বিষয়বস্তুতে চলুন

নজরুলকে যেমন দেখেছি (১৯৫৮)/তরুণ সমাজে নজরুল

উইকিসংকলন থেকে

তরুণ সমাজে নজরুল[]

 আমার সামনে যে ছাত্র সমাজকে দেখতে পাচ্ছি, যাঁরা নজরুলকে স্মরণ ক’রে মিলিত হয়েছেন, তাঁদের দেখে মনে পড়ছে বছর পঁচিশ আগেকার আর এক তরুণ ছাত্র-সমাজকে, যাদের মাঝখানে ছিলেন নজরুল। ভাই তখন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ডাক্তারী পড়ার পালা সাঙ্গ করে চট্টগ্রাম কলেজে বি. এ. ক্লাসে ভর্তি হয়েছেন। তাঁর উৎসাহে বছর তিনেকের মধ্যে আমরা দু’বার পেয়েছিলাম কবিকে চট্টগ্রামে আমাদের বাড়ীতে।

 চট্টগ্রামে তিনি বিপুল জনসমাবেশে বক্তৃতা করেছেন, বিশিষ্ট জননেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছেন; বড় বড় লোকদের কাছে প্রচুর সম্মান পেয়েছেন হয়তো কিন্তু তরুণদের তিনি ভালবাসতেন সবচেয়ে বেশী।

 বেশী ক’রে তাদের নিয়েই ছিল তাঁর কারবার। বেশীর ভাগ সময়েই তাঁকে দেখেছি ছাত্রদের নিয়ে মেতে থাকতে। ছেলেরা কেউ ভাল গাইতেন, কেউ নাম করা খেলোয়াড়, হয়তো বা কেউ পালোয়ান হবার জন্যে করছেন কসরত অথবা তাক লাগাচ্ছেন ক্যারিকেচার দিয়ে; কেউ রাজনীতিতে ঝুঁকেছেন, আর কেউ বা সাহিত্য সাধনার পথে পা বাড়াচ্ছেন। সকল দলের ছেলেরাই আসতেন কবির কাছে প্রেরণার জন্যে, পথের ইশারার জন্যে। কেউ তাঁকে বলতেন ‘কবিদা’, কেউ ‘কাজিদা’ আর কেউ বা ‘নূরুদা’। সকাল থেকে রাত বারোটা পর্যন্ত সব সময় যেন পালা ক’রে এঁরা কবিকে ঘিরে থাকতেন। কোনদিন কবি জনসভায় বক্তৃতা করবেন, হয়তো কোনদিন চট্টগ্রামে জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রাচীন এডুকেশন সোসাইটির বার্ষিক উৎসবের উদ্বোধন করবেন, কোনদিন বা খানবাহাদুর আবদুল আজিজের সমাধিতে শ্রদ্ধানিবেদন করবেন অথবা স্বরচিত কবিতা পাঠ করবেন কবি নবীনচন্দ্রের স্মৃতি বার্ষিকা সভায়; আবার কোনদিন বা সব ছেড়ে ছুড়ে বেরিয়ে পড়বেন সমুদ্রে বা বনে-জঙ্গলে, পাহাড়ে-পর্বতে; প্রকৃতির সঙ্গে হবে মুখোমুখি আলাপ। বিভিন্ন দিনে পোষাকের ঢঙে একটু তফাত। কখনো পরনে ধুতি, গায়ে নিমা ও চাদর, মাথায় কিস্তি টুপি; কখনো পায়জামা, পাঞ্জাবি, মাথায় একখানা কাপড় পাগড়ার ঢঙে জড়ানো। আগাগোড়া সবই মোটা খদ্দর।

