নিগ্রো জাতির নূতন জীবন/পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য
পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য
দেশী ভাষায় ভ্রমণ কাহিনীকে অনেকেই শিশু পাঠ্য মনে করেন। এই ধরণের ধারণা মনে পোষণ করার নানা কারণ আছে। কারণগুলি না বলাই ভাল। পিরামিড, অথবা বাবিলনের তথ্য পূর্ণ প্রবন্ধ ও আমাদের দেশের লোকের কাছে শিশুপাঠ্য। এখানে যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হল তা আমাদের দেশের লোকের মতে কোন্ রকমের পাঠ্য হয়ে দাঁড়াবে জানিনা তবে প্রত্নতত্ত্ববিদ্ ও ভূতত্ত্ববিদদের কাছে বিষয়টি এখনও অজ্ঞাত। বিষয়টি অজ্ঞাত থাকার প্রথম কারণ হল বাবু শ্রেণীর তত্ত্ববিদগণের শরীরে তত শক্তি এবং খরচের মত অর্থ না থাকায় জাম্বাবী ধ্বংসস্তূপের কথা ভারতবাসী এখনও জানতে পারছে না।
আমাদের দেশের দর্শণ হল মায়াবাদী। বাদের দর্শণে পৃথিবী মিথ্যা বলা হয়েছে তাদের পক্ষে আফ্রিকার গভীর বনের ধ্বংসস্তূপের সংবাদ সংগ্রহ করা নিতান্ত আহাম্মকের কাজ। সুখের বিষয় বর্তমাণ ভারত পৃথিবী যে সত্য সে কথা বেশ ভাল করেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমাণ সমাজেই আমার জন্ম। যারা টাকার মর্ম্ম বুঝে তাদের পক্ষে বিদেশ বলে কিছুই নেই, তারাই আফ্রিকার জঙ্গলে গিয়েও জাম্বাবী ধ্বংসস্তূপ দেখার প্রবৃত্তি হারায় না। আজ জাম্বাবী ধ্বংসস্তূপের কথা সকলের কাছে সমাদৃত হবার সময় এসেছে।
বৃটিশ পূর্ব্ব আফ্রিকার যখন ভ্রমণ করছিলাম তখন কয়েকজন জার্মাণ এবং পর্তুগীজ পর্য্যটকের সংগে দেখা হয়, তাদের সংগে দেখা হয়েছিল একটি জঙ্গলে এবং সেজন্যই তারা বর্ণাভিমাণ ভুলে গিয়ে মন খুলে কথা বলতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁরা বলছিলেন ইউরোপের কয়েকটি স্থান ভ্রমণ করার পর শাহারা প্রভৃতি বৃহৎ মরুভূমি দেখে মিশর, সিরিয়া এবং প্যালেষ্টাইন ভ্রমণ করে আফ্রিকায় আসেন। আফ্রিকায় আসার পর জাম্বাবী ধ্বংসস্তূপ দেখে আরও সেই ধরণের কতকগুলি ধ্বংসস্তূপ দেখতে পান। ধ্বংসস্তূপগুলির গঠণ একই ধরণের এবং আশে-পাশে এমন কোন কিছু পান নাই যা দেখে ধ্বংসস্তূপ সম্বন্ধে কোনও উপসংহারে পৌঁছতে পারেন। একজন বৃটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদের মত উদ্ধৃত করেন এবং বলেন বৃটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ্ এই ধ্বংসস্তূপ সম্বন্ধে যে ধারণা পোষণ করেছেন তাতে তারা সায় দিতে পারেন না। তাদের মতে এই ধ্বংসস্তূপগুলি বহু পুরাতণ এমন কি বিশ্ববিখ্যাত ব্যাবিলোনিয়ান্ সভ্যতারও বহু পূর্বের।
