নারীর লেখা

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

নাৰীৱ লেখা নাক ডাকিতেছিল বলিয়া জাগাইয়া দিলে পুরুষমানুষ অপ্রতিত হইয়া পাশ ফিরিয়া শোয়। মুখে স্বীকার করে না,—হয়ত বা, মনে মনে রাগও করে। এবং মিনিট-দুই পরেই এ-পাশ ফিরিয়া যাহা করিতেছিল ও-পাশ ফিরিয়াও তাহাই করিতে থাকে। এটা পুরুষের স্বভাব। কিন্তু স্ত্রীলোক একেবারে মরিতে আসে। দিব্যি করিয়া বলে, কক্ষণ না ; যে যাই বলুক ও দোষটি তাহার নাই—নাক তাহার ডাকিতেই পারে না। অতঃপর তর্ক নিষ্ফল। করিলে কলহ হয়—আর কিছু হয় না। ঘুমন্ত অবস্থায় একটুখানি শব্দ করিয়া শ্বাস গ্রহণ করিতেছে বলায় যে মারাত্মক অপবাদ দেওয়া হয় না, একথা স্ত্রীলোক অপরের বেলায় যত সহজেই বুকুক নিজের বেলায় বোঝে না । এটি তাহাদের স্বভাব । সুতরাং আমার বক্তব্য যদি তাহাদের নিকটে অবোধ্য রহিয়াই যায়, তাহাতে বিশেষ আশ্চৰ্য্য হইব না । ইহার প্রায় জোড়া আর একটা ব্যাপার আছে—সেটা অমুকরণ করা। পূর্বেরটা শরীরের ধৰ্ম্ম, পরেবটা মনের। অতএব, অনিচ্ছাতেও যেমন নাক ডাকে, ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও তেমনি অনুকরণ করা হয় । ‘ডাকানো" অর্থে যেমন ইচ্ছা করিয়া ডাকান নয়, “অনুকরণ করা’ মানে ইচ্ছা করিয়াই করা এমন অর্থ না হইতেও পারে। অথচ, নাক ডাকিতেছিল বলিলে খুশী হই না, কেন করিতেছিলাম দেখাইয়া দিলেও কৃতজ্ঞতায় বুক ভরিয়া উঠে না । এসব জানি, কিন্তু একটু সতর্ক হইয়া পাশ ফিরিয়া শোওয়া কি উচিত নয় ? এখন কথা যদি উঠে, এ দুইটার কোনটার উপরে সত্যিই যদি হাত নাই, এবং ইচ্ছা করিয়াও করি না, এবং দেহ-মনের ইহারা অতি স্বাভাবিক ক্রিয়াই হয়, তবে লজ্জা পাওয়াই বা কেন, আর লজ্জা দেয়ই বা কে ! অবশ্ব, লজ্জা পাওয়া না-পাওয়া স্বতন্ত্র কথা, কিন্তু লজ্জা দিবার অধিকার তাহার আছেই, ষে ব্যক্তি তখনও জাগিয়া আছে এবং ডাকের জালায় ব্যতিব্যস্ত হইয়া বিশ্রামের অবসর পাইতেছে না। স্বতরাং, স্বেচ্ছায় করিতেছি না বলিয়াই সংসারে সব জিনিসের যে জবাবদিহি হয় না, এ-কথা তাহাকে বলিয়া দেওয়া আবগুক, যে লোক ঘুমাইতেছে এবং যে লোক নকল করার মধ্যে একেবারে মগ্ন হইয়া গিয়াছে। ইচ্ছায় হোক, অনিচ্ছায় হোক, শ্বাস-প্রশ্বাসের চলিত প্রথাটা অতিক্রম করিয়া গেলেও লোক বিরক্ত হয়, এবং ভাল জিনিসের অনুকরণ কর্তব্য এবং স্বাভাবিক হইলেও তাহার নির্দিষ্ট সীমা ডিঙাইয়া গেলেও লোকে নিন্দ করে। ভালর অনুকরণ করিও না, এমন কথা বলিবার অধিকার নিশ্চয়ই কাহারো নাই। কিন্তু, “আর না-থামো !" এ-কথা বলিবার অধিকার সমাজের লোকের चांगृह३ । fकफे मूडेखि हेि, גויסי শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ মিসেস বিশ্বাসের পোষাকের কাট-ছাট অতি চমৎকার। তেমনি পোষাকে নিজেকে সজ্জিত করিতে দোষ নাই, কিন্তু তার কোমরের ঘেরটা হয়ত সওয়া তিন হাত । গাউনে কাপড় লাগে সাড়ে দশ গজ । হুবহু নকল করিব বলিয়া তোমার কাঠপানা দেহে ঠিক ঐ সাড়ে দশগজি গাউন জড়াইয়া পথে বাহির হইলে লোকে হাসিবে বৈকি! ভাল জিনিসের অমুকরণ করিতে গিয়া তুমি ভাল কাজেরই সূত্রপাত করিয়াছিলে মানি, কিন্তু অনুকরণের নেশায় এমনি মাতিয়া গেলে যে, নিজের দেহটার পানেও একবার চাহিয়া দেখিলে না। ইহাতে তোমার যে শুধু নকল করিবার সত্বদেশুটাই নিষ্ফল হইয়া গেল তাহা নহে, তোমার নিজের সৌন্দর্ঘ্যও গেল, তোমার কাপড়ের দাম ও মজুরি নষ্ট হইল। পথের লোকের ‘বাহবাটা ত ফাউ। রবিবাবুর লেখা খুব ভাল। তাকে নকল করার ইচ্ছাও স্বাভাবিক, এবং করিবার চেষ্টাও সাধু। কিন্তু একেবারে রবিবাবুই হুইব এমন পণ করিতে গেলে চলিবে কেন ? দেখিতে পাওয়া উচিত যে, তোমার গায়ে তার সাড়ে দশগজি গাউন সার্কাসের ঐ কাহাদের মতই মানাইয়াছে। তার লেখার দোষই বল, আর গুণই বল, পড়িলেই মনে হয় এ ত খুব সোজা। লিখিলে আমিও এমন পারি। তার উপমাগুলা এতই স্বাভাবিক এবং সরল যে, দেখিবামাত্রই মনে হয়—বা —এ ত আমিও জানি—উপমা দিবার প্রয়োজন হইলে