বিষয়বস্তুতে চলুন

নিগ্রো জাতির নূতন জীবন/রডেসিয়ার পথে প্রান্তরে

উইকিসংকলন থেকে

রডেসিয়ার পথে প্রান্তরে

 ইতালীর ইণ্ডিয়ানদের সংগে তিন দিন কাটিয়ে চতুর্থ দিন দক্ষিণ রডেশিয়ার পথে বের হলাম। দক্ষিণ রডেসিয়ার পথ বড়ই সুন্দর এবং উপভোগ্য। দুটা পিচ্ দেওয়া ষ্ট্রেপ্ কালো সাপের মত একেবেঁকে এগিয়ে চলছে। পথের দুদিকে কোথাও গভীর অরণ্য আর কোথাও সাজানো বাগান। লোকের বসবাস যদিও নেই তবুও পথের দুদিকে গোলাবাড়ীর নিদর্শন স্বরূপ সরু তারের বেড়া রয়েছে। এরূপ পথ পেলাম মাইল দশেক। তারপর এসব ছিল না, শুধু পথটিই একেবেঁকে চলছিল। পথের দু’পাশে বন উপবন দূরে দূরে ছিল। স্থানীয় সরকার পথের দুপাশের বন জংগল কেটে পরিষ্কার রাখছিল। বন জংগল কেটে যদি পরিষ্কার না রাখত তবে বনের হিংস্র জীব দিনের বেলায়ই পথিককে আক্রমণ করত। এরূপ জনমানবহীন পথ পেলাম তেইশ মাইল। ক্রমাগত তেইশ মাইল পথ চলে একটু হয়রাণ হয়েছিলাম কিন্তু ওডি ব্রিজ নামক স্থানে আসার পরই শরীরের অবসাদ দূর হল।

 কলকল করে একটি সুন্দর নদী বয়ে যাচ্ছিল। নদীর নাম OEZI BRIDGE। স্থানীয় লোক ODZI কথাটাকে ওডি উচ্চারণ করে সেজন্য আমিও ওডিই উচ্চারণ করলাম। ওডি শব্দের মানে হল “আসতে পারি কি?”

 সেতুটি পার হবার পর নদী তীরে অনেকক্ষণ বসলাম। সাধারণত কোথাও বসে থাকতে ভালবাসতাম না, গন্তব্যস্থানে পৌঁছে বিশ্রাম করাই ছিল আমার অভ্যাস, কিন্তু সেতুর পার্শ্বের প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী আমাকে আকর্ষণ করেছিল। সেজন্যই বসতে বাধ্য হয়েছিলাম। ভাবছিলাম এমন সুন্দর দৃশ্য ভারতের কোন কোন স্থানে দেখতে পাওয়া যায়। মনে হল মাতৃভূমিতে চৈত্র মাসের কথা, বৃক্ষরাজি তখন নব পল্লবে শোভিত হয়, নানা রকমের পাখী তখন সুমধুর রাগিনীতে গান করতে থাকে। কোকিল কুহু কুহু স্বরে ডাকে। এখানে এসেও কোকিলের ডাক শুনলাম, কোকিলের ডাক আমাকে বসিয়ে রেখেছিল। সব ভুলে গিয়েছিলাম, হঠাৎ মনে হল আমি অবাস্তবী ভাবপ্রবণ। তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালাম, কিন্তু যাই কোথায়? আজ ত আমাকে এখানেই থাকতে হবে। নিগ্রোদের গ্রাম পথের কাছে কোথাও ছিল না। নিগ্রোরা যে-সকল গ্রামে থাকে সে-সকল গ্রামে সাইকেল নিয়ে যাওয়া চলে না। পথের পার্শ্বে কয়েকটি নিগ্রোর সংগে দেখা হল। তারা অনর্গল ইংলিশ বলতে পারত। তাদের মধ্যেই একজন শ্লেষ করে বলল “বানা (নিষ্টার) তোমরা আমাদের সংগে থাকতে ভালবাস না আবার শ্বেতকায়রাও তোমাদের দেখতে পারে না। যদিও আমাদের গ্রাম এখান হতে বহুদূরে তথাপি তোমাকে আমাদের গ্রামে নিয়ে যেতান, কিন্তু নিব না। পাশের শ্বেতকায় লোকটির বাড়ীতে রেখে আসব। এক রাত এদের সংগে কাটাও বেশ জ্ঞান হবে, চল নিয়ে যাই। নিগ্রো লোকটির কথায় প্রতিবাদ করলাম না। তার সংগে চললাম। কতক্ষণ চলার পর সে আমাকে একজন শ্বেতকায় লোকের বাড়ী দেখিয়ে দিল। শ্বেতকায় লোকটি জাতে বুয়র। তার বাড়ীর কাছে যেয়ে দেখলাম বাড়ীর চারদিক কাটাওয়ালা লোহার তার দিয়ে ঘেরা। অতিকষ্টে সাইকেলটা লোহার তার পার করে যখন ঘরের কাছে আসলাম তখন একটা মস্ত বড় কুকুর ঘেউ ঘেউ করে আমাকে সম্বর্দ্ধনা করল। কুকুরের ভয়ে ভীত না হয়ে কুকুরের মাথায় হাত দিয়ে একটু আদর করা মাত্র কুকুরটি ঠাণ্ডা হল। ইতিমধ্যে একটি যুবক এসে আগেই নমস্কার জানিয়ে জিজ্ঞাসা করল “কি চাই?”