ইউরোপীয়ান পর্য্যটকগণ আপাতত আমাকে তাদের সমকক্ষ মনে করেই কথা বলতেছিলেন এবং এই ধ্বংসস্তূপগুলি সম্বন্ধে আমার মতামত জিজ্ঞাসা করেছিলেন। ধ্বংসস্তূপ না দেখেই কোনও মন্তব্য করা ভাল হবে না মনে করে পর্য্যটকদের কাছে কোন মন্তব্য করলাম না। বলে দিলাম যখন ধ্বংসস্তূপ দেখব তখন সে সম্বন্ধে কিছু বলতে পারব। পর্য্যটকগণ বিদায়ের পূর্বে তাদের নামের কার্ড দিয়ে বলেছিলেন, “আপনার মন্তব্য জানবার জন্য আমরা উৎসুক রইলাম।”
গাড়ীতে বসা মাত্রই কম্প দিয়ে জ্বর উঠল। সারাদিন এবং সারারাত জ্বরে কষ্ট পেয়ে যখন ভিক্টোরিয়াতে নামলাম তখন ইচ্ছা হচ্ছিল না গাড়ী হ’তে নামি। কাছেই কয়েকখানা টেক্সী দাঁড়িয়েছিল। একখানা টেক্সী ভাড়া করে স্থানীয় একজন গুজরাতী ব্যবসায়ীর ঘরে গেলাম। যদিও গুজরাতী আদর-যত্ন করে আমাকে তার ঘরে স্থান দিলেন কিন্তু যখন কয়েকবার স্থানীয় পুলিশ আমার অনুসন্ধান করল তখন ব্যবসায়ীর পিলে ফাটবার উপগ্রম হল। তিনি আমাকে দ্বিপ্ররের পর পেট ভরে খাইয়ে একখানা মোটর এবং একজন ড্রাইভার দিয়ে বললেন “বাবু এই লোকটি আপনাকে ধ্বংসস্তূপ দেখিয়ে বিকেল চারটার সময় গাড়ী ধরিয়ে দিয়ে আসবে, কেমন?”
তাতেই রাজি হলাম, ভাবলাম যাদের পুলিশের এত ভয় তাদেরই জাত-ভাই আমি।
ড্রাইভার গাড়ী চালাল। সুন্দর পথে গাড়ী চলল। কতকক্ষণ যাবার পরই দেখতে পেলাম একস্থানে লেখা রয়েছে We could not say anything about the ruins, if you can please let us know, Our address is London W. C.—3. etc. etc. ঠিকানাটি নোট বইয়ে লিখে নিলাম তারপর ড্রাইভারকে বললাম খুব ধীরে গাড়ী চালাও। আমি ভাবছিলাম গাড়ীতেই একটু শুয়ে নেব কিন্তু ড্রাইভার যেই দেখল আমার চোখ বুজে গেছে সে অমনি গাড়ী ঘণ্টায় পঞ্চাশ মাইল বেগে গাড়ী চালিয়ে ধ্বংসস্তূপের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর সেও ঘুমিয়ে পড়ল।
আমার ছিল ক্লান্তির নিদ্রা। কতক্ষণ পরই ঘুম ভেংগে গেল। প্রবল পিপাসা হল। গাড়ীতেই ড্রাইভার প্রচুর জল এনেছিল। এদিকে এশিয়াটিকদের জলের ব্যবস্থা ছিল না শুধু ইউরোপীয়ানদের ব্যবহারের জন্যই জলের বন্দোবস্ত ছিল। যদি কোন নিগ্রোর জল পিপাসায় কাতর হ’ত এবং সে জলের জন্য ছট্ফট্ করত তাতে কারো এসে যেতনা। নিগ্রো জলের পাইপে হাত দিলে জলের বদলে বুলেট পেত। আমাদের দেশেও মেথর শ্রেণীর লোক কূপ অথবা পাতকূপে স্নান করতে গেলে এমন কি পাতকূপের কাছে গেলেও গলাধাক্কা খায়।
