বিষয়বস্তুতে চলুন

নিগ্রো জাতির নূতন জীবন/সেলিসবারী

উইকিসংকলন থেকে

সেলিসবারী

 এদিকের পথ বড়ই সুন্দর। পথের দুদিকে বড় বড় খামার। খামারের চারিদিকে সরু তারের বেড়া। পথেরই পাশে একটি ইণ্ডিয়ানের খামার দেখতে পেয়ে খামারে ঢুকে পড়লাম। খামারের মালিক মণিভাই পেটেল। মণিভাই এবং তার স্ত্রী তখন খামারে কপির চাড়া রোপণ করছিলেন। তাঁর বড় ছেলেটি কোদাল দিয়ে মাটি কাটছিল। ছোট দুটি মেয়ে ঘাসের উপর বসে খেলা করছিল। অদূরে একটি নিগ্রো সারেংগী বাজিয়ে গান করছিল। আমাকে দেখতে পেয়ে মণিভাই বললেন “কি চাই ভাই?”

 দক্ষিণ রডেসিয়া, জান্‌জিবার, বৃটিশ পূর্ব-আফ্রিকা প্রভৃতি স্থানে ভাই অথবা ভাইয়া শব্দদ্বয় সাধারণতঃ সংযুক্ত প্রদেশের লোকের প্রতিই প্রযুজ্য। সংযুক্ত প্রদেশের লোক এই দুইটি শব্দ মোটেই পছন্দ করে না। আমাকে ভাই বলাতে একটুও দুঃখিত হলাম না বরং সুখী হলাম এবং মণিভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম মণিভাইএর মত আর কতজন চাষা এদিকে বাস করে।

 বেশি নয় মাত্র কয়েক ঘর। দেশেও আমরা চাষই করতাম এখানেও আমরা চাষই করছি। চাষের কাজ কিন্তু আমাদের দেশের লোকে মোটেই পছন্দ করে না বরং ঘৃণাই করে। আমার নামের পেছনে পেটেল শব্দ ব্যবহার করতে অনেকেই নারাজ। যাকগে বয়ে গেল, আমি এবং আমার মত যারা একত্রিত হই সবাই নিগ্রোদের নিয়েই থাকি। মাটির সংগেই হল আমাদের সম্বন্ধ, ব্যবসারীরা যদি আমাদের ঘৃণা করে আনন্দ পায় তাতে আমাদের দুঃখ করার কিছুই নাই। আপনাকে এদেশে নুতন বলে মনে হচ্ছে, এখন যাচ্ছেন কোথায়?

 সেলিসবারী যাব, মাত্র আর দশ মাইল গেলেই হল।

 মণিভাই খুব দুঃখ করে বললেন তার মাত্র একখানা ঘর এবং তাতে চারটি রুম। প্রত্যেকটি রুমেতে লোক থাকে। যদি একটি রুম খালি থাকত তবে তিনি আমাকে থাকতে অনুরোধ করতেন। কাজে ব্যস্ত, পেটেলের কাছে বসে থাকলে তার সময়ের অপব্যবহার করা হবে মনে করে আবার পথে আসলাম এবং কোথাও বিশ্রাম না করে সরাসরি সেলিসবারী শহরে পৌঁছলাম।

 সেলিসবারী বেশি বৎসরের পুরাতন শহর নয়। এমন কি পঞ্চাশ বৎসরও হয় নাই। তবুও সেখানে পথগুলি আঁকাবাকা, ঘরগুলির গঠন নানা রকমের। যার যেভাবে আর্থিক উন্নতি হয়েছে সে সেইভাবেই বাড়ী তৈরী করেছে। কোনও বাড়ীতে কয়লা দিয়ে পাক করা হচ্ছে আর কোথাও ইলেকট্রিক উনুনের রান্না হতে আরম্ভ করে স্নানের জলও গরম করা হচ্ছে। আমেরিকাতে এই ধরণের শহর একটিও নাই। আমেরিকার সর্বত্র সমভাবে শহরের গাম্ভীর্য বজায় রাখা হয়েছে। বৈদ্যুতিক গ্যাস, মডারেট সেনিটেশন্ সর্বত্র বিরাজমান। সেলিসবারীর মত ধনী শহরে খাটা পাইখানাও রয়েছে।

