দুধ-ভাত/বন্ধু
বন্ধু
এমনই ঘটে যা আমরা ভাবতেও পারি না।
ধর এমন তো আমরা চোখের উপর অবিরাম দেখতে পাচ্ছি— আজ যে প্রাসাদে বাস ক’রে জুড়ি-গাড়ী হাঁকাচ্ছে—তাকেই একদিন দেখা যাচ্ছে বিপরীত অবস্থায়—আবার অনেক দুঃখ-দারিদ্র্যের মাঝে দিনপাত করতে হয় এমনি লোক হঠাৎ একদিন আলাদীনের ঐশ্বর্য পাওয়ার মতো বড় হয়ে উঠলো। এ রকম ঘটনার কথা তো আমরা বহু শুনেছি।
শিয়ালদার মোড় থেকে হেঁটে হেঁটে সারা বউবাজার স্ট্রীট ধ’রে রমু ময়দানে খেলা দেখতে যায়—ক্লান্তি নেই, শ্রান্তি নেই—এ তার অভ্যাসে দাড়িয়েছে। এক-পা ধুলো ও এক-গা ক্লান্তি নিয়ে যখন বাড়ী এসে পৌছোয়, মা তার মুখের দিকে চেয়ে করুণায় বিগলিত হয়ে বলেন: এত কষ্ট করবার কি দরকার—তা ছাড়া মাঝে মাঝে ট্রামে গেলেও তো পারো।
রমু হেসে হাত-পা ধুয়ে পড়তে চলে যায়।
পড়তে পড়তে সারাদিনের অসীম ক্লান্তিতে যখন ঢুলতে সুরু করে —তার মাঝে সে দেখতে পায়—ময়দানের খেলোয়াড়দের—আর দেখতে পায় শিয়ালদা স্টেশনের বাইরের রাস্তার উপর অসংখ্য বাস্তুত্যাগীর ভিড়ের মধ্যে সেই হৃষ্টপুষ্ট ছেলেটি যে প্রত্যেক দিন এসে তার কাছে অনেক খবর জানতে চায়—শুধু সে জানতে চায় তাই নয়, রমুও তাদের দেশের সব খবর জানতে চায়।
রমুর এই ছোট বন্ধুটি যখন তাদের দেশের কথা বলতে থাকে তখন তার নিষ্প্রভ চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
এই ভাবে দিনের পর দিন তাদের বন্ধুত্ব জমে ওঠে।
রমুর অপেক্ষায় তার বন্ধু অপেক্ষা করে থাকে। গল্প শুনতে শুনতে কতদিন যে রমুর দেরী হয়ে যায়—তার ঠিকানা নেই—বকুনিও খেতে হয় বৈকি।
দিন চ’লে যায়—রমুর বন্ধু নীলু একদিন খবর দিল—এখান থেকে এবার তারা চ’লে যাবে, আর হয়তো দেখা হবে না। রমুর মুখ ম্লান হয়ে যায়—জিজ্ঞাসা করে—কবে, কোথায় যাবে? নীলু বলে: জানি তো ভাই—কেবল চ’লে যেতে হবে তাই শুনেছি। আমি মাকে জিজ্ঞাসা ক’রে তোমায় বলবো।
জনবহুল রাস্তায় একটা লাইটপোস্টের নীচে বসে ওরা যখন দু’জনে গল্পে সব ভুলে গেছে—সেই সময় একটি অপেক্ষাকৃত ছোট ছেলে এসে ডাকলো—নীলুদা!
নীলু তাকিয়ে দেখে বললে: আয় তপু।
তপু এসে দাঁড়ালো, মুখ তার ম্লান।
নীলু বললে: বসবি না আমাদের কাছে?
—না যেতে হবে।
—এখন কোথায় যাবি? সন্ধ্যে হয়ে আসছে যে!
তপু চুপ ক’রে ছলছল চোখে তার দিকে তাকালো।
—ওঃ বুঝেছি, আচ্ছা যা ভাই, বেশীদূর যাস্নি যেন! আমি এখানে রইলাম তুই এলে একসঙ্গে ফিরবো।
তপুর মুখে একটু ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটলো তারপর সে আস্তে আস্তে পা বাড়ালো।
তপুর চলার পথের দিকে চেয়ে নীলু বললে: জানো রমুদা, এই তপুরা আমাদের গ্রামের লোক—ওরা কী ভালো আর কেমন ছিল যদি জানতে তুমি—
—কি রকম?
—ওদের কী না ছিল বল? গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ, বাগানভরা ফসল—বারো মাস পালা-পার্বণ লেগেই আছে। ওর মা এত ভালো—সবাই তাঁকে ভালবাসতো—কি যে হলো ভাই! আমরা যখন চ’লে আসি—তপুর মা অনেক কষ্টে ওকে সঙ্গে নিয়ে এলেন—ওর বাবা আর একজন দাদাকে পাওয়া গেল না। ওর সেই লক্ষ্মীর মত মা আমার মায়ের কাছে রোজ কত কাঁদেন! রমু এসব শুনছে; কিন্তু কল্পনায় মন চ’লে গেছে তার তপুদের সেই গ্রামে—যেখানে আকাশের নীল আর বনের সবুজ মিশে গেছে। সেই গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ আর সোনার ফসলে ভরা মাঠ —সেখানে বারো মাসে তের পার্বণে গ্রামের ছোট বড় এক হয়ে মিলে আনন্দ করে। নীলুর মুখে শুনে শুনে রমু একেবারে একটা ভালো ছবি এঁকে নিয়েছে মনে মনে।
নীলু তখনও ব’লে চলেছে—এই তপু কী যে ভালো, আর সবাই ওকে কী যে ভালবাসতো রমুদা, তোমায় কী বলবো! ওদের বাড়ীর খাবার লোকে খেয়ে ফুরোতে পারতো না, কত লোককে বিলিয়ে দিত। আর আজ তপুর একবেলাও পেট ভ’রে খাওয়া হয় না!