 বুয়র যুবককে সাধারণ ভাষায় বললাম “আজ রাত তোমাদের বাড়ীতে থাকতে চাই, পথ দেখিয়ে নিয়ে চল ত। তাদের বাড়ীতে রাত্রে থাকতে পারব কি পারব না সে সম্বন্ধে কোন চিন্তা না করেই যুবক বলল “এদিকে আসুন come this way Sir।” বুবকের “স্যার” কথাটা শুনে আমার মন অনেকটা শান্ত হল। এগিয়ে চললাম, কুকুরটা আমাদের পেছনে চলল, অবশেষে যখন আমরা বুয়র যুবকের বাড়ীতে পৌঁছলাম তখন তার বাবা অতীব অভদ্রভাবে ঘরের বারান্দায় যেতে বললে। বারান্দায় উঠে নিজের পরিচয় দিলাম। একটু বসার পরেই ভদ্রলোকের স্ত্রী এক পেয়ালা কাফি খেতে দিলেন। কাফির পেয়ালা হাতে করে একখানা চেয়ারে বসলাল, এতে বুয়রের মনের পরিবর্তন হল। তার মনের ভাব বুঝে চেয়ার হতে উঠতে যাচ্ছি এমন সময় বললে “এখন বসতে পারেন কিন্তু অন্য কোন ভদ্রলোকের সামনে আপনাকে বসতে দিতাম না, কারণ হাজার হউক আপনি একজন “কুলি!”

 দক্ষিণ আফ্রিকার লোকের ভাষায় সকল ভারতবাসীই কুলি। সেখানকার শ্বেতকায়দের গুজরাতী মুসলমানেরা বুঝাতে চেয়েছিলেন তারা মুসলমান কুলি নন। বুয়রগণ সেকথা বুঝতে চেষ্টা না করে পেগিং বিল পাশ করেছে এরপরে আরও বিল পাশ করবে। কেউ তাতে বাঁধা দিতে পারবে না এবং বাধা দেওয়া সম্ভবও হবে না। যারা ধর্মের মাপকাঠি দিয়ে জাতের নির্ণয় করতে চায় তাদের ভাগ্যে এরূপ দুঃখের কালিমাই বিদেশীরা লেপে দেয়। কোনও তুরুক আরব অথবা ইরাণী নিজেদের মুসলমান বলে পরিচয় দেয় না, শুধু ভারতের লোকই ধর্মের নামে নিজের জাতের পরিচয় দেয়।

 যে মুহূর্তে বুয়র ভদ্রলোক আমাকে কুলি বলে সম্বোধন করলে সেই মুহূর্তে আমার পা হতে মাথা পর্যন্ত একটা বিদ্যুত বয়ে গেল তারপরই মন আবার শান্ত হল, মনে হল হাওড়া আর শিয়ালদহ ষ্টেশনের কুলির কথা। তারা কি আমাদের পর? তারা আমাদের পর না হলেও তাদের আমরা নিজের লোক ভাবি না। যেদিন আমারা কুলিদের টেনে উঠাতে পারব সেদিন দক্ষিণ আফ্রিকার বুয়রদের বলতে পারব “তোমরা আমাদের কুলি বল আর যা ইচ্ছা তাই বল, আমাদের দেশের মানুষের আত্মসম্মান আছে, প্রচুর খেতে পাচ্ছে, শুইবার সুন্দর ঘর আছে।”

 মনের কথা মনেই থাকল বুয়র লোকটীর সংগে কথা আরম্ভ হল, দেখলাম লোকটীর মন পরিষ্কার, গোপন রেখে কোন কথাই বলছে না। কথার মধ্যে আমার প্রতি উদ্দেশ করে “স্যার” শব্দটীও মাঝে মাঝে ব্যবহার করছে।

 কথা প্রসংগে বুয়র লোকটীকে জিজ্ঞাসা করলাম “আপনার দেশ হল দক্ষিণ আফ্রিকাতে, এদেশে কি করে রেল কোম্পানীর ঘর পেলেন?”

 বুয়র ভদ্রলোক হেসে বললে “ওহো সে-কথা, রডেসিয়া এখনও দক্ষিণ আফ্রিকার মত সমৃদ্ধিশালী হয় নাই, এদেশের রেলপথ দক্ষিণ আফ্রিকার মূলধনে পরিচালিত হয় এবং সেজন্যই আমরা এদেশে চাকরী পেয়ে থাকি। রডেশিয়াতে যদিও ডোমিনিয়ন ষ্টেটাশ রয়েছে তবুও দেশটীর দক্ষিণ আফ্রিকার উপর অনেক কিছু নির্ভর করে। এই ধরুন দেশরক্ষা। রডেশিয়াতে পল্টন নাই। এই যে দেখছেন নিগ্রোরা আমাদের চারিপার্শ্বে বসে রয়েছে এরা কি কম, পারলে মানুষের মাংস পর্যন্ত খেতে চায়। এদের যদি সায়েস্তা করে রাখতে হয় তবে দক্ষিণ আফ্রিকার সামরিক সাহায্য নিতে হবেই।

 এদেশের নিগ্রোরা কি মানুষের মাংস খায়? প্রশ্নটী জিজ্ঞাসা করেই বুয়র ভদ্রলোকের দিকে চেয়ে থাকলাম।

 তিনি বললেন এরা সবই খেতে চায়, মানুষ হত্যা করে সারতে পারে না বলেই মানুষের মাংস খায় না।

 বুঝতে পারলাম বুয়র ভদ্রলোক নিগ্রোদের প্রতি হাড়ে হাড়ে চটা, সেজন্য তিনি তাদের বিরুদ্ধে এরূপ মন্তব্য করতে কোনরূপ দ্বিধা করছেন না।

