বিষয়বস্তুতে চলুন

নিগ্রো জাতির নূতন জীবন/ইম্‌তালী

উইকিসংকলন থেকে

ইম্‌তালী

 সকাল বেলা ইম্‌তালী ষ্টেশনে নামলাম। ষ্টেশনটি ঠিক্ দার্জিলিং ষ্টেশনের মত। ষ্টেশন এবং তার চারদিক দেখে মনে হল সত্যিই স্বর্গরাজ্যে এসেছি। শহরের যতটুকু দেখলাম সর্বত্র পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ছোট রেল ষ্টেশনের একদিকে পার্বত্য ভূমি, অন্যদিকে সমতল, সুন্দর ঢেউ খেলানো ঘাসে পরিপূর্ণ সমতল ভূমি। স্নিগ্ধ বাতাস সমতল ভূমিকে আরও স্নিগ্ধ করেছিল। শ্বাস-প্রশ্বাস ফেলতে আরাম মনে হচ্ছিল। ষ্টেশনের একটু দুরেই সহর। সহর নীরব এবং নিস্তব্ধ। আমাদের দেশে যারা বায়ু সেবনার্থে সূর্য উঠবার পূর্বেই ঘর থেকে বেড়িয়ে আসেন সেই ধরণের বায়ু সেবনকারী একজন লোকও দেখতে পেলাম না। মনে হল স্বর্গভূমিতে বোধ হয় কেউ সকালে বেড়াতে বের হয় না।

 ষ্টেশন থেকে বেড়িয়ে বড় পথটা ধরে এগিয়ে চললাম। একটু অগ্রসর হবার পরই দেখতে পেলাম একজন পাঠান তার ঘরের বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে সিগারেট টানছেন। পাঠানের গোঁফ দাঁড়ি ছিল না। চুলও সভ্য সমাজের মতই ছাটা ছিল। লোকটিকে পাঠান বলে অনুভব হয় না, মনে হল একজন ইটালীয়ান অথবা গ্রীক বসে আছে। পাঠান আমাকে ডাকলেন। বারান্দার পাশে সাইকেলটা রেখে দিয়ে তাঁর পাশে একখানা চেয়ার টেনে বসলাম এবং নিজের পরিচয় দিলাম। আমার পরিচয় পেয়ে তিনি সুখী হলেন এবং ঘরের দিকে মুখ বেড়িয়ে বললেস “সোসী এদিকে এক পেয়ালা চা নিয়ে এস দেশের লোক এসেছেন।”

 ভেতর থেকে সোসী বললেস “জ্যনি একটু দেরী হবে, দেশের লোককে বসাও, চা নিয়ে আসছি!

 স্বামী-স্ত্রীর কথা শেষ হয়ে গেলে জ্যনি তাঁর আত্মজীবনী বলতে আরম্ভ করলেন। তিনি তার যৌবনে বিদেশে বেড়িয়ে পরেন এবং পায়ে হেঁটে আফ্রিকাতে পৌঁছেন। পথে সুয়েজ খাল নৌকার সাহায্যে পার হতে হয়েছিল। বাকি সব পথটাই তিনি হেটেছিলেন। সেই পুরাতন ভ্রমণ কাহিনী যখন তিনি আমার কাছে মহানন্দে বলছিলেন তখন তার স্ত্রী চা নিয়ে এলেন। জ্যনির তখন গল্প বলা একেবারে বন্ধ হয়ে গেল। মনে হল তার স্ত্রী জ্যনির ভ্রমণ কথা শুনতে পছন্দ করেন না। জ্যনির স্ত্রীকে আমাদের প্রথায় নমস্কার করলাম। এতে তিনি সুখী হলেন, আমার মনে হল হাত জোড় করে নমস্কার করলে বোধ হয় বনের পশুতেও দয়ার উদ্রেক হয়। নমস্কারে যতটুকু দৈন্যতা প্রকাশ পায় অন্য কিছুতেই ততটুকু পায় না। নমস্কার দ্রাবিড় সংস্কৃতি। চীনাদের মধ্যেও নমস্কার প্রথার প্রচলন আছে। তারাও দৈন্যতা দেখাতে কসুর করে না।

