দুধ-ভাত/ঠাকুর্দা
ঠাকুর্দ্দা
নিতু হবার পরই মা মারা গেলেন—আর তার কিছু দিন পরে বাবা। ব্যস, দেখবার লোক নেই। নিতু তো খুব ছোট্ট, ওর ক্ষুদে গিন্নী দিদি ইতু তখন পাকা পাঁচ বছরের। ভাবনাটা তাকেই ভাবতে হবে, কিন্তু সে বুঝতেই পারছিল না ব্যাপারটা কি হলো। ফুলের মত সুন্দর মা—একটা ছোট্ট হাত-পাওয়ালা পুতুলের মত ভাইকে উপহার দিয়ে সেই যে ঘুম-ঘুম চোখে তাদের দিকে তাকিয়ে চুপ করলেন—আর কথা বললেন না। সকালে উঠে ইতু মাকে আর দেখতেই পেলে না। বাবা কোলে নিয়ে চুমা দিয়ে ছল ছল চোখে বললেন: ঐ যে মস্ত আকাশ দেখছো ইতু, তোমার মা ঐখানে, রাতে যে সবচেয়ে বড় আর জ্বলজ্বলে তারাটা দেখতে পাবে সেইটি তোমার মা।
—বাড়ীতে মা আর আসবে না বাবা?
—তোমরা যখন বড় হয়ে উঠবে, মা তখন ফিরে আসবেন।
—তাহ’লে আমাদের খেতে দেবে কে? কোলে নিয়ে আদর করবে কে? ঐ পুতুলটাকে নিয়ে খেলবে কে?
—সব আমি ক’রে দেবো মা-মণি,—যাও খেলগে।
ইতু কিছুই বোঝে না, কেমন যেন খালি-খালি মনে হয়, মায়ের কাপড়গুলো তখনও আলনায় সাজানো, ড্রেসিং টেবিলে মায়ের চুলের রূপোর কাঁটাগুলো, সিল্কের ফিতে, সিঁদুর-কৌটা, চিরুনি সব পড়ে আছে। শোবার ঘরে খাটে মায়ের জায়গা খালি—কেমন যেন ফাঁকা আর বিচ্ছিরী লাগে ইতুর। সন্ধ্যা হলেই তার ঘুম পায় কিন্তু মায়ের গরম কোলে শুয়ে পড়াও যায় না, মাথায় হাত বুলিয়েও কেউ দেয় না। বাবা খাটে শুইয়ে দিয়ে কাছে বসে থাকে। পাশের ছোট্ট খাটখানায় —মায়ের শেষ উপহার পুতুলটি অঘোরে ঘুমোয়, কখনও কখনও চেঁচায়, বাবা ঝিকে ডেকে কাপড়-জামা বদলিয়ে দিতে বলেন। ইতু রোজ মনে করে আকাশ ভ’রে তারা উঠলেই বড় জ্বলজ্বলে তারাটাকে সে ডেকে বলবে: “শীগগির এসো, রাতে ভয় করে আমার, খেয়ে পেট ভরে না—সব কেমন বিচ্ছিরী হয়ে গেছে।” কিন্তু তারা উঠবার আগেই সে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভেঙে দেখে সূর্যিমামার আলোয় ঘর ভ’রে গেছে। ইতুর ভারী দুঃখ হয়। বড় তারাটাকে কিছুতেই সে আর দেখতে পায় না।
এমনি ক’রে কিছু দিন কেটে গেল। নিতু এখন বড় হয়েছে, বসতে শিখেছে, হাসে, খেলে। দিদিকে সে খুব চিনেছে, দিদি যখন তাকে অনভ্যস্ত হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে, সে দিদির নাকটা মাড়ী আর জিব দিয়ে চেপে ধরে, হাসে। বাবা কোলে নিতে চাইলেও যায় না। মায়ের পুরানো ঝি, সে না কি মার বাবার বাড়ী থেকে এসেছিল— সেই ‘মাসী’ ইতু আর নিতুকে দেখা শোনা করতো, খু-উ-ব ভালোবাসতো।