 শহরে পৌঁছেই পেটেলের বাড়ীতে থাকা ও খাওয়ার বন্দোবস্ত করে পোষ্টাফিসে গেলাল। নেটিভ এবং ভারতীয়েরা যেস্থানে দাঁড়িয়ে পত্র আদান-প্রদান করে সেখানে গিয়ে আমি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলাম আমার কোন পত্র আছে কি না। কতক্ষণ পর একজন শ্বেতকায় কর্মচারী বেড়িয়ে এলেন এবং আমার দিকে চেয়ে রইলেন, মনে হল কোন্ ভাষায় তিনি আমার সংগে কথা বলবেন, সেই ভাষাটি বোধ হয় খুঁজে পাচ্ছিলেন না, সেজন্য আমি নিজেই বললাম “ভাষার জন্য মুখ বন্ধ রাখবেন না, বলুন আপনার কি বলবার আছে?

 শ্বেতকায় কেরাণী বললেন “আপনার ছাব্বিশখানা পত্র এসেছিল। প্রত্যেকখানা প্রেরকদের কাছে ফেরৎ দেওয়া হয়েছে কারণ এখানে Post restente-এ শুধু শ্বেতকায়দের পত্র জমা রাখা হয়। হালে ক’খানা পত্র এসেছে, সেগুলিও আমরা পাঠাবার জন্য উদ্যোগী হয়েছিলাম, এসে গেলেন নতুবা এগুলিও পেতেন না।”

 কখানা পত্র হাতে নিয়ে কেরাণীকে বললাম আপনারা আইনের দাস, আইন আপনারা ভংগ করতে পারবেন না, আপনাদের আইন যেদিন বে-আইনি হবে, আপনারা যেদিন আফ্রিকা হতে বহিষ্কৃত হবেন, যেমন করে হিটলার ইহুদীদের জার্মানি থেকে বিতাড়িত করেছিলেন সেদিন আমাদের মত লোক সুখী হবে, এর পূর্বে নয়। লোকটা আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। রডেসিয়া সরকারের অন্যায় আইনের জন্য থুথু ফেলে পেটেলের ঘরে বসে ভাবতে লাগলাম “কবে এরূপ বে-আইনি আইন পৃথিবী হতে লোপ পাবে?”

 সেলিসবারী শহরটি বড়ই সুন্দর। চারিদিকে খোলা ময়দান, মধ্যস্থলে শহরের অবস্থিতি। শহর দু’ভাগে বিভক্ত। একদিকে ইণ্ডিয়ান, ইন্দো আফ্রিকান এবং এশিয়ার অন্যান্য জাতের লোক বাস করে। অন্যদিকে শুধু ইউরোপীয়ান। শহরে কয়েক ঘর নিগ্রোরও বাস আছে। তারা ইন্দো-আফ্রিকানদের সংগেই মিলেমিশে বসবাস করে। এখানে সর্বপ্রথমই ইন্দো-আফ্রিকানদের কথা বলতে বাধ্য হলাম কারণ পেটেলের বাড়ীতে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে নাই, ইন্দো-আফ্রিকানদের বাড়ীতেই চলে যেতে হয়েছিল।

