দেওয়ানা/অষ্টম পরিচ্ছেদ

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে চলুন অনুসন্ধানে চলুন

অষ্টম পরিচ্ছেদ।

 মীর লতিফের পরিচয় আমরা পূর্ব্বেই একটু দিয়াছি। আনারের পিতার এক বন্ধুর পুত্র। বাল্য কাল হইতে পিতৃমাতৃহীন। মীর লতিফের মাতার দেহান্ত আগে হয়। মীর লতিফের পিতা, পত্নী বিয়োগের পর মাত্র দুই বৎসর জীবিত ছিলেন। তাঁহার মৃত্যু সময়ে যৎসামান্য কয়েকশত মুদ্রা, আর দশম বর্ষীয় বালক এই মার লতিফকে, তাঁহার বন্ধু জামাল খাঁর হস্তে সমর্পণ করিয়া যান। আর আনারের পিতা এই বন্ধু পুত্রকে সেই সময় হইতেই পুত্র নির্ব্বিশেষে পালন করিতেছেন।

 মীর লতিফ প্রথমে চিত্র-বিদ্যার দিকে খুবই ঝুঁকিয়াছিল। কিন্তু শেষ কি মনে বুঝিয়া, বাদশাহের সেনাদলে প্রবেশ করে। আর নানা বিষয়ে কার্য্য কুশলতা দেখাইয়া, বাদশাহের শরীর রক্ষী সেনা দলের একজন অধিনায়ক হইয়া পড়ে।

 এক সময়ে কোন শোভাযাত্রা উপলক্ষে, অসংখ্য জনস্রোতের মধ্যে, সম্রাট‍্পুত্র দারার অশ্বটী ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়া উঠে। সুলতান দারা শেকো, অনেক চেষ্টা করিয়াও অশ্বকে সংযত করিতে পারেন নাই। এই সময়ে এই মীর লতিফ নিজের জীবন বিপন্ন করিয়া শাহাজাদার প্রাণ রক্ষা করে। আর ইহার ফলেই, সে এই শাহাজাদা দারা শেকোর সুপারিসে, সেই একশতী মন্সবদারের পদ লাভ করে।

 বাদশাহের শরীর রক্ষী সেনাদলে প্রবেশ করার পর মীর লতিফ, তাহার পিতৃপ্রতিম জামাল খাঁর আশ্রয় ত্যাগ করিয়া বাদশাহী নিয়মানুযায়ী, ছাউনীতে আসিয়া বাস করিতে লাগিল।

 তাহা হইলেও, সুযোগ পাইলেই সে আনার উন্নিসার সহিত দেখা সাক্ষাৎ করিত। বহুক্ষণ থাকিয়া তাহার সঙ্গে গল্পগুজব করিত। তারপর নিজের ছাউনীতে চলিয়া আসিত।

 বাল্যকাল হইতে এক সঙ্গে খেলাধূলা ও বসবাস করার জন্য আনার ও মীরলতিফের মধ্যে বড়ই একটা প্রীতির ও স্নেহের বাঁধন পড়িয়াছিল। এইজন্য আনার কোথাও যখন মীর লতিফের গুণের প্রশংসা শুনিত, সে তখন আনন্দে অধীরা হইয়া উঠিত। আবার আনারউন্নিসার রূপের ও গুণের প্রশংসা লতিফের কাণে আসিলে, তাহার প্রাণটি যেন একটা আনন্দময় গর্ব্বে স্ফীত হইয়া পড়ত।

 আনারউন্নিসার মাতা যখন জীবিতা ছিলেন, তখন তিনি প্রায়ই তাঁহার স্বামীকে বলিতেন—“এই মীরলতিফকে আমি ছেলেবেলা হইকে মানুষ করিয়াছি। উহার উপর আমার পুত্রাধিক স্নেহ জন্মিয়াছে।’ অমন শান্ত, শিষ্ট, সত্যবাদী সরল প্রাণ, নির্দ্দোষ চরিত্র যুবক আমি খুব কমই দেখিয়াছি। আমার পুত্র নাই। ঐ এক মাত্র কন্যা। তুমি ঐ মীর লতিফের সহিত আমার আনারের বিবাহ দাও। আমাকে যে কালরোগে ধরিয়াছে, তাহাতে আমি যে বেশী দিন বাঁচিব, এরূপ সম্ভাবনা নাই। বিবাহটী হইলে, মরিবার পূর্ব্বে সুখে মরিতে পারি।”

