বিষয়বস্তুতে চলুন

দুধ-ভাত/বেচারা

উইকিসংকলন থেকে

বেচারা

 সন্ধ্যাবেলা মাঠের ফিরৎ এক-পা ধুলো মেখে আর এক-গা ঘাম নিয়ে সরাসর ঘরে ঢুকে গিয়ে পাখার সুইচটা খুলে দিয়ে অলক চেয়ারে ব’সে হাঁফাতে লাগলো। বল খেলাটা আজ বড্ড বেশী হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে দম বুঝি বন্ধ হয়ে যায়। চোখ বুজে অলক চুপ ক’রে রইল

 —কিগো বাবুসাহেব, দেখতেই যে পাচ্ছ না, আমরা ঘরে আছি। মুখ ফিরিয়ে অলক দেখে খাটের উপর মাসী দিলুকে ঘুম পাড়াবার চেষ্টা করছে। মাসী অলকের চেয়ে চার-পাঁচ বছরের বড় হ’লে কি হয়, ভাব ও ঝগড়ায় দুজনেই সমান। মেজাজ তখন অত্যন্ত খারাপ হয়ে আছে, কাজেই অলক উদাস হয়ে বললে: তাতে আমার ভারী বয়ে গেল।

 —আমি এখখুনি ব’লে দেবো, প! না-ধূয়ে ঘরে এসেছ।

 —যাও, দাও গে যাও।

 —দিলু ঘুমুক তারপর—

 দিলু পিটপিট ক’রে চাইছে। অলক বললে: ঘুমিয়ে একেবারে অর্ধেক রাত দিলুর, কাজেই এখন তুমি নালিশ জানাতে যেতে পারো। দিলুর দিকে চেয়ে মাসী রেগে উঠলো: ওমা, এই নাকি ঘুম? আমি পারবো না তোমায়।

 দিলু একবার মাসীর দিকে একবার অলকের দিকে চেয়ে ফিক্ ক’রে হেসে ফেললে।

 —বুঝলি দিলু, গল্প না বললে ঘুমুসনি—অলক উপদেশ দিয়ে ব’লে উঠলো।

 —পরের ঘটকালী করেন শ্রীমন্ত...... নিজে যাও হাত-পা ধোও গে—মাসী অলককে বললে।

 —তুমি দিলুকে ঘুম পাড়াও না—নিজের কাজ করো।

 অলক আস্তে আস্তে উ’ঠে হাত-পা ধুয়ে জামা-প্যাণ্ট বদলে এসে দিলুর পাশে শুয়ে পড়লো।

 দিলু তখনও ঘুমায়নি, হাতটা বাড়িয়ে অলককে ধ’রে চুপি চুপি কানের কাছে কি বলতেই, মাসী ব’লে উঠলো: আবার!

 দিলু বালিশে মুখ গুঁজলো আর অলক বললে: গল্প? তা এতক্ষণ বলিস নি কেন? মাসী কী জানে যে বলবে?

 —শোন: এক মস্ত সমুদ্র, হ্যাঁ, হ্যাঁ, সমুদ্র যাকে বলে। ভূগোলে পড়ি শুনিস নি?

 দিলু চুপ ক’রে আছে দেখে মাসী বললে: সমুদ্র, ভূগোল, এসব ওকি বুঝবে শুনি?

 —ঠিক বুঝবে, তারপর শোন: সমুদ্র, মস্ত নীল সমুদ্র, অথৈ জল, এপার ওপার দেখা যায় না। গঙ্গার চেয়ে বড়, অনেকগুলো গঙ্গা—

 —তুই দেখেছিস সমুদ্র?—মাসী ব’লে উঠলো।

 —থামিয়ে দেওয়া তোমার স্বভাব, সমুদ্র দেখিনি? সেবার যে পুরী গেলাম আমরা, বলে কত চান করলুম ঢেউতে লাফালাম, মাছের নৌকায় উঠলাম—

 —মাছের নৌকা কি দাদা? তাতে মাছ থাকে? দিলু ব’লে উঠলো।

 —মাছ থাকে না, তাইতে চড়ে অনেক অে—নে—ক জলে যেতে হয়, কত বড় মাছ আনা হয়—কত সুন্দর মাছ, আরও কত কি যে আছে সমুদ্রে।

 —বেশ থাকুক, দিলু চোখ বন্ধ করো তুমি—মাসী দিলুকে বললে।

 চোখ বুজে দিলু বললে: মস্ত মাছ দেখেছ দাদা, জলের নীচে আরো কত জিনিষ আছে—বেশ মজা না? ফিস্‌ফিসিয়ে দিলু ব’লে উঠলো।

