বিষয়বস্তুতে চলুন

দুর্য‍্যোধন বধ কাব্য/ষষ্ঠ সর্গ

উইকিসংকলন থেকে

ষষ্ঠ সর্গ।

পূর্ব্বপরিচিত সেই হ্রদ দ্বৈপায়ন,
ধীরে ধীরে উপনীত আমি তার কূলে
যুধিষ্ঠির আদি সবে পঞ্চভ্রাতা মিলি,
সঙ্গে লয়ে সেই কৃষ্ণ যাদবের পতি।
সহর্ষে দেখিল তারা নির্জন সে স্থান;
কিবা মনোরম। আহা, শান্ত চারিদিক্
শান্ত সেই জলরাশি কিবা সুগম্ভীর!
দেখিলে সে দৃশ্য, বল, কার মনে হয়,
চাপল্য এ হেন হ্রদে স্থান পায় কভু?
চাহি সেই জল পানে ক্ষণেকের তরে,
সম্ভাষি কৃষ্ণেরে তবে, ধীর ধর্ম্মরাজ
কহিতে লাগিলা অতি মৃদু মৃদু স্বরে;—
“লুকায়িত দুর্য্যোধন এই জল তলে?
আশ্চর্য্য এ কথা দেব, কভু কি সম্ভবে?
অতল এ হ্রদজল; তার তলে পশি,
বল কি উপায়ে তবে ধরিছে জীবন?

বিশ্বাস নাহিক প্রভু হয় মম মনে।
সত্যই যদ্যপি রহে এই জল তলে,
কেমনে তাহার সনে সম্ভবিছে রণ?
সম্ভাষিব কি উপায়ে? উত্তর কে দিবে?
কি সাধ্য কাহার বল, নাশিতে তাহারে।
দুর্ব্বল ভাবিয়া মনে, লুক্কায়িত হয়ে
থাকে যদি জল তলে, কেন সে আসিবে
বল কবিবারে রণ? বৃথা এ প্রয়াস;
ক্ষান্ত হ(ও)য়া আমাদের উচিত সর্ব্বথা।
নিরবিল ধর্ম্মরাজ এতেক কহিয়া।
উত্তরিল তবে সেই দেব যদুপতি;—
“মায়াবী সে জন রাজা জানিবে নিশ্চয়।
পশিয়া হ্রদের জলে, মায়ার প্রভাবে
ধরিছে জীবন তথা, কহিনু তোমারে।
ডাক উচ্চৈঃস্বরে তারে; মায়ার প্রভাবে,
শুনিবে সকল কথা যা তুমি কহিবে।
শুনহ সঙ্কেত মম, ওহে ধর্ম্মরাজ:
ঘোর অভিমানী সেই রাজা দুর্য্যোধন,
কর্কশ বচন কভু না পারে সহিতে;
কটুউক্তি রুষ্ট বাক্য শুনিলে তখনি

দারুণ ক্রোধেতে অন্ধ হইয়া উঠিবে।
শুনিলে কর্কশ বাক্য জ্ঞানহীন হয়ে
এখন(ই) প্রবর্ত্ত হ’বে সংগ্রাম করিতে।
রুষ্টভাষে ডাকি তা’রে করহ সংগ্রাম।”
শুনিয়া এতেক কথা, রাজা যুধিষ্ঠির,
হ্রদজলে লক্ষ্য করি, কহিতে লাগিল;—
“কোথা বীর দুর্য্যোধন, কোথা তুমি এবে?
লুক্বায়িত কিবা হেতু হ্রদজল মাঝে?
ধরিত্রীর পতি তুমি, বিখ্যাত ভুবনে,
অযোগ্য এ স্থান, হায়, নিতান্ত তোমার।
সুবিস্তীর্ণ রাজ্য তব এই ধরাধাম;
সেই রাজ্য ত্যজি পুনঃ, কোন রাজ্যলোভে,
সুগভীর জলতলে পশিয়াছ এবে?
জলেশের রাজ্যলোভ ঘটেছে কি তব
মনে? অথবা করিয়া ক্ষয় এ বিপুল
কুল, কাপুরুষ তুমি, পালায়েছ তেঁই
শেষে নিজ প্রাণ লয়ে? ধিক্, শত ধিক্
সদা তোমা হেন জনে। তোমার কারণে,
এ বিপুল কুরুকুল মজিল সমূলে।
সমর দারুণ আর বিপদ যতেক,

