বিষয়বস্তুতে চলুন

নিগ্রো জাতির নূতন জীবন/গভীর বনে

উইকিসংকলন থেকে

গভীর বনে

 অনেকটা পথ বেশ সুন্দরই পেলাম। তারপরই আরম্ভ হল একটানা ভাংগা পথ। ভাংগা পথে চলা বড়ই কষ্টকর। এর উপর যদি একা চলতে হয় তবে আরও কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমত বন এবং উপবন থেকে পথ একটু দূরেই ছিল, একটু এগিয়ে যাবার পরই গভীর বনের ভিতর দিয়ে পথ আরম্ভ হল। এরূপ মারাত্মক পথে কেউ সাইকেলে চলাফেরা করে না। আমাকে বাধ্য হয়ে বাইসিকেল চালাতে হয়েছিল। বেলা যখন বারটা তখন পথেরই পাশে বিশ্রামার্থ বসলাম। বসতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। বন্যজীব দ্বারা আক্রমণ হওয়ার ভয় ছিল। এদিকে কিন্তু শরীর চলছিল না। পা দু’খানা বিদ্রোহ ঘোষণা করে জানিয়ে দিয়েছিল আর প্যাডেল করা সম্ভব হবে না। বসতেই হল, সর্বপ্রথম কতকগুলি লতাপাতা সংগ্রহ করে আগুন ধরিয়ে দিলাম। লতাপাতা পুড়ে যাবার পর আরও কিছুটা এগিয়ে গিয়ে কতক্ষণ বিশ্রাম করলাম। বিশ্রামের পর আবার চলতে সুরু করলাম। তিনটার পূর্বেই একটা প্রশস্ত পরিষ্কার মাঠ পেলাম। ভাবলাম আজ রাত এখানেই কাটাব। সাইকেল দাঁড় করিয়ে রেখে কাঠ সংগ্রহ করতে গেলাম। কাঠ সংগ্রহ হয়ে গেলে বসবার স্থানটা বেশ ভাল করে পরিষ্কার করলাম। ভাবছিলাম আরও কতকটা জল পেলে ভাল হবে, কিন্তু জল অন্বেষনে বের হয়ে কোথাও জল না পেয়ে একটু হতাশ হলাম। কত মাইল পথ এসেছি তা জানবার উপায় ছিল না। আরও তিন চারদিন যদি পথ চলতে হয় তবে জল পিপাসা নিয়েই পথ চলতে হবে। ঠিক করলাম যে জলটুকু আছে তা দিয়েই আজ চালিয়ে দেব এবং কাল সকাল থেকেই জলের সন্ধান করব।

 পরিষ্কার স্থানটাতে কম্বলখানা বিছিয়ে বসলাম। সঙ্গের খাবার খেলাম, তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে নানা কথা ভাবতে লাগলাম। সকল কথাই একে একে লোপ পেয়ে জলের চিন্তা প্রবল হয়ে উঠল। যতই জলের চিন্তা করতে ছিলাম ততই জলের পিপাসা বেড়ে চলল। আমি কিন্তু জল খেলাম না। স্থানত্যাগ করে জলের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়লাম। সামনে পেছনে অনেকক্ষণ জলের অনুসন্ধান করলাম। কোথাও জল না পেয়ে অবশেষে স্থান ত্যাগ করা ভাল বিবেচনা করে সামনের দিকে এগিয়ে যাব ভাবছি এমন সময় ব্যাটব্রিজের দিক হতে একখানা মোটর আসার শব্দ শুনে পথের পাশে দাঁড়ালাম। মোটর আসা মাত্র তাদের থামতে বলায় যাত্রীরা থামল। তাদের কাছে জল চাইলাম। বিনা বাক্যব্যয়ে এক টিন জল আমাকে দিয়ে বলল “আর কিছু চাই?” আর কিছু চাই না স্যার, জানতে চাই এখান থেকে ব্যটব্রিজ আর কতদূর? একজন যাত্রী বললে এখান থেকে ব্যাটব্রিজ অন্তত সত্তর মাইল হবে। আরও দশ মাইল যদি দয়া করে এগিয়ে যান তবে বাঁদিকে একটি ছোট পথ পাবেন, সেই পথে দু’ মাইল অগ্রসর হলেই একটি নিগ্রো গ্রাম। কিছু বলবার পূর্বেই যাত্রীরা আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিল। এগিয়ে যাবার ক্ষমতা আমার ছিল না। ঠিক করলাম এখানেই আজ রাত কাটাতে হবে। জলের টিন কাছে এনে রাখলাম। চিন্তার উপশম হল। আরাম করে শোবার চেষ্টা করলাম।

