বিষয়বস্তুতে চলুন

নজরুলকে যেমন দেখেছি (১৯৫৮)/নজরুলকে যেমন দেখেছি

উইকিসংকলন থেকে

নজরুলকে যেমন দেখেছি

 প্রথম মহাযুদ্ধ ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। মাঝখানে একটা যুগ; বেশীদিন নয়, বছর কুড়ি-পঁচিশ। বাংলার মুসলমানের জাতীয় জীবনে এটা একটা বিশেষ স্মরণীয় যুগ। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে জাতির জীবনে যে ক্ষীণ চেতনার সঞ্চার হয়েছিল, এ যুগে তা যেন হঠাৎ জোয়ারের মত ভেঙে পড়ল। বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামকে আশ্রয় ক’রেই মুখ্যতঃ এসেছিল এই জোয়ার। নজরুলের আবির্ভাব অস্বাভাবিক না হ’লেও অত্যন্ত আকস্মিক। তাঁর আগুন-ঝরা লেখা হঠাৎ চমক লাগাল বাঙালী পাঠক-সমাজের মনে। কে এই সৈনিক কবি?—‘ভার্দুন ট্রেঞ্চ, ফ্রান্স,··· আগুনের মধ্যে সাঁতরে বেড়াচ্ছি—পায়ের নীচে দশ-বিশটা মড়া, মাথার ওপর উড়ো জাহাজ থেকে বোমা ফাটছে—দুম দুম দুম; সামনে বিশ হাত দূরে বড় বড় গোলা ফাটছে গুড়ুম গুড়ুম; পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে রাইফেল আর মেশিনগানের গুলি—শোঁ শোঁ শোঁ; এই সাতটা দিন মনের কথাগুলো খাতার পাতাগুলোকে জানাতে না পেরে জানটাকে কি ব্যতিব্যস্ত ক’রে তুলেছিল।’...রবীন্দ্রনাথের লেখনীতে বাঙালীর বর্ণনা মোলায়েম, ব্যঙ্গ-মেশানো—

‘ভদ্র মোরা, শান্ত বড়ো
পোষমানা এ প্রাণ
বোতাম-আঁটা জামার নীচে,
শান্তিতে শয়ান।’

 এ হেন বাঙালীর এ কি নতুন অভিজ্ঞতা ও নতুন অনুভূতির বর্ণনা দিচ্ছেন সৈনিক কবি! সত্যি বাংলা সাহিত্যে নতুন কিছু।

 সৈনিক-কবি হাবিলদার কাজী নজরুল ইসলামের চমকপ্রদ লেখা প্রায়ই দেখা যেতে লাগল মাসিক পত্রিকার পাতায়। বাঙালীর মনে ধাক্কা লাগাল তাঁর মর্মভেদী সুর:—

‘বৃথা ভীরু সমঝায়, রণ দুর্মদ রণ চায়
‘ওরে আয়,’

 এভাবে নজরুলের সঙ্গে প্রথম পরিচয় প্রায় সকলের যেমন, আমারও তেমনি মাসিক পত্রিকার ভেতর দিয়ে। অতশত বোঝবার মত বয়স তখন হয় নি, বুঝতামও না; কিন্তু বিদ্রোহী কবির ‘রণভেরী’ শুনে মন উতলা হ’ত।

‘ওই মহা সিন্ধুর ওপার হতে ঘন রণভেরী শোনা যায়,
ওরে আয়’

 এই মর্মভেদী ডাক বাল্যে মনকে কি এক অজানা ব্যথার উদ্বেগে উতলা ক’রে তুলত।

 মহাযুদ্ধের শেষে ফিরে এলেন নজরুল। তাঁর রচনা তখন পুরোদমে চলেছে, আর আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে বাঙালী পাঠক-সমাজের মনে। ‘মোসলেম ভারতে’ মাসের পর মাস বেরুতে লাগল তাঁর বিখ্যাত কবিতাগুলি। বাঙালীর ঘরে ঘরে ধ্বনিত হ’ল—

‘বল বীর—
বল উন্নত মম শির!’

... ... ...

‘ঐ ক্ষেপেছে পাগলী মায়ের

দামাল ছেলে কামাল ভাই!’

 পর পর এসব কবিতা শব্দের ঝঙ্কারে, ছন্দের বৈচিত্র্যে বিষয়বস্তুর অভিনবত্বে আমাদের প্রাণ মাতিয়ে তুলেছে—রক্তকে করেছে চঞ্চল।

 যুদ্ধ-ফেরতা নজরুলের যখন প্রথম আবির্ভাব হ’ল কলকাতায়, আমার স্বামী ঐ সময় কলিকাতা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। তখনকার কথা পরে তাঁর মুখে যেমন গল্প শুনেছি, ঠিক তেমনি বলছি। তিনি বলেছেন—‘মেডিক্যাল কলেজের সামনে ৩২নং কলেজ স্ট্রীটে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার আপিসে একটা রিডিং রুম ছিল। আমি সেখানে গিয়ে প্রায়ই পড়াশোনা করতাম। একদিন অভ্যাসমত রিডিং রুমে বসে পড়ছি। লোকজন বেশী নেই, শুধু ভেতরের ঘরে বসে আছেন সাহিত্য সমিতির সেক্রেটারী, আরও জন দুই লোক। এমন সময় সৈনিক কবি হাবিলদার কাজী নজরুল ইস্‌লাম ঝড়ের মত এসে ঢুকলেন সেখানে। বাংলা সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাব অনুভূত হচ্ছে তার আগে থেকেই, ঘরে ঢুকবার সঙ্গে সঙ্গেই হাসি ও গল্পের তোড়ে ছোট্ট আপিসখানা কাঁপিয়ে তুললেন তিনি।

 আমার আর পড়াশোনা হ’ল না সেদিন। চুপচাপ একপাশে বসে দেখছি। তারপর তিনি আরম্ভ করলেন কবিতা আবৃত্তি। বোঝা গেল, তিনি নতুন কবিতা লিখেছেন, আর তাই সাহিত্যিক বন্ধুদের শোনাবার জন্যে ছুটে এসেছেন। তিনি আবৃত্তি ক’রে চললেন:

‘বল বীর
বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!’

 নতুন লেখা ‘বিদ্রোহী’ কবিতাখানি একটানা সম্পূর্ণ আবৃত্তি ক’রে তিনি থামলেন। আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে ভাবছি, কি অদ্ভুত লোক, কি অভিনব কবিতা, আর কি চমৎকার আবৃত্তির ভঙ্গী! কিছুদিন পরে দেখলাম, যে কবিতাটি আমি বঙ্গীয় মুসলমান পত্রিকার আপিসে বসে অবাক হয়ে শুনেছিলাম— সেই ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সারা বাংলা দেশে এক মহা তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।’

 এল অসহযোগ আন্দোলন। আজাদীর আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন বিদ্রোহী নজরুল। প্রবন্ধ, কবিতা, গান ও বক্তৃতার ভেতর দিয়ে তিনি পরাধীনতার মর্মজ্বালা ছড়ালেন দেশময়! শুধু তাই নয়! তিনি এগিয়ে এলেন পুরোভাগে, পরলেন শৃঙ্খল। বিদেশী শাসনের আইন অমান্য ক’রে কয়েকবার তিনি কারাবরণ করলেন। সাম্রাজ্যবাদের ভ্রূকুটিকে অগ্রাহ্য ক’রে বললেন:—

