বিষয়বস্তুতে চলুন

নিগ্রো জাতির নূতন জীবন/ভিক্টোরিয়া ফলস্‌

উইকিসংকলন থেকে

ভিক্টোরিয়া ফলস্

 আগ্রার তাজমহল দেখার জন্য যে কোন আমেরিকানের মন যেমন করে লাফিয়ে উঠে ঠিক তেমনি করে যে কোন ভৌগলিকের পক্ষে ভিক্টোরিয়া প্রপাত দেখার জন্য আগ্রহ হয়। আমার মনেও আগ্রহ হয়েছিল বটে কিন্তু বর্ণ বৈষম্য সেই আগ্রহকে অনেকটা দমিয়ে দেয়। সর্ব প্রথমেই প্রশ্ন উঠে থাকার স্থান। ভিক্টোরিয়া ফলস্ হতে আধ মাইল দূরে একটি প্রকাণ্ড হোটেল আছে। হোটেলটির আয়তন এবং থাকবার বন্দোবস্ত কলিকাতার গ্রেট্‌ ইষ্টার্ণ হোটেলের তিন গুণ কিন্তু সেখানে কোন এশিয়াবাসীকে থাকতে দেওয়া হয় না। ইসমাইলী সম্প্রদায়ের জীবিত পয়গম্বর মহামান্য আগাখান্ ও সে হোটেলে স্থান পান না। আগা খানের নাম বলার কারণ হ’ল তিনি অনেক বারই আফ্রিকায় গিয়েছেন এবং দেখতে পেয়েছেন আফ্রিকাতে ভারতবাসীর অবস্থা কিরূপ সেজন্যই তাঁর নাম এখানে বলা হল। অন্য কোন কারণ নাই। এমতাবস্থায় আমার মত নগণ্য ভারতবাসীর পক্ষে আফ্রিকার বিপদ সঙ্কুল অরণ্যে বাস করে ভিক্টোরিয়া প্রপাত পর্যন্ত বাইসাইলে ভ্রমণ করা সম্ভব ছিল না। মেপ্পা এবং জব্বো বলেছিল ভিক্টোরিয়া প্রপাতের দিকে যাবে না। নূতন সাথী জুটিয়ে নেওয়াও সম্ভব ছিল না। সংবাদ নিয়ে জানলাম ভিক্টোরিয়া ফলস্ হতে চার মাইল দূরে লিভিংক্টোনিয়া নামে একটি গ্রাম আছে। গ্রামটি রেলওয়ে ষ্টেশন কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। সেই গ্রামে অনেক ভারতবাসী বাস করে। চার মাইল দূর হতে প্রত্যহ যদি প্রপাত দেখতে যাই তবে আমার বাসনা পূরণ হতে পারে অন্যথায় ভিক্টোরিয়া প্রপাত দেখা আকাশ কুসুম কল্পনায় পরিণত হবার সম্ভাবনা ছিল।

 লিভিংষ্টোনিয়াতে থাকা ঠিক করে সেখানকার ভারতীয় কংগ্রেসী সেক্রেটারীর কাছে তার যোগে আমার পরিচয় দিয়ে থাকবার স্থানের বন্দোবস্ত করতে বললাম। সেক্রেটারী মহাশয় থাকবার ব্যবস্থা করবেন লিখলেন। তাঁ’র তার পেয়ে সুখী হলাম এবং বুলোবায়ো হতে রেল গাড়ীতে যাবার জন্য টিকিট কিনতে ষ্টেশনে গেলাম। ষ্টেশনের টিকেট বিক্রেতা টিকিটটা আমার দিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল “এই নাও টিকিট, কাল সকাল সাতটায় এসো। টিকিটটা হাতে নিয়ে পেটেলের বাড়ীতে এসে মাথা নত করে বসে থাকলাম। ভাবতেছিলাম এত অপমান কি করে সহ্য করেছি।

 পরের দিন পুনরায় টিকিটটা হাতে করে ষ্টেশনে গেলাম। গাড়ী প্রস্তুত ছিল। দ্বিতীয় শ্রেণীর রিজার্ভ কম্পার্টমেণ্টে বসলাম। এই কম্পার্টমেণ্টে শুধু এশিয়াটিকরাই বসতে পারে। এশিয়াটিক শব্দের ভিন্ন মানে রয়েছে। যারা এশিয়ায় জন্মেছে তারা সকলেই এশিয়াটিক নয়। অনেক ইউরোপীয়াণের ও এশিয়াতে জন্ম হয়েছে এবং তারা বসবাসও করছে, তা বলে তারা এশিয়াটিক নয়, তারা ইউরোপীয়াণ। এশিয়াটিক শব্দটা অনেকটা অসুর, দৈত্য, রাক্ষস ধরণের। ঘৃণ্য লোককে কিছু বলা চাইত, এশিয়াটিক শব্দটা হল সেই ধরণের।

