বিষয়বস্তুতে চলুন

নজরুলকে যেমন দেখেছি (১৯৫৮)/‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’

উইকিসংকলন থেকে

‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’

মুহম্মদ হবীবুল্লাহ্‌, বাহার

 প্রথম মহাযুদ্ধ শেষ হয়েছে। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ দেশজোড়া শান্তি উৎসবের আয়োজন করছেন। মওলানা মোহাম্মদ আলী, শেখুল হিন্দ মাহমুদউল হাসান প্রমুখ নেতাগণ ঘোষণা করেছেন—শান্তি উৎসবের সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্ক নেই। ধীরে ধীরে গান্ধীজীর নেতৃত্বে হিন্দুরাও এসে এই আন্দোলনে যোগ দিলেন। খিলাফতের অবিচার—জালিয়ানওয়ালাবাগের অত্যাচারের প্রতিবাদে দেশ মুখর হয়ে উঠল।

 আমরা তখন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুলের ছাত্র। চট্টগ্রাম বহুদিন থেকেই বিপ্লববাদ ও সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্র। চট্টগ্রামে আবার বিপ্লবীর আড্ডা মিউনিসিপ্যাল স্কুল। অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের বীর সেনাপতি অনন্তলাল সিং, গণেশচন্দ্র ঘোষ, প্রমোদরঞ্জন চৌধুরী এই স্কুলে ছিল আমার সহপাঠী।

 অসহযোগ আন্দোলনের জোয়ার আমাদের গায়ে এসেও লাগছিল। এক-একবার মন উতলা হয়ে ওঠে। এক-একবার ভাবি গতানুগতিকভাবে জিওমেট্রির থিওরেম মুখস্থ ক’রে জীবন কাটানো—তা’ আর করছিনে। বিপিন পালের মুখে শুনলাম, তাঁরা তিন বন্ধুতে মিলে রক্তের অক্ষরে লিখে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন: সাম্রাজ্যবাদের অধীনে তাঁরা চাকরি করবেন না। আমরাও প্রতিজ্ঞা করলাম, জীবনে আর যা’ই করি, চাকরি গ্রহণ করব না, করব না, করব না।

 অসহযোগ, বিপ্লব ও বিদ্রোহের নিত্য নতুন আইডিয়া মাথায় আসতে লাগল। ক্লাসের নীরস আবহাওয়ায় মনকে আর বেঁধে রাখা যায় না। মেতে উঠলাম জীবনের বৈচিত্র্যের সন্ধানে। রামমূর্তির সার্কাস, মুকুন্দ দাসের যাত্রা, বিপিন পাল ও শওকত আলীর বক্তৃতা, দোভাষীর জাহাজ ভাসানো, কর্ণফুলীতে সাম্পান চালানো, ফুটবল, দাঁড়িয়াবান্ধা খেলা, এ সবে আর মন ভরছে না। কয় বন্ধুতে মিলে হাতের লেখা কাগজ বার করা গেল। গণেশকে নিয়ে ছেলেদের জন্যে এক লাইব্রেরী তৈরি ক’রে ফেললাম, এর সঙ্গে প্রমোদকে নিয়ে ব্যায়ামের জন্যে ক্লাব। অনন্ত আরও খানিকটা নতুনত্বের সন্ধান দিল—পাঁচকড়ি দে’র ডিটেকটিভ, তীরধনু, ম্যাজিক, তার নিজের তৈরি বাঁশের বন্দুক। তার পর রবীন্দ্রনাথ ও মাইকেলের কবিতা আবৃত্তি। মন তবু ভরে না—চাই নতুন কিছু; তাজা আনকোরা, যাতে পাওয়া যাবে প্রাণশক্তির উল্লাস।

 মন যার জন্যে উতলা হয়ে উঠেছিল, একদিন তার সন্ধান মিলল। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, কলকাতা থেকে কয়েক কপি ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

 একদিন পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে একটা গল্পের উপর চোখ পড়ল। গল্পটির নাম ‘হেনা’। লেখকেরও অদ্ভুত নাম: কাজী নজরুল ইসলাম, হাবিলদার বঙ্গবাহিনী, করাচী। কয়েক লাইন পড়েই লাফিয়ে উঠলাম।