‘তোদের চক্ষু যতই রক্ত হবে,
মোদের চক্ষু ততই ফুটবে।’

 যেখানেই গেছেন, যে-কাজেই হাত দিয়েছেন, ঝরেছে তাঁর উপচে-পড়া প্রাণের প্রাচুর্য। তাঁর প্রচণ্ড প্রাণশক্তি দিয়ে তিনি সজীব ক’রে তুলেছেন চারদিক। জেলখানার ভেতরে বসে তিনি গান রচনা করতেন, গাইতেন, আর দল গড়তেন। আশেপাশে এসে জুটতেন ঘরছাড়া রাজনৈতিক বন্দীর দল। তাঁদের হাত-পায়ের শিকল ঝনঝনিয়ে বাজত। নজরুলের সুরে সুর মিলিয়ে তাঁরা গাইতেন:—

‘শিকল পরা ছল মোদের
এ শিকল পরা ছল
এই শিকল প’রেই শিকল তোদের
করব রে বিকল।’

 এইভাবে কয়েদখানার আবহাওয়াকে কি ক’রে তাঁরা উতরোল ক’রে তুলতেন, অতিষ্ঠ ক’রে তুলতেন জেল কর্তৃপক্ষকে—এসব গল্প আমরা নজরুলের নিজের মুখে শুনেছি। তাঁর চট্টগ্রাম সফরের কথা বলছি। দাদা চট্টগ্রামের ছাত্রদলকে, তরুণ সমাজকে মাতিয়ে তুললেন, ‘নজরুলকে চট্টগ্রামে আনা চাই।’ ফলে ১৯২৬ থেকে ১৯২৯ এই বছর তিনকের মধ্যে নজরুলকে দু’বার আমরা চট্টগ্রামে পেয়েছিলাম আমাদের বাড়ীতে।

 আমাদের দাওয়াত তিনি কবুল করেছিলেন খুশী হয়ে। যে ডাক প্রাণের ডাক, সে ডাকে তাঁর স্নেহ-কাঙাল মন সাড়া দিয়েছে চিরকালই। তাছাড়া অলক্ষ্যে চট্টগ্রামের নদীগিরিবন যে দাওয়াত পাঠিয়েছিল তাও বড় কম লোভনীয় ছিল না তাঁর কবি-চিত্তের কাছে। কবির থাকবার ব্যবস্থা হয়েছিল আমাদের বাড়ীতে। এ ব্যাপারে আমার আম্মা ও নানীআম্মার আগ্রহও বড় কম ছিল না।

 যে ক’দিন তিনি ছিলেন, শুধু চট্টগ্রাম শহরটাই যে সভাসমিতিতে বক্তৃতায়, গানে, আবৃত্তিতে গুলজার হয়ে থাকত তা’নয়, চট্টগ্রামের পার্বত্য প্রকৃতি, চট্টগ্রামের নদীগিরিবন সমুদ্র পর্যন্ত যেন উতরোল হয়ে উঠত; এমনি ছিল নজরুলের প্রাণের প্রাচুর্য।

 বাইরে যেমন সভা-সমিতিতে, বক্তৃতায়, গানে মেতে থাকতেন—অথবা পাহাড়ে, ঝর্ণায়, নদীতে, সমুদ্রে আনন্দ লুটে বেড়াতেন—তেমনি বাড়ীতেও চলত অবিরাম হাসি, গল্প, গান ও পানের মজলিস। সকাল থেকে শুরু ক’রে, অর্ধরাত্রি পর্যন্ত ফাক পড়েনি কখনো এক মুহূর্ত। তিনি বলতেন, থাকি আমি পান বাগানে, পান বা গান দু’য়ের এক আমার চাই-ই।’ কলকাতার পানবাগান লেনে তাঁর বাস ছিল তখন, তারই উল্লেখ ক’রে এই রহস্য।

 নজরুল নদী-ভ্রমণে ও সমুদ্র-বিহারে ফরমায়েশ ক’রে মাঝিদের কণ্ঠে সাম্পানের গান শুনে যেতেন অজস্র। আবার অন্যদিকে বাড়ী ফিরে রচনা ক’রে চলতেন নিজেও। নিজেই সুর দিয়ে যখন তিনি গাইতেন স্বরচিত সাম্পানের গান, তখন গানের আসরে শ্রোতাদের উৎসাহের সীমা থাকত না।

 কবির অনুরোধে কখনো কখনো আমার দাদুর ঝুলি ঝেড়ে কিছু কিছু প্রচলিত গান উদ্ধার ক’রে কবির দরবারে পৌঁছে দিতাম। কাজ-কারবার উপলক্ষে চট্টগ্রামের বহুলোক হরদম আকিয়াবে-রেঙ্গুনে গিয়ে বসবাস করেছে বরাবর। দাদুর কাছ থেকে পাওয়া এই গানগুলোর মধ্যে বর্মী মেয়েদের সঙ্গে তাদের প্রেমলীলার রসাল বর্ণনা কবি খুব উপভোগ যেমন—করতেন।

‘রেঙ্গুনের বর্মা মাইয়া বড় যাদু জানে
খোঁপার উপর পানের খিলি ইশারাতে আনে।’

... ... ...

‘রেঙ্গুনের বর্মা মাইয়া বড় যাদুগীর

টাকা পইসা খাইয়া মোরে বানাইল ফকির।’

 নজরুলকে সাধারণত নিজের রচিত গান ছাড়া অন্য গান গাইতে শুনিনি। গান গাইতে গিয়ে তিনি বলতেন, ‘ফরমাশ কর, কি গান গাইব। শ্রোতাদের তরফ থেকে যদি ফরমাশ না আসে তবে জমে না গানের মজলিস।’ একই বৈঠকে তিনি অবিরাম গানের পর গান গেয়ে যেতেন। প্রথমবার বেশীর ভাগই তাঁর, উদ্দীপনামূলক ও বিপ্লবাত্মক গান এবং সাম্যের গান গাইতে শুনেছি তাঁকে।

চল্‌ চল্‌ চল্‌
ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল্‌
নিম্নে উতলা ধরণী তল
অরুণ প্রাতের তরুণ-দল
চল্‌রে চল্‌রে চল্‌।

... ... ...

 চাষীর গান—

ওঠরে চাষী জগৎবাসী ধর কষে লাঙ্গল
আমরা মরতে আছি, ভাল করেই মরব এবার চল।

... ... ...

 ধীবরের গান—

আমরা দাঁড়ের ঘায়ে পায়ের তলে
জল তরঙ্গ বাজাই জলে রে।

... ... ...

 ছাত্রদলের গান—

আমরা ছাত্রদল
মোদের পায়ের তলায় মূর্ছে তুফান
ঊর্ধ্বে বিমান ঝড় বাদল।

... ... ...

কারার ঐ লৌহ কবাট, ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট

শিকল পরা ছল মোদের এ শিকল পরা ছল
এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল।

... ... ...

 আরও তাঁর সুপ্রসিদ্ধ গান—

দুর্গমগিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার হে
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার।

... ... ...

ফেনাইয়া ওঠে বঞ্চিত বুকে পুঞ্জিত অভিমান

ইহাদেরে পথে নিতে হবে সাথে, দিতে হবে অধিকার

... ... ...

যাত্রীরা তব সম্মুখে ওই পলাশীর প্রান্তর

বাঙালীর খুনে লাল হ’ল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!

