দুধ-ভাত/শিউলি
শিউলি
মস্ত বাগান! কি গাছ আছে আর কি নেই! তুমি বল তুমি কি চাও? আম গাছই আছে ছ’টা, সব রকমের আম। কোণের দিকে একটা বুড়ো কাঁটাল গাছ ঝাঁকড়া মাথায় মেলাই ডালপালা বা’র ক’রে সতর্ক প্রহরীর মত পাহারা দিচ্ছে। কাগজি লেবুর গাছটা গাঢ় সবুজ, লেবুগুলোই সবাই ছিঁড়ে নেয় কিন্তু গাছটার দিকে কেউ লক্ষ্য করে না, যেন তার কোনো দরকার নেই। কিন্তু তাই ব’লে কি সে চুপ ক’রে ব’সে আছে? মোটেই না, ঘর-সংসার বেড়েই গেছে, পাতায় ডালপালায় ছড়িয়ে পড়ে সে বেশ খানিকটা স্থান দখল ক’রে আছে—তবে বড় ম্রিয়মাণ।
ওদিকে ছেড়ে এবার এদিকে এসো, বড় একটা স্থলপদ্মের গাছ, পাশের পঞ্চমুখী জবার সঙ্গে মিতালী করেছে; ওরা দু’জনে পাশাপাশি থাকে, ফুটে ওঠে গাছ আলো ক’রে, ঝলমলিয়ে। পাতায় ডালে ওরা যেন এক হয়ে এসেছে, তবে স্থলপদ্ম বেশ উঁচু জাতের ব’লে গাছটাও লম্বা হয়ে উঠেছে বেশ, ও’ যেন আকাশের সঙ্গে ও আলাপ করতে চায়। ঐ দূরের লম্বা লিলিগুলো আর চন্দ্রমল্লিকারা হাসাহাসি ক’রে এই কথাই বলে। আর চারদিকে ছিটিয়ে ছড়িয়ে আছে কৃষ্ণকলি, টগর, কুন্দ, দোপাটি, অপরাজিতা, কাঠচাঁপা—এরা তো মেজ, ছোটর দল, কাজেই বড়র দলে ঘেঁষেনা বড় একটা।
আচ্ছা এসব ছাড়িয়ে চলে এসো একেবারে দক্ষিণ কোণে, যেখানে একজোড়া শিউলি গাছ পাশাপাশি, ঘেঁষাঘেঁষি দাঁড়িয়ে আছে। একসঙ্গেই এরা ছোট থেকে বড় হয়েছে, উঁচু ডালগুলো গিয়ে ঠেকেছে পাঁচিল পার হয়ে একেবারে লাহিড়ীদের জানলার গোড়ায়। ওখান থেকে অনায়াসে ছোঁয়া যায় গাছটাকে। আর ওদের বাড়ীর কাজল মাঝে মাঝে জানলা দিয়ে ছোট হাত বাড়িয়ে গাছটি ছোঁয়। একদিন সে পাতা ছিঁড়ে দেখেছিল আঠার মত কি লাগে। অনেক ভেবে কাজল বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিল। বাবা বললেন: ওদের লাগে কিনা মামণি, তাই ঐ আঠার মত দেখেছ, তুমি আর ছিঁড়োনা বিনা দরকারে।
সেইদিন থেকে কাজল আর গাছের পাতা ছেঁড়ে না। মাঝে মাঝে এসে জানলায় বসে, গাছটায় হাত দেয়। বাবার কথা সে মনে রেখেছে—আহা ওদেরও লাগে। ওখান থেকে কাজল প্রায়ই তার বন্ধু রুমঝুম-এর সঙ্গে কথা বলে। রুমঝুম এই বাগানওয়ালা বাড়ীর মেয়ে। আর বাগানের ভিতর এই শিউলি গাছের নীচেই তার খেলবার জায়গা। সকালে এসে সে গাছ দু’টির উজাড় ক’রে দেওয়া শেফালীগুলি একটি একটি ক’রে কুড়োয়—বেশ খানিকটা ঘিরে যেন সাদা হয়ে থাকে—রুমঝুম দূর থেকে দেখে যেন বরফের কুচি কে বিছিয়ে রেখেছে—তুষারশুভ্র শেফালীদলের দিকে চেয়ে সে চোখ ফেরাতে পারে না। অনেকক্ষণ পরে সে ধীরে ধীরে এসে একটি সাজিতে আস্তে আস্তে তাদের উঠিয়ে নেয়। তার ফুল ওঠানোর সময়টুকু কাজল জানে, তাই সে-সময় সেও ঐ জানলাটির ধারে এসে বলে: ফুল কুড়োেচ্ছ রুমঝুম?