 “ওঃ কি আগুন বৃষ্টি! আর কি তার ভয়ানক শব্দ! গুড়ূম, দ্রুম দুম! আকাশের একটুও নীল দেখা যাচ্ছে না, যেন সমস্ত আসমান জুড়ে আগুন লেগে গেছে। গোলা আর বোমা ফেটে ফেটে আগুনের ফিন্‌কি এত ঘন বৃষ্টি হচ্ছে যে, অত ঘন যদি জল ঝরত আসমানের নীল চক্ষু বেয়ে, তা’ হ’লে একদিনেই সারা দুনিয়া জলে জলাকার হয়ে যেত।”

 তার পর ছায়াচিত্রের মত চোখের সামনে ভেসে উঠল ‘সিন নদীর ধারে তাম্বু; ফ্রান্স’, ‘প্যারিসের পাশে ঘন বন,’ ‘হিডেনবার্গ লাইন,’ ‘কোয়েটার দ্রাক্ষাকুঞ্জস্থিত আমার ছোট্ট কুটির,’ ‘ডাক্কা ক্যাম্প, কাবুল’......ইত্যাদি।

 লেখাটা গণেশকে পড়ে শোনালাম। পড়ে গণেশ বললে, তাইতো, চমৎকার, খাসা! উনপঞ্চাশ বাহিনীর হাবিলদার, বন্দুক ছেড়ে গল্প লিখতে বসেছে। আচ্ছা, লোকটা কবিতা লেখে না কেন? কিছুদিন পরেই হাবিলদার লেখকের কবিতার সন্ধান মিলল, ‘মোসলেম ভারত’ কাগজে।

“শাতিল আরব! শাতিল আরব!
পূত যুগে যুগে তোমার তীর।
শহীদের লোহু, দিলীরের খুন
ঢেলেছে যেখানে আরব বীর।
সাহারায় এরা ধুঁকে মরে তবু

* * * *

পরে না শিকল পদ্ধতির

শাতিল আরব! শাতিল আরব!
পূত যুগে যুগে তোমার তীর!
শহীদের দেশ, বিদায় বিদায়!
এ অভাগা আজ নোয়ায় শির।”

 রক্ত নেচে উঠল। তার পর কয়েক মাসের মধ্যেই ‘মোহরূম,’ ‘কোরবাণী’ ‘খেয়া পারের তরণী’, ‘আনোয়ার’, ‘কামাল পাশা’, ‘বিদ্রোহী’—ছাপার অক্ষরে দেখা দিতে লাগল মাসিকের পাতায়। কি সৌভাগ্য আমাদের! কি বিস্ময়! ভাষা ও ছন্দের বৈচিত্র্যে, ভাবের উদ্দাম প্রবাহে, বলবার বলিষ্ঠ ভঙ্গীতে প্রত্যেকটি কবিতাই আগুনের শিখার মত প্রোজ্জ্বল, উজ্জ্বল, লেলিহান! এতদিন ধরে আমরা যার সন্ধান করছিলাম, এ যে তাই! বিপ্লবের অগ্নিদীক্ষার পর আমাদের মনে যে ভাবগুলো ভিড় জমিয়েছিল, কবি প্রকাশ করছেন তাই আগুনের ভাষায়।

 নজরুল কাব্যে এই যে আমাদের অবগাহন, এ থেকেই সূত্রপাত হ’ল আমাদের সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক জীবনের। ব্যক্তিগতভাবে যে কথা বলা হ’ল,—বাংলার বহু সাহিত্যিক, বহু কবি, বহু শিল্পী, বহু রাজনৈতিক কর্মীর নজরুল ইসলাম সম্বন্ধে এই-ই বলবার কথা।

 এক কথায় বলতে গেলে নজরুল ইস্লামের কাব্য আমরা শুধু পড়ি নি। এতে করেছি আমরা অবগাহন। তাই এর বিচার করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সাপুড়ের বাঁশীর মত এ আমাদের করেছে ঘরছাড়া, শুধু আমাদের, মানে মুসলমান ছেলেদের নয়, বিপ্লবী হিন্দু ছেলেদের মনেও দিয়েছে এ অদ্ভুত রকমের দোলা। অনন্ত সিংহের কাছে শুনেছি, আলীপুর জেল থেকে আন্দামানে যাওয়ার পথে, এমন কি আন্দামান জেলে বাংলার বিপ্লবী তরুণের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে নজরুলের গান:—

