নিগ্রো জাতির নূতন জীবন/নিগ্রো গ্রাম
নিগ্রো গ্রাম
আজ অল্প দূর যেতে হবে, কাছেই ওয়েষ্ট নিকলসন্ (West Nicholson) পথটাও সুন্দর। যে পথে সিংহ এবং বনগরুতে লড়াই দেখেছিলাম সে পথটা ছিল প্রশস্ত। রাস্তার উভয় দিকে দুইশত ফুট করে বৃক্ষাদি কেটে ফেলে পরিষ্কার রাখা হয়েছিল আর এদিকে পথের পাশেই বনজংগল রক্ষিত এবং কাটা তার দিয়ে বেড়া দেওয়া। একটু দূরে দূরেই লেখা ছিল “সাবধান আগুন লাগতে পারে।” সেজন্য সিগারেট ধরিয়ে কাঠিটা নিবিয়ে ফেলতাম। কতক্ষণ পর দুজন নিগ্রো সাথীও পেলাম। তারা আনন্দের সহিত আমার সংগে কথা বলতেছিল, যেন অনেক দিনের পরিচিত। সংবাদ নিয়ে জানলাম ওয়েষ্ট নিকলসনে নিগ্রো হোটেল আছে, নানারূপ খাবারও পাওয়া যায়, স্নানের বেশ ভাল বন্দোবস্ত রয়েছে।
পথে কোনরূপ কষ্ট হল না। বারটা না বাজতেই গ্রামে পৌঁছে দেখলাম কাছেই রেল ষ্টেশন। মানচিতে রেল লাইন দেছিেলাম। মাঝে মাঝে গাড়ীও দেখেছি কিন্তু কোথাও রেল-ষ্টেশন দেখি নাই। বড়ই দুঃখ হল কেন এতটা পথ সাইকেলে করে এলান? এটা আমার একটা মস্ত ভুল। এদেশে কি সাইকেলে ভ্রমণ করতে আছে!
ওয়েষ্ট নিকলসন্ বেশ বড় গ্রাম। রেল টারমিনাস্ হওয়াতে কতকগুলি ইউরোপীয়ানও সেখানে বাস করে। ইউরোপীয়ানদের কাছও ঘেসলাম না। স্থানীয় একমাত্র নিগ্রো হোটেলে গিয়ে পরিচারিকাকে ডেকে আমার জন্য ভাল বিছানা করে দিতে বললাম। যুবতী মিশনারী স্কুলে শিক্ষা পেয়েছিল এবং ইণ্ডিয়ানদের সংগে তার মেলামেশা ছিল। সে আমাকে প্রথমেই সতর্ক করে বলল “এখানে সকল সুবিধাই পাবে কিন্তু ভদ্রভাবে চলতে হবে একথাটা মনে রাখা চাই।” আমি সুর নামিয়ে বললাম তাই হবে মেম। যুবতী বেশ ভাল করে বিছানা করে দিয়ে বলল “বিছানায় এখনই শুলে ত হবে না আগে গরম জলে স্নান করুন। হাত পা হতে ডুডু পোকা (জিগার্স) বের করে কিছু খান তার পরে শোবেন। হাঁ মেম, আগে স্নান করব, তারপর হাত পা পরীক্ষা করাব, দেখব তাতে ডুডু পোকা আছে কি না!