—হ্যাঁ ভাই কাজল, বেলা হ’লে রোদ উঠলে এরা কেমন লালচে হয়ে আসে, আমার এত কষ্ট হয়। এত সাদা আর সতেজ তো থাকে না। কিন্তু আরো দুঃখ হয়, বাড়ীতে নিয়ে গিয়ে রাখলেই ছোটদি আর ছোট মাসী বোঁটাগুলো ছিঁড়ে রোদে শুকাতে দেয়, সাদা দলগুলো ফেলে দেয়। ওদের ঐ অবস্থা দেখলে আমার কান্না পায় কাজল— জানো?
কাজল সান্ত্বনা দেয়; এমনি রাখলেও তো ওরা থাকবে না ভাই।
—কিন্তু কি জানি কাজল, আমার মনে হয় ওদের লাগছে।
দু’জায়গায় ব’সে দু’বন্ধু মনের কথা ব’লে যায়—আর নির্বিকার হয়ে জোড়া শেফালী গাছ শোনে সে সব। রুমঝুমকে তারা ভালবাসে নাকি? তা না হলে সকালে রুমঝুম বাগানে আসবার আগেই সব ঢেলে দেয়—যেন স্নেহে ভালবাসায় রুমঝুমকে তারা সব উজাড় ক’রে দিয়ে দিচ্ছে।
বাগান পরিষ্কার করতে আসে মালী, শুকনো পাতা কুড়ায়, ছোট ছোট ফুলগাছগুলিতে জল দেয়, ফুলগুলি অযথা কেউ ছিঁড়ে না নষ্ট করে তাও দেখে। কিন্তু রুমঝুম বলে: তুমি কেন আস মালী, আমি সব ক’রে দেবো।
বুড়ো মালী হাসে।
জোড়া শিউলি ঝর ঝর ক’রে ফুল ঢেলে দেয়—সে কি বুঝতে পারে নাকি রুমঝুমের কথা? কি জানি!
মা বলেন: মেয়েটা কি বাগানেই থাকবে, ঘরে আসার নাম নেই। এমন মেয়ে দেখিনি, বাবা!
ছোটদি বলে: ঐ তো শিউলি গাছের তলে ব’সে আছে, কোথাও যায় না।
বাবা স্নেহভরে বললেন: থাকনা, বাগান তোমার মতো সাত মাইল দূর নয়, পাশেই বাড়ী, ওতো দূরে কোথাও যাচ্ছে না।
ছোট মাসী মাকে লক্ষ্য ক’রে বলেন: তা যাই বলো দিদি, এমন ফুল-পাগল মেয়ে আমি দেখিনি। সেদিন সকালে সাজি ভ’রে শিউলি ফুল এনেছে, আমি বোঁটা ছাড়িয়ে রোদে দিয়েছি—ওর কী কান্না, বলে কিনা: অমন ক’রে ছেঁড়ো কেন? জানো ওদের লাগে?
