বিষয়বস্তুতে চলুন

নিগ্রো জাতির নূতন জীবন/বুলোবায়ো

উইকিসংকলন থেকে

বুলোবায়ো

 মেপ্পা এবং জব্বোকে পেছনে রেখে ষ্টেশনের দিকে অগ্রসর হলাম। ষ্টেশনে পৌঁছে দেখলাম স্থানটি বড়ই সুন্দর। ষ্টেশনের বাহিরেই কয়েকটি জলের কল ছিয়। জলের কলের আশেপাশে কোথাও “Only for Europeans” এই কয়টি কথা লেখা না থাকায় ভাবলাম শহরের ভেতর প্রবেশ করার পূর্বে হাতমুখ না ধুইলে মানুষের মত দেখাবে না। কাছেই জল রয়েছে, হাত-মুখ ধুইতে কি আপত্তি? হাতমুখ ধোয়া হয়ে গেলে রুমাল দিয়ে যখন মুখ মুছতেছিলাম তখন একটি শ্বেতকায় আমাকে লক্ষ্য করে বলল “এই, জলের কলটা তুই ব্যবহার করেছিলি?”

 হাঁ, কি হয়েছে?

 হবে আবার কি, কেপটা বদলি করতে হবে; তোরা কি জলের কল ব্যবহার করতে জানিস?

 আসল কথা হল ইউরোপীয়ানরা যে সকল জলের কল ব্যবহার করে সেই সকল জলের কল এশিয়াবাসী এবং নিগ্রোদের ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না। ইউরোপীয়ানটার সংগে ঝগড়া করা মোটেই সুবিধা হবে না ভেবে শহরের দিকে রওয়ানা হলাম।

 একটু যাবার পরই একটি কঙ্কনী মুসলমানের দোকান দেখতে পেয়ে তার ঘরে উঠে এক পেয়ালা কাফি অথবা চা দিতে বললাম।

 কঙ্কনী মুসলমানটি হাত জোড় করে বলল “তা কি করে হয় সাহেব, আমার স্ত্রী নিগ্রো, কোন ইণ্ডিয়ান আমার বাড়ীতে জলও খায় না, আপনি একেবারে চা অথবা কাফি চেয়ে বসলেন।

 দয়া করে এক পেয়ালা চা দিলে বাধিত হব। এ দেশে আমি নূতন এসেছি, উপরন্তু আমার কাছে নিগ্রো, অর্দ্ধ নিগ্রো এবং ইণ্ডিয়ান সকলেই সমান।

 কঙ্কনী মুমলমান তৎক্ষণাৎ তাঁর স্ত্রীকে ডাকল এবং আমাকে এক পেয়ালা কাফি দিতে বলল। তাঁর স্ত্রী আমাকে দেখে কি ভাবছিল জানি না কিন্তু কাফি যখন নিয়ে এল তখন বুঝলাম আমার অজানিতে সে আমাকে আপন করে নিয়েছে। হয়ত নিগ্রো রমণী ভাবছিল আমি কোনও নিগ্রো মহিলার পাণি গ্রহণ করেছি নতুবা তাদের ঘরে কাফি অথবা চা খাব কেন?

 কাফি খাওয়া হয়ে গেলে কঙ্কনী মুসলমানকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম নিকটেই এক পেটেলের দোকান আছে। সেই পেটেলই হলেন এখানকার ভারতীয়দের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দোকানী এবং তার বাড়ীতেই অতিথি অভ্যাগত এসে থাকেন। কঙ্কনী মুসলমানের কাছ হতে বিদায় নেবার পূর্বে বললাম “বন্ধু যদি তোমার ঘরে থাকবার স্থান থাকত তবে এখানেই থাকতাম। দুঃখের বিষয় তোমার নিজেরই স্থানাভাব, আমাকে কি করে স্থান দিবে বল?”

 হাঁ ভাই যা বলেছ সবই ঠিক্, পেটেলের বাড়ীতে থাক, আমাকে কিন্তু ভুলো না। আমিও একজন ভারতবাসী, কিন্তু স্থানীয় ভারতবাসীরা আমাকে পরিত্যাগ করেছে, করুক তারা পরিত্যাগ, আল্লা এর বিচার করবেন। আমাদেরও সুসময় আসবে।

 বাঙ্কনী বলল তার পরিচিত একটি লোক আমাকে রেলষ্টেশনে দেখেছিল। সেই লোকটি বলছিল আমাকে নাকি একটা ইউরোপীয়ান অপমান সূচক কথা বলেছে।