নিতু সবে হাঁটতে শিখেছে—সেই সময় একদিন দু’-তিন দিনের অসুখে বাবাও চলে গেলেন। ইতু ভেবে পায় না বাবা আবার কোথায় গেল। লুকিয়ে লুকিয়ে কেঁদে ইতুরও একদিন জ্বর এসে গেল। মাসী ইতুর কথা বুঝতে পারে, বলে: তোমরা বড় হ’লেই বাবা, মা দু’জনেই ফিরে আসবে। ইতু কি বোঝে সেই জানে, তবে ভাইকে সে খুব ভালবাসে, মাসীকেও।
বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। ইতু আর নিতু দু’জনেই এখন স্কুল যায়। কিন্তু হ’লে কি হবে—এর মধ্যে কিছু দিন ধরে একটা লোক তাদের বাড়ী আনাগোনা করতো, মাসীকে খুব শাসাতো—কি সব বলতো ইতু বুঝতে পারতো না—মাসী বলতো আমি ওসব কখনও পারবো না। লোকটা মাসীকে ধমকাতো, বকতো, তার পর চ’লে যেতো।
মাসীর কাছে ইতু শুনেছিল, ও নাকি কাকা হয় ইতুদের। বাবা থাকতে কিন্তু ইতু ঐ লোকটাকে দেখেনি। তাই ইতু লোকটাকে একেবারে দেখতে পারে না। সে এলেই ও নিতুকে নিয়ে অন্য ঘরে চলে যায়। কিন্তু ইতু দেখতে পায় ক্রমশঃ তাদের বাড়ীর ভালো ভালো জিনিষগুলো সব সেই লোকটা নিয়ে যাচ্ছে। বাবার চমৎকার মোটরটাই সে একদিন নিয়ে চ’লে গেল। বাড়ীর কত ভালো জিনিষ একটা একটা ক’রে চ’লে যাচ্ছে, সবই তার বাবা-মা’র জিনিষ। মাসীকে বললে মাসী কাঁদে আর তাদের বুকে চেপে ধ’রে আদর করে। মাসীর কান্না দেখে ইতু আর কিছু বলে না। শোবার ঘরের পাশের ঘরে যে প্রকাণ্ড বড় ঘড়িটা আছে—লম্বায় প্রায় ইতুর তিন ডবল—কি মিষ্টি আওয়াজ ক’রে সময় দেয়। সেই ঘড়িটার জন্য ইতুর ভারি ভাবনা হয়—সে ভাবে যদি এটা সেই লোকটা নিয়ে যায়— এটাকে সে কিছুতেই দেবে না, ইতুর বেশ মনে আছে—বাবা বলতেন: বুঝলে ইতুমণি, এটা হচ্ছে লক্ষ্মী ঘড়ি, আমার ঠাকুর্দা আমায় দিয়েছিলেন—আমি তখন তোমার চেয়ে আর একটু বড়, আমার ঠাকুর্দা খুব বড়লোক ছিলেন আর আমায় খুব ভালবাসতেন। আমি তাই এই ঘড়িটাকে ‘ঠাকুর্দা’ বলি—
—আচ্ছা বাপি, তোমার ঠাকুর্দা তোমায় গল্প বলতে পারে না? ইতু বলতো।
—খু-উ-ব খুব, ওর কি মিষ্টি আওয়াজ বলতো, ঐতেই তো ও কত কথা ব’লে দেয়।
—ও তোমায় খুব ভালবাসে বাপি?
