নিগ্রো জাতির নূতন জীবন/দক্ষিণ রডেসিয়ার পথে
দক্ষিণ রডেসিয়ার পথে
বৃষ্টির নাম গন্ধ নেই। সর্বত্রই বসন্ত বিরাজমান। শীষবৃক্ষ হতে আরম্ভ করে পাইন বৃক্ষ পর্য্যন্ত সর্বত্রই সবুজ রঙ্গে ঘেরা। নিগ্রো, ইউরোপীয়ান, ইণ্ডিয়ান এমন কি আরব এবং তুরুকদের মাঝেও বসন্তের মাধুর্য্য পরিলক্ষিত হচ্ছিল। আমার শরীর ছিল অবসাদগ্রস্থ জেসন্য আর পথে চলতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। শরীর চাইছিল বিশ্রাম কিন্তু বিশ্রাম নিলে সময়ের অপব্যবহার করা হয়, শরীর রক্ষা করতে হলে বিশ্রামের দরকার সেজন্য বিশ্রাম নিতে বাধ্য হয়েছিলাম।
ন্যাসাল্যাণ্ডে পৌঁছার পর বিশ্রামের বেশ সুযোগ হয়েছিল, সেখানে শরীরটাকে শক্তিশালী করে নবউদ্যমে পর্তুগীজ পূর্বআফ্রিকার দিকে রওয়ানা হই। ইচ্ছা ছিল পর্তুগীজ পূর্ব-আফ্রিকাও বেশ ভাল করেই দেখি কিন্তু ব্যরাতে (Beira) পৌঁছার পর বুঝতে পারলাম পর্তুগীজ পূর্ব-আফ্রিকা একদম অনাবাদী। নিগ্রোরা পর্য্যন্ত সেদেশে থাকতে পছন্দ করে না। পর্তুগীজরা চায় না তাদের দেশে ঘন বসতি হউক। ভূতত্ত্ববিদ্গণ নাকি বলেছেন তাদের দেশ স্বর্ণখনিতে ভরপূর। পর্তুগিজরা সেজন্য ভয় পেত; কি জানি কোন বিদেশী, নিগ্রোদের সাহায্য নিয়ে স্বর্ণখনি আবিষ্কার করে ফেলে। মাটির নীচে সোনা আছে থাক সেখানে, অন্যে এসে তা নেবে কেন? এই হল পর্তুগীজদের ইচ্ছা। সেজন্যই নানা রকমের টেক্স বসিয়ে মামুলী নিগ্রোদেরও নাজেহাল করতে একটুও সঙ্কোচ করত না।
ন্যাসাল্যাণ্ডের দক্ষিণ সীমান্ত হতে একটি রেলপথ ব্যরার দিকে গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার রেলপথের সংগে মিলিত হয়েছে। বাইসাইকেলে আগাগোড়া আফ্রিকা দেশটা ভ্রমণ করার ইচ্ছা অনেকদিন হতেই কমে গিয়েছিল সেজন্য রেলপথ পাওয়া মাত্র রেলভ্রমণের ইচ্ছা হল। কেন ইচ্ছা হল অন্ধকারের আফ্রিকাতে বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, সেজন্য এখানে পুণরাবৃত্তি করা হল না।
আফ্রিকার অন্তস্থল ন্যাসাল্যাণ্ডের সীমা পার হবার পর যখন পর্তুগীজ পূর্ব-আফ্রিকাতে প্রবেশ করলাম তখনই বুঝলাম এদেশের সরকারী কর্মচারী এবং রেলওয়ে কর্মচারীর মধ্যে একই নীতি বর্তমান। সকলেই আমাকে এড়িয়ে চলতে চায়, এমন কি কোন্ গুদাম হতে আমার সাইকেলটি নিতে হবে সে কথাটির সুষ্পষ্ট উত্তর দিতে কেউ ইচ্ছুক নয়। এতে না ঘাবড়িয়ে গুদামে গুদামে হানা দিতে আরম্ভ করলাম। হঠাৎ পথের উপর দেখা হল এক জন তামিল ভদ্রলোকের সংগে। ভদ্রলোক একটু মদ্যপায়ী। সকাল বেলাতেই তার মুখে গোলাবী নেশার রক্তিমাভ চাকচিক্য ফুটে উঠছিল। আমাকে দেখামাত্রই তিনি এগিয়ে আসলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন “আপনি কি ইণ্ডিয়ান?”