 বুয়র লোকটির সংগে কতক্ষণ কথা বলার পরই সন্ধ্যা হয়ে এল। বুয়র-গিন্নী কতক্ষণ পর এক পেয়ালা দুধ, চিনি মিশ্রিত কাফি আর একটুকরা শুকনা রুটী আমার হাতে দিলেন। কাফির কাপে চুমুক দিতেই বুঝলাম এই রকমের কাফি নিগ্রোদেরই দেওয়া হয়। রুটীর টুকরাটা দেখেই সন্তুষ্ট হয়েছিলাম, স্পর্শ করতেও ইচ্ছা হয় নাই এবং স্পর্শ করিও নাই। কাফির পেয়ালা কোনমতে নিঃশ্বেষ করে পেয়ালাটাকে এক দিকে রেখে দিলাম তারপর আবার কথা আরম্ভ হল।

 বুয়র ভদ্রলোক কয়েকটী কথা বলেই বাইরের বারান্দাটা একটা ত্রিপল দিয়ে ঘিরে দিয়ে বললেন, এরই ভেতর আপনাকে শুতে হবে। আপনার কোন ভয় নাই পাশেই আমার কুকুরটী শুয়ে থাকবে। কোনও হিংস্রজীব যদি আপনার গন্ধ পেয়ে এদিকে আসে তবে কুকুরই চিৎকার করবে প্রথম। আমার কাছে বেশ ভাল বন্দুক আছে, অতএব মরবার ভয় খুবই কম। এই বলেই বুয়র মহাশয় স্ত্রী-পুত্রকে সংগে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করলেন। বাইরে থাকলাম আমি এবং তার কুকুর! কুকুরটি বড়ই ভাল। সে বোধহয় জানতে পেরেছিল আমিও তার স্বজাতি, তাই চুপ করে আমারই কাছে শুয়ে থাকল। আমারও ভাবনার কিছুই ছিল না। বারান্দার তক্তাগুলির উপর শরীরটাকে এলিয়ে দেওয়া মাত্রই ঘুম এল। পরের দিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই পাশের কুকুরটাকে সরিয়ে দিয়ে সাইকেলখানা বাইরে নিয়ে গৃহস্বামী বুয়রকে ডাকলাম। ভদ্রলোক উঠলেন এবং বললেন, সুপ্রভাত মিষ্টার কুলি, রাতটা কেটেছে ভালই এখন চল্লেন না কি?

 হাঁ স্যার, এখন যাই আপনাকে ধন্যবাদ, রাতটা এক ঘুমেই কেটেছে। বিদায় নিয়ে সাইকেল কাঁটাসমন্নিত লোহার তারের বেড়া ডিংগিয়ে পথে গিয়ে ভাবলাম, পথ তুমিই ভাল। যারা আমাকে এবং আমার জাতের লোককে ঘৃণা করে তাদের বাড়ী না গিয়ে তোমার আশ্রয় নেওয়াই কর্তব্য। এই ভেবে এগিয়ে চল্লাম অজানা দেশের অজানা পথে।

 রুসাপী (Rusapi) ছিল আমার গন্তব্য স্থান। কয়েক মাইল যাবার পরই ক্রমাগত চড়াই পাচ্ছিলাম। সেজন্য বেশ কষ্ট হতে লাগল। গত রাত্রে খাওয়া হয়নি, এতে শরীরটা খুবই দুর্বল হয়েছিল। পেটের বেল্টটা আরও কষে অগ্রসর হতে হল। কতক্ষণ যাবার পর পথেরই পাশে কয়েকটি নিগ্রো ছেলেকে খেলতে দেখে ভাবলাম এদের গ্রাম নিকটেই আছে। চারিদিকে চেয়ে দেখলাম গ্রাম কোথাও নেই।

 একটি নিগ্রো ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলাম তোমাদের গ্রাম কোথায়? ছেলেটি আগের পথটাই দেখিয়ে দিল। মাইল তিনেক যাবার পর ছোট্ট একখানা নিগ্রো গ্রাম পেলাম। গ্রামের অবস্থা শোচনীয়, ঘরগুলি ভেংগে পরেছে। একজন নিগ্রোকে বসা দেখে তার হাতে একটি শিলিং দিয়ে বললাম “রুটি”। লোকটি খাদ্য চাইছি বুঝল এবং আমাকে টেনে নিয়ে গ্রামের পেছনে একখানা দোকান দেখাল। হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। দোকানে যে লোকটি কাজ করত সেও নিগ্রো। নিগ্রোরা সকল সময়ই একান্ত বাধ্য। তাকে বলে খাবারের বন্দোবস্ত করলাম এবং তারই বিছানায় কতক্ষণ বিশ্রাম করে রুসাপী নামক স্থানের দিকে রওয়ানা হলাম।

 কতক্ষণ চলার পরই পথের পার্শ্বে কতকগুলি নিগ্রোকে কাজ করতে দেখে দাঁড়ালাম। তাদের শরীরে একটুকরাও বস্ত্র ছিল না। আমাদের দেশে দরিদ্র লোক যেমন করে নেংটী পরে কাজ করে ঠিক্ তেমনি তাদের নেংটীই ছিল। সে নেংটী ছিল চামড়ার। আমাকে দাঁড়াতে দেখে একজন লোক কাছে আসল এবং বলল তাদের কিছু শিলিংএর দরকার সেজন্য তারা আজ কাজ করছে। তাদের নিযুক্তকারী বলেছেন যদি তারা পথে ভাল কাজ করে তবে আজ রাত্রে যে বিয়ে হবে তাতে প্রচূর মদ খেতে দিবেন। তাদের জিজ্ঞাসা করলাম “যে গ্রামে বিয়ে হবে সে গ্রাম কতদূর?” একজন আংগুল গুনে বলল চার-পাঁচ মাইল দূর হবে। ভাবলাম আজ নিগ্রোদের বিয়ে দেখতে হবে। লক্ষ্য করার বিষয় লোকটীকে আমি ডাকি নাই অথচ সে আমার কাছে আসল এবং কেন কাজ করছে তাই অনর্গল বলে ফেলল। এসব হল মানসিক দুর্বলতার লক্ষণ।