 স্টলে সংবাদপত্র বিক্রি হচ্ছিল। একখানা সংবাদপত্র স্টল হতে টেনে নিলাম। সবাই নিচ্ছিল, আমি নিব না কেন? এতে স্টলের মালিকের রাগ হয়। সে বলল “আমাকে বললেই উঠিয়ে দিতে পারতাম।” লোকটাকে কিছু না বলে দুপেনী ফেলে দিয়ে গাড়ীতে চাপলাম। ঠিক সেই সময় মনে হয়েছিল দেশের কথা। আমাদের দেশেও তথা কথিত এক শ্রেণীর লোক আছে যাদের হীন জ্ঞান ত করা হয়ই উপরন্তু এদেরে মানুষ বলে স্বীকারও করা হয় না। এখানকার ইউরোপীয়ানরাও আমাদের প্রতি সেই অবস্থা করেছে। তারাও এশিয়াটিক অর্থাৎ এশিয়াবাসীদের মানুষ বলে স্বীকার করতে চায় না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “যাদের আজ অপমান করছ, তারা একদিন তোমাদেরই অপমান করবে।” আমার মনে হয় মুষ্টিমেয় ইউরোপীয়ানের বর্বরোচিত শাসন ভবিষ্যতে ফুঁৎকারে উড়ে যাবে।

 গাড়ী ছেড়ে দেবার পরই বয় নানা রকমের খাদ্য নিয়ে এল। কিছুই ফেরৎ দিলাম না। প্লেটের পর প্লেট উজার করে দিয়ে বয়কে বললাম তুমি বাসনগুলি নিয়ে যাও আমি এখম ঘুমাব। “বয় বললে” এখন ঘুমাবেন না, রেল পথের দুদিকে নানারূপ দৃশ্য দেখতে পাবেন, বসে দেখুন। এদেশেত আর আসবেন না। এই বোধ হয় প্রথম আর এই বোধহয় শেষ।

 তাই মনে হচ্ছে বয়।

 বয় ফিরে এল, সে শুধু এশিয়াটিকদের আদেশ পালন করে। কথা প্রসংগে সে বলল “আজ বড়ই খারাপ দিন কারণ আজ আপনি এখানে রয়েছেন!”

 বয়কে জিজ্ঞাসা করলাম “বুলোবায়োর ইণ্ডিয়ানরা কি গাড়ীতে চড়ে না।”

 খুব কম, রেলগাড়ীতে তারা খুব কম ভ্রমণ করে।

 তাদের প্রত্যেকেরই মোটর গাড়ী রয়েছে। তারপরই বয়কে জিজ্ঞাসা করলাম “আমার উপস্থিতিতে আজ কেন খারাপ দিন হল?” বয় আমার কথার জবাব দিল না দেখে মুখ ফিরিয়ে পথের দু’পাশের দৃশ্যবেলী দেখতে মন দিলাম।

 বেলগাড়ীর দু’দিকেই উঁচু-নীচু পর্বতমালা। পর্বত গভীর জংগলে ভর্তি। কোথাও লোকালয় আছে বলে মনে হল না। লোকালয় ছিল রেল ষ্টেশনকে উপলক্ষ করেই। এক যায়গায় দেখলাম মস্তবড় একটা কয়লার খনি। খনিটা রেল ষ্টেশনের কাছে। ইউরোপীয়ানরা সুপারভাইজারের কাজ করছে এবং নিগ্রোরা তাদের হুকুম তামিল করছে। আমি ষ্টেশনে নামিনি, গাড়ীতে বসা অবস্থাতেই খনির দৃশ্য দেখলাম। এখানে একটী রেঁস্তোরাও আছে। রেঁস্তোরায় শ্বেতকায় ছাড়া অন্যান্যের প্রবেশ নিষেধ। তা জানতে পেরেছিলাম বলেই গাড়ী হতে নামিনি। আবার গাড়ী চলল। এবার একটি ইউরোপীয়ান কাছে এসে বসে আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করল। তিনি আমার পরিচয় পেয়ে দুঃখিত হয়ে বললেন “এদেশে ভারতবাসীর কোন সম্মান নাই। লিভিংষ্টোনিয়ার কাছেই ছোট্ট একটি ষ্টেশন আছে। তার নাম হল ভিক্টোরিয়া। ভিক্টোরিয়াতে যে হোটেল আছে তাতে শুধু ইউরোপীয়ানরাই থাকতে পারে। সেখানে যদি আপনি থাকতে পারতেন তবে বড়ই সুবিধা হত। কিন্তু সে সুবিধা হতে আপনারা সবাই বঞ্চিত। ইউরোপীয়ানটিকে জানিয়ে দিলাম “ভিক্টোরিয়া ষ্টেশনে না নেমে লিভিংষ্টোনিয়াতে নামব। সেখানে আমার স্বদেশবাসী অনেক আছে। ভদ্রলোক স্বইচ্ছায় আমাকে তার নামের একখানা কার্ড দিলেন। তার নাম ছিল পেটারসন্। তিনি জাতে ছিলেন ইংলিশ, পেশায় স্বর্ণ খনির সুপারভাইজার। তাঁর মাইনে প্রচুর, মতবাদে কমিউনিষ্ট! কমিউনিষ্ট মতবাদীরা বেশিক্ষণ তাদের মনের ভাব চেপে রাখতে পারে না, সেজন্যই হঠাৎ বলে ফেললেন “এসব বর্ণ-বৈষম্য বেশিদিন থাকবে না, আগত মহাযুদ্ধ অর্থাৎ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরই এসব চলে যাবে।” আমি শুধু বললাম বৃটেন আজ যে অবস্থায় আছে সেই অবস্থায় অনেক বৎসর থাকবে। বৃটেন এবং জাপানের কমিউনিষ্ট পার্টির প্রতি আমার আগাগোড়াই বিদ্বেষ ভাব ছিল। বৃটেনের কমিউনিষ্ট পার্টি নামকাওয়াস্তে অথবা খেয়ালের বশবর্তি হয়ে কমিউনিজম সম্বন্ধে আলোচনা করে বটে কিন্তু অন্তরে অন্তরে তারা ঘোর সাম্রাজ্যবাদী। জাপানী কমিউনিষ্টদের কথাও সেরূপ। জাপানী সম্রাট যেমন ভাবে জাপানী সমাজ কর্তৃক পূজিত হন তেমনি বৃটেনের ইংলিশ রাজারা কমিউনিষ্টদের দ্বারা পূজিত হন।

