দুধ-ভাত/শিবু
শিবু
তিন-চারটি ভাইবোনেদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট শিবু। সে যে কেন এমন হলো তা ভেবে পাওয়া যায় না। মার মনে ভয়ানক দুঃখ, বাবারও তাই, তবে তিনি পুরুষ মানুষ, প্রকাশ কম, কিন্তু ভালো ক’রে মুখের দিকে তাকালে মনের কথা কিছুটা বোঝা যায় বৈকি!
আর ক’টি ভাইবোন সুন্দর হৃষ্টপুষ্ট, প্রাণবন্ত তারা শিবু জন্মানোর পর দেখা গেল তার মুখের একদিকের চোখ, ভ্রূ ইত্যাদি সব আছে কিন্তু আর একদিকের চোখ, ভ্রূ বলতে কিছুই নেই, একেবারে প্লেন পাতলা চামড়ায় ঢাকা, কুঁচকে কুঁচকে আছে।
ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে মায়ের দু’চোখ জলে ভ’রে এলো। যারা শিবুকে দেখতে এলো, মুখ চাওয়া-চাওয়ি ক’রে চ’লে গেল— মায়ের সামনে আর কিছু বললে না। বাবা এলেন—দেখি কী হয়েছে? তারপর মুখটা গম্ভীর ক’রে বললেন: দেখি কি করা যায়। ডাক্তার রায়কে খবর দিই।
বললেন কেবল বোস বাড়ীর জ্যাঠাইমা। বিরাট বিপুল দেহ, সচল একটি জুয়েলারী দোকান—তাঁর দিকে তাকালেই একথা মনে হয়।—কই গা বৌমা, দেখি নতুন খোকা, কি সব বলছে!
মা তো ভয়ে কাঠ। এই মহিলাকে তিনি সবচেয়ে দূরে রাখতে চান। একে তো মনোবেদনার শেষ নেই, তার উপর আবার একি শাস্তি!
তবুও তোয়ালে জড়ান শিবুকে বা’র ক’রে দেখাতেই হলো।
গালে হাত দিয়ে জ্যাঠাইমা বললেন: ও আমার কপাল—এমনি ধারা ছেলে হলো?
মা চুপ ক’রে রইলেন।
শিবুর জন্মের শুভ শঙ্খধ্বনি এইভাবে দুঃখপূর্ণ ও বিকৃত হয়ে উঠলো।
শিবু ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠতে লাগলো॥ ভাইবোন ছাড়া মা আর কারো সঙ্গে খেলতে দেন না, বাইরে যেতে দেন না। সতর্ক দৃষ্টি মায়ের সব সময় জাগ্রত।
শিবু তো নিজের কথা কিছুই বুঝতে পারে না। একটি চোখের দৃষ্টিতেই সে অভ্যস্ত হয়ে উঠলো। এই তার জন্মগত অভ্যাস, কাজেই সে তার বিকৃত অঙ্গের কিছুই বোঝে না। তার জন্মের কিছুদিন পরেই তার সম্পর্কে বাড়ীর আলোচনা থেমে, থিতিয়ে, জুড়িয়ে এসেছে, তাছাড়া মায়ের নিষেধও আছে—বরং ভাইবোন ও অন্য সকলে সচেতন হয়ে থাকে, নূতন কোনও লোক এলে তারা শিবুকে অন্য ঘরে নিয়ে যায় খেলতে।
শিবুর জন্য মাও বাইরে যাওয়া, আনন্দানুষ্ঠানে বা সামাজিকতায় যোগ দেওয়া সব ছেড়ে দিয়েছেন। তাঁর অন্য সব ছেলেমেয়েরা যাবে আর বিকৃত-অঙ্গ শিবু একা বাড়ী থাকবে, একথা ভাবলে তাঁর বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠতো। তাই মা সব কিছুই ত্যাগ করেছেন শিবুর দিকে তাকিয়ে।
শিবু পাঁছ বছর পার হয়ে গেল।
