বিষয়বস্তুতে চলুন

দুর্নীতির পথে/জনন ও অন্তর্জনন/জনন ও মৃত্যু

উইকিসংকলন থেকে

৪। জনন ও মৃত্যু

বৈজ্ঞানিক বিশেষজ্ঞদের গ্রন্থ হইতে উদ্ধৃত বাক্যদ্বারা এই প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি করা উচিত বিবেচনা করি না, কিন্তু এই বিষয়টি এত গুরুতর এবং এ সম্বন্ধে সাধারণের অজ্ঞতা এত বেশী যে, আমি কয়েকজন পণ্ডিতের লেখা উদ্ধৃত করিতে বাধ্য হইতেছি। রে ল্যাংকেষ্টার বলেন:—

 “এককোষাত্মক নিম্নতম জীবের দেহগঠন এবং বংশবৃদ্ধির বিভাগ প্রণালীর ফল এই যে, ইহাদের মধ্যে মৃত্যু পৌনপৌনিক স্বাভাবিক ব্যাপার নয়।”

 উইজম্যান লিখিয়াছেন—“বহুকোষাত্মক জীবের মধ্যেই মৃত্যু স্বাভাবিক ব্যাপার; এককোষাত্মক জীবের মধ্যে স্বাভাবিক মৃত্যু নাই—ইহাদের বৃদ্ধির এমন কোনো শেষ অবস্থা নাই, যাহাকে মৃত্যু বলা যাইতে পারে এবং নূতন প্রাণীর সৃষ্টির সঙ্গে পুরাতনের মৃত্যু হয় না। একটি এককোষাত্মক প্রাণী বিভক্ত হইয়া দুইটি হইলে, দুই ভাগই সমান হয়, একটির অপেক্ষা অপরটি অধিক বৃদ্ধ এ কথা বলা যায় না। এইরূপে একটি অনন্ত জীবধারা চলিতে থাকে—যাহার প্রত্যেকটি জীব নিজ জাতির সমবয়সী, প্রত্যেকটির অনন্তকাল ধরিয়া বাঁচিয়া থাকার শক্তি আছে, যাহার প্রত্যেকটী পুনঃ পুনঃ দুইভাগ হয় কিন্তু কখনও মরে না।”

 প্যাট্রিক গেডিসের “যৌন ক্রমবিকাশ” নামক গ্রন্থ হইতে উপরের উদ্ধৃত অংশগুলি লওয়া হইয়াছে। তিনি লিখিয়াছেন; “অতএব আমরা বলিতে পারি যে, মৃত্যুই দেহের মুল্য—দেহ লাভ করিলে এবং দেহ থাকিলে মৃত্যু আগে হউক পরে হউক একদিন আসিবেই। যাহাতে বিভিন্ন ক্রিয়ার জন্য কোষসকলের মধ্যে শ্রমবিভাগ দেখা যায় দেহ বলিতে এখানে সেইরূপ একটি জটিল জীবকোষ বুঝাইতেছে।”

 উইজম্যানের মূল্যবান বাক্য পুনরায় উদ্ধৃত করিতেছি। “দেহকে জীবশক্তির প্রকৃত আশ্রয়ের অর্থাৎ জননকারী জীবকোষসকলের একটি নিতান্ত গৌণ উপাঙ্গ বলিয়াই মনে হয়।”

 রে ল্যাংকেষ্টারেরও সেই ধারণা। তিনি বলেন, “বহুকোষাত্মক প্রাণীগণের মধ্যে কতকগুলি জীবকোষ দেহের মূল উপাদানভূত জীবকোষগুলি হইতে ভিন্ন হইয়া আসে। এই ভাবে দেখিলে উচ্চতর প্রাণীগণের মরণশীল দেহগুলিকে সাময়িক ও গৌণ বলিয়া ধরা যাইতে পারে। কেবলমাত্র কিছুকালের জন্য মৃত্যুহীন ভাগজাত কোষগুলির ধারণ ও পুষ্টিসাধন করাই ইহাদের কাজ।

