নজরুলকে যেমন দেখেছি (১৯৫৮)/নজরুল পরিচিতি
নজরুল পরিচিতি
দুঃখু। আমাদের পরম গৌরবের ও গর্বের কবি নজরুল ইস্লামের ছেলেবেলার ডাকনাম দুঃখু মিঞা। সত্যিই শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত আগাগোড়া দুঃখেই গড়া তাঁর জীবন। বর্ধমান জেলার আসানসোলের অন্তর্গত চুরুলিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা কাজী ফকির আহ্মদ ও জননী যাহেদা খাতুন দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম পুত্র পর্যন্ত পরপর চারিটি সন্তান হারান। গভীর বিষাদে আচ্ছন্ন পিতামাতার মন। এই সময় তাঁদের সংসারে আবার দেখা দিল স্বর্গের দূত এক সুন্দর শিশু। জনক-জননীর মুখে হাসি ফোটে, সঙ্গে সঙ্গে আশঙ্কায় ভরে থাকে মন। বড় দুঃখের ধন এই শিশু, তাঁরা নাম রাখলেন দুঃখু।
‘অলৌকিক আনন্দের ভার
বিধাতা যাহারে দেয়, তার বক্ষে বেদনা অপার।’
অলৌকিক আনন্দের ভার দিয়ে বিধাতা সংসারে পাঠিয়েছেন এই দুঃখুকে, সেদিন কে জানত এ কথা! দুঃখু হবে হাসি, গান ও ফুর্তির ফোয়ারা, যেখানেই যাবে আনন্দ ও উল্লাসের কলোচ্ছ্বাসে মুখরিত হবে তাঁর চারদিক, এ কথা কেউ ভাবতে পারেনি সেদিন।
...দিন যায়। দুঃখু এখন নয় বছরের বালক। এই সময় দুঃখুর জীবনে প্রথম দুঃখের আবির্ভাব হ’ল তাঁর পিতার মৃত্যুতে। এবারে পিতৃহীন বালকের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পড়ে জননীর ওপর। দুঃখু নিম্ন প্রাইমারীতে পড়ে। কিন্তু পড়াশুনায় তাঁর মন কই? স্কুলের বাঁধা-ধরা পড়ায় তাঁর মন বসে না। স্কুলের পথে দুরন্ত বালক গাছে চ’ড়ে ফল খায়, পাখীর ছানা পাড়ে। স্কুলে যাবার নাম ক’রে বাড়ী থেকে বেরোয়, পথে-পুকুরে মাছ ধরা থেকে শুরু ক’রে পরের ক্ষেতে ফসল নষ্ট করা পর্যন্ত সব কাজই হয়, শুধু স্কুলের দুয়ার অবধি পৌঁছানো আর হয়ে ওঠে না। যে কবি একদিন মাঠের পানে চেয়ে লিখেছিলেন—
‘ঐ কৃষকের লাঙলের চেয়ে তোমাদের কালি-ভরা লেখনী কি বেশী ফুলের ফসল ফলাতে পারে? ঐ মাঠের খাতায় নিরক্ষর কবির সৃষ্টির কাছে তোমাদের জগতের সবচেয়ে বড় কবি কি তাঁর পুঁথির বোঝা নিয়ে দাঁড়াতে পারেন?'—স্কুলের পাঠ্য-পুস্তকের পরিবর্তে এভাবে প্রকৃতির খাতা থেকেই তিনি পাঠগ্রহণ করতে থাকেন দিনের পর দিন।
শৈশবের সেই স্কুল পালানো বালক নজরুল এইভাবেই দেশের পথ-ঘাট-মাঠ প্রকৃতিকে, দেশের প্রতি ধূলিকণাকে ভালবাসতে শেখেন। তাঁর সেই ভালবাসাই একদিন ছড়িয়ে পড়েছিল ভাগ্যহত ব্যথাতুর মানুষের মাঝখানে নজরুল উঁচু বেদীর ওপর সোনার সিংহাসনে বসে কখনো কবিতা লেখেন নি। তাঁর কাব্য-সৃষ্টির প্রেরণা যুগিয়েছে পথের পথিক, কুলীমজুর ক্ষেতের চাষী, নদীর জেলে ও সাম্পানের মাঝি। তিনি তাদেরই একজন হয়ে তাদের ব্যথা-বেদনাকে দিয়েছেন অপূর্ব রসমূর্তি।
কিন্তু শৈশবে শুধু দুরন্তপনা ক’রেই বালক নজরুলের সময় কাটেনি। তাঁর বিষম ঝোঁক দেখা যায় কবিগান, যাত্রাগান, অভিনয় ও লেটোর নাচের দিকে। শৈশব থেকেই নাচগান ও অভিনয় দিয়ে তিনি লেটোর দলকে মাতিয়ে রাখতেন। শুধু গান গাওয়াই নয়, গান বাঁধায়ও তাঁর অদ্ভুত দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যেত। মক্তবে পড়ার সময় প্রথম দ্বিতীয় শ্রেণী থেকেই লেটোর গান রচনা করতে শুরু করেন তিনি। মুখে মুখে গান রচনা ক’রে প্রতিপক্ষের আক্রমণের জবাব দেওয়া, গান ও ছড়া দিয়ে আসর মাতিয়ে তোলা—এসব ব্যাপারে ঐ অতটুকু বালকের জুড়ি মেলা ভার হয়েছিল। আশেপাশের দু’চারটে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল নজরুলের সুখ্যাতি। তাঁরা নজরুলের কাছে আসতেন যাত্রাভিনয়ের পালা রচনার জন্যে। বালক কবি তাঁদের সুন্দর নাটক ও প্রহসন রচনা ক’রে দিতেন। শুধু তাই নয়, নিমশা গ্রামের লেটোর দলে ওস্তাদের পদ লাভ করেন তিনি। তিন চার বছর তিনি দক্ষতার সঙ্গে ওস্তাদগিরি করেন। এভাবে দুঃখী নজরুলের আর্থিক সমস্যারও কিছু সমাধান হ’ত।
যে কবির যশ ও গৌরব আজ সমগ্র দেশ ও জাতিকে গৌরবান্বিত করেছে, এইভাবেই হয়েছিল তাঁর কবি-জীবনের প্রথম সূত্রপাত। এমনি ক’রে পল্লী অঞ্চলের লোক-সংগীতের ভেতর দিয়েই তাঁর কবিত্ব শক্তির বিকাশ হচ্ছিল ক্রমে। শৈশব থেকে এভাবে নজরুলের কবি-প্রতিভার যে বলিষ্ঠ প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায় তাতে আশান্বিত হয়ে লেটোর দলের সর্দার ‘গোদাকবি’ একদিন কবিতার মধ্য দিয়ে বলেছিলেন ‘আমার ব্যাঙাচি বড় হ’লে সাপ হবে।’ আদর ক’রে তিনি নজরুলকে ঐ নামে ডাকতেন। ব্যাঙাচির সাপে পরিণত হবার আভাস পাওয়া গেলেও একদিন পল্লীগ্রামের এই লেটোর দলের ছেলেটির কাব্য ও জীবন সমগ্র দেশের জন্যে এক অফুরন্ত প্রেরণার উৎস হয়ে উঠবে, সত্যিই একথা কল্পনা করা কঠিন ছিল সেদিন।