—খুব, তোমাকেও বাসে, ঠাকুর্দা কি না।
অত বড় কেন বাপি? কি লম্বা, আমার দেখলে মনে হয় লোক দাড়িয়ে আছে।
—ঐ যে বল্লুম—ঠাকুর্দা বড় তো হবেই।
বাবার এই সব কথা ইতুর খুব মনে হয়। রাতে শুয়ে ভাইকে বলে: বুঝলি নিতু, এই ঠাকুর্দা আমাদের খুব ভালবাসে, বাবা বলতো ঠাকুর্দা গল্প বলতে পারে, আর সব কথা ব’লে দিতে পারে।
—তোর চেয়ে, মাসীর চেয়েও ঠাকুর্দা ভালো দিদু?
—হ্যাঁরে, ও-যে অনেক বড়।
এমনি ক’রে ছোট্ট ভাই আর বোনের দিন কাটে। নিতু রোজ একবার ক’রে সেই বড় আর সোনার মত হাত-পা-ওয়ালা ঘড়ীর কাছে যায়, কেউ না থাকলে চেয়ার দিয়ে ওঠে, তার গায়ে হাত দিয়ে বলে: বুঝলে দাদু, আজ কি হয়েছে?...দিনের সব খবর নিতু ঘড়ীর কাছে গিয়ে ব’লে আসে। ইতু মাঝে মাঝে দেখতে পায় কিন্তু তারও বিশ্বাস ঠাকুর্দা থাকলে ঐ লোকটা বা অন্য কিছুর ভয় নেই।
আবার এক দিন লোকটা এসে নিতুর ছোট গাড়ীটা আর বাবার ভালো ভালো জিনিষ নিয়ে গেল। ইতুর ভারি দুঃখ হচ্ছিল—নিতুকে সে কি বলবে?
মাসীও খুব কাঁদছে। লোকটি চ’লে যেতেই নিতু ছুটতে ছুটতে এসে মাসীর গলা জড়িয়ে ধরলো: আবার সেই লোকটি এসেছিল মাসী, তুমি ওকে মেরে তাড়িয়ে দাও না কেন, ওকে দেখলে আমার এত ভয় করে কি বলবো, একি তুমি কাঁদছো কেন মাসী? কি হয়েছে রে দিদু?
—নিতু লক্ষ্মীছেলে ভাই, তুমি দুঃখ করো না, তোমার গাড়ীটা নিয়ে গেছে ঐ লোকটা, ওর না কি তোমার মত একটা ছেলে আছে।
—ইস্ কেন নেবে? মেরে হাড় ভেঙে দেবো না?
—অমন বলতে নেই ভাই, তুমি বড় হ’লে আবার আমরা নতুন গাড়ী কিনে আনবো, মাসী বলেছে। ইতু বলে।
নিতু একটু চুপ ক’রে থেকে ছুটে চ’লে যায় ঘড়ীটার কাছে, বলে: জানো দাদু, আমার গাড়ীটা নিয়ে চ’লে গেছে, তুমি ওকে কিছু বলবে না?
নিতুর কথা শেষ হতেই টিং টিং ক’রে ঘড়ীটা বেজে উঠে সময় দেয়। নিতু ভাবে দাদু তাহ’লে সব শুনেছে, নিশ্চয়ই তাহ’লে গাড়ীটা দাদু এনে দেবে।
রাতে শোবার সময় নিতু চেয়ার দিয়ে উঠে ঘড়ীটার গায়ে হাত দিয়ে বললে: ভুলে যেও না যেন, বুঝলে দাদু? গাড়ীটা আমার চাই। নিতু দেখে ঘড়ীর বড় কাঁটা দু’টো যেন চিক্চিক্ ক’রে উঠলো। নিতু ভাবে দাদু তাহ’লে সব কথাই শুনেছে।
এক এক ক’রে ইতুদের সব জিনিষই চলে গেল। মাসী কোন ব্যবস্থাই করতে পারে না, খুব ঝগড়া করে লোকটার সঙ্গে, পাড়ার লোকদের বলে—কিন্তু তারা কি করবে, তারা তো পাড়ার লোক— আর এ হচ্ছে সম্পর্কে কাকা। তবু সকলেই খুব দুঃখ পায় ইতু আর নিতুর জন্য, আহা কত বড়লোকের ছেলেমেয়ে!