 বিশ্বমানবের উন্নতি প্রয়াসী বৃটেনের কথায় কোনরূপ শান্তি পেলাম না। তাঁকে সোজা কথায় বুঝিয়ে দিলাম বৃটিশরা যেমনভাবে সুযোগ এবং সুবিধা পাচ্ছে তাতে মনে হয় না তারা কমিউনিজম্ গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। মিষ্টার পেটারসন্ আমার কথা স্বীকার করতে বাধ্য হন। তার উদারতাপূর্ণ বাণী এবং মদের বোতল আমাকে ভোলাতে সক্ষম হয়নি।

 বেলা চারটার সময় গাড়ী ভিক্টোরিয়া ষ্টেশনে থামল। অনেকগুলো শ্বেতকায় যাত্রী নেমে যাবার পর গাড়ী মন্থর গতিতে চলল। মিনিট দুই চলার পর ইঞ্জিন হতে বিপদসূচক ধ্বনি উত্থিত হল। গাড়ী ধীরে ধীরে একটি সেতু পার হল। তারপর পুরাদমে চলে লিভিংষ্টোনিয়া ষ্টেশনে থামল।

 ষ্টেশনটি ছোট। আমাকে নেবার জন্য স্থানীয় কংগ্রেস প্রেসিডেণ্ট, মুসলিম সভার সম্পাদক এবং সহকারী সম্পাদক এসেছিলেন। মিষ্টার নাই ছিলেন হিন্দু মহাসভার সেক্রেটারী এবং কংগ্রেস প্রেসিডেণ্ট। মিষ্টার নাই-এর বাড়ীতে উঠলাম। আদর-আপ্যায়নের অভাব হল না। বিকালের খাওয়াও বেশ ভালই হল। শহরের গণ্যমান্য অনেক লোক দেখতে আসেন। বুলোবায়োতে কংগ্রেস দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে, শুনে সবাই দুঃখিত হল। আমার আসবার কারণ সকলের কাছে বললাম এবং আরও জানালাম, আগামী কল্য সকাল বেলা একখানা সাইকেল দিলেই হবে। সাইকেলে করে প্রপাতটি দেখে আসতে পারব। সাইকেল নেওয়া হবে কি বাসে যাওয়া হবে তাই নিয়েই কথা কাটাকাটি চলছিল। এদের আলোচনাতে বুঝতে পারলাম আমার মত বিদেশীকে তারা স্থানীয় হাঙ্গামায় জড়াতে চান না। অবশেষে মিষ্টার নাইয়ের ছোটভাই বললেন “কুছপরওয়া নেই, আমিই ওঁকে নিয়ে প্রপাত দেখাতে যাব।”

 পরের দিন সকাল বেলা ষ্টেশনে গিয়ে দেখলাম আরও কয়েকজন ভারতীয় লিভিংষ্টোনিয়া যাবার জন্য বাসে বসে আছে। শ্বেতকায় ড্রাইভার বাস ছাড়বে না বলে গো ধরেছে। পুলিশ এরই মধ্যে এসে গেছে। আমিও বাসে বসলাম। আমাকে দেখে আরও অনেক ইণ্ডিয়ান বাসে বসল। বাসের সিট পূর্ণ হয়ে গেল। ড্রাইভার বাস ছাড়তে বাধ্য হল। আমি সকলকে বললাম “আপনারা কয়েকদিন টাকার মায়া পরিত্যাগ করে বাসে যাওয়া আসা করতে থাকুন, দেখবেন শ্বেতকায়রা আপনাদের নিয়ে যাওয়া আসা করতে অভ্যস্ত হবে এবং এদের মন হতে বর্ণ-বিদ্বেষও আপনা হতেই চলে যাবে। আপনারা সর্বদাই শ্বেতকায়দের হতে দূরে থাকেন। সেইজন্যই শ্বেতকায়রাও আপনাদের কাছ থেকে দূরে থাকে।” ঠিক হল পরের দিন থেকে এক গাড়ী লোক ভিক্টোরিয়া প্রপাত দেখতে যাবে এবং পরবর্তী প্রত্যেক গাড়ীতেই দু’একজন করে যাওয়া আসা করবে। এই নিয়ম প্রবর্তন করার জন্য যত অর্থের দরকার হবে, চাঁদা করে উঠাতে হবে এবং শ্বেতকারদের সংগে মেলামেশা করার জন্য নানারূপ উপায় উদ্ভাবন করতে হবে।

