নিগ্রো জাতির নূতন জীবন/পরিত্যক্ত বাস্তু
পরিত্যক্ত বাস্তু
আর একশত মাইল গেলেই আরম্ভ হবে দক্ষিণ আফ্রিকা। যতই এগিয়ে যাচ্ছিলাম ততই মনে হচ্ছিল এ সব জংগল নয় পতিত জমি। পতিত জমি অনেক দিন অনাবাদী থাকার জন্য জংগলে পরিণত হয়েছে। মাইল দশেক যাবার পর পথেই পেলাম মস্ত বড় একটা বাড়ী। বাড়ীটার গঠণ অবিকল কলেজ স্কোয়ারের দ্বার ভাংগা বিল্ডিংএর মত। সামনে প্রকাণ্ড চত্তরে কয়েকটি গাভী চরে বেড়াচ্ছিল। স্তম্ভগুলির পাশে দুটি নিগ্রো ছেলে খেলা করছিল। আমাকে দেখা মাত্র ছেলে দুইটি পালিয়ে গেল। কতকক্ষণ পরই একজন বুয়র বন্দুক হাতে করে আমার সামনে দাঁড়াল। তার মুখ দেখেই মনে হল লোকটা খুন করতে পারে সেজন্য বিনয় করে বললাম, “হে দয়ালু ব্যক্তি আপনার দয়ার উপর আমার প্রাণ নির্ভর করছে। কাছেই একটা সিংহ হাঁ করে বসে আছে। আপনার এখান থেকে যদি তাড়িয়ে দেন তবে আমাকে সিংহের পেটে যেতে হবে।”
তাই নাকি চলত সিংহটা কোথায় দেখে আসি এই বলেই লোকটা আমাকে নিয়ে পথে এল। পথের উপর দিয়ে তখন কতকগুলি খরগোস চলে যাচ্ছিল। খরগোসগুলিকে দেখিরে বললাম—ঐ দেখুন সিংহের বাচ্চাগুলি কেমন কট্মট্ করে আমার দিকে তাকাচ্ছে।
লোকটা তখন অনেকক্ষণ হাসল তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল তবে মশিয়ে (মহাশয়) বিদেশী?
হাঁ মশাই “আমি সাইকেল করে দেশ বিদেশ ভ্রমণ করি।
বিয়ে হয়েছে?
না।
আসুন আসুন, আপনার কাছ থেকে অনেক মজাদার সংবাদ শুনব। দরা করে খরগোসকে সিংহের বাচ্চা বলে আমাকে বিপদে ফেলবেন না এবং বিভ্রান্ত করবেন না।
বাড়ীটার ভেতর যখন প্রবেশ করছিলাম তখন ইউরোপীয়ান লোকটি আমাকে জিজ্ঞাসা করল “বাড়ীটা দেখে কিরূপ মনে হচ্ছে?”
পূর্বকালের কোনও ফিউডেল চীফের বাড়ী বলেই মনে হয়।
আমার কথা শুনে লোকটা ফিরে দাঁড়াল। কতক্ষণ আমার দিকে চেয়ে রইল তারপর এগিয়ে চলল। তার গোঁফ দাড়ি কামানো ছিল না বলে আরও বিভৎস দেখাচ্ছিল। জুতা হতে দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল, মোজা ছেড়া ছিল। চুল অনেকদিন হয় কাটেনি বলে মাথাটা বদখত দেখাচ্ছিল। চোখ দুটা ধূসর বর্ণের ছিল। যতই তার সংগে এগিয়ে চলছিলাম ততই মনে হচ্ছিল লোকটা নিশ্চয়ই খুনী, নতুবা এই জংগলে পরিত্যক্ত বাড়ীতে আশ্রয় নেবার কোনও দরকার ছিল না।
বাড়ীটার ভেতরও স্থানে স্থানে আগাছা গজিয়ে ছিল। কতকক্ষণ যাবার পর আমরা একটি ঘরের সামনে আসলাম। ঘরের সামনে কয়েকখানা চেয়ার বিক্ষিপ্ত অবস্থায় ছিল। ঘরটার দরজা খুলাই ছিল। ভেতরের দিকে চেয়ে দেখলাম অনেকগুলি বই ছড়িয়ে রয়েছে। লিখবার কালি কলমও আছে। পাশেই মস্ত বড় একটা ঘণ্টা! লোকটা ঘরে গিয়েই ঘণ্টা বাজাল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটি নিগ্রো রমণী এল এবং ডাচ্ ভাষায় কথা বলল। বুঝলাম কিছু খাদ্য আনতে বলেছে। তখনও সে আমাকে বসতে বলে নাই, ভদ্রতা বজায় রাখার জন্য আমি দাঁড়িয়েই ছিলাম। কতকক্ষণ পর ভ্যাণ্ডারের চেতনা হল; বললে বসুন। Please sit down. ঘরের বাইরের একটা চেয়ারে বসলাম। ভেতরকার চেয়ারগুলি ব্যবহারের উপযুক্ত ছিল না। ইতি মধ্যে নিগ্রো রমণী আমার জন্য খাবার নিয়ে এসেছিল।