 কিন্তু এই সকল তথ্যের মধ্যে সর্ব্বাপেক্ষা গুরুতর এবং সম্ভবত সর্ব্বাপেক্ষা বিস্ময়কর তথ্য এই যে, উচ্চশ্রেণীর জীবসমূহের মধ্যে জনন এবং মৃত্যুর মধ্যে অত্যন্ত নিকট সম্বন্ধ রহিয়াছে। এ বিষয়ে বহু বৈজ্ঞানিক বিশেষ নিশ্চয়তার সহিত পরিষ্কার ভাবে লিখিয়াছেন, জননের নিশ্চিত পরিণাম মৃত্যু। অনেক শ্রেণীর জীবের মধ্যে ইহা সুস্পষ্টই দেখা যায়। সন্তান-জন্মদানের সঙ্গে সঙ্গেই ইহাদের মধ্যে স্ত্রী অথবা পুং জীবটির মৃত্যু হয়। সন্তান জন্মদানের পরেও জীবন থাকা সকলক্ষেত্রে দেখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে একেবারেই না। মৃত্যু সম্বন্ধে মহাকবি গেটে যে প্রবন্ধ লিখিয়াছেন, তাহাতে তিনি জননের সহিত মৃত্যুর যে কিরূপ অমোঘ ও নিকট সম্বন্ধ তাহা দেখাইয়াছেন। একদিক দিয়া জনন ও মৃত্যু অনুরূপ—উভয়ই দেহীর পক্ষে পরম ক্ষয়সঙ্কট বলা যাইতে পারে। প্যাট্রিক গেডিস্ এ বিষয়ে লিখিয়াছেন:— “জননের সহিত মৃত্যুর সম্বন্ধ সুস্পষ্ট কিন্তু সাধারণত লোকে ইহাকে ভুলভাবে নির্দ্দেশ করিয়া থাকে। লোকে বলে, জীবমাত্রেরই মৃত্যু আছে, সুতরাং জনন না করিলে জাতি লোপ পাইবে। কিন্তু ভবিষ্যতের ভালমন্দের উপর এই জোর দেওয়াটার চেষ্টা আমাদের কর্ম্মের পরবর্ত্তী কল্পনাপ্রসূত। জীবের ইতিহাস আলোচনা করিলে যে সত্য আবিষ্কার করা যায় তাহা এই যে, মরিতে হইবে বলিয়া যে, জীবগণ জনন করে তাহা নহে, জনন করিতে হয় বলিয়াই জীবগুণের মৃত্যু ঘটে।”

 গেটে বলিয়াছেন, “মৃত্যু আছে বলিয়া বংশবৃদ্ধি আবশ্যক এ কথা বলা চলে না, বরং সন্তান জন্মদানের অবশ্যম্ভাবী ফল মৃত্যু।”

 বহু নিদর্শন দেখাইয়া নীচের প্রণিধানযোেগ্য কথাগুলি লিখিয়া গেডিস্ তাহার বক্তব্য শেষ করিয়াছেন। “উচ্চশ্রেণীর জীবের মতে সন্তানজন্মহেতু মৃত্যু সম্ভাবনা অনেকটা কমিয়াছে সত্য কিন্তু জননক্রিয়ায় সাক্ষাৎ ফলস্বরূপ মৃত্যু মানুষেরও হইতে পারে। পরিমিত যৌনসম্ভোগের ফলেও কিরূপ সাময়িক ক্লান্তি আসে এবং যৌনসম্ভোগের ফলে শারীরিক শক্তির ক্ষয় হইলে সর্ব্বপ্রকার ব্যধির সম্ভাবনা কিরূপ অধিক তাহা সুবিদিত।”

 এই আলোচনার সার কথা সংক্ষেপে এবং নিশ্চিতভাবে ইহা বলা যাইতে পারে, মনুষ্যজীবনে পুরুষের পক্ষে যৌনক্রিয়া এবং স্ত্রীলোকের পক্ষে সন্তানপ্রসব মুখ্যত ক্ষয়কারী (মৃত্যুর দিকে পদক্ষেপ)।

 অপরিমিত ইন্দ্রিয়সেবার ফল যে শারীরিক স্বাস্থ্যের পক্ষে অনিষ্টকর, সে বিষয়ে দীর্ঘ একটি অধ্যায় লেখা যাইতে পারে। পূর্ণসংযমী এবং অনেকাংশে সংযমী মানবগণ স্বভাবতই দীর্ঘজীবন লাভ করিয়া থাকে। তাহাদের পুরুষত্ব ও জীবনীশক্তি অব্যাহত থাকে এবং তাহারা সহজে রোগাক্রান্ত হয় না। শ্রুতিকটু হইলেও তাহার একটি প্রমাণ এই যে, পুরুষের অনেক রোগে নিস্তেজ দেহে কৃত্রিম উপায়ে বীর্য্য প্রবেশ করাইয়া রোগ দূর করা হয়।