 কিন্তু আনারের পিতা জামালখাঁ, মনে মনে একটা উচ্চ আশা পোষণ করিতেন। কেই বা তাহা না করে? তাঁহার কন্যার রূপের প্রশংসা চারিদিকে। আর এই সময়ে দুই এক জন বড় ওমরাহ্ ও ধনীর বাড়ী হইতে, আনারের বিবাহ সম্বন্ধ আসিতে লাগিল। সুতরাং জামাল খাঁ বড়লোকের দিকেই ঝুঁকিলেন।

 আনারের পিতা মনে মনে ভাবিলেন, যদি কোন বড় লোকের বাড়ীতে কোন কারণে আনারের বিবাহ না দিতে পারি, তখন মীর লতিফ ত আছেই। দেখাই যাক্ না, ভবিতব্য আমার কন্যার অদৃষ্টকে কোথায় লইয়া যায়।

 কিন্তু তিনি পত্নীকে প্রবুদ্ধ করিবার জন্য বলিলেন,— “মীর লতিফ এখন বাদশাহী সেনাদলে প্রবেশ করিয়াছে। এই সময়ে এই বিবাহটা ঘটাইলে, সে সংসারের মায়ায় বেশী আকৃষ্ট হইয়া পড়িবে। ঘরের ছেলে সে—সেত ঘরেই রহিল। এখন না হৌক, দুই মাস পরেই না হয় বিবাহটা হইবে।”

 আনারের মাতা স্বামীর মুখে এই কথা শুনিয়া আর কিছুই বলিতে সাহস করিতেন না। এইরূপে আশায় আশায় থাকিয়া, তিনি সেই সংকট রোগে দেহত্যাগ করিলেন।

 তারপর নবাব সুজা বেগের মাতা, তাঁহার একমাত্র পুত্রের সহিত, আনার উন্নিসার বিবাহ প্রস্তাব করিয়া, আত্মীয়তা আরম্ভ করিলেন। আর তিনিও তাঁহার মনের বাসনা পরিতৃপ্ত করিবার পূর্ব্বেই পরলোকের পথিক হইলেন।

 নবাব সুজা বেগের উচ্ছৃঙ্খল চরিত্রের কথা যে আনার উন্নিসা না জানিত, তাহা নয়। তাঁহার সমবয়স্কা প্রতিবেশিনীরা, পাছে আনার—বড়লোকের ঘরে পড়ে, এই হিংসায় জ্বলিয়া, আত্মীয়তার ভাণ দেখাইয়া, নবাব সুজা বেগের বিরূদ্ধে অনেক কথাই বলিত। অবশ্য সে সব কথা একেবারে ভিত্তিহীন নয়। এ সম্বন্ধে বাকী যে টুকু ছিল, বাহারবানু তাহাতে পূর্ণাহুতি দিয়া গিয়াছে। এই সব কারণে সে বাহিরে সুজা বেগকে তাঁহার ঊন্নত অবস্থার অনুরূপ সন্মান দেখাইলেও, অন্তরে অন্তরে তাহাকে সে যেন একটু অশ্রদ্ধা করিত।

 জুমেলি সংসারের কাজে ভারি ব্যস্ত। আনারউন্নিসা, তাহার কক্ষ মধ্যে বসিয়া এক দৃষ্টে আকাশের দিকে চাহিয়া, উদাস ভাবে কত কি ভাবিতেছে।

 আনার উন্নিস। তখন মনে মনে ভাবিতেছিল—“মহা সংঙ্কটে পড়িয়াছি যে আমি। বিশ্বাস করিয়া কাহারও নিকট মনোভাব প্রকাশ করিতে পারি না। ভয় হয়, পাছে কেউ উপহাস করে। একদিকে ঐশ্বর্য্য— অপর দিকে অভাব অনাটন। একদিকে নিষ্কলঙ্ক চরিত্র, যুক্ত প্রাণ, সুখে দুঃখে সমান সমবেদনার উপভোগী, স্নেহভরা হৃদয় মীর লতিফ— যার প্রাণের প্রত্যেক কথাটী প্রত্যেক প্রবৃত্তিটি, আমার অজানিত নয়। আর অপর দিকে, যাহাকে আমি সম্পূর্ণরূপে চিনি না,— যার হৃদয় কি উপাদানে গঠিত, তাও জানি না, যার চরিত্রবল নাই, চারিদিকে যাহার নৈতিক শিথিলতার শোচনীয় কাহিনী,—যে বাহার বানুর হস্তে ক্রীড়াপুত্তলী, তাহার করে আমার স্নেহময় পিতা, আমাকে সমর্পণ করিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হইয়াছেন।”

