দুর্নীতির পথে/জনন ও অন্তর্জনন/ব্যক্তিগত সম্ভোগনীতি
৬। ব্যক্তিগত সম্ভোগনীতি
সাধারণত, ব্যক্তি সমাজ বা জাতির অভিজ্ঞতা হইতে নীতিশাস্ত্র রচিত হয়। ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করিলে বুঝা যায় যে, অনেক সময় কোনো না কোনো মহাপুরুষ নীতিশাস্ত্র রচনা করিয়াছেন। মুসা, বুদ্ধ, কন্ফুসিয়াস, সক্রেটিস, এরিষ্টট্ল্ যীশুখৃষ্ট এবং তাঁহাদের পরবর্ত্তী মহান্ নীতিবিদ ও দার্শনিকগণ নিজ নিজ দেশে ও কালে মানবের আচরণের ঔচিত্য অনৌচিত্য বিচার করার জন্য মাপকাঠি নির্দ্দেশ করিয়া গিয়াছেন। দর্শন, মনোবিজ্ঞান, শরীর-বিজ্ঞান এবং সমাজ বিজ্ঞানের তথ্য সমূহই সাধারণ নীতিশাস্ত্রের ভিত্তি। এজন্য কোনো যুগের লোকে নিজেদের অভিজ্ঞতা হইতে যে সব তত্ত্বের প্রভাব বিশেষভাবে উপলব্ধি করে, সেই যুগ বা সভ্যতার ব্যক্তিগত সম্ভোগনীতি সেই সব তত্ত্বের উপর নির্ভর করে। সমাজিক সম্ভোগনীতির ন্যায় এই ব্যক্তিগত সম্ভোগনীতি যুগে যুগে পরিবর্ত্তিত হয়। কিন্তু ইহার ভিতর এমন কিছু আছে যাহা অল্পবিস্তর স্থায়ী।
বর্তমান যুগের উপযোগী সম্ভোগনীতি নির্ণয় করিতে হইলে, সমস্ত জ্ঞাত ঘটনা ও সম্ভাবনার উপর (বিশেষভাবে যখন ইহারা বিচক্ষণ লোক দ্বারা পরীক্ষিত হইয়াছে) আমাদের নির্ভর করিতে হইবে। একথা বলিলে অন্যায় হইবে না যে, ১ম হইতে ৫ম অধ্যায়ে আমি যে সব ঘটনা উদ্ধৃত করিয়াছি, তাহা পাঠ করিলে, সরল ও বুদ্ধিমান পাঠকের মনে কতকগুলি সিদ্ধান্ত না আসিয়াই পারে না। তাহা এই যে, শারীরিক মানসিক ও আধ্যাত্মিক মঙ্গলের জন্য ব্রহ্মচর্য্য অবশ্য পালনীয়। কিন্তু ইহার বিরুদ্ধে শীঘ্রই আর একটি নিয়মও দেখা দেয়। আমরা দুইটি পরস্পরবিরোধী নিয়মের সম্মুখীন হইয়া পড়ি। পুরাতনটি প্রাকৃত, ইহাই আমাদের কামবাসনা উদ্রেক করে, নূতনটি অনুভূতি, বিজ্ঞান, অভিজ্ঞতা বিশ্বাস এবং আদর্শের ভিত্তির উপর স্থাপিত। পুরাতন নিয়মের পথে চলিলে অর্থাৎ কামবাসনা পূরণ করিলে ক্ষয় ও মৃত্যু আগাইয়া আসে; নূতন নিয়মের পথের বাধা এত বেশী যে, প্রায় কেহই এ পথে চলিতে চায় না—লোকে বিশ্বাস করিতেই চায় না যে ইহাই প্রকৃষ্ট পথ। এ সম্বন্ধে কাহাকেও কিছু বলিলে, সে তৎক্ষণাৎ নানা ওজর আপত্তি দেখায়। যোগী ভিক্ষু এবং সন্ন্যাসীগণ যে কঠোর নীতি নির্দ্দেশ করিয়াছেন, এই প্রবন্ধে বর্ণিত শরীরবিজ্ঞানের অনুভূতিলব্ধ জ্ঞানই তাহার ভিত্তি; পৌরাণিক গল্প অথবা কুসংস্কার তাহার ভিত্তি নহে।
কাউণ্ট টলষ্টয় অপেক্ষা বেশী জোরের সহিত সন্তোগনীতি সম্বন্ধে কোনো আধুনিক লেখক লেখেন নাই। নীচে তাঁহার কয়েকটি সিদ্ধান্ত দিতেছি।