লেটো ও যাত্রার দলে মেতে গিয়ে নজরুল ক্রমে মক্তবের আকর্ষণ একেবারেই হারিয়ে ফেলতে থাকেন। যদি বা স্কুলে যান, মন তাঁর রসের সন্ধান পায় পাঠ্যপুস্তকে নয়, অন্যত্র। ক্লাসে ব্যাকরণের সূত্র লিখতে লিখতে, পরীক্ষার খাতায় অঙ্ক কষতে গিয়ে দেখতে পান,—অবাধ্য কলম শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর নয়, এ যে লিখে বসেছে সুন্দর কবিতা। কখনো বা শিক্ষকের হাতে ধরা পড়ে যায় বালক কবির কল্পনা-বিলাস। নজরুলের এক পিতৃব্য কাজী বজলে করিম সুন্দর ফার্সী জানতেন ও কবিতা রচনা করতেন। তাঁর সংস্পর্শে আরও উৎসাহ পায় নজরুলের কবিতা রচনা। পিতার মৃত্যুর কিছুদিন পর দশ বছর বয়সে নজরুল নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষা পাস করলেন বটে, কিন্তু স্কুল আর তাঁকে বেঁধে রাখতে পারল না। এই সময় সাংসারিক অভাব অনটনের তাড়নায় তাঁকে একবছর ঐ স্কুলে শিক্ষকতার কাজ করতে হয়েছিল।
......একটি নধর বালক সকলের অজ্ঞাতে একদিন চুরুলিয়া গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে একেবারে বর্ধমানের রাণীগঞ্জে গিয়ে উপস্থিত হলেন। বড় বড় টানা টানা দু’টি উজ্জ্বল চোখ, স্বাস্থ্যবান সুন্দর এই নওল কিশোর আর কেউ নন,—স্কুল পালানো, ছন্নছাড়া কাজী নজরুল ইস্লাম। সেই থেকে শুরু হ’ল তাঁর বাউণ্ডুলে জীবন। পরবর্তীকালে তিনি একবার লিখেছিলেন—'কোকিল যতক্ষণ কাকের বাসায় থাকে, ততক্ষণ সে কাকের। যেই সে গান ক’রে উড়তে শেখে তখন সে বসন্তের, সে বিশ্বের। বিশেষ ক’রে গানের পাথী যারা, তারা চিরকাল নিরুদ্দেশ দেশের পথিক। কোকিল বাসা বাঁধে না, ‘বৌ কথা কও’-এর বাসার উদ্দেশ আজও মিল্ল না, ‘উহু উহু, চোখ গেল’ পাখীর নীড়ের সন্ধান কেউ পেল না। আসা যাওয়া একটা রহস্যের মত। ওদের ওরা যেন স্বর্গের পাখী, ওদের যেন পা নেই। ধূলার পৃথিবীতে যেন ওরা বসবে না, ওরা যেন ভেসে আসা গান। তাই ওরা অজানা ব্যথার আনন্দে পাগল হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে দেশ-বিদেশে,—বসন্ত-আসা বনে, ফুল-ফোটা কাননে, গন্ধ-উদাস চমনে!’ সেই বালক বয়সে কোন্ গন্ধ-উদাস কানন তাঁকে হাতছানি দিয়ে পথে বার করেছিল, কে জানে!
রাণীগঞ্জে সকলেই বালকের অচেনা। অগত্যা কবি একটি রুটির দোকানে আশ্রয় নিলেন। সেখানে ফুট-ফরমাশ খাটেন, ময়দা মাখেন, রুটি বিক্রি করেন, আর বেতন পান পাঁচ টাকা। কাজের ফাঁকে ফাঁকে অবসর সময়ে একপাশে বসে সুর ক’রে পুঁথি পড়েন। মক্তব তাকে ধরে রাখতে পারে নি, পাঠশালার নীরস পাঠ্য-পুস্তক তিনি পায়ে ঠেলে এসেছেন, কিন্তু পড়ার নেশা তাঁকে ছাড়েনি কখনো। বাংলাদেশের অগাধ রসের ভাণ্ডার, অনবদ্য পুঁথি-সাহিত্য তাঁর ভবিষ্যতের কাব্য-সৃষ্টির মূলে রস সঞ্চার করেছে প্রচুর।
আসানসোলে রুটির দোকানে চাকরি করবার সময় রফিজউদ্দীন আহ্মেদ নামে এক পুলিস সাব-ইন্সপেক্টরের সঙ্গে নজরুলের পরিচয় হয়। বালক নজরুলের সুন্দর মুখশ্রী, বলিষ্ঠ গঠন, তাঁর বুদ্ধি ও প্রতিভার দীপ্তি এই সহৃদয় পুলিস কর্মচারীকে মুগ্ধ করে। তিনি এই প্রতিশ্রুতিশীল বালককে অপত্য স্নেহে মানুষ ক’রে তুলবার আশায় রুটির দোকানের চাকরি থেকে উদ্ধার করে নিজ গ্রাম মৈমনসিং জেলার অন্তর্গত কাজীর সিমলায় নিয়ে যান ও ভর্তি ক’রে দেন সেখানে দরিরামপুর স্কুলে। কিন্তু এবারও বালক কবির কাছে হার মানল স্কুলের কঠোর শাসন ও নীরস পদ্ধতি। তিনি চলে যান বর্ধমানের রাণীগঞ্জে। বছর খানেক পরেই সেখানকার সিয়ারসোল হাইস্কুলে তিনি আরও তিন বছর টিকে ছিলেন।
এই সময় বেজে ওঠে প্রথম মহাযুদ্ধের দামামা। যে দুর্দান্ত বালক এতদিন ছন্নছাড়ার মত ভাগ্যের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছিল, মহাসিন্ধুর ওপার থেকে ঘন রণভেরী আজ তাকে সত্যিই করল ঘরছাড়া। পরবর্তীকালে পরম উপেক্ষা ভরে নজরুল একদিন বলেছিলেন,—
‘শির হ’তে এই পাঁও তক্ ভাই
লাল লালে লাল খুন মেখে
রণভীতুদের শান্তিবাণী শুনবে কে?’
