দুর্নীতির পথে/জনন ও অন্তর্জনন/প্রাণীজগতে অন্তর্জনন
২। প্রাণীজগতে অন্তর্জনন
যৌনবিভাগ বা লিঙ্গভেদ মনুষ্য ও জন্তুগণের মধ্যে প্রকৃতিগত হইয়াছে এবং ইহাদের মধ্যে চরম পরিণতি লাভ করিয়াছে। তাহা আলোচনা করার পূর্ব্বে অযৌন-জনন এবং যৌন-জননের মধ্যবর্ত্তী যে জননরীতি দেখা যায় তাহার প্রতি দৃষ্টিপাত করা আবশ্যক। পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ ইহাকে ‘হারমাফ্রোডাইট’ (দ্বিলিঙ্গ) এই পৌরাণিক নাম দিয়াছেন, কারণ ইহাতে একাধারে স্ত্রী-পুরুষের ক্রিয়া হইয়া থাকে। এখনও এরূপ প্রকৃতিবিশিষ্ট কয়েক প্রকার জীব আছে। ইহাদের দেহের মধ্যে পূর্ব্ববর্ণিত প্রকারে জীবকোষের বৃদ্ধি হইয়া থাকে। কিন্তু ঐ জীবকোষসকল একেবারে দেহের বাহিরে না আসিয়া সাময়িকভাবে দেহের এক অংশ হইতে উৎক্ষিপ্ত হইয়া অপর অংশে যুক্ত হয় এবং যতদিন পর্যন্ত ভিন্ন প্রাণীরূপে বাচিয়া থাকার শক্তি লাভ না করে, ততদিন পর্য্যন্ত ঐ ভাবে পুষ্ট হইতে থাকে।
উৎক্ষেপণের সময় পর্য্যন্ত জনকদেহের যতখানি পরিণতি হইয়াছে, অন্তত ততখানি পরিণতি লাভের সম্ভাবনা লইয়াই সন্তানের জন্ম হয়। এককোষাত্মক বহুকোষাত্মক অথবা দ্বিলিঙ্গ—সকল প্রকার প্রাণীর বৃদ্ধি সম্বন্ধে একথা খাটে। সুতরাং ক্রমবিকাশ মূলে জাতিগত নহে, ইহা প্রাণীগত অথবা ব্যক্তিগত। কোনো প্রাণী যখন সন্তানের জন্ম দেয়, তখন সে নিজে পূর্ব্বের অপেক্ষা উচ্চতর স্তরে থাকে অথবা থাকিতে পারে; ফলে তাহার সন্তানও সেই স্তর পর্য্যন্ত স্বভাবত পৌঁছিতে সমর্থ। সন্তান জন্মদানের কাল প্রত্যেক জাতি ও প্রত্যেক প্রাণীর পক্ষে এক নহে; তবে বলা যাইতে পারে, প্রাণীগণের দৈহিক পূর্ণতালাভের পর হইতে শরীরের শক্তি কমিতে আরম্ভ করার পূর্ব্ব পর্য্যন্ত সন্তান জন্ম দিবার প্রশস্ত কাল। দৈহিক পূর্ণতালাভের পূর্ব্বে অথবা দেহের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় জাত সন্তান অবস্থানুযায়ী দুর্ব্বল ও নিকৃষ্টদেহ পাইয়া থাকে। শরীরের এই স্বাভাবিক ধর্ম হইতেই আমরা এই যৌন-নীতি আবিষ্কার করিতে পারি যে, যদি অন্তর্জননের হানি না করিয়া সন্তান দ্বারা বংশ রক্ষা করিতে হয় তবে কেবলমাত্র দেহের পূর্ণাবস্থায় জননক্রিয়া করা উচিত।
দ্বিলিঙ্গ জীব সৃষ্টির পরে কিভাবে স্ত্রী-পুরুষের লিঙ্গভেদ হইয়াছে, সে ইতিহাস আলোচনা করার প্রয়োজন বোধ করি না, কারণ ইহার সত্যতা মানিয়া লওয়া যাইতে পারে। স্ত্রী-পুরুষভেদ-সমন্বিত প্রাণীগণের একটী নূতন লক্ষণের প্রতি দৃষ্টিপাত করা আবশ্যক। তাহা এই— দ্বিলিঙ্গ জীবের দুই অংশ এখন যে কেবল পৃথক-শরীর হইয়াছে তাহা নয়, পরন্তু ইহারা এখন অপরের সাহায্য ব্যতীত বীজকোষ বা কোষ উৎপন্ন করিতে থাকে। পুরুষ জীব অন্তর্জননের জন্য বীজকোষ উৎপন্ন করে—আবার এই বীজকোষই অননক্রিয়ার জন্য বাহিরে উৎক্ষিপ্ত হয় এবং পুরুষের বীর্য বলিয়া অভিহিত হয়। স্ত্রী-জীবও তদ্রূপ বীজকোষ উৎপন্ন করে, তবে স্ত্রী কর্ত্তৃক উৎপন্ন অণ্ড সকল বাহিরে নিক্ষিপ্ত না হইয়া দেহের ভিতরেই থাকে এবং সেখানে ইহা পুরুষ-বীর্য্যের সহিত মিলিত হইয়া গর্ভ উৎপাদন করে। কিন্তু স্ত্রী পুরুষ উভয়ের পক্ষেই