জলের টিন হতে জল নিয়ে পেট ভরে খেয়ে বহাল তবিয়তে যখন সামনের দিকে তাকালাম তখন দেখতে পেলাম আমার সামনে এক বিরাট ধ্বংঅস্তূপ। এরূপ ধ্বংসস্তূপ আফ্রিকাতে আর দ্বিতীয়টি নেই। ধ্বংসস্তূপটি দেখেই মনে হল এটার সম্বন্ধে খামখেয়ালী মন্তব্য করা আর নিজের গলায় নিজে ছুরি বসান একই কথা। তাই ধীরে ধীরে অগ্রসর হলাম এবং যা দেখতে পেলাম তাই লিপিবদ্ধ করলাম।
ধ্বংসস্তূপের সামনে একটা প্রকাণ্ড দরজা। এরূপ দরজা আমাদের দেশের পার্বত্য দুর্গে দেখা যায়। গোয়ালিয়র দুর্গের সদর দরজার সংগে এই প্রবেশ পথের বেশ সাদৃশ্য রয়েছে। তারপরই একটি ধারণা আপনা হতে এসে গেল, সে ধারণা হল এটা কি আরবগণ তৈরী করেছিল, কারণ আরবদের দুর্গের সংগে এর অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। এ ভাবটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। একটু কাছে যাবার পর আপনা হতেই হাসি পেল। মনে হল কোথায় রাজা-ভূজা আর কোথায় গঙ্গারাম তেলী। সিমেটিকদের এত ফ্যাশন করে পাথর কাটার ধৈর্য কখনও ছিল না। সিমেটিক সভ্যতার অনেক ইমারত এবং অনেক দুর্গ দেখেছি বলেই একথা সাহস করে বলতে সক্ষম হলাম।
আরব সভ্যতার মধ্যে আজ আনরা যে কারুকার্য দেখতে পাচ্ছি আরবদের তা নিজস্ব নয়। দ্রাবীড়দের কাছ থেকে ধার করা। সিমেটিক সভ্যতা জন্ম নেবার হাজার হাজার বৎসর পূর্বে দ্রাবিড়গণ আরব দেশে প্রবেশ করেছিল তার সমূহ প্রমাণ পাওয়া যায়।
সিমেটিক, আর্য, ফিনিসিও এসব সভ্যতা হল দরকারের দাস। দরকার হয়েছে একটা বিল্ডিং তৈরী করতে হবে তাতে ছোট বড় পাথর ব্যবহার কর ক্ষতি নেই কিন্তু বিল্ডিংটি তৈরী হওয়া চাই এই হল এদের কৃষ্টি। শিল্পের দিক দিয়ে এদের কোন দিন কোন রকমের খেয়াল ছিল না, যে সকল চারুশিল্প আমরা আর্য, সিমাইট অথবা ফিনিসিও সভ্যতার ভেতর দেখতে পাই তা দ্রাবিড় অথবা অষ্ট্রিক সভ্যতার মত নয়।
দরজার পাশেই কতকগুলি জ্বালানি কাঠ অর্দ্ধদগ্ধ অবস্থায় দেখে মনে হল হয়ত এখানে কোন দরিদ্র পরিব্রাজক পাক করে খেয়েছিল। তারপরই দেখলাম রডেসিয়া সরকারের বিজ্ঞপ্তি। অমুক দিকে যাবেন, অমুক জিনিস দেখবেন ইত্যাদি, যেন দর্শককে গাইড করে নিয়ে যাবার বেশ নির্দেশ রয়েছে। আর একটু এগিয়ে গিয়ে একটি মঠ পেলাম! মঠটি অবিকল ভারতীয় ধরণের। যে সকল পাথর দিয়ে মঠ তৈরী হয়েছে সেগুলি একই রকমের এবং একই জাতের। কৃষ্ণবর্ণ পাথর দিয়ে এতবড় একটা ইমারত গঠন করা বড়ই কঠিন কাজ। মঠ হতে বের হয়ে যখন মাইল ব্যাপী ধ্বংসস্তূপ দেখতে পেলাম তখন শুধু একই ধরণের পাথর একই আকৃতিতে কাটা দেখতে পেয়ে আশ্চর্য অনুভব করলাম।