দেহে স্বাস্থ্য, মনে স্ফূর্তি, মাথা থেকে পা পর্যন্ত টগবগ করছে দুর্দম আবেগ, ভয়ঙ্করের নেশায় মেতে উঠলেন নজরুল। দশম শ্রেণীতে পড়তে পড়তে রাণীগঞ্জ সিয়ারসোল স্কুলের ছাত্র কাজী নজরুল ইসলাম ৪৯নং বাঙালী পল্টনে যোগদান ক’রে সাগর পাড়ি দিলেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে, আমাদের দেশ ও জাতির জীবনে বিশেষ উল্লেখযোগ্য এই ঘটনা। দুর্ধর্ষ সৈনিক জীবন নজরুলকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছিল, একটা বিশিষ্টরূপ দিয়েছিল তাঁর কবি-প্রতিভাকে, তাঁর সাহিত্যকে করেছিল একসঙ্গে ভয়ঙ্কর, মনোহর ও অভিনব। এক কথায় নজরুলের যুদ্ধে যোগদানের ফলাফল সুদূরপ্রসারী হয়েছিল বাঙালীর জাতীয় জীবনে। কবির সৈনিক জীবনে লেখা ‘ব্যথার দান’ ও ‘রিক্তের বেদন’ গ্রন্থের গল্পগুলিতে নানা জায়গার অদ্ভুত ঠিকানা ও বিচিত্র বর্ণনা চরিত্রগুলির চারদিকে একটা রহস্যময় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। কিন্তু শোনা যায়, সৈনিক কবিকে করাচী পর্যন্ত যেতে হয়েছিল মাত্র। ঐখানে বসেই গল্পের মধ্যে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রের যে রোমাঞ্চকর আবহাওয়া গড়ে তুলেছেন, সৈনিক জীবনের ভয়ঙ্কর পরিবেশের মধ্যে প্রবাহিত করেছেন প্রণয়ের ও স্বদেশপ্রীতির যে ফল্গুধারা, তাতে একদিন মুগ্ধ-বিস্ময়ে চমকিত হয়েছিল বাংলা দেশের পাঠক-সমাজ।
তাঁর ঐ চমকপ্রদ রচনাগুলি প্রথম প্রকাশের গৌরব অর্জন করে এম. নাসিরুদ্দীন সাহেবের মাসিক ‘সওগাত’ ও ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির ত্রৈমাসিক মুখপত্র এই পত্রিকা তখন জনাব মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ (পরে ডক্টর) ও জনাব মোজাম্মেল হকের যুক্ত সম্পাদনায় কলকাতা থেকে প্রকাশিত হচ্ছিল।
গল্পগুলি যেমন অভিনবত্বে অসাধারণ, তেমনি নেহাত সাধারণ নয় লেখকের নাম ও পরিচয়। কাজী নজরুল ইসলাম—হাবিলদার, বঙ্গবাহিনী, করাচী। কে এই অদ্ভুত সাহিত্যিক-সেনানায়ক? কোথা থেকে আবির্ভাব হ’ল এঁর? বাংলা দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত ধ্বনিত হ’ল মৃদু গুঞ্জরন।
১৯১৯ সালে যুদ্ধশেষে বাঙালী পল্টন ভেঙে দেওয়া হয়। কাজী নজরুল ইস্লাম তখন কলকাতায় এসে কলেজ স্ট্রীটে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসেই আড্ডা গাড়লেন। তিনি প্রথম দিনেই হয়ে উঠলেন তরুণ সাহিত্যসেবীদের মধ্যমণি। নজরুলের আকর্ষণে অল্পদিনের মধ্যেই সাহিত্য সমিতির অফিস হিন্দু মুসলমান কবি ও সাহিত্যিকদের প্রধান কেন্দ্রস্থল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে অত অল্প সময়ের মধ্যে অতখানি খ্যাতি অর্জন অন্য কোন কবির ভাগ্যে ঘটে নি।
এই সময় নজরুল নিত্য নতুন কবিতা, গল্প ও উপন্যাসের মধ্য দিয়ে যেন দু’হাতে রস বিতরণ করছিলেন। ‘মোসলেম ভারত’ মাসিক পত্রিকায় (সম্পাদক—মোজাম্মেল হক্) তাঁর সুবিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ ও ‘কামাল পাশা’ কবিতা দু’টি একই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়ে বাংলাদেশে মহা তোলপাড় সৃষ্টি করল। দিকে দিকে দেশের যুব-সমাজ যেন এরই মধ্যে খুঁজে পেল নিজের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাণীরূপ। তাদের মনের গহনে পুলক ও বিস্ময়ে ধ্বনিত হ’ল ‘পেয়েছি, পেয়েছি, এ যে সে-ই! আর কেউ নয়, সে-ই!’ এতদিন যেন এই অদ্ভুত মানুষটিকেই খুঁজে বেড়াচ্ছিল তাদের মন। এই সময় ‘মোসলেম ভারতে’র পাতায় দৃপ্ত ভঙ্গীতে কবির হাবিলদার বেশে তোলা ছবি প্রকাশিত হয়েছিল।
‘মোসলেম ভারতে’ ও অন্যান্য সাময়িক পত্রিকায় এ সময়ে প্রকাশিত কবির সুবিখ্যাত কবিতাগুলি সন্নিবেশিত হয় ‘অগ্নিবীণা’ নামক কাব্যগ্রন্থে। কাব্যের নাম যেমন, ‘অগ্নিবীণা’, উৎসর্গ করেছেন তেমনি স্বদেশী যুগের নেতা ‘বারীনদাকে—
‘অগ্নিঋষি, অগ্নিবীণা তোমায় শুধু সাজে
তাইতো তোমার বহ্নিরাগেও বেদন-বেহাগ বাজে।’
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা প্রচ্ছদপটের বীণাখানি জুড়েই শুধু জ্বলছে না আগুনের লেলিহান শিখা, ভেতরের কবিতাগুলির ছত্রে ছত্রে জমাট বাঁধা রয়েছে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। দেশের তরুণ সমাজের মনে আগুন ধরিয়ে দেবার জন্যে কি যথেষ্ট নয়? সাহিত্য সমিতির অফিসে সন্দ্বীপের বিপ্লববাদী কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ সাহেবের সঙ্গে নজরুলের বিশেষ ঘনিষ্ঠতা জন্মে। ১৯২০ সালের কথা। মুজাফ্ফর আহমদের সম্পাদনায় কলকাতা থেকে জনাব এ. কে. ফজলুল হকের দৈনিক পত্রিকা ‘নবযুগ’ বেরুল।
