দুধ-ভাত/ধীরে ধীরে ফল ফলে
ধীরে ধীরে ফল ফলে
সেদিন কুমকুমের একেবারে পড়া হয়নি, তার মানে পড়া তৈরী করতে পারেনি। কেমন ক’রেই বা পারবে? একে তো রুণুদের দল এসে যা তাড়া লাগালো খেলতে যাবার জন্য, সেই জন্য ভালো ক’রে খাবার খাওয়াই হলো না। হালুয়া আর পাঁপর ভাজা খেতে কতটুকুই বা সময় লাগে, কিন্তু তাও খেয়ে উঠতে পারলো না। খাবার জলের গেলাসে পাঁপর-ভাজা ডুবিয়ে যেই না খেতে গেছে, পড়বি তো পড়, একেবারে পিসির চোখে! পিসি একালের আধুনিকা মেয়ে হ’লে কি হবে, যা রাগী মেয়ে, বাবা! ওকে পড়বার সময় দেখলে আর পড়া হয় না। হবে কেমন ক’রে? বই হাতে দেখলেই ব’লে বসবে—কই দেখি কুমকুম, কেমন পড়া হয়েছে? ও-কথা শুনলেই অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে—না পারলেই বকুনি আর ঐ সব শব্দগুলো—যা শুনে-শুনে কুমকুম মুখস্থ বলতে পারে: এ সব মেয়েদের কিছু হবে না। কেবল খেলা, নাচ, গান! কোথায় মিটিং হচ্ছে, স্কুল পালিয়ে চল সেখানে, আজ স্ট্রাইক, কাল এর ছুটি, হেন-তেন, একটা না একটা বুদ্ধি বেরুবেই। বড়দা যেমন কিছু বলে না! দেখবে কেমন মেয়ে হবে... ইত্যাদি।
কুমকুম ভাবে পিসি যে অত বলে, তা ওরা কি ছোটবেলায় গঙ্গার ঘাটের সাধুর মত চোখ বুজে ব’সে থাকতো, না ঠাকুমার মত ঠাকুরঘরে মালা জপ করতো—তা করলে কেমন ক’রে পাস করলো আবার কলেজ থেকে? হঠাং কুমকুমের কানে আসে—ওর ছোটদা পিসিকে শুনিয়ে শুনিয়ে ওকে বকুনি খাওয়াবার জন্য যেন পড়ছে: ABC ত্রিভুজের A বিন্দু হইতে BCর মধ্য-বিন্দু Dর উপর AD লম্ব টানা হইয়াছে। প্রমাণ করিতে হইবে যে—
কুমকুমের আরো বেশী রাগ হয়, জ্যামিতির ঐ ABC শুনলে তার গায়ে জ্বালা ধরে, ছোটদা জানে ব’লে বেশী ক’রে অমনি করে। তা ছাড়া গাধার মত চেঁচালে ওখানে পড়া যায় নাকি? এই কথা বলেছিল ব’লেই তো ছোটদা ওর বেণী ধ’রে টান মারলো! এত পাজী ছেলে, আর পিসি বলবে অলকের মত পড়াশুনোয় ভালো ছেলে দেখা যায় না, কুমিটা হচ্ছে ফাঁকিবাজ। এ কথা শুনলে কার না কান্না পায়? আবার সুন্দর নামটাকে কাট-ছাঁট ক’রে কুমি বলা হচ্ছে। ছোটদা তো শিখলেই যখন-তখন বলবে বন্ধুবান্ধবের সামনেই। মাকে ব’লেও তো ফল হলো না, বললেন: আচ্ছা, সবাই তোমায় কুমু বলবে, রবীন্দ্রনাথ এই নাম তাঁর লেখায় ব্যবহার করেছিলেন—
ধুত্তোর রবীন্দ্রনাথ, কুমকুমের ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছা করে। ওর অমন সুন্দর নামটাকে যা-তা করবে সবাই, অথচ অনুযোগ করলে কেউ আমোল দেয় না। সবচেয়ে রাগ তার পিসির উপর, অত যে সাধু সেজে বলা হয়, মিটিং, স্টাইক—যেন নিজেরা কিছুই করেননি— এই সেদিন স্বকর্ণে কুমকুম শুনেছে, পিসির সেই বন্ধু অলকা সেনকে পিসি বলছে: তোর মনে পড়ে অলকা, স্কুল পালিয়ে প্রমীলাদের বাড়ীর ছাদে লুকোচুরি খেলা আর তেঁতুল খাওয়া? একদিন ছাদের আলসেতে নামা হয়েছিল আর পাশের বাড়ীর গিন্নী কাপড় তুলতে এসে চীৎকার করেছিল আমাদের দিকে চেয়ে?