“শিকল পরা ছল মোদের
এই শিকল পরা ছল,
এই শিকল প’রেই শিকল তোদের
করব রে বিকল।

* * *

ক্রন্দন নয় বন্ধন এই শিকল ঝন্‌ঝনা,
এ যে মুক্তিপথের অগ্রদূতের চরণ বন্দনা।”

 প্রমোদরঞ্জন ফাঁসি যাওয়ার সময় নাকি গর্জে উঠেছিল কবির ভাষায়:—

“মোরা ফাঁসি প’রে আনব হাসি
মৃত্যুব্জয়ের ফল,
মোদের অস্থি দিয়ে জ্বলবে দেশে
আবার বজ্রানল।”

 জেলখানায় ইংরেজ জেল-সুপারিণ্টেণ্ডেণ্ট বিপ্লবী যুবকদের ওপর জুলুম করছেন—তার পাল্টা জবাব দিতে হবে।

 কাজীদা’ লিখলেন:—

“তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে
তুমি ধন্য, ধন্য হে।
আকাড়া চালের অন্ন লবণ,
করেছ আমার রসনা লোভন
বুড়ো ডাঁটা ঘাঁটা ‘লাপ্‌সী’ শোভন
তুমি ধন্য, ধন্য হে।”

 অসহযোগ আন্দোলনের আগে ফজলুল হক সাহেবের দৈনিক কাগজ ‘নবযুগ’ বেরিয়েছে। এর সম্পাদনার ভার মুজফফর আহমদ সাহেবের উপর। কাগজখানির অভিনবত্ব সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। এমন অদ্ভুত হেডিং কেউ দেখে নি।

‘এদেশ ছাড়বি কিনা বল
নইলে কিলের চোটে হাড় করিব জল।’
‘কালতে ধলাতে লেগেছে এবার মন্দ মধুর হাওয়া
দেখি নাই কভু দেখি নাই ওগো, এমন ডিনার খাওয়া।’
‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার
পরাণ সখা ফৈসুল হে আমার।’

আমরা নজরুল ইস্‌লাম ‘নবযুগে’র ছিলেন সহকারী সম্পাদক। কিন্তু এই হেডিং আর অভিনবত্বের গোড়ায় ছিলেন তিনিই। ১৯২২ সনের ১১ই অগস্ট আবির্ভাব হ’ল দ্বি-সাপ্তাহিক কাগজ ধূমকেতুর। ‘মাভৈঃ বাণীর ভরসা নিয়ে, জয় প্রলয়ংকর বলে ধূমকেতুকে রথ ক’রে সারথির যাত্রা শুরু হ’ল। ‘ধূমকেতু’র জন্যে আমাদের মনে দস্তুরমত নেশা ধরেছিল। এর কপি পাবার জন্যে এক-একদিন বসে থাকতাম গিয়ে পোষ্টাফিসে। এই সারথি আর কেউ নয়—কাজী নজরুল ইস্‌লাম। তখনো কাজীদা’কে দেখি নি। কলকাতা-ফেরত ছেলেদের কাছে শুধু গপ্প শুনেছি— সৈনিক-কবি হাবিলদার কাজী নজরুল ইস্‌লাম করাচী থেকে কলকাতায় এসে আসর জমিয়েছেন। যোধপুরী ব্রিচেস প’রে, ময়ূরকণ্ঠি রঙের কোট গায়ে ঘুরে বেড়ান তিনি কলকাতার রাস্তায়। অদ্ভুত লোক, জাত-বোহেমিয়ান; হাসে, গায়, লোকটা একাই একশ’। মুখে কথার খই ফোটে, গানের ঝরনা বয়ে যায় গলায়।

 কাজী সাহেবের সঙ্গে প্রথম দেখা আমার হুগলীতে, কিন্তু তার বহু আগেই তাঁকে মেনে নিয়েছি জীবন-পথের অগ্রদূত হিসেবে। হঠাৎ একদিন বন্ধুবর মঈনুদ্দীনের সঙ্গে হুগলীতে রেলের লাইনের ধারে তাঁর বাড়ীতে গিয়ে হাজির হলাম। শুনলাম, তিনি উত্তরপাড়ায় এক সভায় গেছেন। রাত্রি ন’টার সময় তিনি ফুলের মালা গলায় পরে বাড়ী ফিরে এলেন। বিশেষ পরিচয় ক’রে দিতে হ’ল না। দেখেই তিনি হেসে উঠলেন, যেন যুগ যুগের চেনা। উপস্থিত কেউ বুঝতেও পারল না, সেই আমাদের প্রথম পরিচয়।