 বাড়ী থেকে বেরিয়ে যাবার সময় আমরা বাড়ীর মেয়েরা তাকিয়ে দেখতাম, কবি চলেছেন আর তাঁকে ঘিরে চলেছে ছাত্রের দল। তখন অত-শত বুঝতাম না, কিন্তু আজ বুঝি তিল তিল ক’রে এঁরা কবির কাছ থেকে পাথেয় সংগ্রহ করেছেন ভবিষ্যৎ জীবনের জন্যে। দেশের যুবসমাজকে তিনি নতুন জগতের, নতুন জীবনের স্বপ্নের নেশায় মাতিয়ে তুলেছিলেন; শিল্পীর নৈপুণ্য দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন তাঁদের এক নতুন আদর্শের প্রেরণায়।

 আমার মাতামহের মৃত্যুর মাত্র কয়েকমাস পর, বাড়ীতে বিষাদের আবহাওয়া তখনো সম্পূর্ণ কাটেনি। এই সময়ে কবির আবির্ভাব যেন একটা জোয়ারের মত নেমে এসেছিল আমাদের পরিবারের মধ্যে। আমাদের বাড়ীতে কবি যে অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন তাতে আয়োজন আড়ম্বর হয়তো ছিল না, তবে তাতে অভাব ছিল না আন্তরিকতার। কিন্তু কবিচিত্ত কি কোনদিন আড়ম্বর ও ঐশ্বর্যের লোলুপ? চট্টগ্রাম থেকে কলিকাতায় ফিরে গিয়ে তিনি আমাকে লিখেছিলেন ‘অর্থ দিয়ে মাড়োয়ারী, জমিদার, মহাজন কিংবা ভিখারীকে হয়তো খুশী করা যায়, কবিকে খুশী করা যায় না। কবিকে খুশী করতে হয় অমূল্য ফুলের সওগাত দিয়ে। সে সওগাত তোমরা দিয়েছ আমার অঞ্জলি পুরে।’ সত্যি সে ফুলের সওগাত তিনি পেয়েছিলেন চট্টগ্রামে অজস্র।

 সমুদ্র সৈকত বা সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে-জঙ্গলে, লোকালয়ের বাইরে তরুণদের মাঝখানে তোলা কবির বিস্তর ফটো আমাদের ঘরে জমা হয়েছিল। কোনটাতে কবি সদলবলে সমুদ্র-স্নানে মেতেছেন, আর কোনটাতে সাম্পানে চড়ে ভেসে পড়েছেন নীল সাগরে। আবার কোথাও সমুদ্রের নির্জন বালুচরে গা এলিয়ে দিয়েছেন বাধাবন্ধন-মুক্ত একদল যুবক, মাথার ওপরে খোলা আকাশ, পায়ের তলায় আছড়াচ্ছে অশান্ত সমুদ্র, মধ্যস্থলে অর্ধশয়ান অবস্থায় কবি কি যেন স্বপ্নে বিভোর; অথবা দুর্গম পাহাড়ের কোলে ঝরণার ধারে বড় বড় গাছের ঝুলে পড়া মোটা শিকড় আঁকড়ে আড্ডা জমাচ্ছেন যুবকদল, মাঝখানে তাদের দলপতি—জমকালো চেহারা এবং শরীর, মাথায় ঝাঁকড়া চুল। ছবিতে দেখে ভারি অদ্ভুত লাগত, কি যেন এক রহস্যপূর্ণ পরিবেশের মধ্যে ডুবে যেত মন। কলকাতায় ফিরে গিয়ে কবি চিঠিতে এরই একটা ছবির কথা উল্লেখ ক’রে লিখেছিলেন— ‘আমার সেই ছবিখানা পাঠিয়ে দিও—যাতে ঝর্ণা ধোয়ায় পা।’

 বাড়ীতে অপেক্ষা ক’রে থাকতাম আমরা মেয়েরা—দাদু, আম্মা ও আমি। কবি ও তাঁর দলবলের খাবার ঢাকা দেওয়া থাকত। রাত বারোটা-একটার সময় কবি বাড়ী ফিরতেন সঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে হৈ-হুল্লোড় ক’রে। চট্টগ্রামের বর্তমান আবদুল আজিজ রোডের একপ্রান্তে আমাদের নিরালা বাড়ীর ওপরে নিশীথ আকাশের এক টুকরো সেই উদ্দাম প্রাণ চাঞ্চল্যে উচ্চকিত হয়ে উঠত। চট্টগ্রাম ছাড়বার পর কবি কৌতুক ক’রে দাদুর কথা লিখেছিলেন চিঠিতে—‘আশা করি নানীআম্মার কান্নার কোলে এতদিনে ভাটি পড়ল।’ কবিকে বিদায় দিয়ে বাড়ীটা সত্যিই কেমন যেন মুষড়ে পড়েছিল।

