বিষয়বস্তুতে চলুন

দুর্নীতির পথে/জনন ও অন্তর্জনন/কাম ও প্রেম

উইকিসংকলন থেকে

৭। কাম ও প্রেম

খৃষ্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে ভালবাসা সম্বন্ধে বহু উপদেশ আছে। ইহাতে ভালবাসার দুইপ্রকার পরিকল্পনা করা হইয়াছে। স্বতন্ত্রভাবে ইহার প্রত্যেকটি আলোচনা করিব। একটিকে কাম বলা হইয়াছে। কাম বলিতে বুঝায়—প্রাণের ও জগতের প্রাকৃত আকর্ষণ, স্ত্রীপুরুষের আসক্তি এবং যাহাতে সুখ অনুভূত হয় সেই সমস্ত ভাব ও বিষয়স্পর্শ। এই কাম আমাদের ইচ্ছাসাপেক্ষ নয়। মনে হয় মানুষের অপেক্ষা প্রবলতর শক্তিসকল মানুষকে সতত জীবনের দিকে টানিয়া আনিতেছে, তাহাদেরই বশীভূত হইয়া মানুষ কোথাও আকৃষ্ট হইতেছে, আবার কোথাও বিমুখ হইতেছে; মানুষের ক্রিয়াসকল প্রায়ই এই সকল শক্তিরই প্রতিক্রিয়া মাত্র। আমাদের পছন্দ অপছন্দ, ভালবাসা বিদ্বেষ, শ্রদ্ধা অশ্রদ্ধা লইয়া এই কাম-জগৎ সৃষ্টি হয়। কাম কি চায়? কাম চায় যাহার দাবী সে সর্ব্বাপেক্ষা তীব্রভাবে অনুভব করে সেই একের অর্থাৎ ‘অহং’এর স্বার্থ। প্রত্যেক জীব, প্রত্যেক বংশ, প্রত্যেক জাতির মধ্য দিয়া এই স্বার্থানুসন্ধান চলিতে থাকে—ইহার বেগ ও ক্রূরতা ক্রমেই বাড়িতে থাকে এবং পরিশেষে ইহা জগৎব্যাপী সমরে (যেমন সম্প্রতি হইয়াছে) পরিণত হয়। ইহা অসংখ্য বার রূপান্তর গ্রহণ করিয়া অগ্রসর হয়, বুদ্ধির সহায়ে সহস্রপ্রকার যান্ত্রিক এবং অর্থনৈতিক উপায় অবলম্বন করে। বর্ত্তমানে ইহা আধুনিক সভ্যতারূপে মূর্ত্তিমান হইয়াছে।

 এখন জিজ্ঞাস্য এই, প্রাণের এই প্রাকৃত আকর্ষণ অথবা কাম সম্বন্ধে খৃষ্টান ধর্ম্মের উপদেশ কি? ইহাকে কি তুচ্ছ, দমন কিংবা নির্ম্মূল করিতে হইবে? অথবা ইহার গতি অব্যাহত রাখিয়া ইহার উদ্দেশ্য সফল হইতে দিতে হইবে? কাম সম্বন্ধে যাবতীয় উপদেশ এই কয়টি সরল কথার মধ্যে পাওয়া যায়—“তোমাদের কি কি বস্তুর প্রয়োজন তোমাদের স্বর্গীয় পিতা তাহা জানেন” এবং “প্রথমে তোমর ঋত এবং স্বর্গরাজ্য লাভ করার চেষ্টা কর, এই সকল বস্তু তখন আপনা হইতেই তোমাদের হইবে।” কামকে নষ্ট করিবার প্রয়োজন নাই, উহাকে শুদ্ধ করিতে হইবে। এরূপে খৃষ্ট-নির্দ্দিষ্ট উচ্চতর লক্ষ্যে পৌছিতে পারিলে ‘পূর্ণতর জীবন’ লাভ হইবে। তাহাতে শুদ্ধিকৃত কামের স্থান আছে।

 এইখানেই আমরা আসল খৃষ্টীয়-প্রেমের সাক্ষাৎ পাই। বাইবেলে ইহাকেই (agape) প্রেম বলা হইয়াছে। কিসে ইহা কাম হইতে ভিন্ন তাহা আমাদের বুঝিতে দেরী হয় না। কামের অননুরূপ এই প্রেম বাক্তির ইচ্ছাসাপেক্ষ। যাহা সাধারণ আকর্ষণ বিকর্ষণের উপরে ইহা সেই সপ্রেম করুণা। ইহা শক্ত মিত্র উভয়কে সমভাবে দেওয়া যাইতে পারে। অতএব লোকে সাধারণত যাহা ভাবে খৃষ্টীয়-প্রেম সেরূপ নয়—ইহা দুর্ব্বলের ভাবাবেশ মাত্র নয়। স্বভাবতই ইহা ভাবাবেগের উপরে; এবং ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগ ছাড়া ইহা লাভ করা যায় না। আবার ইহা কেবলমাত্র ইচ্ছাশক্তিতে হয় না, ইচ্ছাশক্তির সহিত সাধুতা থাকা চাই। খৃষ্টান যখন এই প্রেম দান করে, তখন সে অপরের (eros) কামনাজাত আকাঙ্ক্ষাসমূহের সফলতালাভের সাহায্য করিয়া থাকে। ঈশ্বরের ন্যায় সেও তখন মানুষের কি কি বস্তুর প্রয়োজন তাহা জানে। কল্পনা এবং দয়াবৃত্তির দ্বারা সে অপরের প্রয়োজন সাধনে প্রণোদিত হয়, কারণ সে অন্যের নিকট যেরূপ ব্যবহার পাইতে ইচ্ছা করে, অন্যের প্রতি সেরূপ ব্যবহার করে। সে জানে, যেমন তাহার তেমনি অপর সকলেরও প্রয়োজনের দাবী আছে। খৃষ্টীয় ধর্ম্ম কামের দাবী অগ্রাহ্য করে না, পরন্তু প্রেমের উপর বেশী জোর দেয়। খৃষ্টীয় নীতিধর্ম্ম মানবকে একটি নূতন পথের সন্ধান বলিয়া দেয়, এবং তাহাকে স্বার্থানুসন্ধান হইতে বিশ্বের কল্যাণ সাধনায় নিয়োজিত করে।

 প্রথম যুগের খৃষ্টানগণকে এই মূল্যবান সমন্বয় নীতির উপদেশ দেওয়া তবে ইহা অপেক্ষা উচ্চতর এবং অপার্থিব একটি আদর্শ তাহাদের দেখান হইয়াছিল। তাহা এই—মানুষকে ঈশ্বরের অনুকরণ করিতে হইবে। ঈশ্বর প্রেমে ও করুণায় যেমন পূর্ণ তাহার সেবকদেরও সেরূপ হইতে হইবে, কারণ “ঈশ্বর প্রেমস্বরূপ”।