মঠের কাছেই দুটা বকুল গাছ দেখে মঠের ভেতর বসে থাকতে ইচ্ছা হল না। বকুল তলায় গিয়ে পাকা বকুল গোটাগুলি একত্রিত করার সময় নানা কথা ভাবছিলাম। কাছেই একটা ডুমুর গাছ দেখতে পেলাম। এরূপ ডুমুর গাছ বাংলা, আসাম, উড়িষ্যা এবং দক্ষিণ ভারতেই দেখা যায়। ডুমুর ফলগুলি পাকা ছিল বলেই দু একটা পাকা ডুমুর মুখে দিতে ভুলিনি। কিন্তু তাতে অসংখ্য ছোট ছোট বীজ থাকার মুখ থেকে ফেলে দিতে হয়েছিল। ডুমুর খাওয়া হয়ে গেলে একখানা পাথর বের করে তাই পরীক্ষা করলাম। কৃষ্ণ পাথরে চূণের ভাগ ছিল কিন্তু চূণের ভাগ অতি সামান্য থাকায় পাথর পাথর রূপেই ছিল। পাথর খানা সামান্য পরিমাণে পচতে আরম্ভ করেছিল। শুষ্ক ভূমির উপর যে পাথর দাঁড়িয়ে থাকে তা সহজে পচে না যা পচে তা শুধু রোদে এবং বর্ষায়। এরূপভাবে পাথর পচতে সহস্র বৎসর লাগে তা ভূতত্ববিদ্গণ অতি সহজে নির্ণয় করতে পারেন। অঙ্কটি অতি ছোট এবং সামান্য কিন্তু তার করমুলা জানা না থাকায় এখানে তার সঠিক সময় দিতে পারলাম না। বৃটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ্ ওয়ালস্ কেন যে সেই অঙ্কের সাহায্য নেননি তা বলা বড়ই কঠিন। হয়ত তিনি জাম্বাবী ধ্বংসস্তূপ সম্বন্ধে নীরব থাকতেই পছন্দ করেছিলেন। নীরবতার কারণ কি বলা বড়ই কঠিন।
মন্দির হতে বের হয়ে পাহাড়ের উপরে স্থাপিত আর একটি মন্দিরের দিকে অগ্রসর হলাম, পথে অনেকগুলি স্থানে কে অথবা কাহারা ইচ্ছা করেই দেওয়াল ভেংগেছে বলে মনে হল। অনেকে বলেন যখন আরবগণ ইসলাম ধর্ম প্রচারার্থ স্পেনের দিকে অগ্রসর হয় তখন এক দল আরব আফ্রিকার ভেতর প্রবেশ করে যত প্রাচীন মন্দির ও মঠ পেয়েছিল তার সবই ধ্বংস করেছিল। তার প্রমাণ ন্যাসাহ্রদের তীরে অবস্থিত মন্দিরগুলি দেখলেই বুঝতে পারা যায়। ন্যাসা লেকের তীরের মন্দিরগুলির পাথর এবং জাম্বাবী স্তূপের পাথরের আয়তন এবং জাত একই। এই মন্দির লহরী যে একই সময়ে তৈরী হয়েছিল তাতে আর কোনও সন্দেহ নেই। কোন কোন পর্য্যটকের ধারণা এই মন্দিরগুলি আদিম যুগের গ্রীকগণ তৈরী করেছিল। আমি তাতে একমত হয়ে পারি না। গ্রীকদের তৈরী বহু পুরাতণ বিল্ডিং দেখেছি তাদের গৃহ গঠন পদ্ধতি অন্য ধরণের। তারা দরকার অনুযায়ী পাথর ব্যবহার করত কিন্তু এখানে তাড়াতাড়ি করে যে কোন পাথর ব্যবহার করা হয় নাই। একই