 ইন্দো আফ্রিকানরা যে সকল পাড়ায় বাস করে সেই পাড়ার পথগুলি ইচ্ছা করেই যেন মেরামত করা হয় না, কিন্তু ফুটপাথ থেকে আরম্ভ করে ঘরগুলি দেখলে মনে হয় এই সেদিন বাড়ীগুলি তৈরী হয়েছে। ভেতর এবং বাইরের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার দিক দিয়ে ইন্দো আফ্রিকানরা ইণ্ডিয়ান এবং ইউরোপীয়ানদের ছাড়িয়ে গিয়েছে। তাদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা সর্বত্রই অনুভূত হয়। এরূপ হবার একমাত্র কারণ হল ইন্দো আফ্রিকানরা ভারতবাসী দ্বারা যেমন ঘৃণিত তেমনি ঘৃণিত ইউরোপীয়ানদের দ্বারাও। ঘৃণিত হলেই একটা জাতের উন্নতি বদ্ধ হয় না। জাতকে জাগাতে হলে অনুপ্রেরণার দরকার হয়। সেই অনুপ্রেরণা যোগায় সমাজ পরিত্যক্ত ভারতবাসী। অনুগ্রেরণা সংখ্যালঘিষ্ট সম্প্রদায়ের মধ্য হতেও আসত। সংখ্যালঘিষ্টরা সাধারণতই হিংসুটে হয় সেজন্য তারা বৃহত্তর দলের সংগে সংশ্রব পরিত্যাগ করে ইন্দো-আফ্রিকান্ দলে যোগ দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আমার মত এবং পথ পৃথক সেজন্য আমিও বাধ্য হয়ে ইন্দোআফ্রিকানদের দলে ভিড়ে পড়লাম। এতে আমার কোনরূপ ক্ষতি হল না বরং লাভই হল। বাইরের সংবাদ সংগ্রহের পক্ষে সুবিধা হল।

 ব্যবসায়ীরা চেয়েছিলেন আমি যেন বাইরে না যাই এবং বাইরের লোকের সংগে মেলামেশা না করি, কিন্তু এটা হল আমার স্বভাব-বিরুদ্ধ কাজ। বিদেশে গিয়ে যদি অন্যের সংগে কথা বলতে না পারলাম তবে বিদেশ ভ্রমণে কোনই লাভ নেই।

 আমার নূতন বাসস্থান মিষ্টার লসমনের বাড়ীতেই ঠিক করলাম। লসমনের নামের পূর্বে শ্রী অথবা শ্রীযুক্ত ব্যবহার হয় না। তিনি এসব ইণ্ডিয়ান গোড়ামী পছন্দ করেন না। মিষ্টার শব্দই তিনি ব্যবহার করেন। এবার আমি দ্বিতীয় লসমনের বাড়ীতে আসলাম। পূর্বে ন্যাসাল্যণ্ডে আর এক লস্‌মনের বাড়ীতে ছিলাম। তার স্ত্রীও অর্দ্ধ-নিগ্রো ছিলেন এবং সেলিসবারীর লসমনের স্ত্রীও অর্দ্ধ-নিগ্রো। তবে উভয়ের মধ্যে বেশ পার্থক্য ছিল! সেলিসবারীর লসমনের স্ত্রী শিক্ষিতা। অর্দ্ধনিগ্রো শিক্ষিতা মহিলার বাড়ীতে আসার পর বেশ শান্তি পেয়েছিলাম।

 হিন্দুদের অপ্রাসংগিক দর্শন আলোচনা, মুসলমানদের গোড়ামী, ইউরোপীয়ানদের দাম্ভিকতা এখানে ছিল না। এখানে ছিল নিয়ম এবং কার্যের শৃঙ্খলা। লসমন মদ খেতেন কিন্তু মাতলামী করতেন না! বেশি কথা বলতেন কিন্তু অবান্তরতা ছিল না। লসমনের ঘরে পবিত্রভাব সব সময়ই বিরাজ করত।