ঠিক এইটি ত আমিও দিতাম। কিন্তু ভ্রান্ত অনুকরণ-প্রয়াসীরা ভাবিয়াও দেখে না যে, কোহিকুরের নকল হয় না—টেটের ডায়মণ্ড হয়। আসলটা পাইলে সাত পুরুষ রাজার হালে বসিয়া খাইতে পারে, নকলটার দামে একবেলার বাজার-খরচ চলে না । রবিবাবু কতকগুলো শব্দ প্রায়ই ব্যবহার করেন। সেগুলো এবং তাহার উপমা ও লিখিবার প্রণালী আজকালকার সাহিত্যসেবী নর-নারীরা কিরূপে যে বিকৃত করিতেছেন, তাহ দেখিলে ক্লেশ বোধ হয় । তিনি র্যাহাদের গুরু, তাহদের উচিত র্তাকে বুঝিবার চেষ্টা করা, তাকে শ্রদ্ধা করা। ভিতরে ভিতরে ইহারা, শ্রদ্ধা করেন কি না, এ-কথা অবশু বলিতে পারি না ; কিন্তু বাহিরে ভ্যাঙচানির চোটে গুরুজীর হাড় পৰ্য্যন্ত যে কালি হইবার উপক্রম হইয়াছে, সে কথা বাজি রাখিয়া বলিতে পারি। সে বেচারা যাই বলেন, ব্যাঘ্ৰ ! তার ভক্তেরা আমনি ছুটিয়া আসিয়া দুই হাত নাড়িয়া বুঝাইয়া দিয়া যায়—অর্থাৎ, শার্দুল! দুই একটা নজির দিতেছি। জবশু পুরুষদের কথা বলিতে চাহি না। র্তাহাদের কথা তাহারাই বলিবেন—এবং মাঝে মাঝে কেহ বলেনও, কিন্তু ঐ পর্য্যন্ত। ঐ ডান পাশ আর বা পাশ। আমি শুধু দুই-একটি মহিলা সরস্বতীর কথা উল্লেখ করিয়াই ক্ষাস্ত হইব। আজকাল র্যাহারা বড় লিখিয়ে হইয়া উঠিয়াছেন, তাহদের মধ্যে শ্ৰীমতী জামোদিনী ঘোষজায়া, অনুরূপ ও নিরুপমা দেবীর নাম প্রায় সকলেই জানেন । ইহাদের অজস্র গদ্য পদ্ধ কোন একখানা মাসিক হাতে তুলিয়া লইলেই দেখিতে ארסי অপ্রকাশিত রচনাবলী পাওয়া যায়। আজ ইহাদের কথাই বলি। শ্ৰীমতী ঘোষজায়ার লেখা নাকি রবিবাবুর লেখা বলিয়া অনেকের ভ্রমও হয়। অবশু জমের হেতুও আছে। 3. আমি পূর্বেই বলিয়াছি, রবিবাবুর সত্য অমুকরণ যত কঠিনই হউক, বিকৃত করা খুব সহজ। ও আর কিছু নয়—আমার নিম্নলিখিত এই তালিকাটি মুখস্থ করিলেই হইবে। যদি মুখস্থ না হয়, বড় বড় অক্ষরে লিখিয়া টেবিলের সম্মুখে টাঙ্গাইয়া দিয়া নিজের রচনার মধ্যে মধ্যে এক একটা প্রবেশ করাইয়া দিলেই কাজ হইবে। হরির লুটের বাতাসা কোচড়েই পড়ুক, আর পায়ের নীচেই পড়ুক, নিফল হইবে না। মুখস্থ করুন—পরিণতি, বিশ্ব, মানব, দেহান্বয়, ভূমিষ্ঠ, গরিষ্ঠ, মুখর, চাই-ই, বনস্পতি, প্রয়োজন হইয়াছে, ফাকি, দৈন্ত, পুষ্টি-সাধন, দেবতা, অমৃত, শ্রেয়, ভূম, আশীৰ্ব্বাদ, অর্ঘ্য, আবহমানকাল, শ্রেষ্ঠ, বাণী, খাট, ভারতবর্ষ, নিষ্ঠ, জাগ্রত, জন্ম, সত্ত্ব, দিন আসিয়াছে, তপশ্চৰ্য্য, বৈরাগ্য, শ্রদ্ধা, জো-নাই, খাটো, পাৎলা, ডাক, পড়িয়া গিয়াছে, মুক্তির আনন্দ ও ত্যাগের আনন্দ। ব্যস, এই কয়টিই যথেষ্ট। একটা রচনার মধ্যে সব ক’টা ব্যবহার করিতে পার উত্তম, না পার ভূম, অৰ্ঘ্য, দেবতা, বৈরাগ্য ও ভারতবর্ষ এই পাঁচটি চাই-ই । অন্যথা রচনাই নয়। এখন কেহ যদি অবিশ্বাস করিয়া বলেন, তা কি হয় ? শব্দগুলো যদৃচ্ছা গুজিয়া দিলে লোকে ধরিয়া ফেলিবে যে ! ইহার উত্তরে আমার নজির দেওয়া ছাড়া আর উপায় নাই। গত অগ্রহায়ণের ভারতীতে শ্ৰীমতী আমোদিনী ঘোষজায়ার আট পাতা জোড়া এক প্রবন্ধ বাহির হইয়াছিল। নাম “মমুস্তত্বের সাধনা" । টাইটেল দেখিয়াই ‘বাপরে | করিয়া উঠিলে চলিবে না। ভক্তি করিয়া পড়া চাই। আমার তালিকার প্রায় সকল শব্দগুলোই ইহাতে আছে, স্বতরাং ইহা খুব ভাল, এবং শিক্ষণ হইবে। তবে, অভিধানের সাহায্যে সবটুকু পড়িয়া কেহ যদি শেষকালে বলেন, এই আট পাতার ত আট ছত্রেরও মানে হয় না, তাহা হইলে আমি চুপ করিয়া থাকিব বটে, কিন্তু কবুল করিব না, এবং মনে মনে রাগ করিয়া বলিব, তবু তোমার শিক্ষা হুইল ত ! যাহা হউক, আমি নজির দিব বলিয়াছি, কিন্তু সমালোচনা করিব বলি নাই। সমালোচনা করা পণ্ডশ্রম। আমি বলিব, তোমার রচনার মানে নাই ; তুমি জবাব দিবে, ‘আছে।' আমি বলিব, এই জায়গাটায় বাড়াবাড়ি কারিয়াছ ; তুমি বলিবে, "একটুও না ; এমন না করিলে লেখা ফুটিত না।” আমি বলিব, “এই স্থানটার আর একটু প্রকাশ করা উচিত ছিল ; তুমি বলিবে, “নিশ্চয় না ; আর প্রকাশ করিতে গেলে আর্ট মাটি হইয়া