সাইজের একই রঙ্গের পাথর ব্যবহার করা হয়েছে! এতেই প্রমাণিত হয় এসব ইমারত গ্রীকদের নয়, অন্য কারো দ্বারা তৈরী, গ্রীকদের গৃহ কার্যে প্রায়ই পিলার ব্যবহার করা হত কিন্তু এই ধ্বংসস্তূপে একটিও পিলার নেই। বঙ্গদেশে যত পুরাতন দেবমন্দির দেখেছি তার কোথাও পিলার ব্যবহার করতে দেখিনি। আসামের অসমিয়া সভ্যতার ভেতরও পিলার ব্যবহৃত হয় নাই। গৌর, মৈথিল, বর্তমান বঙ্গ এমন কি খাসিয়া জন্তিয়া পাহাড়ে যে সকল পুরাতন মন্দির দেখতে পাওয়া যায় তাতে পিলারের ব্যবহার মোটেই নাই। এই ধ্বংসস্তূপ সেজন্যই ভারতের স্থপতি বিদ্যার একটি অংশ বলা যেতে পারে। অনেকে হয়ত বলবেন আমি ভারতবাসী সেজন্য আফ্রিকার জংগলে যেয়েও নিজের দেশের টান টানছি। ধরে নিলাম আমার মতবাদ পক্ষপাত পূর্ণ কিন্তু আর একটা সভ্যতা দেখাতে হবে যার সংগে এই ধ্বংসস্তূপের সাদৃশ্য রয়েছে, বর্তমান সিমাইট সভ্যতার ভিতর পিলারের ব্যবহার খুবই বেশি অতএব আরব সভ্যতার সঙ্গে এর কোন সম্বন্ধ নাই একথা বলতেই হবে।
জাম্বাবী ধ্বংসস্তূপের আশেপাশের লোকের আচার ব্যবহার সম্বন্ধে কিছু জানবার জন্য আরও কিছু সময় কাটিয়েছিলাম। আশেপাশের গ্রামগুলিতে এমন অনেক লোক আছে যাদের চুল আমাদের মত। যাদের চোখগুলো এবং ভ্রূ-যুগল বাস্তবিকই তাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। কপাল উঁচু এবং প্রশস্থ। হাত পা অবিকল স্কচ্দের মত। এই আকৃতির লোক সংখ্যা খুবই কম। ক্রমাগত নিগ্রো সংস্পর্শে থেকে তারাও আকৃতি বদলাচ্ছে। এদের শরীরে যদি গ্রীক অথবা আরব রক্ত থাকত তবে এদের গাত্র-বর্ণের কিছুটা পরিবর্তন নিশ্চয়ই হত। কিন্তু সেদিকে তারা একটুও অগ্রসর হয় নাই। শরীরের রং একেবারে কালো।
দ্রাবিড় জাতের ক্রমবিকাশ এবং বিস্তৃতি সম্বন্ধে নৃতত্ববিদ্গণ কি বলেছেন তারাই জানেন। আমার কিন্তু এসব বই পড়ার সময় এবং সুযোগ হয়ে ওঠেনি। মনে হয় নরডিকরা যেমন উত্তর দেশ হতে ক্রমে গ্রীষ্মপ্রধান দেশে আসবার চেষ্টা করেছিল তেমনি দ্রাবিড়গণও পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করেছিল। পৃথিবীর সর্বত্র মানুষের আসা যাওয়া করা এটা হল মানুষের প্রকৃতি। আরব, সিরিয়া, লেবানন্, বলকান প্রভৃতি দেশে এখনও দ্রাবিড় সভ্যতার সমূহ প্রমাণ পাওয়া যায়। আফ্রিকাতে তারা যে যায়নি সেকথা বোধ হয় কেহ বলেন নাই আর যদিও বা বলে থাকেন তবুও আমি বলব দ্রাবিড়গণ আফ্রিকাতেও গিয়েছিল এবং তাদের সভ্যতার চিহ্ন আজও তথায় বর্তমান রয়েছে।
