বিষয়বস্তুতে চলুন

দুর্নীতির পথে/সংযম ও ইন্দ্রিয়পরায়ণতা

উইকিসংকলন থেকে

পরিশিষ্ট (খ)

সংযম ও ইন্দ্রিয় পরায়ণতা[]

যৌন ব্যপারটি বড় অদ্ভুত, কারণ যদিও ইহার সহিত আমরা সকলেই মুখ্য এবং গৌণরূপে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এবং আজ হউক কাল হউক সকল লোকেরই জীবনের এক সময় ইহা চিন্তার বিষয় হইয়া উঠে, তথাপি আমরা পরস্পরের মধ্যে বিশেষতঃ স্ত্রী-পুরুষের মধ্যে ইহার আলোচনা করি না, যেন সমগ্র মানবসমাজ এ বিষয়ে নীরবতার ষড়যন্ত্র করিয়াছে। মানবজীবনের এই অত্যন্ত কৌতুকাবহ বিষয়টিকে অন্য সকল রহস্য অপেক্ষা আমরা গোপন করিয়া রাখিয়াছি। কোনো ধর্ম্ম বিষয়েও এতটা গোপনভাব অথবা সম্ভ্রম রক্ষিত হয় না। প্রেমের বাহিরের দিকগুলি লইয়া বাগাড়ম্বর করা হইয়া থাকে বটে, কিন্তু আমার মনে হয়, অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যেও যৌনব্যাপারের সুখ ও ভয়ভাবনাগুলি লইয়া সচরাচর বলাবলি হয় না। শেকার[] (Shaker) সম্প্রদায় এই ব্যাপারটি সম্বন্ধে মুখে বলিয়া যত না ইহাকে বাড়াইয়া তোলে, সমস্ত মানবসমাজ এ বিষয়ে নীরব থাকিয়া ইহাকে তাহার চেয়ে বেশী বাড়াইয়া তুলিয়াছে। অবশ্য কিছু বলার মত না থাকিলে এ বিষয়ে অথবা কোনো বিষয়েই কেবল কথা কহিয়া কোনো লাভ নাই। কিন্তু এই বিষয়ে প্রকৃত আলোচনার অভাব দেখিয়া বলা যায় যে এদিকে মানুষের শিক্ষা সবেমাত্র আরম্ভ হইয়াছে।

 মানবসমাজ যদি শুদ্ধ হইত, তবে বিবাহ ব্যাপারটির আলোচনা লজ্জা করিয়া (সম্ভ্রম হেতু নয়) এভ এড়াইবার চেষ্টা থাকিত না, চোখঠারা অথবা ইঙ্গিত মাত্র করা হইত না। ইহার স্বাভাবিক ও সহজ আলোচনা হইত। যদি এড়াইবার দরকার হইত, তবে সমশ্রেণীর অপরাপর রহস্যগুলির ন্যায় ইহাকেও সহজ ভাবে এড়ান হইত। যদি লজ্জার জন্য এই বিষয়ে মুখের কথাও না বলা যায় তবে মানুষ এ কাজ কি করিয়া করে? কিন্তু এ কথা নিশ্চিত যে, উপরে উপরে যে পরিমাণ পবিত্রতা অথবা অপবিত্রতা দেখা যায় ভিতরে দুইই তাহার চেয়ে বেশী আছে।

 সাধারণত লোকে বিবাহের সহিত খানিকটা ইন্দ্রিয়লালসা যুক্ত করিয়া ভাবে; কিন্তু পৃথিবীর সর্ব্বত্র প্রত্যেক প্রেমিকই বিবাহের পরিপূর্ণ শুদ্ধতায় বিশ্বাস করে।