 বনে জংগলে একরাত কাটানো শুনতে যেমন সহজ কাজে তেমন সহজ নয়। সন্ধ্যা হবার পূর্ব হতেই মনে হতাশ ভাবের সৃষ্টি হল। হতাশ ভাবকে লোপ করার জন্য আগুন জ্বালাতে ব্যস্ত হলাম। আগুন ধূ ধূ করে জ্বলে উঠল। কাঁচা ডালপালা আগুনে দেওয়ায় বেশ জমকালো ধোঁয়া হল। মনের হতাশ ভাব কেটে গেল। ডায়রী খুলে লিখতে বসলাম। লেখার বিষয় হ’ল বনে জংগলে এ জীবনে কয়টি স্থানে একাকী রাত্রি কাটিয়েছি। ১৯৩১ খৃষ্টাব্দ হতে আমার ভ্রমণ আরম্ভ হয়। চীন দেশ ভ্রমণের ডায়রী আমার সংগে ছিল না। তবুও যতটুকু মনে আসছিল ততটুকু লিখে মনটা যখন ক্লান্ত হল তখন ইচ্ছা হল শুয়ে থাকি কিন্তু শুইবার পূর্বে অন্তত কয়েকটি স্থানে আগুন জ্বালানো চাই। দশ হাত দূরে কাঠ সাজিয়ে একই সংগে কাঠের স্তূপে আগুন দিলাম। আগুন যখন ধূ ধূ করে জ্বলে উঠল তখন মনেও বেশ স্ফুর্তি হল। অবসাদ চলে গেল, ইচ্ছা হল আরও একটু হাটি। হাটবার স্থান বেশি দূরে নয়, আগুনের কাছেই। আগুন ও জলই আমার একমাত্র উপকারী বন্ধু। চারদিকে আগুন দেখতে চাই। দিনের আলো নিবে গেছে। বনের অন্ধকার এবং আকাশের অন্ধকার পুঞ্জিভূত হয়ে চারিদিক অন্ধকার করে ফেলেছে। আগুন, অন্ধকার, মাটি, জংগল সবই বেশ ভাল লাগছিল। ভাল লাগার কারণ ছিল। একেই গভীর জংগল তারই মাঝে রাত কাটাতে হবে। দুঃখ হচ্ছিল না, কারণ এখানে কেউ আমাকে হিংসা বা ঘৃণা করছে না। কিন্তু আগামীকাল যখন সুন্দর শহর দেখব, শহরে ভাল ভাল হোটেল দেখব, খাদ্যদ্রব্য দোকানে দেখতে পাব তার কিছুই ভোগ করতে পারব না, “কালার বার” আমার কাছ হতে সবই সড়িয়ে নেবে। হিংসা ঘৃণা আমার চারিদিকে হাঁ করে দাঁড়াবে।

 নানা চিন্তার মাঝে আবার যখন অবসাদ এল তখন কি চিন্তা করে হঠাৎ শুয়ে পড়লাম। যখন ঘুম ভাংল তখন চেয়ে দেখি ভোর হয়ে গেছে। বনের পাখী ডাকতে আরম্ভ করেছে। হিংস্রজীব জংগলে আশ্রয় নিয়েছে। নব চেতনার নব শক্তি পেয়ে আবার পথ ধরে চললাম। পূর্বেই বলেছি নিকটেই গ্রাম পাব, কিন্তু দশ মাইল চলার পর কোথাও গ্রাম পেলাম না। পেলাম দুটো নিগ্রো। দেখলেই নরঘাতক বলে মনে হয়। যারা বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা পড়েছেন তারা বিশেষ করে জানেন আমাদের দেশেও এক শ্রেণীর লোক ছিল যারা নরবলি দিয়ে তাদের দেবতাকে প্রসন্ন করত, এই লোক দুটোকে সেই শ্রেণীরই বলে মনে হল। এদের পোষাক জংলী লোকের মত ছিল না। এদেশ পোষাক ছিল স্থানীয় নিগ্রো ডাক্তারদের মত। নিগ্রো ডাক্তারগণ মন্ত্র পড়ে দেবতাকে সন্তুষ্ট ক’রে রোগের উপশম করে। এদের যদিও নিগ্রো ডাক্তারের পোষাক ছিল তবুও সন্দেহ হচ্ছিল। আমার জানা ছিল এই ধরণের লোক শ্বেতকায়দের ধরে নিয়ে কখনও তাদের দেবতার কাছে বলি দেয় না। নিগ্রোদের মতে আমিও শ্বেতকায়। পশুর আকৃতিবিশিষ্ট মানুষের পাশ দিয়ে যখন যাচ্ছিলাম তখন হঠাৎ মনে হল এদের সংগে একটু কথা বলে গেলে ভাল হবে। সবল মনে ইংলিশ কায়দায় জিজ্ঞাসা করলাম—

 এই তোরা এখানে কি কর্‌ছিস?

 কিছু না বানা (মিষ্টার)। আমরা পথ হারিয়েছি।

 মিথ্যা কথা বল্‌ছিস্, বল্ কোথায় যাবি?

 আর কোন কথা না বলে দানবতুল্য দু’টা লোক এক পা এক পা করে পেছন দিকে হটে গেল। এদের কাপুরুষতা দেখে অবাক হলাম। কিন্তু ভয় হল এই জানোয়ারগুলি আজই হয়ত কোনও নিগ্রো পরিবার সবংশে নির্বংশ করে তাদের দেবতার পূজা দেবে।

 আর দাঁড়ালাম না, এগিয়ে চললাম। ঠিক করলাম পাশের কোন গ্রামে আজ পৌঁছতে হবেই। বিকেল চারটার পূর্বেই মহাদো হল্ট (Mahado Halt) নামে একটি ছোট্ট গ্রামে পৌঁছলাম। গ্রামেয় এক পাশে কতকগুলি নিগ্রো বাস করে, অপর পাশে দুটি মাত্র বুয়র পরিবারের বাস। এরা দক্ষিণ আফ্রিকার রডেসিয়া সীমান্তে আড্ডা গেরেছে। এমন অনেক বুয়র অর্থাৎ দক্ষিণ আফ্রিকাবাসী দেখা যায় যারা সভ্যতা পরিত্যাগ করে নিগ্রোদের সংগে একত্রে বসবাস করে জীবন কাটিয়ে দেয়। এই দুটি পরিবারের লোকও সে ধরণের মনে করেছিলাম, কিন্তু সেটা ছিল আমার ভুল ধারণা।