খাবারের থালা দেখে বুদ্ধি লুপ্ত হয়েছিল। এরূপ খাদ্য জীবনে কখনও দেখি নাই। কম পক্ষে এক সের ওজনের এক টুকরা মাংস, একটা রুটি, পোয়া খানেক মাখন ও এক বোতল দক্ষিণ আফ্রিকার আঙ্গুরের মদ। মদ খেতাম না বলে বোতলটা সর্ব প্রথমই ফেরৎ দেই তারপর খেতে আরম্ভ করি। আমি যখন খাচ্ছিলাম তখন ভ্যানডার আমার কাছে বসল এবং বললে “বুয়োর বুদ্ধে আমাদের পরিবারের সব মরেছে, শুধু আমিই বেঁচে আছি। এখান থেকে একশত মাইলের মধ্যে ভয়ানক যুদ্ধ হয়েছিল। কেনেডিয়ান্ এবং গুপ্ত পাঞ্জাবী সেপাই মিলে বুয়রদের প্রাপ্ত বয়স্ক যুবক হতে আরম্ভ করে বৃদ্ধ পর্য্যন্ত কাউকে ছাড়েনি। বুয়র যুদ্ধ প্রায় অর্দ্ধ শতাব্দি পূর্বে হয়ে গেছে এখনও কিন্তু আমরা আমাদের সেই শৌর্য্য বীর্য্য ফিরে পায়নি। এই যে বিস্তীর্ণ এলাকা দেখছেন তা আমরই সম্পত্তি। আমি মরলেই এই সম্পত্তি সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হবে। আমার কয়টি নিগ্রো প্রজা আছে। তাদের আমি স্বাধীনতা দিয়েছি। তারা এই বাড়ীতেই থাকে। এখন তারা ভুট্টার ক্ষেতে কাজ করতে গেছে। সন্ধ্যার পূর্বেই ফিরে আসবে। এখন আপনাকে যে খাদ্য দেওয়া হয়েছে তা নিগ্রোদের খাদ্য। বিকালে আমার সংগে খাবেন।
আমাকে যে খাদ্য দেওয়া হয়েছিল তার সামান্য খেয়ে বিশ্রমার্থ নিকটস্থ কক্ষে গেলাম। সেখানে অনেকগুলি বিছানা ছিল। বিছানাগুলি দেখেই মনে হল এসব বিছানার নিগ্রোরা শোয়ে। বিছানাগুলি ছিল বেশ পরিষ্কার সেজন্য শোয়ে থাকতে ঘৃণা হল না। কতকক্ষণ বিশ্রামের পরই ভ্যানডার আমাকে ডাকলে এবং আমরা উভয়ে মিলে বাড়ীটার ভেতরই একটি ছোট্ট বাগানে বসলাম। সর্ব প্রথমই জন্ভ্যানডার আমার পরিচয় জানতে চাইলে। আমার পরিচয় পেয়ে ভ্যানডার একটু দুঃখিত হল। লোকটি কিন্তু উচিত বক্তা। কথা প্রসঙ্গে আমাকে বললে “বুয়র যুদ্ধের পূর্বে যে সকল গুজরাতী মুসলমান দক্ষিণ আফ্রিকাতে বসবাস করছিল তারা প্রকৃত পক্ষেই জেনারেল ক্রুগারকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলছিল। জেনারেল ক্রুগারের কাছে তাদের পঞ্চাশ হাজার টুকরা সোনা পাওনা ছিল। সেই সোনা অসময়ে তারা চেয়ে বসে। জেনারেল ক্রুগার ভারতবাসীকে বুয়রদের সম-অধিকার দিতে চেয়ে ছিলেন এই সোনার বিনিময়ে কিন্তু ভারতবাসী রাজী হয় নাই। রাগ করে জেনারেল ক্রুগার ভারতধাসীর সোনা ফিরিয়ে দেন এবং জেনারেল ত্রুনজি এবং জেনারেল স্মাটকে বলেন “মনে রাখবেন জেনারেলগণ অসময়ে ইণ্ডিয়ানরা আমাদের প্রতারিত করল, সেজন্য এদের শাস্তি দিতে হবে। এরা প্রকৃত পক্ষেই অবুঝ লোক, যদি কোন দিন আমাদের সময় আসে তবে আমরা এদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেব এবং নিগ্রোদের মতই এদের প্রতি ব্যবহার করব। আপনি সে দেশেরই লোক। আপনার সংগে মন খুলে কথা বলতেও ভয় করে। যদিও আমরা বৃটিশের সংগে লড়াই করে ডমিনিয়ন ষ্টেটাশ পেয়েছি তবুও আমরা এখনও বৃটিশের প্রাধান্য হতে রেহাই পান নাই। আমাদের দেশের খনি হতে সোনা উঠায় বৃটিশ। সেই সোনার দর নির্দ্ধারণ করে বৃটিশ ব্যবসায়ী। এর পরেও যদি আমাদের কেউ স্বাধীন রাষ্ট্র বলে স্বীকার করে তবে তারা মূর্খ বই আর কিছুই নয়। আমরা হয়ত বৃটিশকে এদেশ হতে তাড়িয়ে দিতে পারতাম, কিন্তু ভারতীয় সেপাই আমাদের বেশ ক্ষতি করেছে। সে কথা আমরা কখনও ভুলতে পারব না। এখনও আমাদের দেশে অনেক ভারতীয় সেপাই আছে তারা অনেকেই এখন বৃদ্ধ কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা এবং রডেসিয়ার অলিখিত আইন মতে বৃদ্ধ বয়সের পেনশন্ এদের দেওয়া হয় না। ভোটের অধিকার তাদের নেই। এদের পক্ষে শাস্তি উপযুক্তই হয়েছে। আপনি যখন দেশে ফিরে যাবেন তখন আমার বলা অলিখিত ইতিহাস আপনার দেশবাসীকে শুনাবেন। আজ আপনি এখানে আরামে থাকুন, কাল কিন্তু আপনি আমার অতিথি নন একথাটা মনে রেখে সকাল সকালই স্থান ত্যাগ করবেন।
রাত্রে ঘুম হল না। চারটার সময় ঘুম হতে উঠে একটুকরা কাগজে ভ্যান্ডারকে লিখে ধন্যবাদ জানিয়ে যখন পথে এলাম তখন মনে হল এক বন্যজীবের হাত হতে রেহাই পেয়ে অন্য বন্যজীবের খপ্পরে না পরলেই রক্ষা। সুখের বিষয় এত সকালেও কোন বন্যজীবের দেখা পাইনি। কিন্তু একটা গাছের নীচ দিয়ে যখন যাচ্ছিলাম তখন গাছের উপর আগুন দেখে বেশ ভয় হচ্ছিল। তারপরই মনে হল গ্যাসের কথা। অনেকে আলেয়া দেখে অজ্ঞান হয়। আমারও সে অবস্থা হবার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু যখনই মনে হল ঢিল ছুড়লেই আলেয়ার লোপ হয় তখন সময় ক্ষেপন না করে একটি পাথর কুড়িয়ে আলেয়ার দিকে ছুড়ে মারলাম। আলেয়ার লোপ হল কিন্তু মনের ভয় গেল না। সিগারেট ধরালাম এবং ধীরে ধীরে বাইসিকেল চালিয়ে এগিয়ে চললাম। সূর্য উঠার সংগে সংগে সব ভয় চলে গেল। ন্যাসনেলিজমের নগ্ন রূপ চোখের সামনে এসে দেখা দিল। অতবড় ঘৃণা এখনও দক্ষিণ আফ্রিকার বৃদ্ধরা মনে রেখেছে। তারা একটুও বুঝতে চেষ্টা করেনি ভারতবর্ষ তখন ছিল পরাধীনতার অন্নকারে নিমজ্জিত। স্বাধীনতার সামান্য একটু গন্ধ পাবার জন্য, সামান্য একটু লাভের খাতিরে ভারতবাসী তখন যা ইচ্ছা তাই করতে রাজি হত। আজ যদি ভারতবাসী সেরূপ কোন অন্যায় করে তা হবে অসহনীয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরুদ্ধে যোগ দিয়েছিল ক্যানেডিয়ান, অষ্ট্রেলিয়ান, নিউজিল্যাণ্ডার্স, কই তাদের বিরুদ্ধে বুয়রগণ ঘৃণা পোষণ করেন না কেন? ঘৃণা পোষণ না করবার কারণ আছে। তারা হল বুয়রদের সমশ্রেণীর লোক। আর আমরা হলাম মিশ্রজাত। শ্বেতকায়দের সমশ্রেণীর লোক নই। আমাদের আচার ব্যবহার অন্য রকমের, সেজন্যই বুয়রগণ এখনও বুয়র যুদ্ধের কথা মনে রেখেছে।