যাইত।” বাস্তবিক, এ-সব তর্কের মীমাংসা হয় না। একেই লেখা বলে এবং এই বিবেচনার উপরেই লেখকের যথার্থ কৃতিত্ব নির্ভর করে। সমালোচনা করিয়া দোষ-গুণ দেখাইয়া নিন্দ বা স্থখ্যাতি করা যায় বটে, কিন্তু আর কোন कांछ एञ्च नां । vg g শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ যাহা হউক, যাহা বলিতে চাহিয়াছিলাম তাহাই বলি। উক্ত প্রবন্ধে শ্ৰীমতী ঘোষজায়া বলিতেছেন, “ভারতবর্ষ আজ অকস্মাৎ স্বপ্ন হইতে জাগিয়া দেখিতেছে, ষে জনপদের পথ ধরিয়া সে চলিতেছিল তাহা প্রকৃত নয়, মায়া স্বষ্টি মাত্র, অকস্মাৎ আজ তাহ দিগন্ত-বিলীন বাণীর ভিতর কোথায় মিলিয়া গিয়াছে।” ভাষা বটে ! জনপদের পথ দিগন্ত-বিলীন বাণীর মধ্যে মিশিয়া গেল ! জিজ্ঞাসা করি, রবিবাৰু কোথাও কি এমনি করিয়া বাণীর শ্রাদ্ধ করিয়াছেন ? কিছুদিন পূৰ্ব্বে লেখিকা “বিকাশ’ পত্রিকায় একটি দশ-বার লাইনের কবিতায় ‘ব্যোম’ এর সঙ্গে মিলাইবার জন্ত শশি স্বৰ্য্য সোম’ লিখিয়াছিলেন । কবিতার কথা না হয় নাই ধরিলাম—কেন না, ‘ব্যোম, এর ম’ ‘সোম’ ছাড়া মিলিতে চায় না। 'শশী'টিকেও বাদ দিলে অক্ষর কম পড়ে। কিন্তু, জন পদের পথের অমন কোন ধনুক-ভাঙ্গা পণ ছিল না যে, ঐ বাণী’টি না পাইলে আর মিলিত না! কবিকে অঙ্কুশ দেখাইতে নিষেধ আছে তাহ মানি কিন্তু তার্কিক যখন ঘর ছাড়িয়া লাঠি-হাতে মারিতে আসে, তখনও যে একটুখানি আত্মরক্ষার চেষ্টা করিতে নাই এ-কথা মানি না। সেটা কাব্যি ! কিন্তু এটা যে দার্শনিক প্রবন্ধ ! দার্শনিক প্রবন্ধ যখন একশ টাকার দাবী করে, তখন সে ঐ ক্ষুদ্র তিনটি অক্ষরের একশ' টাকাই চায়, তাহাকে "নব-নবতি রজত-মুদ্রা" দিতে গেলে সে হাত পাতিয়া গ্রহণ করে না । কিন্তু আসল কথা এই যে, ‘বাণী রবিবাবু লেখেন সুতরাং সেটা চাই-ই । যদিও নাটক-নভেলে অত দোষ নাই, তথাপি অনুরূপা যখন পোষ্যপুত্রে লিখিলেন “পথে শক মুখর হইয়া উঠিল” তখন ‘শব্দ' শব্দায়মান হইয়া উঠিল বলা নিশ্চয়ই র্তাহার অভিপ্রায় ছিল না, কিন্তু ‘মুখর কথাটার ঠিক মানেটাও ত তার জান উচিত ছিল। জোর করিয়া 'নিলজ’ অর্থ করার চেয়ে বরং বলা ভাল, “কি করিব ওটা যে আমার চাই-ই। ওটা মহতের ইত্যাদি ।” শ্ৰীমতী অনুরূপ। আর একস্থানে লিখিতেছেন—“ক্ষেত্র কর্ষিত হইলে শস্য দান করে, পতিত থাকিলে কণ্টক-গুন্মের আবাসভূমি হয়। স্বতরাং ভারতবর্ষের নৈতিক ক্ষেত্রও আকর্ষণে যে কণ্টক গুন্মে আচ্ছন্ন হইয়া উঠিবে, ইহা কোন স্বভাব-বিরুদ্ধ ব্যাপার নহে। বনস্পতি এ-কাননে পূর্বে বিদ্যমান ছিল বটে, কিন্তু এখন তাহ কীক ও লতাস্তুপে এমন করিয়া ঢাকিয়া পড়িয়াছে, তাহাকে আর চিনিয়া বাহির করিবার বুঝি কোন উপায় নাই।” ছিল ক্ষেত্র এবং শস্য, আসিল কানন ও বনস্পতি । তা আম্বক—ক্ষেত্র না হয় বন-জঙ্গল হইতেও পারে, কিন্তু কোন শস্তকেই ত বনস্পতি, হইয়া উঠিতে দেখিলাম না । এদিকে ত হয় না-ও-দিকে হয় কি-না বলিতে পারি না। ওদিকে বোধ করি হয় না ; কিন্তু "বনস্পতি'টি যে চাই-ই। কিন্তু আমি বলি, চাহিবার পূৰ্ব্বে ও-জিনিসটা যে মটর-কলায়ের গাছ নয়, এটা ত জানা উচিত ছিল । «за 8 অপ্রকাশিত রচনাবলী এই মহতের আশ্রয় ধরিতে গিয়া অনুরূপ একস্থানে লিখিলেন, “ভূমার সঙ্গে ভূমির, ক্ষুত্রের সঙ্গে মহতের এই যে যোগ " অর্থাৎ, ছোট্ট ভূমিটি মহৎ ভূমির সঙ্গে যুক্ত হইতেছে। ‘ভূম কথাটা যে ব্যবহার করা আবশ্বক, আমি তাহ অস্বীকার করি না, কিন্তু কোনটি ক্ষুদ্র, কোনটি মহৎ সে সংবাদটাও কি বই লেখার পূৰ্ব্বে অনুসন্ধান করা আবগুক ছিল না ? ১৩১৭ সালের আষাঢ়ের ভারতীতে ‘প্রাচীন ভারতের পূজায়’ শ্ৰীমতী ঘোষজ্ঞাষা লিখিয়াছেন—“আত্মসম্মানের সহিত আত্মাদরের একটা সাদৃশ্য আছে, এই সাদৃশু-সঙ্কট এড়াইবার জন্য ভারতবর্ষের ধর্থনীতি আত্মসম্মানকে দূরে রাখিয়া আসিয়াছে। ফল যখন পাকে, তখন আপনা হইতেই বোট ছাড়িয়া পড়ে, পাকাইবার জন্য তাহাকে বৃন্তহীন করিলে তাহা বিকৃতই হয়, পরিণত হয় না।” আমি আজ পর্যন্ত বুঝিতে পারিলাম না, এই ‘বোটাছাড়ার’ উপমাটির যোগ কাহার সঙ্গে । মৌলিক না হইলেও স্বতন্ত্রভাবে উপমাটি খুব ভাল তাহা স্বীকার করি, কিন্তু এই আগাগোড়া পরিপূর্ণ স্বখ্যাতির মধ্যে ভাল যে এখানে সে কাহার করিতেছে তাহা বুদ্ধির অগোচর। “বাবলার মত সৰ্ব্ববিসারি গুল্ম'টার ন্যায়” অহং জিনিসটাকে বারংবার নিন্দা করিয়া তাহাকে পরিবর্জন করিয়া প্রাচীন ভারতবর্ষ যেদিন বিরাট ব্যাপার করিয়াছিল, এবং তাহার প্রত্যেক জাতি ; প্রত্যেক বর্ণ তাহার বিরাট রাজছত্রতলে স্থান পাইতেছিল, সেই সময়ে এই জোর করিয়া বোটাছাড়া অপরিণত ফলটি যে কোন শ্রেণীর মধ্যে ঢুকিতে গিয়া অন্যায় করিয়াছিল তাহ বুঝিয়া লইবার কোন পথই লেখিকা রাখেন নাই। সেদিন এই প্রাচীন ভারতের মুখ্যাতি ধরিতেছিল না ; হঠাৎ এই বৎসর-দুয়েকের মধ্যে সে কি অপরাধ করিয়াছে যে, ঘোষজায়া মহাশয়া মনুষ্যত্বের সাধনার ছুতা তুলিয়া এমন করিয়া তাহাকে আজ ভৎসনা শুরু করিয়া দিয়াছেন ? বলিতেছেন, “কিছুমাত্র না বুঝিয়া শুক ও তোতার মত কণ্ঠস্থ করা যে বিদ্যাধ্যয়ন নহে, তাহা বলা নিশ্চয়ই বাহুল্যোক্তি, অধুনা শিশু-শিক্ষাতেও এরূপ মূঢ় নীতি প্রযুক্ত হয় না। কিন্তু, আমাদের এই প্রদ্ধেয়, পূজ্যপাদ, জ্ঞানগরিষ্ঠ ভারতবর্ষ এখনও তাহার ত্রিশ কোট নর-নারীকে সেই প্রাথমিক যুগের প্রথম পাঠ পড়াইতেছে, গম্ভীর-মুখে মাথা নাড়িয়া সে বলিতেছে, “জিজ্ঞাসা করিবার তোমাদের অধিকার নাই, আজ্ঞাবহের মত তোমরা কেবল আজ্ঞা পালন করিবে, ইহাই তোমাদের মুক্তির মূল্য !" জ্ঞানগরিষ্ঠ ভারতবর্ষের এই জ্ঞানের পরিচয় দিয়া পরে লিখিতেছেন “কিন্তু প্রাচীন ভারত এই আপেক্ষিকতাকে একেবারেই আমল দেয় নাই। নেশার কোকে অসাধ্য-সাধনের পরম উল্লাসকে সে এমন বড় করিয়া দেখিয়াছিল যে, জীবনের ছোটখাট কৰ্ত্তব্যগুলি একান্তভাবে সে অবজ্ঞা করিয়াছে।” প্রাচীন ভারতবর্ষ নেশা খাইয়া কি করিয়াছিল, এবং জীবনের ছোটখাট কর্তব্যগুলি একান্তভাবে অবজ্ঞা করিয়াছিল কিংবা করে নাই, এ তর্ক তুলিব না। 9ፃ¢ শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ বিদুৰীয়া যখন বলিতেছেন, তখন মানিয়াই লইলাম। কিন্তু জিজ্ঞাসা করি, ওই শ্রদ্ধেয়’ পূজ্যপাদ প্রভৃতি বিশেষণগুলার কিছু অর্থ আছে, ন, ওগুলো শুধু বিস্তার পরিচয় ? নিজের পিতার কোন ভুলের প্রতিবাদ করার জন্য র্তাহার মুখের সামনে দাড়াইয়া যদি বলা যায়, “হে আমার প্রদ্ধেয় পূজ্যপাদ জ্ঞানগরিষ্ঠ বাবা! তুমি তাড়ি খাইয়া নেশার ক্টোকে মাতলামি করিতেছিলে কি জন্য ?” কেমন শুনায় ? কে নাকি বাহিরে মার খাইয়া আসিয়া স্ত্রীর কাছে আস্ফালন করিয়া বলিরাছিল, “হা, কান মলে দিয়েচে বটে, কিন্তু অপমান করেনি।” ঘোষজায়া মহাশয়াও পূজ্যপাদের অপমান করেন নাই, শুধু কান মলিয়াছেন। যাহা হউক, লেখার হাত বটে ! একস্থানে ইনি evolution theory ব্যাখ্যা করিয়া শেষে বলিতেছেন, “প্রবৃত্তিমার্গের শাসন পালন করিয়া তাহা খওনপূর্বক যাহারা নিবৃত্তি-মার্গে আরোহণ করিয়াছিলেন, বর্তমান ভারত লুপ্ত পদাঙ্ক পুনরুদ্ধার আর করিতে না পারিয়া অস্তভাগশায়ী অবশিষ্ট চিহ্নগুলিকে একান্তভাবে গ্রহণ করিয়াছেন ও তাহাকে কৃপণের ধনের মত আঁকড়াইয়া ধরিয়া রহিয়াছে। তাহার পিছনে যে বিস্তৃতমুখ গহবর অন্ধকার মুখ ব্যাদিত করিয়া আছে, তাহাকে সে শুধু অসম্ভব প্রয়াসের দ্বারা আড়াল করিয়া রাখিতে চাহিতেছে, কিন্তু তাহার পায়ের নীচের মাটি তাহার ভাবে যে খসিয়া পড়িতেছে, তাহার প্রতি তাহার দৃকপাত নাই।” অর্থাৎ ‘অন্ধকার গহবর ‘অসম্ভব প্রয়াস’ ‘পায়ের নীচে মাটি খসিয়া পড়া কথাগুলো লাগাইতেই হইবে। কেন তাহা বলা বাহুল্য । কিন্তু গোল হইতেছে এই যে, অন্তভাগশায়ী চিহ্নগুলিতে আাকড়িয়া ধরিয়া থাকিবার মাঝখানে এত বড় গহবরটাই বা আসে কি স্ববাদে এবং পায়ের নীচের মাটিই বা খসিয়া পড়ে কি হেতু ? গহ্বরটা যে শুধু সে চেহারাই দেখিতে পায় নাই, তাহা নহে, আমারও ত কই কোনদিকে চাহিয়া চোখে পড়িতেছে না। আর একস্থানে রাশি রাশি শাস্ত্রের দোষ দিয়া লিখিতেছেন, “জীবনের অবস্থা-ভেদে কর্তব্য ও ধর্মের প্রভেদ ঘটিয়া থাকে। পুরুষের বাহা ধৰ্ম্ম নারীর ধৰ্ম্ম তাহা হইতে পারে না। অপরন্তু—সন্ন্যাসী যদি গৃহীর ধৰ্ম্ম অবলম্বন করে, তবে সন্ন্যাসী ধৰ্ম্মশ্ৰষ্ট হয় এবং গৃহী যদি সন্ন্যাসীর পদামুসরণ করে, তবে গৃহীও ধৰ্ম্ম হইতে খলিত হয়।...