নজরুল ‘নবযুগের’ সহকারী সম্পাদক ছিলেন কিছুদিন। নামের উল্লেখ না থাকলেও তাঁর তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ-বিদ্রূপপূর্ণ বেপরোয়া রচনা চতুর পাঠকের কাছে সহজেই ধরা পড়ে যেত।
এই সময় একবার নজরুল বন্ধু-বান্ধবদের কাউকে কিছু না জানিয়ে কলকাতা থেকে হঠাৎ কোথায় সরে পড়লেন। পরে জানা যায়, ত্রিপুরা জেলার দৌলতপুর গ্রামে গিয়ে কিছুদিন ছিলেন তিনি। কোন কোন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে সেখান থেকে তাঁর মাঝে মাঝে পত্র বিনিময় চললেও নজরুলের কোলাহলপূর্ণ জীবনে এ যেন অনেকটা অজ্ঞাতবাস। কবির জীবনের এক অতি বিষাদ-করুণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িত তাঁর দৌলতপুরের দিনগুলি। তাঁর এক বন্ধুর মধ্যস্থতায় দৌলতপুরের এক সম্ভ্রান্ত বংশের কন্যার সঙ্গে বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম পরিণয়-সূত্রে আবদ্ধ হলেন। আত্মভোলা, উদাসী নজরুল ধরা দিলেন যেমন সহজে, অভিমানে আঘাত লাগায় চিরবিচ্ছেদ বরণ ক’রে নিতেও তাঁর দেরি হ’ল না। এই বিয়োগান্ত ঘটনা কবির দেশজোড়া ভক্ত মহলে বেশী প্রচার লাভ করেনি, নেহাত দু’চারজন ছাড়া সকলের কাছে অজ্ঞাতই ছিল এই সেদিন পর্যন্ত। নজরুল চিরদিনই সাংসারিক বিষয়ে শিশুর মত নির্লিপ্ত ও অনভিজ্ঞ। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থগুলি কত প্রকাশককে ধনী ক’রে তুলেছে, কিন্তু তিনি নিজে ছিলেন চিরকাল কপর্দকহীন। তবু তাঁর অভিমান ও আত্মমর্যাদাজ্ঞান ছিল গগনস্পর্শী। ছোট বড়, উচ্চনীচ সকলের কাছেই তিনি ধরা দিয়েছেন অতি সহজে, যেখানেই আন্তরিকতা পেয়েছেন সেখানেই অবাধে বিলিয়ে দিয়েছেন নিজেকে, জাতিধর্ম-নির্বিশেষে এক মুহূর্তে পরকে আপন ক‘রে নেবার ক্ষমতা ছিল তাঁর অসাধারণ। তবু তিনি সেই নজরুল, যিনি জীবনে মাথা নত করেন নি কারুর কাছে।
‘বল বীর বল উন্নত মম শির
শির নেহারি আমারি নত শির ঐ শিখর হিমাদ্রির।’
তিনি সেই বিদ্রোহী নজরুল, যাঁর এই সদম্ভ ঘোষণা একদিন স্তম্ভিত করেছিল সারা দেশকে। শোনা যায়, তাঁর আপনভোলা স্বভাব ও বিষয়-বিরাগ নিয়ে তাঁর দৌলতপুরের শ্বশুরালয়ে দাসদাসীরা ব্যঙ্গবিদ্রূপ করতে ছাড়েনি। নবপরিণীতা বালিকাবধূর অবজ্ঞা তাঁকে হেনেছিল সবচেয়ে বড় আঘাত। আহত অভিমানে বিবাহবাসর ত্যাগ ক’রে নজরুল সঙ্গে সঙ্গে কুমিল্লা চলে যান। অবোধ বালিকার যখন চৈতন্যের উদয় হয়, বাঁধনহারা কবি তখন নাগালের অনেক বাইরে। শোনা যায়, যতই দিন কেটেছে, পলাতক প্রিয়ের পথ চেয়ে বিরহিণী আপনার মনে তিলে তিলে পুড়ে মরেছে অনুতাপের আগুনে, কিন্তু উদাসী পথিক সে পথে আর ফিরে আসেন নি কোনদিন। পরবর্তীকালে কবি তাঁকে যে চিঠিখানি লিখেছিলেন তার কিছুটা এখানে উদ্ধৃত হ’ল,—
কল্যাণীয়াসু,
তোমার পত্র পেয়েছি সেদিন নববর্ষার নবঘনসিক্ত প্রভাতে। মেঘমেদুর গগনে সেদিন অশান্ত ধারায় বারি ঝরছিল। পনের বছর আগে এমনি এক আষাঢ়ে এমনি বারিধারার প্লাবন নেমেছিল—তা’ তুমিও হয়তো স্মরণ করতে পারো। আষাঢ়ের নবমেঘপুঞ্জকে আমার নমস্কার। এই মেঘদূত বিরহী যক্ষের বাণী বহন ক’রে নিয়ে গিয়েছিল কালিদাসের যুগে রেবা নদীর তীরে মালবিকার দেশে, তাঁর প্রিয়ার কাছে। এই মেঘপুঞ্জের আশীর্বাণী আমার জীবনে এনে দেয় চরম বেদনার সঞ্চয়। এই আষাঢ় আমায় কল্পনার স্বর্গলোক থেকে টেনে এনে ভাসিয়ে দিয়েছে বেদনার অনন্ত স্রোতে।
আমার অন্তর্যামী জানেন, তোমার জন্যে আমার হৃদয়ে কি গভীর ক্ষত, কি অসীম বেদনা! কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি, তা’ দিয়ে তোমায় কোনদিন দগ্ধ করতে চাই নি। তুমি এই আগুনের পরশমণি না দিলে আমি অগ্নিবীণা বাজাতে পারতাম না, আমি ধূমকেতুর বিস্ময় নিয়ে উদিত হ’তে পারতাম না। ...
নিত্য শুভার্থী
নজরুল ইস্লাম।
শোনা যায়, এই মর্মন্তুদ ঘটনা কবির কাব্যসৃষ্টিতে প্রেরণা দিয়েছিল প্রচুর। এই বেদনা করুণ-মধুর ছায়া বিস্তার করেছিল তাঁর উচ্ছ্বসিত সৃষ্টির ’পরে। উপরোক্ত চিঠি থেকে এই ধারণা দৃঢ়তরই হয়।
১৯২১ সাল। অসহযোগ আন্দোলন তখন দেশময় ছড়িয়ে পড়েছে। একটা প্রবল আলোড়নে টলমল করছে সারা দেশ। এই-ই তো চান নজরুল। কুমিল্লায় গিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন আন্দোলনে।
‘ভিক্ষা দাও, ভিক্ষা দাও,
ওগো পুরবাসী,
সন্তান দ্বারে উপবাসী।’
আয় চলে আয় রে ধূমকেতু
আঁধারে বাঁধ অগ্নি-সেতু,
দুর্দিনের এই দুর্গশিরে
উড়িয়ে দে তোর বিজয়কেতন।
অলক্ষণের তিলক রেখা,
রাতের ভালে হোক না লেখা,
জাগিয়ে দে রে চমক মেরে
আছে যারা অর্ধচেতন!
