বিষয়বস্তুতে চলুন

নিগ্রো জাতির নূতন জীবন/তিন সাথী

উইকিসংকলন থেকে

তিন সাথী

 সেলিসবারী হতে বুলবায়ো যাবার পথে ইণ্ডিয়ান অথবা অর্দ্ধ-নিগ্রোদের বাড়ী না থাকায় খাওয়া থাকার পক্ষে বেশ কষ্ট পেতে হয়েছিল। পথে নিগ্রো চাষীদের সংগে দেখা হলে তারা যেমন কথা বলত না আমিও তেমনি মুখ ফিরিয়ে হয় তাদের আগে চলে যেতাম নয়ত পেছনে থাকতাম।

 এদদিন তিনটি নিগ্রো যুবক আমার পেছন নেয়। ভাবছিলাম এই যুবকত্রয় আমার পাশ কাটিয়ে আগে চলে যাবে, কিন্তু তারা তা না করে ক্রমাগতই আমার পেছনে চলছিল। কতক্ষণ যাবার পর একটি বৃক্ষচ্ছায়ায় বসে বিশ্রাম করার ভান করলাম। তারাও আমার কাছে বসল এবং বিশ্রাম করতে ছিল। অনেকক্ষণ বসে আছি এবং উঠবার নাম করছি না দেখে যুবকত্রয়ের একজন জিজ্ঞাসা করল “বানা যাবেন কোথায়?”

 বুলোবায়ো।

 সকল পথটাই কি সাইকেলে যাবেন না গুটুমা গিয়ে রেল গাড়ীতে বসবেন?

 অন্য আর একজন যুবক বলল “যদি দয়া হয় তবে আমরাও আপনার সংগে পথ চলতে চাই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য আপনাকে সাহায্য করা এবং আপনার সংগে থেকে নানা বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করা।” বললাম “এতে আমার কোনও আপত্তি নাই, এখন আমি উঠব, চল ত এস।”

 যুবকত্রয় তৎক্ষণাৎ আমার সংগ নিল। মাইল পাঁচেক যাবার পর আমরা একটি নিগ্রো বিদ্যালয়ের কাছে আসলাম এবং যুবকত্রয় আমাকে পথের পাশে বসিয়ে রেখে নিকটস্থ নিগ্রো বিদ্যালয়ের দিকে যাবার পূর্বে বলে গেল যে পর্যন্ত তারা ফিরে না আসে সে পর্যন্ত আমি যেন স্থান ত্যাগ না করি।

 অনেকক্ষণ পর যুবকত্রয় একজন ইউরোপীয়ানকে সংগে নিয়ে আমার কাছে আসল। ইউরোপীয়ান্ লোকটিকে দেখেই মনে হল তিনি একজন পাদরী এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষক হবেন। তিনি আমার সামনে এসে দাঁড়াবার পরও যখন আমি তাকে অভিবাদন করলাম না এবং কিছুই বললাম না তখন তিনি নিজেই বললেন “তুমি কি পরিশ্রান্ত?”

 অনেকটা তাই, তুমি এখানে কি কর?

 পাদরী নিজের পোষাকটি দেখিয়ে বললেন, “আমি এখানকার পাদরী এবং শিক্ষক। চল আমার সংগে, তোমার থাকা এবং খাওয়ার বন্দোবস্ত করে দেই।

 চল, বলে উঠে পড়লাম।

 পথের পাশেই মস্তবড় দোতালা বাড়ী। বাড়ীতে শিক্ষক থাকেন। আর একটু দুরেই গীর্জ। গীর্জার পাশেই আর একটা ঘরে কতকগুলি ছাত্র থাকে যাকে বলা হয় হোষ্টেল। আমাকে সেখানেই নিয়ে গিয়ে বসানে হল। বসার পর পাদরীকে বললাম “এক গ্লাস জল দাও।” পাদরী তৎক্ষণাৎ এক গ্লাস জল আনতে একটি ছেলেকে পাঠালেন। ইত্যবসরে পাদরী আমাকে বললেন “দেখেছ আমাদের বোর্ডিং হাউস, কেমন সুন্দর, ভারতে এমন হোষ্টেল কটা আছে?”