লোকসমাজের যখন একটা অনুভূতির স্পন্দনোদয় ঘটিতে থাকে, বিধানের চাপ দিয়া তাহাকে বিমৰ্দ্দিত করা যায় না, গজ্জিত স্রোত তরঙ্গিনীর মত তাহা পথশায়ী প্রতিবন্ধক বিধ্বস্ত করিয়া পথ উন্মুক্ত করিয়া লইয়া অবতরণ করে। স্বতরাং গৃহীদের সন্ন্যাসামুপন্থী হইবার সম্বন্ধে প্রবল শাস্ত্র-প্রতিষেধ থাকা সত্বেও সমাজে তাহার প্রভাব অম্বুমাত্রও হ্রাস হয় নাই ।” আমার বিনীত নিবেদন এই, ‘স্বতরাং’টির অর্থ কি ? সমাজের বিলকুল গৃহীগুলা কি গৃহিণী ত্যাগ করিয়া ৰনে যাইবার সঙ্কল্প করিয়াছে ? না, লুকাইয়া গেরুয়া ❖ግጬ অপ্রকাশিত রচনাবলী কাপড় ছোৰাইতেছিল, ধরা পড়িয়াছে ? নইলে ভয়ের কথা নিশ্চয়ই, কিন্তু আমাদের বাড়িতে কাহারও ত ওসব লক্ষণ দেখি না । অন্ততঃ বড়কৰ্ত্তার সম্বন্ধে আমি ত হলক করিয়া বলিতে পারি। আজ এই ‘মুতরাং শব্দটায় বহুদিনের একটা কথা মনে পড়িতেছে । একবার গাড়ি করিয়া রাত্রে বাড়ি যাইতেছিলাম ! পথে ডানদিকের মাঠে চাষারা পাট কাচিয়া শুকাইতে দিয়াছিল। পাছে ভয় পাই, এই আশঙ্কায় আমাদের পঞ্চা চাকর গাড়ির উপর হইতে সাহস দিয়া বলিল, “মা-ঠাকরুণ ভানদিকে চেয়ে দেখুন, স্বতরাং কেমন পাট শুকোচ্চে !” সেদিন বউমানুষের অত হাসি নিশ্চয়ই ভাল দেখায় নাই, কিন্তু ভাল দেখাইবার উপায় ত আমার হাতে ছিল না। থাকৃ-জার না। এখনো অনেক কথা বলিবার ছিল, কিন্তু কাজ নাই। তা ছাড়া, আমরা মেয়েমানুষ হাড়ির একটা ভাতই টিপিয়া দেখি । শ্ৰীমতী আমোদিনী শিক্ষিতা রমণী, আমরা সেকেলে অশিক্ষিত মুখ মেয়ে-মানুষ । হয়ত, তাহাকে ভুল বুঝিয়াছি। কিন্তু ভুল হোক, নিতুল হোক, যাহা বুঝিয়াছি স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছি। যদি আবণ্ডক হয় নিজের লেখা তিনি অনায়াসে সমর্থন করিতে পারিবেন । তবে, একটা কথা বলিয়া রাখি । মেয়ে-মামুষের নাক ডাকে জানি, কিন্তু এত জোরে ডাকিতে শুনিলে অন্য স্ত্রীলোকেরও যেন লজ্জা করিতে থাকে । ভয় হয়, এই বুঝি বা পুরুষমানুষে চমকাইয়া উঠিয় পড়ে। তাই উৎকণ্ঠায় যদি বা একটু নিষ্ঠুরের মতই ঘুম ভাঙাইবার চেষ্টা করিয়া থাকি, সে চেষ্টার মধ্যে আস্তরিক মঙ্গলেচ্ছা ব্যতীত আর কিছুই নাই। কিন্তু তার ভাষা যে অতি সুন্দর, অতি মধুর, তাহা অকপটে স্বীকার করি। প্রতি ছত্র গভীর পাণ্ডিত্যে পরিপূর্ণ। বহুমূল্য ঘড়ির স্বগঠিত কল-কব্জার ন্যায় তাহার প্রত্যেক শব্দ-বিন্যাসটির আশ্চর্ষ্য কৌশল দেখিয়া মুগ্ধ হইয়াছি। ঘড়িটি দামী এবং চলিতেছেও বটে, কিন্তু কাটা দুটি না থাকায় কবি পোপের মত সময়টা ঠিক ঠাওর করিতে অক্ষম হইয়াছি । এইবার শ্ৰীমতী অমুরূপ ও নিরুপমার রচনা সম্বন্ধে দুই-একটা কথা বলিব। যদিও শ্ৰীমতী অনুরূপার ‘পোন্তপুত্রের গোড়াও পড়ি নাই, শেষও পড়ি নাই, শুধু মধ্যের গুটিকয়েক অধ্যায় মাত্র পড়িবার স্থযোগ পাইয়াছি, এবং এত অল্প পূজি লইয়া বলিতে যাওয়াও বিপজ্জনক জানি, কিন্তু বুড়ো-মামুষের নাকি বেশি পুজির আবগুক হয় না, তাই বলিতেছি । ইহারও ভাষা যে অতি মধুর তাহাতে সন্দেহ নাই। আমার মেয়ে বলিতেছিল, এত মধুর যে মুখ মারিয়া যায়, আর গিলিতে পারা যায় না। তা ভাষা স্বাহাই হোক, প্রায় উপমাগুলিই যে না জানিয়া লেখা তাহা পড়িলেই চোখে ঠেকে। জার একটা জিনিস তার চেয়েও বেশি ঠেকে—সেটা অসঙ্ক জ্যাঠামো । এ-কথাটা আমার বলিবার ইচ্ছা ছিল না । কেন না, এইখানেই তর্ক বাধে। গ্রন্থকারের ভারিযকারীরা ধরিয়া বসেন, কোথায় জ্যাঠামো দেখাও। আমি যাহাই দেখাইন ©ፃፃ १श्व-8w শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ কেন, তাহারা প্রতিবাদ করিয়া বলিবেন—কখখনো না। এটা হিউমার, ওটা উইট, সেটা আর্ট