 যেদিন বাইরে কোন প্রোগ্রাম থাকত না, সেদিন বাড়ীতেই মজলিস চলতে থাকত সারাদিন। জননেতা, সাহিত্যিক, সাহিত্যামোদী এবং ছাত্র সমাজ সকলে মিলে মজলিস জমজমাট হয়ে উঠত। গল্প-গুজব সাহিত্য আলোচনা, হাত দেখা, পান খাওয়া, গান গাওয়া সবই চলতে থাকত সমানে।

 ভাইয়ের ও আমার হাত গণনার ফলাফল তিনি পৃথকভাবে লিখে দিয়েছিলেন। রহস্যের যবনিকা সরিয়ে ভবিষ্যতের গর্ভে আলোকপাত ভারি মজার মনে হ’ত। তাছাড়া জ্যোতিষী হচ্ছেন স্বয়ং কবি। মনে আছে, গভীর আগ্রহে ও ঐকান্তিক বিশ্বাসে জিজ্ঞেস করতাম—‘দেখুন তো, কতখানি পড়াশোনা লেখা আছে হাতে। উচ্চশিক্ষার জন্যে বিলেত যাওয়া কপালে অর্থাৎ হাতে লেখা আছে নাকি।’ জ্যোতিষী-কবির রচিত আমার সেই দীর্ঘ ভাগ্য-লিপিতে তিনি বার কয়েক লিখেছিলেন...স্বাস্থ্যভঙ্গ... প্রাণ নিয়ে টানাটানি...প্রিয়জন বিয়োগ...সব শেষে লিখেছিলেন, স্নেহ-মমতার অভাব হবে না কোনদিন। আর একটা কথা লেখা ছিল— 'Partial Satisfaction of ambition—উচ্চাকাঙ্ক্ষা কেবলমাত্র আংশিকভাবে পূর্ণ হবে। আজ মনে হয়, সত্যিই তো; মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কি কোন নির্দিষ্ট সীমা আছে? শিক্ষা ক্ষেত্রে ও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে নিজের জীবনে ও সমাজে কতই না অসম্ভব আশা, সম্ভবের দেশে পক্ষ বিস্তার করল, বাধার বিন্ধ্যাচল ঠেলে কত আকাঙ্ক্ষাই না বাস্তবে রূপ লাভ করল।

 কিন্তু তাও তো কত বাকি। আদর্শে পৌঁছাতে বহু বিলম্ব। লক্ষ্য যে আজও অনেক দূরে, উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হ’ল কেবল আংশিকভাবেই তো। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কত আকাঙ্ক্ষাই থেকে যাবে অপূর্ণ, যা’ পূর্ণতা লাভ করবে পরবর্তী যাত্রীদের জীবনে অনাগত ভবিষ্যতে।

‘যে ফুল না ফুটিতে, ঝরিল ধরণীতে
যে নদী মরুপথে হারাল ধারা—
জানি হে জানি, তাও হয়নি হারা।’

 এই বুঝি হবে সে-দিনের সান্ত্বনা।

 কি বলছিলাম? কবিকে দেখবার ও তাঁর গান শুনবার আকর্ষণে বাড়ীতে বাইরের মেয়েদেরও সমাগম হ’ত মাঝে মাঝে। কবিকে সেদিন তাঁদেরই ফরমায়েশ অনুযায়ী গান গাইতে হ’ত। গান গাওয়া ছাড়া গান শেখানোর ব্যাপারেও কবির উৎসাহ কম ছিল না। ভিড় কম থাকলেই গান শেখাতেন।