 যে বিবাহ পবিত্র-প্রেমের ফল সে বিবাহের মধ্যে ইন্দ্রিয়লালসার স্থান নাই। পবিত্রতা অস্ত্যাত্মক, নাস্ত্যাত্মক নয়। বিশেষভাবে ইহা বিবাহিতেরই ধর্ম্ম। পবিত্র দাম্পত্যজীবনে উচ্চতর আনন্দসকল কামবাসনা এবং নিম্নশ্রেণীর সুখের স্থান অধিকার করিবে। যাহারা মহৎ ভাব লইয়া মিলিত হয়, তাহারা নীচ কাজ কিরূপে করিতে পারে? অপর যে কোনো কর্ম্মের চেয়ে প্রেমজ কর্ম্ম সুন্দর হইবে ইহাই স্বাভাবিক, কারণ ইহার মূলে রহিয়াছে পরস্পরের শ্রদ্ধা, যাহা উভয়কেই সর্ব্বক্ষণ পবিত্রতর এবং উচ্চতর জীবনযাপনে উৎসাহিত করিতেছে। পরস্পরের সহযোগে স্বামী-স্ত্রী যে কাজ করিবে, তাহা নির্দ্দোষ ও পবিত্র হওয়া চাই, কারণ পবিত্রতার চেয়ে বড় আর কিছুই নাই। এ ব্যাপারে আমাদের যাহাকে লইয়া কারবার তাহাকে তো (অর্থাৎ স্বামীর পক্ষে স্ত্রীকে, এবং স্ত্রীর পক্ষে স্বামীকে) আমরা নিজেদের অপেক্ষা অধিক শ্রদ্ধা করি। অতএব কার্য্য করিবার সময় আমরা ভাবিব, আমরা ঈশ্বরের সম্মুখে বৃহিয়াছি। প্রেমিকের মনে প্রেমাস্পদের চেয়ে কে বেশী সম্ভ্রম উদ্রেক করিতে পারে?

 শরীরের উত্তাপ বাড়াইবার জন্য কুকুর বিড়াল এবং অলস প্রকৃতির লোকে যে ভাব লইয়া আগুন পোহায়, যদি সেই ভাব লইয়া স্নেহের আকাঙ্ক্ষা কর তবে তুমি নিম্নগামী হইতেছ এবং ক্রমশঃ গভীরতর আলস্যের কূপে নিমগ্ন হইবে। সেই আগুণের উত্তাপের অপেক্ষা তুষারাবৃত পৃথিবী হইতে বিচ্ছুরিত সূর্য্যালোকের উত্তাপ শ্রেয়। স্বর্গীয় প্রেমের অমৃত পানে মানুষ শিথিলাঙ্গ হয় না, বরং তাহাতে মানুষের শক্তিসঞ্চার হয়। দেহকে যদি চাঙ্গা করিতে চাও তবে ব্যায়াম কর, আগুণের মালসা কোলে করিয়া বসিয়া থাকিও না। আত্মনির্ভরশীল হইয়া মহৎ কর্ম্ম দ্বারা চিত্তকে সতেজ রাখ, অপরের সহানুভূতির অপেক্ষা করা মহতের পথ নয়। দৈহিক জীবনের সহিত প্রত্যেকের সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনের সামঞ্জস্য থাকা চাই। যেমন কঠিন শয্যায় শোয়া উচিত, তেমনি যদি নির্ভর করিতে হয় তবে কঠিনবক্ষ বন্ধুর উপর নির্ভর করিবে। ঠাণ্ডা জল ভিন্ন কিছু পান করিবে না। যাহা শুনিবে তাহা যেন বিশুদ্ধ প্রাণদায়ী সত্য কথা হয়। মধুর এবং অতিরঞ্জিত বাক্য শুনিবে না। শীতল নির্ঝর বারির ন্যায় সত্যে অবগাহন করিবে, বন্ধুদের সহানুভূতি দ্বারা উষ্ণ করা জলে নয়।

