বিষয়বস্তুতে চলুন

দুধ-ভাত/তারা যদি কথা কইতো

উইকিসংকলন থেকে

তারা যদি কথা কইতো

 পিণ্টু আজ কোনো কথা শুনবে না—বাজারে যাবেই। রোজ রোজ সে ভরতকে বলে বাজারে নিয়ে যেতে—কত কি জিনিষ বিক্রি হয় তা সে দেখবে—যা দু’চার আনা জমেছে তা দিয়ে কিছু না কিছু কিনেও আনবে—অবিশ্যি কেনার কথাটা সে ভরতের কাছে ফাঁস করেনি—তাহ’লে যদি ভরত রাজী না হয়—কিন্তু এত খোসামোদ ক’রেও—দোক্তার জন্য দু’চারটে পয়সা ঘুষ দিয়েও—কোনো ফলই হলো না, ভরত কেবলই আশা দিয়ে রাখে কিন্তু নিয়ে যায় না। কাল তো তাই একচোট বোঝাপড়া হয়েছে, অবশেষে যখন পিণ্টু কাঁদতে লাগলো তখন নীপুকা আর অরুণদা যুক্ত হয়ে কথা দিল—রবিবার দিন নিশ্চয়ই পিণ্টুকে তারা বাজারে নিয়ে যাবে।

 একথা নীপুকা, অরুণদা ভুলে গেলেও পিণ্টু তো ভোলেনি। একটি একটি ক’রে গোনা দিন শেষ হয়েছে। প্রত্যেক দিন পিণ্টু, কল্পনায় দেখে বৌবাজারের চওড়া রাস্তাটা সে গাড়ীঘোড়া এড়িয়ে দিব্যি পার হয়ে গেছে। বাজারের পশ্চিম দিকের গেটে ঢুকেই যে ফলওয়ালার দোকান—সেখানে গিয়ে সে আগে একজোড়া মর্তমান কলা কিনবে—তারপর সোজা ঢুকে যাবে দু’ধারে সব্জী ইত্যাদির বিক্রিওয়ালাদের ফেলে। এসব দোকান আছে কিনা, সত্যিই সে জানে না, তবে ভরত যখন মাকে বাজারের হিসেব দেয়—তখন সেই সব কথা শুনে শুনে সে সব একটা কল্পনা ক’রে রেখেছে।

 সেদিন ভরত বাজার থেকে এসে মাকে হিসেব দিচ্ছে আর বলছেঃ বাবা! আমি আর পারবো না মা, যা আক্রা গণ্ডা হয়েছে— তুমি বিশ্বাসই করতে চাইবে না। দর যদি কমাতে যাও, হাত থেকে কেড়ে নেবে—বলবে একটু মাছের জল খেয়ে যাও—মাছ খেতে হবে না।

 পিণ্টু মনে মনে বলে: দাড়াও না, রবিবার গিয়ে সব জেনে আসবো—তারপর রোজ বাজার যাবো—একদিনও ভরতকে যেতে দেবো না। যদি পয়সা রোজ একটু একটু বাঁচাতে পারি—তাহ’লে যে সব জিনিষগুলো লিস্ট করা আছে তা সব কিনে ফেলবো এক এক ক’রে।

 আজ সেই অনেক দিনের গোনা দিন শেষ হয়েছে।

 আজ রবিবার।

 পিণ্টু খুব ভোরে উঠেছে কিন্তু নীপুকা, অরুণদা তো বেলা পর্যন্ত ঘুমুবে—আজ রবিবার আবার। তারপর চা আর খবরের কাগজ নিয়ে বসবে—, তুমুল তর্ক হবে—পৃথিবীতে ঐ যে ছাই যুদ্ধ ব’লে কি জিনিষ আছে—তাই নিয়ে ওদের মাথাব্যথার অন্ত নেই। লড়াই তো সন্তুর সঙ্গে তার রোজ হয়—মারামারির পর ভাব হয়ে যায়, তা নিয়ে কেই বা মাথা ঘামাচ্ছে—বা তর্ক করছে। যত্তোসব বাজে কথা নিয়ে নীপুকা, অরুণদা এমন কি বাবা, জ্যাঠামণি, ছোড়দাদুর পর্যন্ত মাথা ঘামানো আর সময় নষ্ট। আজকে নিশ্চয় ওদের অনেকক্ষণ ধ’রে বকাবকি চলবে। নাঃ, আগে থেকে তাড়া দিতে হবেই। পিণ্টু মনে মনে ঠিক করলো।