পরম কল্যাণীয়বরেষু,
তোমার কাগজের দীর্ঘ জীবন কামনা করিয়া তোমাকে একটি মাত্র আশীর্বাদ করি, যেন শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে নির্ভয়ে সত্যকথা বলিতে পার। তার পরে ভগবান তোমার কাগজের ভার আপনি বহন করিবেন।
তোমাদের
শ্রীশরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ধূমকেতুর মধ্য দিয়ে সেদিনের সেই বিদ্রোহী কবিকে চেনা যায় সহজে। দিনের পর দিন একদিকে তিনি জড়তা ও অন্ধ মূঢ়তার জন্যে সমাজকে কঠিন আঘাত হেনেছেন, আবার বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে প্রচার করেছেন বিদ্রোহের বাণী। মোহমের শোকাবহ ঘটনার সঙ্গে তিনি তুলনা ক’রে দেখেছিলেন তাঁর স্বদেশের মুসলমান সমাজের অবস্থা। মোহররম সংখ্যা ‘ধূমকেতু’র সম্পাদকীয় প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন—
‘ফিরে এসেছে আজ সেই মোহররম, সেই নিখিল মুলিমের ক্রন্দন-উৎসবের দিন।...কিন্তু তোমার অশ্রু আজ ভণ্ডামি।...চুপ রও কাপুরুষ! ‘হায় হাসান, হায় হোসেন! বলে মিথ্যা বীভৎস চীৎকার ক’রে আর মা ফাতেমার পুত্রশোকাতুর আত্মাকে পীড়িত ক’রে তুলো না। এ ক্রন্দনঅভিনয় দেখিয়ে আল্লার মুখ আর কালো ক’রে দিয়ো না।... তোমার ধর্ম নাই,...তোমার কোরান পর-পদদলিত, যে শির আল্লার আরশ ছাড়া আর কোথাও নত হয় না, সেই শিরকে জোর ক’রে সেজদা করাচ্ছে অত্যাচারী শক্তি, আর তুমি করছ আজ সেই শহীদদের—ধর্মের জন্যে, স্বাধীনতার জন্যে শহীদদের—মাতমের অভিনয়। আফসোস, আফসোস মুসলিম! আফসোস!... তোমার স্বাধীনতাকে, তোমার সত্যকে, তোমার ধর্মকে যে এজিদের বংশধরেরা লাঞ্ছিত, নিপীড়িত ক’রছে, তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের ভূ-অবলুণ্ঠিত শির উঁচু হয়ে উঠুক। ঐ শোনো কাসেমের অতৃপ্ত আত্মা ফরিয়াদ ক’রে ফিরছে—তৃষ্ণা, তৃষ্ণা!’ কারবালার মরুদগ্ধ পিয়াসী চায় নিখিল মুসলিম তরুণের রক্ত, ধর্ম আর স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রাণ বলিদান।...ঐ শোনো সদ্য স্বামীহারা বালিকা সকিনার মর্মভেদী ক্রন্দন, সে চায় না তার স্বামী কাসেমের প্রাণ, সে চায় ইসলামের স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে কাসেমের মত প্রাণ বলিদান।
‘ধূমকেতু’র এই সংখ্যায় ছিল কবির বিখ্যাত ‘মোহর্ম’ কবিতা, আর ছিল মিসেস্ আর. এস্. হোসেনের ‘পিপাসা’ প্রবন্ধ, ধূমকেতুর ‘সন্ধ্যা-প্রদীপ’ বিভাগে থাকত শুধুই মেয়েদের লেখা। বিভিন্ন সংখ্যায় ‘রুদ্রমঙ্গল’, ‘সবাই স্বাধীন সবাই রাজা’, ‘তুবড়ী বাঁশীর ডাক’ প্রভৃতি সম্পাদকীয় প্রবন্ধে নজরুল জ্বালাময়ী ভাষায় কোথাও আহ্বান জানাচ্ছেন— ‘বেরিয়ে এস বিবরের অন্ধকার হ’তে হে আমার বিষধর কালফণীর দল! তোমাদের বিষদাতের ছোবলে ছোবলে ধরণী জর্জরিত হয়ে উঠুক, আসুক নিখিল অগ্নিগিরির বিশ্বধ্বংসী অগ্নিস্রাব, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হোক এ অরাজক বিশ্ব।’ আর কোথাও দেশবাসীর অন্তরের নিদ্রিত সত্যকে জাগিয়ে তোলবার চেষ্টা করছেন, অত্যাচারী অসুরের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন নির্মম আঘাত হেনে সুপ্ত সিংহকে জাগিয়ে তোলার জন্যে। ‘যার অন্তরে আপন সত্য, আপন ভগবান সহজে জাগে না, তাদের ভগবান এমনি ক’রে বুকে লাথি খেয়ে তবে জাগে।...সে-অসুরের পায়ের ধুলো আমি মাথায় নিই, যে-অসুর ভীরু দেবত্বকে পদাঘাত ক’রে পৌরুষ শেখায়, তার সুপ্ত দেবতাকে সিংহবিক্রমে জাগিয়ে তোলে।
দুরন্ত সাহসে নজরুল ক্ষুরধার লেখনী চালিয়ে যাচ্ছেন— ‘জাগো জনশক্তি! মার মার ক’রে ডেকে উঠছে আমার অবহেলিত পদপিষ্ট কৃষক, আমার মুটে-মজুর ভাইরা। তোমার হাতের এ লাঙল আজ বলরাম-স্কন্ধে হলের মত ক্ষিপ্ত তেজে জনগণের মাঝে উৎক্ষিপ্ত হয়ে উঠুক, এই অত্যাচারীর বিশ্ব উপড়ে ফেলুক—উটে ফেলুক! আন তোমার হাতুড়ি, ভাঙ এই উৎপীড়কের প্রাসাদ—ধূলায় লুটাও অর্থ-পিশাচ বলদর্পীর শির। ছোঁড়ো হাতুড়ি, চালাও লাঙল, উচ্চে তুলে ধর তোমার বুকের রক্তমাখা লাল ঝাণ্ডা! যারা তোমাদের পায়ের তলায় এনেছে, তাদের তোমরা পায়ের তলায় আন। সকল অহঙ্কার তাদের চোখের জলে ডোবাও।’
‘ধূমকেতু’র মাধ্যমে একদিকে বিদ্রোহী কবির অনর্গল অগ্নিউদগার, সেই সঙ্গে কখনো কখনো ধ্বনিত হচ্ছে নারী কণ্ঠের গর্জন—‘আমরা চাই আমাদের নারীত্বের সম্মান।... বিশ্বস্রষ্টা দয়াময়ের দেওয়াটুকু কেড়ে নিয়ো না, তার দরবারে বিচারপ্রার্থী হয়ে আসামীর স্থানে দাঁড় করাব, তখন কি জবাব ‘দেবে স্বার্থপর পরস্বাপহারী দস্যু! এ কোন্ দুঃসাহসী নারীর গর্জন? ইনি আর কেউ নন, ‘মা ও মেয়ে’ উপন্যাস রচয়িতা মিসেস্ এম. রহমান। ‘ধূমকেতু’তে প্রায়ই দেখা যেত তাঁর লেখা।