 তারা আমাকে দেখল অথচ কিছুই জিজ্ঞাসা করল না। আমিও তাদের সংগে মেলামেশা করাটা নিরাপদ মনে করলাম না। নিগ্রোরা যেদিকে থাকে সেদিকেই চলে গেলাম। নিগ্রো বস্তির সামনে একজন বৃদ্ধ নিগ্রোর সংগে দেখা হল। বৃদ্ধ মিষ্টভাষী এবং দয়ালু। দেখা মাত্রই বুঝল আমি একজন অতিথি, অর্থাৎ রাত কাটাবার জন্য আশ্রয়প্রার্থী। সে আমাকে তার বাড়ীতে নিয়ে গেল এবং থাকবার ও রাত্রে যাহাতে ভাল খাদ্য পাই তার বন্দোবস্ত করল। বৃদ্ধ নিগ্রো জানত না আমার কাছে পাউণ্ড শিলিং আছে। সে তার সাধ্যমত খাবার এবং থাকবার বন্দোবস্ত করল। একটু বসতে দিয়েই সে কোথায় চলে গেল। ঘণ্টাখানেক সময় কাটিয়ে যখন ফিরে এল তখন দেখতে পেলাম অনেক খাদ্যসামগ্রী কিনে এনেছে। বৃদ্ধকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম তার হাতে যে সওদা ছিল তার দাম কমের পক্ষে চার শিলিং। বৃদ্ধের হাতে চার শিলিং দিয়ে দিলাম। শিলিং চারটি পেয়ে সে আনন্দিত হল এবং বলল তোমার কাছে পাউণ্ড শিলিং আছে সে ধারণা আমার ছিল না, যদি জানতাম তুমিই খাদ্যের দাম দেবে তবে আরও বেশি খাদ্য নিয়ে আসতাম। খাদ্য সমাপান্তে বৃদ্ধ আমাকে সংগে নিয়ে ইউরোপীয়ানদের বাড়ীতে গেল। ইউরোপীয়ান ভদ্রভাবেই বসতে দিয়ে আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করল।

 আমার পরিচয় পেয়ে ইউরোপীয়ান বলল “দেখে সুখী হলাম, তুমি ইণ্ডিয়ান হয়েও পৃথিবী ভ্রমণে বের হয়েছ। আমার ধারণা ছিল ইণ্ডিয়ানরা শুধু উচ্চাঙ্গের বুলি বলতেই জানে।

 কিসে তোমার এরূপ ধারণা হল?

 কিসে আমার সে ধারণা হল জানবার পূর্বে অনুমান কর ত আমার বয়স কত হতে পারে?

 কোকটি দীর্ঘাকৃতি, চুল প্রায় সবগুলিই সাদা। দাঁত বেশ শক্ত। হাতের পেশীগুলি বেশ মজবুত। মনে হল বৃদ্ধের বয়স ষাটের উপরে এবং পয়ষট্টির নীচে। যা ধারণা করেছিলাম তাই বললাম।

 বৃদ্ধ হেসে বলল ভুল করেছ বন্ধু। আমার বয়স বর্তমানে সত্তর পেরিয়েছে। বুয়র যুদ্ধের সময় আমি প্রাপ্তবয়স্ক ছিলাম। আমার কয়েকটি ছেলেমেয়ে ছিল। আমরা এখানেই বাস করতাম। কেনেডিয়ান, অষ্ট্রেলিয়ান এবং নিউজিল্যাণ্ডবাসী সেপাইরা আমাদের গ্রাম আক্রমণ করার পর আমরা পালিয়ে গিয়েছিলাম। সভ্য দেশের সেপাইরা আমাদের ছেলেমেয়ে এবং স্ত্রীলোকদের প্রতি কোন অত্যাচার করেনি, কিন্তু তোমাদের দেশের সেপাই যারা হস্‌পিটাল কোরের আর্দালী হয়ে এদেশে এসেছিল তারাই আমাদের নির্বংশ করে রেখে গেছে।

 লাফিয়ে উঠলাম এবং বললাম “তাই নাকি?”

 বৃদ্ধের কথা শুনে বড়ই দুঃখ হল এবং তাকে প্রবোধ দিলাম।

 বৃদ্ধ আরও দুঃখিত হল এবং বলল আমাদের নির্বংশ করে গিয়েছে, এরা কত বর্ব্বর।

 এখন থেকে যদি আমার কথাগুলি প্রণিধান করে অনুভব কর তবে বুঝতে পারবে পূজিবাদীরা কতদূর বর্বর। কেন তুমি ভারতবাসীদের প্রতি অনর্থক হিংসাত্মক ক্রোধ পোষণ করছ? ভারতীয় সেপাই যদি অর্থের দাস না হত তবে এমন হীনতম কাজ করত না। তুমি আমার নির্দেশ মত বই কিন, দেখবে আমি যা বলছি তা বর্ণে বর্ণে সত্য।

 বৃদ্ধ অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল তারপর বলল “কাল সকালেই আমি জোহান্সবার্গ যাব। সেখান থেকে প্রচুর বই কিনে আনব। বল ত তিন চার মাস পর কোথায় তোমার কাছে পত্র লিখতে পারি?

 কেপটাউনের একটি ব্যাংকের ঠিকানা দিয়ে বললাম, এই ব্যাংকের ঠিকানায় পত্র লিখলে পত্র নিশ্চয়ই পাব। শ্বেতকায় বৃদ্ধের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিগ্রো বৃদ্ধের হাত ধরে চলে এলাম।

 এর পরদিন বিকালে যে নিগ্রো গ্রামে পৌঁছলাম সেই গ্রামে অন্য আর একজন শ্বেতকায়ের সংগে দেখা হল।

 সে বলল, “মশিয়ে যদি দরকার মনে করেন তবে আগামীকল্য সকালে আমি এখান থেকে রওয়ানা হব, এবং আমি কিছুটা জংগল দেখিয়ে আনতে পারব।

 আগামীকল্য সকালে আমি গ্রাম ত্যাগ করতে পারব না। পরশু সকালে আপনার সংগে যেতে পারি।

 বুয়র লোকটি কি ভেবে চলে গেল। পরের দিন তার সংগে দেখা হয় নাই। রাত্রে যখন আমি নিগ্রো হাউসে বিশ্রাম করছিলাম তখন সে আমার ঘরে আসল এবং বলল “কাল সকালে যাবেন ত?”

 নিশ্চয়ই যাব বন্ধু, বস।

 লোকটি বসল। তার চোখের তারা দুটা জ্বলছিল। পকেটের পিস্তলটা এত ঝুঁকে পড়েছিল যে বার হতেই আমার চোখে পড়ছিল। তার মুখের পাইপ হতে দুর্গন্ধ আসছিল। পায়ের জুতা এবং মোজা বোধহয় অনেকদিন বদলায় নাই, তা হতেও ভয়ানক দুর্গন্ধ আসছিল। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম “আমাকে সংগে নেবার দরকার কি?”