 চার পাঁচ মাইল পথ ঘণ্টা খানেকের মধ্যে চলে গিয়ে দেখলাম পথের পাশেই একখানা গ্রাম। গ্রামে লোকজন নেই বল্‌লেই চলে। গ্রামের কাছেই এক পাশে তিনটী বৃষ এবং চারটী গাই একটা গাছের সংগে বাঁধা ছিল। গরুগুলি দেখেই মনে হল এখানে কোথাও বিয়ে হবে। সাইকেলটী দাঁড় করিয়ে নিকটস্থ ছোট্ট নদীতে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে একটী ঘরের দাওয়ায় বসলাম। কতক্ষণ বসে থাকার পর তন্দ্রা আসল। বিছানা না করেই ডান হাতকে বালিশ করে শুয়ে পড়লাম। কতক্ষণ ঘুমানোর পর উঠে বসলাম। বসে ছিলাম অনেকক্ষণ তারপর একটী যুবক আসল। যুবকের বয়স পঁচিশের কম হবে না। সে আমার দিকে চেয়ে থেকে বলল তারই বিয়ে। গরু দেখিয়ে বলল এসব পাবে মেয়ের মা এবং একটা বৃষ দেখিয়ে জানাল এটাকে আর কতক্ষণ পরই হত্যা করা হবে। বিয়েতে যারা আসবে তারা এই বুষের মাংসের রোষ্ট খাবে। যুবককে বললাম “আজ এখানেই থাকব।” আমি যেই বললাম আজ এখানেই থাকব আর তাকে পায় কে। লাফ দিয়ে ঘরের চালের ছন ছুইল, গরুগুলিকে পদাঘাত করল, তারপর মাটীতে পরে একটা উল্টোবাজি খেয়ে আমার সংগে করমর্দন করল। আমি যদি সেই আনন্দের দৃশটী প্রথম দিনই দেখতাম তবে নিশ্চয়ই ভয় পেতাম কিন্তু নিগ্রোদের সংগে ক্রমাগত সাত আট মাস থাকার দরুণ এদের আচার ব্যবহারে অনেকটা অভ্যস্ত হয়ে ছিলাম। যুবকের হাভভাব দেখে মনে হ’ল তার বিয়েতে নিগ্রো ছাড়া ভিন্ন জাতের লোক উপস্থিত থাকবে না।

 যুবকের আনন্দ দেখে বেশ সুখী হলাম। চা খাবার ইচ্ছা হচ্ছিল। যুবককে বললাম এই নাও এক শিলিং, দেখত একটু চায়ের যোগাড় করতে পার কি-না। যুবক শিলিংটী হাতে নিয়ে নিকটস্থ দোকানে গিয়ে মস্ত বড় কাপে এক কাপ চা নিয়ে আসল। চা খেয়ে বেশ আরাম পেলাম। ইচ্ছা হল গ্রাম্য দোকানে গিয়ে দোকানের অবস্থা দেখি কিন্তু তা আর হয়ে উঠল না। ইতিমধ্যে কয়েকজন লোক আসল এবং একটী ডুমুরু বাজিয়ে নৃত্য আরম্ভ করল। তাদের প্রত্যেকের পরনেই চামড়ার বেল্ট ছাড়া আর কিছুই ছিল না। নৃত্য আরম্ভ হওয়ার সংগে সংগেই মেয়ের মা আসল এবং একটা বৃষকে ছেড়ে দিল। বুষটা মুক্ত হওয়া মাত্র দৌড়াতে থাকল। যারা নৃত্য আরম্ভ করছিল তারা বৃষের পেছন দিকে নানারূপ অস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করল। বৃষটা বেশীক্ষণ দৌড়াতে পারল না। পশুরা পশু হত্যা করল। তারপর পশু মাংস একটা ঘরে অতি যত্নের সহিত রাখল। মেয়ের মা বৃষ মাংস অর্দ্ধপক্ক হবার পর সর্বপ্রথম কিছুটা খেয়ে নিল। তারপর তার মেয়েটীকে নানারূপ ঝিনুকের গহনায় সজ্জিত করে সকলের সামনে আনল। মেয়েটী অবনত মস্তকে একখানা চামড়া দিয়ে সমস্ত শরীর ঢেকে দাঁড়াল। ছেলেটীও মস্তবড় একখানা মহিষের চামড়া দিয়ে সর্বাংগ জড়িয়ে দাঁড়াল। তারপর নবাগতেরা এবং গ্রামবাসীরা সকলে যুবক যুবতীর চারদিকে দাঁড়িয়ে কতক্ষণ গান গাইল, গানের পরে অনেকক্ষণ নৃত্য করল। নৃত্য হয়ে গেলে নব বিবাহিত যুবক যুবতী অন্ধকারে উধাও হয়ে গেল। গ্রামবাসীরা গোমাংসের সংগে ভুট্টার ছাতু মিলিয়ে যা পাক করল সকলে মিলে তাই খেল। আমি যে একজন বিদেশী তাদেরই কাছে বসে আছি সেদিকে কিন্তু তাদের দৃষ্টি ছিল না। খাওয়া হয়ে গেলে অন্য গ্রামের লোক নানারূপ গান গেয়ে বিদায় নিল এবং গ্রামের লোক আপন আপন ঘরে শয্যা গ্রহণ করল।