ইত্যাদি। জ্যাঠামো অন্তরে অনুভব করা যায়, কিন্তু অনুভব করানো যায় না। হিউমার কোথায় পাকামিতে পরিণত হয়, উইট্‌ কোথায় অঙ্গীল হইয়া উঠে, আট কোথায় আতিশয্যে ও ছেবলামিতে রূপান্তরিত হয়, সেটা যে-বয়সে বোঝা যায়, ততটা বয়স এখনও লেখিকার হয় নাই। তবে, আশা করি, এ দোষ একদিন শুধরাইবে । কিন্তু, তাহার না জানিয়া যা-ত উপমা দিবার স্বপক্ষে সে-রকম কৈফিয়ত কিছুই নাই। তাই দৃষ্টাস্তের মত দুই-একটা উল্লেখ করিব মাত্র। একস্থানে বলিতেছেন, “বিজন-পথে চলিতে চলিতে অকস্মাৎ পায়ের নীচে দংশনোস্থ্যত সৰ্প দেখিলে পথিক যেমন আড়ষ্ট কাঠ হইয়া দাড়ায়, ইত্যাদি।” তাই বটে! একটা ন্যাকড়া কিংবা দড়ির টুকরো দেখিলে লাফাইয়া কে কার ঘাড়ে পড়িৰে ঠিক থাকে না, আড়ষ্ট হইয়াই দাড়ায় ! তাও আবার যে-সে সর্প নয়—একেবারে দংশনোন্তত সপ! ইনি যে লেখেন নাই, রান্নাঘরে হঠাৎ জলন্ত আগুনের টুকরো পায়ের নীচে মাড়াইয়া ধরিয়া রাধুনী যেমন অবাক হইয়া ই করিয়া দাড়ায়,—ইহাই পরম ভাগ্য । আর একস্থানে লিখিতেছেন, “দীপ্ত সূৰ্য্যালোকের উপর মেঘ আসিয়া পড়িলে তাহা যেমন এক-মুহূর্তেই মান হইয়া যায়, শিবানীর মুখ তেমনি মুহূর্বেই অন্ধকার হইয়া আসিল ।” এটা অলঙ্কার না উপমা ? কিন্তু দীপ্ত সূৰ্য্যালোকের উপর মেঘ আসিয়া পড়িলে কি হয় ? শাদা দেখায় । কিন্তু লেখিকা ঐ যে মান বলিয়াছেন, কাজেই তাহার অন্ধকার মুখের সহিত স্বৰ্য্যালোক পতিত মেঘের তুলনা করিবার অধিকার জন্মিয়াছে ! এই কি ? আর এক জায়গায় গভীর কৃষ্ণবর্ণ মেঘের গায়ে বক প্রভৃতিকে উড়িতে দেখিয় তাহার মনে হইয়াছে যেন ‘কৃষ্ণতারকা উড়িয়া যাইতেছে। কাল মেঘের তলায় বক কি কৃষ্ণতারকার মত দেখায় ? তা ছাড়া ‘কৃষ্ণতারকা’ই বা কি ? রাত্রে আকাশের পানে চাহিয়া কোনদিন ত কাল কুচ কুচে নক্ষত্র চোখে পড়ে না। আর যদি চোখের তারাই হয়, সেও ত সাদা পদার্থের মাঝখানে থাকে। কালো মেঘের সঙ্গে তাহার সাদৃশুই বা কোথায় ? প্রকৃতি-দেবীর উপর উৎপাত আরও অনেক আছে—সেইগুলি একটুখানি হস করিয়া করা উচিত ছিল। কেন না, নিজে যাহা জানি না, তাহা না জানানই বুদ্ধির কাজ । স্বাহা হউক, বইখানি শুনিয়াছি ৫৬শ পাতার ; আমি মাত্র ২৫৩•খানি পাতা পড়িয়াছি ; স্বতরাং আশা করিতেছি, যাহা পড়ি নাই তাহার মধ্যে ভাল ভাল জিনিসই রহিয়া গিয়াছে। মেয়েটাও বলিতেছিল, বইখানি জ্ঞানগর্ত। বেদ, কোরান, বাইবেল, রামায়ণ, মহাভারত, এথিক্স, মেটাফিজিক্স, রামপ্রসাদী, তন্ত্ৰমন্ত্র, ঝাড়ফুক, মারণ, উচাটন, বশীকরণ-সমস্তই আছে। এ-ছাড়া সংস্কৃত, হিন্দী, 9ማኒ” অপ্রকাশিত রচনাবলী ইংরেজী—কালিদাস, সেক্সপিয়র, টেনিসন—যাহা কিছু শিক্ষা করা প্রয়োজন একাধারে সমস্তই। বলিতে পারি না, শেষের দিকে রাজভাষা এবং clerk's guide আছে কি না। আমার ছোট নাতিটিকে একখানি কিনিয়া দিব মনে করিতেছি । যদি আমার রাধারাণীর কথা সত্য হয়, তবে আর গোটা-দুই প্রশ্ন করিয়াই ক্ষাস্ত হইব । জিজ্ঞাসা করি, এত বাড়াবাড়ি ধৰ্ম্মচর্চা কেন ? হিন্দুধর্মের অত যুদ্ধ ভেদগুলি না হয় নাই দেখান হইত—তাহাতে এমনই কি ক্ষতি ছিল ! এ যে সন্ন্যাসী ফকিরের ভিড়ে পা বাড়াইবার জো নাই, কোথায় দাড়াই, কোন দিকে চলি, কোন মহাত্মার গায়ে বুঝি পা দিয়া ফেলি, এই ভয়েই যে সারা হইতে হয়। তার উপর ইংরেজির বুকনি ও ইংরেজি কবিতার লম্বা কোটেশন ! এ-কথাও ভাবা উচিত ছিল, এটা বাংলা উপন্যাস এবং তাহার অধিকাংশ ভগিনীগুলিই ইংরেজি জানেন না। জানি বলিয়া কি তাহ জানাইতেই হইবে ! শুনিয়াছি, রবিবাবুও ইংরেজি জানেন, বঙ্কিমবাবুও নাকি শিখিয়াছিলেন, কিন্তু তাহারাও নভেলের মধ্যে লোভ সংবরণ করিতে পারিয়াছিলেন। এক্ষেত্রেও লোভ সামলান উচিত ছিল। অন্তঃপুরচারিণী স্ত্রীলোক হইয়াও সর্বতোমুখী পাণ্ডিত্যের বহরে লোকজনের তাক লাগাইয়া দিব, এই ম্পিরিট টাই নিন্দাহ । অগ্রহায়ণের ‘ভারতী’তে এক ভদ্রলোক এই বইখানি সমালোচনা করিয়া একস্থানে বলিয়াছেন, স্থানে অস্থানে অত্যধিক প্রকৃতি-বর্ণনা