 বুদ্ধের স্ত্রী বোধহয় আমার কাছ থেকেই সর্বপ্রথম নমস্কার পেয়েছিলেন সেজন্যই তার এত আনন্দ। বৃদ্ধ জ্যনি তার নিজের চেয়ার তার নিজের স্ত্রীকে ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন।

 জ্যনির স্ত্রী তিন পেয়ালা চা তৈরী করে বৃদ্ধের হাতেই সর্বপ্রথম দিলেন তারপর দিলেন আমাকে। নিজের পেয়ালাতে মুখ দিয়েই বললেন “বেশ ভাল চা হয়েছে”, এখন বলুন আপনার দেশ কোথায়, কোন ধর্ম এবং নিগ্রোদের সম্বন্ধে আপনি কি মত পোষন করেন?

 বৃদ্ধার তিনটি প্রশ্ন শুনে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধাই হয়েছিল। তাকে আমার জন্মভূমির কথা বলে যখন ধর্মের কথা বলতে যাচ্ছিলাম তখন জ্যনি বাঁধা দিয়ে বললেন “ইনি বাংগালী বেনে নন্।”

 বুঝতে পারলাম বৃদ্ধা এত তাড়াতাড়ি কেন কথাটা বদলে দিচ্ছেন। বিদেশে গিয়েও কতকগুলি হিন্দু তাদের কুসস্কার পরিত্যাগ করে না। হিন্দু এবং মুসললান তাদের কুসংস্কার আকড়ে ধরে রাখতে সমান তালে পা ফেলে এগিয়ে চলে। বিদেশে বাংগালী বড়ই উদার। সে তার কুসংস্কার ভুলে গিয়ে ইণ্টারন্যাসনেল হয়ে যায় সেজন্য বাংগালী, হিন্দু মুসলমান সকলের কাছে সম্মানিত।

 ধর্মের কথা আমাকে বলতে হল না। নিগ্রোদের আমি ঘৃণা করি না বলেই ক্ষান্ত থাকলাম না। কি করে নিগ্রোদের উন্নতি হবে সে সম্বন্ধেও দু’ একটি কথা বলায় বৃদ্ধা আমার প্রতি সদয় হলেন এবং সেদিনই রাত্রে তার বাড়ীতে খাবার নিমন্ত্রণ করলেন।

 বৃদ্ধ জ্যনি বেশিক্ষণ আমাকে তার ঘরে বসিয়ে রাখলেন না—নিকটস্থ প্রসিদ্ধ ব্যবসায়ী এবং ধনী লালজীর ঘরের দিকে নিয়ে চললেন। তখন পথেও লোক চলাচল আরম্ভ হয় নাই। পথের দু’দিকের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা দেখে মনে হল এরূপ করে পথ পরিষ্কার রাখা অনেক শহরেই সম্ভব হয় না।

 পাশের ফুল বাগিচা হতে ফুলের সুগন্ধ সমেত প্রাতঃকালীন নির্মল বায়ু বয়ে আসছিল। মনে হচ্ছিল এটাই স্বর্গ। আমাদের দেশের লোক কাশ্মীরকে ভূস্বর্গ বলে। ১৯৩৭ সালে শ্রীনগর গিয়েছিলাম, সেখানে ফুলের গন্ধের বদলে অন্য কিছুর গন্ধ পেয়ে নাক রুমাল দিয়ে চেপে রাখতে হয়েছিল। স্বর্গ এবং নরকের স্রষ্টা মানুষ, আর কেহই নয়।

 অল্পক্ষণ পরই আমরা লালজীর ঘরে পৌঁছলাম, লালজী তখন সংবাদপত্র পড়ছিলেন। আমাদের দেখতে পেয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং সাদর সম্ভাষণ জানালেন। বসার পর জ্যনি লালজীর কাছে আমার পরিচয় দিলেন। আমার পরিচয় পেয়ে লালজী সুখী হলেন এবং উভয়ের জন্য চা আনতে নিগ্রো বয়কে আদেশ করলেন। চা খাবার পর লালজী আমাকে উপরে নিয়ে গিয়ে তার স্ত্রীর সংগে পরিচয় করিয়ে দিলেন এবং বললেন “আমার অবর্তমানে আপনার যে-কোন অসুবিধার কথা আমার স্ত্রীর কাছে বলবেন, তিনি অতিথি সেবায় বড়ই তৎপর, আশা করি আমার বাড়ীতে আপনার কোন অসুবিধা হবে না।”