 লণ্ডনেও এমন সুন্দর বোর্ডিং নাই, আমি লণ্ডনে অনেকদিন ছিলাম কিনা তাই বলছি।”

 পাদরীর মুখ শুকিয়ে এল। পাদরী যতক্ষণ পর্যন্ত আমার সংগে কথা বলছিলেন ততক্ষণ পর্যন্ত “প্লিজ” শব্দ একবারও ব্যবহার করেন নাই। আমি ঠিক তেমনি তার সংগে কোন কথার সংগে অথবা প্রথমে ভদ্রতাসূচক ‘প্লিজ’ কথা ব্যবহার করি নাই। অবশেষে যখন পাদৱী বুঝলেন আমি অন্য ধরণের লোক, স্থানীয় ভারতবাসী নই, তখন তাঁর ভাষার এবং মনের পরিবর্তন হল। আমাকে তৎক্ষণাৎ তাঁদের ঘরে নিয়ে বসতে দিলেন এবং ভদ্রভাবে কথা বলতে লাগলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই বুঝিয়ে দিলেন ভারতবর্ষে বৃটিশরা উচ্চশিক্ষা প্রচার করে যে অন্যায় করেছে, ভারতবাসীও যদি এদেশে নিগ্রোদের সংগে মেলামেশা করে তবে তাদেরও এদেশে সেই অবস্থা হবে। আমি প্রতিবাদ করে বললাম “এসব বাজে কথা।”

 অতি অল্প কথা অথচ এই অল্প কথার পেছনে বৃহত্তম চিন্তাধারা ছিল। বৃটিশ পাদরী যেমন আমার কথা বুঝতে সমর্থ হয়েছিলেন আমিও তেমনি তাঁর কথা বুঝতে সমর্থ হয়েছিলাম। তারপর উভয়েই নির্বাক হয়ে অনেকক্ষণ থাকার পর আমি চলে আসলাম! বাই-সাইকেল নিয়ে গেট পর্যন্ত আসার পরই দেখলাম দুটি পূর্বপরিচিত ছেলে আমার সংগে বের হয়ে এল। কতক্ষণ যাবার পর জিজ্ঞাসা করলাম “তোমরাও বের হয়ে এলে নাকি?”

 হাঁ বানা, আর স্কুলে যাব না ঠিক করেছি। কতকদিন আপনার সংগে থেকে যা বুঝতে পারি তাই মূলধন করে কাজে লাগাব। বুঝতেই পারছ আমাদের জীবনের মূল্য কত? যদি জীবনটা দেশের কাজে লাগাতে পারি তবেই মনে করব জীবন সার্থক হয়েছে।

 অন্য ছেলেটি এল না?

 না, তাকে রেখে এসেছি। সে কিছু লেখাপড়া শিখুক। বড় বড় বই পড়ে সে আমাদের বুঝাবে। আমরাও প্রাইভেট্‌ পড়ব। তবে সর্বসাধারণের মধ্যে আমাদের থাকতেই হবে নতুবা আমাদের উন্নতি হবে না। সুখের বিষয় আমরা বেশি মাইনে পাই না। তাই আমরা যে-কোনও দিকে চলে যেতে পারি। আমরা বিদেশেও যেতে চাই না। দেশে থেকেই দেশের উন্নতি করব।

 ছেলে দুইটির বয়স উনিশ-কুড়ি হয়েছে। এরই মধ্যে তাদের মনোনীত স্ত্রী ঠিক হয়ে গেছে। পথের পাশেই একজনের মনোনীত স্ত্রী থাকত। সেজন্য আমরা তিনজনে সে বাড়ীতেই উঠলাম। এরা হল বাস্তু। শিক্ষার দিক থেকে এরা অনেকটা উন্নতি করেছে। একজনের নাম ছিল মার্টিন। তারই মনোনীত স্ত্রীর বাড়ীতে গিয়েছিলাম। মার্টিন তার খৃষ্টান নাম পরিত্যাগ করে জব্বো নাম নিয়েছিল। আমি তাকে জব্বো বলেই ডাকতাম! আমরা যখন জব্বোর ভাবী শ্বাশুরী বাড়ীতে পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা হয় হয়। জব্বোর মনোনীত স্ত্রী তখন স্নান করে এক কলসী জল মাথায় করে নিয়ে ঘরে ফিরছিল। জব্বোর সংগে তার স্ত্রীর দেখা হওয়া মাত্র সে তাকে আলিঙ্গন করল এবং গালে ছোট্ট চুমু খেল। তার স্ত্রী ঘরে গিয়ে একটি শিলিং এনে দিল এবং কি কি জিনিস আনতে হবে বলল। আমি জব্বোকে বললাম শিলিংটি ফিরিয়ে দাও এবং আমার কাছ থেকে শিলিং নিয়ে আমি যা আনতে বলি তাই নিয়ে এস। জব্বো গেল না, গেল তার সহাধ্যায়ী নাম মেপ্পা। মেপ্পা আমার আদেশ মত খাদ্যদ্রব্য আনতে গেল।