হাঁ স্যার, আমি আপনাদেরই লোক। বোধহয় শুনেছেন একজন ইণ্ডিয়ান বাই-সাইকেলে পৃথিবী ভ্রমন করছে, আমিই সেই লোক ৷
সে সংবাদ আমি পেয়েছি এবং আপনাকে নেবার জন্যই এখানে এসেছি। আপনার সাইকেলটা নিয়ে আসি চলুন।
ভদ্রলোকের কথায় হাসলাম কিন্তু কিছুই বললাম না, তাঁর সংগে একটি গুদামে গিয়ে দেখলাম্—আমার সাইকেলে মস্ত বড় একটা লেবেল আঁটা রয়েছে এবং অনেকেই একদৃষ্টে অবলোকন করছে। তাদের সাইকেল দেখার আগ্রহ এবং উৎসাহ দেখে বেশ আনন্দ হল কিন্তু অনিচ্ছায় শ্লেষ করে বললাম “আমিই সেই লোক, সাইকেল দেখে কি লাভ হবে আমাকেই দেখুন।”
পর্তুগীজ গুদাম ইন্চার্জ আমার আপাদমস্তক নীরিক্ষণ করে বললেন রেলগাড়ীতে না এসে যদি জংলী পথে আসতেন তবে অনেক কিছু দেখতে পেতেন।
অনেক কিছু দেখার প্রবৃত্তি আমার লোপ পেয়েছে। বৃটিশ পূর্ব আফ্রিকা এবং বেলজিয়াম কঙ্গোর কতক দেখে বুঝতে পেরেছিলাম অনেক কিছু দেখার মানে কি? সেজন্য গুদাম রক্ষককে বললাম—“যথেষ্ট হয়েছে আর না, এবার আফ্রিকা হতে বিদায় হতে পারলেই হল।
গুদাম রক্ষক কি ভেবে বললেন আর কিছু না দেখেন জাম্বাবী ধ্বংস স্তূপ দেখে যাবেন এবং লক্ষ্য রাখবেন তার চারদিকে যে সকল লোক বসবাস করে তাদের আকৃতি এবং প্রকৃতি কিরূপ।
ধন্যবাদ মশায়, অন্য সময় কথা বলব—এখন আমাকে যেতে দিন। কোথায় থাকব এখনও তার বন্দোবস্ত হয় নাই। থাকবার বন্দোবস্ত করার পর মাথা ঠিক হলে এসব কথা চিন্তা করতে পারব।
গুদাম রক্ষক মাদ্রাজী ভদ্রলোলের দিকে চাওয়া মাত্র তিনি বললেন পর্য্যটক মহাশয়কে নেবার জন্যই এসেছি। সাইকেলটা দিয়ে দিন। তামিল ভদ্রলোকের কথা শুনে পূর্বে সন্দেহ হয়েছিল, এবার ভালকরেই বুঝলাম—উনি একজন সরকারী লোক নতুবা আমার প্রতি এত দয়া হবে কেন? মনের কথা মনেই থাকল, কাউণ্টারের দিকে এগিয়ে গিয়ে রসিদে নিজের নামটা লিখে দিয়ে সাইকেল খানা নিতে যাচ্ছি তখন গুদাম রক্ষক বললেন “বেঁচে থাকুন মশায়, আপনাদের জীবন স্বার্থক। আমরা এখানে বসেই বৎসরের পর বৎসর কাটাচ্ছি এবং নানা দেশের ছবি ও গল্প পড়েই অতৃপ্ত মনকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করছি, পৃথিবী দেখার সৌভাগ্য আমাদের কখনও হবেনা, আপনাদের মত লোককে দেখেই আমরা সুখী। গুদাম রক্ষকের কথার উত্তরে কয়েকটি মুখ রোচক কথা বলে বিদায় নিলাম।
মান্দ্রাজী ভদ্রলোকের নাম ও লসমন, পূর্বে ন্যাসাল্যাণ্ডে অন্য আর একজন লস্মনের কথা বলা হয়েছে। ষ্টেশন হতে বের হয়ে লসমন আমাকে তাঁর ঘরে যাবার পথ বলে দিলেন, পরিশেষে বললেন তিনি ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই ঘরে পৌঁছবেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝতে পারলাম তিনি কোথায় যাচ্ছেন এবং সে অনুযায়ী আমার কর্মপদ্ধতিও ঠিক করে ফেললাম। লস্মন শ্রেণীর লোককে আমার পক্ষে চেনা অতি সহজ হয়েছিল, একদিকে দেশপ্রেম অন্যদিকে সরকারী আদেশের তাবেদারী যারা করে তারা অনেক সময়ই ভাল হয়, কিন্তু এই শ্রেণীর লোকের যখনই অর্থাভাব হয় তখনই তারা তাদের নিকটস্থ আত্মীয়কে পুলিশের হাতে সমর্পন করে—সরকারের কাছ থেকে দুপয়সা অর্জন করতে কখনও কুণ্ঠাবোধ করে না। গুদাম রক্ষককে কিন্তু সেরূপ বলে মনে হয় নাই। একেবারে অন্যধরনের লোক তিনি প্রগতিশীল। ছাইয়ের নীচে সোণা পড়ে থাকলে প্রথমত ছাই দেখতে পাওয়া যায় কিন্তু একটু নাড়লেই সোণা বেরিয়ে আসে। গুদাম রক্ষকের সংগে পরে দেখা হয়েছিল এবং একটু নেড়েচেড়েই বুঝতে পেরেছিলাম তিনি খাঁটী সোনা।
ষ্টেশন হতে রওয়ানা হয়ে লস্মনের বাড়ীর দিকে চলার পথে ধান ক্ষেতের উপর দিয়ে চলছিলাম। মাঠে কোথাও লোক নেই অথচ দেখলেই মনে হয়—এই কদিন হল ক্ষেত হতে ধান কেটে নেওয়া হয়েছে। সমুদ্রতীরের ধান ক্ষেত বড়ই সুন্দর। ধান ক্ষেতের আইল ধরে চলার সময় শুধুই মনে হচ্ছিল এদেশের এত বদনাম কেন? কেন লোকে আফ্রিকাকে এত হেয় চক্ষে দেখে? কোন লোক আফ্রিকাকে কালো আফ্রিকা বলে?
কতক্ষণ যাবার পর সামনেই দেখতে পেলাম গ্রাম। গ্রাম সুন্দর। গ্রামটি নানা জাতীয় বৃক্ষ এবং নারিকেল বৃক্ষে পরিশোভিত। প্রায় বৃক্ষই ফলন্ত। ফলন্ত গাছ দেখে বেশ আরাম বোধ করলাম। লস্মনের ঘরে যখন পৌঁছলাম তখন মনের পরিবর্ত্তন হল। মনে হল যেন নিজের দেশেরই কারো বাড়ীতে এসেছি। একটু বিশ্রাম নেবার পরই লস্মনের চাকর—যাকে ‘আফ্রিকাতে বয় বলা হয় তিনি আমাকে স্নানাগার দেখিয়ে দিয়ে বললেন, এখানে স্নান করুন, আমি খাবার নিয়ে আসছি, অন্য রুমে বিছানা আছে। খাবার খেয়ে সেখানে বিশ্রাম করতে পারবেন।
লস্মনের চাকরকে “আপনি” বলেছি তার কারণ আছে, চাকরটি শিক্ষিত, আমাদের দেশের বি, এ পাশের মত পণ্ডিত। তিনি ইংলিশে লিখতে পারতেন এবং পর্তুগীজ ভাষার অনর্গল কথা বলতে পারতেন, এমন লোককে তুমি বলা ভদ্রলোকের পক্ষে সম্ভব নয়।
বয় খাবার নিয়ে আসার পর স্নান করে খেয়ে নিলাম, তারপর কিছু সময় বিশ্রাম করার পর পাশের বাড়ীর বাসিন্দাদের সংগে পরিচিত হবার জন্য নিকটস্থ ঘরের দরজার কাছে দাঁড়ালাম। আমি কি চাই জানবার জন্য একজন ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন “কি চাই?”