রমুর যেন চমক ভাঙলো: কী বলছো, খাওয়া হয় না ঐ বাচ্চা ছেলের?
নীলু একটু হাসলো—বড় করুণ হাসি। বললে: শুধু তপু— আমাদের ওদিকে একদিন এসো, দেখে যেও সব অবস্থা।
রমুর নরম বুক যেন মোচড় দিয়ে উঠেছে—আত্মগত ভাবে বলতে লাগলো—খাওয়া হয় না, খাওয়া হয় না—আর আমরা ওর চেয়ে বড়, চারবার পেট ভ’রে খাই!
রমু, তপুর কোমল মুখখানি ভাববার আর একবার চেষ্টা করলো।
নীলু তখনও ব’লে চলেছে— তপু এখন কোথায় গেল জানো রমুদা? আজ সারাদিন ওর খাওয়া হয়নি, আমি ওকে আমার সঙ্গে খেতে ডেকেছিলাম কিন্তু মায়ের খাওয়া হয়নি মনে ক’রে এলো না—
—কিন্তু কোথায় গেল তপু? আমার কাছে পয়সা আছে, আট আনা পয়সা আজ মা দিয়েছে—মাঝে মাঝে ট্রামে যেতে বলেছে কিনা তাই—এই পয়সায় নিশ্চয় তপুর পেট ভরবে—উত্তেজিত হয়ে রমু ব’লে উঠলো।
—কিন্তু ওতো খাবে না রমুদা, ওর মার যে খাওয়া হয়নি—নীলু বললে।
—আচ্ছা ওকে ডাকো—আমি বললাম।
নীলু এদিক ওদিক চেয়ে কিছুদূরে একটা জায়গায় দৃষ্টি দিয়ে আর চোখ ফেরালো না, শুধু আস্তে আস্তে বললে: ঐ যে তপু দাঁড়িয়ে।
রমু চোখ ফিরিয়ে দেখলো—পুলিশের ইঙ্গিতে দু’খানা বৃহদাকার উজ্জ্বল মোটর থেমে আছে—তপু তার সামনে দাঁড়িয়ে ছলছল চোখে হাত দু’টো বাড়িয়ে দিয়েছে। কোনরকম সাহায্য করার কথা মোটরের অধিকারী ভাবতে পারলেন না—মুখ বা’র ক’রে তীব্র ভাষায় ব’লে উঠলেন: মরবে যে গাড়ী চাপা প’ড়ে—এখানে দাড়িয়ে হাত বাড়ালে কী হবে—
বাধা দিয়ে পরবর্তী গাড়ীর আরোহী ব’লে উঠলেন: খেটে খেতে পারো না—এমনি ছোট চাকরের দরকার তো সব বাড়ীতেই, তা না, কেবল ভিক্ষে দাও, ভিক্ষে দাও!
অপমানে, লজ্জায় তপুর কচি মুখ লাল হয়ে উঠেছে—তবু সে মায়ের উপবাস-ক্লান্ত মুখখানি মনে ক’রে, আর একবার কী বলতে চেষ্টা করলো। আরোহী তখন তীব্রভাষা থামিয়ে পাশের সঙ্গীর সঙ্গে ভিক্ষাবৃত্তি দূর করা উচিত সম্বন্ধে আলোচনা সুরু করেছেন।
তপু ভেবে পায় না কী করবে, সমস্ত লজ্জা, সঙ্কোচ দূরে ঠেলে সে আবার চেষ্টা করলো আর একবার চাইবার। কিন্তু চোখ তুলে যখন সে কথা বলতে গেল—তখন গাড়ী বহুদূরে চ’লে গেছে—কিন্তু তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ঐ মোড়ের চানাচুরওয়ালা, সে সারা বিকেল ধ’রে বেশীরকম কথা ব’লে চানাচুর বিক্রির চেষ্টা করেছে। সে তার মলিন পকেট থেকে একটি টাকা বা’র ক’রে, তপুর হাতে দিয়ে বললে: তুমি নিয়ে যাও ভাই, আর ওদের কাছে কোনদিন ভিক্ষা চেয়ো না।
তপু হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
চানাচুরওয়ালা তখনও বলছে—যাও, বাড়ী যাও ভাই, কত হয়তো বাড়ীর লোক তোমার জন্যে ভাবছে।
দূরে দাঁড়িয়ে নীলু আর রমু দেখছিল এই দৃশ্য, চানাচুরওয়ালার সারাদিনের উপার্জন হয়তো ঐ একটা টাকা—যা সে অনেক কথা ব’লে, অনেক সুরের গাঁথনিতে গেঁথে—সাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ ক’রে বিক্রি করেছে।
রমু দু’হাতে মুখ ঢেকে ঝরঝর ক’রে কেঁদে ফেললে!