এবং তাহাতে রসভঙ্গ না কি এমনি একটা দোষ ঘটিয়াছে। আমি কিন্তু এ কথা বলি না। বরং বলি, দুই-তিন পাতা জোড়া প্রকৃতি বর্ণনা পড়িয়া যে ব্যক্তি একটা কিছু আইডিয়া করিতে চায় সেই অরসিক। এ জিনিসটা গয়ায় পিণ্ড দেবার মত । পুরোহিত ঠাকুরও জানে না, কি বলাইতেছি ; যজমানও গ্রাহ করে না, কি বলিতেছি! অথচ, উভয়েই জানে কাজ হইতেছে—ভূত ছাড়িতেছে! এ-বিষয়ে শ্রদ্ধা থাকা চাই, বিশ্বাস করা চাই, প্রকৃতি-বর্ণনা বুঝিতেছি। ভেস্কি-খেলা দেখেন নাই ? খেলোওয়াড় চোখের ভিতর হইতে হাসের ডিম বাহির করিবার আগে হাত-পা নাড়িয়া ভানুমতীর ব্যাখ্যা শুরু করিয়া দেয়—এ তেমনি। বোঝা উচিত, এবার আশ্চৰ্য্য কিছু একটা আসিতেছে। যে সমঝদার সেই জানে এইবার ডিম বাহির হইবে—বোকায় শুধু হাত-পা নাড় দেখিতেই ব্যস্ত থাকে এবং ভানুমতী ব্যাখ্যার মানে বুঝিতে চায়। আমি ত ৩• অধ্যায়ের গোড়াতেই বুঝিয়াছিলাম, এবার নতুন কিছু একটা আছে। লেখিকা লোক-হিতার্থে দয়া করিয়া পেটকামড়ানির মন্ত্র পর্য্যস্ত শিখাইয়া দিয়াছেন । “রাম লক্ষ্মণ সীতে যান কিষ্কিন্ধ্যার পথে ; সাথে নিলে হনুমান আর স্বগ্রীব মিতে ; স্বগ্রীব বলিল মিতে আমি মন্তর এক জানি পেটের ব্যথায় অব্যথা হয়ে যায় প্রাণী ।” ●ፃሕ) শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ বাস্তবিক, লোকের কুসংস্কারে হিন্দুধন্মের অনেক ভাল জিনিস লোপ পাইতেছে, এটা কোনমতেই হইতে দেওয়া উচিত নয়। ক্রযুক্ত লালবিহারী দে, গোবিন্দ সামস্তকে সাপের মস্তর শিখাইয়া দিয়াছিলেন। আমিও পেট কামড়ানির একটা মন্তর জানি, যদি কাহারও উপকার হয়, তাই লিখিতেছি। অবগু আমার মন্তর অব্যর্থ কি না বলিতে পারি না। এ বাড়ির পুরুষগুলা গোয়ার গোছের, ওসব বিশ্বাস করিতে চাহে নী—তাই যাচাই করিয়া লইবার স্ববিধ ঘটে নাই। যে বাড়ির পুরুষেরা শিষ্ট শাস্ত সেখানে পরথ হইতে পারিবে। মস্তর এই— - “পেট কামড়ানি, পেট কামড়ানি, ভাল হবি ত হ’ ; নইলে কামড়ে কামড়ে কি গরু বাছুর - মেরে ফেলবি !” রোগীর পেটে হাত বুলাইয়া তিনবার বলিতে হয়। এবার শ্ৰীমতী নিরুপমার কথা কিছু বলিব। ইহাদের মধ্যে নিরুপমার রচনাকে অনেক দিক হইতে ভাল বলিতেই হয় । সহজ, সরল ও বিনীত। যাকে ‘পাণ্ডিত্যের হুঙ্কার’ বলে সেটা নাই, এবং স্টেজ আস্ফালনিও কম। কথাবার্তাগুলি কথাবার্তারই মত। লেখার ভুল যে নাই তাহা নহে। ভুল কাহারই বা না থাকে, এবং থাকিলেই তাহা মহা লজ্জার বিষয় হয় না, যদি না ভুল যাচিয়া ঘরে আনি। যদি না সোজ পথ ছাড়িয়া অজানা পথের মধ্যে গিয়া পথ হারাই। শরীরে ঘা হওয়া এক এবং চুলকাইয়৷ ঘা করা আর । একটায় মায়া হয়, অপরটায় রাগ করিতে ইচ্ছা করে— মুখে আসিয়া পড়িতে চায়—বেশ হইয়াছে, যেমন কৰ্ম্ম। যদি পরিবে না, তবে যাও কেন ? নিরুপমা এই দোষটি করেন বলিয়া ইহার ভুলটা শুধু ভুল, কিন্তু ওঁদের ভুলগুলা ভুল ত বটেই এবং আরো কিছু। যাহারা সোজা পথে চলিয়া ভুল করে তাদের ভুল একদিন আপনি শুধরাইয়া যায়, কিন্তু যাহারা বাক পথে চলিতে চায়, অথচ পথ চেনে না, তাদের ভবিষ্যৎ অধিকতর বিপজ্জনক হইয়া উঠিতে থাকে। ইমতী নিরুপমার অন্নপূর্ণার মন্দির’ পড়িবার সময় দুই-একটা সোজা ভুল চোখে ঠেকিয়াছিল, কিন্তু এখন আর তাহা মনে করিতে পারিতেছি না। তবে, একটা মনে আছে, দৃষ্টাস্তের মত উল্লেখ করিতেছি। একস্থানে সস্তরণ মূঢ়ের স্বায়’ না বলিয়া সস্তরণহীণ মূঢ়ের ন্যায় বলিয়াছেন। এটা বুঝিবার ভুল। বঙ্কিমবাবু যেমন কৃষ্ণকাস্তের উইলের গোড়াতেই ‘ইহলোকান্তে না বলিয়া একাধিক বার ‘পরলোকাস্তে’ বলিয়াছেন—তেমনি । কিন্তু, এটা যদি রবিবাবুর অনুকরণ করা হইয়া থাকে, তাহা হইলে অন্তায় করা হইয়াছে। তিনি সস্তরণ মূঢ় রমেশ সঙ্গীতের ধাটুজলে' ইত্যাদি বলিয়াছেন, সস্তরণহীন বলেই নাই। যাহা হউক, এটা ধর্তব্যের ogbre অপ্রকাশিত রচনাবলী মধ্যেই নয়। কি ধর্তব্যের মধ্যে সেইটা নিশ্চয়ই যেটা না জানা সত্বেও লেখ৷ হইয়াছে। যেখানে সতী আফিং এবং বেলেডোনা দুই