 এ গান পরে নানান জায়গায় নানান গায়কের কণ্ঠেও বারে বারে শুনেছি, আজও শুনি। কিন্তু গানের চরণে চরণে ফুর্তি ও আনন্দের প্রতীক নজরুলের কণ্ঠে যে বুক-ফাটা কান্না ঝরে ঝরে পড়ত, তাঁর চোখে-মুখে ফুটে উঠত যে তীব্র বেদনার ছাপ, তা’ আর কোথাও শুনেছি বা দেখেছি বলে মনে হয় না।

 রবীন্দ্রনাথকে তাঁর নিজের কবিতা আবৃত্তি করতে শুনেছি, নিজের লেখা নাটকের ভূমিকায় দেখেছি তাঁকে জোড়াসাঁকো ঠাকুর-বাড়ীর রঙ্গমঞ্চে, সপ্ততিতম জন্মোৎসব উপলক্ষে বিশাল জনসমাবেশে এবং কলিকাতা টাউন হলে নিখিল ভারত নারী সম্মিলনের অধিবেশনে তিনি বক্তৃতা করেছেন দেখেছি। শান্তিনিকেতনের আবহাওয়ায় পরিবার পরিজনবর্গের মাঝখানে ‘উত্তরায়ণে’র কক্ষেও তাঁকে দেখবার সুযোগ হয়েছে। তিনি কবি—তাঁর চলা, তাঁর বলা সব কিছুতেই ঝঙ্কৃত হয়েছে যেন সুর ও ছন্দ। কিন্তু নজরুলের মধ্যে দেখেছি যে তেজ, তাঁর গান, আবৃত্তি, বক্তৃতায় ঝরেছে যে আগুন—তা’ আর কোথাও দেখি নি। একটা মৃতপ্রায় জাতিকে জাগিয়ে তোলার জন্যে এই জিনিসটারই বুঝি দরকার ছিল সবচেয়ে বেশী।

 ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘ভাঙ্গার গান’ প্রভৃতি কাব্যের গান ও কবিতা সেকালে দেখতে দেখতে দেশময় ছড়িয়ে পড়েছিল। দেশের মুক্তি-আন্দোলনে একটা প্রেরণার উৎস সৃষ্টি করেছিল নজরুলের সাহিত্য ও জীবন।

 নজরুলের অল্পকয়েক বছরের কবি জীবন। শেষের দিকে সেই আবেগ ও উন্মাদনা অনেকটা স্থিতিলাভ করল। এই সময় গান ছাড়া তিনি আর উল্লেখযোগ্য কিছু রচনা করেন নি। গান তিনি রচনা করেছেন অসংখ্য। তার মধ্যে বহু গান সাহিত্যের স্থায়ী সম্পদ হয়ে থাকবার দাবি রাখে। তাঁর প্রথমবার চট্টগ্রাম অবস্থানকালে যেমন তিনি আসর জমাতেন স্বজাতি ও স্বদেশপ্রেমমূলক গান দিয়ে, তেমনি দ্বিতীয়বার শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করতেন গজলের সুরে সুরে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্বরচিত গজল গানের আনন্দ ও বেদনা ঝরে পড়ত কবির কণ্ঠে,

‘কে বিদেশী বন-উদাসী বাঁশের বাঁশী বাজাও বনে’
‘বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল’
‘আমারে চোখ ইশারায় ডাক দিলে হায় কেগো দরদী’
‘করুণ কেন অরুণ আঁখি লাওগো সাকী, লাও শরাব’

 এসব গজলের সুরের মূর্ছনায় ভরপুর হয়ে থাকত আমাদের বৈঠকখানার মজলিস।  তাঁর গজল গান সেকালে জনসাধারণের মধ্যেও অসম্ভব সমাদর লাভ করেছিল। তাঁর গজলের সুর সেকালে বাংলা দেশের যেখানে-সেখানে চায়ের দোকানে, রেস্তোরাঁয় শোনা যেত,পথে-প্রান্তরে ধ্বনিত হ’ত রাখাল বালকের, কুলি-মজুর, গাড়োয়ানের কণ্ঠে কণ্ঠে।

 বৈচিত্র্য নজরুল সাহিত্যের এক প্রধান বৈশিষ্ট্য। নজরুল একদিকে যেমন কবিতা, ছোট গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ সব কিছুর মধ্য দিয়েই নিজেকে নিঃশেষে উজাড় ক’রে দিতে চেয়েছেন, তেমনি এক কাব্যের মধ্যেই তিনি বিচিত্র ভাবকে ফুটিয়ে তুলেছেন নানা বিচিত্র ভঙ্গীতে। একদিকে স্বদেশ-প্রেমের উদ্দীপনা ও সকল রকমের অন্যায়-অসত্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ তাঁর কাব্যকে অনলবর্ষী ক’রে তুলেছে, আবার তারই পাশাপাশি তাঁর কাব্যে ফুটে উঠেছে অনুরাগ, মিলন ও বিরহের অপরূপ ছবি। হিন্দুশাস্ত্র ও দেব-দেবীর কাহিনী তাঁর কাব্যের মাল-মসলা যুগিয়েছে প্রচুর, তিনি মুসলমানের সন্তান হয়ে বেপরোয়াভাবে ব্যবহার ক’রে গেছেন সে-সব মাল-মসলা। তার জন্যে সমাজের একটা অংশে তাঁর বিরুদ্ধে মহা তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও লক্ষ্যযোগ্য যে বাংলা সাহিত্যে ইস্‌লামী আদর্শ ও ঐতিহ্য তাঁর মত অত সুন্দর, মনোহর ভঙ্গীতে আর কেউ তুলে ধরতে পারেন নি। তাঁর কাব্য জীবনের গোড়ার দিকে ‘শাতিল আরব’ থেকে শুরু করে ‘মোহর্‌রম,’ ‘খেয়া পারের তরণী,’ ‘আনোয়ার’ সর্বোপরি ‘কামাল পাশা’ কবিতা ভাবে ও ভাষায়, বাংলা ও আরবী-ফার্সী শব্দের মিলিত ঝঙ্কারে বাঙালী মুসলমানকে শুধু মুগ্ধ করেনি, এক নতুন জীবনে সঞ্জীবিত ক’রে তুলেছে। তাঁর বেপরোয়া লেখনী ও বাধা-বন্ধন মুক্ত জীবন অন্ধ সমাজের বহু গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের মূলে কঠিন আঘাত হেনেছে, ও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে মোল্লা সমাজের মনে। ইস্‌লামী গানগুলি আঘাতের মধ্য দিয়ে নয়, আক্রোশ কিন্তু তাঁর অপূর্ব মধুর ভক্তিরসের বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল তখনকার সমাজের সঙ্কীর্ণ সংগীত-বিমুখতা।

‘তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে
শিশু মোহাম্মদ দোলে।’

... ... ...