 বার তিনেক চা খেয়ে—বাহিরের ঘরে খবরের কাগজ নিয়ে যেই নীপুকা আর অরুণদা ঢুকেছে—অমনি ঝড়ের মতো পিণ্টু এসে বললে: মনে আছে তো আজ রবিবার।

 নীপুকা, অরুণদা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলো।

 পিণ্টু বললে: সেই মঙ্গলবার বলেছ আজ বাজারে নিয়ে যাবে।

 ওঃ, তাই বল। এখন তো মোটে সাড়ে আটটা, সাড়ে ন’টার সময় যাবো—তখন আসিস।

 একটা ঘণ্টা পুরো—রীতিমত অসহ্য পিণ্টুর। সন্তু এসে খেলতে ডাকলে—সগর্বে পিণ্টু, উত্তর দিলো: না, আজ আর খেলা নয়, আমি আজ বাজার যাবো।

 সাড়ে ন’টা বাজতেই পিণ্টু, আবার বৈঠকখানার দরজায় হাজির। নীপুকা বললে: চল চল—যা ভরতকে ঝুড়ি আর মাছের জালতি আনতে বল।

 আবার ভরত! পিণ্টু বললে: ভরত কেন, আমি তো আছি। অরুণদা হেসে বললে: রবিবারের বাজার তুমি আমি পারবো না, ভরত না গেলে মুটে করতে হবে।

 —তাই করবে, ভরত এখন ওপরের ঘর মুছছে।

 আচ্ছা, যা, মা’র কাছে টাকা চেয়ে নিয়ে আয়। একলাফে পিণ্টু ওপর ঘুরে এলো—হাতে একটা দশটাকা ও একটা পাঁচটাকার নোট অন্যহাতে মাছের জালতি। অরুণদা আর নীপুকা ওর চেহারা দেখে হেসে ফেললে। বাজারে ঢুকবার একটু আগে বাঁদিক ঘেঁষে যে দোকানটায় সাইন বোর্ডে লেখা—বাঙালীর পাঁঠার দোকান—সেখানে অরুণদা হেঁকে বললে: পীতাম্বরদা, আড়াই সের ভালো মাংস রাখো —মেটে দিও। ফিরবার সময় নেবো। আর শোনো, এই নোটটা ভাঙিয়ে দাও তো!

 পীতাম্বর পানে কালো দাঁতগুলি বার ক’রে একগাল হেসে বললে: এই যে—নাও।

 এবার পিণ্টুকে নিয়ে ওরা আর এক মাথায় ঘুরে অন্য গেট দিয়ে ঢুকলো। আর কি সুন্দর ফুলের গন্ধ—দু’পাশে ফুলের দোকানে নানারকম ফুল—তারই সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। আর একটু এগিয়ে গেলেই তরকারী, নানা সব্জীর ডালা সাজিয়ে ব্যাপারীরা ব’সে আছে। অরুণদা বললে: নীপুকা ভালো ক’রে দেখে-শুনে সব কিনো ভাই, না হ’লে আজ আর রক্ষে থাকবে না বাড়ীতে।

 নীপুকা তখন উবু হয়ে পাশের ঝুড়িতে টাটকা বড় করলা আর কালো শিরওয়ালা বড় বড় পটল দর করতে লেগে গেছে।

 পিণ্টু খুশীতে উপচে পড়ছে। হঠাৎ তার মনে হলো ভরত ছোট শুকনো পটল নিয়ে গেলে মা রাগ ক’রে বলেন: এই কুচ্ছিত পটলগুলো আনিস কেন—বেশ বড় বামুন পটল আনতে পারিস না?