 ভিক্টোরিয়া প্রপাত এবং নায়েগ্রা প্রপাত এই দুটাই হল পৃথিবীর সব চেয়ে বড় প্রপাত। অন্য আর একটি প্রপাত নাকি হালে আফ্রিকাতে আবিষ্কৃত হয়েছে। সেই প্রপাত দেখবার সুযোগ আমার হয়ে উঠে নাই। ভিক্টোরিয়া প্রপাত এবং নায়েগ্রা প্রপাতের গঠন একই ধরণের। এখন আমি আফ্রিকার ভিক্টোরিয়া প্রপাতের কথাই বলছি।

 দক্ষিণ রডেসিয়ায় উত্তরদিকে জাম্বেসী নদী বয়ে চলেছে। জাম্বেসী নদীর উৎপত্তি স্থান হতে যে জলধারা বয়ে চলেছে তা ভিক্টোরিয়া প্রপাতের একটু আগে পর্য্যন্ত যে অবস্থাতে থাকে তা অতীব আশ্চর্য্য। প্রশস্থ নদী বক্ষে গ্রেভেল (বড় গোল পাথর) সর্বত্র ছড়ানো। গোল পাথরের নীচ দিয়ে কোথাও কোথাও সামান্য জল ঝির ঝির করে বয়ে যাচ্ছে। নদী বক্ষে প্রায় স্থানেই গুল্ম দেখতে পাওয়া যায়। আবার কোথাও কোথাও ছোট ছোট বৃক্ষের জন্ম হয়েছে। জংলী ছাগল নদীবক্ষে ঘাস ঘায়। বড় বড় বানর নদী বক্ষের বড় বড় পাথরের উপর বসে ছোট ছোট মাছ ধরার জন্য ধ্যানে বসে। বক এবং সারস জাতীয় পাখী নদীবক্ষে দিনের বেলায় অনবরত আসা যাওয়া করে। এই ত হল নদীবক্ষের অবস্থা। তারপর নদীটা যতই নিম্নগামী হয়েছে ততই খরস্রোতে পরিণত হয়েছে। ইচ্ছা করলে যে কোন লোক সেই স্রোতে নির্বিঘ্নে স্নান করতে পারে। অনেক সময় এই স্রোতের জলে অনেক বন্য ছাগল পড়ে যায়। নদীর স্রোত তাদের প্রপাতে টেনে নিয়ে যেতে পারে না, ছাগল সাঁতার কেটে ওপারে চলে যায়। এই দুই শত হাত দূরেই হল প্রপাত।

 প্রপাত থেকে ক্রমাগত ধূমের আকারে উপরের দিকে জল উঠে মেঘের সৃষ্টি করে। বাস্তবিক পক্ষে দুই শত হাত দূরে থেকে বুঝা যায় না যে কাছেই এত বড় প্রপাত রয়েছে। নদীর বক্ষস্থল দেখার পর পূর্ব কথিত রেলওয়ে ব্রিজের উপর গিয়ে দাঁড়ালাম। রেলওয়ে ব্রিজের দুপাশে মোটর রোড্ রয়েছে। মোটর রোডের উপর দাঁড়িয়ে দেখলাম প্রপাতটি দুভাগে বিভক্ত। কত হাত নীচে জল পড়ছে তার মাপ রডেসিয়া সরকার এখনও নেন নাই। বোধ হয় দরকারও মনে করেন না! দূর থেকে দাঁড়িয়েই অনুমান করলাম প্রপাতের গভীরতা দুই শত ফুটের কম হবে না। যদি দুই শত ফুট হয় প্রপাতের গভীরত্ব তবে ভিক্টোরিয়া প্রপাত এত বিপজ্জনক কেন? জাম্বেসী নদীর উপরের দিকে প্রচুর জল জমা রয়েছে। তাতে নৌকা চলাচল করে কিন্তু যে স্থানে ভিক্টোরিয়া প্রপাত হয়েছে তার উপরের দিকটাতে পাথর জমা হয়ে যেন একটা বাঁধ দেখাছে। পাথরের বাঁধে ছিদ্র রয়েছে। সেই ছিদ্র দিয়ে জল হঠাৎ প্রপাতে পড়ার জন্যই ভিক্টোরিয়া প্রপাত এত বিপজ্জনক।

 পূর্বেই বলেছি ভিক্টোরিরা প্রপাত এবং নায়েগ্রা প্রপাতের উৎপত্তি একই ধরণের। অগভীর জলস্রোত ক্রমাগত চলতে থাকে। পরে সাগরে অথবা অন্য নদীতে, নয় কোথাও হ্রদে গিয়ে পতিত হয়। এখানে নদীর জল ধরাস্ করে নীচে পড়ে প্রপাতের সৃষ্টি করে বড় নদীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। এরূপ হবার কারণ কি? যদিও বিষয়টি ভৌগলিক জ্ঞাতব্য বিষয় তবুও ভ্রমণ কাহিনীরূপে পাঠকদের এ বিষয়ে একটু জেনে নিলে দোষ কি।