খাইয়াছে। একটা বিষ জার একটা প্রতিষেধক। বেলেডোনা দিয়ে ডাক্তারের “মরফিন ইনজেকট করেন। দুইটা বিষ একসঙ্গে সেবন করিলে দুর্ভাগা যে অনেক সময়ে শুধু মরে না, তা নয়, মরিলেও অত শীঘ্র অত আরামে মরে না ; অনেক বিলম্বে অনেক কষ্টে মরে । সেটা নিশ্চয়ই লেখিকার অভিপ্রায় ছিল না। তাছাড়া, দুর্ঘটনার আশঙ্কা যথেষ্ট ছিল । হয়ত মরিতই না, হয়ত পোড়াইবার সময় চোখ চাহিয়া ফেলিত। যাহা হউক, যখন নির্বিঘ্নে কার্ধ্যোদ্ধার হইয়াছে, তখন আর আলোচনার প্রয়োজন নাই। কিন্তু বেলেডোনা যোগাড় করিবার জন্ত মালিশের ঔষধ, ডাক্তার, ডাক্তারখানা, বাত ইত্যাদি অনেক অবাস্তর কথার অবতারণা করিতে হইয়াছে। সুতরাং, একটুখানি জানিয়া লিখিলে আর এই বাজে মেহমতগুলো করিতে হইত না । আর না। এইবার সমাপ্ত করি । অপ্রিয় কথা অনেক লিখিলাম। আশা করি ইহাতে স্বফল ফলিবে। আর যদি প্রচলিত নিয়মানুসারে লেখক-লেখিকার এই বলিয়া সাত্বনা লাভ করিবার চেষ্টা করেন যে, সমালোচকেরা নিজেরা লিখিতে পারে না বলিয়াই হিংসা করিয়া গ্লানি করে, তাহা হইলে আমি নিরুপায় । কিন্তু সমালোচক মাত্রেই যে লিখিতে পারে না, এবং পারে না বলিয়াই দোষ দেখাইয়া বেড়ায়, এ-কথাটার উপরেও তত আস্থা রাখা ঠিক নয়। —শ্ৰীঅনিলা দেবী গ্রন্থ-পরিচয় গৃহদাহ প্রথম প্রকাশ : ১৩২৩ সালের মাঘ—চৈত্র, ১৩২৪ সালের বৈশাখ—আশ্বিন অগ্রহায়ণ ফাল্গুন, ১৩২৫ সালের পৌষ—চৈত্র এবং ১৩২৬ সালের আষাঢ় অগ্রহায়ণ ও পৌষ—মাঘ সংখ্যা ‘ভারতবর্ষ মাসিক পত্রে প্রকাশিত হয়। পুস্তকাকারে প্রথম প্রকাশ : ২৭শে মাচ্চ, ১৯২০ খ্ৰীষ্টাব্দ (ফাল্গুন, ১৩২৬)। বিন্দুর ছেলে • প্রখম প্রকাশ : ১৩২০ সালের শ্রাবণ সংখ্যা "যমুনা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পুস্তকাকারে প্রথম প্রকাশ : ৩রা জুলাই, ১৩১৪ খ্ৰীষ্টাক্স(শ্রাবণ, ১৩২১) “রামের মুমতি ও পথ-নির্দেশ' নামক অপর দুইটি গল্পের সহিত একত্রে পুস্তকাকারে ইহা প্রথম প্রকাশিত হয়। 'Modern Review' পত্রে ১৯২৭ সালের ফেব্রুয়ারী-জুন সংখ্যায় "Bindu's Son” নামে শ্ৰীঅশোক চট্টোপাধ্যায় কৃত ইহার ইংরাজী অনুবাদও প্রকাশিত হইয়াছিল। 'বিন্দুর ছেলের নাট্যরূপ সৰ্ব্বপ্রথম প্রকাশিত হয় ২২শে ফেব্রুয়ারী, ১৯৪৫ খ্ৰীষ্টাব্দে । অনুপমার প্রেম প্রথম প্রকাশ : ১৩২০ সালের চৈত্র সংখ্যা ‘সাহিত্য পত্রে প্রকাশিত হয়। পুস্তকাকারে প্রথম প্রকাশঃ কাশীনাথ গল্প-পুস্তকের অন্তভূক্ত সাতটি গল্পের অন্যতম। কাশীনাথ গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১লা সেপ্টেম্বর, ১৯১৭ খ্ৰীষ্টাৰ ( ভাদ্র, ১৩২৪)। ‘অনুপমার প্রেম’ গল্পের নাট্যরূপ প্রকাশিত হয় ২৬শে ডিসেম্বর, »ሕ8¢ অপ্রকাশিত রচনাবলী সমাজ-খন্মের মূল্য প্রখম প্রকাশ : ১৩২৩ সালের বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য সংখ্যা ভারতবর্ষ মাসিক পত্রে ‘শ্রীমতী আনিলা দেবী এই ছদ্মনামে প্রকাশিত। এই ছদ্মনামে শরৎচন্দ্র যমুনা’ ও ‘ভারতবর্ষে কয়েকটি প্রবন্ধ ও সমালোচনা निषिब्राहिणन। उँीशंद्र ७हे नांग aषप्य ‘यमूनांद्र बांश्द्रि रहेब्राहिण। eystę § শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ ১৯১২ খ্ৰীষ্টাব্দের ১২ই ফেব্রুয়ারী তিনি রেজুন হইতে "যমুনা সম্পাদক ফণীন্দ্রনাথ পালকে লিখিয়াছিলেন —“আমার তিনটে নাম। সমালোচনা-প্রবন্ধ প্রভৃতি —অনিলা দেবী। ছোট গল্প—শরৎচন্দ্র চট্টো। বড় গল্প—অভূপমা । সমস্তই এক নামে হলে লোকে মনে করবে, এই লোকটি ছাড়া আর বুঝি এদের কেউ নেই।” পুস্তকের অন্তভুক্ত হইয় প্রথম প্রকাশ ঃ শরৎচন্সের পুস্তকাকারে অপ্রকাশিত রচনাবলী"র অস্তভূক্ত হইয়া পুস্তকাকারে প্রথম প্রকাশিত হয়—শ্রাবণ, ১৩৫৮ । .* নারীর লেখা প্রথম প্রকাশ : ১৩১৯ সালের ফাঙ্কন সংখ্যা "যমুনা মাসিক পত্রিকায় ‘শ্ৰীআনিলা দেবী এই ছদ্মনামে প্রকাশিত । পুস্তকের অন্তভূক্ত হইয় প্রথম প্রকাশ ঃ "শরৎচন্দ্রের পুস্তকাকারে অপ্রকাশিত রচনাবলী"তে ইহার প্রকাশ হয় । সপ্তম সত্তার