 সেলিসবারীতে আসার পর থেকে অনেক অর্দ্ধ-নিগ্রো পুরুষ এবং মহিলার সংগে সাক্ষাৎ হয়। তারা আমাকে শহরের অবস্থা বুঝিয়ে দেবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। সর্বপ্রথমই একটি বিদ্যালয়ে যাই, সেখানে ভারতীয় ছাত্রেরাও পড়তে যায়। লক্ষ্য করলাম ছাত্র এবং ছাত্রীদের মধ্যে যেরূপ সংযত ভাব বিদ্যমান তেমন সংযত ভাব ইউরোপীয়ান অথবা ইণ্ডিয়ানদের মাঝে মোটেই দেখতে পাওয়া যায় না। হেডমাষ্টার মহাশয়ের সংগে সর্বপ্রথমই এ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়—তিনি স্পষ্ট ভাষায় বললেন “আমরা ছাত্র এবং ছাত্রীদের বুঝিয়ে দেই তাদের মধ্যে কারো কারো জন্ম ব্যভিচার হতেই হয়েছে, হয়ত ব্যাভিচারী ভাব তাদের মনেও আছে। সেই দুষ্ট ভাবকে দমন করাই হবে তাদের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য, তারা যেন মৌলিক জাতগুলির আচার-ব্যবহার দেখে পথভ্রষ্ট না হয়। শিক্ষক এবং শিক্ষরিত্রীর মুখ থেকে যখন বয়স্ক ছাত্র এবং ছাত্রীরা প্রকাশ্যভাবেই এসব কথা শুনতে পায় তখন তাদের মুখ শুকিয়ে যায় এবং অসৎ প্রবৃত্তিগুলি আপনা হতেই দমিত হয়।

 হেডমাষ্টার মহাশয় হলেন অর্দ্ধ-নিগ্রো। তার শরীর এবং মন একই ধরণের! সমাজের সেবার জন্য নিজের অস্তিত্ব পর্যন্ত বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু তিনি ভেবে পাচ্ছিলেন না কি করে রাষ্ট্রনৈতিক সমকক্ষতা পাওয়া তার সমাজের পক্ষে অল্পায়াসে সম্ভবপর হয়। আমার সংগে সে বিষয়েই তিনি কথা বলতেন। যতটুকু সম্ভবপর ততটুকু উপদেশ দিয়েই সুখী হতাম।

 অর্দ্ধ-নিগ্রো অথবা শ্বেত নিগ্রোদের আকৃতি ইউরোপীয়ানদের হতে সর্বতোভাবে বলিষ্ঠ এবং সুন্দর। তাদের পোষাক যদিও মামুলী তবুও তাদের বিশ্রি দেখায় না। সৌষ্ঠব শরীরে জীর্ণবস্ত্রও অনেক সময় শ্রীবৃদ্ধি করে।

 ইউরোপীয়ানরা কম মজুরী করে প্রচুর অর্থ পায়। আয়াসে এবং বিলাসে সে অর্থ খরচ করে। বিলাস এবং ভোগ যখন চরমে উঠে তখন তারা অভুক্ত এবং অর্দ্ধভুক্ত অর্দ্ধ-নিগ্রোদের ভোগের সামগ্রীতে পরিণত করতে প্রয়াসী হয়। অর্দ্ধ-নিগ্রো অথবা শ্বেতকায় নিগ্রোরা সহজে আত্মবিক্রয় করতে রাজী হয় না তখন তাদের প্রতি ইউরেপীয়ানদের প্রতিশোধ নেবার প্রবৃত্তি আপনিই জেগে উঠে। সেই প্রতিশোধের দৃষ্টান্ত প্রায়ই দেখতে পাওয়া যায়। অর্দ্ধ-নিগ্রো এবং শ্বেতকায় নিগ্রোরা নীরবে আত্মাহুতি দেয়। সংবাদপত্রে সেই সংবাদ বের হয় না। সেরূপ দু’ একটা দৃষ্টান্ত পাওয়ার পর এবং সেরূপ গল্প শুনার পর চোখের জল আপনা হতেই এসে যেত!

 কয়েক দিনের মধ্যেই আমি অর্দ্ধ-নিগ্রো এবং শ্বেতকায় নিগ্রোদের মধ্যে পরিচিত হলাম। তাদের বললাম আর কিছু না পার হাতে লিখে এসব দুর্ঘটনা মাসিক অথবা সাপ্তাহিকের মত পত্রিকা বের করে তাতে প্রকাশ কর এবং প্রত্যেক শিক্ষিত লোককে একদিনের জন্য পড়তে দিয়ে পরের দিন অন্য আর একজন যাতে পড়তে পায় তার ব্যবস্থা কর। আমার উপদেশ কার্যকরী হয়েছিল। কয়েক দিনের মধ্যেই কয়েকখানা হাতের লিখা সাপ্তাহিক বের হয়েছিল।