 নিগ্রো চাকরেরা নবাগত দেখলেই সুখী হয়, বকসিসের আশায় নয়, নূতন কিছু জানতে পারবে সেই ভরসায়। বয় আমার কাছ থেকে অনেক নূতন তথ্য সংগ্রহ করল, কিন্তু তার প্রশ্ন করার পদ্ধতি দেখে ভয় হল হয়ত একদা এই বয় শ্রেণীর লোকই শ্বেতকায়দের সংগে ইণ্ডিয়ানদেরও আফ্রিকা হতে বহিষ্কার করবে। বয়ের মনের ভাব বুঝতে পেরে রডেসিয়াতেই আমি বৈদেশিক সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে কমন ফ্রণ্ট তৈরী করার চেষ্টা করেছিলাম। দুঃখের বিষয় স্থানীয় ইণ্ডিয়ানরা আমার কথায় সায় দেন নাই বরং বিদ্রূপ করেছিলেন। এদের ভবিষ্যৎ কোন অন্ধকারে নিমজ্জিত তা কে জানে?

 লালজীর স্ত্রীর সংগে যখন দেখা হল তখন পাঠান তাঁকে সুপ্রভাত জানালেন এবং আমিও তাই করলাম। কথা বলে বুঝলাম লালজীর স্ত্রী শুধু পরদা সরিয়ে দিয়ে সুখী হন নাই তিনি যে একজন স্বাধীন মহিলা তারও পরিচয় দেন। লালজীর স্ত্রীর মত আর একজন ভারতীয় স্বাধীন মহিলা চীন দেশের হার্‌বিন্ শহরে দেখেছিলাম। সেই ভারতীয় মহিলা স্বামীর আয়ের উপর নির্ভর করতেন না অথচ সংসার ধর্মও ঠিকভাবে চালিয়ে যেতেন। স্বাধীনতাপ্রিয় রমণীদের চালচলনই পৃথক। তাদের স্বাধীন ভাব নাকে মুখে ফুটে উঠে।

 গুজরাতীরা সকালের খাদ্যকে “নাস্তা” বলে। লালজী, জ্যনি এবং আমি এক সংগে নাস্তা করলাম এবং আমার সাইকেল ও পিঠ-ঝোলাটি লালজীর ধরমশালায় রেখে শহর দেখতে বের হলাম। তখন বেলা হয়েছিল। সকালের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য লোপ পেয়েছিল তবুও শহরটি দেখতে সুন্দর লাগছিল।

 একটু বেড়িয়ে এসেই আমরা এক গোয়ানী ভদ্রলোকের বাড়ীতে উঠলাম। ভদ্রলোকের নাম ডিকস্‌টা। জ্যনি আমাকে ডিকস্‌টার সংগে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমার পরিচয় পেয়ে ডিকস্‌টার নাকে মুখে আনন্দের সঞ্চার হল। তিনি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছিলেন না। কতক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, “শরীরে আর শক্তি নেই, নতুবা আবার পৃথিবী ভ্রমণে বের হতাম। ভালই হয়েছে, পৃথিবীর কি পরিবর্তন হয়েছে তাই জেনে সুখী হব।” তারপরই তিনি আমাকে গোটা পঞ্চাশেক প্রশ্ন করলেন। তার প্রত্যেকটি জবাব দেবার পর তিনি বললেন, পৃথিবীর ঢের পরিবর্তন হয়েছে মিষ্টার জ্যনি, আপনি কি বলেন?

 জানি বললেন, অনেক বৎসর পূর্বে দেশ ছেড়ে এসেছি, পরিবর্তন নিশ্চয়ই হয়েছে তবে আমার প্রশ্ন হবে অন্য ধরণের। স্থানের কি পরিবর্তন হয়েছে তা আমি জানতে চাই না, আমি জানতে চাই মানুষের কি পরিবর্তন হয়েছে?