বললাম পরিচিত হতে এসেছি। এদেশে আমি নূতন লোক, পেশা পর্য্যটন, সেজন্যই অন্যের সংগে পরিচিত হতে এত আগ্রহ। ভদ্রলোক আমার কথা শুনে অবাক হলেন এবং আমার দিকে চেয়ে থাকলেন।
কতক্ষণ পর তিনি বললেন “বেশ ভাল কথা, বলুন আপনি কি জানতে চান?”
ভাবছিলাম গৃহস্বামী আমাকে তার ঘরে গিয়ে বসতে বলবেন কিন্তু তিনি তা করলেন না। দাঁড়িয়েই আমার সংগে বাক্যালাপ শেষ করতে চাইলেন। গৃহস্বামীর হাবভাব দেখে মনে হল আমাকে ঘরের ভেতর নিয়ে যেতে অনিচ্ছুক সেজন্য তার দিকে আরও ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম লোকটি খাঁটী ইউরোপীয়ান কি-না? আমার চোখে লোকটিকে খাঁটী ইউরোপীয়ান বলেই মনে হল যদিও তিনি ভারতীয় ধরনের বাড়ীতে বাস করছেন। অবশেষে জিজ্ঞসা করলাম আপনার ঘরে বসে কথা বলতে আপত্তি আছে কি?
গৃহস্বামী বললেন আমার কোনও আপত্তি নেই। আপনাদের লোক আমাদের ঘরে প্রবেশ করতে ঘৃণা বোধ করে সেজন্যই আমরা তাদের ঘরে যাই না—অথবা তাদের আমাদের ঘরে ডেকে আনি না।
গৃহস্বামীর কথা আমার কাছে নূতন বলেই মনে হল, তাকে বললাম আজ পর্য্যন্ত কোন ইউরোপীয়ান আমাকে এই ধরনের কথা বলে নাই।
গৃহস্বামী হেসে বললেন “আমি ইউরোপীয়ান নই। নিগ্রো এবং ইউরোপীয়ান এই দুই-এর মিলনে আমার জন্ম। আমাদের মত লোককে বর্ডার লাইনার বলা হয়। বর্ডার লাইনার শব্দটির মানে হল আর একটু হলেই ইউরোপীয়ান হতে পারা যেত। ইউরোপীয়ান হবার যেটুকু বাকি সেইটুকু আপনার চোখে ধরা পড়বে না। এদেশের বাসিন্দা ইউরোপীয়ানরাই তা বুঝতে পারে। ইউরোপের অনেকে ইউরোপীয়ান্ বলে ভুল করে। এ ভুলের জন্য আপনি দায়ী নন্। আপনি এদেশে এসেছেন ভ্রমণের নেশায় মত্ত হয়ে, আপানার চোখে এসব ছোট-খাট বিষয় দৃষ্টিভূত হবে না।
কথা শেষ করে গৃহস্বামী দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ করলেন দেখে আমারও দুঃখ হল। আমি তার নাম জিজ্ঞাসা করলাম; গৃহস্বামী বললেন “এনতোনিয়ো পেদ্রো”! নামটি একেবারে মামুলী। এদেশে এ নামে হাজার হাজার লোক দেখতে পাবেন। আমি তার মধ্যে একজন।
সিনিওর পেদ্রোকে মামুলী লোক বলে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। এঁর ঘরটি সুন্দর এবং মূল্যবান ফার্ণিচারে সজ্জিত ছিল। পাকের উনুন ইউরোপীয়ান ধরনের। ঘরেতে নানা রকমের পুস্তকাবলী। পরিচ্ছদও মামুলী লোকের বলে মনে হল না। তবুও তিনি কেন যে মামুলী লোক বলে পরিচয় দিচ্ছেন তার কারণ জিজ্ঞাসা করায় তিনি বললেন “এখন আমাকে চিনবার চেষ্টা করুন, আমার শরীরের গঠন সবটাই ইউরোপীয়ানদের মত, কিন্তু চুলগুলি বেশ মোটা এবং কালো, সেজন্যই আমি ইউরোপীয়ান নই। যেহেতু আমি ইউরোপীয়ান্ নই সেজন্য আমার মাইনেও ইউরোপীয়ানদের মত নয়। যদিও আমার নামের সংগে মাইনের কোনই সম্পর্ক নেই তবু ও বলছি মামুলী নাম আর মামুলী মাইনেতে আমার চলে না।
আমার পরিচয় পেদ্রো পূর্ব্বে পেয়েছিলেন, এখন আরও একটু ঘনিষ্টতা হওয়ায় তিনি আমাকে তার ঘরে নিয়ে বসালেন এবং নানা বিষয়ে আলোচনা করতে আরম্ভ করলেন।
কথা প্রসংগে পেদ্রোর মামুলী জীবনচরিত বলতেও ভুললেন না তার জন্মস্থান সেণ্টহেলেনা দ্বীপে। সেখানে নেপোলিয়ন্ নির্বাসিত হয়েছিলেন।
পেদ্রোকে জিজ্ঞাসা করলাম “নিগ্রো জাতের গতিবিধির নিশ্চয়ই একটি ইতিহাস আছে?”