 কাজী সাহেব চট্টগ্রামে আমাদের বাড়ী গিয়েছেন কয়েকবার। যে কয়দিন তিনি ছিলেন চট্টগ্রামে, মনে হ’ত বাড়ীখানি যেন ভেঙে পড়বে। রাত্রি দশটায় থারমোফ্লাস্ক ভ’রে চা, বাটাভরা পান, কালিভরা ফাউণ্টেন পেন, আর মোটা মোটা খাতা দিয়ে তাঁর শোবার ঘরের দরজা বন্ধ ক’রে দিতাম। সকালে উঠে দেখতাম, খাতা ভর্তি কবিতায়। এক-এক ক’রে ‘সিন্ধু’ ‘তিন তরঙ্গ,’ ‘গোপন প্রিয়া’, ‘অনামিকা’, ‘কর্ণফুলী’, ‘মিলন মোহানায়’, ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’, ‘নবীনচন্দ্র’, ‘বাংলার আজিজ’, ‘শিশু যাদুকর’, ‘সাত’ভাই চম্পা’—আরও কত কবিতা লিখেছেন আমাদের বাড়ীতে বসে। চট্টগ্রামের নদী, সমুদ্র, পাহাড়, আমাদের বাড়ীর সুপারি গাছগুলো আজ অমর হয়ে আছে তাঁর সাহিত্যে।

 সারা রাত কবি চা আর পান খেতেন—আর খাতা ভর্তি করতেন কবিতা দিয়ে। দুপুরে কখনো কিছু পড়তেন, কখনো করতেন পামিষ্টীর চর্চা, কখনো বা মশগুল হতেন দাবা খেলায়। বিকেলে দল বেঁধে যেতাম নদীতে, সমুদ্রে। সাম্পানওয়ালারা এসে জুটত, সুর ক’রে চলত সাম্পানের গান। সবাই মিলে গান ধরতাম। ‘আমার সাম্পান যাত্রী না লয়, ভাংগা আমার তরী’...‘ওগো গহীন জলের নদী’... ...... এক-এক সময় চট্টগ্রামী সাম্পানওয়ালারা গাইত—‘বঁধুর আমার চাটিগাঁ বাড়ী—বঁধুর আমার নন্দীর কূলে ঘর—কর্ণফুলীর উত্তর পারে লালকুঠির উপর বন পুড়িতে সকলে দেখে, মন পুড়িতে কেউ না দেখে, বন-পোড়া হরিণীর মত কবাব হইলাম মুই নারী, বঁধুর আমার চাটিগাঁ বাড়ী।’

 এক-একবার বেড়াতে যেতাম ঘোড়ায় চ’ড়ে পাহাড়ে। কখনো পরতেন তিনি আরবী পোষাক, কখনো বা ব্রিচেস। কাজী সাহেবকে নিয়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পাহাড়, জঙ্গল, হ্রদ, জলপ্রপাত, খালবিল, নদী-চরে বেড়িয়েছি। সঙ্গে ছেলের দল। এত বড় বিদ্রোহী বীর, কিন্তু জোঁককে তিনি বড় ভয় করতেন। একবার সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে উঠে জোঁকের ভয়ে আর তিনি নামতে চান না। কয়েকজনে মিলে কাঁধে ক’রে তাঁকে নামাতে হয়েছে শেষ পর্যন্ত।