 হ্যাঁ, তাই বলতে আসছি। মানুষের অভাব থাকে আমার নাই। আমার ঘরে মদের অভাব নাই, অর্থের অভাব নাই, নারীর অভাব নাই। আমি বিশেষ লেখাপড়া করি নাই বলে বিদেশে যাবারও ইচ্ছা নাই। তবে বিদেশীকে পেলে তার কাছ থেকে নূতন কথা শুনতে ভালবানি। এই গ্রামে আমরা উভয়ে সমভাবে বসতে পারব না, একসংগে খেতে পারব না। সেজন্য যেখানে গ্রাম নাই, অন্য মানুষ নাই, সেখানে যেয়ে তাঁবু খাটাব, উত্তম খাদ্য খাব এবং গল্প করব। এই ইচ্ছা নিয়েই এই অনুরোধ। লোকটার কথা শুনে যেমন বিস্মিত হলাম তেমনি তার কাছ থেকে কথা শুনারও প্রবৃত্তি হল। তার সংগে যেতে রাজি হলাম।

 সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই দেখি একখানা মস্তবড় লরী দাঁড়িয়ে আছে। চট্‌পট করে আমার বাইসিকেলখানা বের করে দিলাম। তারপর নিজে এসে তারই পাশের সিটে বসলাম। আমাদের উভয়ের মধ্যে মাত্র দুটি কথা হয়েছিল। আমরা উভয়েই উভরকে “সুপ্রভাত” জানিয়েছিলাম। পনের মাইল চলে যাবার পর লরী মোড় ঘুরিয়ে বড়রাস্তা ছেড়ে অরণ্য পথে প্রবেশ করল, তারপরও পাঁচ মাইল যাবার পর গাড়ী থামাল। সংগের নিগ্রোগুলি আমাদের জন্য ক’খানা চেয়ার এবং একটি টেবিল নামিয়ে দিয়ে চা করে নিয়ে এল। কাছেই সুন্দর একটি জলপ্রপাত। সেখানে গিয়ে স্নান করে এলাম। স্নান করে দেখি খাবার প্রস্তুত। আমরা খেতে বসলাম।

 বুয়র লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল “কেমন লাগছে?”

 বেশ ভাল, এমন সুন্দর স্থানে লোক যদি বসতি করে তবে বেশ হবে।

 বুয়র লোকটি এক টুকরা মাংস মুখে পুরে দিয়ে বললে “গোটা পৃথিবীটাই যদি মানুষ দখল করে তবে বনের পশু যাবে কোথায়?

 “কেন তাদের দেশে, পূর্ব আফ্রিকাতে দুটা রিজার্ভ রয়েছে। শুনেছি দক্ষিণ আফ্রিকাতে আর একটা রিজার্ভ রয়েছে। সংখ্যা অনুযায়ী স্থান দখল করা ভাল।”

 তবে ত আমাদের অর্থাৎ বুয়রদের দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে যেতে হবে

 আমি বাধা দিয়ে বললাম “মানুষ আর বনের পশু সমান নয়, সে-ও একটা কথা বটে।”

 খেতে বসে বেশি কথা বলা পছন্দ করি না বলায় সে চুপ করল। তারপর খাওয়া শেষ হলে আমরা জংগলে পাখীর খোঁজে বের হলাম। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল কতকগুলি গিনি ফাউল সংগ্রহ করা, কিন্তু তা হল না, আমরা মাত্র একটি খরগোস পেলাম।

 গিনি ফাউলের কথা নিয়েই আমি পূর্ব দেশের কথা আরম্ভ করলাম। লোকটি আমার কথা অনেকক্ষণ শুনল, তারপর সে তার পাইপে তামাক বোঝাই করে তাতে আগুন দিল। আমিও একটি সিগারেট ধরিয়ে বললাম “এই করেই আমাদের সৃষ্টি হয়েছিল। এখন আমরা উন্নত, আমাদের আরও উন্নতির দিকে এগুতে হবে।

 তবে কি আপনি বলতে চান নিগ্রোরাও মানুষ?

 হ্যাঁ, আমি তাই বলছি। প্রমাণ করে দিতে পারব।

 আচ্ছা ভেবে দেখব, বলেই লোকটা জংগলের ভেতর প্রবেশ করল। আমি একখানা কম্বল বিছিয়ে শুয়ে রইলাম। লোকটার চাল-চলন দেখে মনে হল সে শান্তিতে নেই। আমার কথায় তার মন উঠছে না। সে জানতে চায়, অথচ যা জেনেছে তা গ্রহণ করতে পারছে না। সেজন্যই সে আমার কাছে বসতে পারছিল না।

 সংস্কার বড় বালাই। ছোটবেলা হতে শুনে আসছে নিগ্রোরা মানুষ নয়, এরা এক জাতীয় বানর বিশেষ, আজ কি করে সে ওদের মানুষ বলে স্বীকার করতে পারে? তারপর শিক্ষার বড়ই অভাব। যে সকল পুস্তকে জ্ঞান থাকে দক্ষিণ আফ্রিকার মজুর শ্রেণীর লোক পড়তে রাজি নয়। আমাদের দেশের লোক যেমন প্রথম ভাগ আর দ্বিতীয় ভাগ পড়েই রামায়ণ মহাভারত পড়তে পারে এরাও তদ্রূপ। একটু লেখাপড়া শিখেই নাটক, নভেল এবং দৈনিক পত্র পড়ে তৃপ্ত হয়।