ইতিহাস একটা নিশ্চয়ই কিছু আছে, কিন্তু কথা হল নিগ্রোদের আসাযাওয়া এবং জীবন মরণ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। হয়ত পর্তুগীজরা আফ্রিকা হতে নিগ্রোদের সেণ্টহেলেনাতে ছেড়ে দিয়েছিল এর বেশি আর ইতিহাস কি হতে পারে? নিগ্রোদের ইতিবৃত্ত যাহাই হউক না কেন একথা সত্য যে নেপোলিয়ন্ সেণ্ট হেলেনাতে নির্বাসিত হন এবং সেখানেই তিনি মারা যান।
পেদ্রোর অরন্তের কথার প্রতিবাদ করে বললাম—শুনেছি আজকাল অনেকে বলেন সেণ্টহেলেনাতে নেপোলিয়নকে নির্বাসিত করা হয় নাই?
পেদ্রো রেগে বললেন “এ হল বাজে কথা। আমার মায়ের কাছ থেকে শুনেছি—নেপোলিয়ন গ্রাম্য লোকের সংগে কথা বলতেন এবং সর্বত্র যাতায়াত করতেন। গ্রাম্য লোক তার হাটার পদ্ধতি দেখে হাসত এবং জিজ্ঞাসা করত “তুমি এমন করে হাটছ কেন?” নেপোলিয়ন এসব কথায় কর্ণপাত করতেন না উপরন্তু নেপোলিয়ন সেণ্টহেলেনা দ্বীপে আসার পর থেকে নিগ্রোদের প্রতি শ্বেতকায়দের নির্যাতন অনেকটা কমে গিয়েছিল এবং সামান্য শিক্ষারও ব্যবস্থা হয়েছিল। অবশ্য আমাদের মত বর্ণশঙ্করদের জন্য পর্তুগীজ এবং স্পেনিশদের সময় থেকেই শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল।
কি করে কতকগুলি লোকের মরেল ভেঙ্গে যায়—এবং অবনতির চরম সীমায় পৌঁছে—যদি দেখতে হয় তবে সেণ্টহেলেনার শ্বেতকায় নিগ্রোরাই হল তার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। পেদ্রোকে ভারতের সম্বন্ধে অবশ্য কিছুই বললাম না, শুধু সেণ্টহেলেনার লোকের জীবন কেমন সে বিষয়েই জিজ্ঞাসা করে সময় কাটালাম। পেদ্রোর কথাশুনে মনে হল তাদের মধ্যে রাজনীতির প্রভাব মোটেই প্রসার লাভ করে নাই।
সিনিয়র পেদ্রোর যাতে পলিটিকেল জ্ঞান হয় সেজন্য চেষ্টা করতে বাধ্য হই। এই ধরনের লোক প্রায়ই ইণ্ডিয়ানদের বিরুদ্ধে নানারূপ খারাপ মত পোষণ করে এবং কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁর হীন প্রবৃত্তিগুলির পরিবর্তন করতে সক্ষম হই। পূর্বে তিনি মদ খেয়ে এবং জুয়া খেলে সময় কাটাতেন। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি বদ্ অভ্যাসগুলো পরিত্যাগ করে প্রগতিশীল সাহিত্যে মনোনিবেশ করেন এবং বিশেষ করে বুঝতে সক্ষম হন ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে সংমিলিত জনমত গঠন না করতে পারলে তাদের অদূর ভবিষ্যত অন্ধকারাচ্ছন্ন। পেদ্রোর মনের গতি কয়েকদিনের মধ্যেই পরিবর্তন করতে পারায় লোক অবাক হয়ে যায়। তারা ভাবছিল সিনিয়র পেদ্রো ধর্ম বই পড়ছেন এবং সত্বরই একজন পাদ্রী হবেন। কিন্তু এরপর যখন পেদ্রো কালো নিগ্রোদের সংগে মেলমেশা আরম্ভ করলেন তখন অর্দ্ধনিগ্রো এবং সাদানিগ্রোদের মধ্যে, এই নিয়ে সমালোচনা আরম্ভ হল। পূর্ব হতেই অর্দ্ধনিগ্রো এবং বর্ডার লাইনারদের মধ্যে আশা যাওয়া এমন কি বিয়ে পর্য্যন্ত চলত। কিন্তু কালো নিগ্রোদের সংগে তাদের কোন সম্পর্ক ছিল না। আমার আদেশ অনুযায়ী পেদ্রো কালো, অর্দ্ধকালো, ব্রাউন, সাদা নিগ্রো সকলের সংগে মেলামেশা করতে থাকেন। নিগ্রো জাতের যাহাতে একতা হয়, সোহেলী ভাষা যাতে সকলে গ্রহণ করে এবং নিগ্রোদের সংগে কোন ধর্মের সম্পর্ক না থাকে এই নিয়েই তিনি আলোচনা করতে থাকেন। এতে তার স্ত্রী প্রকাশ্য ভাবেই বলেন “ভারতীয় পর্যটকের সংশ্রবে আসার পর থেকে পেদ্রো বিপথগামী হয়েছেন। তিনি ইস্লাম অথবা খৃষ্ট ধর্মকে ধর্মরূপে গ্রহণ করেন না। লস্মন যদিও এ সম্বন্ধে প্রকাশ্যে কিছুই বলতেন না, কিন্তু মনে মনে তিনিও অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এমতাবস্থায় স্থান ত্যাগই আমার পক্ষে ভাল হবে ঠিক করলাম। লস্মন শ্রেণীর লোক এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীরা সকল সময়েই অন্ধ থাকতে ভালবাসে সেজন্য তাদের কাছে শুনোভাব প্রকাশ করা বিপদজনক হবে ভেবে কিছুই বললাম না।