 —হ্যাঁ, সে অনেক গঙ্গা এক জায়গা করলে তারপর সমুদ্র হয়, মনে কর এমনি এক সমুদ্র আর তাতে কতই না মাছ, কত ধনরত্ন, আমি ধনরত্ন দেখিনি—কিন্তু কত মাছ যে দেখেছি—

 —আহা, যেন সমুদ্রের ভিতর গিয়ে মাছ দেখেছ, এমন গল্প ফাঁদা, —মাসী বললে।

 —তুমি ভয়ানক বাধা দাও মাসী, কথা বলতে দাও না কেন? তোমার মত ঝগড়ু লোক আমি একটিও দেখিনি—রেগে গিয়ে অলক ব’লে উঠলো।

 —তুই বলছিস কেন যত সব বাজে বাজে কথা?

 —তুই শুনছিস কেন? তোকে তো বলা হচ্ছে না — অলক এবার ভীষণ খাপ্পা হয়ে গেছে।

 —দেখবি? মাসীর কণ্ঠস্বরও সপ্তমে বাঁধা।  —যাও, ঢের দেখেছি, বুঝলি দিলু? অলক বললে। উঁ—উঁ—উঁ শব্দ ক’রে দিলু ঘুম-জড়ান চোখে পাশ ফিরলে।

 কিন্তু অলক আর স্থির থাকতে পাচ্ছে না, সেখান থেকে উ’ঠে পড়ার টেবিল, তারপর খাওয়া শোয়া, রাতে ঘুম পর্যন্ত তার যেন কেবল মনে হ’তে লাগলো কেমন ক’রে জলে নামা যায়। সমুদ্র নয়, গঙ্গা? তা মন্দ হয় না, কিছু যদি না হয় তাহ’লে পুকুর অন্ততঃ।

 রাতে ঘুমিয়ে অলক স্বপ্ন দেখতে লাগলো সে যেন সমুদ্রে স্নান করছে, বড় বড় ঢেউগুলোর সঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে কি মজাই না করছে। দিলু পাড় থেকে বিস্মিত চোখে দেখছে আর হাততালি দিয়ে উঠছে। * * * পরের দিন সকালে শোনা গেল—শ্রীরামপুর যাওয়া হচ্ছে, রবিবার ছিলই, তাছাড়া সেখানে ছিল জ্যাঠামশায়ের মেয়ের বিয়ে। দিলু সকালে খুব সেজে এসে অলককে সে খবর দিয়ে তৈরী হয়ে নিতে বললে।

 শ্রীরামপুর! চমৎকার হয়েছে, গঙ্গা পাওয়া যাবে, স্নানও হবে বেশ—মনে মনে ভেবে অলক খুসী হয়ে উঠলো।

 শ্রীরামপুর পৌঁছে দেখা গেল বাড়ীতে খুব হৈ চৈ, লোকজন, মোণ্ডামিঠাই, চেঁচামেচি। এসব কিন্তু অলককে খুসী করতে পারলো না। কিছুক্ষণ পরেই সে বেশ একটি রেজিমেণ্ট তৈরী ক’রে নিলে। কাকামণির মেয়ে অনু, ছেলে গোপাল, বড়মার মেয়ে তারা, শঙ্করদির ছেলে সুনু, তাছাড়া যারা এসেছিল তাদেরও বাচ্চাকাচ্চা চিকু, মীরু, গীতা—এ ছাড়া দিলু তো আছেই।

 চুপি চুপি সব বেরিয়ে পড়লো। বাড়ীর দোরে গঙ্গা বললেও হয় —কিন্তু বেলা তখন প্রায় দুপুর। মাথার উপর সূর্যিমামা ঝাঁ ঝাঁ করছে, ঘাটে জনপ্রাণী নেই।

 —এখন নেয়ে দরকার নেই, বেড়িয়ে ফি’রে যাই চলো—অনু বললে।

 সেই ভালো, বড় রোদ—গোপাল সম্মতি দিল।

 —দূর, তোরা বোকারাম—গরমে তো জলে নামতেই হয়—না অলকদা?—সুনু বেশ জোর দিয়ে ব’লে উঠলো।

 —না বাবা, আমি নামছিনে, সেদিন বান ডেকেছিল—তারা বললে।

 —তোরা হচ্ছিস ভীতুর দল, অলকদা কোলকাতা থেকে এসেছে, অত ভয় পায় না—কি অলকদা?—সুনু জিজ্ঞাসা করলে।

 —ভয়? ভয় আবার কি? এইসা সাঁতার দেবো তোরা অবাক হয়ে যাবি—বীরদর্পে অলক বললে।

 —কিন্তু দাদা, সেদিন তুমি পা ভেঙে পড়েছিলে, মা বলেছে এখন কিছু করবে না তুমি—ভুলে যাচ্ছ? আর সাঁতার তুমি জানো নাকি?