‘দিকে দিকে পুনঃ জ্বলিয়া উঠিল

দীন ইস্‌লামী লাল মশাল
ওরে বেখবর তুইও ওঠ জেগে
তুইও তোর প্রাণ-প্রদীপ জ্বাল।’

 যিনি ছিলেন তথাকথিত ধর্মদ্রোহী, সেই নজরুলের সব চেয়ে নির্দয় সমালোচকও সে-যুগে এইসব রাশি রাশি গানের অকৃত্রিম আন্তরিকতায় মুগ্ধ হয়ে কবির শত অপরাধ ক্ষমা করবার কথা ভেবে দেখেছিলেন। নানা রকম মত ও পথের লোক তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হতেন নানাভাবে। তাঁর মজলিসে শরিক হতেন সকল শ্রেণীর লোক; চট্টগ্রামে এবং পরে কলকাতায় তার প্রমাণ পেয়েছিলাম আমরা। সরকারের খয়ের খাঁ যাঁরা তাঁর স্বদেশী গান শুনে আতঙ্কিত হয়ে কানে আঙুল দিতেন, তাঁদের আসতে দেখেছি কবির অনবদ্য গজল গানের আকর্ষণে। তাছাড়া, তাঁর অপূর্ব, অদ্ভুত ব্যক্তিত্বের আকর্ষণও কম ছিল না। আর যে সব গোঁড়া মুসলমান সংগীত চর্চা গোনাহ্ বলে মনে করতেন, তাঁরাও এড়াতে পারেন নি তাঁর ইসলামী গানের আকর্ষণ। বিদ্রোহী কবির খোদার আরশ আসন ছাড়িয়ে আরও ঊর্ধ্বে ওঠার সদম্ভ বর্ণনা শুনে যাঁরা তাঁকে কাফের মনে করতেন অথবা যাঁরা ‘তওবা, তওবা’ পড়তেন তাঁর শ্যামা সংগীতের জন্যে, তাঁর ইস্‌লামী গানের মাধুর্যে মুগ্ধ হয়ে কঠোর সমালোচনার ভাষা হারিয়ে ফেলতেন তাঁরাও।

 নজরুল কাব্যের একটা শ্রেষ্ঠ অংশ রচিত হয় চট্টগ্রামে। প্রথমবার চট্টগ্রাম থেকে কলকাতায় ফিরে আসবার পর তিনি আমায় লিখেছিলেন— ‘কারুর বলা যদি আনন্দ দেয়, তবে সেই আনন্দের বেগে সৃষ্টি হয়তো সম্ভব হয়ে ওঠে। তোমরা আমায় বলেছ লিখতে—সে বলা আমায় আনন্দ দিয়েছে, তাই সৃষ্টির বেদনাও জেগেছে অন্তরে। তোমাদের আলোর পরশে, শিশিরের ছোঁয়ায় আমার মনের কুঁড়ি বিকচ হয়ে উঠেছে।’

 আমরা পরম উৎসাহে মোটা বাঁধানো খাতা, কালি কলম, পেন্সিল কবির ঘরে সাজিয়ে রেখে দিতাম।

 সারাদিন অবিশ্রাম কোলাহলের পর তখনো পর্যন্ত আসল জিনিসটাই বাকী। মধ্যরাত্রে যখন সমস্ত কলরব থেমে যেত, প্রকৃতি হয়ে যেত নিস্তব্ধ, তখন কবি মনের গহনে ডুবে যেতেন—শতধারে উৎসারিত হ’ত তাঁর কবিত্বের উৎস। তাঁর এই সময়ে লেখা ‘স্তব্ধ রাতে’ কবিতায় তিনি নিজেই বলেছেন:—

‘থেমে গেছে রজনীর গীত কোলাহল,
ওরে মোর সাথী আঁখিজল
এইবার তুই নেমে আয়
অতন্দ্র এ নয়ন পাতায়।’

 এবার সারা রাত ধরে চলত অঝোরে কবিতা রচনা। আমাদের কৌতূহল উপচে পড়ত; সকালে উঠেই প্রথম কাজ হ’ত, আজ কি কবিতা লেখা হ’ল, কতখানি লেখা হ’ল দেখা। অধীর আগ্রহে পড়ে যেতাম—

‘হে সিন্ধু, হে বন্ধু মোর, হে চির বিরহী
হে অতৃপ্ত, রহি রহি কোন্ বেদনায়
উদ্বেলিয়া ওঠ তুমি কানায় কানায়?
কি কথা শুনিতে চাও, কারে কি কহিবে বন্ধু তুমি?
প্রতীক্ষায় চেয়ে আছে ঊর্ধ্বে নীলা, নিম্নে বেলাভূমি!’

 রাজনৈতিক আন্দোলনের হট্টগোলের মাঝখানে, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রচারের উত্তেজনার ভেতরে একই সময় পাশাপাশি বিশ্বপ্রকৃতি কি ক’রে তাঁকে হাতছানি দিত, তা’ আমরা চোখে দেখেছি। সারাদিন সভা-সমিতি, বক্তৃতা, মজলিস নিয়ে ব্যস্ত থাকবার পর রাত্রির অন্ধকারে প্রকৃতি তার রূপের ঐশ্বর্য মেলে ধরত তাঁর কাছে, চট্টগ্রামের গিরিদরীবন তাঁর মনকে উতলা ক’রে তুলতো। রাত্রির পর রাত্রি খাতার পাতায় আত্মপ্রকাশ করতে লাগল ‘সিন্ধু’ প্রথম তরঙ্গ, ‘সিন্ধু’ দ্বিতীয় তরঙ্গ, ‘সিন্ধু’ তৃতীয় তরঙ্গ, ‘কর্ণফুলী’ ‘সাম্পানের গান’, ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি।’ এই সময়েই ‘অনামিকা', ‘গোপনপ্রিয়া’ প্রভৃতি ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ কাব্যের শ্রেষ্ঠ প্রেমের কবিতাগুলি লিখিত হয়। তিনি লিখেছিলেন আমাকে চিঠিতে—আমার পনের আনা রয়েছে স্বপ্নে বিভোর, সৃষ্টির ব্যথায় ডগমগ, আর এক আনা করছে পলিটিক্স, দিচ্ছে বক্তৃতা, গড়ছে সঙ্ঘ। নদীর জল চলেছে সমুদ্রের সঙ্গে মিলতে, দু’ধারে গ্রাম সৃষ্টি করতে নয়। যেটুকু জল তার ব্যয় হচ্ছে দু’ধারের গ্রামবাসীদের জন্যে, তা’ তার এক আনা। বাকি পনের আনা চলেছে আর চলেছে সৃষ্টি দিন হতে, আমার সুন্দরের উদ্দেশে। আমার যত বলা, সেই বিপুলতরকে নিয়ে, আমার সেই প্রিয়তম, সেই সুন্দরতমকে নিয়ে।

 রাজনৈতিক কোলাহলের হট্টগোলের মাঝেও তিনি সেই সুন্দরের স্বপ্নে বিভোর হয়ে যেতেন।

 চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যই শুধু কবির কল্পনাকে উদ্বুদ্ধ করেনি, চট্টগ্রামের কীর্তিমান মানুষের স্মৃতির উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়েও মুখর হয়েছে তাঁর বাণী। চট্টগ্রামের কবি নবীনচন্দ্রকে স্মরণ ক’রে তিনি করলেন কবিতা রচনা; বললেন—‘অজয়ের কবি আজ কর্ণফুলীর কবিকে অর্পণ করতে এসেছে শ্রদ্ধাঞ্জলি।’

 চট্টলের শিক্ষাগুরু আবদুল আজিজের সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে তিনি গাইলেন—‘বাংলার আজিজ’।

‘পোহায়নি রাত আজান তখনো দেয়নি মুয়াজ্জিন।
মুসলমানের রাত্রি তখন আর সকলের দিন।
অঘোর ঘুমে ঘুমায় তখন বঙ্গ মুসলমান,
সবার আগে জাগলে তুমি গাইলে জাগার গান।’

 একদিন ভাই বললেন— ‘কবিদা, এবার ছোটদের জন্যে কিছু লেখো। কবির কলমে এবার ঝরল ‘সাত ভাই চম্পা’।

‘আমি হব সকাল বেলার পাখী—
সবার আগে কুসুম বাগে উঠব আমি ডাকি।’

... ... ...