স্কুল থেকে এসে নিতু দেখে টম নেই, তার অত সাধের লোমওয়ালা সাদা কুকুর টম। নিতু বই-পত্তর ফেলে কাঁদো-কাঁদো হয়ে উপরে উ’ঠে ঘড়িটার কাছে গেল: তুমি এখনও কিছু বলবে না দাদু?...বলতে বলতে নিতু ঝর ঝর ক’রে কেঁদে ফেললে।
মাসী খাবার দিতে এসে দেখে ঘড়ির নীচে মাথা রেখে নিতু ফোঁপাচ্ছে আর ঘড়িটা ধীরে ধীরে টিক্ টিক্ শব্দ ক’রে যাচ্ছে, ঘরটি নিস্তব্ধ।
কিছুক্ষণ পরে মাসী নিতুকে ডাকে: চলো লক্ষ্মী, খাবে চলো, তোমার দাদু আমায় বলেছে নিতু বড় হ’লে সব এনে দেবো।
—দাদু বলেছে? কবে? নিতু লাফিয়ে ওঠে।
—হ্যাঁ, হ্যাঁ বলেছে, তোমাকেও বলবে বলেছে। সেদিন রাতে খেতে যাবার আগে নিতু আগে উপরে এসে ঘড়িটার কাছে গিয়ে বলে: দাদু, লক্ষ্মী সোনা ভাই, ঐ দুষ্টু লোকটাকে একটু বকুনি দিয়ে দিয়ো—। আজ আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে তোমায় তো সব বলা হলো না, তোমার উপর রাগও হচ্ছে, কই তুমি তো এক দিনও গল্প বলো না—। নিতু হাই তুলে চেয়ারটা ছেড়ে বিছানায় চলে গেল।.. নিতু অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে দেখছে, ভাবছে দাদুর সঙ্গে আর কথা কইবে না—কিন্তু ও কি? ঘড়িটার বড় কাঁটা দু’টো যেন দু’খানা হয়ে গেছে...ও মা! ধবধবে সাদা পোষাক-পরা দাড়িওয়ালা একটা লোক নেমে আসছে দেখো—দিদি, দিদি কোথায় গেল—? কী সুন্দর চেহারা!
লোকটি ধীরে ধীরে নিতুর মাথায় হাত দিয়ে ডাকলো: নিতু!
—কে তুমি? তোমায় তো চিনি না। ভয়ে ভয়ে নিতু উত্তর দেয়।
—বা রে, রোজ তুমি আমার সঙ্গে কত কথা বলো—আর এখন বলছো চেন না? আমি—
—ওহোঃ তুমি বুঝি দাদু?
—হ্যাঁ ভাই।
—আচ্ছা দাদু, তুমি তো আমার একটা কথারও জবাব দাও না; কেন? আমার ভীষণ রাগ হয়।
—বা রে, আমি তো তোমার কথার জবাব দিই, তুমিই শুনতে পাও না তাই বলো।
—তবে তুমি ঐ লোকটাকে ব’কে দাও না কেন?
দাদু নিরুত্তর।
—চুপ ক’রে রইলে যে? দেখতে পাও না, দিদি কেমন মুখ ক’রে থাকে, মাসী কাঁদে।
দাদু তবুও নিরুত্তর।
—বলবে না বুঝি? আচ্ছা বেশ না বলোগে, আমি আর কিছু বলবো না। দু’জনেই চুপচাপ। একটু পরে নিতু ব’লে উঠলো: আচ্ছা দাদু, তুমি গল্প জানো? মজার মজার গল্প?
—হ্যাঁ, জানি বৈ কি!
—বলো না দাদু ভাই!