 তখনও আমার খাওয়া এবং ঘুমানোর বন্দোবস্ত হয় নাই। এখন কি করতে হবে তাই নিয়ে মহাসমস্যায় পড়লাম। সাইকেলটা সংগে করে নিয়েই গ্রাম্য দোকানের দিকে অগ্রসর হলাম। কতক্ষণ যাবার পরই দেখতে পেলাম প্রকাণ্ড একটা বাতি জ্বলছে। বাতির কাছে কতকগুলি লোক নৃত্য করছে। তাড়াতাড়ি করে সেখানে গিয়ে দোকানীকে আমার জন্য কিছু খাবারের বন্দোবস্ত করতে বললাম। দোকানী বেশ ভদ্রলোক, সে গ্রাম্য আনন্দ পরিত্যাগ করে আমার জন্য ভাত রেধে দিল। আমি ইত্যবসরে স্নান করে এলাম। দোকানে মাখন, এবং ক্রিম ছিল। রাত্রে খাবারের বেশ ভালই বন্দোবস্ত হল। খাবারের পর যে ক্রিমটুকু ছিল তাই দিয়ে কাফি তৈরি করে খেয়ে নিগ্রোদের গান শুনলাম। নিগ্রোরা বিদেশী মদ ত খেয়েছিলই উপরন্তু তাদের নিজেদের তৈরী মদও খেয়েছিল। রাত দুটা পর্যন্ত এদের নৃত্য দেখে দোকানীর বিছানাতেই শুয়ে থাকলাম। দোকানী কোথায় শুয়েছিল সে সংবাদ আমার জানা ছিল না।

 নিগ্রোদের কাছে বিয়ে করা মহা ঘৃণ্য কাজ। তারপর যখন যুবতী গর্ভবতী হয় তখন তার ছুঁয়া জলও কেউ স্পর্শ করে না। সন্তান হবার কয়েক মাস পর শিশুর মায়ের কাছে সবাই আসতে আরম্ভ করে। মেয়ের মা অথবা নিকটস্থ আত্মীয় ছাড়া গর্ভবতীর সন্নিকটে কেউ আসে না এজন্যই বোধহয় নিগ্রোদের ছেলেমেয়ের সংখ্যা খুবই কম। নিগ্রোদের ছেলেমেয়ের সংখ্যা খুব বেশী হয়ত দুই হতে তিন। এই নিয়মটী অসভ্য নিগ্রোদের মধ্যে এখনও আছে। যারা সভ্য হয়েছে তাদের মধ্যে আবার ছেলেমেয়ের সংখ্যা আমাদের চেয়েও বেশী। সভ্যদের ছেলেমেয়ের সংখ্যা যেমন বেশী হয় তেমনি শিশু মরকও বেশ আছে। অসভ্যদের মধ্যে শিশুমৃত্যু নাই বললেও চলে। সভ্য নিগ্রোদের শিশুরা যাতে না মরে সেজন্য স্থানীয় সরকার একটুও পরওয়া করে না। স্থানীয় সরকার নিগ্রোদের শিশুর মৃত্যু সংবাদ হয় আনন্দের সহিত গ্রহণ করে নয়ত একটা বন্যজীব মরেছে এ ধারণাই মনে পোষণ করে। নিগ্রোদের জন্য হসপিটাল কোথাও দেখি নাই।

 সকালে ঘুম থেকে উঠেই বয়কে যুবক যুবতীর সংবাদ জিজ্ঞাসা করলাম। দোকানের চাকরটী বললে যুবক যুবতী নিকটস্থ একটী গ্রামে বাস করছে। সেখানে যুবক তার জন্য পূর্বেই ঘর তৈরী করেছিল এবং ভবিষ্যতে যুবক সেখানেই থাকবে। যুবকের চিরতরে গ্রাম পরিত্যাগের কথা শুনে অনেকক্ষণ ভাবলাল তারপর চিন্তার অবসান হল বটে কিন্তু গ্রাম পরিত্যাগ করার কারণ খুঁজে পেলাম না। যুবতীর বয়স কমের পক্ষে পঁচিশ যুবকও সেই বয়সেরই, এরূপ অবস্থায় নূতন গ্রামে নুতন ভাবে বাস করতে কোনই কষ্ট হয় না, তবুও নূতন গ্রাম, নূতন মানুষ একথাটাই আমাকে একটু চিন্তিত করে তুলেছিল।

 বেলা হচ্ছিল, গ্রামে বেশীক্ষণ বসে থাকা ভাল হবে না ভেবে অনিচ্ছা সত্বেও গ্রাম পরিত্যাগ করলাম।

 নিগ্রো গ্রাম হতে বের হয়ে পুনরায় পথে এলাম। পথের দুপাশে কয়েকট বড় বড় গাছ দেখতে পেলাম। গাছগুলি আমাদের দেশের কদম গাছের মত। দেখতে বড়ই সুন্দর! গাছের গায়ে কে বা কাহারা কতকগুলি টীনের পাতে “ভোট ফর্” লিখে এটে দিয়েছিল। বুঝলাম এদেশে ইলেকশন্ আরম্ভ হয়েছে। যতই এগিয়ে যেতেছিলাম ততই “ভোট ফর্” সংখ্যা বেড়ে চলছিল।

 দক্ষিণ রডেসিয়াতে অনেক ভারতবাসীর বাস। তাদের ভোট আছে, কিন্তু নিজের লোক পার্লামেণ্টে পাঠাবার অধিকার নাই অথবা কোন ইণ্ডিয়ানের পক্ষে রডেসিয়ার পার্লামেণ্টে সভ্য হবার অধিকার নাই। বৃটেনে ইণ্ডিয়ানদের সে অধিকার আছে। এখানে ইণ্ডিয়ানদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য পার্লামেণ্টে একজন সভ্য থাকেন, সেই সভ্যকে ইণ্ডিয়ানরা ভোট দিয়ে পাঠায়।

 “ভোট ফর্” বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি দেখে মনে হল ইণ্ডিয়ানরা এপথে আসা-যাওয়া করে, কিন্তু কখন? একটী ইণ্ডিয়ানকেও যে পথ চলতে দেখতে পাচ্ছি না। যে দু’একখানা মোটরকার দেখতে পাচ্ছি তাতে শুধু ইউরোপীয়ানরাই যাওয়া আসা করছে।

 রূপাসী তখনও অনেক দুরে। পথের দু’পাশে প্রাকৃতিক দৃশ্যও ছিল। শরীর অবসন্ন হয়ে আসছিল সেজন্য পথে দাঁড়ালাম। অনেকক্ষণ বিশ্রামের পর রূপাসীর দিকে রওয়ানা হবার পূর্বে ইচ্ছা হল জংগলে বেড়ালে ভাল হবে। এমন সুন্দর বন কি আর দেখতে পাব? কিন্তু সংগে খাদ্য না থাকায় বনের সৌন্দর্য ভুলে শহরের দিকে রওয়ানা হতে বাধ্য হলাম!