‘আমি সাগর পাড়ি দেব, আমি সওদাগর,
সাত সাগরে ভাসবে আমার সপ্ত মধুকর!’

 মানুষকে আপন করে নেবার ক্ষমতা ছিল নজরুলের অসাধারণ। আমার আম্মাকে ও নানীআম্মাকে তিনি স্নেহমমতায় বেঁধে নিয়েছিলেন। একদিন সকাল বেলা আম্মা তাঁর তিন মাসের দৌহিত্রটিকে কবির কাছে পাঠিয়ে দিলেন। ফাঁক পেলেই আমার ছোট্ট শিশুটিকে নিয়ে মশগুল হয়ে যেতেন কবি। কিন্তু আম্মা আজ তুললেন অন্য কথা। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন—‘জানালার ধারের ঐ সুপারি গাছগুলো দেখতে সুন্দর, না এই শিশুটি? এর আগেকার রাত্রিতে কবি লিখেছিলেন ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’। আমাদের জানালার পাশে পুকুরের ধারে ঘেঁষাঘেঁষি ক’রে দাঁড়িয়েছিল ন’টা সুপারি গাছ। আসন্ন বিদায়ের কথা স্মরণ ক’রে কবি লিখলেন—

‘বিদায় হে মোর বাতায়ন পাশে নিশীথ জাগার সাথী,
ওগো বন্ধুরা পাণ্ডুর হয়ে এল বিদায়ের রাতি।
আজ হতে হ’ল বন্ধ আমার জানালার ঝিলিমিলি।
আজ হতে হ’ল বন্ধ মোদের আলাপন নিরিবিলি।’

 ‘সুপারি গাছগুলি সুন্দর, না এই শিশুটি’—আম্মার একথা শুনে কি বুঝে জানি না কবি অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন বললেন——‘আম্মার মনের কথা বুঝতে আর আমার বাকি নেই।’ পরদিন সকালে কবিতার খাতা খুলতেই চোখে পড়ল নতুন কবিতা ‘শিশু যাদুকর’।

‘পার হয়ে কত নদী, কত সে সাগর
এই পারে এলি তুই, শিশু যাদুকর।'

 যার ঘরে শিশু নতুন অতিথি হয়ে এসেছে, তারই মনের কথা প্রকাশ পেয়েছে এই কবিতার মধ্যে।

 কবিতাখানির এক জায়গায় আছে——

‘লায়লার পারে দূর নাহারের কোল
আলো করি এলি কে রে পুষ্প বিভোল,
পেলি হেথা ঠোঁট-ভরা মধু-চুম্বন
আমি দিনু হাতে তোর নামের কাঁকন।
যাদু মোর কি দিবে এ ভিখারী আশিস,
সুন্দর হয়ে যেন ধরায় বাঁচিস্।’

 এ কবিতার সঙ্গে আমার ছেলের নামকরণের ইতিহাস একটুখানি জড়িত আছে, তা’ বোঝাই যাচ্ছে। কবি ওর জন্যে ডাকনাম পছন্দ করেছিলেন ‘শেলী’। আর একটা নাম দিয়েছিলেন ‘সোহরাব’। রুস্তম-সোহরাব কাহিনীর সোহরাব-চরিত্র তাঁকে ভারী মুগ্ধ করত, তিনি বলেছিলেন। কিন্তু কাহিনীটা বিয়োগান্ত ব’লে কবির দেওয়া ঐ নামটা আমাদের বাড়ীতে ক্রমে চাপা পড়ে যায়।

 এভাবে নজরুলের সঙ্গে আমাদের পরিবারের যোগাযোগ যখন খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল, তখনো কিন্তু বাড়ীর পুরোপুরি সাহিত্যিক আবহাওয়া সত্ত্বেও মেয়েরা বাইরের জগতের সঙ্গে মুখোমুখি আলাপ করবার অধিকার পাননি। ফাঁকে ফাঁকে আড়াল-আবডাল থেকে উঁকিঝুঁকি মেরে বাহির-বিশ্বের সাথে সাক্ষাৎ পরিচয় করবার চেষ্টা চলত আমাদের বাড়ীর মেয়েদের। আর আমি? আমি তখন সবে নতুন বন্দিনী। উচ্চশিক্ষার জন্যে আমার চলছে বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহে নজরুলের প্রভাব কতখানি কার্যকরী হয়েছিল, তা’ ভেবে আজ মন কৃতজ্ঞতায় ভরে যায়।

 তিনি আমায় চিঠিতে লিখেছিলেন——“আমাদের দেশের মেয়েরা বড় হতভাগিনী। কত মেয়েকে দেখলাম কত প্রতিভা নিয়ে জন্মাতে; কিন্তু সব সম্ভাবনা তাদের শুকিয়ে গেল সমাজের প্রয়োজনের দাবিতে। ঘরের প্রয়োজন তাদের বন্দিনী ক’রে রেখেছে। এত বিপুল বাহির যাদের চায়, তাদের ঘিরে রেখেছে বার হাত লম্বা আর আট হাত চওড়া দেয়াল। বাহিরের আঘাত ঐ দেয়ালে বারে বারে প্রতিহত হয়ে ফিরল; এর বুঝি ভাঙন নেই অন্তর হতে মার না খেলে। তাই নারীদের বিদ্রোহিনী হতে বলি। তারা ভেতর হতে দ্বার চেপে ধ’রে বলছে——‘আমরা বন্দিনী’। দ্বার খুলবার দুঃসাহসিকা আজ কোথায়? তাকেই চাইছেন যুগ-দেবতা।”

 আমার বাল্য-রচনা ‘পুণ্যময়ীকে’ তিনি আশীর্বাদ-করেছিলেন যে-ভাষায়, তার মধ্যে পেয়েছিলাম এক নতুন জীবনের, নতুন জগতের আভাস।

“শত নিষেধের সিন্ধুর মাঝে অন্তরালের অন্তরীপ,
তারই বুকে নারী বসে আছে জ্বালি বিপদ-বাতির সিন্ধুদীপ।
শাশ্বত সেই দীপান্বিতার দীপ হতে আঁখি-দীপ ভরি
আসিয়াছ তুমি অরুণিমা আলো, প্রভাতী তারার টিপ পরি।’

 এই কবিতার মধ্যে ধ্বনিত হয়েছে বাংলাদেশের ঘুমন্ত মুসলিম নারীশক্তির জয়গান। নজরুলের সঙ্গে সাক্ষাৎভাবে পরিচয়ের আগে ১৯২৫ সালে ভাই চট্টগ্রাম থেকে ডাক্তারী পড়তে যান কলকাতায়। ঐ সময় কয়েক বছর কবির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। ভাইয়ের আগ্রহে ও উদ্যোগে তখন কলকাতা থেকে ‘পুণ্যময়ী’ প্রকাশিত হয়। ‘পুণ্যময়ী’ গ্রন্থকে উপলক্ষ ক’রে আমার ভাইয়ের মারফতে নজরুল আমাকে পাঠিয়েছিলেন তাঁর আশিসবাণী। কবির স্বহস্ত লিখিত কবিতাখানি ব্লক ক’রে ‘পুণ্যময়ী’তে ছাপানো হয়েছিল।