দাদুর মুখের গল্প শুনতে শুনতে নিতু সব ভুলে গেল।
সকালে চোখ মুছে নিতু বলছে: জানিস দিদি —
—কি রে? ইতু বললে।
—না থাক, পরে শুনিস্। দাদুকে জিজ্ঞাসা ক’রে বলবো। আমি একটা নতুন মজার গল্প শুনেছি।
নিতু বেশীক্ষণ লুকিয়ে রাখতে পারে না, সব ব’লে ফেলে।
—দূর, ও স্বপ্ন। ইতু বলে।
—কখনও না, আমি জানি—।
—আচ্ছা বেশ বেশ, ইতু বাধা দিয়ে ব’লে ওঠে।
কিন্তু স্বপ্ন বা সত্যি যাই হোক—নিতু নিয়ম-মত রোজই দাদুর কাছে সব বলতো, মাঝে মাঝে সে যেন দাদুকে দেখতেও পেতো। সত্যি আর মিথ্যে যাই-ই হোক।
আর অবশিষ্ট কিছুই নেই, নিতুদের জামা কাপড় পর্যন্ত কমে গেছে। ভাল খাবার দিতে না পারায় মাসী রোজ কাঁদে আর সেই লোকটার উদ্দেশে কত কি বলে। ইতু ভাবে এবার কি হবে? নিতৃ ভাবে সব যাক, যেন ঠাকুর্দাকে না নিয়ে যায়। এক দিন ঘড়ীটার দিকে চেয়ে লোকটা বলছিল: বাঃ! চমৎকার ঘড়ী তো। নিতুর দৃঢ় বিশ্বাস ঠাকুর্দা এক দিন সব ঠিক ক’রে দেবে। ভাল খাওয়া আর ভাল জামা-কাপড় নাই বা হলো। রাতে শুয়ে নিতু শুনলো মাসী বলছে দিদিকে: কি যে হবে, কাল না কি ঐ ঘড়িটাকে নিয়ে যাবে, মিস্ত্রী ডাকিয়ে। ঘড়িটা গেলে ছেলেটাকে বাঁচানো যাবে না ইতু—কি করবো, ভগবানকে এত ডাকছি।
ইতু কিছুতেই উত্তর দেয় না, কি-ই বা দেবার আছে, ভেবেও পায় না কি বলবে।
মাসী আর দিদু ঘুমিয়ে পড়লো: নিতু পা টিপে টিপে ঘড়ীর কাছে গেল: একটা চেয়ার এনে তার উপর উঠতে লাগলো, উঃ কী ভীষণ অন্ধকার! তবু মনে সাহস এনে ভাবলে: আমি তো পুরুষ মানুষ, আমার আবার ভয় কি?
ঘড়ির গায়ে হাত দিয়ে নিতু বললে: শুনলে তো দাদু, কাল তুমি চলে যাবে? আচ্ছা যাও, আমি তোমায় আর কিছু বলবো না, আজ শেষ এসেছি। ঘড়িটার গায়ে মাথা রেখে নিতু কিছুক্ষণ চুপ ক’রে রইল। অন্ধকারে ঘড়ির বড় কাঁটা দুটো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এত উজ্জ্বল—টিক্ টিক্ ক’রে আওয়াজ হচ্ছে—কি মিষ্টি যে লাগে নিতুর।
রাত বোধ হয় অনেক হয়ে গেছে, নিতু এবার উঠলো, চেয়ারে সটান হ’য়ে উ’ঠে দাড়িয়ে ঘড়ীর দরজাটা খুলে দেখতে লাগলো, এত মিষ্টি আওয়াজ কেমন ক’রে হয়? মনে হলো ঠাকুর্দা বলছে: নিতু ভাই, মন খারাপ করো না: তোমাদের আমি খুব ভালবাসি। নিতু তৎক্ষণাৎ ঠোঁট ফুলিয়ে উত্তর দেয়: তাই তো, কাল চলে যাবে? ঠাকুর্দা বলছে: পাগল, তোমাদের ছেড়ে কোথায় যাবো?