হাঁ তাই করুন বলেই যুবতী চলে গেল। ভাল করে স্নান করে একটি লোক ডেকে হাত পা পরীক্ষা করলাম। হাত পায়ে একটাও ডুডু পোকা ছিল না। তারপর রুমে বসে খাবারের জন্য অপেক্ষা করলাম। কতক্ষণ পর একটি শ্বেতকায় যুবক আর একটি যুবতী আসল এবং তাদের পরিচয় দিল। নামে তাদের পরিচয় পাওয়া কঠিন। তারপর যখন বলল তারা শ্বেতকায় নয় কৃষ্ণকায় তখন আমার চৈতন্য হল। অনেকক্ষণ চেয়ে থেকে দেখলাম তাদের চোখের তারা এবং চুল কটা নয়—কালো, একটু মোটা। বুঝলাম এদের শরীরে নিগ্রো রক্ত রয়েছে। যুবক যুবতী আমার কাছে অনেকক্ষণ বসে থাকল। তারপর নিগ্রো যুবতী আমাকে খাবার ঘরে নিয়ে গেল।
সুন্দর টেবিলের উপর ধবধবে টেবিল ক্লথ, তিনজনের খাবারের উপযুক্ত কাটা-চামচ এবং নানা রকমের চাকু ছিল। সর্বপ্রথমই জানিয়ে দিলাম আমি হরেক রকমের চাকু ব্যবহার করতে জানি না বলে যেন তারা আমাকে ক্ষমা করে। তারা সমস্বরে বলল “দু’বৎসর পূর্বেও আমরা হাতে খেতাম, হালে কাটা-চামচ ব্যবহার করতে শিখেছি।
যে যুবতী আমাদের খাদ্য পরিবেশন করবেন তিনি কোন শ্বেতকায় ধনীর বাড়ীতে চাকরি করতেন। তাঁর ইচ্ছা নিগ্রোরা শ্বেতকায়দের মত কাটা-চামচ ব্যবহার করুক। কথা মন্দ নয়, নিগ্রোরা যদি ভাল করে ইউরোপীয়ান প্রথা গ্রহণ করতে পারে তবে লাভ তাদেরই। আমি ত নিগ্রো নই, আমি হলাম ভারতবাসী, আমরা ভালতে যেমন প্রতিবাদ করি, মন্দতেও তেমনি প্রতিবাদ করি। প্রতিবাদ করে বললাম “কাটা চামচ আবার ভাল ব্যবহার কিসের?” এমনি সময় নিগ্রো যুবতী এসেই বললে “কুলিরা তা বুঝবে না, তুমি যে একজন কুলি সে-কথা আমি ভাল করেই জানি। তোমাদের জাতের ইতিহাসও আমার জানা আছে। এখন খাও মিষ্টার কুলি, এখনও দক্ষিণ আফ্রিকার পৌঁছাও নাই। এখনও বুঝতে পার নাই তোমরা আমাদের চেয়ে একচুলও উচ্চস্তরে থাক না, ভালকে ভাল বলতে শিখো। নিগ্রো মেমের কড়া মেজাজের কাছে হার মানতে হল। কারণ হাজার হোক, স্ত্রীলোক ত? স্ত্রীলোকের সম্মান নেই সিমেটিকদের মধ্যে, আমি সিমেটিক নই, সেজন্য স্ত্রীলোকদের সম্মান দিতে বাধ্য।
অর্দ্ধ-নিগ্রো বুবক যুবতীর মত আমিও নানারূপ কাটা-চামচ ব্যবহার করলাম এবং ছয় রকমের খাদ্য বারখানা কাটা চামচের সাহায্যে খেলাম। খাবারের বিল এল। বিল দু’ রকমের। অর্দ্ধ-নিগ্রো যুবক যুবতীকে ছয় পেনী করে চার্জ করা হয়েছে এবং আমাকে করা হয়েছে এক শিলিং ছয় পেনী। সংগে সংগে কারণটিও বলা হল। নিগ্রো যুবতী বললেন আপনি ইণ্ডিয়ান আপনাদের আয় বেশি আর এঁরা হলেন অর্দ্ধ-নিগ্রো, এদের