আমি বললুম: তোদের শাড়ী রাঙিয়ে দেবো ব’লেই তো বোঁটা শুকোচ্ছি। বললে: আমি অমন শাড়ী পরতে চাই না।
বাবা স্নেহস্বরে বলেন: আহা থাকনা, ফুল একটু ভালবাসে বেচারা।
কিন্তু বাবা কোনো সমর্থন পেলেন না।
যার উদ্দেশ্যে কথাগুলি বলা হচ্ছে, সে তখন জোড়া শিউলি গাছের নীচে ব’সে তাদের সঙ্গেই গল্প করছে।
বিকেলে জলখাবার জন্য রুমঝুমকে ডেকে কোথাও পাওয়া গেল না। · মা বললেন: কোথায় আবার যাবে, নিশ্চয়ই ঐ শিউলি গাছের কাছে আছে।
রাঙাদি রুমঝুমকে খুব ভালবাসে। সে বললে: তোরা গোলমাল করিসনি, আমি যাচ্ছি ডেকে আনছি।
চুপি চুপি বাগানে এসে দেখলে জোড়া শিউলির মাঝের সামান্য ফাঁকটিতে ব’সে রুমঝুম কার সঙ্গে খুব হাসছে আর গল্প করছে। রাঙাদি অবাক হয়ে এদিক ওদিক চেয়ে দেখলে এমন কি লাহিড়ীদের বাড়ীর জানলায় কাজল আছে কিনা তাও দেখতে ভুললে না। কিন্তু না, কেউ কোথাও নেই।
রাঙাদি শুনছে রুমঝুম বলছে: তা বলুক না ঐ গাছরা চুপি চুপি কথা, তোমরাও তো দু’জনে গপ্পো করো, বলোনা তোমাদের কি লুকানো কথা আছে, সত্যি আমি কাউকে বলবো না।
অপর পক্ষের কথা কিন্তু রাঙাদি জানতে পায় না।
রুমঝুম খিল খিল ক’রে হেসে বললে: সত্যি বলছো তোমাদের কোনো লুকানো কথা নেই—তোমরা কেবল সবাইকে ধন্যবাদ দাও? কিন্তু সে আবার কি, সব সময় ধন্যবাদের ঘটা ভালো নাকি? আমি কবে কস্মিনে এক আধবার বলি, খুব মজা লাগলে আর খুশি হ’লে। রুমঝুম আবার চুপ ক’রে কি যেন শুনছে—। একটু পরে আবার বললে: নিশ্চয়ই কেন? সব সময়—কারণে অকারণে—?
রাঙাদি অবাক হয়ে শুনছে, রুমঝুম তখনও বলছে: ওঃ তাই বলো, তোমরা প্রকৃতিকে সব সময় ধন্যবাদ দাও, আকাশের আলো, বৃষ্টির জল, সুস্নিগ্ধ বাতাস, নরম মাটি, যেখানে তোমরা আমরা দাঁড়িয়ে আছি, আর পাখীর মিষ্টি গান, রাত্তিরের নিস্তব্ধ অন্ধকারের ঝলমলে তারার সারি—এদের তোমরা সব সময় ধন্যবাদ দাও?
রুমঝুম আবার থামলো, রাঙাদির বিস্ময় উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে।
—হ্যাঁ, ওরা তো আমাদের বন্ধু, ওদের সঙ্গ না পেলে, স্পর্শ না পেলে আমরা বাঁচবো কি ক’রে? জানো শিউলি ভাই, আমি রাতে খাটে শুয়ে জানলা দিয়ে যখন আকাশের ঝলমলে তারাগুলো দেখি, ভাবি—তোমরাও তো দেখছো, কিন্তু একলা তোমাদের ভয় করছে কিনা—কিন্তু তারপর ভাবি আমি যেমন মার কাছে ঘুমোই, তোমাদেরও তো এখানে কত বন্ধুবান্ধব রয়েছে। কিন্তু সত্যি বলেছ শিউলি, এই আলো, জল, হাওয়া, নরম মাটি—এসব না পেলে আমরা বাঁচতাম না। আর ঝলমলে তারার মালা, পাখীর গান—এসব না শুনলে, না দেখলে কিছু ভালো লাগতো না।
রুমঝুম!
রুমঝুম ভয়ানক আহত হয়েছে যেন, বললে: কি রাঙাদি, এখন কি বলছো?
রাঙাদির দৃষ্টি তখনও কাকে এদিক ওদিক অন্বেষণ করছে: কার সঙ্গে কথা বলছিলে?
রুমঝুম হেসে বললে: ওঃ তাই বলো, ওরা আমার বন্ধু।
কই তারা? রাঙাদির কণ্ঠে আগ্রহ।
—তোমার সামনেই তো দাড়িয়ে আছে, দেখছো না?
