বিষয়বস্তুতে চলুন

দুধ-ভাত/দুধ-ভাত

উইকিসংকলন থেকে

দুধ-ভাত

 মিণ্টু বড় মুস্কিলে পড়েছে। সকালে, রাতে যখনই সে ভাত খাবে—দুধ-ভাত খেতেই হবে—আশ্চর্য! এত ব’লে কয়ে কিছু হয় না—ঠাকুমা, মা শেষ পর্যন্ত ছোটকা বড়দা পর্যন্ত বলবে: খা রে মিণ্টু, দুধ-ভাত খা, ভারী ভালো জিনিস।

 ছাই ভালো। মনে মনে গর্জে উঠে মিণ্টু বলে। আহা-হা ভালো, তাই ওঁরা খান না—কেবল মিণ্টু দুধ-ভাত খাবে। কেন খাবে ঐ ছাইগুলো? ওর একটুও ভালো লাগে না। বিশেষ ক’রে ছোটকা যখন বলে তখন তো তার মারতে ইচ্ছা করে। ছোটকা যে কী ভীষণ বাজে কথা বলে, তা মনে হ’লে রাগে আর মেজাজ ঠিক রাখা যায় না। সেবার দার্জিলিং বেড়াতে গিয়ে যখন সে হেঁটে আসতে পারছিল না—তখন ছোটকা বলেছিল: মিণ্টু, জোর জোর পা চালিয়ে চলো, আমরা রাজার বাড়ী যাব, সেখানে রাজকুমার ব’সে আছে। সেই যে রাজপুত্রের গল্প তুমি শুনেছিলে—সেই রাজপুত্র। ঝলমলে পোষাক প’রে মাথায় উষ্ণীষ, মুক্তোর মালা গলায়—সেই রাজপুত্তুর পক্ষিরাজ ঘোড়া নিয়ে আছে, আমরা গেলে দেখা ক’রে তবে সে পক্ষিরাজে ক’রে বেড়াতে যাবে।

 সেদিনের কথা মিণ্টুুর পরিষ্কার মনে আছে।—অনেক কষ্ট ক’রে সে যখন বাড়ীর কাছাকাছি প্রায় এলো: কই ছোটকা, রাজপুত্তুর? ছোটকা বললেন: ঐ যে দেখছ দূরে বন্ধ বড় বাড়ীটা, ঐটায় রাজপুত্তুর থাকে—আর ঐ তার ঘোড়া। মিণ্টুু দেখলো একটা বন্ধ বাড়ী বটে, কিন্তু যেমন বাড়ী সে ভেবেছিল তেমন নয়, আর ঘোড়া? আরে রাম—যে রোগা রোগা ঘোড়াগুলো নিয়ে বাবুরা ভাড়া ক’রে চ’ড়ে বেড়ায়, তারই একটা শুকনো ঘোড়া সেই দরজার কাছে দাড়িয়ে আছে, বোধ হয় সোয়ারী নেবে—ঐ নাকি ছাই পক্ষিরাজ।

 ছোটকার উপর সেদিন তার কি না রাগ হয়েছিল! পরে সে নিজের কানে শুনেছে ছোটকা বলছে: মিণ্টুুটা কি হাঁটতে চাইছিল? রাজপুত্তুরের কথা বলাতে ও হেঁটে এলো।

 উঃ, কী ভীষণ মিথ্যেবাদী! অথচ ওকে বললে: আমাদের আসতে দেরী হয়ে গেছে কিনা তাই রাজপুত্তুর লেখাপড়া করতে চ’লে গেছে, আবার পরে একদিন আসবে।

 সেই থেকে ছোটকার উপর তার যা রাগ আছে। আবার বলা হয়, মিথ্যে কথা বলতে নেই।

 কিন্তু আজকে তার সব চেয়ে রাগ—দুধ-ভাত নিয়ে। আজ সে একটা কাণ্ড করবেই। দুধের বাটি যদি উল্টে না দেয় তাহ’লে তার নামই মিণ্টু নয়। আর বাড়ী থেকে সে আজ চ’লে যাবে যেদিকে তার চোখ যায়। এ কথার আর কোনো নড়চড় নেই।

 আজ স্কুল নেই, রবিবার—মা, ছোট কাকিমা সবাই রান্নাঘরে। আজ ভালো ভালো রান্না হচ্ছে, সব্বাই আজ বাড়ীতে আছে। আরো কারা যেন সব আসবে। মিণ্টু পড়া সেরে একবার রান্নাঘরে গেল। —সত্যিই আজ অনেক ঘটা রান্নাঘরে। ঠাকুমা পর্য্যন্ত এসে গেছেন রান্নাঘরে।—মা উনানের পাশে ব’সে বড় বড় মাছের খণ্ডগুলো ভেজে তুলছেন, ঠাকুমা তদারক করতে করতে বলছেন: এবার মালাইকারীটা চড়িয়ে দাও বড় বৌমা। ছোট বৌমা, এ দুধটা কিসের গা, মালাইকারীর?