আয় হল খুবই কম। এমন কি নিগ্রোদের তুলনায় কম। আজ কি করে এরা এক শিলিং রোজগার করলেন তাই হল আশ্চর্যের বিষয়। ইউরোপীয়ানরা এদের অন্তরের সহিত ঘৃণা করে, এমন কি সামান্য চাকরী দিতেও রাজি হয় না। সামান্য চাকরী না দেবার একমাত্র কারণ হল এদের শরীরের রং শ্বেতকায়দের মতই, শুধু চোখ কটা নয় এবং চুলগুলি একটু মোটা। এখনও এদের ধমনীতে নিগ্রো রক্তের সিট্ রয়েছে।
যারা সত্য কথা বলতে লজ্জা অনুভব করে তাদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করে সত্যের উদ্ঘাটন সর্বসাধারণের কাছে করবই। এই অর্দ্ধ-নিগ্রো বুবক যুবতীর সম্বন্ধে আমি অন্যত্র কিছু ছিখেছিলাম কিন্তু দুঃখের সহিত বলছি শ্লীলতার দোহাই দিয়ে আমার কথাগুলি পরিত্যাগ করা হয়। এই যুবক যুবতীয় জন্ম যে প্রকারেই হউক এদের জীবন যাপন প্রণালী বড়ই কষ্টের। যুবতীর সৌন্দর্য ছিল, শ্বেতকার যুবকগণ যুবতীকে প্রচুর অর্থের বিনিময় উপভোগ করত। অর্দ্ধ-নিগ্রো যুবকেরও যৌবন ছিল তাকে নিয়ে ধনী পরিবারের যুবতীরা টানা-হেচরা করত। যুবকও এই করে বেশ দু’ পয়সা রোজগার করত। অশ্বেতকায় সুন্দর যুবক যুবতী নিয়ে শ্বেতকায়রা টানা-হেচকা করতে পারে অথচ তাদের সমাজে স্থান দিতে পারে না সে কেমন কথা? যে সমাজ নৈতিক চরিত্রে এত হীন সেই সমাজে আঘাত করলে আঘাত কোনমতেই সহ্য করতে পারে না। এরূপ অন্যায়ী সমাজের প্রতি আঘাত না করে শিক্ষার ভেতর দিয়ে যে-ই সমাজের গলদ দূর করতে যাবে সে-ই কার্যে নিষ্ফল হবে।
নিগ্রো রমণী শিক্ষিতা। বি-এ, অথবা এম্-এ পাশ নন্। ইংলিশ ভাষায় বেশ জ্ঞান আছে। বড় বড় বই তার পড়া হয়েছে। সাধারণ জ্ঞান প্রচুরই আছে। তবে একটু কড়া মেজাজ। এই গ্রামের মধ্যে এই যুবতীই কর্তৃত্ব করেন। সেদিন যুবতীর সংগে কথা হল না। পরের দিন থাকব জানিয়ে আরামদায়ক বিছানায় শুয়ে থাকলাম।
বেটব্রিজ হতে দক্ষিণ আফ্রিকার আরম্ভ। রডেসিয়া যদিও দক্ষিণ আফ্রিকার অন্তর্গত নয় তবুও এদিকের লোক দক্ষিণ আফ্রিকার অনেক নিয়ম কানুন মেনে চলে। যদিও ইণ্ডিয়ানদের প্রকাশ্যে কুলি বলে না, তবুও কুলির মত ব্যবহার করে। ওয়েষ্ট নিকলশন্ গ্রামটা বেশ বড়। ঘুম থেকে উঠেই গ্রামটা দেখার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লাম। একটু যেতে না যেতেই পূর্ব দিনের যুবক যুবকী আমাকে হোটেলে ফিরিয়ে নিয়ে এলো এবং উভয়ে গত রাত্রে কি করেছে তাই অকপটে বলল। গত রাত্রে ওদের আয় হয়েছিল চার পাউণ্ড। চার পাউণ্ডে ওদের এক মাসের মত থাকা খাওয়ার খরচ চলবে। উভয়ে এরা ভাই বোন। এরা একে অন্যের কাছে সকল কথা অকপটে বলা-কওয়া করে। এদের ইচ্ছা সত্বরই একটা ঘর তৈরী করে এবং গৃহস্থ হয়। সেজন্যই তারা যেন-তেন প্রকারে টাকা রোজগার করছে।