অলকা সেনও তো বলছিল: মনে নেই আবার, সেদিন তো শুধু বকুনি নয়, মারও খেতে হয়েছিল—
তবে যে পিসি অমন ক’রে বলে, এবার একদিন স্পষ্ট কুমকুম ব’লে দেবে, তার পর মার খেতে হয় খাবে।
কিন্তু মুস্কিল তো ঐখানে, আজই রুণুরা এলো, আজই খেলতে যাবার জন্যে পাঁপরগুলো জলে ডুবিয়ে খাওয়া হলো, সবই আজ, আর পিসিই দেখলো—নাঃ, কুমকুম আর ভাবতে পারে না। পড়া ছেড়ে আস্তে-আস্তে শোবার ঘরের ভিতর ঢুকলো। ঘরের পিছন দিক্কার জানলাগুলোর কাছে একটা বড় গাছ ছিল, সেই গাছে থাকতো একঘর শালিক। কর্তা, গিন্নী আর বাচ্চা-কাচ্চা। কুমকুম অনেক সময় লক্ষ্য করেছে ওরা কি বলাবলি করে, কিন্তু কিছু সে বুঝতে পারে না। আজ যেন কুমকুমের মনে হচ্ছে, ওরাই ওর বন্ধু, বকা-ঝকা করে না, কালো চোখ বা’র ক’রে মিটমিট ক’রে ওর দিকে তাকায়, আবার বন্ধ করে, মাঝে মাঝে বাসা ছেড়ে উ’ড়ে এ-ডাল ও-ডাল ক’রে বেড়ায়। খেলাধুলো না থাকলে কুমকুম এই সব দেখে।
গাছটাও মস্ত গাছ, ডালে-পাতায় ভরতি, একটুকু ফাঁক নেই। উপর-তলা নীচে-তলা হয়ে গেছে তিন-চার-তলা বাড়ীর মত। সব উপরের তলায় থাকে এক-ঘর চন্দনা, মাঝের তলার ভাড়াটে শালিকপরিবার আর নীচের তলায় চড়াই-গিন্নী ছানা-পানা নিয়ে আরাম ক’রে বাস করে। তাদের খাবার-দাবার কুমকুমদের ভাঁড়ার থেকে যা আসে তাই যথেষ্ট—ইচ্ছা করলে কিছু বিলিয়ে দিতেও পারে। কিন্তু যে সুবিধাটা চড়াই-গিন্নী এই রেশন-এর দিনে পাচ্ছে, তা কিন্তু উপর-তলা বা মাঝের তলার ভাড়াটেরা পায় না। তা না পাক, তাদের খাবার সংগ্রহ করবার শক্তি আছে।
এই ঝাঁকড়া-মাথা গাছটার নীচে যদি দাঁড়ানো যায়, বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে নীল আকাশের একটুও দেখা পাবে না। খাটে শুয়ে কুমকুম কত রাতে ঘুম ভেঙে ভয় পেয়ে বালিশে মুখ গুঁজে ঘেমে নেয়ে উঠেছে। সারাদিন ধ’রে দিনের আলোয় যে গাছকে দেখেছে, গভীর রাতে নিস্তব্ধ পৃথিবীতে তার যেন অন্য রূপ দেখে সে আতঙ্কিত হয়েছে।
তবু তিন তলার তিন-ঘর অধিবাসীদেরই সে চেনে। বেশী ভালো লাগে তার মাঝের তলার বাসিন্দাদের। তাদের বাসার সঙ্গে তাদের ঘর একেবারে এক সমান লাইনে। কুমকুম ভারী-মুখে জানলার রেলিং ধ’রে গাছের দিকে চেয়ে রইল।
শালিক-গিন্নীর কণ্ঠস্বর শোনা গেল: দেখেছ, বাগচি-বাড়ীর মেয়েটা অভিমানে মুখ ফুলিয়ে রয়েছে।
কর্তা ঘাড় গুঁজে আরাম করছিল, বললে: দেখেছি বৈ কি, বেচারার পড়া হয়নি আর ওদের বাড়ীর ছোট ছেলেটা গলা ফাটিয়ে পড়ছে, শুনছো না?