১০২। বংশরক্ষার সংস্কার অর্থাৎ কামবাসনা মানুষের ভিতর প্রকৃতিগত। প্রাকৃত অবস্থায় এই বাসনা তৃপ্ত করিয়া সে বংশরক্ষা করে এবং ইহাতে তাহার সার্থকতা হয় মনে করে।
১০৩। জ্ঞান উন্মেষের সহিত মানুষ ভাবে, এই ইচ্ছা পূরণে তাহার ব্যক্তিগত লাভ; এবং বংশরক্ষার কথা না ভাবিয়া শুধু ব্যক্তিগত সুখের জন্য সে সম্ভোগে লিপ্ত হয়। ইহাই যৌন পাপ।[১]
১০৭। যখন মানুষ ব্রহ্মচর্য্য পালন ও নিজের সকল শক্তি ভগবানের সেবায় নিয়োগ করিতে ইচ্ছা করে, তখন সম্ভোগমাত্রই তাহার পক্ষে পাপ বলিয়া গণ্য হইবে। সন্তান জন্মদানের ও পালন করার উদ্দেশ্যেও ইন্দ্রিয়সেবা তাহার পক্ষে পাপ। যে ব্যক্তি পূর্ণ সংযমের পথে চলা স্থির করিয়াছে, পবিত্র বিবাহও তার পক্ষে এরূপ পাপ।
১১৩। যে ব্যক্তি ব্রহ্মচর্য্যের পথ নির্বাচন করিয়া লইয়াছে বিবাহ করা তাহার পক্ষে এই জন্য পাপ (বা ভুল) যে, বিবাহ না করিলে সে সম্ভবত সর্ব্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ কাজকে জীবনের ব্রতরূপে নির্বাচন করিত এবং ভগবানের সেবায় নিজের সমস্ত শক্তি নিয়োজিত করিত, ফলে প্রেমের প্রচারে ও সর্ব্বশ্রেষ্ঠ মঙ্গলপ্রাপ্তিতেই তাহার শক্তির ব্যবহার হইত। কিন্তু বিবাহ করার জন্য সে জীবনের নিম্ন স্তরে নামিয়া আসে এবং নিজের মঙ্গলও সাধন করিতে পারে না।
১১৪। যে ব্যক্তি বংশরক্ষার পথ নির্ব্বাচন করিয়া লইয়াছে, সন্তান উৎপাদন না করিলে অথবা অন্তত পক্ষে পারিবারিক সম্বন্ধ স্থাপন না করিলে সে দাম্পত্য-জীবনের সর্ব্বাপেক্ষা প্রধান সুখ হইতে আপনাকে বঞ্চিত করিবে। ইহাই তাহার পক্ষে পাপ বা ত্রুটি।
১১৫। আর এক কথা, যাহারা সম্ভোগসুখ বাড়াইতে চেষ্টা করে, তাহারা যত অধিক কামাসক্ত হইবে, সম্ভোগের স্বাভাবিক আনন্দ হইতে তাহারা তত অধিক বঞ্চিত হইবে। প্রত্যেক কামনাতৃপ্তি সম্বন্ধেই ইহা খাটে।
পাঠক দেখিবেন, টলষ্টয়ের সিদ্ধান্ত সাপেক্ষিক; অর্থাৎ তিনি বলেন নাই যে, ভগবান বা কোনো খ্যাতনামা গুরু মানুষের জন্য পাকা নিয়ম বানাইয়া দিয়াছেন। তিনি বলেন, প্রত্যেকেই নিজ নিজ পথ বাছিয়া লইবে; কেবল ইহা মনে রাখিতে হইবে, স্ব-নির্ব্বাচিত পথের নিয়ম যেন প্রত্যেকে পালন করে।
