বিষয়বস্তুতে চলুন

নিগ্রো জাতির নূতন জীবন/গ্রাম হতে গ্রামান্তরে

উইকিসংকলন থেকে

গ্রাম হতে গ্রামান্তরে

 সামমেই সুন্দর একটি নিগ্রো গ্রাম। গ্রামের মধ্যে কয়েকখানা ঘর। নিগ্রোদের ঘর গোল হয়, তারই মধ্যে একটি চতুষ্কোণ ঘরে মুদির দোকান। মুদির দোকানের মালিক একজন শ্বেতকায়, কর্মচারী একটি নিগ্রো, মাসিক মাইনে তিন শিলিং এবং দৈনিক দেড় পাউণ্ড করে ভুট্টার ছাতু পায়। লোকটি বড়ই বিশ্বস্ত এবং শ্বেতকায় ভক্ত। কথা প্রসংগে বলল দোকানের মালিক বড়ই উদার। তিনি শিক্ষিত নিগ্রোদের মোটেই পছন্দ করেন না। পাশের ঘরে কয়েকজন নিগ্রো বসা ছিল, তারা নাকি শিক্ষিত। কে শিক্ষিত এবং কে অশিক্ষিত তা জানবার প্রবৃত্তি লোপ পেয়েছিল। পরিশ্রান্ত এবাং ক্ষুধার্ত অবস্থায় এই ধরণের কথা নিয়ে সমালোচনা করা চলে না।

 দোকানের বয়কে জিজ্ঞাসা করলাম “এখানে খাওয়া থাকার বন্দোবস্ত করে দিতে পার?”

 নিশ্চয়ই স্যার, কি চান বলুন?

 শুইবার বিছানা এবং সামান্য কিছু খাবারের সংস্থান হলেই হল।

 নিগ্রো লোকটি বেশ ভাল করে চিন্তা করল তারপর বলল আড়াই শিলিং হলেই আজকের মত খাওয়া থাকা হয়ে যাবে। আড়াই শিলিং নিগ্রোর হাতে দিয়ে ঘরের মধ্যে বসে থাকলাম। বয় সর্বপ্রথম বিছানা করে দিল, তারপর গরম জল করে স্নান করতে বলল। ধারাবাহিকভাবে একটার পর একটা করে খাওয়া থাকার কাজ হয়ে গেলে বয়কে বলে শরীর হতে কয়েকটি ডু ডু পোকা বের করিয়ে নিলান। নিগ্রো লোকটি বড়ই গল্প-প্রিয়। সে যখন আমার হাত এবং পা হতে ডু ডু পোকা বের করছিল তখন একটি মজার গল্প বলছিল।

 এই গ্রামেরই একটি নিগ্রো সেলিশবারীর এক ধনী শ্বেতকায়ের বাড়ীতে কাজ করত। ধনী লোকটির অনেকগুলি মেয়ে ছিল। মেয়েদের মধ্যে দ্বিতীয় মেয়েটির স্বভাব চরিত্র অনেকটা তার বাবার মতই ছিল। তার বাবা ছিলেন বড়ই উদার, তিনি নিগ্রোদের মানুষ বলেই স্বীকার করতেন এবং মানুষের মতই ব্যবহার করতেন। তার নিগ্রো চাকরদের কাউকে দশ শিলিং-এর কম সাপ্তাহিক মাইনে দিতেন না। নিগ্রো চাকরদের থাকবার জন্য সুন্দর ঘরের বন্দোবস্ত ছিল। উদার শ্বেতকায়ের বাড়ীতে যে সকল নিগ্রো বাস করে তাদের স্বভাব এবং চরিত্র শ্বেতকায়দের মতই গড়ে উঠে। শ্বেতকাররা যেমন করে স্ত্রী জাতির সম্মান দেখায় তারাও ঠিক সেরূপ সম্মান দেখাত এবং অন্যান্য আচার-ব্যবহারের দিক দিয়েও নিগ্রো চাকরেরা ইউরোপীয়ান রীতি অনুকরণ করছিল। প্রকৃতপক্ষে নিগ্রো চাকরেরা ইউরোপীয়ানদের ভাল গুণ সবই গ্রহণ করেছিল কিন্তু তাদের বিবাহ প্রথা গ্রহণ করতে সক্ষম হচ্ছিল না। নিগ্রোদের বিবাহ প্রথা ইউরোপীয়ানদের বিবাহ প্রথা হতেও ঔদার্যপূর্ণ এবং যখন ইচ্ছা তখন স্বামী এবং স্ত্রীতে বিবাহ ভঙ্গ করা যায়। নিগ্রোদের মতে ইউরোপীয়ানদের বিবাহ প্রথা খুবই কঠোর নিয়মে আবদ্ধ সেজন্য তারা খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করেও খৃষ্টধর্ম মতে বিবাহ কার্য সম্পন্ন করে না।