 রূপাসী গণ্ডগ্রাম। গ্রামের বাসিন্দা সকলেই ইণ্ডিয়ান। ভারতবাসী অধ্যুসিত গ্রামে পৌঁছে মনে হল না সেখানে ভারতবাসী বাস করে। রাস্তা পরিষ্কার, বাড়ীগুলির সামনে সামান্য আবর্জনাও দেখতে পাওয়া যায় না। ঘরের বারান্দা হতে আরম্ভ করে যতটুকু দেখা যায় কোথাও একটুও আবর্জনা নাই। মেথর অথবা ঝারুদারদেরও প্রলচন নাই। গ্রামটি ইণ্ডিয়ান নয় মনে হবার বিশেষ কারণ হল আমাদের বাইরে বেড়ানো অভ্যাস, এখানের লোক ঘরের বাইরে বেড়ায় না। দরকার বোধে খেলার মাঠে যায়, মোটরে গ্রামান্তরে যায় কিন্তু পথে অনর্থক পাইচারী করে না।

 গ্রামে নানা রকমের লোক। তামিল, তেলেগু, গুজরাতী এবং দু’একজন হিন্দুস্থানী। একজন গুজরাতী ভদ্রলোকের বাড়ীতেই অতিথি হলাম। গুজরাতী ভদ্রলোক যুবক, হালে বিয়ে হয়েছে। বাড়ীতেই ছিলেন। অতিথি থাকবার ব্যবস্থা থাকায় আমার জন্য কিছুই নূতন করে করতে হল না। অতিথির জন্য বাথরুম এবং সুন্দর বিছানা ছিল।

 গুজরাতীদের মধ্যে স্ত্রীস্বাধীনতা আছে। নব বিবাহিত যুবতী আমাকে দেখতে এলেন। তার মুখে একটুও সঙ্কোচ ছিল না। আমার জন্য এক পেয়ালা চা এনে যুবতী বললেন “চা খাও”।

 চায়ের পেয়ালা হাতে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম “তুমিই বোধহয় এবাড়ীর গৃহকর্ত্রী?”

 হাঁ, তুমি ডাল ভাত খাও?

 হাঁ, আর কি খাব? ভাত বেশী করে পাক করো, তোমাদের মত অল্প চারটে ভাত খেয়ে আমার পেট ভরে না।

 বেশ তাই হবে। বেশী করে ভাত রাঁধব, দেখব তুমি কত ভাত খেতে পার।

 যুবতীর স্বাধীন ভাবে কথা বলা দেখে মনে হল তার জন্ম ভারতে হয় নাই। যদি এই যুবতীর জন্ম ভারতে হত তবে এরূপ পরিষ্কার এবং সহজভাবে আমার সংগে কথা বলতে পারত না।

 যুবতী চলে গেলে একটু বিশ্রাম করলাম এবং নিকটস্থ ইউরোপীয়ান গ্রাম দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। ইণ্ডিয়ান্ গ্রাম হতে ইউরোপীয়ান গ্রাম বেশী দূরে নয়। তাদের বাড়ী বাংলো ধরণের। যদিও তাদের গ্রামে একশত লোকেরও বসতি হবে না, তবুও তাদের গ্রামে চায়ের দোকান, হোটেল, প্রমোদ উদ্যান সবই রয়েছে। রেঁস্তোরা অথবা চায়ের দোকান দেখার মত জিনিষ। দোকানগুলি সজীব লতাপাতা দিয়ে সাজানো। টেবিল চেয়ার যদিও মামুলী কাঠের তৈরী কিন্তু প্রত্যেকটী জিনিষ আরামদায়ক এবং নয়নাভিরাম। ইউরোপীয়ান গ্রামে পৌঁছে সাইকেল একটা ল্যাম্পপোষ্টে দাঁড় করিয়ে রেঁস্তোরায় একখানা চেয়ারে বসলাম। ইউরোপীয়ান্ বয় তখন কাজে ব্যস্ত ছিল। কাজ হতে ফিরে আমাকে দেখতে পেয়েই জিজ্ঞাসা করল “কি চাই?”

 ক্রিম চাই, কোয়ার্টার পাউণ্ড ক্রিম নিয়ে এস ত!

 বয় কিছু না বলে একটা কাগজের ঠোংগায় কোয়ার্টার পাউণ্ড ক্রিম নিয়ে এল! তাকে তার প্রাপ্য এক শিলিং দেবার পর ঠোংগাটা মুখে ঢেলে দিয়ে নিমিষের মধ্যে ক্রিম নিঃশেষ করে ঠোংগাটা পকেটস্থ করলাম কারণ ঠোংগা ফেলার মত স্থান সেখানে ছিল না।

 চলে আসার সময় বয় বলল এখান থেকে ক্রিম কিনতে পার কিন্তু কখনও চেয়ারে বসো না। দাঁড়িয়ে থেকে আমাকে ডাকবে?