—কই? কোথাও তো কেউ নেই।
রুমঝুম খিল খিল ক’রে হেসে ওঠে—দু’হাত দিয়ে শিউলি গাছের গোড়াটা জড়িয়ে ধ’রে বলে: আচ্ছা শিউলি ভাই—রাঙাদি বলছে কেউ নেই।
রাঙাদির এবার রাগ হয়ে গেছে, গম্ভীর কণ্ঠে বললে: বেশ তুমি এখন চলো, খেতে ডাকছে।
রুমঝুম বললে: আমার ক্ষিদে পায়নি রাঙাদি, তুমিও বসো না এখানে—কি সুন্দর হাওয়া আর ফুলের সুবাস। আর এই জায়গাটা আমি পরিষ্কার ক’রে রেখেছি।
রাঙাদি বিরক্ত হয়ে বললো: না চলো, এখনি যেতে হবে, তারপর আজ ফুলুমাসীর বাড়ী যাবার কথা আছে—তোমাকেও যেতে হবে।
রুমঝুমের এসব ভালো লাগে না। ওর নিবিড় বন্ধুত্ব শিউলিদের সঙ্গে। তবুও ম্লান মুখে উঠতে হলো।
মা বললেন বাবাকে: দেখ, মেয়েকে স্কুলে দাও, ও নিশ্চয় পাগল হয়ে যাবে। দিনরাত ঐ শিউলি গাছের নীচে ব’সে আছে, কার সঙ্গে কথা বলে, লোক নেই জন নেই। মাঝে মাঝে কেমন সুন্দর গান করে। কিন্তু বাড়ীতে ব’সে গান করতে বলো, কিছুতেই করবে না। ওভাবে থাকলে ও নিশ্চয়ই পাগল হয়ে যাবে।
বাবা হাসলেন: না, না, বাচ্চা মেয়ে, খেলাধুলো করে, বাগানে থাকতে ভালবাসে, শিউলি ফুল ভালবাসে—পাগল হবে কেন?
মা কিন্তু স্বস্তি পেলেন না, তাছাড়া বাজে কথা বলার লোকের ভো অভাব নেই। মা ভাবলেন কি জানি এ আবার কি রোগ!
রুমঝুমকে খুব সতর্ক দৃষ্টিতে রাখা হলো। বাগানে বেশী যেতে দেওয়া হতো না। লেখাপড়া, ছবির বই ইত্যাদি দিয়ে তাকে আটকে রাখা হলো বটে, তাতে সে হাঁফিয়ে উঠতে লাগলো।
কিন্তু যত তার অস্বস্তি বাড়ছে ততই সতর্কতার অন্ত নেই। মাকে নাকি দত্তদের বাড়ীর দিদিমা বলেছে: তোমার মেয়ের গায়ে হাওয়া লেগেছে, ঝাড়াতে হবে। মেয়েকে বেশী গাছপালার কাছে যেতে দিও না।
মায়ের মন, শঙ্কা হবার কথাই, তাই বাঁধন আরো শক্ত হয়ে উঠলো। কিন্তু ফাঁক পেলেই রুমঝুম ফাঁকি দেয়, দুপুরে সবাই যখন দিবানিদ্রা দিচ্ছে বা স্কুল-কলেজে, অফিসে চলে গেছে—তখন সে বই শ্লেট ফেলে পা টিপে টিপে বাগানে যায়। শিউলিগুলি মাটিতে প’ড়ে শুকিয়ে গেছে—আবার তার উপর টাকা শিউলিরাও ম্লান হয়ে আসছে রৌদ্রের প্রখরতায়। চারিদিকের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে রুমঝুম ঝরঝর ক’রে কেঁদে ফেলে। শিউলি গাছ দু’টি তাদের চার পাঁচটি পাতা ঝরিয়ে দিয়ে যেন নীরব সান্ত্বনা দেয়। তার পর সুরু হয় তাদের কথাবার্তা।
পুরোদমে গল্প চলছে—এমন সময় রুমঝুমের পরোয়ানা এসে যায়: এই রুমঝুম! জলদি, জলদি চলো, মা ডাকছে।
কতদিন রাতে রুমঝুম স্বপ্ন দেখেছে শিউলি গাছরা বলছে: “রুমঝুম, তুমি যদি আর না আসো, আমরাও বাঁচবো না, আমাদের সতেজ পাতা সব শুকিয়ে আসবে, হয়তো থাকবে শুকনো ডালগুলো, একদিন তা চাকরে কেটে পুড়িয়ে দেবে। সঙ্গী বা বন্ধু না থাকলে কেউ বাঁচতে পারে?”