 মনে পড়ে, সেদিন এক বিপুল আনন্দ ও গৌরবে দেহমন অভিষিক্ত করেছিল কবির প্রশস্তি। এ যে সম্মোহিত নারীচিত্তের অপূর্ব জাগরণী গান। সেদিন ধরার ধূলায় যে তাজমহলের কল্পনা তিনি করেছিলেন নারী-সমাজকে নিয়ে, পাকিস্তানের মেয়েরা হয়েতা সেই তাজমহল সত্যিই গড়বে, যার মহিমায় ছনিয়া একদিন বিস্ময়-বিমুগ্ধ হবে।

 বছর কয়েক আগে ঢাকা ইউনিভার্সিটির একটা অনুষ্ঠানে ছাত্রীদের লক্ষ্য ক’রে বলেছিলাম, ‘তোমরা জন্মেছ উজ্জ্বল আলোকের প্লাবনের মধ্যে, আর আমাদের জন্ম গভীর অন্ধকারে; অন্ধকারেই হয়েছে আমাদের যাত্রা শুরু। অন্ধকারকে ভেদ ক’রে এসে উত্তীর্ণ হয়েছি আমরা আলোকের তীরে। আলো তোমাদের কাছে এসেছে সহজ, স্বাভাবিকভাবে। আর আমরা আলো জয় ক’রে নিয়েছি। আলো হয়তো সেইজন্যে আমাদের কাছে একটু বেশী মূল্যবান। এইটুকু তফাত রয়েছে তোমাদের আর আমাদের যুগে। সে-যুগের সেই আলোকের অভিযানে যিনি আমাদের অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি আমাদের কবিদা।’

 প্রত্যক্ষ পরিচয়ের বহু আগে নজরুল-প্রতিভা যখন প্রথম বিস্ময়-বিমুগ্ধ করে আমাদের, তখন এক হিসাবে আমি ছাত্রী। নিয়মিত ছাত্রী জীবন অবশ্য আমার ভাগ্যে ঘটেনি সেকালে। বাল্যে চট্টগ্রাম খাস্তগীর বালিকা বিদ্যালয়ে পড়তাম। ন’বছর বয়সে ফরমান জারি হ’ল স্কুল ছাড়তে হবে। সেই থেকে বাড়ী বসে বইপত্র নাড়াচাড়া করি। বছরের পর বছর কাটে। চোখের সামনে সমপাঠী হিন্দু, ব্রাহ্ম, ক্রিশ্চান মেয়েরা অবাধে চলাফেরা করে, ক্লাসের পর ক্লাস ডিঙিয়ে যায়, ম্যাট্রিক পাস ক’রে কেউ কেউ পড়তে যায় কলকাতা বেথুন কলেজে, ডায়োসিসন কলেজে। মাঝে মাঝে তারা চিঠিপত্র দেয়, তাতে থাকে নতুন দুনিয়ার ইঙ্গিত। আমাদের পাশের বাড়ীর বৌদ্ধ পরিবারের মেয়ে, স্কুলে আমার চেয়ে উঁচু ক্লাসের ছাত্রী, ‘দিদি’ জ্যোতির্ময়ী চৌধুরী (পরে ‘বিলাত দেশটা মাটির’ প্রভৃতি গ্রন্থের লেখিকা জ্যোতির্মালা দেবী) চট্টগ্রাম, কলিকাতা ও রেঙ্গুনে পড়াশোনা ক’রে উচ্চতর শিক্ষার জন্যে বিলাত পাড়ি দিলেন। মনে হয়, আমরা অন্ধকারের জীব, আর ওরা আলোর দেশের বাসিন্দা। দিনের পর দিন মনের মধ্যে কেবলই গুমরাতে থাকে বিদ্রোহ।

 এমনি আবহাওয়ার মধ্যে নজরুলের সঙ্গে পরিচয় হ’ল তাঁর কবিতার ভেতর দিয়ে। ডাক দিলেন তিনি—

‘ওরে আয়,
ঐ মহাসিন্ধুর ওপার হ’তে
ঘন রণভেরী শোনা যায়।’

 এল উদাত্ত আহ্বান—

‘দুর্গমগিরি, কান্তার মরু, দুস্তর পারাবার
লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার।’

 মনে হ’ল এ যে আমাদেরই মনের কথা। সত্যিই তো আমাদের যে তৈরী হতে হবে। নিজেরই অজ্ঞাতে যেন দুর্গম পথে যাত্রার জন্যে চলতে লাগল প্রস্তুতি। এভাবে শুধু রাজনৈতিক আন্দোলনই নয়, নারী আন্দোলন, সামাজিক কুসংস্কার বা অর্থ নৈতিক অসাম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন, বাংলার মুসলমানের জাতীয় আন্দোলনের সমস্ত শাখাগুলি যথেষ্ট পুষ্টি লাভ করেছিল নজরুলের প্রেরণায়। তাঁর প্রবল প্রাণোচ্ছ্বাসের বন্যায় সে-যুগে ভেসে গিয়েছিল আমাদের সমাজের অনেক জঞ্জাল।

 সম্যবাদী নজরুল শুধু যে হিন্দু-মুসলমানে ভেদাভেদ করেন নি, ধনী-দরিদ্রে কোন পার্থক্য দেখতে পাননি, তা’ নয়। নারী-পুরুষেও তিনি করেছেন অভেদজ্ঞান। জাতিভেদ প্রথা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন—

‘যারে তুমি নীচে ফেল, সে তোমারে
বাঁধিবে যে নীচে।
পশ্চাতে ফেলিছ যারে, সে তোমারে
পশ্চাতে টানিছে।’

 আর নজরুল বন্দিনী নারীর দুঃখে বলছেন——

‘বেদনার যুগ, মানুষের যুগ, সাম্যের যুগ আজি
কেহ রহিবে না বন্দী কাহারও, উঠেছে ডঙ্কা বাজি।
নর যদি রাখে নারীরে বন্দী, তবে এর পর যুগে
আপনারই রচা ঐ কারাগারে পুরুষ মরিবে ভুগে।
যুগের ধর্ম এই——
পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে, পীড়া দেবে তোমাকেই।’

 রাজনৈতিক আন্দোলনের পুরোভাগে দাঁড়ালেও বাস্তবিক পক্ষে এইটুকুই কিন্তু বিদ্রোহী-কবির সব নয়। সমাজের মধ্যে মানুষে মানুষে বিভেদ, অর্থনৈতিক বিভেদ ও সামাজিক মর্যাদার পার্থক্য——এইখানেই খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর বিদ্রোহের মূল সুর। সকল রকম অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে তাঁর বিদ্রোহ।

 নজরুলের ‘নারী’ কবিতা আমাদের দেশের মেয়েদের আজও প্রেরণা দিচ্ছে, ভবিষ্যতেও দেবে। তাছাড়া নজরুলের জীবন ও সাহিত্যের গোড়ার কথাই হ’ল বাঁধন ভাঙা——সে বিদেশী শাসনের নাগপাশই হোক, অথবা হোক মানুষে মানুষে ভেদাভেদের প্রাচীর বা সমাজের অন্ধ মূঢ়তার নিগড়।

‘কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট।’

... ... ...