সেদিন দুপুর বেলায় যখন আমি কোন গ্রাম পেলাম না তখন মানচিত্র খুলে পথের পাশে বসে পড়লাম। দেখতে পেলাম আর পচাত্তর মাইল গেলেই রডেসিয়ার সীমা শেষ হবে। পচাত্তর মাইল চলা বিশেষ কঠিন কাজ নয় ভেবে মনে বেশ আনন্দ হল। এগিয়ে চললাম। এক এক করে মাইল গুণে যখন দেখলাম প্রায় পনর মাইল চলে এসেছি তখন আমার প্রাণে নবচেতনার উদ্রেক হল। পথের পাশেই রাত কাটাতে হবে ঠিক করে বিশ্রামের স্থান ঠিক করবার জন্য একটু পায়চারী করছিলাম। ইত্যবসরে একটি ছোট্ট নিগ্রোর সংগে দেখা হয়। লোকটিকে বামন বলেই মনে হল। তার সংগে আরও দুটি লোক ছিল। আমাকে পেয়ে তাদের কত আনন্দ। তাদের সিগারেট দেওয়ায় তারা আরও খুসী হল। তারা ছিল একেবারে উলঙ্গ। তাদের হাতে ছিল তীর-ধনু। তীরধনুগুলি খুবই ছোট।
বিকাল চারটার পূর্বেই শুইবার স্থান করে নিলাম। তিনটি নিগ্রো আমার কাছে বসল। তাদের প্রকৃতি ছিল চঞ্চল, গাছের পাতা নড়লেই কেঁপে উঠে। কথা বলা ত দূরের কথা ইঙ্গিতও ভাল করে বুঝতে পারে না। তাদের জল আনতে বললাম। জল যে কি পদার্থ তাদের বুঝাতে পারলাম না। অবশেষে ওয়াটার বোতল থেকে জল বের করে দেখালাম। তখন তারা জল কাকে বলে জানল এবং আমাকে নিয়ে নিকটস্থ একটি নালাতে গেল। জলের কাছে গেল কিন্তু জলে নামল না। পশুর মতই জল খেল। আমাকে আবার পথের কাছে পৌঁছিয়ে দিয়েই চলে যেতে চাইল। আমি তাতে রাজি হলাম না। যেখানে থাকব বলে ঠিক করেছিলাম সেখান পর্যন্ত যেতে বললাম। সিগারেট দেব লোভ দেখালাম, কিন্তু কোনমতেই তারা এল না। তারা চলে গেলে মনে হল বোধহয় ওয়া ব্যুসম্যান। পরে জেনেছিলাম এ অঞ্চলে ব্যুসম্যানরা যাওয়া আসা করে।
রাত বেশ আরামেই কাটল। পরের দিন সকাল বেলা নবোদ্যমে পথে বের হলাম। ষাট মাইল পথ যেতে হবে। উঁচু-নীচু পথের জন্য একটুও দুঃখিত হলাম না। যতই পথ এগিয়ে যেতে লাগলাম ততই নূতনের গন্ধ পাচ্ছিলাম। কতক্ষণ চলার পর পেলাম একটা পেট্রল পাম্প। সেখানে ছিল কয়েকজন নিগ্রো আর একজন ইউরোপীয়ান। ইচ্ছা করলেই এখানে থাকতে পারতাম কিন্তু থাকলাম না। বেটব্রিজ যেন আমাকে টেনে নিয়ে চলছিল। লক্ষ্য করছিলাম ক্রমেই ভূমি উঁচু হয়ে উঠেছে। পাহার নেই, পর্বত নেই অথচ ভূমি উঁচু। এতেও দুঃখ হল না। চল্লিশ মাইল চলার পর আর অগ্রসর হতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। শরীরের বল হারিয়ে ফেলছিলাম। সঙ্গে খাদ্য ছিল