—হ্যাঁ, মাসী তো দিদুকে বলছিল আমি শুনেছি।
—আচ্ছা শোনো, সত্যি আমি যাবো না। গল্প শুনবে নিতু? —হ্যাঁ, হ্যাঁ—ব্যস নিতুর রাগ জল হয়ে গেছে।
ঠাকুর্দা তখন গল্প বলতে সুরু করেছে: তার পর সেই রাজপুত্তুর চলেছে রাক্ষসকে মারতে, অনাহার পরিশ্রম তুচ্ছ ক’রে ছোট্ট ছেলে পক্ষিরাজকে উড়িয়ে নিয়ে চলেছে।...এত কষ্ট করতে পারো নিতু?...
—তার পর দাদু, তার পর?
তার পর? দাদু বলতে সুরু করলো...
—ভীষণ ঘুম পাচ্ছে দাদু, কিন্তু তুমি কাল যাবে না ঠিক তো?
—আচ্ছা নিতু, আমার ডানদিকের পকেটে হাত দিতে পারো?
—তুমি যা লম্বা, তাহ’লে চেয়ার দিয়ে ছুঁতে হয়—
—তুমি পার কি না তাই বলো না, ডানদিকের পকেট—
—নিতু! নিতু!! মাসীর কণ্ঠস্বর পাওয়া গেল।
নিতু পাশের ঘরে চেয়ারের উপর শুয়ে ঘড়ির গায়ে মাথা দিয়ে অঘোরে ঘুমুচ্ছে।......
—দিদি! দাদু বলছে আমার ডানদিকের পকেটে হাত দিতে পারো?
—সে আবার কি নিতু, তোর এমন সব কথা।
—হ্যাঁ দিদি সত্যি, আচ্ছা আয় আমার সঙ্গে—।
নিতু একটা ছোট চৌকির উপর চেয়ার দিয়ে উঠলো: বাঃ! এবার তো ঠাকুর্দার গায়ে হাত গেছে। ধীরে ধীরে নিতু দরজাটা খুলে ডানদিকের পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিল—ঠিক সেই সময় ঢং ঢং ক’রে আটটা বাজলো আর ঘড়ীর কাঁটাগুলো যেন অস্বাভাবিক ভাবে উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।
নিতুর হাতে অনেক কাগজ-পত্র, আর কিছু নেই। ইতু অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
—সকাল বেলা খাবার না খেয়ে কি হচ্ছে সব? এসো ইতু, নিতু, খাবে এসো। মাসী এসে ডাক দিলো।
—নিতু তখনও কাগজগুলো হাতে দাঁড়িয়ে আছে। দু’জনেই নিরুত্তর।
—কি হয়েছে? ইতু?
—এগুলো ঠাকুর্দা দিয়েছে মাসী! নিতু হাত বাড়িয়ে মাসীকে দিলো।
ইতু আর নিতু এখন অনেক বড় হয়ে গেছে, তোমাদের মত। ঠাকুর্দা যে কাগজগুলো দিয়েছিল তা তাদের ঠাকুর্দার সম্পত্তির উইল ইত্যাদি।
সেই বিচ্ছিরী লোকটি যা নিয়ে গিয়েছিল কড়ায় গণ্ডায় তাকে তা ফেরৎ দিতে হয়েছে। ওদের আর কিছু কষ্ট নেই। নিতুর সবচেয়ে আনন্দ তার গাড়ী আর টম ফিরে এসেছে। গাড়ীটায় নিতু আর চড়ে না—বড় হয়ে গেছে কি না, কিন্তু টমকে নিয়ে সে রোজ বেড়াতে যায়। ঠাকুর্দাকে সে আজও ভোলেনি। এখনও রোজ শোবার সময় একবার ক’রে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম ক’রে আসে।