সারথি নজরুলের খাট্টা মিঠা টিপ্পনী ‘ধূমকেতু’র বিশেষ আকর্ষণ ছিল। যেমন—জনৈক দেশ-সেবকের কারামুক্তির সংবাদের শিরোনামা ‘খাঁচার বাইরে’—সেই সঙ্গে মন্তব্য করা হ’ল, ‘ছোট খাঁচা থেকে বড় খাঁচায় এলেন আর কি।’ বাংলাদেশের কোন গ্রামে জমিদার ও প্রজার গোলমালের সম্ভাবনা দেখে পুলিস গুলি চালিয়েছে, এই খবরের ওপর টিপ্পনী—‘চোরে চোরে মাসতুত ভাই। যেমন জমিদার তেমনি পুলিস। একজনের আছে টাকা, আর একজনের গুঁতো, অতএব অর্থসামর্থ্যহীন গরীবদের ওপর বেপরোয়া গুলি চালাবে না তো কি করবে? কিন্তু মনে রেখো, এয়সা দিন নেহি রহেগা।’...এই কৌতুকের পেছনে ছলছল করছে যে অশ্রু, তা পাঠকের চোখ এড়ায় না।
কিন্তু এই বেপরোয়া, নির্ভীক লেখনী চালনা চলল না বেশীদিন, ‘ধূমকেতু’ আপিসে পুলিস হানা দিল, নজরুল রাজরোষে পতিত হয়ে কারারুদ্ধ হলেন। এক সময়ে তিনি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আমাকে এখনো ধরেনি, তার প্রমাণ এই চিঠি, কিন্তু আমি ধরা দেবার দিকেই এগিয়ে চলেছি।’
১৯২৩ সালের ৮ই জানুয়ারী বিচারে রাজদ্রোহের অপরাধে বাংলার বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইস্লামের একবছরের কারাদণ্ড হ’ল।
এর পরে ২৭শে জানুয়ারী তাঁর শিষ্য ও সহকর্মীরা বহু ঝড়ঝাপটা কাটিয়ে আবার যে ‘ধূমকেতু’ প্রকাশ করেন, তার প্রথম সংখ্যা ‘কাজী নজরুল সংখ্যা’ ব’লে অভিহিত হয়েছিল। তাতে লেখা ছিল ‘ধূমকেতু’ হপ্তায় দু’বার দেখা দিবে। সারথি—অমরেশ কাঞ্জিলাল। তাতে প্রকাশিত হয়েছিল কারারুদ্ধ কবির ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’—আদালতে আসামীর কাঠগড়া থেকে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন ক’রে যে অপূর্ব অদ্ভুত, অগ্নিগর্ভ বক্তৃতা দিয়েছিলেন তা’ই। সেকালে প্রবল প্রতাপ ইংরেজের ![]()
কর্ণফুলির তীরে
কাজী নজরুল ইস্লাম, মুহম্মদ হবীবুল্লাহ্ বাহার ও চট্টগ্রামের ছাত্রগণ রাজত্বে এই ধরনের রচনা দূরের কথা, কল্পনাও ছিল মহাপাপ। কাজী নজরুল সংখ্যায় ‘ধূমকেতুর গ্রহণ’ এই শিরোনামায় সারথির কারাদণ্ডের সংবাদ ঘোষণা করা হয় এভাবে—‘ধূমকেতুর সারথি, প্রতিষ্ঠাতা উদ্দাম উন্মাদ কাজী নজরুল ইসলাম ব্যুরোক্রেসীর রাজদ্রোহ অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে একবছরের জন্যে কঠিন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন।... আজ কয়েকদিনের অদর্শনের পর মেঘ, বাদল, বর্ষা, বজ্র ফুঁড়ে ধূমকেতু আবার আপনাদের সামনে উদয় হ’ল শুধু তাঁরই কথা নিয়ে।’
এ সংখ্যার সম্পাদকীয় প্রবন্ধে বলা হয়েছিল,—‘নজরুল আমাদের লক্ষ্মীছাড়া দলের চরম লক্ষ্মীছাড়া। সে বাঁধনহারা ক্ষ্যাপা, কিন্তু অক্লান্ত কর্মী। সে রোজগার করে মুঠো মুঠো টাকা, আর খরচ করে জলের মত, তাও দেশ কাল পাত্রের বন্ধন তার নেই, যেখানে সেখানে, যখন তখন, খাবার বেলায় প্রায়ই ভাতে ভাত, শোবার বেলায় প্রায়ই ছেঁড়া কম্বল, ছেঁড়া কাঁথা, বালিশের বদলে কাগজের তাড়া উপাধান।...লক্ষ্মীছাড়াদের কথা তার মুখে আর একবার শুনুন—
‘এস আমার লক্ষ্মীছাড়া গৃহহারা ভাইরা!...তোমাদের জন্যে গৃহ নাই, তোমাদের জন্যে দয়া নাই, এই দুর্দিনে তোমাদের ঘরে ডেকে নেবার কেউ নেই, তোমাদের ডাক দিয়েছে ঐ ঝড় বাদলের উতল হাওয়া আর মাটির মায়ের সিক্ত কোল। এস আমার অনাদৃত লাঞ্ছিত ভাইরা, আমরাই নতুন ক’রে আমাদের জ্বালার জগৎ সৃষ্টি করব।... মহামারী, মারীভয়, ধ্বংস আমাদের উল্লাস...এস আমার রুদ্র তাপস তরুণের দল। এই অমঙ্গল অভিশাপ আর শনির জ্বলা রুদ্র চুল্লীর মধ্যে বসে তোমাদের নব সৃষ্টির সাধনা করতে হবে। তোমাদের এই রুদ্র তপস্যার প্রভাবে সকল নরকাগ্নি ফুল হয়ে ফুটে উঠবে, যেমন ইব্রাহিমের পরশে নমরুদের জাহান্নম ফুল হয়ে হেসে উঠেছিল। এস আমার রুদ্র তরুণ তপস্বীর দল! তোমাদের ধ্বংসের নামে আহ্বান করছি। এস!’
কিছুদিন আলীপুর সেণ্ট্রাল জেলে থাকার পর নজরুল ইস্লাম হুগলী জেলে স্থানান্তরিত হলেন। কবির কারাবাস তাঁর বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবনের আর-এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। শৃঙ্খলের বন্ধন তাঁর কবিতা রচনায়, হাসিগান ও কোলাহলে কিছু বাধা সৃষ্টি করতে পারে নি। বরং বিদ্রোহী কবির প্রাণশক্তি ও স্বদেশপ্রেম বন্দীজীবনে যেন আরও শতধারে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। জেলের নিয়মকানুন ও শৃঙ্খলা অগ্রাহ্য ক’রে জীবনটাকে যেন আরও প্রচণ্ডভাবে উপভোগ করবার উল্লাসে মেতে উঠলেন তিনি। তাঁর আশেপাশে কারাপ্রাচীরের অন্তরালে আবদ্ধ ছিলেন তখন বহু স্বদেশ প্রেমিক নেতা ও তরুণদল। বিদেশী শাসনকে ভ্রুকুটি দেখিয়ে তীব্র ব্যঙ্গবিদ্রূপপূর্ণ গান রচনা করা, গান গাওয়া, উল্লাসের কলরোল ও নিত্য নতুন হট্টগোল সৃষ্টির ব্যাপারে কবিকে আরও প্রেরণা দিত তাঁদের সাহচর্য।
‘আমি দুর্বার
আমি ভেঙে করি সব চুরমার!
আমি অনিয়ম, উচ্ছৃঙ্খল;
আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম-কানুন শৃঙ্খল!