 দুঃখের বিষয় শ্বেতকায়ের দ্বিতীয় মেয়েটি তাদের গ্রামের একটি নিগ্রো যুবককে বিবাহ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে। যুবক খুব ভাল করেই জানত এই বিবাহের ভবিষ্যৎ পরিণাম কি? রডেসিয়ার ইউরোপীয়ানরা তাকে প্রকাশ্যে হত্যা করত না, কিন্তু অপ্রকাশ্যে তার মৃত্যু অনিবার্য ছিল। সেজন্য সে শ্বেতকায় ভদ্রলোকের বাড়ীতে চাকুরী করা ভাল হবে না ভেবে স্বগ্রামে চলে যায় এবং একটি নিগ্রো যুবতীকে বিবাহ করে ঘর-সংসার করতে থাকে। যুবক ভাবছিল এখানেই শ্বেতকায় যুবতীর প্রেমের সমাধি, কিন্তু তা হল না। বৎসর শেষ না হতেই কোথা হতে সেই শ্বেতকায় যুবতী তাদের গ্রামে আসল এবং যুবককে দেখা মাত্র অন্য আর দুটি নিগ্রোর সাহায্যে ধরিয়ে এনে মোটরে বসাল। নিগ্রো যুবক পলায়ন করল না, সে জানত পালিয়ে কোনই লাভ হবে না। অনেক নিগ্রো যুবক শ্বেতকায় যুবতীদের কোপানলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে, তারও জীবনের শেষ হবে যদি শ্বেতকায় যুবতীর অবাধ্য হয়।

 নিগ্রো যুবক চুপচাপ করে মোটরে বসে থাকল। মোটরকার ক্রমাগত চলে ব্যরা নামক পর্তুগীজ বন্দরে এসে ঠেকল! তারপর দুজন নিগ্রো তাকে একটি জাহাজের কেবিনে প্রবেশ করিয়ে দিয়ে কেবিনের দরজা বাহির হতে বন্ধ করে দিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জাহাজ কলম্বোর দিকে রওয়ানা হল। বন্দর হতে জাহাজ বাহির হয়ে উন্মুক্ত সাগরে পৌঁছার পর নিগ্রো লোকটিকে মুক্ত করে দেওয়া হল। শ্বেতকায় যুবতী নিগ্রো যুবকের সংগে তখনও কোন কথা বলে নাই। জাহাজ কলম্বো পৌছার পর নিগ্রো যুবককে নিয়ে যুবতী শহরে যায় এবং সেখানে স্বামী-স্ত্রীরূপে বাস করতে থাকে। সুখের বিষয় নিগ্রো যুবক ইংলিশ ভাষায় চিঠি-পত্র লিখতে পারত। নিগ্রো যুবক গ্রাম হতে উধাও হয়ে যাবার কয়েক মাস পরে তার স্ত্রীর কাছে এক পত্র আসে। সেই পত্রে নিগ্রো যুবক তার স্ত্রীকে জানিয়েছিল দরকারবোধে সে অন্য স্বামী গ্রহণ করতে পারে। কলম্বো অতীব সুন্দর বন্দর এবং সেখানে নিগ্রোদের কেউ তত ঘৃণা করে না। সেজন্য নিগ্রো যুবক কলম্বো বন্দরেই আজীবন কাটাতে মনস্থ করল। এই রকমে অনেক নিগ্রো যুবক শ্বেতকায় রমণীদের দ্বারা অপহৃত হয়ে বিদেশে যেতে বাধ্য হয়। যদি তাদের বিবাহে আমাদের মত কঠোর নিয়ম থাকত তবে তাদের বিবাহিত স্ত্রীদের কত কষ্ট পেতে হত তার কথা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

 নিগ্রো বয়ের গল্পের শেষে তারই সজ্জিত বিছানায় শুয়েছিলাম। এখানেই সর্বপ্রথম দেখলাম এক জন নিগ্রো চাকর ইউরোপীয়ান ধরণে লোহার খাটের উপর জাজিম পেতে বিছানায় শুয়ে। যদিও গ্রামে একটিও মশা ছিল না তবুও নিগ্রো বয় মশারী খাটিয়ে ছিল।