 প্রেমের সহিত কি কোনো ভাবে উচ্ছৃঙ্খল ভোগের সম্বন্ধ থাকিতে পারে? স্ত্রী-পুরুষ পরস্পরকে ভোগ না করিয়া প্রেমসাধনা করিবে। প্রেম হইতে কাম বহু দূরে। একটি ভাল, অপরটি মন্দ। প্রেমিকযুগল যখন তাহাদের চরিত্রের উচ্চতর ভাবের দিক দিয়া পরস্পরকে আকর্ষণ করে তখন জাগে প্রেম। কিন্তু চরিত্রের নিকৃষ্ট ভাবের দিক দিয়া আকর্ষণের ভয়ও আছে, সেরূপ হইলেই সেখানে কামের উৎপত্তি হয়। ইহা ইচ্ছাকৃত এমন কি জ্ঞাতসারে নাও হইতে পারে। কিন্তু নিবিড় প্রেমালিঙ্গনের সময় পরস্পরকে দূষিত করার ভয় থাকে, কারণ মানুষ যখন আলিঙ্গন করে তখন নিজের সম্পূর্ণ দেহ মন দিয়াই করে।

 আমাদের প্রেমাস্পদের চিন্তা যেন কখনও অপবিত্র চিন্তার সহিত যুক্ত না হয়। যদি আমাদের অজ্ঞাতসারেও অপবিত্রতা আসে, তবেই পতন হইল।

 প্রেম যখন প্রেম-বিলাসে পরিণত হয় তখনই ভয়। শীতের প্রভাতের মত আমাদের প্রেমের মধ্যে একটা বীর্য্য একটা কাঠিন্য থাকা চাই। সকল ধর্ম্মেই পবিত্রতার একটা আদর্শ আছে, কিন্তু হায় মানুষ তাহা লাভ করিতে পারিতেছে না। আমরা ভালবাসিয়াও পরস্পরকে উন্নত না করিতে পারি; যে ভালবাসা আমাদের মধ্যে উন্নতির আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করে না, যাহা পায় তাহাতেই সন্তুষ্ট থাকে, সে ভালবাসা আমাদের অধোগতিরই কারণ। সতত দৃষ্টি রাখা চাই, যেন আমাদের সকলের চেয়ে মধুরতম এবং পবিত্রতম স্নেহবন্ধনের উপর কোনো দাগ না পড়ে। আমাদের ভালবাসা যেন এরূপ হয় যে, তৎপ্রণোদিত কোনো কাজের জন্য আমাদের পরে অনুতাপ করিতে না হয়।

 ফুলসকলের কি অপরূপ বর্ণ ও গন্ধের বৈচিত্র্য! তাহার তুরুসকলের বিবাহ দেয়। মানুষের জীবনে যখন বসন্ত আসে, তখন আমরা রূপকের ভাষায় বলি তাহার বিবাহের ফুল ফুটিল, কিন্তু এই রূপকের সার্থকতা থাকে না যদি এই বিবাহ লালসাবর্জ্জিত এবং পবিত্র না হয়। ইন্দ্রিয়ভোগের সহিত যুক্ত হইয়া ভাষার কত গভীর রূপকোপযোগী শব্দেরই না অর্থহানি ঘটিয়াছে!

 কুমারীকে পুষ্পকলির সহিত তুলনা করা যায়। অপবিত্র বিবাহের দ্বারা সে মলিন হইয়া যায়, পাপড়িগুলি খসিয়া যায়। ফুল যার প্রিয়, কুমারী ও পবিত্রতাও তার প্রিয়। ফুলের বাগান এবং বেশ্যালয়ে যে তফাৎ প্রেম ও কামে সেই তফাৎ।