 আমাদের পড়ার ঘরে বসে, দিনের পর দিন গভীর দরদের সঙ্গে আমার মহীদা’কে শিখিয়েছিলেন বহু গান। ‘কে বিদেশী বন উদাসী, ‘চেয়োনা সুনয়নে,’ ‘রুমুঝুমু রুমুঝুম্ কে এলে নূপুর পায়,’ ‘বাজলো কিরে ভোরের সানাই,' ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ ইত্যাদি।

 আরও শিখিয়েছিলেন কয়েকটা রবীন্দ্র-সংগীত ‘অগ্নিশিখা, এস এস’, ‘আজি দখিন দুয়ার খোলা’, ‘আজি মর্মর ধ্বনি কেন জাগিল রে,’ ‘হে ক্ষণিকের অতিথি।’ দ্বিতীয়বার চট্টগ্রাম যাবার আগে আমাকে চিঠিতে লিখেছিলেন—‘চিঠি লিখছি আর গাইছি নতুন শেখা গানের দুটো চরণ—

‘হে ক্ষণিকের অতিথি, এলে প্রভাতে কারে চাহিয়া
ঝরা শেফালির পথ বাহিয়া।
কোন্ অমরার বিরহিণীরে চাহনি ফিরে,
কার বিষাদের শিশির নীরে এলে নাহিয়া।’

 কবির আসা ঐ ঝরা শেফালির পথ বেয়ে আসা। কোন্ বিষাদের শিশির জলে নেয়ে আসে সে, তা’ সে জানে না। তার নিজের কাছেই সে একটা বিপুল রহস্য।’

 ...এর পরে কেটে গেছে আরও বছর দশেক। এই দীর্ঘকাল বিভিন্ন উপলক্ষে কবিকে দেখেছি কলকাতায়। কৃষ্ণনগরের পর তিনি কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। ইতিমধ্যে মোড় ঘুরে যায় তাঁর কাব্য প্রবাহ এবং নানা ঘটনা বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেন তিনি শেষ মর্মান্তিক পরিণতির দিকে। জীবনে এবং সমাজে এক অভিনব বিপ্লবের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলি আমরাও।

 যখন প্রথম তাঁর অসুস্থতার লক্ষণ দেখা যায়, তখন আমি কলকাতা লেডি ব্রেবোর্ণ কলেজে অধ্যাপনার কাজে আছি। আমার ছাত্রীরা প্রায়ই কবিকে দেখবার জন্যে আগ্রহ প্রকাশ করত। তখন তিনি ক্রমেই সংবিৎ হারাচ্ছেন। একবার তাদের কয়েকজন মিলে তাঁকে দেখতে গিয়েছিল তাঁর বাসায়। ফিরে এসে বলল: ‘কবিকে দেখলাম আপা। কথাবার্তা মাঝে মাঝে কিছু অসংলগ্ন; আপনার নাম করছিলেন এক-একবার। বললেন, নাহার কেমন আছে?’

 সাক্ষাতের সময় ছাত্রীদের মধ্যে একজন তার অটোগ্রাফের খাতা খুলে ধরেছিল কবির সামনে। কবি তাতে লিখে দেন সুন্দর চার লাইন কবিতা—জাগ্রত নারী শক্তির অপূর্ব প্রশস্তি গান। সৃষ্টির উৎস তাঁর একেবারে রুদ্ধ হয়নি তখনো। কবিতা ক’লাইন আমি নিজের জন্যে লিখে নিয়েছিলাম। বহু বৎসর পরে এই সেদিন আমার সেই ছাত্রীটি কথাপ্রসঙ্গে বলছিল— কবির অমন চমৎকার কবিতাখানা নিজের অসতর্কতার জন্যে হারিয়ে ফেলেছে সে। এই সেই কবিতা—