 রডেসিয়ার রাষ্ট্রকেন্দ্র সেলিশবারী। সেখানে পৌঁছবার জন্য প্রাণটা আইঢাই করছিল। তাড়াতাড়ি করে সেলিশবারীতে যাবার দুটি কারণ ছিল। প্রথম কারণ সেলিশবারীর জেনারেল পোষ্টাফিসে আমার অনেকগুলি চিঠি দেশ-বিদেশ থেকে এসে জমা হয়েছিল। দ্বিতীয় কারণ হল জংলী পথে চলতে আর ভাল লাগছিল না! সেজন্য ছোট ছোট গ্রামগুলিতে রাত কাটিয়েই সেলিশবারীতে পৌছিতে চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু পথের দূরত্ব আমাকে একটুও দয়া দেখায় নাই৷

 চিঠির প্রলোভন ভুলতে বাধ্য হয়েছিলাম। এদিকের প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং শিক্ষিত নিগ্রোর সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলছিল।

 সেলিশবাড়ীর পথে একদিন একটি ছোট্ট নিগ্রো গ্রামে থাকতে হয়। গ্রামটি একেবারে ইউরোপীয় ধরণের। গ্রামের স্ত্রী-পুরুষ সকলেই বেশ শিক্ষিত এবং সভ্য। যে বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছিলাম সেই বাড়ীতেই একজন আমেরিকান নিগ্রো মহিলা আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি ভূতত্ব এবং নৃতত্বে অভিজ্ঞ ছিলেন। সেই মহিলা আমাকে দেখতে পেয়ে মোটেই সুখী হন নাই। বরং যাতে আমি গ্রামে থাকতে না পারি তারই ব্যবস্থা করতে থাকেন। তাঁর ব্যবহার আমার মোটেই ভাল লাগে নাই। সেজন্য তাকে কয়েকটি কটুবাক্য বলতে বাধ্য হই।

 আপনি কি বুয়র-গৃহে প্রতিপালিত?

 মহিলা ক্রোধ সম্বরণ করতে না পেরে বললেন “আমি হবোদের ‘Hobo’ পছন্দ করি না।”

 আমার জীবনে এই সর্বপ্রথম হবো শব্দটি শুনে দুঃখিত না হয়ে হবো কাকে বলে তাই জানতে আগ্রহ প্রকাশ করি।

 মহিলা বললেন তোমার মত যারা এক স্থান হতে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়ায় এবং কোনও কাজ করে না তারাই হল হবো। হবোদের চরিত্র দোষ নানা দিকেই থাকে। তুমি যে চোর নও তার প্রমাণ কি?

 মহিলাকে বললাম “আমেরিকাতে হবোরা! চুরি ও ছেচরামি করে এটাই বোধহয় আপনার বক্তব্য বিষয়। আমি কিন্তু চোর নই, আমার কাছে টাকা পয়সাও বিস্তর আছে। যদি স্থানীর অসভ্য নিগ্রোরা এখানে একটা হোটেল খুলত তবে আপনাদের আশ্রয় চাইতে হত না।

 স্ত্রীলোকটি আর ধৈর্য রাখতে পারলেন না, একেবারে চামুণ্ডা রূপ ধরে বললেন “তুমি কি খাবার থাকবার জন্য দশ শিলিং দিতে পারবে?”

 সেদিন আমার পকেটে চল্লিশ পাউণ্ড এবং ব্যাঙ্কের চেক নিয়ে মোট দু’শত পাউণ্ড ছিল। মহিলার হাতে পাঁচ পাউণ্ডের একখানা নোট ফেলে দিয়ে বললাম এবার আমার পালা ও এই নিন পাঁচ পাউণ্ড এবং এর বদলে আমাকে উত্তম থাকবার ও খাবার বন্দোবস্ত করে দেন। আরও বলছি আমি যে সৎ লোক তার প্রমাণার্থে আমার কাছে অনেক দলিল আছে। পুলিশ ডেকে আনুন, পুলিশের সামনেই আমার সততার পরিচয় দেব।