—শুনছি বৈ কি! আহা, একরত্তি দুধের মেয়ে, এত পড়ার চাপ দেওয়াই বা কেন? ঐ ওর পিসিটা, উঁচু জুতো প’রে খট্খটিয়ে ছাতা হাতে ক’রে বেরোয়—ওই তো বেশী শাসন করে। শালিক-গিন্নী স্নেহভরে একবার কুমকুমের দিকে তাকালো।
কর্তা বললে: কিন্তু যে বয়সের যা। এখন ছোট কিন্তু একদিন তো বড় হবে, চিরদিন ছোট থাকবে না, লেখা-পড়া তো করতেই হবে।
গিন্নী ঠোঁটটা একবার গাছের ডালে ঘষে নিলো, তার পর বললে: তা তো বটেই—তবে বড় ছেলেমানুষ।
কর্তা বললে: তা আর কি হবে বলো? একটু-একটু ক’রে সব দিক্ দিয়ে বড় হবার চেষ্টা করা উচিত, আর এখন থেকেই—এই ছোট থেকেই।
গিন্নী আর একবার নরম চোখে তাকালো কুমকুমের দিকে, তার পর ব’লে উঠলো: আহা, তা হোক, কচি বাচ্চা।
কর্তা রেগে বাধা দিয়ে বললে: কচি বাচ্চা—কচি বাচ্চা ক’রে তুমি তোমার ছেলেমেয়েদেরও মাথা খেয়েছ, বিশেষ ক’রে বড় ছেলেটার।
—কেন কি করেছে সে?
কর্তার মেজাজ তখনও সমান পর্দায়: হয়েছে আমার মাথা আর তোমার মুণ্ডু!
গিন্নী কিছু বলবার আগে ছোট ছেলে হাঁপাতে হাঁপাতে তাদের কাছে এসে ডাকলো: মা! বাবা!
গিন্নী ব্যস্ত হয়ে বললে: কি হয়েছে রে, এত হাঁপাচ্ছিস কেন?
ছোটর সারা মুখখানা লাল হয়ে উঠেছে, হাঁপাতে হাঁপাতে বললে: অনেক—অ—নে—ক দূর উড়ে বেড়িয়ে এলাম। দিদি সঙ্গে ছিল। আকাশটা কোথায় শেষ হয়েছে কেবল তাই দেখতে ইচ্ছে করে।
গিন্নী ছোটর কাছে স’রে এসে বললে: ষাট ষাট, অত দূর যাস নে, বাপু।
কর্তা হুঙ্কার দিয়ে উঠলো: না যাবে না, তোমার কোলের কাছে ব’সে থাকবে?
—আচ্ছা, তুমি থামো, তোর দাদা কোথায় রে ছোট?
আবার কর্তার সপ্তমে-চড়া কণ্ঠ শোনা গেল: কোথায় আবার যাবে, বাসায় পড়ে-পড়ে ঘুমুচ্ছে, একটুও উড়তে পারে না, পোকা ধরতে পারে না—একবারে হাঁদা গঙ্গারাম—অমন ছেলে থাকার চেয়ে যাওয়া ভালো।
গিন্নী ঝঙ্কার দিয়ে উঠলো: বলি, বুড়ো বয়সে ভীমরতি হয়েছে নাকি? ষাট, বাছা আমার বেঁচে থাক!
—বেঁচে থাকবে কি ক’রে? শক্তি চাই, বুঝলে গিন্নী! নির্জীব হয়ে পড়ে থাকলে এ যুগে বাঁচা চলবে না। উড়তে পারবি না, পোকা ধরতে পারবি না, তবে পাখী হয়ে জন্মেছিস কেন? মানুষের ঘরে জন্মালেই তো পারতিস!
—তা বেচারা পারে না কি হবে? গিন্নীর কথার সুরে অনুকম্পা
—পারে না কেন শুনি? তার ছোট ভাই, ছোট বোন যখন আকাশের শেষ কোথায় দেখবার চেষ্টা করে, পোকা-মাকড় ধ’রে খায়, তখন ধেড়ে ছেলে বাসায় খেয়ে প’ড়ে-প’ড়ে ঘুমুচ্ছে, আর মা-বাপের হাত-তোলা খাচ্ছে, লজ্জা করে না—ছিঃ!
—তা কি করবে? বেচারার ডানায় জোর নেই।
—কে বললে জোর নেই? ভয়েই সারা, এ যুগে ঐ কুড়েমি আর ভয় থাকলে তোমার ছেলে ঐ বাসায় পচে মরবে, বুঝলে?