 হাঁ, এটা ত এখন আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। আফ্রিকা ছেড়ে যাবার পর ভাবতে পারব এদেশে কি দেখেছি, এখন আমার মন অপমানের ধার ধারে না, কোন মতে আফ্রিকা ভ্রমণ শেষ করতে পারলেই হল।

 আপনার পক্ষে ইউরোপীয়ান অধ্যুসিত রেলষ্টেশনে যাওয়াই অন্যায় হয়েছে। আমরা সেদিকে মোটেই যাই না। ভবিষ্যতে আপনি ইউরোপীয়ানদের সংস্পর্শে যাবেন না।

 বাঙ্কনীকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম এখন এসব কথা রাখ একটু বিশ্রাম করে নেই তারপর এই বিষয় নিয়েই কথা বলতে পারব। বাঙ্কনীর ঘর হতে বিদায় নিয়ে সহরের দিকে রওয়ানা হলাম। অনেকক্ষণ যাবার পর নির্ধারিত গুজরাতী ভদ্রলোকের বাড়িতে পৌঁছলাম। নিচে দুটি ছেলে বসে ছিল। তাদের কাছে আমার উদ্দেশ্য বললাম। তারা আমাকে তাদের মনিবের কাছে নিয়ে গেল এবং থাকবার ব্যবস্থা করে দিল। আমি তখনও পরিশ্রান্ত ছিলাম। যুবকগণ আমাকে নানারূপ প্রশ্ন করতে ছিল। পরিশ্রান্ত হয়ে কোন কথা বলতে ইচ্ছা করে না সেজন্য বল্‌লাম “আমাকে বকিও না।” যুবকগণ বুঝল আমি পরিশ্রান্ত, বকিয়ে লাভ হবে না। ক্রমাগত কয়েকদিন ভ্রমণ করার জন্য বিছানায় শুয়ামাত্র ঘুম এল। সুখের বিষয় যুবক দ্বয় ঘুমের সময় কোন ব্যাঘাত জন্মায় নাই। দুদিন ক্রমাগত বিশ্রাম করার পর কিছুটা শান্তি পেলাম। তৃতীয় দিন সকাল বেলা সাইকেলখানা ঘসে মেজে পরিষ্কার করার পর পায়ে হেটে শহর দেখতে বের হলাম। কোন রূপ উদ্দেশ্য না থাকলে সাইকেলে ভ্রমণকারী পায়ে হেটে ভ্রমণ করতে রাজি হয় না।

 বুলোবায়ো শহর বড়ই সুন্দর। তিন দিকে পাহাড় একদিকে ঢালু, শহরটি সমুদ্র সমতল হতে বহু ঊর্দ্ধে অবস্থিত থাকায় আবহাওয়া বড়ই ভাল লাগছিল। ইণ্ডিয়ানদের ব্যবসা কেন্দ্র ঢালু ভূমিতে অবস্থিত থাকায় সকালের স্নিগ্ধ শীতল বায়ু দুর্বল শরীরকে সবল করে তুলল। হাটতে বেশ আরাম লাগছিল। নিগ্রো অথবা ইউরোপীয়ান ধরনে ফুটপাতে হাটতে জানতাম এবং তাদেরই অনুকরণে হাটতে ছিলাম। অনেকক্ষণ হাটার পর দেখতে পেলাম মেপ্পা একদিকে দাঁড়িয়ে দোকানের সৌন্দর্য্য দেখছে। সে আমাকে দেখতে পেয়েছিল কিন্তু কাছে এসে কথা বলতে ইচ্ছুক ছিল না, বুঝলাম সে যদি আমাকে পরিচিত বলে স্বীকার করে তবে বিপদের সম্মুখীন হবে সেজন্য আমি তারই কাছে দাঁড়িয়ে দোকানের সৌন্দর্য্য দেখছিলাম। কতকক্ষণ পর সে একদিকে রওয়ানা হল, আমিও তার পেছনে হাটতে আরম্ভ করলাম। কতকক্ষণ হাঁটার পর আমরা শহরের শেষ সীমায় পৌঁছলাম। শহরের শেষ সীমান্তে লোক চলাচল মোটেই ছিল না। মেপ্পা দাঁড়াল এবং বলল “আগামী কল্য সন্ধ্যার পর আপনি এ পথে আসবেন, আমরা আপনার জন্য অপেক্ষা করব। আপনাকে আমাদের গ্রামে নিয়ে যাব এবং যে সকল গ্রামের লোক তাদের দুঃখের কথা আপনার কাছে বলে শান্তি পেতে চাইছে তাদের দুঃখের কাহিনী আপনি দয়া করে শুনবেন।