আমরা যখন কথা বলছিলাম তখন নিগ্রো যুবতী ঘরে প্রবেশ করেই বলল “তোমরা বোধহয় পর্যটকের কাছে সকল কথা বলে দিয়েছ?” যুবক বললে হাঁ, আমরা সকল কথা বলে দিয়েছি। এতে পাপের কিছুই নেই। পর্যটক জেনে নিক আফ্রিকার জীবন কেমন সুখের ও সুন্দর। “হ্যাঁ বল বল, সবই বল, আমি পর্যটকের খাবার নিয়ে আসি, তোমরাও বোধ হয় কিছু খাবে?” হ্যাঁগো, কিছু খাবার জন্যই এসেছি, দয়া করে কিছু নিয়ে এস। নিগ্রো যুবতী চলে যাবার পর নিগ্রো-রক্ত সমন্বিত ভাই বোন বলল “আমরা আপনাকে চিনি, আপনি এখন বেটব্রিজের দিকে যাচ্ছেন তাও শুনেছি। আপনি এখানে আসার পূর্বেই দুজন নিগ্রো এসেছিলেন, তারা আপনার পরিচয় আমাদের কাছে দিয়ে গেছেন। আমরা আপনার সংগে মেলামেশা করার একটি উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছি। আমাদের উদ্দেশ্য অতি অল্প কথায় আপনার কাছে বলব। আপনি যখন দক্ষিণ আফ্রিকাতে পৌঁছবেন তখন ভারতবাসীদের বলবেন তারা যেন নিগ্রোদের সংগে সংযোগ রেখে কাজ করে নতুবা তারাও যেমন অত্যাচারিত হবে আমরাও তেমনি অত্যাচারিত হব। এই দেখুন যে-কোন শ্বেতকায় এই দেশে আসার পর দৈনিক চল্লিশ শিলিং করে যে-কোনও কাজের জন্য পায়। তাদের বেকার করে রাখা হয় না। আর আমরা যদি কাজ চাই তবে শ্বেতকায়রা সর্বপ্রথম দেখে আমাদের শরীরের সুগঠন এবং মুখের লাবণ্য। আমাদের তারা কাজ দেয় না। যতদিন মুখের লাবণ্য থাকে ততদিন আমাদের কাছে কাছে রাখে তারপর তাড়িয়ে দেয়। এসব অন্যায় হতে রেহাই পেতে হলে আমাদের কাজ করার অধিকার শ্বেতকায়দের কাছ থেকে আদায় করতে হবে। কাজের অধিকার পেতে হলে ইণ্ডিয়ান, আফ্রিকান এবং আরবদের সকলের মিলে বিদ্রোহ করতে হবে নতুবা দক্ষিণ আফ্রিকা এবং রডেসিরার শ্বেতকায়গণ আমাদের টুকরা টুকরা করে হয় আটলাণ্টিক নয় ভারত মহাসাগরে ভাসিয়ে দেবে।
আর একটি কথা এখন থেকে ভাল করে মনে রাখবেন “এখান থেকে বেটব্রিজ প্রায় একশত মাইল। পথ কোথাও প্রশস্ত আর কোথাও একেবারে সংকীর্ণ। এদিকে মোটর বাস চলাফেরা করতে দেওয়া হয় না। অবশ্য ইউরোপীয়ানরা মোটর বাস্, মোটরকার সবই চালাতে পারে, কোনও ইউরোপীয়ান ভুলেও আপনাকে তাদের গাড়ীতে স্থান দেবে না। পথে মাত্র তিনটি গ্রাম দেখতে পাবেন। এই