এরূপ নীতিশাস্ত্রে নিষেধের ক্রমনিম্ন ধাপ আছে। যে ব্যক্তি অখণ্ড ব্রহ্মচর্য্যে বিশ্বাসী এবং উচ্চতর শারীরিক ও আত্মিক কল্যাণের জন্য যে বুদ্ধিমানের ন্যায় ইন্দ্রিয়সংযম করিতে ইচ্ছুক, সব রকম সম্ভোগ তাহার পক্ষে নিষেধ; যে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হইয়াছে, পরপুরুষ বা পরস্ত্রীসঙ্গ তাহার পক্ষে নিষেধ। অধিকন্তু যে সব অবিবাহিতের অবাধ অথবা অনিয়মিত সম্ভোগ চলে তাহাদের পক্ষে বেশ্যাগমন আরও খারাপ; যাহারা স্বাভাবিক মৈথুনে লিপ্ত হইয়া থাকে, তাহাদের অস্বাভাবিক মৈথুন ত্যাগ করা উচিত। পরিশেষে, প্রত্যেক শ্রেণীর লোকের ভিতর যাহারা হাল ছাড়িয়া দিয়া চলে, অতিমাত্রায় ইন্দ্রিয়সেবা তাহাদের পক্ষে অনিষ্টকর। অপরিণতবয়স্ক এবং নব-যুবকদের ইন্দ্রিয়সেবা স্থগিত রাখা উচিত। ইহাই সম্ভোগনীতির স্বরূপ।
আমি ইহা ধারণাও করিতে পারি না যে, কোনো ব্যক্তি এই সম্ভোগনীতি বুঝিতে পারিবে না। যাহারা বিশেষভাবে ইহা চিন্তা করিবে, তাহাদের অতি অল্প লোকেই ইহার মূল্য অস্বীকার করিবে। তথাপি নানাপ্রকার কুতর্ক দ্বারা এইরূপ নীতির বিরোধিতা করার প্রবৃত্তি কাহারও কাহারও আছে দেখা যায়। লোকে ধরিয়া লয়, যেহেতু ব্রহ্মচর্য্য পালন করা কঠিন এবং নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী অত্যন্ত দুর্লভ, অতএব ব্রহ্মচর্য্যের সমর্থন করা ঠিক নহে। এইরূপ তর্ক অনুসারে নিজ পতি অথবা পত্নীতে অনুরক্ত থাকা অথবা দাম্পত্যজীবনে পরিমিত সম্ভোগ করা, কিংবা কেবল স্বাভাবিক মৈথুনে আসক্ত হওয়াও ঠিক নহে, কারণ কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগুলি পালন করাও দুষ্কর। একটি আদর্শ খর্ব্ব করিলে, সকল আদর্শই খর্ব্ব করা যায়, এবং ঘৃণিত পাপ ও কামনাবাসনার পথ উন্মুক্ত হয়। একমাত্র খাঁটি ও তর্কানুমোদিত নিয়ম এই যে, আমরা আমাদের আদর্শকে ধ্রুবতারার ন্যায় চোখের সামনে রাখিয়া সর্ব্বদা পথ চলিব, ইহাই আমাদিগকে একের পর এক অধঃপতন হইতে রক্ষা করিবে, এবং বিরুদ্ধ শক্তিকে বিপর্য্যস্ত করিয়া আমাদিগকে জয়যুক্ত করিবে। বুঝিয়া সুঝিয়া স্বেচ্ছাপূর্ব্বক যে এই পথে চলিবে, তার নিকট এ আশা নিশ্চয়ই করা যায় যে, সে নবযৌবনের অস্বাভাবিক মৈথুনের কিছু উপরে উঠিয়া স্বাভাবিক মৈথুনের আশ্রয় লইতে পারে, শেষোক্ত মৈথুন প্রথম প্রথম অবাধও হইতে পারে; এই অবস্থা হইতে মুক্ত হইয়া সে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হইতে পারে এবং নিজের ও সহধর্ম্মিণীর মঙ্গলের জন্য যতদূর সম্ভব সংযম রক্ষা করিতেও পারে। এই নীতি অনুসরণ করিয়া সে ব্রহ্মচারী পর্য্যন্ত হইতে পারে অথবা ভোগের কূপে ডুবিবার পূর্ব্বেই রক্ষা পাইতে পারে।
- ↑ টলষ্টয়ের পাপের অর্থ একটু স্বতন্ত্র রকমের। যাহা সকলের প্রতি অতি প্রেমের পরিপন্থী, টলষ্টয়ের মতে তাহাই পাপ।