 অনেক সময় দেখা যার পাহাড় পর্বত ধ্বসে পড়ছে। লোকে বলে ধ্বসে পড়ছে, সেজন্য আমরাও বলি ধ্বসে পড়ছে। কিন্তু কেন ধ্বসে পড়ে তা আর আমরা জানতে চাইনা। পাথর অনেক সময় পচে। সেই পচা পাথর যখনই বড় বড় পাথরের ভার সহ্য করতে পারে না তখনই খসে পড়ে। ছোট ছোট নদী পাহাড় হতেই জন্ম নেয়। তাদের তলদেশে সকল সময় কঠিন পাথর থাকে না। যদি পঁচা পাথর থাকে তবে সেই পঁচা পাথরের ভেতর দিয়ে জল নীচে নেমে যায় এবং জলের গভীরতা বাড়ে। কিন্তু ভিক্টোরিয়া প্রপাতের মত প্রপাত সৃষ্টি করতে পারে না। যখনই কোনও পচা পাথরের লহর অনেক দূর চলে গিয়ে হঠাৎ নিম্নস্থানের কাছে গিয়ে শেষ হয় তখনই ভিক্টোরিয়া অথবা নায়েগ্রা প্রপাতের মত প্রপাত সৃষ্টি করতে পারে। জাম্বেসী নদীর প্রথম রেখাটা ঠিক সেরূপ অবস্থায় পৌঁছুতে পেরেছিল বলেই আজ আমরা ভিক্টোরিয়া প্রপাত দেখতে পাচ্ছি। প্রপাপ এবং প্রস্রবনে অনেক প্রভেদ রয়েছে। সেদিকেও পাঠকদের লক্ষ্য রাখা চাই। যে জলরাশি কোনও পর্বতের উপর হতে ঝম্‌ঝম্ করে নিম্নস্থানে পড়ে তাকে বলা হয় প্রস্রবন। প্রপাত সেরূপ নয়। প্রপাত নদী হ’তে জন্ম নিয়ে নদীতেই পতিত হয়।

 প্রাকৃতিক দৃশ্য এক-দু’ ঘণ্টায় দেখা যায় না। প্রথম দিনটা ত গেল হট্টগোল করেই। দ্বিতীয় দিন সকাল বেলা বাসে না গিয়ে সাইকেলে করেই প্রপাতের কাছে চলে গেলাম। আমার পৌঁছার পূর্বেই একদল ভারতবাসী বাসে করে প্রপাতে পৌঁছে গিয়েছিল। দেশবাসীদের সংগে নিয়ে হোটেলে রওয়ানা হলাম। আমাদের যাবার কতক্ষণ পরই দেখলাম হোটেলের ম্যানেজার দৌড়ে আসছেন। তিনি এসেই বললেন হোটেলে লোকে লোকাকীর্ণ আপনাদের স্থান সেখানে হবে না। আমি তাকে বললাম “মশাই হোটেলে স্থান চাই না হোটেলটা দেখতে চাই মাত্র।” হোটেল-ম্যানেজার আমাকে সংগে করে নিয়ে বম্বের তাজমহল হোটেল সদৃশ একটি বাড়ীর সামনে উপস্থিত হয়ে বললেন এখানে শুধু থাকার জন্য একুশ শিলিং চার্জ করা হয়। খাবারের দাম পৃথক দিতে হয়। পৃথিবীতে অনেক সুন্দর বাড়ী দেখেছি কিন্তু লিভিংষ্টোনিয়া হোটেলের মত মস্তবড় বাড়ী খুব কমই দেখতে পাওয়া যায়। চারদিকে দিগন্তব্যাপী উপবন। তারই মাঝে রূপার সূতার মত নদীগুলি বয়ে যাচ্ছে দেখতে পাওয়া যায়। হোটেলটি উচ্চস্থানে অবস্থিত বলে সকল সময়েই ঠাণ্ডা সমীরণ বইতে থাকে। সেই ঠাণ্ডা সমীরণে ভাবুক অনেক সময় ভেরে ভেবেই দিন কাটিয়ে দিতে পারে।

 ফেরার পথে দেখা হল একজন নিগ্রোর সংগে। সে আমাদের একটা মরা সিংহ দেখাতে নিয়ে গেল। এতবড় সিংহ আর কখনও দেখিনাই। সিংহটাকে এক বৈমানিক উপর থেকে মেসিনগান দিয়ে হত্যা করেছিল। নিকটস্থ বিমান ঘাঁটিতে গিয়ে বৈমানিক সংবাদ দেয় এবং নিগ্রোরা মৃত সিংহ বন হতে খুঁজে বের করে হোটেলের সামনে রেখেছে।

 একজন ভারতীয় প্রস্তাব করলেন “আপনি সিংহটার কাছে দাঁড়ান আর আমরা ফটো উঠাই। আমি তাতে রাজি হলাম এবং ফটো উঠান হল। পরে ভারতীয় বন্ধুগণ বলল, “দেশে গিয়ে বলবেন আপনি এই সিংহটাকে হত্যা করেছেন। এতে আপনার বইয়ের বেশ কাটতি হবে। ওদের কথায় উত্তর দেইনি বটে কিন্তু এদের কেন যে এত হীন প্রবৃত্তি জেগেছিল তাই আমি কয়েকদিন ক্রমাগত ভেবেছিলাম। এক শ্রেণীর পাঠকও আবার ইত্যাকার আজগুবি গল্প চায়। কিন্তু এরূপ দুষ্ট গল্প ভ্রমণ কাহিনীতে না দিয়ে উপন্যাসে দিলেই ভাল হয়। আমার চীন ভ্রমণে বারংবার আমি ডাকাত শব্দটি ব্যবহার করেছি। তখনকার দিনে প্রগতিশীলদের অপর নাম ডাকাত ছিল। তা ক’জন জানতেন? আমিও প্রগতিশীল শব্দটি ব্যবহার না করে আইন বাঁচিয়ে নিজের কাজ সমাপ্ত করেছি, সেকথাটা ক’জন অনুধাবন করেছেন। পাঠকবর্গের দু’ পংক্তির মধ্যে তৃতীয় পংক্তি খুঁজে বের করার শক্তি ক’জনারই বা আছে!