পেদ্রো বুঝতে পেরেছিলেন সত্বরই আমি স্থান ত্যাগ করব সেজন্য তিনি কয়েক দিনের জন্য ছুটি নিয়ে আমার কাছে বসে সময় কাটাতে থাকেন। এতে লস্মনের ভাবান্তর হয়। আমি এবং পেদ্রো কি কথা বলি জানবার জন্য তিনিও আমার কাছে বসে থাকতে বাধ্য হন। মিষ্টার লস্মনের পরিচয় অনেকটা বলা হয়েছে। এখানে আর তার পুণারাবৃত্তি করা হল না। লস্মনের উপস্থিতিতে আমরা ভাষাতত্ত্ব, সমাজতত্ব, এবং ভারতের পরাধীনতার কথাই বিশেষ করে আলাপ করতাম। লস্মন দেখলেন আমি ভারতের কথাই বেশি ভাবি এবং আলোচনাও করি সেজন্য তিনি আমাকে একদিন তার বোনের বাসায় নিয়ে যান। তার বোনের বাসায় ভোজের আয়োজন হয়েছিল এবং অনেক তামিল ভদ্রলোক সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ভোজনের শেষে ঘরে ফিরে এসে পেদ্রোকে বললাম “সিনিয়র পেদ্রো আপনাকে সব সময় সবচেয়ে বেকওয়ার্ড লোকের সংগে মেলামেশা করতে হবে। তাদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই হবে আপনার সর্বপ্রথম কর্ত্তব্য। কখনও তাদের সংগ পরিত্যাগ করবেন না। যেদিনই আপনি তাদের সংগ পরিত্যাগ করে নরম পন্থী মধ্যবিত্তদের সংগে মেলামেশা করবেন সেদিন থেকেই বুঝবেন আপনার অধঃপতন আরম্ভ হয়েছে। মনে রাখবেন আপনি ইণ্টারন্যাসনেলিজম হতে বিচ্যুত হয়ে ন্যাসনেলিজমের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। নিগ্রোদের পক্ষে ন্য্যাসনেলিজম্ গ্রহণ করা মারাত্মক হবে।”
ব্যরা ছেড়ে যাবার পূর্বে সাইকেলটি সারাতে এক নিগ্রোর কাছে গিয়েছিলাম। নিগ্রো মজুরের কর্মতৎপরতা দেখে বুঝতে পেরেছিলাম তার ধৈর্য্য আছে। কাজটি যাতে সুচারুরূপে সম্পন্ন হয় সেদিকেও লক্ষ্য ছিল। উপযুক্ত শিক্ষা পেলে লোকটি কর্মক্ষেত্রে কারো থেকে কম হত না। সাইকেলটি সারিয়ে দিয়ে যখন তার মজুরীর জন্য আমার কাছে হাত পাতল তখন তাকে আমি ইউরোপীয়ান্ মজুরদের সাধারণত যা দিয়ে অভ্যাস তাই দিলাম। অত্যধিক মজুরী পেয়ে সে আমার দিকে চেয়ে রইল। তার বোকামিপূর্ণ চাহনি দেখে বললাম “কাজের দিক দিয়ে যদি দেখা যায় এক জন নিগ্রো ইউরোপীয়ানদের মত কাজ করেছ, তবে তাকে ইউরোপীয়ানদের মতই মজুরী দেওয়া কর্তব্য। তোমার কাজও ইউরোপীয়ান্দের মত হয়েছে সেজন্য তোমাকে ইউরোপীয়ানদের মতই মজুরী দিয়েছি। আমার কথা নিগ্রোটী যেন কিছুই বুঝতে পারেনি সেরূপ মুখভঙ্গী করল। এদের ধারনা এরা যত ভাল কাজই করুক না কেন, কোন মতেই ইউরোপীয়ানদের মত মজুরী পাবার অধিকার নেই। এই হীন ভাবটি পর্তুগীজ পূর্ব-আফ্রিকার প্রত্যেক নিগ্রোর মনে জন্মিয়ে দেওয়া হয়েছে। পর্তুগীজ কেরাণী, ব্যবসায়ী, এমন কি পর্তুগীজ মজুররা পর্য্যন্ত নিগ্রোদের মধ্যে এই চিন্তাধারা প্রচার করার জন্য সম্পূর্ণরূপে দায়ী। ভারতবাসী সেই ভাবধারা আরও যাতে বৃদ্ধি পায় সেজন্য আগ্রহশীল, কিন্তু এই আগ্রহশীলতার পরিণাম ভয়াবহ।
সেদিনই বিকালবেলা পেদ্রোর সংগে সাক্ষাৎ হয়েছিল। আগামী কল্য স্থান ত্যাগ করব একথা তাকে জানালাম। চলে যাব শুনে তিনি দুঃখিত হলেন। তাঁকে বুঝিয়ে বললাম “আমার কাজই হল বন্ধুত্ব স্থাপন করে সেই বন্ধুত্ব কয়েক দিনের জন্য বজায় রাখা এবং দরকার অনুযায়ী যখন তখন স্থান ত্যাগ করা। এই নিয়মটিতে আমি অভ্যস্ত ছিলাম কিন্তু পেদ্রো আমার মত পথিক ছিলেন না, সেজন্যই তিনি বন্ধুসংগ পরিত্যাগে কাতর হয়েছিলেন। পরের দিন সকালে পেদ্রো এবং লস্মনকে পেছনে রেখে ইম্তালীর দিকে রওয়ানা হলাম। ইম্তালী পর্তুগীজ পূর্ব-আফ্রিকার বাইরে দক্ষিণ রডেসিয়ায় অবস্থিত। ইম্তালী সি-লেভেল হতে অন্তত তিন হাজার ফুট উচ্চে অবস্থিত সেজন্য পথ সুন্দর নয় বন্ধুর। পথ চলা কঠিন। শহর থেকে মাত্র আধ মাইল পথ পরিষ্কার তারপরই গ্রেভেল দেওয়া পথ, সাইকেল নীচের দিকে আপনি নেমে আসে। এরূপ পথে চলতে হলে শারীরিক শক্তির যত দরকার হয় মনের শক্তির দরকার হয়ে তার চাইতে আরও বেশি। আমার মনের শক্তি ছিল সেজন্যই চলতে পারছিলাম। কিন্তু বেশি দিন পথ চলা আমার পক্ষে সম্ভব হয় নাই।
কয়েক দিন পথ চলার পর একদিন একটি শিক্ষিত নিগ্রোর সংগে দেখা হয়। নিগ্রোটি উপযাচক হয়ে আমার সংগে কথা বলে। সে সর্বপ্রথমই আমার সাইকেলে লেখা দেখে আবাক হয় এবং বলে “বানা আপনার মত পরিশ্রমী ইণ্ডিয়ান এদেশে দেখি নাই, আপনি কিসের ব্যবসা করেন?”