 চেয়ারে বসব ক্রিমও খাব দেখব তুমি কি করতে পার।

 মদ খাবার জন্য মাতাল যেমন আগ্রহান্বিত হয় আমিও ক্রিম খাবার জন্য আগ্রহান্বিত থাকতাম, ক্রিম খেলে শরীর ভাল থাকত তাই ক্রিম খাওয়ার এত আগ্রহ।

 গুজরাতী ভদ্রলোকের বাড়ীতে ফিরে এসে দেখতে পেলাম তার বসবার ঘরে অনেক লোক তর্কবিতর্ক আরম্ভ করেছে। তর্কের বিষয়বস্তু ইলেকশন।

 কনসারভেটিভ্ পার্টির পক্ষে কি শোসিয়েলিষ্ট পার্টির পক্ষে ভোট দেওয়া হবে এই নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে।

 অপরের নাম জিজ্ঞাসা করা আমার অভ্যাস নাই, সেজন্য যখন গুজরাতী ভদ্রলোকের বাড়ীতে গিয়েছিলাম তখন তাঁর নামও জিজ্ঞাসা করি নাই। যখন তর্কবিতর্ক হচ্ছিল তখন একজন লোক মগনভাই বলে গুজরাতী ভদ্রলোককে সম্বোধন করছিল। দেখলাম মগনভাইএর বাড়ীটা একটা আড্ডাখানা। চা সিগারেট চলছে অনবরত, অনেকে হয়ত ভাববেন মগনভাই সকলকে সিগারেট বিতরণ করছিলেন, বিষয়টা কিন্তু বিপরীত। মগনভাই সিগারেট খেতেন না। যারা এসেছিলেন তাদেরই পকেটে কুড়ি সিগারেটের পেকেট ছিল। কুড়ি সিগারেটের দাম এক শিলিং মাত্র। রডেশিয়ার ভারতবাসীর পক্ষে অতি সস্তা।

 আড্ডাস্থলে বসলাম না, মগনভাইকে সংগে নিয়ে ভেতরে চলে গেলাম। কথা প্রশংগে জিজ্ঞাসা করলাম এখানে আপনাদের আচার ব্যবহার কিরূপ?

 কি জানতে চাইছি মগনভাই বুঝতে না পেরে আমার মুখের দিকে হাঁ করে চেরে থাকলেন।

 পুনরায় তাকে বললাম “আপনাদের মধ্যে কি জাতিভেদ নেই?

 এখানে আমরা জাতিভেদ মানি না। চর্মকারের ছেলের সংগেও ব্রাহ্মণের মেয়ের বিয়ে হয়। খাবারের দিক দিয়েও তথা। যা হজম করা যায় তাই যদি খাওয়া যায় তবে তাতে কেউ বাঁধা দেয় না। সেজন্যই আমরা সুখে আছি। আমাদের লোক সংখ্যাও বেশ বাড়ছে। দুঃখের সহিত বলছি এখানে ভারতীয় ডাক্তার নেই। যদি ভারতীয় ডাক্তার থাকতেন তবে হয়ত আমাদের শিশুদের একটিরও মৃত্যু হত না। ভদ্রলোক কাছে এসে চুপে চুপে বললেন “সাদা ডাক্তারদের বিশ্বাস করা চলে না, তারাই বোধহয় আমাদের শিশু হত্যা করে।”

 এটা নেহাৎ বাজে কথা মশাই।

 আমি যা বলছি তাই ঠিক। দক্ষিণ আফ্রিকাতে গেলে এ বিষয়ের প্রমাণ পাবেন।

 দক্ষিণ আফ্রিকাতে গিয়ে ভদ্রলোকের কথা শুধু বুঝতে সক্ষম হই নাই স্বচক্ষে একটি ঘটনা দেখতে পেরে শিহরে উঠেছিলাম। দুখের বিষয় সকল সময় সকলের কথা বিশ্বাস করতে প্রবৃত্তি হত না। এসব দুষ্কর্ম বুয়রদের দ্বারাই সম্ভব হয়। বৃটিশ অথবা ফরাসীরা এরূপভাবে নরহত্যা করেছে বলে কেউ বলে না। বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতবাসী কোন বুয়র ডাক্তারকে ডাকে না, এই যা মন্দের ভাল। রডেসিয়াতেও বেশি ভিজিট দিয়ে বৃটিশ ডাক্তার ডাকবার প্রথা চালু হয়েছে। বুয়র ডাক্তার ডেকে অকালে কেউ মরতে রাজি হয় না।

 বিদায়ের পূর্বদিন বিকাল বেলা এক সভা হয়। কাকে ভোট দিতে হবে তাই নিয়ে বেশ বাকবিতণ্ডা চলতে থাকে। সোসিয়ালিষ্ট পার্টির প্রতিনিধি সভায় উপস্থিত ছিলেন। ভোট কাকে দিতে হবে তাই নিয়ে যখন তর্ক চলছিল তখন একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন আপনার এসম্বন্ধে মত কি বলুন?