তিনটি গ্রামের লোকসংখ্যা কখনও বাড়ে আর কখনও বা একেবারে কমে যায়। গ্রামের লোককে কেউ মেরে ফেলে না, গ্রামের লোক খাদ্যান্বেষণের জন্য বনে জংগলে চলে যায়। যদি গ্রামে লোক না থাকে তবে আপনি গৃহে প্রবেশ করবেন এবং যে-কোন গৃহে আশ্রয় নিবেন। নিগ্রোরা কোন আপত্তি করবে না। কিন্তু মনে রাখবেন এ-পথে অনেক নিগ্রোকে ইচ্ছাপূর্বক মোটর চাপা দেওয়া হয়। যদি দক্ষিণ আফ্রিকার কোনও জংলী বুয়র বুঝতে পারে আপনি একজন বিশিষ্ট লোক তবে হয়ত সে আপনাকে মোটর চাপা দিতে ত্রুটি করবে না।
কথা শুনে শিহরে উঠলাম। মালয় দেশেও দুটি রবার বাগানের ইউরোপীয়ান আমাকে মোটর চাপা দিতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তারা তাদের কাজে সফল হতে পারে নাই। মালয় দেশের পথের দুদিকে খাল ছিল। যখনই পেছন থেকে মোটরের শব্দ শুনতাম তখনই সাইকেল সমেত খালে গিয়ে পড়তান। এদিকেও সেরূপ কিছু করতে হবে, নতুবা আর উপায় থাকবে না। দীর্ঘনিঃশ্বাস পরিত্যাগ করে নিগ্রো যুবক যুবতীকে বললাম “বন্ধুগণ! এই ত আমাদের জীবন, এ জীবন এমনিভাবে বয়ে নিয়ে যাওয়া কত কষ্টকর তা আপনারা বেশ ভাল করেই বুঝতে পারছেন। আমিও তার ভুক্তভোগী। তা বলে আমাদের ভয় করলে চলবে না, আমাদের চলতে হবেই।
আমাদের খাবার নিয়ে নিগ্রো যুবতী ঘরে প্রবেশ করল এবং তিনজনকেই গম্ভীরভাবে বসে থাকতে দেখে বললে “ঔষধ তবে কাজ করেছে।” অর্দ্ধ-নিগ্রো যুবতী বললে “ঔষধ সুস্থ দেহে দিতে হয় না। পর্যটকের শরীর বেশ সুস্থ। আজ আমরা ওকে আমাদের পরিচালিত বিদ্যালয়টি দেখাবো এবং উনি বিদ্যালয়টি দেখে বুঝতে পারবেন আমরা কতদূর কাজে অগ্রসর হয়েছি। আমি তখন বিদ্যালয়ের কথা একটুও ভাবছিলাম না। আগামীক্য এখান থেকে রওয়ানা হয়ে কিভাবে পথ চলব সে-কথাই মনে তোলপার হচ্ছিল।
খাওয়া শেষ করে আমরা গ্রাম দেখার জন্য বের হয়ে পড়লাম। গ্রামের অবস্থা বিশেষ ভাল নয়। কারো ঘর ভেংগে পড়েছে আর কারো ঘরের পেছনে আবর্জনা জমে আছে। ঘরের সামনে আবর্জনার মধ্যে বসেই শিশুরা খেলছে। বেকার যুবক-যুবতীরা ঘরের সামনে রৌদ্রে বসে আনমনে চেয়ে আছে। বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধেরা ছেঁড়া অপরিষ্কার কাপড় পরে পথেরই দিকে তাকিয়ে আছে। বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধাদের দেখলেই মনে হয় এদের জীবনের কোনও মমতা নেই। মৃত্যুতেই শান্তি, জীবিত থাকলেও ক্ষতি নেই। একে ত নিগ্রোদের মুখের আকৃতি বদখতে তার উপর যদি ওরা