 J. Biberg নামক উদ্ভিদতত্ত্ববিদ পণ্ডিত লিখিয়াছেন, “প্রাণী জগতে প্রকৃতি জননেন্দ্রিয়গুলিকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে লুক্কায়িত রাখিবার প্রয়াস করিয়াছে, যেন সেগুলি লজ্জার বিষয়; কিন্তু উদ্ভিদ জগতে তাহারা পরিদৃশ্যমান এবং যখন তরুসকলের বিবাহ হয় তখন পৃথিবীতে কি আনন্দধারা বহিয়া যায়! পৃথিবী বর্ণে উজ্জ্বল এবং গন্ধে আমোদিত হইয়া উঠে, মধুমক্ষিকা, কীট পতঙ্গ ফুলের মধু ভাণ্ডার হইতে মধু এবং শুষ্করেণু হইতে মোম আহরণ করে। লিনিয়াস (Linnœus) ফুলের ঘরটিকে বলিয়াছেন বাসরঘর এবং পাপড়ির ভিতর দিকের আবরণটিকে বলিয়াছেন পরদা। এই ভাবে তিনি ফুলের প্রত্যেক অংশের বর্ণনা করিয়াছেন।

 কে জানে হয়ত ফুল জগতেও অনেক দুষ্টাত্মা আছে, যাহাদের স্পর্শে ফুলের জ্যোতি ম্লান হইয়া যায়, যাহারা ফুলের গন্ধ অপহরণ করে এবং তাহাদের বিবাহকে পঙ্কে লিপ্ত করে! তাই বুঝি সকল ফুল সমান আনন্দ দেয় না! নীচু জমিতে বর্ষাকালে এক রকম ফুল ফোটে যাহার গন্ধ পূতিগন্ধের মত।

 যৌন মিলন অপূর্ব্ব সুন্দররূপে আমি কল্পনা করি। এত সুন্দর ষে তাহা স্মরণে থাকে না। ঠিক যেমনটি তেমনটি কিছুতেই ভাবিয়া মনে আনা যায় না। লোকে বলে জগতে দৈবীশক্তির প্রকাশ আজকাল আর হয় না। কিন্তু যতদিন জগতে প্রেম আছে, ততদিন সে কথা বলা চলে না।

 প্রকৃত বিবাহ এবং সত্যদর্শনে কোনো ভেদ নাই। সত্য উপলব্ধির মধ্যে যে স্বর্গীয় অনির্ব্বচনীয় পাগলপারা আনন্দ আছে, তাহা প্রেমালিঙ্গনের আনন্দেরই অনুরূপ।

 অমর মানবজাতি এইরূপ মিলনেরই ফল। জননীর গর্ভ অনন্ত সম্ভাবনার ভাণ্ডার।

 কেহ কেহ জিজ্ঞাসা করে, পশুর নায় মানুষের বংশও সুজনন বিদ্যার সাহায্যে উন্নত করা যাইতে পারে কিনা। আমি বলি আমাদের প্রেম পরিশুদ্ধ হউক, তাহা হইলেই সব হইবে। শুদ্ধ প্রেম জগতের সমস্ত অমঙ্গল দূর করিয়া দিবে।

 উন্নতি যদি উদ্দেশ্য না হয়, তবে জনন অন্যায়। কেবল সংখ্যাবৃদ্ধি প্রকৃতির বাঞ্ছিত নয়। পশুরা কেবল সংখ্যা বৃদ্ধি করিয়া থাকে, কিন্তু মহৎপ্রাণ নরনারীদের আশা-আকাঙ্ক্ষা যেমন নিজেদের ছাড়াইয়া চলে, তেমনি তাহাদের সন্তানও তাহাদের নিজেদের অপেক্ষা উন্নত হইবে। মানুষের পরিচয় তাহাদের সন্তানের ভিতর পাওয়া যায়।


  1. হেনরী ডেভিড থরোর প্রবন্ধ সংগ্রহ হইতে (From Essays by Henry David Thoreau.)
  2. ইংলণ্ড ও আমেরিকার ধর্ম্মসম্প্রদায় বিশেষ। বৈষ্ণবদের মত নর্ত্তন ইহাদের উপাসনার অঙ্গ।