অন্তর্জনন একান্ত আবশ্যকীয়। গর্ভ সঞ্চারের পর হইতে প্রতি মুহূর্ত্তেই অন্তর্জননক্রিয়া ক্রমশ অধিক পরিমাণে চলিতে থাকে। দেহের পূর্ণতালাভের পর মানুষের মধ্যে জননক্রিয়া হইতে পারে; ইহাতে জাতিরক্ষা হয় বটে, কিন্তু ব্যক্তির উপকার যে হয় তাহা বলা যায় না। অন্তর্জনন বন্ধ হইলে অথবা যথারূপ না হইলে, নিম্নশ্রেণীর জীবের ন্যায় মানুষেরও রোগ অথবা মৃত্যু আসিয়া উপস্থিত হয়। মানুষের ভিতরেও ব্যক্তি এবং ভবিষ্যৎ জাতির স্বার্থ এইরূপ পরস্পরবিরোধী হইতে দেখা যায়। যদি বীজকোষের আধিক্য না থাকে, তবে জননের জন্য ইহা ব্যয় করিলে অন্তর্জননের উপাদান কম পড়ে। প্রকৃতপক্ষে সভ্য মানব-সমাজে জাতিরক্ষার জন্য যতটা প্রয়োজন তাহার অতিরিক্ত যৌন-সম্ভোগ চলে এবং এরূপে অন্তর্জনন ব্যাহত হয়—ফলে রোগ ও অকালমৃত্যু দেখা দেয়।
মানবদেহ সম্বন্ধে আর একটু বিশেষ আলোচনা করা যাউক। আমরা পুরুষের দেহকেই নিদর্শন স্বরূপ গ্রহণ করিব, যদিও স্ত্রীদেহ সম্বন্ধে একই কথা খাটে।
কেন্দ্রীয় বীজকোষাগারই প্রাণের আদিম ও নিগূঢ়তম আশ্রয়। প্রথম হইতেই ভ্রূণ ক্ষণে ক্ষণে এবং দিন দিন জীবকোষবৃদ্ধির দ্বারা বাড়িতে থাকে; এই জীবকোষগুলি মাতার শরীর-নিসৃত রসের দ্বারা পুষ্ট হয়। এখানেও জীবকোষগুলিকে পোষণ করাই জীবনের ধর্ম্ম। এই জীবকোষ সকল যখন বৃদ্ধি পাইতে থাকে, তখন তাহারা ভিন্ন ভিন্ন সাময়িক অথবা স্থায়ী আকার এবং কার্য্যভার গ্রহণ করে। মাতৃদেহ হইতে জন্মলাভ করার পরও এ নিয়মের ব্যতিক্রম হয় না। ভ্রূণ মাতৃগর্ভে নাড়ী দ্বারা খাদ্য গ্রহণ করিত, তাহার পরিবর্ত্তে শিশু এখন মুখ দিয়া খায়। জীবকোষগুলির পুষ্টি সাধনের জন্যই এই খাদ্য গ্রহণ। এই জীবকোষের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি হইয়া থাকে, এবং শরীরের যখন যে অংশে প্রয়োজন তখন সেই অংশে গিয়া তাহার অকর্ম্মণ্য তন্তুগুলির সংস্কার করিয়া থাকে। মূলকেন্দ্র হইতে জীবকোষগুলি রক্তে আসে এবং রক্তের সহিত শরীরের সর্ব্বত্র যায়। জীবকোষগুলির এক একটি সমষ্টি এক একটি দৈহিক ক্রিয়ার জন্য নিযুক্ত হয় এবং শরীরের বিভিন্ন অংশের সংস্কারকার্য্য করিয়া থাকে। এই জীবকোষগুলি নিজেরা সহস্রবার মরিয়া ‘জীবকোষের সমাজকে’ অর্থাৎ দেহপ্রাণকে বাঁচাইয়া রাখে। ইহাদের ‘মৃত দেহ’ উপরের দিকে আসিয়া শক্ত হইয়া অস্থি, দন্ত, চর্ম্ম, কেশ প্রভৃতিতে পরিণত হয় এবং দেহকে রক্ষা ও বলবান করে। ইহাদের মৃত্যু বিনিময়েই দেহের উচ্চতর জীবন এবং তার উপর নির্ভরশল অপর যাহা কিছু বাঁচিয়া থাকে। জীবকোষসকল যদি খাদ্য গ্রহণ না করিত, যদি ইহাদের সংখ্যা বৃদ্ধি না হইত, যদি ইহারা শরীরের বিভিন্ন অংশে না যাইত এবং বিভিন্ন ক্রিয়া না করিত এবং পরিশেষে না মরিত তবে দেহ বাঁচিয়া থাকিতে পারিত না।
পূর্ব্বকথিত মতে দেখা যায় যে, বীজকোষ হইতে দুই প্রকার প্রাণের উদ্ভব হয়: (১) আভ্যন্তরিক বা অন্তর্জননীয় (২) বাহ্যিক বা জননীয়। অন্তর্জননই দেহের জীবনের ভিত্তি এবং অন্তর্জনন ও জননের উপাদান একই মূল হইতে আহৃত হয়। ইহা হইতেই বুঝা যাইবে কিরূপে অন্তর্জনন ও জনন অবস্থাবিশেষে পরস্পরবিরোধী হইয়া থাকে।