 ঠিক বেলা এগারটার সময় দেখলাম একদল ইউরোপীয়ান ভিজা কাপড়ে হোটেলে ফিরছে। আকাশে মেঘ নাই অথচ তারা বৃষ্টিতে কি করে ভিজ্‌ল বুঝতে পারলাম না। কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে তারা যেদিক থেকে আসছিল, আমিও সেদিকে গেলাম। কতক্ষণ যাবার পরই লিভিংস্টোনের পিতল মূর্তি দেখতে পেলাম। মুর্তিটির পরিমাণ লিভিংস্টোনের জীবিতাবস্থার সম আকৃতি। লিভিংস্টোনের আকৃতিতে মহানুভবতার বেশ একটি ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। এই মূর্তিটি দেখার জন্য বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে না থেকে আরও এগিয়ে গেলাম।

 সামনেই প্রবল ধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। অথচ একটু দূরে থেকেও সেই মহান দৃশ্যের সন্ধান পাওয়া যায় না। স্থানটি বৃক্ষরাজিতে আবৃত বলেই কাছের জিনিসও দেখা যায় না। বৃষ্টিকে অবজ্ঞা করে আরও এগিয়ে গিয়ে দেখলাম প্রবল ধারায় জল নীচে পড়ছে। জল নীচের দিকে পড়ার সময় ভয়ঙ্কর শব্দ করছিল। সেই শব্দ কানে অত্যন্ত যন্ত্রণা দিচ্ছিল। সংগে তূলা ছিল না। রুমাল ছিঁড়ে ভিজিয়ে তাই কানে গুজে দিলাম। কানের ব্যথা কমল। আরও এগিয়ে দেখলাম যেখানে জল পড়ছে সেখান হতে ছিটকে উপরের দিকে উঠছে এবং পুনরায় বৃষ্টির আকারে নীচের দিকে নেমে আসছে। আশে-পাশে নানা রকমের গাছ গাছে টিন্ প্লেটে নানা ইউরোপীয়ান ভাষায় “সাবধান” লেখা ছিল। এশিয়ার কোন ভাষায় সাবধান লেখা ছিল না। এরপর কি চিন্তা করছিলাম তার একটি কথাও মনে নেই।

 কতক্ষণ যে দাঁড়িয়ে ছিলাম বলতে পারি না। হঠাৎ একজন লোক আমার মুখে একটি জ্বলন্ত সিগারেট গুজে দিয়ে বলল চলুন মশায়, এবার বাড়ী যাই—আমিও লিভিংষ্টোনিয়া যাব। সিগারেট টানতে বেশ আরাম বোধ করছিলাম, কিন্তু নড়তে পারছিলাম না। হাত পা ঠাণ্ডা হয়েছিল। আগত লোকটি আমার দুর্দশা দেখে বলল ভয়ের কোন কারণ নেই আমিই আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি বলেই সে আমাকে কাঁধে উঠিয়ে জংগলের বাইরে আনল। সেখানে কয়েকজন ভারতীয় দাঁড়িয়েছিল। তারা বোতল হতে ব্রাণ্ডি আমার মুখে ঢেলে দিল। চলবার শক্তি হল না তবে দাঁড়াবার শক্তি হল।

 নিয়ম রয়েছে যখন কোন লোককে প্রপাতের কাছে দেখা যায় তৎক্ষণাৎ তাকে ডাকতে নেই। পাশেই পুলিশ থাকে। পুলিশ জানে কি করে তন্ময় লোকটিকে ডাকতে হয়। ভারতীয়রা আমার দেরী দেখে আমায় খুঁজে বের করে এবং আমার তন্ময় অবস্থা দেখে পুলিশ ডেকে আনে। পুলিশের পোষাক ভদ্রলোকের মত থাকে। সাহায্যপ্রাপ্ত লোকটি মনে করে কোনও সদাশয় লোক তাকে সাহায্য করছেন অথবা সাহায্য করবেন। অনেকে পুলিশ দেখেও থতমত খেয়ে যায়, অনেকের জ্ঞানও লোপ পায়। পরিষ্কার স্থানে অনেকক্ষণ দাঁড়ালাম, তারপর শরীরে চেতনা হলে শহরের দিকে রওয়ানা হলাম।