 রডেসিয়াতে যে সকল ভারতবাসী বাস করে তাদের কাছে অর্দ্ধ-নিগ্রো এবং শ্বেতকায় নিগ্রো পরিচালিত কয়েকখানা সাপ্তাহিক গিয়েছিল। অনেক ইণ্ডিয়ান তাই পড়ে মাথায় হাত দিয়েছিল। লোভী ব্যবসায়ী প্রমাদ গুণেছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল এসব আমারই কাজ সেজন্য আমাকে চাঁদা দেওয়া বন্ধ করেছিল। এতে আমি মোটেই দুঃখিত হই নাই বরং সুখীই হয়েছিলাম অর্দ্ধ-নিগ্রো এবং শ্বেতকায় নিগ্রোদের কিছুটা সাহায্য করতে পেরেছিলাম বলে।

 একদিন একজন শ্বেতকায় নিগ্রো আমাকে জিজ্ঞাসা করল ইউরোপীয়ানদের কাছ থেকে আমি কিরূপ ব্যবহার পেয়েছি। সে যখন অবগত হল অছ্যুঁতের মতই ইউরোপীয়ান সমাজে আমার স্থান তখন সে আমার কাছে প্রস্তাব করল যদি আমি কিছু মনে না করি তবে আমাকে একটি নাইট ক্লাবে নিয়ে যেতে পারে। নাইট ক্লাবে যেতে আমার কোনও আপত্তি ছিল না কারণ শালগ্রামের শোয়া ও বসা দুই সমান।

 শ্বেতকায় নিগ্রোটি আমাকে নেবার জন্য লসমনের ঘরে এল। রাত তখন বারটা। এত রাত্রে বাহিরে যাচ্ছি দেখে লসমনের স্ত্রী কেঁপে উঠলেন। শ্বেতকায় নিগ্রো তাকে গোপনে কি বলল তারপর আমরা পথে বের হয়ে আসলাম। বেশিক্ষণ আমাদের হাটতে হল না, কাছেই একজন নিগ্রো টেক্সিওয়ালা দাঁড়িয়েছিল। ইংগিত করা মাত্র সে আমাদের কাছে আসল এবং আমাদের টেক্সিতে উঠিয়ে নিয়ে গন্তব্যস্থানের দিকে পবন বেগে রওয়ানা হল। দশ মিনিটের মধ্যে আমরা ক্লাবের কাছে পৌঁছলাম। শ্বেতকায় নিগ্রো বলছিল দু’ঘণ্টা পর যেন আমাদের ফিরিয়ে নিতে আসে। বাঁধা দিয়ে বললাম আধ ঘণ্টার বেশি আমি থাকব না। সে যেন আধ ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসে।

 টেক্সী হতে নেমে পেছন দ্বার দিয়ে আমরা ক্লাবের ভিতর পৌছলাম। ক্লাবের ভেতর অনেকগুলি রুম দেখতে পেলাম। কোন রুমে জাঁকালো আলো আর কোন রুমে মিটমিটে। কোথাও নিগ্রো যুবক বসে আছে আর কোথাও ইউরোপীয়ান যুবতীরা ফিস্ ফিস্ করে কথা বলছে। আমরা রুমগুলি দেখে সর্বশেষ রুমে গিয়ে বসলাম। সেখানে কেহই ছিল না। সেখানে পৌঁছেই শ্বেতকায় নিগ্রোকে বললাম প্রচুর পরিমাণে খাদ্য আনতে বল। সে তৎক্ষণাৎ কলিং বেল বাজাল এবং একজন ইউরোপীয়ান বয় আসল। তাকে নানা রকমের খাদ্য একটার পর আর একটা আনতে বললাম। সুপ, কাটলেট, আলু সিদ্ধ, মাছ ভাজা, পায়স এবং সর্বশেষে কাফি খেয়ে ঘড়িতে দেখলাম আধ ঘণ্টার চেয়ে বেশি হয়ে গেছে। বিল চুকিয়ে দিয়ে শ্বেতকায় নিগ্রোকে বললাম “এখানে আর বসা চলে না, আমার পক্ষে নাইট ক্লাবে যা দেখার তা দেখা হয়ে গেছে এখন ঘরে চল। সে প্রতিবাদ করে বলল “তা কি করে হয়, এখনও ম্যানেজারের সংগে দেখা হল না।” আমি দাঁড়ালাম এবং বললাম “যদি আমার সংগে না আস তবে আমি চললাম, এখানে আর থাক! চলে না।