 নিগ্রো স্ত্রীলোকগণ সাধারণত একগাছা সরু রশি তাদের কোমরে বাঁধে এবং সেই রশির সংগে একটুকরা কাপড় অথবা কোন জন্তুর চামড়া আটকিয়ে রাখে। বাড়ীতে ভিন্ন পুরুষ আসলে পরিধেয় বস্ত্র পরিবর্তন করে। জব্বোর স্ত্রীও আমাদের দেখতে পেয়ে তার পরিধেয় পরিবর্তন করল এবং বসবার জন্য ঘরটা পরিষ্কার করে আমার সাইকেলখানা নিজেই ঘরে তুলে রাখল। পরিষ্কার স্থানে একখানা কম্বল বিছিয়ে দিয়ে আমাদের বসতে বলল। ঘরে বাতি ছিল না। আমার কাছে মোমবাতি মজুত থাকত। মজুত মোমবাতি হতে একটি মোমবাতি খুলে দিলাম। তাই প্রজ্জ্বলিত করে ঘরের অন্ধকার দূর করা হল। জব্বোর স্ত্রী যখন অন্যান্য গৃহকাজে ব্যস্ত ছিল তখন আমরা নিকটস্থ ছোট্ট নদীতে স্নান করে ফিরে এলাম এবং দেখলাম চা আম্‌লেট ও দুখানা করে রুটি বৃক্ষপত্রে পরিবেশিত হয়েছে। আরাম করে তাই খেলাম। আমাদের খাওয়া শেষ হয়ে গেলে জব্বোর স্ত্রীও খেল। খবর নিয়ে জানলাম মেয়েটীর মা অন্যত্র গিয়েছে সেও নাকি নিগ্রো জাতির উন্নতির জন্য চেষ্টা করছে। জব্বো তার ভাবী শাশুরীর প্রশংসা করে বলল বিয়ের পণ স্বরূপ মেয়ের মাকে আটটি গরু দান প্রথা প্রচলিত আছে, সেই প্রথা জব্বোর ভাবী শাশুরী লঙ্ঘন করবেন। এখন বিয়ে হলেই হল। খাবারের পর নানা রূপ গল্প বলে মুখে যখন ব্যথা হল তখন জব্বোকে মশারী খাটিয়ে দিতে বললাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি জব্বো এবং তার স্ত্রী মরার মত শুয়ে আছে। তাদের পাশেই মেপ্পা। মেপ্পাকে ডাকামাত্র সে উঠে বসল এবং বলল “বানা, আজ এখানে থেকে যাও, অন্যত্র যেয়ে কাজ নাই, আমি এখনই অন্য গ্রামে যাচ্ছি, সেখান থেকে কতকগুলি শিক্ষিত লোক সংগে করে নিয়ে আসব। তারা তোমার কথা শুনবে। জব্বোও ঘরে থাকবে না, সেও তার ভাবী শাশুরীকে নিয়ে আসতে যাবে। যারা তোমার সংগে কথা বলতে আসবে, যদিও তারা নিগ্রো সমাজের উন্নতিকামী তবুও তাদের মত এবং পথ ভিন্ন রকমের। এসব লোকের মতিগতি যাতে বদলায় সেজন্যই ডেকে আনতে যাচ্ছি। মেপ্পার কথায় রাজি হলাম এবং অন্য আর একটি রাত এখানে কাটাতে মনস্থ করলাম। জব্বোর ভাবী স্ত্রীর নাম মেরিয়া। জব্বো এবং মেপ্পা চলে যাবার পর মেরিয়া স্নান করতে গেল। স্নান করে ঘরে ফেরবার পথে আমার জন্য কতকগুলি বনজ ফল নিয়ে আসছিল। বনজ ফলগুলি আমার সামনে রেখে দিয়ে সে রান্না আরম্ভ করল। যখন মেরিয়া রান্না করছিল তখন সে আমাকে জিজ্ঞাসা করল “বানা তুমি আমাদের এরূপ সুন্দর উপদেশ দাও কেন? তোমার উপদেশে তোমার দেশের লোকের কি কোম ক্ষতি হবে না?”