'চল চল চল ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল,

নিম্নে উতলা ধরণী তল’

 আমরা যে বন্দিনী মেয়েরা সে-যুগে শিকল ভেঙে বেরুবার চেষ্টা করছিলাম, এসব ভাঙার গান তাদের রক্তকে কম উতলা করেনি। যখনই দেখেছেন নজরুল কোন মেয়ে মুক্তির জন্যে লড়ছে, তখনই নারীত্বের জয়গানে মুখর হয়েছেন তিনি।

‘শত নিষেধের সিন্ধুর মাঝে অন্তরালের অন্তরীপ
তারি বুকে নারী বসে আছে জ্বালি বিপদ-বাতির সিন্ধুদীপ।
অথবা
‘আমি জানি মাগো আলোকের লাগি তব এই অভিযান
হেরেমরক্ষী যত গোলামের কাঁপায়ে তুলিত প্রাণ
আমরা দেখেছি যত গালি ওরা ছুড়িয়া মেরেছে গায়,
ফুল হ’য়ে সব ফুটিয়া উঠিয়া ঝরিয়াছে তব পায়।
কাঁটার কুঞ্জে ছিলে নাগ-মাতা সদা উদ্যত ফণা,
আঘাত করিতে আসিয়া আঘাত করিয়াছে বন্দনা।’

 এসব কবিতা সেকালে দীর্ঘ-দারুণ চলার পথে আমাদের অনেকখানি শক্তি ও সাহস দিয়েছিল।

 কৃষ্ণনগর ছেড়ে যখন সপরিবারে কবি কলকাতায় বসবাস শুরু করেন, তখন শুধু তাঁর সঙ্গে নয়, তাঁর পরিবারবর্গের সঙ্গেও আমাদের পরিবারের বিশেষ ঘনিষ্ঠতা জন্মে। খালা-আম্মার সঙ্গে কলকাতায় কবির শাশুড়ী ও পত্নীর হামেশা আসা যাওয়া চলত। সংসার-জ্ঞানহীন আত্মভোলা কবির কার্যকলাপে তাঁর শাশুড়ী মাঝে মাঝে অতিষ্ঠ হয়ে উঠতেন। সংসারের দিকে নজর নেই বলে প্রায়ই জামাতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে ছাড়তেন না তিনি। সাংসারিক বিষয়ে কবির সঙ্গেও খালাআম্মার আলাপ-আলোচনা হ’ত। আমার ভাইয়ের খামখেয়ালী চালচলনের জন্যে আমাদের পরিবারে ভাবনার অন্ত ছিল না। সুযোগ মত খালাআম্মা কবির সঙ্গে ভাইয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরামর্শ করতে বসে যেতেন। আমাদের জেলায় পল্লী অঞ্চলে একটা গ্রাম্য কথা আছে— ‘সতীনের কিস্সা সতীনের মাকে শোনানো। আজ মনে হয়, ভাইয়ের সাংসারিক বিষয়ে ঔদাসীন্য, স্বার্থবুদ্ধির অভাব—এসব ব্যাপারে কবিদা’র কাছে নালিশ জানানো বা তাঁর হাতে দেওয়া শোধরাবার ভার, এ যেন ছিল অনেকটা তাই। সপত্নীর যত কারসাজি, তার পরামর্শ হয়তো সব সময় তার মায়ের কাছ থেকেই সে পায়। তেমনি ভাইয়ের আপন-ভোলা স্বভাব অনেকখানি পারিবারিক উত্তরাধিকার হলেও তার বেশ কিছুটা শিক্ষা তো তিনি নজরুলের কাছ থেকেই পেয়েছিলেন। কাজেই সে-কাহিনী তাঁর সঙ্গে আলোচনা করা নিরর্থক ছাড়া আর কি!

 আমি চট্টগ্রাম থাকতে কবি-পত্নীর সঙ্গে মাঝে মাঝে আমার পত্রালাপ চলত। আজকাল দেখতে পাই তিনি নাম স্বাক্ষর করেন ‘প্রমীলা নজরুল,’ তখন কিন্তু আমাকে চিঠিতে লিখতেন ‘তোমার বৌদি আশা। একবার কবি বৌদির কথা চিঠিতে রগড় ক’রে লিখেছিলেন, ‘দেখতো ভাই, চিঠি লিখতে লিখতে এক দোয়াত কালি ঢেলে ফেললাম একটা বইয়ের ওপর। তার জন্যে তোমার বৌদির কি বকুনি, আর কি তম্বিহ্।’

নিজের সম্বন্ধে কবি ছিলেন চিরদিনই উদাসীন। কবির মাতৃস্থানীয়া মিসেস্ এম. রহমান একবার আমাকে চিঠি লিখে চট্টগ্রাম থেকে কবির জন্যে ‘বিনি সুতোর’ একখানা দেশী চাদরের ফরমাশ দিয়েছিলেন। আমি চিঠিতে সেকথা কবির কাছে উল্লেখ করায় তিনি জবাবে লিখেছিলেন—‘বিনি সুতোর কথা আমার বিনি গোচর। সে মা-ই জানেন, আর তোমরাই জান।’

 ১৯২৭ সাল থেকে আমি কবিদা’কে কলকাতায় দেখেছি। তাঁর দ্বিতীয়বার চট্টগ্রাম সফরের আগে ও পরে ভাইয়ের উৎসাহে আমাদের কলকাতার বাসায় মাঝে মাঝে তাঁকে নিয়ে সাহিত্য মজলিস বসত। এই ব্যাপারে আমার খালাআম্মা হাসিনা খাতুন সাহেবার আগ্রহ ছিল অফুরন্ত। তালতলা, জানগর, ক্রেমেটোরিয়াম স্ট্রীট, ভবানীপুর পর পর আমাদের সব বাসাই কবির পদস্পর্শে ধন্য হয়েছিল। ১৯৩৬ সালে যখন আমরা তাঁকে ক্রেমেটোরিয়াম ষ্ট্রীটের বাসায় পাই, আমাদের ‘বুলবুল’ সাহিত্য পত্রিকার আসর তখন সরগরম। সে সময় বুলবুলের সাহিত্য-কুঞ্জে যাঁরা আসর জমিয়ে রাখতেন, সেই সাহিত্যিকদের অনেকেই কবির সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সেদিন। আমার আম্মা এবং দাদুও তখন সেখানে। তার মাসখানেক পরেই আম্মা ইহজগৎ ছেড়ে যান।

 মনে আছে, ১৯৪০ সালের দিকে আমাদের ভবানীপুর পুলিস হাসপাতালের বাসায় কবিদা’ মজলিস জমিয়েছিলেন শেষবারের মত।

 সেই থেকে দ্রুত তাঁর স্বাস্থ্যের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। তার পর বেশীদিন তিনি আর প্রকৃতিস্থ ছিলেন না। শেষের দিকে তাঁর মনে আধ্যাত্মিক ভাবই প্রবল ছিল। সেই উদ্দাম আবেগ ও আনন্দময় নজরুল যেন ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছিলেন আমাদের কাছ থেকে।