 ডিকস্‌টা বললেন “আমরা যখন এদেশে আসি তখন জাহাজের চলাচল খুব কমই ছিল কিন্তু তাতেও কষ্ট কম হয় নাই। মিষ্টার জ্যনি আপনার ত কষ্ট আরও বেশি হয়েছিল। আপনি এদেশে এসেছিলেন পায়ে হেটে, সে কি সহজ কাজ? আরব, ইরাণী কেউ আপনাকে ছেড়ে দেয় নাই। সবাই নিজেদের পাওনা আদায় করেছে। জুর করে মজুর খাঁটিয়েছে। আমরা নৌকাতে খেঁটেছি বটে সেজন্য মজুরীও পেয়েছি। এজন্যে আমাদের আপশোষ করার মত কিছুই নেই। তারপরই আমার প্রতি লক্ষ্য করে বললেন “আপনিও ভ্রমণ করে আনন্দ পাচ্ছেন। আনন্দ সংবাদ দেবার জন্য আপনাকে বিরক্ত করব না। হয়ত আজই নয়ত আগামী কাল বিকালে আপনাদের চায়ের নিমন্ত্রণ করব। এখন পর্যটককে বিশ্রাম করতে দিলেই ভাল হবে।”

 ডিকস্‌টা পর্তুগীজ পূর্ব আফ্রিকাতে ছোটবেলায় এসেছিলেন এবং সেখানে জীবনের প্রায় অর্দ্ধেকটা কাটাবার পর চিন্তা করে বুঝতে পেরেছিলেন সেখানে থাকা সম্ভবপর হবে না। সেখানে টেক্স এতই বেশি যে ব্যবসা-বাণিজ্য করে যা রোজগার হয় তার শতকরা নব্বই ভাগই পর্তুগীজ সরকারকে দিতে হয়। মজুরীও সেখানে কম পাওয়া যায়। সেজন্য তিনি পর্তুগীজ পূর্ব আফ্রিকা পরিত্যাগ করে রডেসিয়াতে আসেন, তখন রডেসিয়াতে শ্বেতকায়দের তত উপদ্রব ছিল না। তারা নিগ্রো অথবা ইণ্ডিয়ানদের তত ঘৃণা করত না। সেজন্যই তিনি রডেসিয়াতে থেকে যান এবং এদেশেরই একটি অর্দ্ধ-নিগ্রো স্ত্রীলোকের পাণিগ্রহণ করেন। অর্দ্ধ-নিগ্রো স্ত্রীলোকদের চালচলন সম্বন্ধে ইংগিতে কিছুটা জিজ্ঞাসা করলাম। আমার প্রশ্নের উত্তরে ডিকস্‌টা বললেন “স্ত্রী হিসাবে ওরা ভাল কিন্তু ধর্মের গণ্ডি ওদের সহ্য হয় না। ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত কর আর খৃষ্ট ধর্মে দীক্ষিত কর তারা সাধারণত স্ত্রীধর্মই প্রতিপাষাণ করে। পর্ব ইত্যাদির কোনও ধার ধারতে চায় না। মরণের পর স্বর্গ নরক বলে যে কিছু আছে তা তারা কিছুতেই মানতে রাজি নয়। পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যটাকে তারা বড় করে দেখে। অর্দ্ধ-নিগ্রো ছেলেরাও সেইরূপ। তারা ধর্ম সম্বন্ধে একেবারে উদাসীন। ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছেলেদের সংগে যদি খৃষ্টান মেয়ের বিয়ে হয় তবে তারা দেখে মেয়ের মায়ের পাওনা ঠিক ঠিক ভাবে ছেলে এবং তার মা বাবা দিল কি না? মেয়ের মায়ের পাওনা পরিশোধ করতে পারলেই বিবাহ কর্ম সমাধা হয়।

 মিষ্টার ডিকস্‌টার স্ত্রী আমাদের কথা শুনছিলেন। কতক্ষণ পর তিনি ঘর থেকে বের হয়ে এসে আমাকে এক গ্লাস দুধ দিয়ে বললেন “যত অবতার পৃথিবীতে দেখতে পাওয়া যায় সকলের জন্ম স্থান এশিয়াতে, আমাদের দেশে একটা অবতারের জন্ম হউক তারপর সে যদি বলে স্বর্গ নরক আছে তখন তার সংগে আমরা কথা বলে দেখব সে ঠিক বলেছে কি মিথ্যা বলছে।”