আমি মানিনাকো কোন আইন,
আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো,
আমি ভীম ভাসমান মাইন!’
—এই যাঁর পরিচয়, সেই অদ্ভুত, দুর্দান্ত কয়েদীকে জেল কর্তৃপক্ষ নানাভাবে শাস্তি দিয়েও শায়েস্তা করতে পারেন নি।
শাস্তির প্রতিবাদে বরং নজরুল অনশন ধর্মঘট ক’রে বসলেন। চল্লিশ দিনব্যাপী এই অনশনে কবির জীবনের আশঙ্কায় দেশবাসী বিচলিত হ’য়ে পড়ল। রবীন্দ্রনাথ, চিত্তরঞ্জন দাস, আবদুল্লাহ্ সরওয়ার্দি প্রভৃতি দেশবিখ্যাত নেতা থেকে শুরু ক’রে ছোট-বড় সকলের মধ্যেই দেখা দিল দারুণ উদ্বেগ। কলকাতায় বিরাট জন-সভার আয়োজন ক’রে দেশবাসী সরকারের অসঙ্গত ব্যবহারের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানালেন। সভার তরফ থেকে কবিকেও অনশন ত্যাগের অনুরোধ জানানো হ’ল। নজরুলের গুণমুগ্ধ রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং তার-যোগে বাংলা সাহিত্যের নামে দাবী জানালেন—‘Give up hunger strike, our literature claims you.’—‘অনশন ত্যাগ কর। আমাদের সাহিত্য তোমাকে দাবী করে।’ শোনা যায়, নজরুলের জননী যাহেদা খাতুন এই সময় পুত্রের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যে জেলখানা পর্যন্ত ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু সাক্ষাতের অনুমতি পান নি। অনশনের চতুর্থ সপ্তাহে নজরুলের প্রিয়বন্ধু হাস্যরসিক নলিনীকান্ত সরকার তাঁর অন্যতম সুহৃদ্ সুসাহিত্যিক পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে কারাগারে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান, কিন্তু এবারও কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিলেন না। কিন্তু এঁরা হতাশ হয়ে ফিরে যাবার লোক নন। অগত্যা স্টেশনের ধারে জেলখানার পাঁচিলের বাইরে নলিনীকান্ত পবিত্রর ঘাড়ে পা দিয়ে মাথা উঁচু ক’রে দাঁড়ালেন। আর এদিকে খবর পেয়ে জেলখানার ভেতরে নজরুল দু’জনের কাঁধে ভর দিয়ে টলতে টলতে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন; ইশারায় জানাচ্ছেন, অনশন ভঙ্গ করা সম্ভব নয়। এই অদ্ভুত সাক্ষাতের দৃশ্য দেখবার জন্যে জেলখানার ভেতরের মাঠে তখন রীতিমত ভিড় জমিয়েছে তরুণ বন্দীর দল।
অবশেষে চল্লিশদিন পর কবি অনশন ভঙ্গ করেন। পরবর্তীকালে কারাবাসের নানা চিত্তাকর্ষক বর্ণনা দিয়ে নজরুল গল্পের আসর গুলজার ক’রে তুলতেন। কারাবাসের সময়েই গুণগ্রাহী কবিসম্রাট রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বসন্ত’ নাটকখানি উৎসর্গ করেন নজরুলের নামে। হুগলী জেল থেকে কবিকে পরে স্থানান্তরিত করা হয় বহরমপুর জেলে। কারাদণ্ডের অবসানে ১৯২৪ সালে কবি কলকাতায় আশালতা সেনগুপ্তার সঙ্গে পরিণয় প্রীতিপাশে আবদ্ধ হন। এই বিবাহের উদ্যোগ করেন কবির মাতৃসমা মিসেস এম. রহ্মান। বিয়ের পর হুগলী বাসকালে মিসেস এম. রহ্মানের সঙ্গে কবির স্নেহের সম্পর্ক দৃঢ়তর হয়। তাঁর মধ্যে মাতৃস্নেহের সন্ধান পেয়ে স্নেহকাঙাল কবি তাঁকে মাতৃ সম্বোধন করতেন। পরে ‘বিষের বাঁশী’ কাব্যগ্রন্থ তাঁর নামে উৎসর্গ করতে গিয়ে কবি একটি সুন্দর কবিতায় অভিনন্দিত করেছিলেন তাঁকে।
বিবাহের ফলে বাঁধনহারা কবি সংসারের বন্ধনে ধরা দিলেন কিন্তু আপনভোলা, নিরাসক্ত নজরুল এতদিন পর কেমন সংসারী হলেন, যাঁরা তাঁর নিকট-সংস্রবে ছিলেন, তা’ শুধু তাঁরাই জানেন। বিয়ের পর থেকে কবির বিধবা শাশুড়ীও কবির পরিবারভুক্ত হন। চিরকালের সেই উদাসীন নজরুলের স্বভাবে কোন পরিবর্তন আনতে পারল না তাঁর সংসার জীবন। সেই চিরদিনের মতই রইল তাঁর গতিবিধি সম্পূর্ণ অনিশ্চিত; অগণিত ভক্তের সমাগমে বাড়ী সরগরম, হয়ত সময়ে অসময়ে বন্ধুবৎসল নজরুল ধরে বসেছেন বন্ধুদের, না খেয়ে যেতে দেবেন না; এদিকে হয়ত অর্থাভাবে বাড়ীতে রান্নার কোন ব্যবস্থাই হয় নি সেদিন।
কবিপত্নী সেদিনের সেই আশালতাই আজ প্রমীলা নজরুল নামে পরিচিত। সেই থেকে আজও পর্যন্ত তিনি কবির সুখদুঃখের সমভাগিনী। এমন কি অদৃষ্টের নির্মম বিধানে দুরারোগ্য রোগ-ব্যাধি পর্যন্ত স্বামীর সঙ্গে সমানভাবেই ভাগ ক’রে নিয়েছেন তিনি।
