দুর্নীতির পথে/জনন ও অন্তর্জনন/সামাজিক সম্ভোগনীতি
৮। সামাজিক সম্ভোগনীতি
যেমন ব্যক্তির সমষ্টি লইয়া সমাজ, সেইরূপ ব্যক্তিগত সম্ভোগনীতি হইতেই সামাজিক সম্ভোগনীতির উৎপত্তি। অন্য কথায়, সমাজ ব্যক্তিগত সম্ভোগনীতির সহিত কিছু জুড়িয়া ইহার সীমা নির্দ্দেশ করিতে চায়। ইহার মুখ্য উদাহরণ বিবাহ প্রথা। শিক্ষিত বৈজ্ঞানিক পণ্ডিতগণ বিবাহের ইতিহাস সম্বন্ধে অনেক-কিছু লিখিয়াছেন এবং এ সম্বন্ধে প্রচুর মালমসলা সংগ্রহ করিয়াছেন। এজন্য আজকাল বিবাহ-প্রথায় যে পরিবর্ত্তনের কথা শুনা যাইতেছে, তাহার উল্লেখ করার সময় বৈজ্ঞানিকদের সিদ্ধান্তের সারাংশ দেওয়া যাইবে।
মানবের মধ্যে সন্তান উৎপাদন সম্বন্ধে পিতার অপেক্ষা মাতার মহত্ত্ব অধিক। মাতাকে কেন্দ্র করিয়াই পরিবার গঠিত হয়। বাস্তবিক এক সময় মাতার শাসনবিধিই ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল এবং বহুপতিত্ব বা এক স্ত্রীর বহু পুরুষের সহিত মিলনের প্রথা প্রবর্ত্তিত হইয়াছিল। এশিয়ার কতকগুলি আদিম জাতির মধ্যে এখনও এই প্রথার জের বিদ্যমান আছে। স্বামীদের ভিতর যে সর্ব্বাপেক্ষা বলবান সুন্দর ও রক্ষাকার্য্যে সুনিপুণ ছিল, স্ত্রীর নিকট ধীরে ধীরে তাহার আদর বাড়িতে লাগিল এবং কালে স্বামীপদ সৃষ্টি হইল। ইংরেজী ভাষায় husband শব্দের অর্থ পতি অথবা গৃহপতি। husband শব্দ husbuondi শব্দ হইতে উদ্ভূত; husbuondi শব্দের অর্থ, যে ঘরে থাকে। এই একটি শব্দ বিবাহপ্রথার অনেক-কিছু ইতিহাসপূর্ণ। সকল পতির ভিতর হইতে যে পতি পত্নীর সহিত ঘরে থাকিত, তাহাকে স্বামী বা গৃহপতি বলা হইতে লাগিল। ক্রমে সে ঘরের মালিক হইল এবং গৃহপতি সম্প্রদায়ের কেহ কেহ সরদার বা রাজা হইল। নারীজাতির শাসনকালে যেমন বহুপতিত্ব চলিয়াছিল, পুরুষজাতির শাসন সুরু হইতেই বহুপত্নীত্ব চলিত হইল।
এজন্য সামাজিক ভাবে না হইলেও মনোবিজ্ঞানের দিক দিয়া স্ত্রী স্বভাবত বহুপতিত্ব এবং পুরুষ স্বভাবত বহুপত্নীত্ব পছন্দ করে। পুরুষ নিজের ইচ্ছায় চারিদিকে ছুটাছুটি করিয়া সর্ব্বাপেক্ষা সুন্দরী নারীর খোঁজ করে, স্ত্রীও সেইরূপ সুন্দর পুরুষের খোঁজে ছুটাছুটি করে। যদি স্ত্রীপুরুষের অবাধ, স্বাভাবিক এবং মানসিক বাসনার উপর কোনো লাগাম না থাকে, তবে কি প্রাচীন, কি আধুনিক সকল মনুষ্য-সমাজের নিশ্চয়ই নাশ হইবে। মনুষ্যেতর সব জানোয়ারের ভিতরও সন্তান-উৎপাদন বাসনার আতিশয্য আছে। ইহাকে নিয়ন্ত্রিত করার জন্য সমাজ প্রথমত বিবাহপ্রথা এবং পরিশেষে এক-বিবাহপ্রথা আবিষ্কার করিয়াছে। স্ত্রীপুরুষের অবাধ মিলনই ইহার একমাত্র বিকল্প; এরূপ অবাধ মিলনের ফলে আধুনিক সমাজ ধ্বংস হইবে। এক-বিবাহপ্রথা ও অবাধমিলনের একটি সংগ্রাম চলিতেছে তা আমরা দেখিতেছি। বেশ্যাবৃত্তি, অনিয়মিত ও অবৈধ মিলন, ব্যভিচার ও তালাক দেখিয়া দিন দিন মনে হয় যে এক-বিবাহ প্রথা এখন পর্য্যন্ত পুরাতন ও আদিম সম্বন্ধ দূর করিয়া নিজের প্রাধান্য স্থাপন করিতে পারে নাই। কোনো কালে কি পারিবে?
যাহা বহুদিন হইতে গুপ্তভাবে প্রচলিত ছিল, কিন্তু হালে নির্লজ্জভাবে মাথা তুলিতে সুরু কবিরাছে, সেই সন্তান-নিরোধ সম্বন্ধে কিছু বলা দরকার। এজন্য এমন সব ঔষধ ও যন্ত্রপাতির সাহায্য লওয়া হয় যাহাতে গর্ভসঞ্চার হইতে পারে না। গর্ভসঞ্চার হইলে অবশ্য নারীর উপর ভার পড়ে, কিন্তু ইহা পুরুষের প্রবৃত্তিকে বিশেষত দয়ালু পুরুষের প্রবৃত্তিকে অনেক সময় সংযত রাখে। সন্ততিনিরোধ প্রচলিত হইলে বিবাহিত জীবনে আত্মসংযম করার কোনো তাগিদ থাকে না, এবং যতক্ষণ ইচ্ছা না কমে অথবা ইন্দ্রিয় শিথিল না হয়, ততক্ষণ কামবাসনা তৃপ্ত করা সম্ভব হয়। তা ছাড়া স্বামীস্ত্রীর উপর বিবাহিত জীবনের বাহিরেও ইহার প্রভাব পড়িতে পারে। ইহা অনিয়মিত, অবাধ এবং নিষ্ফল সম্ভোগের দরজা খুলিয়া দেয়—আধুনিক শিল্প, সমাজবিজ্ঞান এবং রাজনীতির দৃষ্টিতে ইহা বিপদপূর্ণ। আমি ইহার খুঁটিনাটি আলোচনা এখানে করিতে পারি না। ইহা বলাই যথেষ্ট যে, সন্তাননিরোধের জন্য কৃত্রিম উপায়ের সহায়তা লইলে নিজের স্ত্রী বা পরস্ত্রীর সহিত অতিমাত্রায় সম্ভোগের সুবিধা হয়, এবং এ পর্য্যন্ত শরীরশাস্ত্র সম্বন্ধীয় যে সব যুক্তি আমি পেশ করিয়াছি, তাহা ঠিক হইলে ইহাতে নিশ্চয়ই ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের অকল্যাণ হয়।