 লোকটা যখন ফিরে এল তখন আমি তাকে বললাম “আমার কথা আপনার ভাল লাগবে না। আপনার শিক্ষা অন্য ধরণের। ছোটবেলা হতে আপনি যে-সকল ধারণা মনে পোষণ করে আসছেন তা সহজে পরিত্যাগ করতে পারবেন না। আমার কথা শুনে কতকক্ষণ কি চিন্তা করল তারপর বলল “আজ আমরা এখানেই থাকব, আগামীকল্য সকাল বেলা আপনাকে বড় পথে দিয়ে আসব। আমি তাতে রাজি হলাম এবং নানা গল্পগুজবের ভেতর দিয়ে বৈকাল বেলা পর্যন্ত কাটিয়ে দিলাম। সে আমাকে বারংবার নানারূপ মদ খেতে দিচ্ছিল কিন্তু প্রত্যেকবারই আমি তার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করছিলাম। সন্ধ্যার পূর্বে তাকে বললাম “মদ খাওয়া আমার সহ্য হয় না, সেজন্যই আমি মদ খাই না নতুবা খেতাম। দ্বিতীয় কথা হল আমি পর্যটক। আমাকে অনেক দেশ দেখতে হবে, আমার জীবনের উদ্দেশ্য আছে। উদ্দেশ্যবিহীনরাই মদ খেতে ও শুয়ে থাকতে ভালবাসে। বলুন ত আপনার জীবনের কোনও উদ্দেশ্য আছে কি না? লোকটা আমার প্রতি অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে বলল “কই তেমন কিছু নেই ত। আমি বললাম “এখানেই আমাতে ও আপনাতে পার্থক্য।”

 রাত্রে খাওয়ার পর আমরা উভয়েই দু’খানা ক্যাম্পখাটে শুয়ে ছিলাম। লোকটি মুখ ফিরিয়ে বলল “বলুন ত আমার জীবনের কি মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া ভাল হবে?

 এখন ভাল কথা বলেছেন। যাদের আপনি মানুষ বলে স্বীকার করেন না, তাদের আপনি মানুষ বলে স্বীকার করে এদেরই নৈতিক এবং আর্থিক উন্নতির চেষ্টা করুন। আজ আমরা যেস্থানে আকাশের নীচে শুয়ে আছি এখানেই একখানা নিগ্রো গ্রাম তৈরী করুন। দেখবেন এতে জীবনে বিমল আনন্দ পাবেন। আর কতদিন উদ্দেশ্যহীন জীবন কাটাবেন?

 লোকটার চেতনা এসেছিল, সে বলছিল আমার কথামত কাজ করবে। পরেরদিন যখন সে আমাকে বিদায় দিয়েছিল তখন প্রতিজ্ঞা করল “উপরে আকাশ এবং পায়ের নীচে মাটি এ দু’য়ের নামে শপথ করে বলছি আমি নিগ্রোদের মানুষ বলে মেনে নেব এবং এদের উন্নতি করতে চেষ্টা করব। মানুষের মনে পরিবর্তন আসে দুই রকমে। জ্ঞানে এবং ভাবপ্রবণতায়। লোকটা ছিল ভাবপ্রবণ, সেজন্যই তার পরিবর্তন তাড়াতাড়ি এসেছিল।

 লোকটার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জংলী পথেই রওয়ানা হলাম, জানতাম নিকটেই বড় রাস্তা। বড় রাস্তায় চলতে ভাল লাগছিল না বলে জংলী পথ ধরে অগ্রসর হচ্ছিলাম। পরের দিন সকাল বেলা একটি গ্রামে পৌঁছি। গ্রামটি আমার ভাল লাগছিল। পরিশ্রম আর ভাল লাগছিল না। সেজন্য স্থির করছিলাম কয়েক দিন এই নিগ্রো গ্রামে থেকে তাদের আচার ব্যবহার ও রীতি-নীতি ভাল করে দেখে নেব। বাস্তবিক পক্ষে একটি গ্রামে কয়েকদিন না থাকলে সকল বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায় না। নিগ্রোদের প্রত্যেক গ্রামেই আমাদের দেশের মত একজন করে মোড়ল থাকে। কিন্তু মোড়ল কোথায় থাকে ঠিক করতে পারছিলাম না। বিশ্রামার্থ একটি ঘরের বাড়ান্দায় বসলাম। এদিকে জিগার্স (ডুডু) পোকা বড়ই অত্যাচার করে, আমার কিন্তু ডুডু পোকার ভয় ছিল না। নিগ্রোদের সংগে ভালবাসা থাকার জন্য তারাই আমার হাত পা হতে ডুডু পোকা বের করে দিত। তা বলে অনেক্ষণ মাটিতে বসা অন্যায় হবে ভেবে উঠে দাড়ালাম এবং গ্রামে ক’খানা ঘর আছে গণনা করলাম। হিসেব করে দেখলাম গ্রামে একুশখানা ঘর। একজন নিগ্রোকে জিজ্ঞাসা করলাম “এই তোদের গ্রামে ক’খানা ঘর?” নিগ্রো বলল “One & twenty only, bana.” এর মানে হল এককুড়ি একখানা ঘর। লোকটি ভাল ইংরাজী বলছে অথচ গুণবার সময় একুশ না বলে এককুড়ি এক বল্‌ল। আমাদের দেশের গ্রাম্য লোকের কথা মনে পড়ল। আমাদের গ্রামেও অশিক্ষিতরা এককুড়ি একই বলে। কুড়ি কুড়ি করে গণতি করে পূর্বে পৃথিবীর সর্বত্রই প্রচলিত ছিল। লানুষের জ্ঞানের প্রসারণের সংগে অঙ্ক বিদ্যাও উন্নতি হতে থাকে।