 এই অধ্যায়ের সিদ্ধান্তগুলি মানিয়া লইতে পাঠকের মনে একটু খটকা লাগিতে পারে। বহু সন্তানের জনক হইয়াও বৃদ্ধবয়স পর্য্যন্ত সুস্থদেহে জীবিত রহিয়াছে এরূপ লোককে কেহ কেহ নজীররূপে দেখাইবেন; বিবাহিতেরা অবিবাহিতদের অপেক্ষা বেশীদিন বাঁচে এইরূপ সিদ্ধান্তসূচক হিসাবপত্রের উল্লেখও কেহ কেহ করিবেন। কিন্তু যদি আমাদের মৃত্যু সম্বন্ধীয় ধারণা বিজ্ঞানসম্মত হয় তবে এই দুই যুক্তির কোনোটির মূল্য থাকে না। কারণ মৃত্যু এমন একটী ঘটনা নহে, যাহা কেবল জীবনের অন্তে ঘটিয়া থাকে; পরন্তু বৈজ্ঞানিকেরা দেখাইয়াছেন যে, মৃত্যু একটি প্রবহমান ঘটনাবিশেষ—ইহা জীবনের প্রথম হইতেই আরম্ভ হইয়া প্রতিক্ষণই জীবনের পাশে পাশে চলিতেছে। বৃদ্ধি অথবা সংস্কার এবং ধ্বংস অথবা ক্ষয়, যথাক্রমে জীবন ও মৃত্যুর শক্তিতে হইয়া থাকে। প্রাণীগণের শৈশবে ও যৌবনে জীবনশক্তি আগে চলে, মধ্যবয়সে জীবনশক্তি ও মৃত্যুশক্তি সমানে চলে, শেষের দিকে মৃত্যুশক্তি আগে চলে এবং অন্তিমে তাহারই জয় হয়। যাহা কিছু এই মৃত্যুশক্তির জয়ের সাহায্য করে, যাহা কিছু এই জয় একদিন এক বৎসর অথবা দশ বৎসর আগাইয়া দেয় তাহাই মৃত্যুর অঙ্গ। যৌনসম্ভোগ বিশেষত অতিরিক্ত যৌনসম্ভোগ মৃত্যুরই অঙ্গ।

 যাহারা আমার কথা প্রামাণিক বলিয়া গ্রহণ করিতে অনিচ্ছুক তাহারা যেন Charles S. Minot লিখিত The Problem of Age Growth and Death নামক বহুতথ্যপূর্ণ সুন্দর গ্রন্থখানি পাঠ করেন। এই পুস্তকের লেখক ধ্বংস এবং মৃত্যুর শরীরতত্ত্ব পরিস্ফুট করিয়া দেখাইয়াছেন। এই পুস্তকখানি ডাক্তারি বই নহে, ইহা সাধারণের বোধগম্য কয়েকটী বক্তৃতার সমষ্টিমাত্র, এজন্য ইহাতে বিশেষ বিশেষ রোগের এবং যৌনবৃত্তির আলোচনা অল্পই আছে। যে তথ্যটির উপর আমি বিশেষভাবে জোর দিতে চাই তাহা এই যে, মৃত্যু পূর্ব্বোত্তর সম্বন্ধহীন একটি ঘটনামাত্র নহে পরন্তু ইহা একটি প্রবহমান ঘটনাধারা। কিন্তু যৌনবৃত্তি বিষয়ে লিখিত পুস্তকগুলির মধ্যে আমি যেটির মূল্য সকলের অপেক্ষা বেশী বলিয়া মনে করি সেটি হইল Dr. Kenneth Sylvan Guthrie লিলিত Regneration, the Gate of Heaven (অন্তর্জনন অথবা স্বর্গের দ্বার)। এই পুস্তকের নাম হইতেই বুঝা যায় যে, ইহা প্রধানত আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যে লিখিত, যদিও ইহাতে দৈহিক ও নৈতিক দিকগুলিরও বিশদ আলোচনা আছে এবং বহু বৈজ্ঞানিক ও শাস্ত্রিক বাক্য প্রমাণ স্বরূপ উদ্ধৃত হইয়াছে। কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয়, লেখক যৌনক্রিয়ার সহিত মৃত্যুর সম্বন্ধের উপর তেমন জোর দেন নাই, যদিও আমার প্রবন্ধের বর্ত্তমান অধ্যায়ের ইহাই প্রতিপাদ্য বিষয়।