‘আঁধার হেরেমে তোমরা দিব্য দীপ্তি সঞ্চারিকা
রোজা অবসানে খুশীর ঈদের হেলালের ললাটিকা
ফিরদৌসের গুলরুখ এলে শিশির-নেকাব খুলি
এতদিনে শিশ-মহলের দ্বার খুলিয়াছে বুলবুলি
আনন্দ-প্রজাপতি এলে মেলি চিত্রাঞ্চল পাখা
নূতন আকাশ দেখিলাম আমি নব রামধনু আঁকা।’
২০।৯।৪১   নজরুল ইস্‌লাম

 আমার আরেক ছাত্রীর[] খাতায় তিনি লিখেছিলেন—

‘তোমরা সকলে পুষ্পাঞ্জলির মত দেখতে সুন্দর
তোমরা আনন্দিতা হও, হও মনোহর।
তোমরা আমাদের মাঝে মাঝে দেখতে এসো,
তোমরা আমাদের পরমাত্মীয়ের মত ভালবেসো।’

 এর পরে নজরুল একেবারেই জ্ঞান হারান ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলনের সময়।

 এখানে একটা কথা বলে নিই। চট্টগ্রাম ও কলকাতায় দীর্ঘকাল কবির সঙ্গে পারিবারিক ঘনিষ্ঠ পরিচয় ও মমতার সম্পর্ক সত্ত্বেও আমি কখনো তাঁর সামনে বেরুইনি। এমন কি হাত দেখানো ব্যাপারটাও সারতে হয়েছে আড়াল থেকে। আমাদের জীবনে প্রতিপদে অস্বাভাবিক গোঁজামিলের অভাব ছিল না সেকালে। কিন্তু পর্দার এপার ওপার পুরুষ শিক্ষকের কাছে পড়া তৈরি করতে, এলজেব্রা, জিয়োমেটি, কষতে যাদের আটকায় নি—আড়াল থেকে হাত দেখাতে সে মেয়েদের অসুবিধে কি?

 নজরুলের ‘নারী’ কবিতায় আছে—

‘আপনারে আজ প্রকাশের তব নাই সেই ব্যাকুলতা,
আজ তুমি ভীরু, আড়ালে থাকিয়া নেপথ্যে কও কথা।
চোখে চোখে আজ চাহিতে পারনা, হাতে রুলি পায়ে মল।
মাথার ঘোমটা ছিঁড়ে ফেল নারী, ভেঙ্গে ফেল ও শিকল।’

 বোধহয় আমি সর্বপ্রথম তাঁর সামনে বেরুই ভবানীপুরের বাসায়। বহুকাল আগে তাঁর চট্টগ্রাম সফরের পরে তিনি আমাকে লিখেছিলেন—তুমি আমার সামনে বেরুতে পারনি বলে কিছু মনে ক’রো না। আমি তোমাকে দেখেছি এবং দেখতে চাই লেখার মধ্য দিয়ে, সেই হ’ল সত্যিকারের দেখা। মানুষ দেখার কৌতূহল আমার নেই। স্রষ্টাকে দেখার সাধনা আমার, সুন্দরকে দেখার তপস্যা আমার।... সৃষ্টির মাঝে স্রষ্টাকে যে দেখছে, সেই দেখেছে সত্যিকারের দেখা। এ দেখা আর্টিষ্টের দেখা, ধেয়ানীর দেখা, তপস্বীর দেখা।

 পেছনে ফেলে আসা দিনের কথা যখন মনে পড়ে, দেখতে পাই কবিদা’র স্মৃতিতে আজও জমজমাট হয়ে আছে মনের একটা কোণ।