তুমিই তাহার হেতু নাহিক সংশয়।
পিতামহ ভীষ্ম, আর কর্ণ দ্রোণ আদি,
যতেক আত্মীয় বর্গ ছিল অগণিত,
নিহত সকলে, হায়, তোমার কারণে
“ক্ষত্রিয়ের কুলাঙ্গার, নরাধম সেই,
স্বার্থসিদ্ধিতবে যেই বাধায়ে সংগ্রাম,
করে পলায়ন শেষে নিজ প্রাণ লয়ে।
এত যদি মায়া তোর্ নিজ প্রাণ তরে,
কেনরে বাধাস্ রণ অন্যেরে নাশিতে?
ধিকরে পাপিষ্ঠ তুই ঘোর দুবাচার;
নাহিক্ তুলনা তোর এ তিন ভুবনে।
মায়াফাঁদ পাতি তুই প্রতারণা করি,
হরি রাজ্য আমাদের, অবশেষে, হায়,
পাঠাইলি ঘোর বনে আমাদের সবে।
প্রতিজ্ঞা পালন তবে তাহাও সহিনু।
বহুকাল ভ্রমি বনে, গভীর অরণ্যে,
নিদারুণ কতক্লেশ সহি বিধিমতে,
ফিরিয়া আইনু যবে আপন রাজ্যেতে,
ধিক্ নরাধম তুই প্রতিজ্ঞা করিলি,
সূচ্যগ্র মৃত্তিকা অপি নাহি দিতে মোরে?

রাজ্যাকাঙ্ক্ষা তদা তোর্ এতই বাড়িল?
কোথা সেই রাজ্য তব?—যাহার লালসে
করেছ দুষ্কর্ম্ম ঘোর; ডুবেছ নরকে?
অধার্ম্মিক তব সম নাহি দেখি আর।
হায়, পড়িনু বিপদে, পঞ্চভ্রাতা মোরা
যবে তোর্ মায়াবশে, সে দারুণ ক্ষণে,
ধর্ম্মভয়, নিন্দাভয়, কিছু নাহি করি,
রজস্বলা ভ্রাতৃবধূ দৌপদী সুন্দরী,
অপমান কৈ’লি তার সভার মাঝারে!
স্মরিলে সেক্ষণ কথা এখন(ও) কম্পিত
হয় এই দেহ মম। এখন(ও) সুতপ্ত
হয় এ দেহ শোণিত; শিরায় শিরায়
প্রধাবিত হয় তাহা দ্রুততর বেগে।
উঠ দুষ্ট দুরাচার, উঠ ত্বরা করি।
ক্ষত্রিয়ের রক্ত যদি থাকে তব দেহে,
লুক্বায়িত ভাবে তুমি কভু নাহি রবে।”
নিরবিলা ধর্ম্মরাজ এতেক কহিয়া।
উদ্দেশিয়া দুর্য্যোধনে কহিতে লাগিল
তবে বীর ভীমসেন;—ক্ষত্রিয়ের রক্ত
তুই ধরিয়া শরীরে, এখন(ও) জলেতে,

কাপুরুষ মত র’স্ লুক্বায়িত হয়ে?
বড় সাধ মম মনে, নাশিবারে তোরে
হস্তস্থিত মম এই গদার আঘাতে।
প্রতিজ্ঞা করেছি আমি বহু দিন আগে,
নোশিতে দুর্ম্মতি তারে গদার আঘাতে।
কালপূর্ণ এবে বুঝি সে প্রতিজ্ঞা মম।
আনন্দ হতেছে তেঁই আজি মম মনে।
যত অপমান আর যত অত্যাচার,
সহেছি আমরা সবে, রে পাপিষ্ঠ তোর,
প্রতিশোধ আজি তার লইব নিশ্চয়।
উঠ শীঘ্র নরাধম, কি ফল বিলম্বে;
ছাড় জীবনের আশা করহ সংগ্রাম।
প্রস্তুত সত্বর হও মরণের তরে।
না কর সাহস যদি করিতে সংগ্রাম,
শৃগাল কুক্কুর বলি গণিব তোমারে।
মনুষ্যের রক্ত যদি থাকে তব দেহে
করহ সত্বর তবে এখন(ই) সংগ্রাম।”
ভীম বাক্য শুনি তবে, রাজা দুর্য্যোধন
কাঁপিতে লাগিল ক্রোধে জলের ভিতরে।
অসহ্য হইল তার ভীমের দুর্ব্বাক্য;