 মহিলার চক্ষে যেন সরিষাফুল ফুটে উঠল। তিনি কি করবেন তা ভেবে কিছুই ঠিক করতে পারছিলেন না, ঘরের ভেতর চলে গেলেন। ঘরের মালিককে বললাম যদি আপনার ঘরে থাকার স্থান না হয় তবে অন্যত্র বন্দোবস্ত করে দিন। ঘরের মালিক মহা ফ্যাসাদে পড়লেন। হঠাৎ তার মনে হল গ্রামে একজন ভারতবাসী আছেন। ঘরের মালিক আমাকে তার ঘরে বসিয়ে ইণ্ডিয়ানের বাড়ীতে গেলেন। ইণ্ডিয়ান তখন ঘরে ছিলেন না, তিনি গিয়েছিলেন সেলিশবাড়ীতে। তার অর্দ্ধ-নিগ্রো স্ত্রী যখন শুনলেন একজন ইণ্ডিয়ান থাকবার জন্য স্থান খুঁজছে তখন দৌড়ে এসে বললেন “আমাদের কথা আপনার কাছে কি কেউ বলেনি?”

 অর্দ্ধ-নিগ্রো স্ত্রীলোকগণ বড়ই ভাবপ্রবণ সেজন্য বলতে বাধ্য হলাম “আমি ভেবেছিলাম আপনারা এই ঘরটাতেই থাকেন কিন্তু এখানে আসার পর এরূপ ঘটনা যে ঘটবে তা আমার ধারণাও হয়নি। ভদ্রমহিলা বললেন আর এখানে বসে লাভ নাই মাতালটা বোধহয় এখনই আসবে। সে যদি এসে আপনাকে অপরের দরজায় দেখতে পায় তবে আর আমার ইজ্জত থাকবে না। তাড়াতাড়ি করে মাতালের ঘরে গেলাম এবং আরাম করে বসলাম। অর্দ্ধ-নিগ্রো মহিলা মাতালটা যাকে সম্বোধন করছিলেন তিনি হলেন তার স্বামী।

 মাতালের ঘরে গরম জলের বন্দোবস্ত ছিল। স্নান করে কিছু খেয়ে মাতালের অতিথিশালায় শুয়ে থাকলাম। তারপর যখন ঘুম ভালে তখন পুনরায় আমেরিকার নিগ্রো রমণীর ঘরে গেলাম এবং আমার ভ্রমণের কারণ তাকে বুঝিয়ে বললাম। আমার ভ্রমণের কারণ শুনে তার চৈতন্য হল এবং নানারূপ বাক্যালাপে মনোনিবেশ করল। তার ধারণা ছিল না আমিও মনুষ্যতত্ত্ব বিজ্ঞানের কিছুটা জানি। বাইরের মাটির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললাম এই মাটি বহুদিনের আবাদী। আপনি এখানে যদি একটি গর্ত খোঁড়েন তবে দেখবেন অন্ততঃ ত্রিশ ফুট নীচে শক্ত পাথর রয়েছে। শুধু এখানে নয় নীচের দিকের যত স্থান বেড়িয়ে আসছি প্রায় সর্বত্রই একই রকমের মাটীর অবস্থা দেখে এসেছি। ন্যাসালণ্ড একদিন সভ্যতার লীলাভূমি ছিল তাতে আর সন্দেহ নাই। তবে সেই সভ্যতার সংগে বর্তমান ভারতের কোনও সম্পর্ক আছে কি না তাই দেখবার জন্য আমি সত্বরই বুলবায়ো হতে ভিক্টোরিয়া নামক স্থানে গিয়ে জাম্বাবী ধ্বংসস্তূপ দেখব। আপনি সেই ধ্বংসস্তূপটি দেখেছেন কি?

 আমেয়িকান্ নিগ্রো মহিলা একটি দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করে বললেন “আমি সে ধ্বংসস্তূপ দেখেছি এবং ন্যাসল্যণ্ডেও দেখেছি, সর্বত্র দ্রাবিড় সভ্যতার পূর্ণ বিকাশ দেখতে পেয়ে সুখী হয়েছি। বুঝতে পেরেছি এদিকে ভারতীয় সভ্যতার প্রসার হয়েছিল, তবে কখন সে সভ্যতার প্রসার হয়েছিল তা অনুমান করতে সক্ষম হইনি। আপনি সেদিকটা একটু ভাল করে দেখবেন। বড়ই দুঃখের সহিত বলছি আমি অনেক ফাইন টাইপের নিগ্রো দেখেছি, তাদের চুল ভারতীয় দ্রাবিড়দের মতই, চোখগুলি বেশ বড় বড় এবং দেখতেও মৃগাক্ষী বললেও চলে। এরা নিশ্চয়ই কোনও বিদেশী বংশের শেষ অংশ। নিগ্রোরাই শুধু নিগ্রো রয়ে গেছে, বর্তমানে তাদের মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে, একেবারে শিশুর দল।” নিগ্রো রমণীর দুঃখের কথা শুনে আমারও দুঃখ হল, কারণ নিগ্রোদের মধ্যে আমরা বর্তমানে যে সভ্যতা দেখতে পাই তাতে মৌলিকত্ব মোটেই নাই, সবই বিদেশী। আমেরিকান্ নিগ্রো মহিলাকে বললাম “দুঃখ করার কিছুই নেই, সভ্যতার মৌলিকত্ব নিয়ে যারা বাহাদুরী করে তারা জানে না তাদের পূর্বপুরুষগণও একদিন নিগ্রোদের মতই অসভ্য ছিল।