 ভবানীপুরের কথা বলছিলাম। আমাদের সেই সাহিত্যমজলিসে নবীন, প্রবীণ সাহিত্যিকরা অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ছিলেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী ও খাজা শাহাবুদ্দীন। মেয়েদের মধ্যে ছিলেন লেডী ব্রেবোর্ণ কলেজে আমার ছাত্রীদের ও সহকর্মী অধ্যাপকদের কয়েকজন। সদ্য বিলাত থেকে আমদানী করা জিয়োগ্রাফীর প্রফেসার মিস বেকার (পরে মিসেস মেকনেল) এ দেশীয় অনুষ্ঠানের প্রথম অভিজ্ঞতা অর্জনের আশায় অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে যোগদান করেছিলেন। তখনো পর্যন্ত নজরুল একাই একশো; গান, গল্প, আলোচনা ও বক্তৃতা দিয়ে মজলিস জমাবার অদ্ভুত ক্ষমতা তাঁর তখনো অক্ষুণ্ণ। কি প্রসঙ্গে যেন কোরবানীর কথা উঠে পড়ল। কোরবানীর দার্শনিক ব্যাখ্যা দিলেন নজরুল,—‘ভোরের আকাশে প্রথমে সোনালী আলো দেখা দেয়, তার পর আসে রক্তবর্ণ, সবশেষে উদিত হয় সূর্য। তেমনি মানব জীবনের ঐশ্বর্যের সোনালী ছটাকে রক্তে রাঙিয়ে আসে কোরবানী, ত্যাগ, বিসর্জন। তার পরে মানুষের জীবনে গৌরব ও মহিমার সূর্য উদিত হয়।’ তখনও পর্যন্ত কথায় কথায় উচ্ছ্বসিত আনন্দ ও প্রাণ খোলা হাসি দিয়ে মজলিস মাতিয়ে তুলছিলেন নজরুল। আমাদের মেয়েরা সে-যুগে পর্দার বাঁধন কেটে বেরিয়ে আসছেন দলে দলে। স্কুল-কলেজে, খোলা আকাশের তলায় তাঁদের ভিড় ক্রমেই বেড়ে চলেছে—সফল হতে চলেছে নজরুলের নারী জাগরণের স্বপ্ন। সেকথা আলোচনা করতে গিয়ে নজরুল সকৌতুকে আবৃত্তি করলেন আকবর এলাহাবাদীর ‘দেওয়ান-ই-আকবর’ কাব্যের একটি কবিতা— যা’তে বিবিকে প্রশ্ন করা হয়েছে, ‘বিবি, তুমি নেকাব খুলে ফেলেছ যে?’ বিবি জবাব দিচ্ছেন, ‘পুরুষের আক্কেলের ওপরে পড়েছে সে-নেকাব।’ সঙ্গে সঙ্গে নজরুল হাসিতে ফেটে পড়লেন। তাঁর হাসি ও আনন্দের উৎস সেই থেকে একেবারেই শুকিয়ে গেল।

 যতদূর মনে পড়ে, তাঁকে দেখেছি সজ্ঞানে মজলিসের মধ্যে বোধ হয় কলকাতা ধর্মতলায় ওয়াছেল মোল্লা বিল্ডিংয়ে। দোতলার বারান্দায় ছোটখাট আসর বসেছিল। কবির নিতান্ত ঘনিষ্ঠ সাহিত্যিক-বন্ধুরা উপস্থিত ছিলেন। একটি হিন্দু মহিলা, আজ আর নাম মনে নেই—কীর্তন গান করলেন চমৎকার। আমার ভাই, ভাবী, আমরা স্বামী-স্ত্রী—বাড়ীর সবাই ছিলাম। কবি গানের পর গান গেয়ে চললেন।

 আজকাল মাঝে মাঝে এদিক ওদিক বইপত্রে দেখতে পাই কবির আধুনিক কালের পীড়িত অবস্থার ছবি। কিন্তু এই নজরুল কি সেই নজরুল! ভাগ্যের নির্মম আঘাতে জর্জরিত, বিষাদক্লিষ্ট, নির্বাক নজরুল-এ হয়তো কঠোর বাস্তব, কিন্তু হাসি, গান, আনন্দ, উল্লাস ও উদ্দাম প্রাণশক্তির ভাণ্ডারী যেনজরুল আমাদের মনোজগতে অক্ষয় আসন অধিকার ক’রে আছেন, আজও সে-নজরুলই সত্য। শুধু আজ নয়, যুগে যুগে বাঙালীর মনে চির-তারুণ্যের প্রতীক হয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন। দুঃখ, জরা ও দুর্ভাগ্যের করাল ছায়া সেখানে পৌঁছাতে পারবে না কোনদিন।

 কিছুদিন আগে গিয়েছিলাম চট্টগ্রাম। আমাদের সেই পুরানো বাড়ীতে আজ ভিন্ন লোকের বসবাস, অন্য লোকজনের আনাগোনা; তবুও যখনই সেখানে পা দিই, শৈশবের শত স্মৃতির সঙ্গে মনে পড়ে যায় বছর ত্রিশ বত্রিশ আগেকার কথা। দক্ষিণে পুকুর পাড়ের দিকে তাকিয়ে দেখি, সেই তখনকার কালের সুপারি নারিকেলের গাছগুলো যেন বাতাসে হা হা ক’রে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে যায়। আবার সঙ্গে সঙ্গে যেন নতুন জীবনে বেঁচে ওঠে ঘাটের ধারে গা ঘেঁষাঘেঁষি ক’রে দাঁড়ানো ন’টা সুপারি গাছ, বাংলা সাহিত্যে অমর সেই ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’। অন্দর মহলে শান্ত উদার হাসিতে জেগে ওঠেন জান্নাতবাসিনী আম্মা ও দাদু (মাতামহী)। পেছনের দিকে বছরের পর বছর পেরিয়ে শৈশব ফিরে পায়, আনন্দে কলহাস্য ক’রে ওঠে আমার ‘বাচ্চা-ই সাক্কাও’, আমার ‘শিশু যাদুকর’।[]

 আর এসে দাঁড়ান আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বাহার—নব নব পথ রচনার নেশায় মাতাল। তাঁর আশেপাশে আঙিনায় ভিড় ক’রে আসেন কানাই, সুধীন্দ্র, মনিরুজ্জমান, ইস্কান্দর, রবিউল হোসেন, দিদারুল আলম—তাঁর বন্ধুরা দলে দলে। সবার ওপরে সগৌরবে মাথা উঁচু ক’রে এগিয়ে আসেন দলের মধ্যমণি আমাদের কবিদা’—দেশ ও জাতির সম্পদ কাজী নজরুল ইস্‌লাম। হাসি, গান ও উল্লাসে যেন আজও মুখর হয়ে ওঠে চারিদিক।

 সেই থেকে বাস্তবে কত কি নিদারুণ ঘটে গেল! কিন্তু তবু মনে হয়, সে তো সত্য নয়; সেদিন যা ঘটেছিল, শুধু তাই সত্য, অবিস্মরণীয়, অবিনশ্বর।

  1. ছোট্ট শিশুকে বাড়ীতে সবাই বলত ‘বাচ্চা’, তাই শুনে কবি ওকে আদর ক’রে ‘বাচ্চা-ই সাক্কাও’, বলে ডাকতেন। কবির ‘শিশু যাদুকর’ কবিতা ওরই জন্যে লেখা। বলা দরকার, আফগানিস্তানে ‘বাচ্চা-ই সাকাও’-এর আবির্ভাবে সে-যুগে এদেশেও কম হৈচৈ পড়েনি।