মহাদম্ভে উচ্চৈঃস্বরে কহিতে লাগিল;—
“পামর দুর্ব্বত্ত তুই অতি দুরাচার,
পলায়িত শত্রুপরে রূক্ষ কথা ক’স?
বেড়েছে সাহস তোর বিষম এখন।
ভেবেছিস পলায়িত আমি তোর্ ভয়ে
তৃণজ্ঞান করি তোরে জানিস নিশ্চয়।
সময় লভিতে মাত্র আছি লুক্বায়িত।
ভেবেছিনু ইহা মনে, কিছু দিন এই
ভাবে রহি লুক্বায়িত, সুযোগ পাইয়া
পুনঃ বাধাইয়া রণ, নাশিব তোদের
সবে, স্বহস্তে নাশিব। কিন্তু, না রহিতে
পারি আর শুনি তোর দত্ত; না রহিতে
পারি শুনি অপমান। আর না বিলম্ব
সহে, শুন যুধিষ্ঠির, শুন মম বাক্য;
সংগ্রাম করিতে আমি প্রস্তুত এখন(ই)।
কিন্তু, একামাত্র আমি ভেবে দেখ মনে
দ্বিতীয় সহায় আর কেহ নাহি মম,
অস্ত্র শস্ত্র কিছু নাই, একমাত্র গদা
আছে মম হস্তে। যুদ্ধ ইচ্ছা কর যেই
তোমাদের মাঝে, লয়ে গদা মম সাথে,

প্রস্তুত তাহার সনে সংগ্রাম করিতে।
বড় সাধ করে ভীম নাশিতে আমারে;
বিখ্যাত সে ধরা মাঝে গদাযুদ্ধে সদা:
আলুক তাহার সনে করিব সংগ্রাম।
কিন্তু যুধিষ্ঠির তুমি প্রতিজ্ঞা করহ,
রাজ্যলাভ রাজ্যনাশ নির্ভর করিবে,
এই যুদ্ধ ফলাফলে আমাদের মাঝে;
আর না হইবে রণ কভু কোন কালে।
পরাজিত হয় যদি ভীমসেন রণে,
পশিবে অরণ্যে পুন তোমরা সকলে
রাজ্যলোভ কোন কালে আর না করিবে।
বিজীত যদ্যপি হই কহিনু নিশ্চয়,
তখনি পশিব আমি গভীর অরণ্যে;
নাশিব জীবন কিম্বা যে কোন উপায়ে।
রাজ্যাকাঙ্ক্ষা পুন স্থান না পাবে হৃদয়ে।”
কহিয়া এতেক কথা গভীর গর্জ্জনে,
নিরবিল দুর্য‍্যোধন প্রত্যুত্তর আশে।
কৃষ্ণের সম্মতি তবে লয়ে ধর্ম্মরাজ,
ভীমসেন প্রতি পুন চাহিয়া তখনি;
সন্মত তাহারে দেখি রণের প্রস্তাবে,

চাহি অন্য ভ্রাতাগণ সবাকার দিকে,
সম্মতি সবা’র বুঝি, কহিতে লাগিল;—
“সম্মত আমরা সবে তোমার প্রস্তাবে।
সম্মত করিতে রণ ভ্রাতা ভীমসেন।
উভয়ে করিবে রণ গদামাত্র লয়ে;
কাহারে সাহায্য অন্য কেহ না করিবে।
রাজ্যলাভ, রাজ্যনাশ, নিশ্চয় কহিনু,
নির্ভর করিবে তাহা তোমাদের হস্তে:
জিনিবে সংগ্রামে যেই সেই পাবে রাজ্য
আর নাহি হ’বে রণ কভু কোন কালে।
কিন্তু এই স্থান নহে যুদ্ধ সমুচিত,
প্রশস্ত সর্ব্বথা রণ, রণক্ষেত্র মাঝে।
কে জানে ভবিষ্য মনে কি আছে- সংবৃত,
এই যুদ্ধে কা’র ভাগ্যে কি দশা ঘটিবে;
পুণ্যভূমী কুরুক্ষেত্র, তথায় যাইয়া
মিটাও রণের সাধ তোমরা উভয়ে।
বিলম্বে কি ফল আর উঠ ত্বরা করি।
শুনিয়া এতেক কথা বীর দুর্য্যোধন,
লয়ে হস্তে সুবৃহৎ লৌহময় গদা,
জলস্তম্ভভেদ করি উঠিয়া তখনি,