রুমঝুম বলে: কি করবো ভাই, তোমাদের ছেড়ে আমিও কত দুঃখ পাচ্ছি কেউ বোঝে না। একবার গেলেই ধ’রে নিয়ে আসে। তোমরা ভাই, কষ্ট করোনা লক্ষ্মীটি। আমার নাকি অসুখ করেছে, অসুখ ভাল হ’লেই আমি আবার নিশ্চয় যাবো। আমিও তোমাদের সঙ্গে খেলতে না পেলে বাঁচবো না।
রুমঝুমের মনে হয়—শিউলি গাছরা যেন অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে, তাদের সাদা সতেজ ফুলগুলো কেমন মলিন হয়ে আসছে। চীৎকার ক’রে রুমঝুম ডাকে: শিউলি, ও শিউলি ভাই!
মা পাশে ঘুমিয়ে ছিলেন, উঠে পড়েন তাড়াতাড়ি—ষাট্ ষাট্ ক’রে মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে দেন। তন্দ্রার আচ্ছন্নতার মধ্যে রুমঝুম শোনে মা বাবাকে বলছেন: তুমি কিছু বুঝছো না, এ দত্তগিন্নী যা বলেছে ঠিক তাই।
বাবা বললেন: পাগল! ওকে আটকে রেখেই খারাপ করছো। ওর মার প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর—রুমঝুম শুনতে চায়না।
বাঁধন শক্ত হলো দৃঢ়ভাবে। ছাদ ছাড়া রুমঝুম কোথাও যেতে পায় না। একদিন তার অসুখ হলো। জ্বর, প্রবল জ্বরে রুমঝুম আবোল তাবোল বকছে, অসংলগ্ন কথা, তবে শিউলিদের সঙ্গে কথা, মাঝে মাঝে হেসে ওঠে রুমঝুম: “পর অত ভাবছো কেন? আমার অসুখ সেরে গেলেই আমি যাবো তোমাদের কাছে। না, না, অমন শুকনো ফুল হয়ে যাচ্ছো কেন?”
একদিন রাঙাদি রুমঝুমের কাছে ব’সে আছে। রুমঝুমের জ্বরটা কম, রাঙাদি বললে: কি চাইছিস? কি ইচ্ছে করছে রে?
ম্লানমুখে রুমঝুম চেয়ে রইলো।
—ফুল নিবি? ফুল?
ঘাড় নাড়লে রুমঝুম
রাঙাদি তার ছোট্ট হাতটা ভর্তি ক’রে এক রাশি শিউলি ফুল দিলো। রুমঝুম তাকালো ফুলগুলোর দিকে, ছড়িয়ে দিলে তাদের তার বিছানায়, তারপর পাশ ফিরে চোখ বুজলো।
ডাক্তার ব’লে গেছেন রোগ তাঁর চিকিৎসার বাইরে! মা চোখে আঁচল দিয়ে কাঁদছেন, রাঙাদি মলিন মুখে শিয়রের কাছে ব’সে। ভাইবোনেরা সবাই নীরবে চোখ মুচছে। রুমঝুম সকলের ছোট, সকলের আদরের।
সেদিন সন্ধ্যাবেলা রুমঝুম আর জলও গিলতে পাচ্ছে না, কষ বেয়ে প’ড়ে গেল। রাঙাদি কেঁদে উঠল। বাবা এসে ধীরে ধীরে রুমঝুমের মাথায় হাত রেখে ডাকলেন: রুমঝুম! মা-মণি! রুমঝুম চোখ মেললো, উদাস দৃষ্টি।
—বাগানে যাবে মা? বাবার আদর-ভরা কণ্ঠস্বর।
রুমঝুম বাবার দিকে চেয়ে রইল, কথা বলতে পারে না আর। কোন দিকে না দৃষ্টি দিয়ে বাবা তাঁর দুই সবল বাহু দিয়ে মেয়েকে চাদর জড়িয়ে তুলে নিলেন। কেউ কিছু বলার আগে—প্রবল শক্তিতে নেমে এলেন নীচে, সকলের বিস্মিত ও স্তম্ভিত দৃষ্টিকে আরো বিস্মিত ক’রে।
নীচে এসে দালান ঘর পার হয়ে বৈঠকখানা বাঁদিকে রেখে লম্বা সরু বাগান যাবার স্থানটিতে এসে ডাকলেন: রুমঝুম, আমরা বাগানে যাচ্ছি।
তারপর কৃষ্ণকলি, স্থলপদ্ম, পঞ্চমুখী জবা গাছের সারি দ্রুতপদে পার হয়ে জোড়া শিউলি গাছের নীচে এসে দাড়ালেন।
রুমঝুম চোখ মেলে চাইলো। গাছ থেকে টুপটুপ ক’রে দু’টি শেফালি ঝ’রে পড়লো রুমঝুমের বুকে আর মুখে।
বাবা রুমঝুমকে শুইয়ে দিলেন জোড়া শিউলি গাছের নীচে।
ইতিমধ্যে বাড়ীর সবাই এসে জড় হয়ে গেছে। অন্তিম পথযাত্রী মেয়েকে নিয়ে এ কি কাণ্ড বাবার!