 ভারতবর্ষের সর্বত্র পঞ্চায়েত মহাশয়গণের বাড়ী বেশ সুন্দর এবং যারাই পঞ্চায়েতের কর্ণধার হন তাদের বেশ ভাল অবস্থাই থাকে। ভারতীয় প্রথামতে গ্রামের হেড্‌ম্যানের ঘরটা খোঁজার ভার নিজের চোখের উপর দিয়েছিলাম। চোখ কিন্তু কোনমতেই মোড়লের ঘর খুঁজে বের করতে পারল না, অবশেষে জিহ্বার সাহায্য নিলাম এবং পূর্বের নিগ্রোটিকে জিজ্ঞাসা করে হেড্‌ম্যানের ঘরে গেলাম। হেড্‌ম্যান তখন বাড়ীতে ছিল না। তার ঘরের দরজা বন্ধ ছিল। আমাদের দেশে ঘর বন্ধ করে যাবার সময় তালা লাগাতে ভুলি না। নিগ্রোদের দরজায় তালা দেওয়া হয় না। দরজা সাধারণত বাঁশের তৈরী থাকে। যে-কোন ঘরেরই দরজা বন্ধ থাকুক সে ঘরে পারতপক্ষে কেউ প্রবেশ করে না। মোড়লের ঘরের দরজার বসে থাকার চেয়ে যে নিগ্রোটি হেড্‌ম্যানের ঘর দেখিয়েছিল তার ঘরে চলে যাওয়াই ভাল মনে করে নিগ্রোটির হাতে এক শিলিং দিয়ে বললাম, চল তোমার ঘরে যাই এবং সেখানে গিয়েই বিশ্রাম করি। আমার কথা শুনে নিগ্রোটি ইতস্তত করছিল দেখে জিজ্ঞাসা করলাম, “কি হয়েছে?” নিগ্রো বললে, “বুঝতে পারছি না শিলিংটি দিয়ে কি করতে হবে।” ও-হো, সেই কথা, চল তোমার ঘরে যাই সেখানে গিয়ে শিলিং দিয়ে কি করতে হবে বলে দেব। নিগ্রো মাথা নত করে আমার সংগে চলল।

 হেড্‌ম্যানের ঘর হতে নিগ্রো লোকটির ঘরে এসে আরও একটি শিলিং দিয়ে বললাম, দোকান হতে ডাল, রুটি, বিস্কুট নিয়ে এস। দুই শিলিং একসংগে পেয়ে নিগ্রোর আনন্দ হল। সে তার পরিচয় দিল এবং বলল, তার নাম কটে। কটে সওদা কিনতে বের হয়ে গেল। কটের স্ত্রীও লাকড়ির সন্ধানে বের হল। কটে ফিরে আসার পর তাকে বললাম, “তোমার স্ত্রী তোমার সংগে সংগেই বেরিয়ে গেছে, সে কি লাকড়ি আনতে গেল।” কটে বলল, শুধু লাকড়ি আনতে নয়। ভুট্টার আটাও আনবে। পথে তার সংগে দেখা হয়েছিল, আমি পুনরায় তাকে স্মরণ করিয়ে দিলাম ভুট্টার আটা আমি খাব না, আমার জন্য ভাত রান্না করতে হবে। সেজন্য আমি পুনরায় চাল, ডাল, লঙ্কা, নুন, মাখন এবং মাছের টিন আনতে শিলিং দিলাম। এদিকে ছেলে তিনটিকে বিস্কুট দেওয়ায় তারা সুখী হয়ে আনন্দে নাচতে আরম্ভ করল, পরে বিস্কুট খাওয়ায় মন দিল।

 তিনটি ছেলে বিস্কুট খাচ্ছে দেখে পাড়ার অন্যান্য ছেলেমেয়েরা বিস্কুটের জন্য বায়না ধরল না বটে কিন্তু তাদের চাহনীতেই বুঝতে পেরেছিলাম তারাও বিস্কুট চায়।

 কটেকে যখন প্রথম একটি শিলিং দিয়েছিলাম তখন সে কিছুই বুঝতে পারছে না বলে ভাণ করছিল, দ্বিতীয় শিলিং হাতে পেয়ে সুখী হয়েছিল; তার কারণ খুঁজতেছিলাম। কারণ খুঁজে না পেয়ে অবশেষে কটেকেই জিজ্ঞাসা করলাম। কটে পরিষ্কার ভাবে বলল, একত্রে এক শিলিং কেউ তাদের দেয় না। যখনই কেউ দেয়, মনে করতে হবে এই দেওয়ার পেছনে মস্তবড় একটা মতলব আছে। যখন সে বুঝল আমার শিলিং দেওয়ার পেছনে কোন বদ মতলব নাই তখন সে সুখী হতে পেরেছিল।

 আমরা যখন চা খাচ্ছিলাম তখন কটের স্ত্রী ফিরে আসল। স্ত্রীকে দেখা মাত্র কটে এমন একটি ভাব দেখাল যেন সে আমাকে তার ঘরে ডেকে এনে মহা অন্যায় করেছে। কটের স্ত্রী আমাকে দেখে রাগ করল না। তার তিনটি শিশুকে আমার কাছে বসা দেখে সুখী হল। সকলের বড়টির পিতা অন্য আর একজন নিগ্রো। তাকে নাকি কটে কখনও দেখে নাই। দ্বিতীয় স্বামীকে কটের স্ত্রী তারই সামনে বিদায় করে দিয়ে তাকে রেখেছে। কটের স্ত্রী কখন তাকে বিদায় করে এই ভয়েই সে অস্থির থাকে। কটের দুরবস্থা দেখে কটেকে বললাম, তোমার স্ত্রীকে চা দাও তবেই তুমি সমস্ত বিপদ হতে রেহাই পাবে। কটে তৎক্ষণাৎ নিজের মাটির হাড়ীটা তাড়াতাড়ি শেষ করে স্ত্রীর জন্য চা ঢেলে দিল। স্ত্রী লিপ্‌টন চা বোধহয় কখনও খায় নাই। সেজন্য চা একটু খেয়েই উঠে দাঁড়াল এবং লাফ দিয়ে নেচে চক্কর দিল। তারপর আবার চা খেতে লাগল, এটাই হল এদের প্রশংসা করার একমাত্র উপায়। চা খাওয়া হয়ে গেলে কটের দিকে তাকিয়ে বললাম, “এখন শোন কটে, তুমি দুধ, চিনি এবং কাফি নিয়ে আসবে। এক শিলিংএর সিগারেটও আনবে। সিগারেট রডেসিয়ার হওয়া চাই। তোমাদের গ্রাম্য দোকান কোথায়?