ব্যবসা আমি করি না একজন পর্য্যটক মাত্র।
জবাব শুনে সে থমকে দাঁড়াল এবং সাইকেলটা ভাল করে দেখে বললে আপনার সংগে করমর্দন করব। তারপর বলতে লাগল যদি এ দেশের ইণ্ডিয়ানরা আপনার মত হত তবে আমাদের উন্নতির পথ খুলে যেত। এদেশের ইণ্ডিয়ানরা আমাদের সংগে করমর্দন করা দূরের কথা কাছেও ঘেসে না।
নিগ্রোর কথা শুনে দুঃখ হল এবং বললাম “বন্ধু এদেশে যত বিদেশী এসেছে তারা সকলেই নিজের মতলব সিদ্ধির চেষ্টা করছে, তারা তোমাদের ভালমন্দ দেখছে না। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের যদি বুদ্ধি থাকত তবে তোমাদের সংগে নিশ্চয়ই সহযোগীতা করত। দুঃখের বিষয় ওদের ঘটে বুদ্ধি নাই সেজন্যই তারা তোমাদের সংগে মেলামেশা করে না।
এখন কেথায় যাচ্ছেন বানা?
ইম্তালী, দক্ষিণ রডেসিয়ার একটি শহরে, সেই শহরটি এখান থেকে আরও তিন সপ্তাহের পথ।
নিগ্রো একটু চিন্তা করে বললে সে অনেক দূর। পথে অনেক বন জঙ্গল। লোকালয় নাই বললেই চলে। তারপর পথত পথ নয় যেন জমের দক্ষিণ দুয়ার। এই পার্বত্য পথ আপনার পক্ষে আরোহন করা সম্ভব পর হবে বটে কিন্তু এতে আপনার লাভ হবে না। শরীর ভেংগে যাবে এবং তাতে হয়ত আপনার পক্ষে আর ভ্রমণ করাও সম্ভব হবে না। আসুন আমার সংগে আজকের মত ভাল করে খেয়ে বিশ্রাম করুণ কাল যা হয় করবেন।
নিগ্রোর কথা আমার বেশ ভাল লাগল সেজন্য তার বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলাম। লোকটি বেশ শিক্ষিত বলেও মনে হল। তার মুখ হতে নির্ভুল ইংলিশ শব্দ বের হচ্ছিল। তার সংগ নিলাম। গ্রামে পৌঁছে দেখলাম কাছেই রেলওয়ে ষ্টেশন। নিগ্রো আমাকে বসতে দিয়ে মোরগের জন্য চলে গেল। সে ফিরে আসবার পর নিকটস্থ মুদীর দোকান হতে চাল, নুন ইত্যাদি নিয়ে এল। সর্বপ্রথমই কাফি তৈরী করে আমাকে এক কাপ কাফি খেতে দিল তারপর সেও এক কাপ খেল। কাফি খেরে সে মোরগ কাটতে রওয়ানা হয়ে গেল দেখে জিজ্ঞাসা করলাম পাশেই মোরগটা কেটে নিলে হয় না?
না মিষ্টার আমাদের এরূপ নিয়ম নাই। যখনই কোন জীবকে আমরা হত্যা করি তখনই সেটাকে একটু আড়ালে নিয়ে গিয়ে হত্যা করাই হল আমাদের নিয়ম। জীব হত্যা করতে গিয়ে আমরা কোনরূপ ধর্মের নিয়মকানুন মানি না। জীবহত্যা করা নির্মম কাজ, সেই কাজটি লোকের সামনে করতে আমরা রাজি নই। আপনাদের দেশের লোক জীব হত্যায় আনন্দ পায় তা ব্যরাতে দেখেছি। আমরা কিন্তু হত্যায় আনন্দ পাই না বাধ্য হয়ে জীব হত্যা করি, আনন্দ করার জন্য আরও অনেক কিছু আছে।
আমরা যখন খাচ্ছিলাম তখন নিগ্রো লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলাম “লোকান্তরালে জীবহত্যা করাটা কি ইউরোপীয়ান সভ্যতা না নিগ্রো সভ্যতা?