 সাত রকমের খাদ্য খাবার একমাত্র কারণ হল আধ ঘণ্টা সময় কাটানো। যা দেখেছি তাতেই যথেষ্ট হয়েছে, এরবেশি দেখলে হয়ত পেট ফেটে মারা যাব। শ্বেতকায় নিগ্রো আমার কথার ভাবার্থ বুঝতে পারল না। তাকে বুঝানোও শক্ত কাজ ছিল, সেজন্য তাকে টেনে নিয়ে ক্লাব হতে বের হয়ে টেক্সীতে বসলাম। টেক্সী যখন নাইট ক্লাব হতে অলেক দুরে তখন শ্বেতকায় নিগ্রোকে বললাম এরূপ ঘটনা পৃথিবীর সর্বত্রই ঘটে নুতন কিছুই নয়। তোমাদের যে বিদ্যালয় তাতে যে সমস্ত ছেলেমেয়ে পড়ে তাদের মুখ দেখলেই এসব নাইট ক্লাবের অস্তিত্ব আছে বুঝতে পারা যায়, এসব স্থানে বেশিক্ষণ বসতে নাই, শ্বেতকার নিগ্রো দুঃখিত হল, কিন্তু সেরূপ দুঃখের কোন মূল্য নাই।

 ঘরে ফিরে আসার পর লসমনের স্ত্রী নাইট ক্লাব সম্বন্ধে একটি কথাও আমায় জিজ্ঞাসা করলেন না। পরের দিন লসমনকেও এ বিষয়ে একেবারে নির্বিকার থাকতে দেখে আমাকেই এ সম্বন্ধে প্রথম কথা বলতে হল। লসমন আমাকে হুসিয়ার করিয়ে দিয়ে বললেন এসব কথা ঘরে বসে বলা কওয়া চলে না। চলুন মাঠে যাই সেখানেই এসব কথা বলার উপযুক্ত স্থান। যাদের আমরা অসৎ বলি, সমাজ হতে তাড়িয়ে দেই তাদের পক্ষে এরূপভাবে সংযত ভাব দেখানো নিশ্চয়ই সুখের বিষয়। লসমনের বাড়ী হতে বিদায়ের দিন লসমন বলেছিলেন “আপনি আর কখনও নাইট ক্লাবে যাবেন না। নাইট ক্লাবে গেলে আপনার দুর্ণাম হবে এবং আমাদেরও এ দুর্ণামের বোঝা বইতে হবে, কারণ এখন আপনি আমাদের মধ্যে আছেন এবং ভবিষ্যতেও থাকতে বাধ্য হবেন। কি ভেবে লসমন আমাকে তাদের মধ্যে থাকতে হবে বলেছিলেন তার কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কারণ যাই হউক না কেন যতই দক্ষিণের দিকে চলছিলাম ততই মনে হচ্ছিল অর্দ্ধ-নিগ্রোরা বেশ শিক্ষিত এবং তথাকথিত উচ্চবর্ণের হিন্দুরা প্রাচুর্যে মদমত্ত।