 —বামুন পটল আবার কি?—ভরত চোখ কপালে তোলে।

 বড় কালো শিরওয়ালা টাটকা পটল, আমার শাশুড়ী বলতেন, বামুন পটল আর এগুলো মেথর পটল—মার জোরে হেসে ওঠার কথাও পিণ্টুর মনে হলো। কিন্তু ও কি!—ঝুড়ির পটলগুলো ন’ড়ে-চ’ড়ে করলার কাছে গিয়ে ফিসফিস ক’রে ব’লে উঠলো: ও দিদি শুনছো, ওদের পিণ্টু নাকি সস্তায় আমাদের কিনে নিয়ে যাবে

 করলাদিদি মাথার বোঁটাটা একটু সিঁটকে বললে: সে তোদের, আমার গায়ে যা তেতো, পিণ্টুরা খায় না—কেবল ওর দাদু মাঝে মাঝে চেঁচায় করলার শুক্তো করো ব’লে।

 আর পাশাপাশি ক’টা ঝুড়িতে ডুমুর, কাঁচা লঙ্কা আর ঝিঙে ছিল, একসঙ্গে সবাই ব’লে উঠলো: আরে জানো না বুঝি—ও এসেছে সব কিনতে—মনে মনে ঠিক করেছে চাকরটাকে আর পাঠাবে না—পয়সা বাঁচাবে, তা দিয়ে অন্য সব জিনিষ কিনবে—বুঝলে পটল খুড়ো।

 লাল কুমড়া দু’ফালি হয়ে প’ড়ে আছে—বিচিশুদ্ধ দাঁত বা’র ক’রে ব’লে উঠলো: তা বাঁচাক না পয়সা, তোদের কি? ছেলেটা এসেছে তোরা অমন করছিস কেন?

 —ঐ যাঃ, করলাদিদি তো চললো মুটের মাথায়—কাঁচা লঙ্কা চিটপিটিয়ে ব’লে উঠলো।

 —এবার পটল খুড়ো আর কুমড়ো কর্তার পালা,—ঝিঙে কথাটা ব’লেই মুখ ঢাকলো।

 —হুঁ, হুঁ কেউ বাদ নয়, সবাইকে যেতে হবে—নীপুকা তো এগিয়ে আসছে।

 পিণ্টু, তন্ময় হয়ে শুনছে—এরা বলে কি? বেগুনের ঝুড়িতে কালো বড় বড় বেগুন এবার কাঁটা বা’র ক’রে পুঁইডাঁটাকে বললে: খুব তো কচি কচি পাতা বা’র ক’রে বাহার দিচ্ছ—ওঠগে এবার পিণ্টুদের মুটের মাথায়।  —এই তো সকালে আমাকে মাচা থেকে কেটে এনেছে, এর মধ্যে তরকারী হ’তে উনুনে যেতে হবে?—কাঁদ কাঁদ হয়ে বললে পুঁইডাঁটা।

 —তা আর কি করবে, চচ্চড়ি খাবার সাধ হয়েছে পিণ্টুর দিদির —ফোঁড়ন দিল কোণের দিক থেকে যজ্ঞিডুমুর।

 —দাঁড়াও না, পেট কামড়ানো ধরিয়ে দেবো, মানুষগুলোর জ্বালায় বাঁচবার উপায় নেই।

 মানকচু আর ওল পাশাপাশি গলা জড়িয়ে গল্প করছিল, দুজনে একসঙ্গে বললে: তা যা বলেছ দিদি। মাটির তলা থেকে বা’র ক’রেও খাবে।

 পিণ্টু, ভীষণ ঘাবড়ে গেছে, এরা তো সাংঘাতিক লোক। আজ তাহলে দিদিকে পুঁইডাঁটা খেতে বারণ করতে হবে—যা ডাঁটা চিবোয় দিদিটা, পাতের কাছে যেন পাহাড় হয়।

 অরুণদা বললে: এদিকে তো সব হলো—ফল আর মাছ হ’লেই হয়—আয় পিণ্টু!

 পিছন ফি’রে তাকাতে তাকাতে পিণ্টু হাঁটছে—যা ভিড়, লাগলো একজনের সঙ্গে ধাক্কা—।

 —বাচ্চা ছেলেদের বাজারে আসা কেন বাপু!—ব’লে উঠলো সামনের লোকটি।

 পিণ্টু রাগ ক’রে একবার তার দিকে তাকালো—না, তা আসবে কেন, কেবল তোমরাই আসবে।

 বড় ছোট গলা কাটা কাটা মাছের মুড়োগুলো বারকোষে সাজান —চোখগুলো যেন বেরিয়ে আসতে চাইছে। তার পাশে বড় বড় বঁটী নিয়ে ব’সে আছে মেছুনীরা, আরও এগিয়ে গেলে ছোট-বড় নানা মাছের ডালা। কুচো চিংড়ি অবধি আছে।