 তোমরা প্রত্যেকেই একখানা করে ধর্মগ্রন্থ ইণ্ডিয়া হতে এনে আমাদেরে বল অবতার অমুক কথা বলেছেন, কিন্তু একজনের কথার সংগে অন্যজনের কথার ত কোন মতভেদ নেই, তবে কেন তোমরা একে অন্যে পৃথক থাক? আমরা এসব পারব না। তোমাদের অবতারগণ আমাদের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করতে পারবে না। জ্যনির স্ত্রী শূকর খেতেন। জ্যনি তা খেতে দেন না বলে জ্যনির স্ত্রী এখন শূকর মাংস খাওয়া পরিত্যাগ করেছেন, এসব কি ভাল কথা? ডিকস্‌টার স্ত্রীর কথা শুনে মিষ্টার জ্যনির মুখায়বয়বের পরিবর্তন হল বটে কিন্তু জ্যনি ধর্মকথা পরিত্যাগ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ কেমন হবে সে বিষয়েই আলোচনা করতে প্রবৃত্ত হন।

 ১৯৩৮ খৃষ্টাব্দের মধ্যভাগের কথা বলছি। রডেসিয়ায় অর্দ্ধ-নিগ্রো ও নিগ্রোদের ভোটের অধিকার ছিল না বলে তারা ক্ষেপে উঠেছিল। তারা প্রকাশ্যে বলত “যুদ্ধই হউক আর শান্তিই হউক টাকার লোভ দেখিয়ে কেউ আমাদের যুদ্ধে নামাতে পারবে না। সংবাদ মারফতে জানতে পেরেছিলাম যতদিন জার্মাণী সোভিয়েট রুশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে নাই ততদিন রডেশিয়ার নিগ্রো এবং অর্দ্ধ-নিগ্রোরা যুদ্ধ সম্বন্ধে কোন কথাই বলত না। কিন্তু যেদিন জার্মাণী রুশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল সেদিন থেকেই নিগ্রো এবং অর্দ্ধ-নিগ্রোরা জার্মাণীকে পরাজিত করবার জন্য বৃটিশকে প্রাণপণে সাহায্য করতে থাকে।

 মিষ্টার ডিকস্‌টার ঘর হতে বের হয়ে ছোট্ট শহরটি দেখবার জন্য পুনরায় বের হয়ে পড়লাম, তখনও দ্বিপ্রহর হয় নাই। সূর্য কিরণ এখানে সকল সময়ই উপভোগ্য। শহরের বৃক্ষরাজি সকল সময়ই সতেজ এবং তরুণ। পিচ দেওয়া পথের উপর বৃক্ষের ছায়া পড়ে শহরের সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। শহরের কোথাও আবর্জনা অথবা ময়লাযুক্ত স্থান দেখতে পেলাম না। পথচারীরা কোথাও পথের উপর থুথু ফেলছিল না। শহরের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং লোকের আচার ব্যবহার দেখে মনে হছিল সত্যই রডেসিয়ার ইম্‌তালী শহর একটি স্বর্গরাজ্য। তবে এখানে ইণ্ডিয়ান অথবা অন্য কোন এশিয়াটিকের দ্বারা পরিচালিত খাবারের দোকান অথবা রাত্রি যাপনের হোটেল দেখতে না পেয়ে দুঃখিত হলাম।

 শহরটি অনেকক্ষণ বেড়ানোর পর মনে হল ইউরোপের কোনও গ্রামে ভ্রমণ করছি। শহরের ঠিক মধ্যস্থল দিয়ে একটি চওড়া রাস্তা লম্বালম্বি হয়ে চলে গেছে। পথের দু’ পাশে বড় বড় দোকানে ইউরোপের পণ্য দ্বারা সুচারুরূপে সজ্জিত। দোকানগুলির পেছনে ছোট ছোট গলি। গলিতে অনেকগুলি মোটর কার পার্ক করা ছিল। গলির উভয় পাশে সুন্দর সুন্দর বাড়ী। এই বাড়ীগুলিতে অর্দ্ধ-নিগ্রো, দরিদ্র ইউরোপীয়ানগণ এবং ভারতবাসী বসবাস করে। শুনলাম এখানকার প্রত্যেকটি ভারতবাসীর একখানা করে মোটরকার আছে এবং সেজন্যই এতগুলি মোটরকার পথের পাশে দেখতে পাওয়া যায়।

 শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে একটি নিগ্রো পরিবারও ছিল না। অনেকে বলে নিগ্রোদের শহরে বাস করতে দেওয়া হয় না, কেন নিগ্রোদের শহরে বাস করতে দেওয়া হয় না তার উত্তর একজন ভারতবাসী দিয়েছিলেন। এদেশের নিগ্রোরা শহরে বাস করার শিক্ষা এখনও পায় নাই। যারা পেয়েছে তারা ইচ্ছা করলেই শহরে এসে বাস করতে পারে। কথার ভাবে বুঝলাম ভারতীয় ব্যবসায়ী মহাশয় নিগ্রোদের শহরে বাস করার বিরুদ্ধ মত পোষণ করেন। এটা হবার কথাই। গোলাম অপরকে গোলামই করে রাখতে চায়।

 ইম্‌তালী শহরটিকে ইউরোপের গ্রামের সংগে তুলনা করেছি। অনেকে হয়ত জিজ্ঞাসা করবেন ইউরোপের গ্রাম কি এতই পরিষ্কার? ইউরোপের গ্রামে কি কোন গৃহপালিত জন্তু নাই? এই প্রশ্নগুলির উত্তরে বলব ইউরোপের গ্রামে গৃহপালিত পশু থাকে না। কোনরূপ গোলাবাড়ী ইউরোপের গ্রামের কাছে রাখতে দেওয়া হয় না। ইউরোপের গ্রামে যেয়ে লোক বায়ু পরিবর্তন করে। এতে বুঝতে পারা যায় ইউরোপের গ্রামগুলি কত উন্নত। ইউরোপের গ্রামের কথা ইউরোপ ভ্রমণে লিখেছি অতএব এসব বিষয় নিয়ে এখানে পুনরায় আলোচনা করা চর্ব্বিতচর্ব্বন মাত্র।

 শহর পরিভ্রমণ করে লালজীর বাড়ীতে ফিরে গেলাম। লালজী আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। খেতে বসে লালজী দম্ভ করে বললেন ইণ্ডিয়ানদের মধ্যে কেবল তিনিই স্থানীয় লাইব্রেরী হতে বই এনে পড়তে পারেন। লাইব্রেরীতে ইণ্ডিয়ানদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। বই-এর লিষ্ট দেখে নিগ্রো বয়-এর মারফতে লাইব্রেরী হতে বই আনাতে হয়। ভাবলাম আজই বিকালে স্থানীয় লাইব্রেরীতে গিয়ে কিছুটা অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। খেতে বসে লালজীর অনেক কথাই শুনলাম কিন্তু বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করবার মত আর কিছুই পেলাম না।

 বিকাল বেলা শহরের লাইব্রেরীর দিকে রওয়ানা হলাম। পথে অনেকেই জিজ্ঞাসা করল কোথায় যাচ্ছি? সকলকেই বললাম লাইব্রেরীর কথা—লাইব্রেরীতে গিয়ে কি করি তা দেখার জন্য অনেকেই সংগ নিল। সাথীদের বললাম অপর ফুটপাথে যেয়ে দাঁড়ান, আপনাদেরে আমার সংগে দেখলে লাইব্রেরীয়ান্ হয়ত তার স্বরূপ না-ও দেখাতে পারে। আমার কথায় সকলেই সুখী হল এবং অন্য ফুটপাথে যেয়ে এমনিস্থানে দাঁড়াল যাতে লাইব্রেরীয়ান্ তাদের মুখ দেখতে না পারে। লাইব্রেরীর দরজার কাছে যেয়ে একটুও না দাঁড়িয়ে সোজা ঘরের ভেতর গিয়ে উঠলাম এবং লাইব্রেরীর শো-রুমে যে বই ছিল তাই দেখায় মন দিলাম। বই দেখা হয়ে গেলে যেস্থানে বসে লোক দৈনিক সংবাদপত্র পড়ে সেখানে যেয়ে একটি চেয়ারে বসে একখানা সংবাদপত্রে চোখ বুলাতে আরম্ভ করলাম। এমনি সময় লাইব্রেরীয়ান্ ধীরপদনিক্ষেপে আমার কাছে আসল এবং আমার ঘারে হাতটা রেখে বললে “তবে তোমার ইংলিশ জানা আছে?”