 না।

 মেরিয়া তার কারণ জিজ্ঞাসা করল। তাকে যুক্তি দিয়ে সকল কথা বুঝিয়ে বলায় সে সুখী হয়েছিল। কতক্ষণ পর মেরিয়াকে জিজ্ঞাসা করলাম “এমন সুন্দর করে ইংলিশ ভাষায় কথা বলা কোথা হতে সে শিক্ষা করেছে?

 মেরিয়া বলল “দু’ বৎসরের মত সে নিগ্রো স্কুলের ছাত্রী ছিল।

 দিনটা বেশ পরিষ্কার ছিল। ঘরের বাইরে বসে আরাম করছিলাম। জব্বোর স্ত্রী আমার হাত ও পায়ের নখ হতে ডুডু পোকা নিষ্কাসন করার সময় বিদেশের সংবাদ জিজ্ঞাসা করল। যতটুকু সম্ভবপর ততটুকুই বলতেছিলাম কারণ সে ইংলিশ ভাষায় ততটুকু দক্ষ ছিল না। আমরা যখন কথা বলছিলাম তখন যে-সকল নিগ্রো পথ দিয়ে যাচ্ছিল তারা জব্বোর স্ত্রীকে ঠাট্টা করে বলল “এরূপ আধমরা বিদেশী বুড়াটাকে শেষটায় বিয়ে করলে নাকি?” জব্বোর স্ত্রীও তেড়ে জবাব দিল “বুড়াটার বেশ টাকা আছে, সেইজন্যই নিয়েছি, যখন বুড়ার টাকা শেষ হয়ে যাবে যখন তাড়িয়ে দেব।” এসব কথা বলেই আমার দিকে চেয়ে কথাগুলি অনুবাদ করে শুনাচ্ছিল। নিগ্রোদের মধ্যে ঠাট্টা তামাসা করার বেশ প্রবৃত্তি আছে দেঘে সুখী হয়েছিলাম।

 বেলা বারোটার সময় জব্বোর শাশুরী এসেই দরজায় বসে হাঁপাতে লাগল এবং বির্‌বির্ করে কতকগুলি কথা বলল। জব্বো তার ভাবী শাশুরীর কথাগুলি বুঝিয়ে দিল। কতক্ষণ পরই মেপ্পা সাত-আটজন যুবককে সংগে নিয়ে এল। যুবকদের মধ্যে কেউ ফ্রেঞ্চ, কেউ ডাচ, কেহ বা ইংলিস ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারত। তাদের সংগে কথা বলে বুঝতে পারলাম ভবিষ্যতে এই যুবকগণ আফ্রিকার নিগ্রো জাতকে বৈদেশিক শৃঙ্খল হতে মুক্ত করতে সক্ষম হবে। এই যুবকগণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী হয়েও সাধারণ লোকের পোষাক পরেই সন্তুষ্ট। মামুলী খাদ্য খেয়েই তৃপ্ত, সারাদিন পায়ে হেটে গ্রাম হতে গ্রামান্তরে ভ্রমণ করেও অপরিশ্রান্ত। এই ধরণের লোক যদি আফ্রিকাকে বৈদেশিক শাসন হতে মুক্ত করতে না পারে তবে আর কে করতে পারবে?

 এই ধরণের শিক্ষিত নিগ্রো যুবকেরা ইণ্ডিয়ান এবং ইউরোপীয়ান সবাইকে সমানভাবে শত্রু মনে করে। ইণ্ডিয়ানদের সংগে তারা যাতে শত্রুতা না করে সেজন্য কিছু বলতে ইচ্ছা থাকা সত্বেও জিহ্বা আড়ষ্ট হয়ে এল। কি কারণ দেখিয়ে ইণ্ডিয়ানদের মিত্র বলে গণ্য করতে বলব? কোন কারণ খুঁজে পেলাম না সেজন্য বিষয়টা পরিত্যাগ করাই ভাল হবে ভাবলাম কিন্তু কতক্ষণ পরেই দেশের কথা মনে হল এবং ইচ্ছা হল এ সম্বন্ধে কিছু বলি, অবশেষে পামার নামে একজন ফরাসী ভাষায় দক্ষ নিগ্রো ভদ্রলোককে বললাম “আপনারা ইণ্ডিয়ানদের শত্রু মনে করেন কেন?”