 সেলিসবাড়ীতে দেখার মত কিছুই ছিল না, সেজন্য অন্যত্র যাওয়াই ভাল মনে করছিলাম। কথা প্রসংগে একদিন কয়েকজন অর্দ্ধ-নিগ্রোকে বললাম ভিক্টোরিয়াতে গিয়ে জাম্বাবী ধ্বংসস্তূপ দেখা অবশ্য কর্তব্য। ভিক্টোরিয়া ফলস্ না দেখলেও চলবে না। আমার প্রস্তাব শুনে একজন অর্দ্ধ-নিগ্রো বললে “উভয় স্থানই দেখা আপনার পক্ষে সমূহ কর্তব্য। কিন্তু এ-সকল স্থানে সাইকেলে করে যদি যেতে চান তবে অন্তত চার মাস সময় লাগবে। পথে বন্যজীব ছেয়ে রয়েছে। এমতাবস্থায় রেল গাড়ীতে ভ্রমণ করাই কর্তব্য কিন্তু ভুলবশত যদি আপনার পরিকল্পনা কোন ইণ্ডিয়ানের কাছে বলে ফেলেন তবেই হবে মুস্কিল। তারাই আপনাকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করে। অর্দ্ধ-নিগ্রোটি দুঃখ করে বললে ইণ্ডিয়ানরা এদেশে অনেক সুযোগ হারিয়েছে। তারা বাস্তববাদী নয়! এখান থেকে সাইকেলে করে বুলবায়ো যান এবং সেখানকার দ্রষ্টব্য স্থানগুলি দেখে সর্বপ্রথম যাবেন ভিক্টোরিয়া ফলস্। ভিক্টোরিয়া ফলস্ দেখে পুনরায় বুলবায়োতে ফিরে এসে কয়েকদিন বিশ্রাম করবেন, তারপর যাবেন জাম্বাবী ধ্বংসস্তূপ দেখতে। এসব দেখা হয়ে গেলে পুনরায় বুলবায়োতে ফিরে গিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার দিকে রওয়ানা হবেন। অর্দ্ধনিগ্রোদের প্রস্তাব আমার মনোমত হওয়ায় সত্বরই বুলবারোর দিকে রওয়ানা হতে মনস্থ করি।

 সেলিসবারীতে ছোট্ট একটি মিউজিয়ম আছে। সেখানে সকলকেই অবাধে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়। দেখলাম ভূতত্ব সম্বন্ধেই নানা রকমের পাথর এবং কয়েকটা দুষ্পাপ্য বন্যপশুর অস্থি কঙ্কাল পড়ে আছে। যারা মনুষ্যতত্ব বিজ্ঞান সম্বন্ধে গবেষণা করতে চায় তাদের পক্ষে লণ্ডন মিউজিয়মই যথেষ্ট। সেলিসবারীর ঠেলা ধাক্কা খেয়ে সেই ছোট্ট মিউজিয়মের দিকে ধেয়ে যাওয়া কোনমতেই কর্তব্য নয়।

 সেলিসবারীর প্রত্যেকটি ইউরোপীয়ান আমাদের দেশের নবাব, সুলতান, রাজা, মহারাজা বিশেষ। এদের নাক-সিটকিয়ে পথে চলতে দেখে বেশ রাগ হয়। যেখানে ইউরোপীয়ান রাজমিস্ত্রি দৈনিক পঞ্চাশ শিলিং করে মজুরী পায় সেখানে তারা আমাদের দেশের নবাব, সুলতান, মহারাজাদের মত চলবে না কেন? স্বর্গের স্বর্গত্ব নরকের অস্তিত্বের উপরেই নির্ভর করে।

 সেলিসবারীর কাছেই নিগ্রো গ্রাম রয়েছে। সেখানে উই পোকার ঢিবির মত কতকগুলি মেটে ঘরে নিগ্রোরা বাস করে। বিজলী বাতি অথবা জলের কল সেখানে নাই। আছে সর্বত্র দুর্গন্ধ। দুর্গন্ধ না হয়ে যায় কোথায়? যেখানে ভাল ড্রেন নাই, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বালাই নাই সেখানে দুর্গন্ধ হবেই। নিগ্রোরা পোল-ট্যাক্স নামে যে ট্যাক্স দেয় যদিও সেই অর্থ নিগ্রোদের শিক্ষার্থে-ই খরচ হয় তবুও বলতে বাধ্য, নিগ্রো শিক্ষা বিভাগের শ্বেতকায় রাজকর্মচারীরাই ট্যাক্সের নিরানব্বই ভাগ খেয়ে ফেলে। এরপর যা থাকে তাতে নিগ্রোদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের উচ্চ ধাপে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভবপর হয় না। নিরক্ষরতা, কুশিক্ষা, দুর্গন্ধ, অভাবের তাড়না, স্বর্গরাজ্য সেলিসবারীর আধ মাইলের মধ্যেই দেখতে পাওয়া যায়, সেজন্যই বোধহয় স্বর্গের স্বর্গত্ব উপলব্ধি করা যায় সত্বর এবং বেশ ভাল করে।