 আমি তার দিকে চেয়ে বললাম “আমি তোমাকে চিনি না দূরে সরে দাঁড়াও।”

 লোকটা বললে “আমি এখানকার লাইব্রেরীয়ান্”

 তোমাকে ধন্যবাদ, আমার মনে হয় তুমি একজন দার্শনিক—নয় অভদ্র। আমার ঘারে হাত রাখার তোমার কোনও অধিকার নাই।

 লাইব্রেরীয়ান আর ধৈর্য রাখতে পারল না। সে আমার হাত ধরে টেনে ঘরের বাইরে এনে একটা সাইন বোর্ড দেখাল। তাতে লেখা ছিল Only for Europeans—“শুধু ইউরোপীয়ানদের জন্য।” এরপর আর আমার বলার কিছুই ছিল না। চলে আসবার সময় বললাল “সাইন বোর্ডটি দরজার সামনে টাংগিয়ে দিলেই ভাল হত? লাইব্রেরীয়ান্ আর কোন কথা না বলেই গট্‌গট্ করে চলে গেল। দেশী ভাইরা যারা অন্য ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল তারা আমার কাছে এসে বলল এমনি করেই আমাদের জীবন এদেশে কাটাতে হচ্ছে। আমাদের ধন আছে কিন্তু মান নেই। আমরা সংখ্যায় মাইনরিটি।

 দেখতে দেখতে অনেকগুলি লোক ফুটপাথের উপর জমে গেল। জনতা ফুটপাথ ছেড়ে দিয়ে পথের উপর দাঁড়াল। জনতাকে লক্ষ্য করে বললাম, “যদি আপনাদের এদেশে থাকতে হয় তবে নিগ্রোদের সাহায্য পেতে হবে। এশিয়াটিক এসোসিয়েশনে নিগ্রোদেরও সভ্য করতে হবে, তারপর দেখবেন মুষ্টিমেয় ইউরোপীয়ান্ আপনাদের কাছে মাথা নত করবে।” জনতা বাড়তে না দিয়ে আমিই সরে দাঁড়ালাম এবং তাড়াতাড়ি করে একজন ইণ্ডিয়ানের ঘরে গিয়ে আশ্রয় নিলাম। পর্যটক বিদেশে গিয়ে হল্লা করে না, বিদেশের সংবাদ স্বদেশে নিয়ে আসে মাত্র।

 পরের দিন সকাল বেলা স্থাসীয় পোষ্টাফিসে গেলাম। পোষ্টাফিসের দুটি দ্বার। একটি দ্বারে লেখা রয়েছে “শুধু ইউরোপীয়ানদের জন্য”, অন্যটিতে কিছুই লেখা ছিল না। যে দ্বারে শুধু ইউরোপীয়ানদের জন্য লিখা ছিল সেটা ছিল পোষ্টাফিসের সামনের দিক, আর যে দ্বারে কিছুই লিখা ছিল না সে দ্বার ছিল পোষ্টাফিসের পেছন দিক। আমি সে দ্বার দিয়েই পোষ্টাফিসে প্রবেশ করছিলাম। দ্বার ডিংগিয়ে গিয়ে পোষ্টাফিসের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলাম একজন অর্দ্ধ-নিগ্রো কাউণ্টারে বসে আছেন। আমার কোনও চিঠি আছে কি না তাই জিজ্ঞাসা করায় তিনি “পোষ্ট রেষ্টে ইসি” ফাইলটি দেখে বললেন “না মাশায়”, লোকটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে আসলাম।

 চলে আসার সময় নিগ্রো লোকটিকে “থ্যাঙ্ক ইউ স্যার” বলেছিলাম। পেছনের গেট পার হয়ে বাইরে আসা মাত্র ভেতর থেকে একজন শ্বেতকায় এসে বলল “নিগ্রোদের” স্যার “বলতে নেই, এতে ভারতবাসীর পক্ষে বদনাম এবং অপমান হয়।” শ্বেতকায় কর্মচারীটিকে বললাম আমার কাছে শ্বেতকায় এবং কৃষ্ণকায়ে কোনও প্রভেদ নেই, অতএব দরকার বোধে সবাইকেই স্যায় বলব। কিন্তু কারো পদাঘাত সহ্য করব না। তোমাদের পোষ্টাফিসে আসা আমার নিতান্ত অন্যায় হয়েছে—ঐ দেখ লিখা রয়েছে শুধু ইউরোপীয়ানদের জন্য। আজ যদি আমি তোমাদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা নেই তবে আগামী কল্য যে আমরা ধ্বংস হয়ে যাব। “তোমার উপদেশের জন্য তোমাকে ধন্যবাদ মাশায়।” লোকটি আর কোন কথা না বলে আফিসে চলে গেল!