 কটে একটু চিন্তা করে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, অতি কাছেই বানা, যেতে আসতে দশ মিনিট এবং সওদা কিনতে পাঁচ মিনিট।”

 কটে চলে গেলে ঘরের একদিক কতকগুলি খড়ের সাহায্যে পরিষ্কার করে তাতেই বিছানা বিছিয়ে ফেললাম। সঙ্গের মগ্ জলের কেতলী এবং অন্যান্য দরকারী জিনিস একত্র করে রেখে দিয়ে ডায়েরী লিখতে আরম্ভ করলাম। ডায়েরী অনেকদিন লেখা হয় নাই সেজন্য বেশ মাথা ঘামাতে হল। সর্বপ্রথম চিন্তা করে বের করতে হল সেদিন কি বার ছিল, তারপর তারিখ। ডায়েরী লেখা হলে নিগ্রোর ঘরের মধ্যে কি কি আছে এবং ঘরের অবয়ব কি রকমের তাই লক্ষ্য করলাম। কটের ঘর একটি গোল মঠ বিশেগ। ঘরের উপরের দিকটা মাটির দেওয়াল, উপরে খড়ের ছাউনি, বেশ সুন্দর ভাবে উঠেছে। যেন একটি শিব মন্দির। শিব মন্দিরের ভিটি বা চত্তর থাকে, এই লোকটির ঘরে শুধু তাহাই ছিল না। সামনের পথের সঙ্গে সমতা বজায় রেখেছিল।

 রান্নার একটি বড় মাটির হাড়ী ও জলের কলসী। কলসীর কানা নাই, নতুবা আমাদের দেশের মাটির কলসীর মতই। আর একটি ছোট্ট হাড়ী। তারই পাশে একখানা ছোট কাঠের হাতা। হাতাটি বেশ বড় এবং বেশ শক্ত কাঠ দিয়ে গড়া। জল খাবার জন্য ছোট্ট একটা গিল্‌টী করা জাপানী গ্লাস। এর পাশেই তিনটি বড় পাথর। তিনটা পাথরই উনুনের কাজে ব্যবহৃত হয়। ঘরের চালাতে একটা রশি বাঁধা ছিল। তাতে দুটা ময়লা হাফপ্যাণ্ট, একটা লম্বা সার্ট, আর একখানা নিগ্রো শাড়ী ঝুলছিল। শাড়ীখানা তিন হাত লম্বা এবং দেড় হাত চওড়া! নিগ্রো রমণীরা অনেক সময়ই তাই কোমড়ে বাঁধে। যারা ইউরোপীয় ধরণে গাউন পরে তারা এসব শাড়ী রুমালের মত মাথায় জড়িয়ে রাখে। ঘরের ভেতরের সকল জিনিস দেখে তারপর ছেলেমেয়েদের দেখলাম তারা বাইরে বসে আছে। বাহির হতে মাছি এসে এদের হাতের উপর বসছে। মাছির দংশন তিনটি ছেলে অম্লানবদনে সহ্য করছে। আমি তাদের পাশে দাঁড়িয়ে দেখতে ছিলাম এরা কতক্ষণ মাছির অত্যাচার সহ্য করতে পারে। ক্রমে ক্রমে ছেলে তিনটি মাটিতে শুয়ে পড়ল এবং গভীর নিদ্রায় নিদ্রিত হল। এদের অবস্থা দেখে মনে হল মাছির দংশন কেন, যে-কোন হুল ফুটানো যন্ত্রণাদায়ক মক্ষিকার দংশন পর্যন্ত এরা সহ্য করতে পারবে। কটের তিনটি শিশুই প্রায় মর মর অবস্থায় পৌঁছে ছিল। তাদের শরীরে রক্ত ছিল না, কি রোগ হয়েছে কেউ জানবার চেষ্টা করছিল না। মরলে মরল এই ধরণাই কটের স্ত্রী পোষন করে।

 পাড়াগাঁয়ের নিগ্রোরা এখনও বেশি কাপড় ব্যবহার করা পছন্দ করে না। পুরুষরা নেংটা থাকতেই ভালবাসে। বর্তমানে পাড়াগায়ের নিগ্রোদের কিছুটা সভ্যতা প্রবেশ করেছে সেজন্য স্ত্রী-পুরুষ সকলেই ঘরে এসে নেংটী ব্যবহার করে। প্রত্যেকের কোমড়ে একটি করে সূতার রশি বাঁধা থাকে। সেই রশির সাহায্যেই নেংটির ব্যবহার হয়। আমাদের দেশেও নেংটির ব্যবহার আছে, কিন্তু এখন প্রায় লোপ পেতে বসেছে।

 বিকালের দিকে পরিবার শুদ্ধ সকলে নিকটস্থ ছোট নদীতে স্নানের জন্য বের হল। আমিও সংগে চললাম। নদী-তীরে গিয়ে দেখি অনেকেই স্নান করতে আসছে। সকলেই উলঙ্গ হয়ে ঝুপঝাপ করে নদীতে ঝাঁপ দিচ্ছে। ছেলেমেয়েদের স্নান করতে কত না আনন্দ। আমি কিন্তু স্নানের দিকে তত আগ্রহ দেখালাম না। আমার যথাসর্বস্ব ঘরে রয়েছিল, অথচ ঘর হতে আসার সময় দরজা বন্ধ করে আসা হয়নি। কটেকে চিৎকার করে বললাম, “এই দরজা বন্ধ করে আসিস নাই, যদি অন্য কেউ সব নিয়ে চলে যায় তবে মহাবিপদে পড়তে হবে।” জল থেকেই কটে উত্তর দিল, “কুছ, পরওয়া নেই, সব ঠিক থাকবে। মন যদিও চঞ্চল ছিল তবুও স্নানে নামতে হল। দুটা ডুব দিয়ে আর বসে থাকলাম না, সোজা গ্রামে চলে এলাম।