 মাতাল ঘরে ফিরে এসে যখন শুনল আমি তারই ঘরে উঠেছি তখন সে আর ঘরে বসে থাকে নাই। তক্ষণি শহরের দিকে যায় এবং রাত আটটার সময় দুই বোতল হুইস্কি এবং আরও কিছু টুকটাক জিনিস নিয়ে ফিরে আসে। সে যখন ফিরে আসল তখন আমি তারই ঘরে বসে একখানা দৈনিক সংবাদ পত্র পড়ছিলাম। এসেই বলল “আজ আমার কি সৌভাগ্য, ভারতের ভূপর্যটক আমার অতিথি। তারপরই আরও উচ্ছ্বাসের প্রস্রবণ ছুটিয়ে দিল। সেই প্রস্রবণে ভিজে গিয়ে জ্বরাক্রান্ত হতে চলছিলাম। কিন্তু মাতাল যখন শুনল আমি মদ্যপায়ী নই তখন সে হতাশ হল। সুখের বিষয় মিনিট পনের পরই সেলিসবারীর জনৈক পেটেল তার ঘরে অতিথি হবার জন্য এসেছিলেন। তিনি ছিলেন মদ্যপায়ী, তাঁকে পেয়ে মাতাল অনেকটা শান্ত হয়। রডেসিয়াতে ভারতবাসীর পক্ষে মদ খাওয়া বড়ই ব্যাঙ্গকর ব্যাপার। যার তার কাছে মদ বিক্রি হয় না, সেইজন্য অনেকেই শ্বেতকায়দের ঘুষ দিয়ে মদ কিনিয়ে আনে। এতে শ্বেতকায়দের দু’পয়সা রোজগার হয়। আজ যাকে আমরা ব্লেক মারকেই বলছি দক্ষিণ রডেসিয়াতে তাই যুদ্ধের পূর্বেই প্রচলিত ছিল।

 মাতালের বেশ আয় ছিল। সেলিসবারীর তিনি কোনও সওদাগরী অফিসে ত্রিশ পাউণ্ড মাসিক বেতনে হিসাব রক্ষকের কাজ করতেন। এই আয়ের দ্বারা মাতালের সাংসারিক খরচ এবং হাত খরচও চলত। অর্দ্ধ-নিগ্রো রমণীরা খুব কম খরচে থাকতে পারে। গয়না এবং শাড়ীর বালাই তাদের নেই। তাদের একটা প্রধান খরচ আছে, সেই খরচটা হল বড় বড় বই কেনা এবং অবসর সময় তাই পড়া। মাতালের পুত্র কন্যারা খাঁটী ইউরোপীয় প্রথায় প্রতিপালিত হওয়ায় তারা স্ব স্ব ভরণপোষণের ভার নিজেরাই বহন করত এতে মাতালের খরচ আরও কমে গিয়েছিল।

 প্রাচুর্যের মধ্যে আনন্দের বিকাশ হয়। খালি পেটে অথবা অর্থাভাবের মধ্যে আনন্দের পেছনে দুঃখ লুকিয়ে থাকে। মুখের মধ্যে হাসি ফুটে উঠে বটে কিন্তু তার মধ্যে একটি দুঃখের ক্ষীণ সূত্র দেখতে পাওয়া যায়, মাতাল এবং তার স্ত্রীর মুখে সেরূপ ভাব দেখতে পাওয়া যেত না। রডেসিয়ার ভারতীয়দের মধ্যে অভাবের নাম গন্ধ নাই। নবাগত ভদ্রলোক সেলিসবারীর একজন বিখ্যাত ধনী। তিনি আমাকে তার বাড়ীতে থাকতে অনুরোধ করেন। মাতালের বাড়ীতে সে রাতটা বেশ আনন্দেই কেটেছিল।