আসল কথাটা হল কতকগুলি লোকের চোখ, মুখ দেখেই সেদেশে কোনও জাতির গমনাগমন নির্ণয় করা চলে না। দেখতে হবে পুরাতন বিল্ডিং, মঠ, দেব-মন্দির প্রভৃতি তারপর জাতির গমনাগমন নির্ণয় করতে হবে। আমার জানা মতে জনৈক ভারতীয় ভদ্রলোক দক্ষিণ আমেরিকাতে গিয়ে কতকগুলি লোক দেখেই সেদেশে আর্য-সভ্যতার সন্ধান পেয়ে যান। হাসির কথা বটে। দেখতে হবে ইমারত, তারপর মানুষ। এতগুলি বিবেচনা করে আমি বলতে বাধ্য জাম্বাবী ধ্বংসস্তূপ দ্রাবিড় সভ্যতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ইউরোপের যে যে স্থানে দ্রাবিড় সভ্যতার লক্ষণ দেখেছি সেই দেশগুলিতে এখনও দ্রাবিড়ের বসতি রয়েছে। তারা কত শত বৎসর পূর্বে শীতপ্রধান দেশে গিয়েছে সেকথা তারাও জানে না, অথচ রক্তের সংমিশ্রণ না হওয়ায় এখনও তাদের শরীরের কালো রং বদলাতে সক্ষম হয় নাই। দক্ষিণ আফ্রিকার নালয়, ইটেনটট্ ইত্যাদি জাত মৌলিকত্ব বজার রাখতে পারে নাই, সেজন্য শ্বেতাংগে পরিণত হয়েছে। আমার মনে হয় দ্রাবিড়গণও নিগ্রো সংস্পর্শে আসায় তাদের তামাটে রং একেবারে কৃষ্ণাংগে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় লোকদের সংগে যখন কথা বলছিলাম তখন তাদের কতকগুলি সদ্গুণের পরিচয় পেয়েছিলাম। তারা বেশি কথা বলে না। অন্যায় কাজ মোটেই পছন্দ করে না, সমাজে সর্বদাই শৃঙ্খলা বজায় রাখে। যখন তারা উত্তেজিত হয় তখন বেশি উৎপাত করে না। এরা বহু বিবাহ পছন্দ করে না। বিধবা বিবাহ প্রচলিত আছে। ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, কিন্তু ভগবান ভূত, প্রেত এবং পিতৃপুরুষের পূজা করে। এদের আচার ব্যবহার দেখলে অনুন্নত ভারতীয় দ্রাবিড়দের সংগে বেশ সম্বন্ধ রয়েছে বলেই মনে হয়। এদের নামগুলির সংগে ভারতীয় মৌলিক তামিলদের নামের বেশ সম্বন্ধ রয়েছে। মৌলিক তামিল বলতে অব্রাহ্মণ তামিলদের কথাই বলছি। ব্রাহ্মণ তামিলদের নাম প্রায়ই উত্তর ভারতীয় হিন্দুদের নামের সংগে মিলতে দেখা যায়।
অর্দ্ধেকটা ধ্বংসস্তুপ দেখার পর হাঁপিয়ে পড়েছিলাম। সেজন্য অনেকক্ষণ বিশ্রাম করতে হয়েছিল। বিশ্রাম করে আবার একটা পাহাড়ের উপর উঠতে আরম্ভ করি। ভাবছিলাম আজ আমি একাই ধ্বংসস্তূপ দেখছি। পাহাড়ের উপর উঠে ভুলটা ভেংগে গেল। করেকজন ইউরোপীয় মহিলা এবং পুরুষও একটি মন্দিরের প্রকোষ্ঠে বসে বিশ্রাম করছিলেন। আমাকে দেখা মাত্র তারা উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন “আমরা বেড়িয়ে যাচ্ছি, এখন আপনি