 গ্রামে এসে দেখি, কতকগুলি লোক কাজ হতে ফিরে এসেছে এবং অনেকেই আমার সাইকেল দেখছে। কাছেই সিগারেটের বাক্স ছিল কেউ তাতে হাত দেয় নাই। আমাকে দেখা মাত্র জনতা আপন আপন বাড়ীতে চলে গেল। আমিও নিশ্চিন্ত মনে বস্ত্র পরিবর্তন করলাম।

 চারটার পূর্বেই আমাদের খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। কটের স্ত্রী তাদের জন্য ভুট্টার ছাতুর লেই তৈরী করেছিল। লবণ, মাংস এবং সব্জী সবই লেইয়ের মধ্যে দিয়েছিল। আমার জন্য পৃথক রান্না হয়েছিল। এদের লেই খেয়ে আমি কোনদিনই তৃপ্তি পাইনি, সেজন্য আজও তাদের লেই খেলাম না!

 খাবার পর যখন আমি একটা বই পড়ছিলাম তখন কটে বলল যে, তার স্ত্রীর শরীর বড়ই দুর্বল। কটের স্ত্রীকে দেখে কিন্তু দুর্বল বলে মনে হচ্ছিল না। সে বলল তাদের দুর্বলতা মুখে প্রকাশ পায় না, পিঠে প্রকাশ পায়। লক্ষ্য করে দেখলাম কটের স্ত্রীর ডানার হাড় দুখানা ভেসে উঠেছে এবং পিঠ একেবারে শুকিয়ে গেছে। তার স্ত্রীর অবস্থা দেখে মনে হল সে ঠিকই দুর্বল হয়েছে কিন্তু মুখ দেখে সেরূপ কিছুই মনে হল না। কটেকে বললাম, তোমার স্ত্রীর শরীর কি করে ভাল হবে আমি বলতে পারব না। আমি ডাক্তার নই, মিশনারী ডাক্তার যখন আসেন তখন তার কাছ থেকে ঔষধ নিতে পার। কটে বড় দুঃখ করে বলল, যতদিন সে খৃষ্টান হয় নাই ততদিন তাকে মিশনারী ডাক্তার অনেক কিছু দিয়েছেন। যখন থেকে খৃষ্টান হয়েছে তখন থেকে সকল সাহায্য বন্ধ হয়ে গেছে। কথাটা কিন্তু আমার বিশ্বাস হল না, সেজন্য শুক্রবারে মিশনারী ডাক্তার আসার পরই কটের স্ত্রীকে পরীক্ষা করতে বললাম। মিশনারী ডাক্তার আমাকে দেখে অবাক হলেন কিন্তু পরিচয় পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে কটের স্ত্রীকে ঔষধ দিয়ে খাদ্যের ব্যবস্থা করলেন। কটের স্ত্রীর জন্য ঔষধ এবং পথ্যের কেন ব্যবস্থা করেছিলেন বেশ ভাল করেই বুঝতে পেরেছিলাম। আমি না থাকলে কটের স্ত্রী কিছুই পেত না। আরও অনেক অসুস্থ নারী আমার চোখে পরছিল, তাদের জন্য কিন্তু সেরূপ কিছুই করেন নাই।

 বিকেল বেলা গ্রামের যুবক যুবতীরা গ্রাম থেকে একটু দূরে গিয়ে নাচতে আরম্ভ করল। তাদের নাচ দেখার জন্য আমি এবং কটে উপস্থিত ছিলাম। তাদের নৃত্যের সংগে অনেক ভারতীয় নৃত্যের সম্বন্ধ রয়েছে। বাস্তবিকপক্ষে তাদের নৃত্য দেখে সুখী হয়েছিলাম। অতি পুরাতনের সংগে ভারতীর নৃত্যের যে সম্বন্ধ রয়েছে সেই ভাবটিই নিগ্রোদের নৃত্যে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছিল। অবশ্য ইউরোপীয়ানরা অনেকেই নিগ্রো নৃত্য দেখে মুখ ফিরিয়ে চলে যায়। কিন্তু নিগ্রো নৃত্যে যতটুকু পবিত্রতা আছে ইউরোপীয়ান নৃত্যে ততটুকু পরিত্রতা আছে বলে মনে হয় না। নিগ্রোদের অনেক মানসিক বৃত্তি এখনও সুপ্ত, আর ইউরোপীয়ানদের মানসিক বৃত্তিগুলি পরিস্ফুট সেজন্যই তাদের মুখ ফিরিয়ে রাখতে হয়।

 সন্ধ্যার পূর্বেই নাচ-গানের হল্লা শেষ হল, আমরাও ঘরে ফিরে এলাম। কটের স্ত্রী আমাদের ঘরে পৌঁছার পূর্বেই ঘরের মধ্যস্থলে আগুন জ্বালিয়েছিল এবং ছাই দিয়ে মেজে ঘসে ঘর পরিষ্কার করে রেখেছিল। আমরা ঘরে গিয়ে ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিলাম। ঘরের ভেতর ধোঁয়া রাশিকৃত হল এবং আমার চোখ দিয়ে অনবরত জল পড়তে লাগল। এরূপ করে ধোঁয়ার ভেতর শুয়ে থাকা অভ্যাস না থাকায় ঘর হতে বাহিরে এসে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হল। যখন ঘর ধোঁয়া একেবারে নিশ্বেস হতে চলছিল তখন ঘরে গিয়ে দেখি সবাই মরার মত শুয়ে আছে। আমিও তাদের পাশে শুয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছিলাম। এরূপ সুখ দুঃখের ভেতর দিয়ে আমার একদিনের ভ্রমণ সমাপ্ত হয়েছিল।