 “নিশ্চয়ই মেপ্পা। কাল সন্ধ্যার পর আমাকে এই স্থানে পাবে। আমার পরণে কালো বস্ত্র থাকবে। অন্ধকারে মিলিয়ে যাবার পক্ষে সুবিধা হবে। আমার কথা শেষ হবা মাত্র মেপ্পা রাজপথের এক পাশে একটি বৃক্ষের আড়ালে আত্ম গোপন করল। মেপ্পাকে ছেড়ে দিয়ে পুনরায় শহরের দিকে রওয়ানা হলাম। কতকক্ষণ যেয়ে দেখলাম সামনেই একটি ভারতীয় বিদ্যালয়। ভারতীয় ছাত্রগণ তখন খেলছিল। আমাকে দেখা মাত্র তারা খেলা ছেড়ে কাছে আসল এবং পরিচয় চাইল। আমার পরিচয় পেয়ে তারা তাদের মাষ্টারের কাছে নিয়ে গেল। মাষ্টার মহাশয় আমাকে দেখে এমনি একটা ভাব দেখালেন যাতে মনে হল তিনি আমাকে ভাল চোখে দেখছেন না। জয়য়াম সীতারাম বার বার উচ্চারণ করে বললেন “অন্য সময় আসবেন।” আমি আর অন্য সময় যাই নাই, ছাত্রদের কাছেও অভিজ্ঞতার কথা বলা হয় নাই। এই ভদ্রলোকই ধর্ম্ম সম্বন্ধে লেক্‌চার দিবার জন্য অনেক লোককে ডেকে আনতেন কিন্তু পর্য্যটন কাহিনী শোনার কোনও আগ্রহ ছিল না।

 বুলোবায়োর ভারতীয় কংগ্রেস দুটি ভাগে বিভক্ত। একদল আর একদলের লোকের সংগে কথা বলতেও নারাজ। অবস্থা প্রণিধান করে বুঝতে পারলাম এখানে নেতৃত্ব নিয়েই বিবাদ। কে নেতৃত্ব করবে? যারা ধর্ম্ম পরায়ণ অর্থাৎ ধনী ব্যবসায়ী তারা পলিটিক্স বুঝতে রাজি নয়। যে অবস্থায় আছে সে অবস্থাতেই থাকতে রাজি। এর মানে হ’ল নিগ্রো ঠকানো এবং অবসর পেলে ঈশ্বরের নাম কীর্তন করা। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মহাশয়ও ধনীদের মতই পোষণ করতেন। কিন্তু এদের তখনও ধারনা হচ্ছিল না নিগ্রোরা এ অবস্থায় থাকবে না। নিগ্রোরাও বিদ্রোহ করতে সক্ষম হবে। নিগ্রোরা যাতে মাথা না তুলতে পারে সেজন্য ভারতীয় ধনী এবং ধর্মপ্রাণেরা ইউরোপীয়াণদের নানারূপ উপদেশ এবং সাহায্য করে সুখী হত দেখে হাসতাম এবং যে সকল যুবক আমার সঙ্গে দেখা করতে আসত তাদের বলতাম তোমাদের ভবিষ্যত অন্ধকারাচ্ছন্ন, ভারতেই তোমাদের ফিরে যেতে হবে। ভেবোনা নিগ্রোরা চিরকাল অশিক্ষিত থাকবে এবং তোমরা ওদের যথাসর্বস্ব অপহরণ করবে।

 সন্ধ্যা সমাগত। খাওয়া শেষ করেই শহরের বাইরের দিকে পথ ধরে অগ্রসর হলাম। পথে লোক জন নাই। মাঝে মাঝে দু একখানা মোটর কার প্রবল বেগে শহরের দিকে আসছিল। এই মোটরকারগুলিকে বেশ সমীহ করে পথ চলতে হচ্ছিল। এরা যদি ইচ্ছা করেও আমাকে মোটর চাপা দিয়ে যেত তবে কারো কিছু বলার ছিল না। রডেসিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রায় স্থানেই যখন কোনও নিগ্রোকে রাজনৈতিক কাজে বেশ অগ্রসর হতে দেখতে পাওয়া যায় তখন তাকে পথের মাঝে মোটর চাপা দেবার বন্দোবস্ত করা হয়। মেপ্পা আমাকে সে কথাটি বলেছিল। মেপ্পা শ্রেণীর লোক সেজন্য কখনও প্রকাশ্য স্থানে ভদ্র পোষাকে যেত না। মেপ্পার একদিনের পোষাক দেখে আশ্চর্য্যান্বিত হয়েছিলাম। তার পরণে ছিল একটি পরিত্যক্ত হাফ্‌পেণ্ট, হাতে ছিল দুটা মোটা বেতের বালা, পায়ে ছিল বেতের বুট। তাকে দেখলেই মনে হত এই মাত্র জংগল থেকে সভ্য জগতে চলে এসেছে।