এটা নিগ্রো সভ্যতা কি ইউরোপীয়ান সভ্যতা আপনি স্বচক্ষে দেখতে পাবেন দক্ষিণ রডেসিয়ায়।
দক্ষিণ রডেসিয়ায় ভ্রমণ করার সময় অনেক গ্রামে থাকতে হয়েছিল এবং এ বিষয়ে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম তাতে এ বিষয়ের কোন উপযুক্ত প্রমান পাই নাই কিন্তু যখন দক্ষিণ রডেসিয়ার দক্ষিণ দিকে গ্রামের পর গ্রাম অতিক্রম করতে ছিলাম তখন বুঝতে পেরেছিলাম একেবারে উলংগ স্ত্রীলোক যারা, সভ্যতার নাম গন্ধও অনুভব করে নাই তারা ও কোন জীবহত্যা দেখতে প্রস্তুত নয়, অথচ তাদের একমাত্র খাদ্য হল পশুর মাংস। এটা নিশ্চয়ই স্ত্রী প্রকৃতি। কিন্তু যে দিন থেকে ধর্মের প্রভাব পৃথিবীতে বাড়তে আরম্ভ করছিল সেদিন থেকে স্ত্রী প্রকৃতিরও পরিবর্তন হয়েছিল। বর্তমানে কালীঘাটে যখন আমরা যাই তখন দেখতে পাই স্ত্রীলোক অবলীলাক্রমে পশু হত্যা দেখছে এবং পশু হত্যার বদলে নিজের সন্তানের মঙ্গল কামনা করছে।
খাওয়ার শেষে কতকক্ষণ বিশ্রাম করলাম। নিগ্রো নিজেই বলল চার পাঁচটার সময় গাড়ী পাওয়া যাবে। গাড়ীর সময় হয়ে আসল, ষ্টেশনে যেয়ে টিকিট কেনার সময় ষ্টেশন মাষ্টারের সংগে পরিচয় হয়। তিনি বড়ই মিষ্টভাষী। গাড়ীর টিকিট কিন্ছি দেখে সুখী হলেন এবং বললেন “এরূপ বনে জংগলে ভদ্রলোকের সাইকেল নিয়ে ভ্রমণ করা কঠিন কাজ। হয়ত ভ্রমণের পর ক্ষয় রোগও হতে পারে। নিগ্রোরা অতি পরিশ্রমে অনেক সময় ক্ষয় রোগে আক্রান্ত হয় এবং আপনি সে পথের পথিক নন সেজন্য আপনাকে ধন্যবাদ।”
ষ্টেশন মাষ্টারের ধন্যবাদে সুখী হলাম না কারণ তার মুখ থেকে এমন একটি কথা বেরিয়ে পড়ছিল যা শুনে আমার দুঃখই হয়েছিল। অতিরিক্ত পরিশ্রম করলে যক্ষা হয়। নিগ্রোরা অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে বাধ্য, অথবা তাদের বাধ্য করা হয় এই ধরণেরই কথাটা ছিল। ষ্টেশন মাষ্টারকে এ সম্বন্ধে কিছুই বললাম না, শুধু মামুলী ধন্যবাদ জানিয়েই গাড়ীতে বসলাম।
ষ্টেশন মাষ্টার বললেন “এখন আপনি রডেসিয়ার পথে, মংগঙ্গময় ঈশ্বর জাপনাকে নিরাপদে ইম্তালী পৌঁছে দিন এই আমার কামনা।”
আমার মংগলামংগল আমার উপরই নির্ভর করে সেকথা আমি জানতাম, কিন্তু যারা ঈশ্বরকে বিশ্বাস করে তাদের সংগে যদি এ সম্বন্ধে তর্ক করা হয় তবে তারা সোজা কথায় বলে “লোকটা কমিউনিষ্ট” আজকাল এ সম্বন্ধে মুখ বন্ধ রাখাই ভাল। সাংখ্যদর্শন পড়ে ও মুখ বন্ধ রাখবার সময় এসেছে, ঈশ্বর সম্বন্ধে এই ধরনের সন্ত্রাসবাদ শংকরের সময়েও বিদ্যমান ছিল।
গাড়ী ছাড়বার পূর্বে নিগ্রোলোকটিকে কাছে ডেকে তার সংগে করমর্দন করলাম। সে শ্বেতকায় ষ্টেশন মাষ্টারের ভয়ে আমার কাছে আসতে সাহস করছিল না।
গাড়ী ছাড়বার পরই ইমিগ্রেসন অফিসার গাড়ীতে উঠলেন এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমার কম্পার্টমেণ্টে প্রবেশ করলেন। আফিসারের সংগে প্রথম কথা বলা ভাল মনে করলাম না সেজন্য গাড়ীর, জানালা দিয়ে বাইরের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখায় মন সন্নিবেশ করলাম।
ইমিগ্রেসন অফিসার আমার কাছে আসলেন এবং সবিনয়ে বল্লেন কোথায় যাচ্ছেন স্যার?
ইম্তালী।
রডেসিয়া প্রবেশের অধিকার পত্র নিশ্চয়ই আছে?
রডেসিয়ার ট্রেনজিট্ ভিসা আছে এবং দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবেশের অধিকার পত্র আছে?
ব্যরাতে কেমন লাগল?
বেশ সুন্দর সহর। এমন সহরে বসবাস করতে ইচ্ছা করে, কিন্তু আপনাদের সরকার আমাদের প্রবেশের পথ বন্ধ করে দিয়েছে।
কি করে?
চারশত পঞ্চাশ ইংলিশ ষ্টালিং ইমিগ্রেসন ধার্য্য করা হয়েছে।
পর্য্যটক মহাশয়ের জানা উচিত কোন দেশকে সমৃদ্ধ করতে হলে অর্থের প্রয়োজন। আমাদের অর্থ নেই, সেজন্যই আমরা শুধু ধনী লোকদেরেই এদেশে প্রবেশের অধিকার দিয়েছি!
তবে কেন দেশটা খারাপ বলে চিৎকার করেন?
এসব দরকারী বিষয়ের অংশ বিশেষ।
বেশ ভাল কথা মশায়, আপনারা যতটুকু পারেন ততটুজু দরকারের সমাধান করুন।
ইমিগ্রেসন অফিসারগণ কম্পার্টমেণ্ট ছেড়ে যাবার সময় আমাকে বার বার নমস্কার জানিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন।
গাড়ী পার্বত্য পথে এঁকেবেঁকে চলছিল। যখনই গাড়ী মোড় ফেরাচ্ছিল তখনই তন্দ্রা ভেঙ্গে যাচ্ছিল। আমার মত অনেকেরই তা ভেংগে যাওয়ায় বসে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। রাত তিনটা বাজবার পর গাড়ীটা একটি জংলী ষ্টেশনে দাঁড়ল। যাত্রী উঠলও না শুধু তিনজন কাষ্টম অফিসার এবং দুজন ইমিগ্রেসন অফিসার গাড়ীতে উঠল। ইমিগ্রেসন অফিসারগণ গাড়ীতে উঠেই আমার কম্পার্টমেণ্টে আসল এবং আমাকে বসা দেখে ভদ্রতাসূচক কোন কথা না বলে বলল “হ্যালো ব্লেকী কেমন আছ?”