 পরের দিন সকাল ন’টার সময় আবার সেস্থানে গেলাম। দেখলাম ইউরোপীয়ানরা একটা প্রকাণ্ড বানরকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। বানর তখনও মরেনি। একজন ইউরোপীয়ান তার হাতের কেতলী হতে একটু ব্র্যাণ্ডি বানরের মুখে ঢেলে দেবার কয়েক মিনিট পর বানরটা সজ্ঞানে এল এবং একটু এদিক সেদিক চেয়েই এক লাফ দিয়ে জংগলের দিকে পালিয়ে গেল। এরূপ করে অনেক বানও নাকি এখানে মরে। এসব স্থানে কেউ একাকী যায় না। যারা একাকী যায় তারা নানারূপ বিপদে পড়ে।

 যদি তন্ময় হবার কোনও স্থান থাকে তবে ভিক্টোরিয়া প্রপাতের তীরদেশ। আমেরিকার নায়েগ্রা প্রপাতের কাছে সেরূপ স্থান নাই। যে সকল ভারতবাসী মনটাকে চিন্তাশূন্য করতে চান তাদের বলি তারা যেন ভিক্টোরিয়া প্রপাতের কাছে যান। মুক্ষ অনিবার্য। আধ্যাত্মিকতার জয় জয়।

 ইউরোপীয়ানরা যতক্ষণ ছিল আমিও ততক্ষণ তাদের সংগেই ছিলাম। তারা যখন হোটেলে ফিরে গেল আমি সেই স্থান পরিত্যাগ করে প্রপাতের জল যেদিকে বয়ে যাচ্ছে সেদিকে রওয়ানা হলাম। কয়েক মাইল যাবার পর সামনে পড়ল একটা মস্তবড় বন। বনে প্রবেশ করতে ইচ্ছা হল না, ফিরে আসলাম।

 লিভিংষ্টোনিয়াতে ফিরে আসার পর অসুস্থতা অনুভব করায় শুয়ে ছিলাম। আমাকে অসুস্থ দেখে একজন ইণ্ডিয়ান, তাদের জন্য নির্দ্ধারিত বিয়ারের দোকানে নিয়ে গেল। দোকান ইউরোপীয়ানদের দ্বারা পরিচালিত। যে সকল ভারতীয় পুরুষ ইউরোপীয়ান পোষাক পড়েন এবং যে সকল ভারতীয় মহিলা শাড়ী ব্যবহার করেন শুধু তারাই এই বিয়ারের দোকানে প্রবেশ করতে পারেন। ইউরোপীয়ানের ব্যবহার খুবই ভাল। ঘরও বেশ পরিষ্কার। নারীদের বসার স্থান পৃথক রয়েছে বটে কিন্তু ইচ্ছা করলে একত্রেও বসতে পারেন।

 বিয়ারের সংগে চাটন স্বরুপ অন্য কিছু কিনতে পাওয়া যায় না। খাঁটী ইউরোপীয়ান ধরণে দোকান পরিচালিত হয়। যদি কোন ইণ্ডিয়ান মাতাল হয়ে কোনও স্ত্রীলোককে আক্রমণ করে তবে মাতালকে বাড়ীতে পৌঁছে দেবারও ব্যবস্থা রয়েছে। মদের দোকানে ঢোকার পর আমার মনের পরিবর্তন হ’ল। অবুঝ ভারতবাসীর কাছ থেকে সবাই অর্থ ছিনিয়ে নিতে পারে কিন্তু সভ্যতার দিকে একটুও এগিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে না। লিভিংষ্টোনিয়ার বিয়ার ব্যবসায়ী কিন্তু সেরূপ লোক নয়। সে ভারতবাসীকে বিপথগামী করতে রাজি নয়। আমার মন্তব্য শুনে অনেকেই বলবেন স্ত্রী-পুরুষ মিলে কি বিয়ার খাওয়া ভাল দেখায়? যারা সিমেটিক সভ্যতার মোহে মোহিত তারা আমাকে এ বিষয়ে ক্ষমা করবেন। স্ত্রীলোকের মর্যাদা সিমেটিকরা কখনও দেয় নাই। আমরা সেই সভ্যতায় অন্ধ হয়ে রয়েছি। অতএব স্ত্রী-পুরুষ মিলে বিয়ার খাওয়া আমাদের কল্পনাতীত।

 সকাল বেলা আবার প্রপাতের দিক রওয়ানা হলাম। পথ চলতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। নদী তীরে অনেকক্ষণ বসে থাকলাম। জাম্বেসী নদীও সুন্দর। অনেকক্ষণ নদী তীরে বসে প্রপাতের কাছে গেলাম। সেখানে বেশিক্ষণ বসলাম না কি জানি নির্বান পেয়ে যাই। যারা মনকে চিন্তাশূন্য করার জন্য নানারূপ প্রাণায়াম করেন তাদের আমরা কত সম্মান করি, খাদ্য সংগ্রহ করে দেই এবং ভাবি প্রাণামামকারী আমাদের চেয়ে কত উন্নত। সেই দুর্লভ শক্তি এখানে পাঁচ মিনিটেই আয়ত্ব হয়।

 প্রপাতের বহুদূরে নানাস্থানে কুঞ্জবন রয়েছে, সেই কুঞ্জবনে অনেক ইউরোপীয়ানকে ধ্যানস্থ অবস্থায় দেখলাম। একটি লোককে ঠেলা দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম “এরূপ ভাবে থাকবার মানে?” অবশ্য সেজন্য বারবার ক্ষমা চাইতে হয়েছিল। ইউরোপীয়ান বললেন এসব স্থানে বসে থাকলে মন চিন্তাশূন্য হয়। আহার নিদ্রার উদ্রেক থাকে না সেজন্যই বসে আছি। “ধন্যবাদ মশাই” এই বলেই সেখান হতে বিদায় নেই।

