দুর্নীতির পথে/জনন ও অন্তর্জনন/প্রাণীজগতে জনন
পরিশিষ্ট (ক)
জনন ও অন্তর্জনন[১]
১। প্রাণীজগতে জনন
অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে এককোষাত্মক প্রাণী পর্যবেক্ষণ করিলে দেখা যায় যে, নিম্নতম শ্রেণীর প্রাণীগণ একটি দুইভাগ হইয়া নিজেদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে। খাদ্য গ্রহণ করিয়া ইহারা বাড়িতে থাকে এবং যতদূর সম্ভব বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইলে, প্রথমে ইহাদের প্রাণকেন্দ্র তাহার পর দেহটিও দুইভাগে বিভক্ত হইয়া যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় অর্থাৎ যখন ইহারা জল ও খাদ্য পায় তখন এই প্রকারেই ইহাদের সমস্ত প্রাণশক্তির প্রকাশ হইয়া থাকে। কিন্তু জল ও খাদ্য না পাইলে, অনেক সময় দুইটি জীবকোষকে পুনমিলিত হইতে দেখা যায়; তাহার ফলে পুনর্যৌবন প্রাপ্তি হইতে পারে কিন্তু নূতন জীবসৃষ্টি হয় না।
বহুকোষাত্মক প্রাণীদের মধ্যে আহার ও বৃদ্ধি ছাড়া আর একটি নূতন জিনিষ দেখা যায়। দেহের বিভিন্ন কোষসকল বিভিন্ন দৈহিক কার্য্যে নিযুক্ত হয়—কতকগুলি আহার গ্রহণ করে, কতকগুলি তাহা দেহের বিভিন্ন অংশে বণ্টন করে, এবং কতকগুলি চলাচলের কার্য্য করে, এবং কতকগুলি, যথা ত্বক, আত্মরক্ষার কার্য্যে নিযুক্ত থাকে। যে সকল কোষ নূতন কার্য্যে নিযুক্ত হয়, তাহারা আর পূর্ব্বের ন্যায় একটি ভাগ হইয়া দুইটি হয় না, কিন্তু দেহের অপেক্ষাকৃত অন্তঃস্থলে যে সকল কোষ থাকে, সেগুলি পূর্ব্বের ন্যায়ই একটি ভাগ হইয়া দুইটি হয়। যে সকল কোষের মধ্যে কার্য্যানুসারে বহু প্রকার বিভাগ সৃষ্টি হইয়াছে, তাহারা অন্তঃস্থলের কোষদিগকে রক্ষা করে। যে সকল কোষ পূর্ব্বের ন্যায় একটি ভাগ হইয়া দুইটি হয়, তাহারা এখন দেহের মধ্যেই ঐরূপ হয়— অবশেষে কতকগুলি দেহের বাহির হইয়া যায়। কিন্তু এই সকল কোষের একটি নূতন শক্তি লাভ হয়। পূর্ব্বে যেমন ইহারা একটি ভাগ হইয়া দুইটি পৃথক কোষ হইয়া যাইত, এখন সেরূপ না হইয়া অন্তর্ভেদ হয় অর্থাৎ পৃথক না হইয়া একের মধ্যেই একাধিক প্রাণকেন্দ্রের সৃষ্টি হয়। বহুকোষাত্মক প্রাণীগণের নিজ নিজ জাতির আকার ও আকৃতি না হওয়া পর্য্যন্ত এইরূপ চলিতে থাকে। কিন্তু এই সকল প্রাণীর দেহে আমরা একটি নূতন ব্যাপার দেখিতে পাই। নবসৃষ্ট প্রাণকোষগুলি কেবলমাত্র অথবা মুখ্যত পৃথক প্রাণী সৃষ্টির জন্য দেহের বাহিরে আসে না; অপরপক্ষে তাহারা দেহের নানাকার্য্যেরত বিভিন্ন কোষসমষ্টির জন্য যথাপ্রয়োজন কোষ জোগাইয়া থাকে। সুতরাং জীবকোষগুলি দুই প্রকার কার্য্য করিয়া থাকে, প্রথমত দেহের ভিতরের সৃষ্টি দ্বারা দেহের পুষ্টিসাধন, দ্বিতীয়ত দেহের বাহিরের সৃষ্টি দ্বারা বংশ অথবা জাতিরক্ষা। এই দুই প্রকারের ক্রিয়া আমরা সূক্ষ্মভাবে আলাদা করিয়া দেখিতে পারি এবং ইহাদের যথাক্রমে অন্তর্জনন এবং জনন নামে অভিহিত করিতে পারি। কিন্তু একটি গুরুতর কথা এখানে মনে রাখা দরকার। অন্তর্জনন ক্রিয়ার উপর প্রত্যেক প্রাণীর অস্তিত্ব নির্ভর করে, এজন্য ইহা মুখ্য ও প্রয়োজনীয়; জননক্রিয়া জীবকোষের বাহুল্য হেতু হইয়া থাকে, অতএব ইহা গৌণ।, এই দুই ক্রিয়াই খাদ্যগ্রহণ অথবা পুষ্টির উপর বিশেষরূপে নির্ভর করে। কারণ পুষ্টির অল্পতা হইলে অন্তর্জনন কমিয়া যায় এবং জননের আবশ্যকতা অথবা সম্ভাবনাও থাকে না। প্রথমত অন্তর্জনন, দ্বিতীয়ত জননের জন্য জীবকোষগুলির পোষণ করাই এই স্তরে জীবনীশক্তির কার্য্য। যদি পুষ্টির অল্পতা হয়, তবে প্রথমে অন্তর্জননের দাবীই পূরণ করিতে হইবে এবং জননক্রিয়া বন্ধ রাখিতে হইবে। এইরূপে আমরা প্রাণীগণের জননক্রিয়া স্থগিত রাখার মূল কারণ জানিতে পারি এবং সেই মূল ধরিয়া মানুষের যৌননীতির উন্নত স্তরগুলির যথা ব্রহ্মচর্য্য ও সন্ন্যাসের অর্থ বুঝিতে পারি। অন্তর্জনন ক্রিয়া কখনও বন্ধ করা চলে না, কারণ তাহা করিলেই মৃত্যু। মৃত্যুর স্বাভাবিক কারণ কি তাহাও এরূপে দেখা গেল অর্থাৎ অন্তর্জনন ক্রিয়া বন্ধই মৃত্যুর স্বাভাবিক কারণ।
- ↑ চিকাগো হইতে প্রকাশিত ‘ওপোন ফোর্ট’ নামক পত্রিকায় ১৯২৬ সালের মার্চ মাসে উইলিয়াম লোফ্টাস হেয়ার কর্তৃক লিখিত প্রবন্ধ হইতে।