না। কি করতে হবে তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। ঠিক এই সময় একজন পাদ্রীর সংগে দেখা হল। তাঁর সংগে অন্য শ্বেতকায় ছিল বলে তিনি আমাকে সংগে নিতে পারলেন না। কিন্তু রুটি, জল এবং এক প্যাকেট সিগারেট বিনামূল্যে দিতে ভোলেন নাই। চলে যাবার সময় বললেন “ব্যাটব্রিজে আমার বাড়ীতে থাকবেন। সেখানে বর্ণ-বৈষম্য নেই।” পাদ্রীর কথায় আশ্বস্ত হয়েছিলাম।
পরদিন সকাল বেলা যখন রওয়ানা হলাম তখন মনে বেশ আমার পাচ্ছিলাম। কুড়ি মাইল পথ দ্বিগ্রহের পূর্বেই শেষ করলাম। সাধের ব্যাটব্রিজে পৌঁছলাম। ব্যাটব্রিজের ওপারে অর্থাৎ রডেসিয়ার দিকে মাত্র কয়েকখানা দোকান। দোকানগুলি প্রশস্থ এবং পাকাবাড়ী। একখানা হোটেলও আছে। হোটেলে ইণ্ডিয়ানদের প্রবেশ নিষেধ। কাষ্টমস্ হাউস দোকান ঘরগুলির পাশেই। অনেকদিন পর সভ্যতার সন্ধান পেয়ে বড়ই আনন্দিত হলাম। সর্বপ্রথমই দক্ষিণ আফ্রিকার জোহান্সবার্গ হতে প্রকাশিত রেণ্ড ইভিনিং নিউজ কিনলাম। সেখানে মস্কো নিউজ প্রকাশ্যে বিক্রি হতে দেখে একখানা মস্কো নিউজও নিলাম। তারপর গেলাম নিগ্রো গ্রামে। নিগ্রো গ্রামটা একেবারে অপরিষ্কার! বিভিন্ন দেশের নিগ্রোরা এখানে বাস করে। গ্রামের উন্নতির চেষ্টা কেউ করে না। নিগ্রো গ্রাম দেখে পাদ্রীর বাড়ীর খোঁজে বের হলাম। পাদ্রীর বাড়ী কাছেই ছিল, কিন্তু আমার ধারণা হচ্ছিল না এটা কি করে একজন পাদ্রীর বাড়ী হতে পারে।
মস্তবড় একতলা বাড়ী। তাতে অনেকগুলি কোঠা। বাড়ীর সামনে মস্তবড় বাগিচা। অনেক চিন্তা করে যখন বাড়ীর সামনে দাঁড়ালাম তখন একজন মহিলাকে পেয়ে তার কাছেই থাকবার আব্দার জানালাম। মহিলা কানে একটু কম শুনতেন। একটানা বলে যেতে লাগলেন, “আপনার কথা আমার ভাই বলে গেছেন। আমাদের বাড়ীটা হোটেল ভিন্ন আর কিছুই নয়। এখানে বিপদগ্রস্থ ইণ্ডিয়ানদের স্থান দেওয়া হয়। শুনেছি আপনি দক্ষিণ আফ্রিকাতে যাবেন। দক্ষিণ আফ্রিকাতে প্রবেশ করা তত সহজ নয়। আপনাকে অন্তত দুদিন এখানে থাকতে হবে। আপনার জন্য বিছানা ঠিক আছে। আসুন নিগ্রো বয়ের সংগে পরিচয় করিয়ে দেই, সে-ই আপনার স্নানের জল এবং খাবার দেবে—আসুন!”
ঘরে গিয়ে দেখলাম সত্যিই বিছানা তৈরী! বয় পূর্বেই জল উঠিয়ে রেখেছিল। বয়ের সংগে পরিচয় হল। সে বেশ ইংলিশ বলতে পারে। এতে আমার আরও সুবিধা হল। পাদ্রীর বোনকে বিদায় দেওয়ার পূর্বে জিজ্ঞাসা করলাম, দৈনিক কত দিতে হবে? কথাটা তার কানে পৌঁছাল না। বয় বললে, (Ten and Six) দশ শিলিং ছয় পেনী করে দিতে হবে। তাতেই রাজি হলাম। আরাম করে তিন দিন কাটিয়ে চতুর্থ দিন সকাল বেলা রওয়ানা হবার সময় পেছনে কিছু রেখে গেছি বলে মনে হল না। পথে নামতে ভয় হল কারণ সামনেই দুরন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা।
সমাপ্ত