 আমার জীবনের একটা মজার ঘটনা কাজী সাহেবকে নিয়ে। আমার আত্মীয়েরা সকলেই প্রায় সরকারী চাকুরে। সবাই ধরে বসলেন আমাকে আই. পি. এস. পরীক্ষা দিতে হবে। পরীক্ষায় পাস হলাম, ডাক্তারী পরীক্ষা হয়ে গেল। শুধু Secretary of Stateএর মঞ্জুরী বাকী। কাজী সাহেবের সঙ্গে পরামর্শ ক’রে ঠিক করা হ’ল, নিযুক্তি-পত্র এলে কলিকাতা কংগ্রেসের সময় মঞ্চের উপর উঠে পদত্যাগের কথা ঘোষণা করতে হবে। কাজীদা’র ভক্ত-শিষ্য পুলিসের চাকরি করবে, তিনি সইতে পারতেন না। পদত্যাগ আমাকে আর করতে হয় নি। কথাটি আগেই বেরিয়ে পড়েছিল। টেগার্ট সাহেবের দৌলতে ইংরেজের চাকরির খাতা থেকে আমার নাম কেটে যায় চিরদিনের জন্যে। আমি তখন কাজী সাহেবকে নিয়ে সভা ক’রে বেড়াচ্ছি। কাজী সাহেব বক্তৃতা করছেন—‘গান্ধীজীর দল কাটছে চরকা— আমরা কাটব মাথা।’ কাজী সাহেবের মনে কারুর প্রতি বিদ্বেষ দেখিনি কোনদিন। তিনি ছিলেন সকল ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে। মাঝে মাঝে তিনি বলতেন—

দে গরুর গা ধুইয়ে।

 গরুর গায়ে পানি ঢেলে দিলে সে যেমন ক’রে আনন্দে লাফাতে থাকে, তার মধ্যে তখন থাকে না বিদ্বেষ-বিষ, সে-রকম অনাবিল আনন্দের ধ্বনি এই—

‘দে গরুর গা ধুইয়ে।’

 নজরুলকে ‘জাতীয় কবি’ বললে সবটুকু বলা হ’ল না। আমাদের জীবনে নজরুল ইস্‌লাম কতখানি জায়গা জুড়ে আছেন, পরিমাপ করা সহজ নয়। এক কথায় বলতে গেলে ‘কাজীদা’কে বাদ দিয়ে আমরা নিজের কথা ভাবতেই পারিনে। আমাদের রাজনীতি, আমাদের সাহিত্য, আমাদের মানস ও মনন—এক কথায় আমাদের জীবনের অনেকখানি তো তাঁরই হাতে গড়া।

 তাঁরই লেখায় আমরা প্রথম পেয়েছি জীবনের আস্বাদ। তাঁর নাটকীয় জীবন, উদ্দাম প্রাণশক্তি, মনুষ্যত্বের বেদনাবোধ, দুরন্ত অভিনবত্ব, বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব ছেলেবেলায় আমাদের যেভাবে আকর্ষণ করেছে, তেমনভাবে করেনি অন্য কিছু। পথে বেরুবার উদাত্ত আহ্বান শুনেছি আমরা তাঁরই গানে। বাংলার লক্ষ-লক্ষ কৃষক-শ্রমিক সর্বহারার সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা রস-মূর্তি লাভ করেছে তাঁরই লেখায়। ভাণ্ডার উন্মুক্ত ক’রে বছর বিশেক কবি তাঁর সাহিত্য-রস বিলিয়েছেন। বিশ বছর সভা-সমিতির উদ্বোধন হয়েছে তাঁর গান দিয়ে। মজলিস জমেনি তাঁর গজল না হ’লে। রেডিও, সিনেমা, থিয়েটার, গ্রামোফোন অচল হয়েছে তাঁকে না পেলে। গানের রাজা রবীন্দ্রনাথ। গানের সংখ্যার দিক থেকে রবীন্দ্রনাথকেও হার মানিয়েছেন নজরুল ইস্‌লাম।

 কাজীদা’র কাব্য বিচার করা আমাদের পক্ষে কঠিন ব্যাপার। তাঁর ‘অগ্নিবীণা,’ ‘ভাঙার গান,’ ‘বিষের বাঁশী’ সাপুড়ের মত আমাদের করেছে ঘরছাড়া। তাঁর সাহিত্যে আমরা করেছি অবগাহন। কবিকে নানারূপে দেখবার সুযোগ হয়েছে আমাদের। সাহিত্যিক হিসাবে, সম্পাদক হিসাবে, খেলার মাঠে, দাবা খেলায়, পামিন্ত্রীর ছাত্ররূপে, রাজনীতি ক্ষেত্রে, বিচারালয়ে, কারাগারে, পাহাড়ে, নদীতে, সমুদ্রে, সিনেমায়, থিয়েটারে, এ্যাসেম্বলী ইলেকশানে, জীবনের কত ক্ষেত্রেই না দেখেছি তাঁকে। যতই দেখেছি, ততই তাঁর ব্যক্তিত্ব আমাদের আকর্ষণ করেছে।