পাঁচটা বছর পরে মায়ের সতর্ক দৃষ্টি এড়িয়ে শিবু একদিন তার বিকৃত দেহের কথা আবিষ্কার করলো।
সেদিন তখন ভাইবোনেদের স্কুলে যাবার সময়, খুব তাড়া, মাও রান্নাঘরে ব্যস্ত। ইবু আর নিবু স্নান সেরে চুল আঁচড়াতে দাড়ালো বাবার ঘরে বড় আয়নাটার সামনে। এই ঘরে আসবার লোভ তাদের বহুদিনের। এই ঘরে বাবা বেশী সময় থাকেন, কাজ করেন—কাজেই ছোটদের আসার হুকুম নেই। কদাচিৎ কোনও দরকারে মা হয়তো একবার আসেন। ঘরখানি দেখে আজ ইবু-নিবু বাবার আয়নাতে চুল আঁচড়াবার লোভ সামলাতে পারেনি। মহা আনন্দে দু’জনে চুল আঁচড়ে বেরিয়ে আসতে যাবে এমন সময় শিবু এসে বললে:
—আমি চুল আঁচড়াবো দাদাভাই!
শিবুর জন্য সকলের মনেই একটা বেদনা-বোধ ছিল—তাই তারা সকলেই তাকে ভালবাসতো। ওরা বললে: যা, চট ক’রে চুল আঁচড়ে চলে আয়,—বাবা এখনি এসে পড়বে।
মার কণ্ঠস্বর শোনা গেল: শীগগীর এসো ইবু-নিবু, খেতে দেওয়া হয়েছে।
ওরা দৌড়ে চ’লে গেল নীচে।
কিন্তু একি হলো! শিবু আয়নাতে ও কার মুখ দেখছে? ও কে? বিরাট আতঙ্কে যেন তার সারা শরীর হিম হয়ে আসছে। একটা ছোট মুখ—এক পাশে একটা ভ্রূর নীচে চোখ, মাঝখানে নাক —এ পাশে কিছু নেই, প্লেন হয়ে গেছে, পাতলা চামড়া কুঁচকে বিকৃত মুখের ভয়ঙ্করতা প্রকাশ পাচ্ছে।
শিবু ভয়ে ভয়ে হাত দু’খানা তুলে মুখটায় বুলিয়ে নিলে। হ্যাঁ, এটা তো তারই মুখ, স্পর্শটুকু বেশ অনুভব করতে পারছে। দাদাদিদিদের মুখ তো এমন নয়—তাহ’লে তার মুখের এ ভয়ঙ্করতার কথা সে তো কোনদিন জানতে পারেনি—এ কী হলো!
বেদনায় নীল হয়ে গেছে শিবু, থর থর ক’রে কাঁপতে কাঁপতে ব’সে পড়লো মাটীতে। তার এক চোখ দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা ক’রে জল গড়িয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগলো।
বাবা ঢুকলেন ঘরে—কিরে শিবু, এখানে কেন? কাঁদছিস কেন? শিবুর ছোট্ট বুকে তখন ঝড় চলেছে। হাত দিয়ে চোখ মুছতে গিয়ে আবার তার মনে হলো সেই বীভৎস দৃশ্যের কথা। আয়নার দিকে না তাকিয়ে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বাবা খানিক সঙ্গে এসে চেঁচিয়ে মার উদ্দেশ্যে বললেন: দেখ তো শিবু কেন কাঁদছে।
মায়ের কাছে থেকে, ভাইবোনদের কাছে থেকে শিবু লুকিয়ে লুকিয়ে বেড়াতে থাকে। যখন তখন চেষ্টা করে বাবার ঘরে ঢুকে আয়নাতে মুখ দেখবার। বাড়ীতে ছোট ছেলেমেয়ে খেলতে এলেই তাদের ডেকে নিয়ে গিয়ে মুখে চোখে হাত বুলোয়। একদিন পাশের বাড়ীর ছট্টুকে জিজ্ঞাসা করলো: তুই অনেক বেশী বেশী দেখতে পাস ছট্টু?