দেখুন।” আমি তাদের বিশ্রামে ব্যাঘাত জন্মানোর জন্য দুঃখ প্রকাশ করলাম এবং প্রকোষ্ঠটি ভাল করে দেখে নিলাম। কুঠরীটির একটি মাত্র দরজা এবং দরজার বিপরীত দিকে একটি ত্রিভুজাকৃতির নক্সা দেখতে পেয়ে ইউরোপীয়ানদের ইঙ্গিত করে বললাম “দেখুন কেমন সুন্দর একটি ত্রিভুজ। ত্রিভুফটির তিনটি কোণের পরিমাণ নব্বই ডিগ্রির বেশী হবে না।” আমার কথা শুনে ইউরোপীয়ানরা ফিতা বের করে ত্রিভুজটির মাপ নিলেন এবং গণনা করে বললেন, আপনার কথাই সত্য। একেবারে কাণায় কাণায় নব্বই ডিগ্রি। সেই মন্দিরে দেখবার আর কিছুই ছিল না। বাইরে এসে চারিদিকের দৃশ্য দেখলাম।
পশ্চিম দিকে তখন সূর্য হেলে পরছিল। উত্তর এবং দক্ষিণ দিক একেবারে খোলা থাকায় মনে হচ্ছিল এমন সুন্দর দৃশ্য জীবনে আর দেখি নাই। কিন্তু পূর্বদিকে দৃষ্টি পড়া মাত্র মনে একটা দুঃখের ছায়া পড়তে বেশিক্ষণ লাগে নাই। মনে হচ্ছিল যেন বহু পুরাতন একটি শহর ধ্বংস হয়েছে এবং তাহারই উপর সূর্যালোক পড়ে ঝক্মক্ করছে। সংগঠন সবাই দেখতে চার। ধ্বংস কেউ দেখতে ভালবাসে না। এই ধ্বংসস্তুপটি দেখে ধ্বংসের কারণ জানতে ইচ্ছা হয়েছিল।
সর্বোচ্চ প্রকোষ্ঠে এবং তার আশেপাশে না দাঁড়িয়ে বিধ্বস্ত শহরটি দেখার জন্য যখন নামতে আরম্ভ করলাম, আমার সংগে ইউরোপীয়ানরাও নেমে আসলেন। একই সংগে আমরা বিধ্বস্ত শহরটি দেখলাম এবং একই সংগে বেরিয়ে আসলাম। পথে ইউরোপীয় পর্যটকদের সংগে যে-সকল কথা হয়েছিল আমার সেই কথাগুলি পর্যটকগণ কেপটাউনের আর্গাস নামক পত্রিকায় ছাপিয়েছিলেন। এই পর্যটকগণ বোধ হয় সর্বপ্রথম দ্রাবিড় সভ্যতা সম্বন্ধে আমার কাছ থেকেই কিছুটা শুনেছিলেন, সেজন্যই তারা এত আগ্রহ করে শুধু আর্গাস নামক পত্রিকায় নয়, নানা পত্রিকায়ই আমার কথা বিশদভাবে উল্লেখ করতে ভোলেন নাই।
আমাদের দেশে সংবাদপত্রে অনেক সময় অনেক ভাল কথাও সংবাদপত্রের মালিকের আদেশে পরিত্যাগ করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকাতে সংবাদ পরিবেশন করা সম্পাদকের উপরেই নির্ভর করে, সেজন্যই বোধ হয় আমার সম্বন্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার সংবাদপত্রগুলি এত কথা প্রকাশ করেছিল।
চারটার গাড়ী ধরার কথা ছিল। উপযুক্ত সময়েই ধ্বংসস্তূপ পরিত্যাগ করে ষ্টেশনে আসতে সক্ষম হই এবং ট্রেণে বসার পর মোটরকার ড্রাইভারকে সামান্য অর্থ উপহার দিয়ে বিদায় নেই। পরের দিন দুপুর বেলা গাড়ী বুলোবায়ো পৌঁছে এবং গাড়ী হতে নেমেই পেটেলের ঘরের দিকে রওয়ানা হই।