 বাংলার জাগরণের নকীব ছিলেন কাজী নজরুল ইস্‌লাম। আর মুসলিম জাগরণ, তার তো তিনিই স্রষ্টা, প্রধান উদ্‌গাতা। কাব্যে, সাহিত্যে, সাংবাদিকতায়, গানে, শিল্পে, আর্টে যে সব মুসলিম তরুণ সৃষ্টিধর্মী প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন, তাঁদের প্রায় সকলেরই যাত্রা শুরু হয়েছে তাঁকেই কেন্দ্র ক’রে। অখ্যাত, অবজ্ঞাত পল্লীর অজ্ঞাত-কুলশীল যুবককে কাজী সাহেব উন্নতির রাজপথে তুলে দিয়েছেন, এর নজীরের অভাব নেই।

 অজ মফঃস্বলে বসে ভাই-বোন দু’জনে লেখার মক্‌শ করছি। দু’চারটি লেখা বেরিয়েছে প্রবাসী, সরণী, সাধনা, সওগাত, কল্লোলে। কাজীদা’র অমর অবদান ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ বেরুতে দেখি উৎসর্গ করেছেন আমাদের দু’ভাইবোনকে।

‘কে তোমাদের ভালো?
বাহার আন গুলশানে গুল, নাহার আন আলো।
বাহার এলে মাটির রসে, ভিজিয়ে সবুজ প্রাণ,
নাহার এলে রাত্রি চিরে জ্যোতির অভিযান।

তোমরা দুটি ফুলের দুলাল, আলোর দুলালী!
একটি বোঁটায় ফুটলি এসে নয়ন ভুলালি!
নামে নাগাল পাইনে তোদের, নাগাল পেল বাণী,
তোদের মাঝে আকাশ ধরা করছে কানাকানি!’

 রবীন্দ্রনাথ, দিলীপকুমার, বারীন ঘোষের মত লোক আনন্দ লাভ করেছেন যাঁর উৎসর্গ করা বই পেয়ে, তিনি ‘সিন্ধু-হিন্দোল’ উৎসর্গ করেছেন আমাদের নামে! আনন্দে বুক ভ’রে গেল। এত আনন্দ জীবনে পাইনি, জানি না পাব কিনা কখনো। বিদ্রোহী-কবির এই দান জীবন-পথে পাথেয় হয়ে থাকবে আজীবন।

 কবি আজ আমাদের মধ্যে নেই। বিদ্রোহের পথে, বিপ্লবের কালে কবির উদাত্ত আহ্বানের ঐতিহাসিক মূল্য যাই হোক না কেন, মহাকালে তার কাব্যমূল্য কি হবে, অনেকেই প্রশ্ন করেন। কিন্তু বিপ্লবের মেঘ-গর্জনের ফাঁকে তাঁর চোখে যে কয় ফোঁটা পানি দেখা দিয়েছে, কালের কপোলে তা ফুল হয়ে ছলে রইবে। চিরন্তন ক্রন্দসীর ক্রন্দনের অশ্রুমালা মহাকালকে চিরদিনই হার মানিয়েছে।

 দেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীন দেশে বহু বৎসর পরে কবির ভাঙার গানের আর কদর থাকবে কি না, কে জানে? কিন্তু তাঁর গানের মালা অক্ষয় হয়ে থাকবে চিরদিন। আজ থেকে বহু বহু দিন পরেও শুধু অজয়-দামোদর নয়, মেঘনা, করতোয়া, কর্ণফুলীর তীরেও বিরহীর কণ্ঠে গুঞ্জরণ শোনা যাবে:-

‘বসিয়া বিজনে   কেন একা মনে
পানিয়া ভরণে   চল লো গোরী।
চল জলে চল   কাঁদে বনতল,
ডাকে ছলছল   জল-লহরী।
দিবা চলে যায়   বলাকা পাখায়
বিহগের বুকে   বিহগী লুকায়,
কেঁদে চখাচখী   মাগিছে বিদায়
বারোয়ার সুরে   ঝুরে বাঁশরী।’

 আজকের মত সেদিনও লক্ষ লক্ষ ভক্তের মুখে ধ্বনিত হবে:—

‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর
তোরা সব জয়ধ্বনি কর।’