 সেদিন সকাল বেলা কালার্ড স্কুলে একটি সভা হয়। সভায় সভাপতির আসন পাঠান মহাশয়ই গ্রহণ করেন। সর্বপ্রথমই কালার্ড স্কুল কাকে বলে সে কথাটি আমায় বুঝিয়ে দেন। তিনি বলেছিলেন এই স্কুলে শুধু অর্দ্ধ-নিগ্রো এবং এশিয়াটিকরাই প্রবেশ করতে পারে। খাঁটী নিগ্রোদের এখানে প্রবেশ নিষেধ। আমার লেকচারের সময় অন্যান্য দেশের কথা শেষ করে কালার্ড স্কুল সম্বন্ধেই কিছু বলতে হয়েছিল। “বলছিলাম আপনারা শ্বেতকায় দ্বারা ঘৃণিত হন।” স্বচক্ষে দেখলাম আপনারা পোষ্টাফিস এবং লাইব্রেরীতে প্রবেশ করতে পারেন না। ঘৃণার প্রতিশোধ নির্যাতিত জাতকে ঘৃণা নয়, নির্যাতিতদের উন্নত করা এবং নিজের সমপর্যায়ে টেনে আনাই হল ঘৃণার প্রকৃত প্রতিশোধ।

 রাত্রে নিগ্রো এবং ইণ্ডিয়ানরা মিলে আমাকে এক ভোজ দেন। ভোজে খাদ্যের প্রাচুর্য হয়েছিল। যা রান্না হয়েছিল তার এক-তৃতীয়াংশও খাওয়া হয়নি। পরের দিন সকাল বেলা গ্রামের গরীব নিগ্রোরা খাদ্যের সদ্ব্যবহার করেছিল। ভোজের আয়োজন দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম এ যেন বাংলা দেশের ব্রাহ্মণ ভোজন। কিছু খাওয়া হবে আর কিছু ফেলা।

 ভোজ হতে বিদায় নিয়ে যখন লালজীর ঘরের দিকে আসছিলাম তখন নীল আকাশের সুন্দর চন্দ্রালোকে শ্বেতকায় যুবক-যুবতীগণ তাদের জাতের পরিচালিত রেঁস্তোরায় বসে আনন্দ করছিল আর আময়া চোরের মত পথ চলছিলাম। ইম্‌তালীতে ভারতবাসী এবং অর্দ্ধ-নিগ্রোর সংখ্যা শ্বেতকায়দের চারগুণ হবে কিন্তু স্বভাবের দোষে নিজেদের রেস্তোরা অথবা হোটেল ছিল না। আমাদের দেশের লেখক অথবা কথকগণ রেস্তোরা অথবা রাত্রি যাপনের হোটেলের কথা উঠলেই ভারতবাসীর প্রাচীন আতিথ্যের অহংকার করেন এবং জোর গলায় ইউরোপীয় সভ্যতাকে তৃতীয় শ্রেণীর সভ্যতা বলে গাল দেন। কিন্তু সেরূপ লোকের মুখেই আবার বাহাদুরীপূর্ণ ভাষায় বলতে শুনা যায় “আজ অমুক রেস্তোরায় খেয়ে আসলাম, কাল অমুল হোটেলে শুয়েছিলাম। আফ্রিকাতে আঠার মাস লোকের বাড়ীতে থেকে এবং খেয়ে আমার যতটুকু অধঃপতন হয়েছিল তেমনটি আর কিছুতেই হয়নি। যাদের মনের বিকাশ হয় নাই অথবা স্বাধীন ভাব মনে জাগরিত হয় নাই তারাই পরের বাড়ীতে খেতে এবং শুতে কোনরূপ কষ্টানুভব করে না।