 ভাল কথাই উত্থাপন করেছেন, আপনিও একজন ইণ্ডিয়ান, সাধারণতই আপনার মন ইণ্ডিয়ানদের প্রতি ঝুকবে, কিন্তু মনে করুন একজন ইণ্ডিয়ান বৃটিশের সাহায্য নিয়ে আপনার গলা কাটতে আসছে তখন আপনি তাকে জ্ঞাতী-ভাই বলে এড়িয়ে যাবেন না শত্রু বলে আত্মরক্ষা করবেন?

 প্রশ্নের জবাব এত সহজে সমাধান হবে মনে হচ্ছিল না।

 পরের দিন জব্বো এবং মেপ্পাকে সংগে নিয়ে পথে বের হলাম। ষ্টার-উড্-ষ্টার এবং কিউ কিউ হয়ে গুয়েলো পৌঁছলাম। গুয়েলোতে পৌঁছার পর আমাকে ম্যালেরিয়া জ্বর প্রবলভাবে আক্রমণ করে। ডাক্তার কুইনাইন্ ইনজেকশন্ দেওয়া সত্বেও জ্বর বন্ধ হয় নাই। জব্বো জ্বরের প্রকোপ দেখে তাদের মতে সিনকোনা জাতীয় এক প্রকার গাছের পাতার রস খেতে দেয় এতে পনের মিনিটের মধ্যেই জ্বর সেরে যায়। জ্বর সেরে যাবার পর জব্বো আমাকে বিছানা পরিত্যাগ করতে নিষেধ করে। তার আদেশ মত শুয়ে থাকতে বাধ্য হই। তিন দিন বিছানায় শুয়েছিলাম। এই তিন দিন সে নিজেই কাঁচা দুধ সংগ্রহ করে আনত এবং কাঁচা দই খেতে দিত। ক্রমাগত তিন দিন কাঁচা দুধ খেয়ে শরীরের দুর্বলতা লোপ করতে সক্ষম হই।

 গোয়েলোতে যে ভদ্রলোকের বাড়ীতে উঠেছিলাম সেই ভদ্রলোক জাতে গুজরাতী। ব্যবসায়ের দিক দিয়ে তিনি খুবই উন্নতি করেছিলেন। রাষ্ট্রতত্ব সম্বন্ধেও তিনি অনেক সংবাদ রাখতেন। রডেসিয়া পার্লামেণ্ট সম্বন্ধে বলতে যেয়ে বললেন “হয়ত ভবিষ্যতে দক্ষিণ রডেসিয়াতে শ্বেতকায়দের সংখ্যাধিক্য হবে। গ্রীক্, আর্মেনিয়ান, ইংলিশ, স্কচ্, আইরিশ এবং অন্যান্য ইউরোপীয়ান জাতি অনবরত রডেসিয়ায় প্রবেশ করছে, অথচ যাদের এশিয়াটিক বলা হয় তাদের এদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

 আপনার কথা শুনে দুঃখিত হলাম স্যার। এরূপ হওয়া খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমানে যারা এদেশে বাস করছেন তাদের মধ্যেও একতার অভাব দেখতে পাচ্ছি। আপনারা তামিল অথবা তেলেগুদের আমল দেন না কেন?

 তারা নিগ্রোদের সঙ্গে মেলামেশা ত করেই উপরন্তু নিগ্রো খাদ্য খেতে কোনরূপ দ্বিধা বোধ করে না। এই ধরণের ব্যভিচারী লোকের সংগে মেলামেশা করা কি ভাল হবে?