কুরুক্ষেত্র রণভূমে চলিল সদর্পে।
চমকিল সবে দেখি সে ভীম আকৃতি।
ভীতচিত্তে ধর্মরাজ কহিল কৃষ্ণেরে;—
বিপদ দেখি যে দেব, কি হবে উপায়?
নাশিতে সংগ্রামে ভীম নারিবে দুর্ব্বৃতে।
নাহি করি ভয় কিছু হারাইতে রাজ্য,
ভীমসেন তরে, কিন্তু, ভীত যে হ’তেছি
পাণ্ডব ভরসা তুমি, দেব, দয়াময়,
সর্ব্বজ্ঞ সতত তুমি এ বিশ্ব সংসারে;
নাহি অবিদিত দেব, কিছুমাত্র তব।
ভূত যে ঘটনা আর, যেবা ভবিষ্যৎ,
বর্ত্তমানবৎ তাহা দেখিছ সর্ব্বদা।
কহ মোরে দয়া করি, কহ তুমি দেব,
কি ফল ফলিবে আজি এ ঘোর সংগ্রামে।
শক্তির আধার তুমি, তব শক্তিবলে
চলিছে সতত দেব, এ বিশ্ব সংসার।
প্রাণিগণ এ সংসারে যেবা কার্য্য করে,
শক্তির সঞ্চার তাহে তুমিই করহ।
কহ তবে যদুপতি, কহ তুমি মোরে,
উভয় যোদ্ধার মাঝে, অধিক সামর্থ্য

আজি কোন বীর ধরে? দারুণ আশঙ্কা
কেন জন্মিতেছে মম মনে। দয়াময়,
দয়া করি, কর মম সংশয় মোচন।”
নিরবিল ধর্ম্মরাজ এতেক কহিয়া।
আশ্বাসিয়া পুন তারে কহিল শ্রীপতি;—
“কেন বৃথা শঙ্কা বল, কর তুমি মনে?
ধর্ম্মের সতত জয়, শুন ধর্ম্মরাজ।
উপনীত এই মোরা কুরুক্ষেত্র ভূমে।
সংগ্রামে এখন(ই) ভীম হউক প্রবর্ত্ত;
বিলম্ব উচিত নহে তিলমাত্র আর।”
কুরুক্ষেত্র রণভূমে আসি দুর্য্যোধন,
কহিলা সক্রোধে অতি ডাকি ভীমসেনে;—
“ওরে দুষ্ট ভীমসেন আয় শীঘ্র করি,
রণসাধ যত তোর মিটাব এখনি।”
হুঙ্কারিয়া ভীমসেন চলিল সম্মুখে,
উভয়ে মাতিল রণে, ঘোর গদাযুদ্ধে।
কাঁপিল মেদিনী তদা তাদের দাপটে;
ব্যাপিল আকাশ মার্গ যত দেবগণ,
দেখিতে লাগিল সবে যুদ্ধ উভয়ের।
দেখি শিক্ষা তাহাদের আশ্চর্য‍্য হইল।

সন্ সন্ রবে গদা ফিরাইছে উভে।
লক্ষ্য করি বক্ষঃদেশ, উভে উভয়ের,
শিরোদেশ লক্ষ্য করি কভু বা কৌশলে,
হানিছে ভীষণ গদা; বিফলিছে উভে
পুনঃ উভয়ের লক্ষ্য, কিবা সুকৌশলে।
এই ভাবে উভে রণ করি কতক্ষণ,
দুর্য্যোধন বক্ষঃদেশে সজোরে আঘাৎ
হঠাৎ করিল তবে বীর ভীমসেন।
পড়িল ভূতলে তাহে দুর্য্যোধন বীর।
নিমেষের মধ্যে পুনঃ উঠি লম্ফ দিয়া,
পুন আরম্ভিল রণ মহা আস্ফালনে।
সুযোগ পাইয়া পুনঃ, কিছুক্ষণ পরে
প্রহারিল এক গদা ভীমের দেহেতে।
বজ্রবৎ সে আঘাৎ বিচেতন কৈল
তদা বীর ভীমসেনে। পড়িল ভূতলে
ভীম সে বজ্র আঘাতে। চমকিল তাহা
দেখি ধীর ধর্ম্মরাজ; সম্ভাষি মাধবে,
সজল নয়নে তবে কহিতে লাগিল;—
কি ঘটিল বল মোরে দেব নারায়ণ,
অচেতনবৎ হয়ে পড়িল ভূতলে