 “নিজের স্বাধীন মত, ব্যক্ত করিবার ইচ্ছা থাকিলেও, পাছে পিতা আমাকে প্রগলভা বলিয়া ভাবেন, অবাধ্য কন্যা বলিয়া অভিসম্পাত করেন, সেই ভয়ে পিতাকেও ত কিছুই বলিতে পারিতেছি না! হায়! আজ যদি আমার মা থাকিতেন?

 এমন সময়ে তাহার পিতা কক্ষ দ্বারে করাঘাত করিয়া ডাকিলেন,—“আনার!”

 পিতার কণ্ঠস্বর শুনিয়া, আনার ত্বরিতগতিতে উঠিয়া দ্বার খুলিয়া দিল। জামাল খাঁ, কক্ষের দরোজাটী উত্তমরূপে ভেজাইয়া দিয়া, কন্যা যে সোফার উপর বসিয়াছিল, তাহার উপর গিয়া বসিলেন।

 আনারউন্নিসা, দেখিল, তাহার পিতার মুখ শুষ্ক। তাহাতে যেন একটা দুশ্চিন্তাজনিত উত্তেজনার ভাব ফুটিয়া উঠিয়াছে।

 আনারউন্নিসা, পিতার সেই মলিন মুখ দেখিয়া বলিল,—“তোমার মুখখানি আজ অত শুক্‌নো কেন বাবা?”

 জামাল খাঁ একটী দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন—“যাহারা বয়স্থা কন্যার বিবাহ ব্যাপার লইয়া, একটা মহা সমস্যার মধ্যে পড়ে, আর তাহার একটা সূক্ষ্ম মীমাংসা করিতে না পারিয়া দিশাহারা, হইয়া যায়, তাহাদের অবস্থা ঠিক আমারই মত হইয়া উঠে।”

 আনার, সবিস্ময়ে পিতার মুখের দিকে বারেক মাত্র চাহিয়া, পিতার মনোভাব কতকটা অনুমানে বুঝিয়া বলিল,—“কিসের জন্য তুমি এত ভাবিতেছ পিতা?”

 জামাল খাঁ মলিন মুখে বলিলেন—“তোমার জন্যই ভাবিতেছি মা! তবে এবার খালি তোমার জন্য নয়, আমার নিজের জন্য কিছু বেশী মাত্রায় ভাবিতে হইয়াছে।”

 এই কথা বলিয়| জামাল খাঁ, একখানি পত্র আনারের হাতে দিয়া বলিলেন,—“এই পত্রখানি পড়িয়া দেখ, তাহা হইলে আমার মুখ কেন এত মলিন, তাহা আমি স্বমুখে কোন কিছু বলিবার পূর্ব্বেই তুমি বুঝিতে পারিবে।”

 আনার পত্রখানি আদ্যোপান্ত মনোযোগের সহিত পড়িল। পত্রপাঠ শেষ হইলে, তাহার সুন্দর মুখখানি যেন মেঘঢাকা চাঁদের মত মলিন হইয়া পড়িল।

 জামাল খাঁ কন্যার মুখের দিকে চাহিয়া বলিলেন—“কেন আমার মুখ এত চিন্তাপূর্ণ, তাহা এখন বুঝিলে কি?”

 আনার। খুব বুঝিয়াছি। কিন্তু বাবা!—

 জামাল। এর আর কিন্তু কি মা?

 আনার। কিন্তু দেখিতেছি, এই পত্র লেখকের হৃদয় অতি সংকীর্ণ, অতি অনুদার। আর তুমি এই প্রকৃতির লোককে, তোমার জামাতা বলিয়া স্বীকার করিতে ইচ্ছুক!