কিছুদিন পর হুগলী ছেড়ে কবি সপরিবারে বসবাস করতে লাগলেন কৃষ্ণনগরে। তাঁর বিখ্যাত ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসে কৃষ্ণনগরের চিত্রই এঁকেছেন তিনি। কৃষ্ণনগর থেকে কলকাতায় তাঁর যাতায়াত চলত। ১৯২৬ সালে কলকাতায় যে ভীষণ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়, তিনি সেই উপলক্ষে তাঁর দেশবিখ্যাত জাতীয় সংগীত ‘দুর্গমগিরি কান্তার মরু’ রচনা করেন। দেশের এক গভীর সঙ্কটের সময় তিনি এই সংগীতের মধ্য দিয়ে দেশবাসীকে এবং বিশেষ ক’রে নেতৃবৃন্দকে চরম সাহস ও পরম সতর্কতার সঙ্গে অগ্রসর হবার জন্যে মর্মভেদী আহ্বান জানান। কৃষ্ণনগরে থাকাকালে কম্যুনিষ্ট পার্টির মুখপত্র ‘লাঙ্গলের’ পরিচালনার ভার অনেকটা তাঁর ওপরেই পড়েছিল। মানবতার কবি নজরুলের কাব্যসৃষ্টি এসময় এক বিশিষ্ট রূপ পরিগ্রহ করে। বঞ্চিতের ব্যথা ও সর্বহারার হাহাকার—তাঁর এই সময়কার কাব্যের মর্মকথা; শুধু তাই নয়, ভেদাভেদহীন অভিনব এক সাম্যের জগৎসৃষ্টির সম্ভাবনাময় আশার বলিষ্ঠ ইঙ্গিত তাঁর এ যুগের কাব্যকে মহনীয় ক’রে তুলেছে। তাঁর ‘চাষীর গান’ ‘সাম্যবাদী’ প্রভৃতি গান ও কবিতা সাপ্তাহিক ‘লাঙ্গল’ পত্রিকাকে জনপ্রিয় ক’রে তুলেছিল। এর পর কমরেড মুজাফফর আমদের সম্পাদনায় ‘লাঙ্গল’ যখন ‘গণবাণী’ নামে প্রকাশিত হ’তে থাকে, তখনো এর পরিচালনার ব্যাপারে নজরুল ছিলেন তাঁর সহকর্মী।
কবির কাব্যজীবনে একটা বিশিষ্ট স্থান অধিকার ক’রে আছে তাঁর চট্টগ্রাম সফর। নজরুল তাঁর অনুজপ্রতিম হবীবুল্লাহ্ বাহারের উদ্যোগেও আমন্ত্রণে ১৯২৬ সালের শেষাশেষি ও ১৯২৯ সালের গোড়ার দিকে পর পর দু’বার চট্টগ্রাম পদার্পণ করেন। এই সফরের মধুময় ফল ‘সিন্ধুহিন্দোল’ ও ‘চক্রবাক’ কাব্যগ্রন্থে সন্নিবেশিত কবির কতকগুলি শ্রেষ্ঠ কবিতা।
ইতিমধ্যে কবির কাব্যপ্রবাহে এসেছে নতুন ঢল; কবি সংগীত রচনায় মনপ্রাণ ঢেলে দিয়েছেন। নলিনীকান্ত সরকার লিখেছেন, তাঁর বাসায় বসে একদিন নজরুল পথচারী দু’জন হিন্দুস্থানী ভিখারী ও ভিখারিণীর কণ্ঠে গজল গান শুনে নতুন প্রেরণা লাভ করেন। পথ থেকে ডেকে এনে কবি তাদের গান শুনলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে রচনা করে ফেললেন গজল গান। তার পর থেকে নজরুল কাব্যে বয়ে চলেছে গানের অফুরন্ত স্রোত। কবির আর্থিক অনটনের সুযোগ নিয়ে গ্রামোফোন কোম্পানীগুলি কবিকে পেয়ে বসল। তাঁদের ফরমায়েশ মত আটঘাট-বাঁধা সময় ও পরিসর অনুসারে বাঁধাধরা গায়ক বা গায়িকার জন্যে রেকর্ডের গান রচনায় নজরুল কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন সত্যি, কিন্তু কবির স্বতঃস্ফূর্ত কাব্য-রসের স্রোত তাতে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে, সন্দেহ নেই। তা সত্ত্বেও কবির রচিত অসংখ্য গানের মধ্যে অনেকগুলি সাহিত্যের স্থায়ী সম্পদ ব’লে গণ্য হবে। ‘চোখের চাতক’ ও ‘বুলবুল’ কাব্যগ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়েছে এসব গান।
গানের ফোয়ারা যখন শতধারে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে, সেই সময় অকস্মাৎ কবির দুয়ারে হানা দিল মর্মান্তিক মৃত্যুশোক। কবির চার বৎসর বয়সের প্রাণবন্ত শিশুপুত্র ‘বুলবুল’ দুরন্ত বসন্ত রোগে মারা গেল। শৈশব থেকে শত দুঃখ-দুর্দশা যে কবিকে কাবু করতে পারেনি, সন্তান-বিয়োগ ব্যথায় সত্যিই তিনি মুষড়ে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে একটা লক্ষ্যযোগ্য মোড় ঘুরে গেল তাঁর কাব্য-প্রতিভার। শোকাতুর কবি শান্তি খুঁজে নিলেন অধ্যাত্ম রাজ্যে। মন অন্তর্মুখী হ’লেও তেমনি অব্যাহতই রইল তাঁর আনন্দ ও উল্লাস; তেমনি অবিশ্রাম সৃষ্টি ক’রেই চলেছে তাঁর লেখনী। বরং সৃষ্টিশক্তির নূতন নূতন দুয়ার খুলে গেছে জীবনের এই নূতনতম অধ্যায়ে। সংগীতে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে বহু লুপ্তপ্রায় রাগরাগিনী উদ্ধার ক’রে কবি শুধু যে সেই সুরেই গান রচনা করেছেন তা’ নয়, নির্ঝরিণী, সন্ধ্যামালতী, দোলনচাঁপা প্রভৃতি নব নব রাগিনীও সৃষ্টি করেছেন এ যুগে।
এই সময় কলকাতা থেকে মুক্তবুদ্ধি, প্রগতিপন্থী মুসলিম সমাজের মুখপত্র ‘বুলবুল’ সাহিত্য পত্রিকা (সম্পাদক—মুহম্মদ হবীবুল্লাহ্ বাহার ও বেগম শামসুন নাহার) প্রকাশিত হচ্ছিল। ‘বুলবুলের’ সাহিত্য-বাসরে নেতৃত্বের আসন স্বাভাবিকভাবেই অধিকার করেছিলেন নজরুল। ‘বুলবুলে’ নিয়মিতভাবে বেরুত তাঁর রচনা। ‘বুলবুল’ পত্রিকার উপর বর্ষিত হয়েছিল কবির পুত্র-বিয়োগ-বিধুর চিত্তের অপরিসীম স্নেহ।
কিন্তু এই নবসৃষ্টির যুগে কবির পারিবারিক আকাশ ঘিরে দুর্ভাগ্যের কালো মেঘ ক্রমেই পুঞ্জীভূত হয়ে আসছিল। দুরারোগ্য পক্ষাঘাত রোগে পঙ্গু হয়ে পড়লেন কবি পত্নী; নিষ্ফল হ’ল সকলরকম চিকিৎসা। ক্রমে কবির মধ্যেও মানসিক ব্যাধির লক্ষণ প্রকট হয়ে উঠছিল।...দেশ ও জাতির পরমপ্রিয় বিদ্রোহী কবি এভাবে জাতির জীবন থেকে, ক্রমে একেবারেই বিদায় গ্রহণ করলেন।...কিন্তু সে কি শুধু বাহ্যিক ব্যাপার নয়! দেশবাসীর মাঝখান থেকে নিষ্ঠুর নিয়তি যাঁকে ছিনিয়ে নিল, দেশ যে তাঁকে হৃদয়ের আসনে বরণ ক’রে রেখেছে চিরকালের জন্যে!