 ভালমন্দ এখন দেখবেন না, বুঝবেন তখনই যখন তামিল এবং তেলেগুরা নিগ্রোদের সংগে হাত মিলিয়ে আপনাদের সাজানো বাগানে আগুন দেবে।

 কি বলছেন মশাই, আপনি যে আমাদের শত্রু।

 আমি আপনাদের শত্রু নই মিত্র, পরম মিত্র। যদি মিত্র না হতাম তবে শুধু চাঁদা উঠিয়েই বিদায় নিতাম। এসব কথা বেশি বলা-কওয়া করে লাভ নাই। আপনার ঘরের সামনেই একটি তামিল বসে আছে, তাকে জিজ্ঞাসা করুন তারা আপনাদের প্রতি কিরূপ মনোভাব পোষণ করে।

 এদের মনোভাব কিছুটা জানি, কিন্তু ঘরে আগুন দেবে এটা বিশ্বাস করি না।

 পাশে বসা তামিল ছেলেটি আমাদের কথা গিলতে বসেছিল না। সে আমাকে তার বাড়ীতে খাবার খেতে নিয়ে যেতে এসেছিল। শুধু আমাকেই সে নিমন্ত্রণ করে নাই, সংগের নিগ্রোদেরও নিমন্ত্রণ করেছিল। ইণ্ডিয়ানরা কখনও নিগ্রোদের নিজের বাড়ীতে নিমন্ত্রণ করে না। কিন্তু এই তামিল যুবক নিগ্রোদের বিশেষ পরিচয় পেয়ে নিনন্ত্রন করতে সঙ্কোচ বোধ করছিল না।

 গুজরাতী ব্যবসায়ী যখন শুনলেন সংগের নিগ্রোদ্বয় তামিলের বাড়ীতে আমার একই সংগে খাবে তখন তিনি দুঃখিত হলেন। নিগ্রো সংগীদ্বয় ভারতীয় ব্যবসায়ীর মনোভাব যাতে বুঝতে না পারে সেজন্য আমি অন্য বিষয়ের অবতাড়না করলাম।

 গুয়েলো হতে বুলোবায়ো একশত আট মাইল দক্ষিণে অবস্থিত। এইটুকু পথ তাড়াতাড়ি যাওয়া পছন্দ করি নাই। তার দুটি কারণ ছিল, প্রথম কারণ হল পথের সৌন্দর্য, দ্বিতীর কারণ হল মেপ্পা আমার জন্য পথেও দুধের বন্দোবস্ত করে দিত। কাঁচা দুধ খেয়ে শরীরে ক্রমশঃই শক্তি বেড়ে চলছিল এবং সাইকেলে চলতে আরাম লাগত। এক দিন পথের পাশেই মেপ্পা একটা গাইকে ধরে আমার ওয়াটার বোতল ভর্ত্তি করে দুধ আনল। আমি সবটা খেতে পারলাম না বলে সে দুঃখ প্রকাশ করল। আমারই সামনে এরা প্রত্যেকে দুবার করে ওয়াটার বোতল ভর্ত্তি করে দুধ খেয়েছিল।

 বোলবায়োর পথে কোনও বিশিষ্ট স্থানে আমরা রাত কাটাই নাই। নিগ্রো গ্রামেই আমরা থাকতাম। জব্বো গ্রামবাসীকে ডেকে একত্রিত করত। লেকচার দিত আর আমি তাই শুনতাম। বুঝতে চেষ্টা করতাম গ্রামবাসী জব্বোর কথা বুঝতে পারছে কিনা? জব্বো কখনও চিৎকার করে কথা বলত না। সে স্পষ্ট করে বিষয়-বস্তু সাজিয়ে গল্পের আকারে বলত। সভাতে থাকতে থাকতেই অনেকে নূতন কাপড় পরে পুনরায় সভাতে আসত এবং জব্বোকে সুখী করত। জব্বো নিগ্রোদের ভাল ঘরে থাকতে, উত্তম খাবার খেতে, ইউরোপীয় ধরণে থাকতে এবং পাক করতে উপদেশ দিত। অনেকে বলত এত টাকা পাবে কোথা হতে? দরকার বেড়ে গেলে টাকা আপনা থেকেই আসবে। নিজের দরকার মিটাতে গিয়ে ডাকাতি চুরি এসব করতেও বিমুখ হয়ো না। জব্বোর জব্বরী উপদেশ শুনে আমি শুধু দুঃখিত হতাম না, শরীরটাও যেন সংগে সংগে কেঁপে উঠত। এসব কথা আমার ধাতে সইত না।