 আমার সামনে এই ছাত্রসমাজকে দেখছি, আর বারে বারে ফিরে ফিরে যাচ্ছি পঁচিশ বছর আগেকার সেই চট্টগ্রামের শৈলচ্ছায়ায়। নিমেষে বিহঙ্গের মত মন উড়ে যাচ্ছে আমাদের পুরোনো চট্টগ্রামের বাড়ীতে, যেখানে গানের পাখী নজরুল একদিন বাসা বেঁধেছিলেন কয়েকদিনের জন্যে। আজ আর সেই নজরুল নেই—নেই সেদিনের সেই চট্টগ্রাম। আর নেই যাঁরা ছিলেন আশেপাশে—আম্মা, খালাআম্মা, দাদু, দিদারুল আলম...। সেদিন আরও ছিলেন এক তরুণ সমাজ, যাঁদের সাহচর্যের আনন্দে কবির সৃষ্টি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিল। আমার স্মৃতির পাতায় সেদিনের ছবি আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে, হয়তো মলিন হবে না জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। চোখের সামনে আজও আমি দেখতে পাচ্ছি, তাঁর আসন পাতা রয়েছে তোমাদের মাঝখানে। হয়তো বাস্তবে সে আসন আজ শূন্য। কিন্তু হলে কি হবে? তিনি যে মিশে রয়েছেন তোমাদের প্রত্যেকের মর্মে; তিনি দখল ক’রে আছেন তোমাদের হৃদয়ের আসন।

 নজরুল আজ আমাদের মাঝে থেকেও নেই। যে উদ্দাম প্রাণশক্তির বন্যায় তিনি একদিন এই দেশকে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন, যুগ যুগ ধরে তা’ সঞ্চারিত হোক প্রাণ হতে প্রাণে, তাঁর কাব্যের ভেতর দিয়ে। স্বাধীনতার শুভ প্রভাতে আজ আমরা কৃতজ্ঞ চিত্তে তাঁকে স্মরণ করি। যুগে যুগে তিনি চির তারুণ্যের প্রতীক হয়ে থাকবেন মানুষের মনে। আজ এই নবীন রাষ্ট্রকে গড়ে তোলার দায়িত্ব পড়েছে আমাদের ওপর। নূতন সৃষ্টির কাজে আত্মনিয়োগ করতে গিয়ে আজ আমরা নজরুলের সুরেই সুর মেলাই—

‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে
মোর বুক হাসে, মোর চোখ হাসে
মোর ডগমগিয়ে খুন হাসে
আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।’

 দেশ ও জাতির পরম দুর্দিনে নজরুল শুনিয়েছিলেন আশার বাণী—

‘ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায় ভারতের দিবাকর
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পুনর্বার।’

 রক্তে রেঙে স্বাধীনতার সূর্য আজ সত্যি উঠেছে; কিন্তু তাঁর আদর্শ বাস্তবে সম্পূর্ণ রূপায়িত হয়নি। কবে সেদিন আসবে, যেদিন আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রের মূলমন্ত্র হবে বঞ্চিতের অধিকার।

 সারা দুনিয়ার লাঞ্ছিত ও বঞ্চিতের হাহাকার বাসা বেঁধেছিল নজরুলের কাব্য এবং জীবনে। সেদিন আসবে কবে, যেদিন শুধু আমাদের এই নতুন রাষ্ট্রে নয়, সারা জগতে—

‘উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না।’

কবে সেদিন আসবে? প্রতিধ্বনি বলছে-‘কবে?’

 তরুণদের ভালবাসতেন নজরুল। তিনি ছাত্রসমাজের কণ্ঠে ভাষা যুগিয়েছিলেন একদিন—

‘আমরা ছাত্রদল
মোদের পায়ের তলায় মূর্ছে তুফান
ঊর্ধ্বে বিমান ঝড় বাদল।’

 আজ তোমরা ঝড়বাদল অগ্রাহ্য ক’রে এগিয়ে চল, তোমাদের সমাজকে গড়ে তোল; দেশকে সুন্দর ও জাতিকে গৌরবান্বিত কর; বিদ্রোহী কবির মানবতার আদর্শকে বাস্তবে রূপায়িত করবার সাধনা কর; কবিকে যে একদিন আমরা পেয়েছিলাম আমাদের মধ্যে তবেই তা’ হবে সার্থক।

  1. ঢাকা ফজলুল হক মুশলিম হলের ছাত্র সমাবেশে সভানেত্রীর ভাষণ (সাল ১৯৪৮)।
  2. এখন মিসেস হাজেরা মাহমুদ আলী।