আমি বললাম “ye, How do ye do”? তোরা কেমন আছিস্?
মনে হল আমার কথা ওরা বুঝতে পারে নি, সেজন্য বললাম “হ্যালো শ্বেতনিগ্রো, (White Negroes) কেমন আছ?
ওরা চিৎকার করে বললে “আমরা নিগ্রো নই আমরা ইউরোপীয়ান।”
রং সাদা হতে পারে কিন্তু ব্যবহার নিগ্রোর মতই।
আমার কথা শুনে লোকটা আর কথা বাড়াল না, শুধু পাসপোর্ট দেখতে চাইল। এরা যখন আমার পাসপোর্ট দেখছিল তখন ওদের সিগারেট দিলাম এবং নিজেও একটি সিগারেট ধরিয়ে বললাম “মনে করোনা তোমার দেশ দেখার জন্য ব্যস্ত হয়েছি, দক্ষিণ আফ্রিকাতে যাচ্ছি পথে তোমাদের দেশ সেজন্যই এসেছি। হয়ত দু এক সপ্তাহ থাকতেও পারি তার পরই চলে যাব। এই দেখ দক্ষিণ আফ্রিকা যাবার ভিসা আমার আছে।” লোকটা পাসপোর্ট রেখে দিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ইমিগ্রেসন বিভাগের পত্র দেখল এবং মনের ভাব বদলে ফেলে পাসপোর্টে ভিসা লিখে বলল জাম্বাবী ধ্বসস্তূত এবং ভিক্টোরিয়া ফলস্ নিশ্চয়ই দেখে যাবেন।
তা দেখতেই এদেশে এসেছি।
লোকটির ভদ্রতা তখন চরমে উঠল এবং কতক্ষণ কথা বলার পরই স্থানীয় রাষ্ট্রনীতি নিয়ে কথা আরম্ভ করল। রাজনীতি নিয়ে কথা বলা বড়ই কষ্টকর কাজ। জানতাম রডেসিয়ার লোক ফাসিস্ত ভাবাপন্ন সেজন্য তার প্রতিটি কথার প্রত্যুত্তরে নিজেকে ফাসিস্ত ভাবাপন্ন বলে পরিচয় দিয়ে উদারনীতির বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করলাম। কমিউনিজমের গন্ধ আমার শরীরে না পেয়ে কতক্ষণ পর লোকটা গাড়ী হতে নেমে গেল। সে চলে যাবার পরও নিশ্চিন্ত হয়ে বসতে পারলাম না। কতক্ষণ পরই আর একদল কাষ্টম্স্ অফিসার গাড়ীতে উঠল এবং এদেরও কথাবার্তার দ্বারা সন্তুষ্ট করতে হল।
সকাল বেলা দেখেই যেমন দিনের আবহাওয়ার কথা বলতে পারা যায়, তেমনি রডেসিয়ার সরকারী কর্মচারীদের মুখ দেখলেই বুঝা যায় ওরা সকলেই সাম্রাজ্যবাদী। এসব লোক দুমুখো সাপের মত। যাই বল না কেন তাতেই খুঁত বের করবে। বিদেশে গিয়ে চুপ্ করে বসে থাকলেও চলে না। ধর্ম্মের কথা শিক্ষিত লোক কখনও প্রকাশ্য স্থানে বলাবলি করে না। সভ্য জগতে আজ ধর্মসংক্রান্ত কথা হয় বাজে কথায় পরিণত হয়েছে নয় ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বাকি থাকে রাষ্ট্রনীতি। রাষ্ট্রনীতির সংগে জীবন-মরণের সম্বন্ধ রয়েছে। ধনীদের কর্মচারীরাই খাঁটী ফাসিস্তে পরিণত হয়। রডেসিয়ার সরকারী কর্মচারীরাও ধনীদেরই চাকর। এদের মনে কখন কি আসে বলা যায় না, সেজন্য আজে-বাজে কথা বলা ছাড়া আমার উপায় ছিল না।
পর্যটক দেখলেই এদের কথা বলার স্পৃহা বাড়ে। বাজে কথায় রডেসিয়ার কাষ্টম অফিসার সুখী হল না। তারা ভাল করেই বুঝতে পেরেছিল রডেসিয়াতে আমি থাকব না, সেজন্য বলল আপনার বাজে কথা শুনতে এখানে বসি নাই। বেশ ভাল করেই বুঝতে পেরেছি আপনি মনের ভাব গোপন করছেন। রডেসিয়া ভ্রমণ আপনার হবে কেউ তা রুখতে পারবে না। আপনার ভিসা পাওয়া হয়ে গেছে। এখন যদি কেউ আপনাকে এদেশে প্রবেশ করতে বাধা দেয় তবে আন্তর্জাতিক জগতে রডেসিয়া সরকারের বদনাম হবে। সেজন্য বলছি আপনি আমাদের কাছে মন খুলে কথা বলতে পারেন।
এদের বেয়াদবী দেখে বললাম “রডেসিয়াতে মন খুল কথা বলার মত কিছুই নেই। দেশ দেখতে এসেছি বুঝলেন। ইম্তালী হতে সাইকেলে করে বুলবায়োর দিকে রওয়ানা হব। এখন যেতে পারেন, একটু ঘুমোতে দিন, আর ক’ ঘণ্টা পরেই ভোর হবে, তখন আপনারাই বা যাবেন কোথায় আর আমিই বা যাব কোথায়, কেউ তখন কারো খবর রাখবে না। সুপ্রভাত।
অফিসার আর অন্য কথা না বলে অন্য কম্পার্টমেণ্টে চলে গেল।