 ছোট কাকিমা বললেন: না, না, এ দুধ জ্বাল দিলাম এবার বাটিতে তুলবো, মালাইকারীর দুধ পাথর বাটিতে আছে। এই ব’লে ছোট কাকিমা সারি সারি বাটিতে নাম ক’রে ক’রে দুধ তুলতে লাগলেন— এটা সন্তুর, এটা নাণ্টুর, এটা হলো ছোট খোকনের—এটা মিণ্টুর।—ব্যস, মিণ্টুর আর দেখতে হবে না, ছিটকে বেরিয়ে এলো রান্নাঘর থেকে। আজ যদি সে বাড়ীতে ভাত খায়, কী বলেছে! সন্তু, নাণ্টু, ছোট খোকন ওরা হলো একরত্তি ছোট্ট, ওরা দুধ-ভাত খাবে। মিণ্টু, এখন বড় হয়নি? আর কোনো কথা নেই—কেবল দুধ-ভাত।

 মিণ্টুর তাড়াতাড়ি ক’রে বেরিয়ে আসা দেখে মা একবার ডাকলেন: মিণ্টু, কোথায় যাচ্ছ? এসো না, ক্ষিদে পেয়েছে?

 মিণ্টুর তখন চোখে জল এসেছে—ক্ষিদে পেয়েছে। দূর থেকে চেঁচিয়ে মিণ্টু, বললে: না ক্ষিদে পায়নি—আমি মনুদের বাড়ী বেড়াতে যাচ্ছি।

 —শীগ্‌গির এসো কিন্তু।

 শীগ্‌গির এসো! সবাই ভালো ভালো জিনিষ খাবে আর মিণ্টুর জন্য দুধ-ভাত! মিণ্টু আর এ বাড়ী এসেছে!—মনে মনে এই কথা ব’লে মিণ্টু রাস্তায় বেরিয়ে সোজা মনুদের বাড়ী গিয়ে উঠলো। ওদের বাড়ী গিয়ে একদল বন্ধুবান্ধবদের মাঝে খেলাধুলো পেয়ে মিণ্টু যে দুঃখ নিয়ে বেরিয়েছিল সব ভুলে গেল।

 অনেকক্ষণ খেলাধুলোর পর মনুর মা ডাকলেন: সবাই খাবে এসো।

 মিণ্টুর মনে হলো এবার বাড়ী যেতে হবে। —আবার তার দুধ-ভাতের কথা মনে হলো। সে ঠিক করলে এখান থেকে পাখীদের বাড়ী যাবে। এমন সময় মনুর মা বললেন: এসো মিণ্টু, খাবে এসো।

 —না, আমি খেয়ে—না, বাড়ী যাবো। অস্পষ্ট ক’রে মিণ্টু কি যে বললে বোঝা গেল না।

 মনুর মা বললেন: তোমাদের চাকর ডাকতে এসেছিল, আমি ব’লে দিয়েছি ও এখানে খেলছে, খেয়ে দেয়ে পরে যাবে। মিণ্টু চুপ ক’রে রইল। ভাবলো মনু নিশ্চয় দুধ-ভাত খায় না। যাক—বাড়ীর রাগটা তাহ’লে বেশ জমবে।—কিন্তু বাড়ীতে আজ অনেক ভালো ভালো রান্না হচ্ছে।

 মনু, মিণ্টু আর সব ছোটরা খেতে ব’সে পড়লো—খুব হাসি গল্প, মজা ক’রে খাওয়া হচ্ছে। মনুর মা একবার এসে দেখে গেলেন: কি নিবি রে? মিণ্টু ভালো ক’রে খাও, লজ্জা করো না। ও ঠাকুর! দুধের বাটিগুলো নিয়ে এসো।

 মিণ্টুর সব আনন্দ নিবে গেছে!—য়্যাঁ, এখানেও দুধ?

 —না মাসীমা, আমি দুধ খাবো না, পেট ভ’রে গেছে।

 —না, না, সেকি হয়, একটু দুধ-ভাত না খেলে ছোট ছেলেপিলে বাঁচবে কি ক’রে?  বাড়ীতে রাগ চলে, কিন্তু পরের বাড়ীতে?

