দুর্নীতির পথে/জনন ও অন্তর্জনন/অন্তর্জনন ও অগোচর
৩। অন্তর্জনন ও অগোচর
অন্তর্জনন ক্রিয়ার প্রকৃতি যান্ত্রিক নহে, পরন্তু একটি জীব ভাগ হইয়া দুইটি হইবার প্রণালীর ন্যায় ইহা জৈবিক; অর্থাৎ ইহাতে বৃদ্ধি এবং ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ দেখা যায়। যে শক্তিতে এক দেহ হইতে আর এক দেহ উৎপন্ন হইতেছে, দেহকোষসকল ভিন্ন ভিন্ন কার্য্যে নিযুক্ত হইতেছে—তাহার প্রকৃতি যে বিলকুল নির্জীব কলের ন্যায় তাহা ধারণা করা অসম্ভব। একথা সত্য যে, আমাদের বর্ত্তমান চেতনা হইতে এই প্রাণশক্তির কার্য্য এতদূরে গিয়া পড়িয়াছে যে, দেখিয়া মনে হয়, প্রাণশক্তির কার্য্যের উপর মানুষের অথবা অপর জীবের ইচ্ছাশক্তির কোনো প্রভাব নাই। কিন্তু একটু চিন্তা করিলেই বুঝা যায় যে, যেমন পরিণতদেহ মানুষের ইচ্ছাশক্তি বুদ্ধির দ্বারা চালিত হইয়া তাহার সকল কার্য্য এবং অঙ্গসঞ্চালন নিয়ন্ত্রিত করে, তেমনি দেহগঠনের প্রথম অবস্থার ক্রিয়া সকল অবস্থা উপযোগী এক ধরণের বুদ্ধি দ্বারা চালিত একপ্রকার ইচ্ছাশক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। মনস্তত্ত্ববিদগণ আজকাল ইহার ‘অগোচর’ নাম দিয়াছেন। ইহা আমাদের অস্তিত্বের অংশ। যদিও আমাদের প্রাত্যহিক চিন্তাধারার সহিত ইহার যোগ নাই, তথাপি ইহা সদা জাগ্রত এবং আপন কার্য্যে সদা তৎপর। আমাদের নিদ্রার সময় গোচর মন নিদ্রিত হয় কিন্তু এই অগোচরের নিদ্রা নাই।
অন্তর্জননের ক্রিয়াসমূহ অগোচরের কর্ত্তৃত্ত্বাধীনে হয়। গর্ভসঞ্চারের পর হইতে মৃত্যু পর্য্যন্ত ইহা বীজকোষ সকলকে দেহের রক্তে সঞ্চারিত করে এবং শরীরের যেখানে যখন প্রয়োজন পাঠাইয়া দেয়। যদিও বহু বিখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদের মত অন্যরূপ, তথাপি আমি বলিতে চাই যে, অগোচরের কার্য্য জীব লইয়া, জাতি লইয়া নয়, সুতরাং ইহার প্রধান লক্ষ্যের বিষয় অন্তর্জনন। ‘অগোচর’ জাতির ভালমন্দের জন্য ব্যস্ত, এ কথা কেবল এক অর্থে বলা যাইতে পারে—তাহা এই যে, অগোচরের দ্বারা জীবের দেহগঠন একবার যে উন্নত অবস্থায় নীত হয়, অগোচর তাহাকে স্থায়ী করার চেষ্টা করে। কিন্তু ইহা অসম্ভবকে সম্ভব করিয়া তুলিতে পারে না—গোচর মনের ইচ্ছাশক্তির সাহায্য লইয়াও ইহা প্রাণীকে অনন্তকাল ধরিয়া বাঁচাইয়া রাখিতে পারে না। সুতরাং মৈথুনাসক্তির দ্বারা ইহাকে সৃষ্টি করিতে হয়। মৈথুনাসক্তিতে গোচর এবং অগোচর মনের ইচ্ছাশক্তি একত্র মিলিত হয় এরূপ বলা যাইতে পারে। মৈথুনে যে আনন্দ আছে, তাহা হইতে বুঝা যায়, মৈথুনকার্য্যের দ্বারা জীবের উদ্দেশ্য ভিন্ন অপর কোনো (অর্থাৎ জাতির) উদ্দেশ্যও সাধিত হয়। এই মৈথুনের আনন্দের জন্য জীবকে অজ্ঞাতে বড় বেশী দাম দিতে হয়। হিব্রুলেখক ঈশ্বরের মুখ দিয়া এই সত্যই প্রকাশ করিয়াছেন। ঈশ্বর ইভকে জলদগম্ভীর স্বরে বলিতেছেন “বহু গর্ভসঞ্চারের দ্বারা তোমার দুঃখ বৃদ্ধি পাইবে; গভীর যন্ত্রণায় তুমি সস্তান প্রসব করিবে।”