গিন্নী রেগে বললে: একশো বার ঐ ছাই কথাগুলো বোলো না বলছি।
ছোট দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল, এবার বলে উঠলো: আমারও এই রকম ভয় করতো, মনে হতো উড়তে পারবো না, ডানা ভেঙে প’ড়ে মরবো।
কর্তাও ব’লে উঠলো: হ্যাঁ, হ্যাঁ, ছোটবেলায় আমারও অমনি হতো, সকলেরই হয়।
ছোট একদমে ব’লে চললো: চেষ্টা করতেই দেখলাম, বেশ উড়তে পাচ্ছি। আর সে কী মজা আর আনন্দ!
গিন্নী একটু ভেবে বললে: বড়কে একবার চেষ্টা ক’রে দেখতে বললে হয়।
কর্তা বিরক্ত হয়ে বললে: কিন্তু চেষ্টা ক’রে দেখবার কি মন আছে? মন থেকে ভয়কে মুছে ফেলতে না পারলে কোনো কালেই কিছু হবে না, শুধু বয়সই বাড়বে, বুদ্ধি আর পাকবে না। শোনো গিন্নী, বড়কে ওড়া শেখাতেই হবে, আজ কেউ ওকে খাবার দিতে যেয়ো না।
—বা রে, না খেয়ে থাকবে ছেলেটা? গিন্নীর কণ্ঠস্বর ভিজে।
—না, না, নিজের চেষ্টায় ও খাবার খুঁজে নিক, উড়তে শিখুক। আত্মনির্ভরশীল হওয়া দরকার, শক্তি চাই। কর্তা জোর দিয়ে ব’লে উঠলো।
ছোট তার দিদির সঙ্গে আবার উড়ে চললো আকাশে। উড়তে উড়তে নীল আকাশের কোন্ অসীম শূন্যে তারা মিলিয়ে গেল ক্রমশঃ।
বাসায় শুয়ে বড় ঝিমুচ্ছিল—সে দেখলো ওরা উ’ড়ে গেল, নীচের তলায় চড়াই-গিন্নীর সে-দিনের কচি বাচ্চাটা পর্যন্ত তার আহার সংগ্রহের চেষ্টা করছে। উপর-তলা থেকে যে আসতো মাঝে মাঝে, কথা বলতো—চন্দনার সেই ভাইটাও পাখা মেলে উ’ড়ে গেল।
বড় দেখছে একমনে, একমাত্র সে-ই বাসায় পড়ে আছে অথর্বের মত।
মা ডাকলো: বড় এসো, খাবার নাও।
বড় এগিয়ে আসার চেষ্টা করলো—কিন্তু পারলো না। মা আবার ডাকলো, বললে: চেষ্টা করো বড়, ঠিক পারবে।
বড় ন’ড়ে-চ’ড়ে উঠলো: না মা, প’ড়ে যাচ্ছি যে!
—একবার পড়বে, দু’বার পড়বে, তিন বারে ঠিক উড়তে পারবে।
বড় প্রাণপণে চেষ্টা করতে লাগলো। শালিক-গিন্নী তখনও বলছে: নিজের শক্তি জাগাতে হবে, ওঠো বড়, ঠিক উড়তে পারবে।
কুমকুম তখনও চুপ ক’রে দাড়িয়ে আছে।
মনে হলো, তাদের সব কথা সে বুঝতে পেরেছে। ভারী আরাম আর আনন্দ হচ্ছিল তার। মনে হলো, সে-ও যদি ডানা মেলে অমনি অসীম শূন্যে উড়তে পারতো!
শালিক-গিন্নীর বড় ছেলে মাটীতে প’ড়ে গেছে, উড়তে চেষ্টা করছিল, পারেনি।
মা এসে ছেলের মুখে খাবার দিয়ে বললে: ঠিক উড়তে পারবে বড়, চেষ্টা করো, চেষ্টার অসাধ্য কিছু নেই। মনে রেখো, নিজের শক্তি জাগাতে হবে।
পিসির কণ্ঠ শোনা গেল: কুমকুম কই রে? পড়তে বসেনি?
ছোটদার উচ্চকণ্ঠ তখনও ঘোষণা করছে: ABC ত্রিভুজের A বিন্দু হইতে BCর মধ্য-বিন্দু Dর উপর লম্ব টানা হইয়াছে—
কুমকুম আর একবার নীল আকাশের দিকে চাইলো—দেখলো, শালিক-গিন্নীর বড় ছেলে উড়ে চলেছে...।
কুমকুমের কানে বাজতে লাগলো: মনে রেখো, নিজের শক্তি জাগাতে হবে...।