অপরিষ্কৃত থাকে তবে দেখতে অনেকটা বানরের মতই দেখায়। গ্রামটা যতই দেখছিলান ততই মনে হচ্ছিল যেন একটি বানর পল্লীতে ভ্রমণ করছি। কোন কোন নিগ্রো গ্রামে দেখেছি তারা মাথার চুল একেবারে চেঁছে ফেলে। যারা মাথার চুল একেবারে ফেলে দেয় তাদের মাথার উকুন হতে পারে না। স্নানের সময়ও সুবিধাই হয়। কিন্তু এই গ্রামে স্ত্রী বা পুরুষ কেউ মাথার চুল একেবারে ফেলে দেয়নি বলে এদের আরও খারাপ দেখাচ্ছিল। অর্দ্ধ-নিগ্রো পুরুষটিকে জিজ্ঞাসা করলাম “মশাই এরা কেন মস্তক মুণ্ডন করে না? মস্তক মুণ্ডন করলে এদের মুখের সৌন্দর্য অনেকটা বাড়ত।”
যুবক দুঃখের হাসি হেসে বলল “এখানে কেউ সুন্দর হতে চায় না, একথা যদি আপনি ভেবে থাকেন তবে সেটা আপনার ভুল হবে।”
এখানে এমন লোক কেউ আসেনি যাতে এদের উন্নতির পথ বলে দিতে পারে। এই যে অবস্থা দেখছেন তা হল প্রাকৃতিক। গ্রামে হোটেল খোলার পর হতে এই গ্রামের লোক চিনি কাকে বলে প্রথম দেখেছে এবং চিনি খেতে যে মিষ্ট তা বুঝতে পেরেছে। আমরা এ গ্রামের লোক নই। হোটেলওয়ালী অন্যগ্রাম থেকে এখানে এসেছেন। আমাদের সর্বপ্রথম কাজ হ’ল এ গ্রামে নিজকে স্থাপিত করা, তারপর গ্রামের উন্নতিতে হাত দেওয়া। হোটেলওয়ালী এখানে এসেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন, তার পূর্বের সঞ্চিত অর্থে এবং আমাদের সাহায্যে। এখন আমরাও যদি কোনমতে একখানা ঘর করে ফেলতে পারি তবেই গ্রামের অবস্থা ফিরে যাবে। যে পর্যন্ত আমরা নিজের ঘরে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারব, সেই পর্যন্ত এই গ্রামে আমাদের কোন অধিকার স্থাপিত হবে না। আমরা যদি গ্রামের লোককে কোন ভাল উপদেশ দেই এবং সেই উপদেশ মত কাজ করার পর আমাদের বিরুদ্ধে গ্রাম্য পাদরীর কাছে নালিশ করে তবে আমাদের গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে। সেজন্যই এখন আমরা চুপ করে আছি। আপনার কাছে বিদ্যালয়ের কথা বলেছিলাম। সেটা বিদ্যালয় নয়। আমরা কোনরূপ বিদ্যালয় স্থাপন করতে পারি না। আইন তাতে বাধা দেয়। আমরা নৃত্য-গীতের বিদ্যালয় খুলেছি। ছেলেমেয়েরা বিকাল বেলা নাচ-গান প্রভৃতি করতে আসে। নাচ-গানের ভেতর দিয়েই আপাতত তাদের পরিষ্কার পরিচ্ছতা শিক্ষা দিচ্ছি। এতে শিক্ষা বিভাগ বা স্থানীয় পাদরীরাও আপত্তি উঠাবে না; কারণ এতে তাদেরই সুবিধা হবে। তারা নূতন নূতন যুবক-যুবতীদের চাকর রাখতে পারবে। চাকর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালবাসে। ভাববেন না এদেশে কোন সৎকার্য অতি সহজে সম্পন্ন করা যায়। সাধারণ লোকের মধ্যে যদি কেউ শিক্ষা বিস্তার করতে যায় অমনি তাকে কমিউনিষ্ট আখ্যা দেওয়া হয় এবং গ্রাম হতে বহিষ্কার করা হয়। রডেসিয়ার নিগ্রোদের উপর শ্বেতকার প্রভুরা বড়ই কড়া হাতে শাসন এবং শোষণ কার্য চালিয়ে যাচ্ছেন।