ছট্টু ওর মুখের দিকে চেয়ে মানে বুঝতে না পেরে বললে: তার মানে?
—না, তাই বলছিলাম।
সেদিন ঘরে কেউ নেই, শিবু জানলার সার্সিতে চেষ্টা ক’রে নিজের মুখ দেখছে, এই মুখ যেন তার নিজের নয়—এ যেন এক ভয়ঙ্কর রকম জীব—যাকে দেখলে ভয়ে বুকের ভিতর ঠাণ্ডা হয়ে আসে।
শিবুর কণ্ঠরোধ হয়ে আসছে, চেতনা হারিয়ে ফেলছে যেন। এমন সময় নিবু ঘরে ঢুকলো: কি করছিস রে? মা খেতে ডাকছে যে!
—আচ্ছা দিদি, দুই চোখে বেশী দেখা যায় বুঝি? যাদের এক চোখ—
নিবু বুঝতে পেরে বাধা দিলে, বললে: ওসব থাক—আগে চল খেয়ে আসবি—তারপরে তোকে একটা মজার গল্প বলবো।
—না খাবো না, খেতে ইচ্ছে করছে না।
—কেন? কেন? দেখি তোর গা? মায়ের মত সুরে নিবু বললে। গা’টা গরম মনে হলো যেন—নিবু বললে: মাকে ডাকি।
—না, না, ডাকতে হবে না। তার চেয়ে তুই বল যা জিজ্ঞেস করছি।
—ওসব কথা বললে মা বকবে ভাই—তার চেয়ে গল্প করি আয়।
—আচ্ছা দিদি, তোর মুখটায় আমি হাত বুলিয়ে দিই—কেমন? নিবুর মনে খুব দুঃখ হচ্ছে—কিন্তু ছোট বিকৃত-অঙ্গ ভাইটাকে কি ব’লে বোঝাবে? তাই বললে: আচ্ছা দে।
শিবু নিবুর সারা মুখে হাত বোলাতে লাগলো—আর মাঝে মাঝে সার্সিতে নিজের মুখটা দেখবার চেষ্টা করতে লাগলো। হঠাৎ ভীষণ ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো শিবু—দিদি আমার ভয়ানক শীত করছে। চাপা দিয়ে শুইয়ে দে।
নিবু ভাইকে তাড়াতাড়ি খাটে শুইয়ে দিয়ে গায়ে চাপা দিয়ে ডাকলো: মা, ওমা! শীগগির এসো।
মা এলেন: পরে বাবাও এলেন—ডাক্তারও এলেন। সারারাত্রি শিবু জ্বরের ঘোরে চমকে উঠেছে আর প্রলাপ বকেছে। মা বুকের কাছে টেনে বলেন: কেন এমন করছো—কি হয়েছে শিবু!
—সরে এসো না মা, তোমার মুখটায় একটু হাত দিই।
—এই তো আমি তোমার কাছে রয়েছি মাণিক!
আবার প্রলাপ সুরু হলো: ওরে বাবা! কি ভয়ঙ্কর মুখ—ও কে? মা, ওমা! কাছে এসো; দু’টো চোখে কত বেশী দেখে মা?
ভোরের দিকে শিবু শান্ত হয়ে এলো দেখে বাবা শুতে গেলেন। মা ঘুমজড়ান চোখে শুয়ে রইলেন পাশে।
ভোরের আলো দেখা যেতেই বাবা ঢুকলেন ঘরে, দেখলেন শিবু স্থির নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমুচ্ছে, কোনও স্পন্দন নেই শরীরে তার, কেবল ছোট হাতখানি মায়ের মুখের উপর রাখা আছে।