 কতকক্ষণ চলার পরই মেপ্পার সঙ্গে দেখা হল। সে আমার হাত ধরে বড় রাস্তা হতে ছোট পথ ধরে চলল। রাত্রে এরূপ পথ চলার অভ্যাস আমার ছিল না, তথাপি চলতে বাধ্য হলাম। কতক্ষণ যাবার পর দেখলাম গণ্ডা কতক যুবক আঁধারে বসে আছে, তাদের কাছে আমিও বসলাম, তারা কেউ উঠে সম্মানও দেখাল না। মেপ্পা তাদের ভাষায় বলল “এই যে দেখছ ভারতবাসী, তিনি পৃথিবী ভ্রমণ করছেন। তার সংগেই আমি আর জব্বো অনেকদিন ছিলাম। তোমরা তাকে দেখতে চেয়েছিলে, তিনি এখন তোমাদেরই মাঝে বসে আছেন। লোকগুলি আরও কাছে এসে অনেকক্ষণ ধরে কি বলল তার একটি কথাও বুঝতে পারলাম না। মেপ্পাকে বললাম “তোমার কাছেই আমার বক্তব্য বলা হয়েছে, এখন আমি যাই, বুলোবায়তে আমার বেশি দিন থাকার ইচ্ছা নাই। সত্বরই এখান থেকে চলে যাব কিন্তু আবার ফিরে আসব। মেপ্পার বন্ধুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে শহরের দিকে চলার সময় মেপ্পা বললে “বানা, রাত্রে শহরে যাবার আমাদের কোন অধিকার নাই, সে কথা নিশ্চয়ই অবগত আছ। অতএব এখান থেকেই বিদায় নিচ্ছি, মেপ্পার দুঃখ দেখে মনে বেশ আঘাত লাগল।

 ইণ্ডিয়াণরা রাত্রে কোথাও যায় না। রাত নয় দশটার সময় তারা শুয়ে থাকে। আমাকে বিলম্বে আসতে দেখে পেটেলের বাটিস্থ সকলেই চিন্তিত হয়েছিল, তারা ভেবেছিল হয়ত আমি পথ হারিয়েছি। ফিরে আসার পর সকলেই জিজ্ঞাসা করল কোথায় গিয়েছিলাম। তাদের কাছে সত্য কথাই বললাম। সত্য কথা শুনে তারা স্তম্ভিত হল। বুলোবায়োর ভারতবাসী নিগ্রোদের সঙ্গে ব্যবসা সংক্রান্ত কথা ছাড়া অন্য কোন কথা বলে না। এদের এই ধরণের খাপ ছাড়া আচার বাবহারে দুঃখিত হওয়া ব্যতিরেকে আর কিছুই করার মত ছিল না। ভিক্টোরিয়া ফলস্ দেখতে যাবার পূর্বে একজন যুবক রডেসিয়াবাসী ইণ্ডিয়ান শিক্ষকের সংগে দেখা হয়। তাঁর পূর্বপুরুষ বিহারের অধিবাসী ছিলেন। তিনি তথা কথিত ছোট জাতের অন্তর্গত। তাঁর কথা কেউ শুনতে রাজি নয়। তিনি মর্মে মর্মে অনুভব করেছিলেন, দক্ষিণ রডেসিয়াতে নিগ্রোদের উন্ননি অতি অশ্চিয়, সেজন্য তিনি নিগ্রোদের সংগেই মেলামিশা করতেন। ইণ্ডিয়ানদের পক্ষে শিক্ষক মহাশয়ের আচার ব্যবহার খারাপ মনে হওয়ায় তাঁকে সমাজ চ্যুত করা হয়। উপায়ন্তর না দেখে তিনি নিগ্রোদের সংগে সমাজ স্থাপন করতে বাধ্য হয়েছেন! এই শিক্ষক মহাশয়ের ভবিষ্যৎ বংশধরগণ কি ভারতদ্রোহী হবে না? নিশ্চয়ই হবে এবং সেই একটি পরিবারের লোক এক লক্ষ এন্‌টি ইণ্ডিয়ান্ ভারবাসীদের যা ক্ষতি করবে তার চেয়ে শেী ক্ষতি করবে।