 আমি চুপ করে থাকার পাত্র নই। অনেক সময় অনেকে নিজের স্বার্থ বজায় রাখার জন্য নীরবতা পছন্দ করে। আমারও এখানে বেশ বড় রকমেরই একটা স্বার্থ ছিল। মুখ খুবলার পূর্বেই মনে হল আমার কথা শুনে এরা যদি মোটেই চাঁদা না দেয় তবে ক্ষতিগ্রস্থ হতে হবে। মনটা দুর্বল হল। একটু যেতে না যেতেই শক্তি এল—বললাম আপনাদের ভোটের কোনও মূল্য নেই। আপনারা ভোট দিতে পারেন, নিজের লোক পাঠাতে পারেন না। আপনাদের জানা উচিত নিগ্রোরা ভোটের অধিকারী নয়। আপনাদের প্রথম কর্তব্য হবে নিগ্রোদের টেনে এনে দল বাড়ানো তারপর ভোটের প্রার্থী হওয়া। যে দেশে শতকরা পাঁচজন মাত্র ইউরোপীয়ান, যে দেশের পার্লামেণ্টে শুধু ইউরোপীয়ানরাই প্রতিনিধি হিসাবে প্রবেশ করতে পারে সে-দেশে ডেমোক্রেসী যে কি তা আপনারাই বুঝেন। ভোট পায় এবং ভোট দেয় সেই দেশগুলিতেই যে-সকল দেশে মানুষের স্বাধীনতা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। এদেশে এখনও নিগ্রো এবং ইণ্ডিয়ানদের মানুষ বলে স্বীকার করে নেওয়া হয় নাই। অতএব এখানে ভোটের কোন মানেই হয় না। আমি মনে করি আপনারা কাউকে ভোট না দিয়ে নিগ্রোদের কাছে টেনে আনবার চেষ্টা করুন তাতেই আপনাদের ভোট দেওয়া হবে। নিগ্রোরা যদি আপনাদের কাছে দাঁড়াতে পারে তবে হয়ত একদিন আপনাদেরও প্রতিনিধিও পার্লামেণ্টে যেতে পারবেন।

 আমার কথা শুনে অনেকেই বললেন যিনি আমাদের হয়ে পার্লামেণ্টে যাচ্ছেন তিনি একজন কমিউনিষ্ট। নিপীড়িত জাতের যাতে উন্নতি হয় তারই চেষ্টা করছেন। তাকে ভোট না দিলে হয়ত আমাদের ভোটাধিকারই থাকবে না। আমার আর ভাল লাগল না। শুধু বললাম আপনাদের ইচ্ছা অনুযায়ী আপনারা কাজ করুন কিন্তু মনে রাখবেন এরূপ ভোটের কোন মূল্য নাই। আজ যিনি কমিউনিষ্ট সেজে আপনাদের ভোট ভিক্ষা করছেন, আগামী কল্য এই ভদ্রলোকই আপনাদের ব্যবসার পথ বন্ধ করতে কসুর করবে না। নামে কমিউনিষ্ট আর কাজে কনজারভেটিভ্ হতেও খারাপ, এমন লোককে ভোট দিয়ে নিজের পায়ে নিজে কুঠার মারবেন না। আমার জানা মতে এদেশে কোনও কমিউনিষ্ট প্রতিষ্ঠান নেই, সে সংবাদ কি আপনারা রাখেন?

 মুখরোচক কমিউনিষ্ট শব্দটি সবাই পছন্দ করে কিন্তু কমিউনিজম কি এবং কি করে কমিউনিষ্টরা কাজ করে সে কথা রুসাপীর ভারতীয় ব্যবসায়ী মহলের লোক কিছুই জানত না। ব্যবসায়ের দিক দিয়ে তারা সামান্য সুবিধা চাইছিল মাত্র। অনেক স্থলেই সোসিয়েলিষ্টরা কমিউনিষ্ট নামে পরিচিত হয়ে কমিউনিষ্টদের বেশ ক্ষতি করে।

 একজন ব্যবসায়ী আমার কথা তাড়াতাড়ি শেষ করতে বলছিলেন। ব্যবসায়ীর আদেশ অবহেলা করে আমার বক্তব্য শেষ করলাম। সভার শেষে মগনভাই যখন আমার জন্য চাঁদা উঠাবার প্রস্তাব করলেন তখন অনেকেই চাঁদা দিল না এবং আমার প্রতি কটুবাক্য প্রয়োগ করতেও কসুর করল না। আশা করছিলাম এখানে হয়ত পাঁচশত টাকার মত চাঁদা উঠবে কিন্তু মাত্র তের টাকাতেই সন্তুষ্ট হতে হয়েছিল। তের টাকা পেয়ে একটুও দুঃখ হল না। টাকার জন্য আমার আমিত্ব যে বিক্রি করি নাই সেজন্য গর্ব অনুভব করিতেছিলাম।

 যে সকল দেশে আইনের ভেতর কোনও কাঠিন্য নেই সেই দেশগুলিতে যদি কেউ সত্য কথা বলে এবং সরকার পক্ষের তরফ থেকে সেই সত্য কথা পছন্দ না হয় তবে সত্যবাদীকে ছলে, বলে, কলে কৌশলে দেশ হতে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। ভাবছিলাম রডেসিয়া সরকারও আমাকে তাড়িয়ে দেবে কিন্তু তা হয় নাই বরং রডেসিয়া সরকার বিপদে আপদে সাহায্য করেছিল।

 রুসাপী হতে বিদায় নিয়ে পথে বের হয়ে কয়েক মাইল যাবার পরই এক শ্বেতকায়ের সঙ্গে দেখা হয়। লোকটা বড়ই উগ্র। সকল সময়ই নরডিক ভাবাপন্ন। সে আমার পেছন দিক থেকে আসছিল। হঠাৎ আমার কাছে মোটর থামিয়ে মোটর হতে নেমে পড়ল এবং বলল “এই এটা সাইকেলের পথ নয়, যখনই মোটর আসছে শুনবে তখনই পথ ছেড়ে দেবে।”

 লোকটার কথা ছিল উগ্র সেজন্য বললাম “Is that so,” তাই নাকি? Do mind your own. নিজের চরকায় তৈল দাও। তারপরই বললাম, যদি তাতে রাজি না হও তবে এস।

 ইনি হলেন আমাদের দেশের ভদ্রলোক। ভদ্রভাবে থাকাই পছন্দ করেন সেইজন্যই বোধহয় গাড়ীতে ফিরে গেলেন এবং হাওয়ার মানুষ হাওয়াতে মিশে গিয়েছিলেন। বুঝতে পেরেছিলাম মরবার যদি সাহস থাকে এবং শরীরে যদি শক্তি থাকে তবে জয় অনিবার্য।