 অগত্যা মিণ্টুকে—।

 ওখান থেকে সে পাখীদের বাড়ী গেল। আজ রবিবার, খুব ক’ষে খেলার দিন। বিকেল হয়ে এলো, মিণ্টু বাড়ী যাবার নাম করে না। সে তো বাড়ী যাবে না ঠিকই ক’রে ফেলেছে। পাখীর মা সবাইকে জলখাবার আর চা দিলেন, আর মিণ্টুকেও। মিণ্টু অবশ্য‍ই আপত্তি করেছিল, কারণ ওর ভীষণ লজ্জা করে অন্য জায়গায় খেতে। কিন্তু তাহ’লে কি হয়, পাখীর মার কাছে কোনো আপত্তিই টিকলো না। খাবার চা খেতে খেতে এলো এক বাটি দুধ।

 —খেয়ে নাও মিণ্টু, চা খাও না-খাও দুধটা খাও।

 মিণ্টু দু’বার ঢোঁক গিলে দুধটার দিকে তাকিয়ে ভাবলো, কিজন্য সে আজ সারাদিন বাড়ী ছাড়া।

 কিন্তু মিণ্টুকে খেতেই হলো— অগত্যা—।

 সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সারাদিন হৈ চৈ ক’রে মিণ্টুর চোখ বুজে আসছে। কোথায় যায়? আচ্ছা, আজ চুপচাপ লুকিয়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়িগে, সকালবেলা উঠে আবার ভাববো কি করা যায়, কোথায় যাওয়া যায়।

 মিণ্টু আস্তে আস্তে বাড়ী ঢুকলো। সন্তু বাইরের ঘরে পড়ছিল, মুখ তু’লে মিণ্টুকে দেখে বললে: এই যে ছোটদি! সারাদিন কোথায় থাকা হয়েছিল শুনি?

 মুখ ভেঙিয়ে মিণ্টু উত্তর দিল: যেখানেই থাকি তোর কি?

 —যাও না, হবে’খন, আজ খাবার সময় ছোটকা খুঁজছিল, বড়দা ডাকছিল মিণ্টু, মিণ্টু, ক’রে। আজ কি খাওয়ার ঘটা ছোটদি, বুঝলি! সন্তু জিব দিয়ে তার ঠোঁটটা একবার চেটে নিলো।

 —যা, যা, তোর মত আমি লোভী নই। মিণ্টু সোজা শোবার ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়লো।

 ইস্! রাজ্যের ঘুম চোখে মিণ্টুর।

 —মিণ্টু, ওঠো লক্ষ্মী মেয়ে! সারাদিন খাওনি। মায়ের কণ্ঠস্বর ঘুমের আমেজের মধ্যে শোনা যায়।

 —এত রান্না বান্না, লোকজন খেলো, একটা মেয়ে বাড়ীতে, সে যে খেলো না, তার খোঁজ হলো না, তোমাদের আক্কেল কি গো বৌমারা! —দূর থেকে শোনা যায়, এ কণ্ঠ ঠাকুমার।

 —না মা, ওকে আনতে পাঠানো হয়েছিল, মনুর মা হরিকে ফেরৎ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এখানে খাবে।—তা ওর জন্য সব আছে তো—নরম কণ্ঠ, এ হলো ছোট কাকিমার।

 —মিণ্টু কই রে? কখন এলো? সারাদিন খুঁজে পাইনা।— এই কণ্ঠস্বর শুনলেই মিণ্টুর রাজপুত্তুরের কথা মনে পড়ে। ছোটকার কণ্ঠস্বর।

 —মিনু মামণি! ওঠো তো মা, যাও খেয়ে নাও গে, সারাদিন খাওনি। বাবার আদরভরা কণ্ঠস্বর শুনলে সব রাগ জল হয়ে যায়।

 ঘুমের ভিতর মিণ্টু মার হাত ধ’রে উঠলো। মুখ ধুয়ে যখন খেতে বসছে, সন্তু বলছে: এই ছোটদি, চোখ তাকিয়ে খা না, কত কি খাচ্ছিস দেখ ভালো ক’রে।

 —যা, যা, লোভী কোথাকার—ঝাঁঝিয়ে উঠলো মিণ্টু তারপর খেতে আরম্ভ করলো।  —খাচ্ছিস তো মিণ্টু, খা, খা।—বড়দা পাশ দিয়ে বাইরের ঘরে চলে গেলেন।

 —এই তো মিণ্টু, কোথায় ছিলে মা সারাদিন? মাথাটা নেড়ে দিয়ে ছোটকা বেরিয়ে গেল।

 ছোটকার গলা পেয়ে মিণ্টুর চোখের ঘুমটা একটু ছেড়েছে। চোখ তাকিয়ে দেখলো অনেক সব খাবার জিনিসের মাঝে সে ব’সে আছে, সামনে সন্তু আর নাণ্টু গপ্ গপ্‌ গপ্, ক’রে খাচ্ছে।

 ছোট কাকিমা বললেন: ভালো ক’রে চোখ চাও মিণ্টু, এই নাও—দুধের বাটি, সব শেষে দুধ-ভাত খাবে—দেখো যেন বেড়ালে মুখ না দেয়।

 মিণ্টুর চোখের ঘুম একেবারে ছেড়ে গেছে।

 অগত্যা—!