বাবা বললেন: কেউ এখানে থাকবে না, সব বাড়ীর ভিতর যাও। বাবার তখনকার গম্ভীর আদেশ অমান্য করবে এমন সাহস কারো নেই। কেবল কাজল থাকবে, ও যে রুমঝুমের বন্ধু।
রুমঝুম শুয়ে আছে, মুখে যেন তৃপ্তির হাসি। ক্লান্ত উদাস দৃষ্টি যেন কমে এসেছে। মাথার কাছে কাজল, কান্নায় ভরা চোখ।
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছে। আকাশের গায়ে দু’-চারটে তারা দেখা যাচ্ছে। বাগানের সমস্ত ফুলের মিষ্ট সুবাস—বাতাসকে ভারী ক’রে তুলছে।
অতি ক্ষীণস্বরে রুমঝুম ডাকলো: বাবা!
—কি মা? বাবা উত্তর দিলেন ঝুঁকে প’ড়ে।
—আমায় এখানে আবার আসতে দেবে?
—হাঁ, মা-মণি—নিশ্চয়।
—শিউলি গাছে একবার হাতটা লাগিয়ে দাও না বাবা।
মেয়ের হাত দু’টি গাছে স্পর্শ করালেন বাবা তার পর বললেন: আজ চলো, আবার কাল আসবে, আমি নিয়ে আসবো কোলে ক’রে। রোজ, রোজ তুমি আসতে পাবে, কেউ বারণ করবে না।
রুমঝুমের মুখে একটু হাসি ফুটে উঠলো।
বাবা আবার দু’হাতে মেয়েকে তুললেন। একটু গাছের নীচে দাঁড়ালেন। মনে হলো রুমঝুম তাই চায়। দু’টি পাতা ঝ’রে পড়লো রুমঝুমের গায়ে, পাতায় পাতায় কি যেন আওয়াজ, হয়তো বাতাসের দোল। রুমঝুম দেখলো আকাশে তারা ফুটে উঠেছে, সবচেয়ে বড় ও উজ্জ্বল তারাটা তার মাথার উপরেই। অস্ফুট কণ্ঠে সে বললে: ধন্যবাদ।
বাবা ঘরে ফিরে এলেন।
রুমঝুম ধীরে ধীরে ভাল হয়ে উঠছে। ডাক্তার বললেন, আশ্চর্য রকম বেঁচেছে সে। এখন তাঁরা ভাবতে পারেন না কেমন ক’রে এ সম্ভব হলো।
রুমঝুম হেসে আস্তে আস্তে বললে: তাহ’লে আপনি ডাক্তারী করা ছেড়ে দিন ডাক্তার কাকা।
—তুমি তো মা তাই ছাড়াবে দেখছি। হেসে জবাব দেন ডাক্তারবাবু। বাবার নির্দেশে প্রতিদিন চেয়ারে ক’রে বিকেলে বাগানে নিয়ে যাওয়া হয় রুমঝুমকে—। ইজিচেয়ারে সেখানে সে শুয়ে থাকে, শিউলি গাছের নীচে। আবার তার হাসি কথা ফিরে আসছে। বাবা বলেছেন সে হাঁটতে পারলে—পড়ালেখার সময় ছাড়া সব সময় সে বাগানে খেলতে পাবে। রুমঝুমের এ কথা মনে আছে।
জোড়া গাছে অজস্র শিউলি ফুটছে। বাগানের মাটী দেখা যায় না।