 পৃথিবীর সর্ববৃহৎ একটি প্রপাত দেখতে পেরেছি বলে মনে বেশ আনন্দ হল। চতুর্থ দিন সকাল বেলা লিভিংষ্টোনিয়ার ভারতবাসীর কাছে বিদায় নিয়ে যখন পুনরায় গাড়ীতে বসলাম তখন মনে হল হয়ত আর এখানে আসা হবে না।

 আবার সেই বংশীধ্বনি। বংশীধ্বনি বিপদ সংকেত জ্ঞাপক। বুঝতে পারলাম ভিক্টোরিয়া প্রপাতের ব্রিজের কাছে গাড়ী এসেছে। খিড়কী দিয়ে মাথা বের করে তাকালাম। পুমরায় নয়ন ভরে সে দৃশ্য দেখলাম। গাড়ী মন্থর গতিতে ব্রিজ পার হয়ে পুরাদমে চলতে থাকল। নিমেষে ভিক্টোরিয়া প্রপাত অদৃশ্য হল। দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করে দৃষ্টি ফেরালাম।

 কতক্ষণ চলার পর দেখতে পেলাম গাড়ী থামল এবং একটি নিগ্রোকে গাড়ী হতে টেনে নামিয়ে দেওয়া হ’ল। নিগ্রোটা ভুল করে বিপদ হতে রক্ষা পাবার অস্ত্র ছোড়া নিয়েই গাড়ীতে উঠেছিল। আফ্রিকাতে প্রত্যেক নিগ্রো, আরব, সোমালী একখানা করে ছোড়া সংগে নিয়ে পথ চলে। ইউরোপীয়ান এবং ইণ্ডিয়ানরাই সংগে ছোরা রাখাটা বর্বরতার লক্ষণ বলে মনে করে। সেজন্য শহরের মধ্যে, রেলগাড়ীতে কাউকে ছোরা রাখতে দেওয়া হয় না। নিগ্রো লোকটিকে যখন বুঝিয়ে বলা হল রেলগাড়ীতে ছোড়া নিয়ে চলতে নেই তখন সে দু’ তিনবার তার জাতীর নৃত্য করে কোমড় হতে বেল্ট সমেত ছোড়াটা ফেলে দিল এবং হাসতে হাসতে আবার গাড়ীতে উঠল। নিগ্রোদের যদি কিছু বুঝিয়ে বলা হয় এবং সে তা বুঝতে সক্ষম হয় তবে সে গা ঝাড়া দিবেই এবং একটু নৃত্যও করবেই। তারপর সে উপদেশ অনুযায়ী কাজ করবে। এটা হল তাদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য। যারা সভ্য হয়েছে তারা এখনও সেই বৈশিষ্ট্য পরিত্যাগ করতে পারে নাই। উপদেশ দেবার সময় উর্দ্ধে চোখ উঠিয়ে পরে চারদিক চেয়ে যে উপদেষ্টা উপদেশ দেয়। তার উপদেশ অনুযারী যারা কাজ করে তারা কিরূপে তাকে অনুসরণ না করে থাকতে পারে?

 গাড়ী চলছে বুলোবায়োর দিকে। সভ্যতা সেখানে আছে সেজন্য সবাই সেখানে পৌঁছবার জন্য উদ্‌গ্রীব। যে সকল ইউরোপীয়ান জংগলে থেকে বেশ মোটা টাকা অর্জন করেছে তারা বুলোবায়ো পৌঁছার জন্য অস্থির হয়েছে। অনেকেই গান ধরেছে। প্রত্যেক ষ্টেশনে ষ্টেশনে তারা আনন্দসূচক ধ্বনি করছে! এতে আমার ঘুমের যদিও ব্যঘাত হচ্ছিল তবুও এদের আনন্দ দেখে আমিও আনন্দিত হয়েছিলাম।

 বুলবায়োতে ফিরে এসে পেটেরে বাড়ীতেই আশ্রয় নিতে বাধ্য হরেছিলাম। জাম্বাবী ধ্বংসস্তূপ দেখবার জন্য মন বড়ই উথলা হয়ে উঠেছিল। জাম্বাবীতে পৌঁছে কোথায় থাকব, কি দেখব এসব কথাই চিন্তা করতাম এবং সে সম্বন্ধে লোকের উপদেশ সংগ্রহ করতাম। এদিকে জব্বৌ কোথায় এবং কি করছে সে কথা একবারও মনে হচ্ছিল না। সকাল বেলা ট্রেনে উঠব এমনি সময় একটি নিগ্রো আমার পাশ কেটে যাবার সময় একখানা পত্র পকেটে গুঁজে দিয়ে গেল। পত্রে লিখা ছিল, “বুলোবায়ো হতে বিদায়ের পূর্বে পুনরায় যেন দেখা পাই, দক্ষিণ রডেসিয়া সরকার আমাদের নির্বংশ করতে বসছে।” পত্রখানা পকেটে রেখেই গাড়ীতে বসতে হল।