 পিণ্টু মুড়োগুলোর কাছে আসতেই—সবচেয়ে বড় মুড়োটা ব’লে উঠলো: কিনতে এসেছ তো? জানো এরা আমাকে ধ’রে এনে কেটেছে—আমার সাজানো সংসার জলের তলে রয়েছে, মানুষের ওপর আমার কি রাগ আছে তা বলতে পারি না। শুধু শুধু এনে কাটলো—।

 মুখটা হাঁ হয়ে গেছে বড় মাথাটার—ভিতর অবধি খাঁ খাঁ করছে—। ভয় পেয়ে পিণ্টু অরুণদাকে ঘেঁষে দাড়ালো।

 বড় একটা আস্ত মৃগেল লম্বা হয়ে শুয়ে ছিল—ঐখানেই। ল্যাজটা নেড়ে বললে: আমি সকলকে ছেড়ে চ’লে এসেছি অর্থাৎ জাল ফেলে এনেছে শুধু শুধু মানুষদের ভোজের জন্য। দাঁড়াও না, মজা দেখাচ্ছি, পেটের ভিতর ঢুকি একবার।

 ছোট ছোট বাটা মাছগুলো কাঁদ কাঁদ হয়ে বললে: দেখ না কাকা, আমাদেরও মা-বাবার কাছ থেকে কেমন ক’রে ছিনিয়ে এনেছে! জেলেগুলো আমাদের নিয়ে কি দর করে, মোটা পয়সা নিয়ে চ’লে যায়—এত পাজী ওরা।

 মোটা দাড়া নেড়ে ঘিওয়ালা মাথাটা বেঁকিয়ে চোখ বা’র ক’রে গলদা চিংড়ি বললে: দাম যদি বেশী নেয় সে আমায় দিয়ে মাথার এই টকটকে লাল ঘির দামই আলাদা—তবে সহ্য হয় না বেশী খেলে মানুষের। আমরা হলাম গিয়ে—

 বলা শেষ হলো না—সুড়সুড় ক’রে পিণ্টুদের মুটের মাথায় বসতে হলো, সবচেয়ে বড় রুইএর মাথাটা ইতিমধ্যেই চ’লে গেছে।  পিণ্টু, আর ঘুরতে চায় না—সকলের সব কথা শুনে সে রীতিমত ভয় পেয়েছে। আর কোনো দোকানে সে দাঁড়াতে রাজী নয়— এদিকে অবিশ্যি কাজও শেষ হয়েছে।

 বাড়ী এসে মুটে যখন জিনিষগুলো ঢেলে দিচ্ছে, পিণ্টু আস্তে আস্তে সেগুলোর কাছে এসে দাঁড়ালো। ভরত তখন সব্জী সরিয়ে মাছগুলো তুলে নিচ্ছে কাটবার জন্য। রুই-এর মুড়ো দেখে মা বললেন: আজ মুড়িঘণ্ট হবে—পিণ্টু খেতে ভালবাসে।

 —না, না, আমি মুড়িঘণ্ট খাবো না—পিণ্টু চীৎকার ক’রে ওঠে।

 ভরত ঝঙ্কার দিয়ে উঠলো: তা’ না খাও গে, সর দিকি, আমি মাছ কাটি। বাজারে যাবার জন্য তো কান্নাকাটি, এসে অমন গোঁজ হয়ে দাড়িয়ে আছ কেন? সখ মিটেছে?

 পিণ্টু রেগে ভরতের পিঠের উপর গুম গুম ক’রে ক’টা কিল বসিয়ে দিল: হ্যা মিটেছে, তোমার কি!

 মা ব’লে উঠলেন: ও কি হচ্ছে পিণ্টু!

 কিছুক্ষণ পরে শোনা গেল, পিণ্টু সন্তুকে বলছে: জানিস সন্তু, মুড়িঘণ্ট খাসনি, গলদা চিংড়িও নয়—

 —কেন? কেন? সন্তু জিব দিয়ে ঠোঁটটা চেটে বললে: কি সুন্দর রান্নার গন্ধ বেরিয়েছে পিণ্টু দা, আর তুমি বলছো—

 —তবে যা, খেয়ে মরবি—রাগ ক’রে উঠলো পিণ্টু।

 পিণ্টু আর কোনোদিন বাজারে গিয়েছিল কিনা ভরত, নীপুকা বা অরুণদাকে তা জিজ্ঞাসা করা হয়নি।