নিগ্রোগ্রাম দেখা হয়ে গেলে আমরা ইউরোপীয়ানদের গ্রামের দিকে অগ্রসর হলাম। ইউরোপীয়ানরা রেলষ্টেশনের কাছে থাকে। নিগ্রোগ্রাম থেকে রেলষ্টেশন প্রায় দুই মাইল দূরে অবস্থিত। আমরা গজেন্দ্র গমনে সেদিকে অগ্রসর হলাম। পথের অবস্থা মোটে ভাল নয়। কোথাও গর্ত আর কোথাও বালি একত্রিত হয়ে ঢিবি হয়ে রয়েছে। কোথাও গৃহপালিত জীবের মোটা মোটা হাড় একত্রিত করে রাখা হয়েছে। এসব হাড় হতে দুর্গন্ধ আসছিল। আমরা নাকে রুমাল দিলাম না। রুমাল দেওয়াটা দরকারও মনে করলাম না, কারণ নিগ্রো-গ্রামেও নানারূপ দুর্গন্ধ থাকে, শুধু হোটেলের চারিদিকই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ছিল।
ইউরোপীরান বসতিতে পৌঁছামাত্রই মনেরও পরিবর্তন হল। সুন্দর পথ। পথের দুদিকে বাঁধানো ফুটপাথ। ফুটপাথের পরেই ফুলের বাগান। ফুটপাথ ধরে হাটতে আমার সাথীরা খুবই ভয় পাচ্ছিল। আমিই শুধু ফুটপাথের উপর দিয়ে চলছিলাম। কতকক্ষণ যাবার পরই একখানা গ্রোসার সপ্ (মুদির দোকান) দেখতে পেলাম। দোকানে দৈনিক সংবাদপত্র থেকে আরম্ভ করে সব কিছুই ছিল। আমার সাথীরা দোকানে প্রবেশ করল না। আমি দোকানে প্রবেশ করে জোহান্সবার্গ হতে প্রকাশিত ডেইলী এক্সপ্রেস এবং নিউ আউটলুক্ বলে দু’খানা সংবাদপত্র এবং লণ্ডন হতে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ডেলী মিরার এবং ডেলী ওয়ার্ল্ড কিনেই একটি বোতলে রক্ষিত ক্রিম্ দেখতে পেয়ে দোকানীকে ক্রিমের বোতলটিও দিতে বললাম। দোকানী ক্রিম্ বোতলটি এক শিলিং ছয় পেনীতে বিক্রয় করল এবং জিজ্ঞাসা করল আমি কোন্ দেশের লোক। আমি যখন তাকে আমার পরিচয় দিলাম তখন সে আর কোন কথাই বলল না, এমন কি আমার মনে হয় ক্রিম বিক্রি করার জন্য সে দুঃখিত হয়েছে এবং সে যদি জানত আমি ইণ্ডিয়ান তবে সে আমার কাছে বিক্রি করত না।
গ্রোসারী দোকান পার হয়েই কয়েকখানা বাংলো ধরণের বাড়ী দেখতে পেলাম। বাংলোগুলিতে বোধহয় রেলকর্মচারী থাকে। এই ভেবে সেদিকে অগ্রসর হলাম। পথে দেখা হ’ল একজন ব্যবসায়ী ইউরোপীয়ানের সংগে। সে আমাকে দেখেই বললে, “হ্যালো নেপোলিয়ন বোনাপার্ট, এদিকে কি ভেবে?”