 অলক দিলুর উপর খাপ্পা হয়ে উঠেছে, মেয়েটা তাকে একেবারে যা তা ধারণা করিয়ে দিচ্ছে? ধমক দিয়ে ব’লে উঠলো: থাম তুই দিলু, পা আমার, আমি বুঝবো। আর সাঁতার আমি কত দিয়েছি ইস্কুলের সঙ্গে গিয়ে।

 —হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক তো, নেমে পড় অলকদা বুঝলে?—উৎসাহ দিলো সুনু। হাফপ্যাণ্ট, সিল্কের শার্টে সোনার বোতাম লাগানো— তার উপরই একটি গামছা জড়িয়ে অলক নেমে পড়লো—কোমর অবধি জলে। সেইখানেই আছড়া-আছড়ি ক’রে জল ছিটিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করলে সে সাঁতারে কত বড় ওস্তাদ।

 কিন্তু সুনু সত্যিই সাঁতার জানে আর বোঝেও, হেসে বললে: এই তোমার ইস্কুলের সাঁতার অলকদা? আমি কিন্তু আরো ভাল পারি, মেয়ে ইস্কুলে শিখিনি।

 লজ্জার বিষয় সত্যি! অলকের মাথা হেঁট হয় আর কি। তাড়াতাড়ি আর একটু এগিয়ে অলক বললে: এই দেখনা।

 কিন্তু এরপর অলক আর পা রাখবার জায়গা পায় না। অকূল পাথার। উঠবার বহু চেষ্টা করতে লাগলো অলক, কিন্তু সব বৃথা জল, জল আর জল—ক্রমশঃ গভীর জলে গিয়ে পড়ছে অলক। নাকে মুখে জল, শেষ পর্যন্ত হাঁপ ধরতে লাগলো।

 সুনু নতুন ধরনের সাঁতার মনে ক’রে অবাক হয়ে দেখছে। দিলু হঠাৎ চীৎকার ক’রে উঠলো—দাদা ডুবে গেল!

 —ডুবে গেল? য়্যাঁ, তাইতো! তবে যে অলকদা বললে: ইস্কুলের সাঁতার? সুনু আর ভাববার অবসর পেলে না। দিলু তখন তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। ছেলেমেয়ের দল মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে, কি করবে সব?

 শেষবার এক চেষ্টা করতেই অলকের হাতের আঙুল ক’টি কেবল জলে ভেসে উঠলো—ব্যস!

 একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। চীৎকার শুনে যখন তিনি এসে দাড়ালেন তখন শেষবারের মত আঙুলক’টি দেখা দিয়ে মিলিয়ে গেল।  জামা-কাপড় না ছেড়েই জলে ঝাঁপিয়ে প’ড়ে বহু কসরৎ ক’রে অলককে নিয়ে যখন ডাঙায় উঠলেন—তখন সে অচৈতন্য, সারা দেহ নীল হয়ে গেছে, মাঝে মাঝে আপনা থেকে ঝাঁকুনি খাচ্ছে।

 বিয়ে বাড়ীর কাজ অর্ধসমাপ্ত রেখে মা অলককে নিয়ে চ’লে এলেন কোলকাতায়।

 নতুন ধরনের সাঁতার শেষ পর্যন্ত দেখানো হলো না বন্ধুদের—

 বেচারা অলক!

 শুধু তাই নয়—বিয়ে বাড়ীর আমোদ আর নিমন্ত্রণটাও মাঠে মারা গেল ভাবলে কি কম দুঃখ হয়—?

 বেচারা অলক!

 হ্যাঁ, শ্রীরামপুরের রেজিমেণ্ট-এর সঙ্গে অলকের আবার দেখা হয়েছিল। ইস্কুলের সাঁতার সম্বন্ধে সুনু জিজ্ঞাসা করেছিল বৈ কি!

 অলক বললে: এ রকম কসরৎ তাদের সাঁতারের মাস্টারমশাই শিখিয়েছেন। কিন্তু আমি বলছিলাম—এ রকম কসরৎ না শেখাই ভালো, নয় কি? তোমরা ভাই সাবধান হয়ো।

 কিন্তু এখনও অলক বিছানায় শুয়ে আছে। সামনেই আবার একটা উৎসব আসছে, কিন্তু অলক তো এখনও বিছানায়।

 বেচারা অলক!