 জামাল। না করিলেও ত অন্য উপায় নাই। এক সময়ে নসিবের অনুগ্রহে, ঐশ্বর্য্য যথেষ্টই করিয়াছিলাম। আমিও একজন ছোট দরের আমির-ওমরাহ গোছ লোক ছিলাম। এখন বিরূপ নসীব সে ঐশ্বর্য্যের প্রায় সবই কাড়িয়া লইয়াছে। কিন্তু সমাজে সম্ভ্রম, ইজ্জতের মূল্য, কাড়িয়া লইতে পারে নাই। একদিন এই ইজ্জত বজায়ের জন্য, আমি রুকিনা বিবির শরণাপন্ন হইয়া ছিলাম। উহারা ঋণ দিয়া আমার ইজ্জত বজার রাখিয়াছিল। এখন আমার সেই ইজ্জত বিপন্ন। তুমি আমার বুদ্ধিমতী কন্যা। পুত্র একটা থাকিলে তাহাকে এরূপ স্থলে যাহা করিতে বলিতাম, তাহা তোমায় করিতে বলিতেছি। পারিবারিক সম্ভ্রম নষ্ট হওয়া, মৃত্যু যন্ত্রণার চেয়েও যে বেশী।  আনার। বলুন—আপনার মনের ইচ্ছা কি? আপনি যা করিতে বলিবেন, আমি তাহাই করিতে প্রস্তুত।  জামাল খাঁ, কন্যার মুখের দিকে একবার চাহিবমাত্রই বুঝিলেন, সে মুখে একটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞার ছায়া ফুটিয়া উঠিয়াছে। তিনি কম্পিতস্বরে বলিলেন,—“আমি তোমাকে কিছুই বলিব না। তুমিই আমাকে পরামর্শ দাও,এক্ষেত্রে আমি কি করিব? নবাবের এই কঠোর পত্রের অবজ্ঞাসূচক উত্তর কি করিয়া দিতে হয়, তাহা আমি জানি। কিন্তু যা লইয়া দর্প করিব, সে শক্তি ত আমার নাই! সুজা বেগ যদি নিরাশ হইয়া আমার নামে প্রাপ্য অর্থের জন্য কাজির দরবারে নালিশবন্দ হয়, তাহা হইলে ইজ্জত যে কেবল জন্মের মত যাইবে তাহা নয়, মাথা রাখিবার স্থানটুকু পর্য্যন্ত আমাদের থাকিবে না মা!”

 আনার উন্নিসা গভীর মনোযোগের সহিত পিতার কথাগুলি শুনিয়া বলিল,—“আপনি নবাবকে লিখিয়া পাঠান, এই সপ্তাহের মধ্যেই আপনি আমার বিবাহ দিতে প্রস্তুত। আর আমার বিবাহের কেবলমাত্র যৌতুক, ঐ ঋণপত্র।”

 কথাটা আনার উন্নিসা এতটা দৃঢ়তার সহিত বলিল, যে তাহা বলিতে তাহার স্বর একটুও কাঁপিল না, তাহার মুখ ভাবের কোন পরিবর্ত্তনই হইল না।

 জামাল খাঁ, কন্যার মুখে এই কথা শুনিয়া খুবই তৃপ্ত হইলেন। এই কথা গুলি বলিবার সময়, আনার উন্নিসার মনে একটা মহ। ঝড় উঠিতেছিল। কিন্তু নারীর স্বভাবসিদ্ধ সহিষ্ণুতার প্রচণ্ড শক্তির সহায়তায়, সে সেই মহা ঝড়টাকে এমন ভাবে চাপিয়া রাখিয়া পিতাকে তাহার মনের কথাগুলি বলিয়াছিল, যে জামাল খাঁ সেই কথা গুলিকেই, তাঁহার কন্যার মনের প্রকৃত ভাব মনে করিয়া, প্রফুল্ল মুখে তাহার কক্ষত্যাগ করিয়া চলিয়া গেলেন।

 চেষ্টা করিয়া আনারউন্নিসা তাহার পিতার সম্মুখে হৃদয়ে উত্থিত প্রচণ্ড ঝটিকাবেগকে অনেকটা প্রশমিত করিয়াছিল বটে, কিন্তু রাত্রের নির্জ্জনতার অবসরে সেই ঝটিকা আবার বলসঞ্চয় করিল। সে দিন, কোন বিশেষ কারণে জুমিলা সে বাড়ীতে ছিল না। কাজেই সমস্ত রাত্রিটা প্রাণ খুলিয়া কাঁদিয়া সে তাহার বুকের বোঝাটা খুবই হাল্কা করিয়া লইল। আর রাত্রের মধ্যেই সে সংস্কল্প স্থির করিল, মীর লতিফের কাল তো আসিবার কথা আছে। সে আসিলে, আমার সহিত তাহার ভালবাসার দেনা পাওনা নিকাশের কর্তব্য যাহা—তাহাই করিব।