মিষ্টার এদিকে ভিক্ষায় বের হয়েছি। নেপোলিয়ন মস্কো পর্য্যন্ত মুক্ত অসিতে অগ্রসর হতে সক্ষম হয়েছিলেন আর আমি ভিক্ষাপাত্র নিয়ে এখান পর্যন্ত আসতে সক্ষম হয়েছি। এই বলেই তার হাতে আমার একখানা ভিক্ষাপত্র দিলাম। সে আমার ভিক্ষাপত্রখানা দেখে বললে “দেখা হওয়ায় বড়ই আনন্দিত হয়েছি, কিন্তু আপনার ভিক্ষাপত্রে অনেক বানান ভুল আছে।
“যে-কোন মতেই হোক আমার বক্তব্য বুঝতে পেরেছেন নিশ্চয়ই।”
“হ্যাঁ, তা ঠিক, কিন্তু আপনার এ ভুলের জন্য আমি ক্ষমা করব না, বোধহয় আপনি নিগ্রোদেরও ভিক্ষাপত্র দিয়েছেন। তারা ভুল বানান শিখলে তাদের যেমন ক্ষতি হবে আমাদেরও তেমনি ক্ষতি হবে। দুঃখের বিষয় এখানে কোনও প্রেস নাই, যদি থাকত তবে আমি আপনার সবগুলি ভিক্ষাপত্র নষ্ট করে দিয়ে নূতন করে ছাপিয়ে দিতাম। যাক্গে আপনি আপনার ভিক্ষাপত্র শুদ্ধ করে ছাপবেন এই আশায় আমি আপনাকে এক পাউণ্ড দিচ্ছি। এই নিন্ আর অগ্রসর হবেন না। এদিকে সবাই বার্গার, এরা আপনাকে অপদস্ত করে ছাড়বে, একটি পেনীও দেবে না। আমি জাতে স্কচ্, এবং ধর্মে কমিউনিষ্ট, সেজন্যই আপনার সংগে দাঁড়িয়ে কথা বলছি। যদি কোনও বার্গার আপনাকে ফুটপাথে হাটতে দেখে তবে বড়ই রাগ করবে, হয়ত বা কুকুরও লেলিয়ে দিতে পারে, এদিকে আর অগ্রসর হবেন না।
এক পাউণ্ডএর নোটখানা যত্নসহকারে রেখে দিয়ে ভদ্রলোককে বিদায় দিলাল। সামনের দিকে এগিরে চলেছি দেখে ভদ্রলোক একটু দুঃখিত হলেন এবং বললেন “চলুন আমিও আপনার সংগে যাব। আমরা ফুটপাথে চলছিলাম এবং অর্দ্ধ-নিগ্রো ভাইবোন রাস্তার উপরে চলছিল। আমাদের একত্র চলন দেখে অনেকেই ঘরে চলে গেল এবং এমনি ভাব দেখাল যাতে করে মনে হল তারা নন্-কোপারেশন করেছে। আমাদের গ্রাম ভ্রমণ হয়ে গেলে হোটেলে চলে এলাম এবং স্কচ্ম্যানের সংগে পুনরায় কাফি খেলাম। নিগ্রো স্ত্রীলোক বিয়ে করে বলে স্কচ্দের বিদেশে খুবই বদনাম এবং সেজন্য স্কচ্দের ইউরোপের ইংলিশ, আইরিশ, জার্মান এবং ডাচরা বড়ই ঘৃণা করে। স্কচ্ ভদ্রলোক দুঃখের সংগে বললেন “আজ যাদের আমরা ঘৃণা করছি কাল যখন তারা মানুষ হবে তখন আমাদের অবস্থা কত শোচনীয় হবে সেকথা অনেকেই চিন্তা করে না।
সুখের সময় বড়ই তাড়াতাড়ি অতিবাহিত হয়। ওয়েষ্ট নিকলসনে করেকটি দিন যেন কয়েকটি ঘণ্টার মতই কেটে পেল। সকাল বেলা ঘুম হতে উঠেই কতকগুলি রুটি, এক টিন মাখন এবং কতকটা চিনি কিনে ফেললাম। তারপর জলের কেতলি জলে ভরপূর করে সাইকেল মেরামত করার যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করলাম এবং নিগ্রো হোটেলওয়ালীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পথে এলাম।