ওই দেখ ভীমসেন; কি হ’বে উপায়?
নাহি অন্য কিছুমাত্র ভরসা আমার,
তুমিই ভরসা দেব, তুমিই রক্ষক।
নাহি চাহি রাজ্য আর নাহি চাহি ধন,
না বাঁচিব কিন্তু দেব, হলে ভীম হত।
কাটায়েছি বহুকাল ভ্রমি বনে বনে,
জীবনের অল্প অংশ আছে মাত্র বাকি;
সেই অংশ কেন মোরা নাহি কাটাইনু
অরণ্য মাঝাবে, হায়, কোন তপোবনে?
কেন না কাটা’নু কাল ঈশ্বরের ধ্যানে?
রাজ্যলোভে আসি হেথা বাধিল সংগ্রাম।
আত্মীয় স্বজনগণ যেবা যথা ছিল,
সকলে হইল হত সে ঘোর সংগ্রামে।
হ’বে কি হারা’তে দেব, হায়, অবশেষে
প্রাণের সোদরে মম বীর ভীমসেনে?
নারিব সহিতে আমি, আর কোন শোক,
বাঁচাও ভীমেরে দেব, যাই ফিরি বনে।”
পাইয়া চেতন পুন উঠিল তখনি
বীর ভীমসেন; রোষে দন্ত কড়মড়ি,
মাতিল আবার সেই তুমুল সংগ্রামে।

সন্ সন্ রবে গদা ফিরিল আবার।
উভয়ে করিয়া লক্ষ্য উভয়ের বক্ষঃ
হানিতে লাগিল গদা ভীষণ প্রতাপে।
ভাবিল মনেতে তবে বীর ভীমসেন
‘কেমনে পালিব মম প্রতিজ্ঞা দারুণ;
যে প্রতিজ্ঞা কৈনু আমি সে দারুণ ক্ষণে,
অপমান কৈল যবে পাপিষ্ঠ দুর্ম্মতি,
দ্রৌপদী সতীরে লয়ে সভার মাঝারে।
পারে কি সহিতে কভু, হায়রে মানব,
রক্তমাংস দেহ ধরি এত অপমান
কি সাহস দুর্ম্মতির। বাঞ্ছিল মনেতে
বসাইতে ঊরুপরে সতী দ্রৌপদীরে!
প্রতিজ্ঞা করিনু আমি তখন(ই) মনেতে
ভঙ্গ করি উরুদ্বয় নাশিতে ইহারে।
প্রতিজ্ঞা পূরণকাল উপস্থিত এবে,
কর্ত্তব্য কি কার্য্য তাহা ভাবিয়া না পাই।
সুযোগ নাহিক হায়, লৈতে উপদেশ;
এখন ছাড়িলে আর না পা’ব সুযোগ।
অভিমত মাধবের ইহার বিনাশ;
কি ভয় অন্যেরে তবে, কোনবা কারণে।

নাশিলে অন্যায় রণে হাসিবেক লোক,
অপবাদ লোকলাজ নিতান্ত ঘটিবে:
সেইত ভাবনা হায়, কি করি উপায়?
ইহাও নিশ্চিত, তাহে নাহিক সংশয়
সত্যরক্ষা মানবের কর্ত্তব্য সর্ব্বথা।
প্রতিজ্ঞা করিয়া যেই না পালিতে পারে
পামর সেজন,— হায়, কাপুরুষ অতি।
প্রতিজ্ঞা আপন এবে নিশ্চয় পালিব,
যা ঘটে ঘটুক তাহে নাহি করি ভয়।
‘অথবা অন্তরযামী দেব যদুপতি;
যতেক ভাবনা মনে হ’তেছে উদয়
নাহি অবিদিত তাহা কিছুমাত্র তাঁর।
চাহি মুখ পানে তাঁর বুঝি মন ভাব;
মুখভাবে মনভাব অবশ্য বুঝিব।’
এতেক ভাবিয়া তবে বীর ভীমসেন
চাহিল কৃষ্ণের মুখে সতৃষ্ণনয়নে।
বুঝিল সম্মতি তাঁর সঙ্কেতে তাঁহার;
ঘুচিল ভাবনা তদা হৃষ্টচিত্ত হৈল।
চলিছে তুমুল রণ উভয় বীরেতে;
ঠন্ ঠন্ রবে হয় গদার আঘাৎ;

কাঁপিছে মেদিনী যেন উভয় দাপটে:
কেহ ঊন নহে উভে সমান বিক্রমে।
অবশেষে মহারাজ দুর্য্যোধন যবে,
এক লম্ফ দিয়া বীর উঠিল উর্দ্ধেতে,
গদাঘাত করিবারে ভীমের মস্তকে,
সুযোগ তখনি পেয়ে বীর ভীমসেন
হানিল আপন গদা তার ঊরুদ্বয়ে।
সে গদা প্রহারে হায়, মড় মড় রবে
ভাঙ্গিল উভয় ঊরু তখনি তাহার:
ঊরুভঙ্গে মহারাজ পড়িল ভূতলে।