 সেলিসবারীর ইউরোপীয়ানদের সংগে পরিচিত হবার জন্য একদিন মাত্র ভিক্ষা করতে বের হই। বড় বড় বাড়ীর ভেতর প্রবেশ করা আমার মত পথিকের পক্ষে বড়ই কষ্টকর কাজ তা আমি জানতাম, তবুও ইচ্ছা করেই অপমানিত হবার জন্য কয়েকজন বড়লোকের দ্বারে ভিক্ষাপত্র হাতে করে দাঁড়াই। অনেক বড়লোকই আমার ভিক্ষাপত্র আগ্রহের সহিত পড়েন এবং আমার সংগে কথা বলার জন্য আগ্রহান্বিত হয়েও কোথায় নিয়ে বসাবেন সে চিন্তা করেই প্রচুর অর্থ দিয়ে বিদায় করতে রাধ্য হন। যেস্থানে কথা বলতে প্রয়াসী হয়ে প্রচুর অর্থ পাওয়া যায় সেখানে ভিক্ষা ভিক্ষাবৃত্তিতে পরিণত হয় ভেবে বড়লোকদের বাড়ীতে ভিক্ষা করা বন্ধ করে দিয়ে, ছোট ছোট দোকানে ভিক্ষা করতে যাই, সেখানে ত তারা আমাকে অপ্রত্যাশিত ভাবে দান করেই সুখী হয়েছে। কিন্তু ঘরে বসিয়ে দুটি কথা শুনার সাহস করে নাই কি জানি যদি জাতিচ্যুত হয়? জাতিচ্যুত হওয়ার অভিসাপ মর্মে মর্মে অনুভব করে যখন লসমনের ঘরে ফিরলাম তখন আপন সমাজের কথা আপনা হতেই মনে পড়ল। অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকলাম। কোথাও যেতে আর ইচ্ছা হল না। দুপুর বেলা যখন লসমনের স্ত্রী খেতে ডাকলেন তখন তিনি আমার শুষ্ক মুখ দেখেই বললেন নিশ্চয়ই আপনাকে কেহ অপমান করেছে। তাঁকে আমার অভিজ্ঞতার কথা বলার পর তিনি বললেন “আপনদের দেশের লোক কিন্তু এ বিষয় নিয়ে একটুও মাথা ঘামায় না। আমরা যদিও এরূপ নিকৃষ্ট আবহাওয়ার মধ্যে বাস করি তবুও যখনই আমাদের আত্মসম্মানে ঘা লাগে তখনই আমরা ইউরোপীয়ানদের কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি। ভারতবাসীরা ইউরোপীয়ানদের দ্বারা অপমানিত এবং ঘৃণিত হবার পরও আমাদের সংগে মেলামেশা করতে ভালবাসে না। এটা কি পরিতাপের বিষয় নয়? যদি ভারতবাসী আমাদের সংগে যোগ দেয় তবে বোধহয় আমরা ইউরোপীয়ানদের কোণঠাসা করতে পারি।

 পরের দিন মস্তবড় একজন মুসলমান ব্যবসায়ীর দোকানে গিয়ে ইউরোপীয়ানদের ব্যবহারের কথা বললাম এবং প্রতিকারের জন্য ইন্দো আফ্রিকানদের সহযোগীতা করতে অনুরোধ করায় তিনি আমার প্রস্তাব শুনে একেবারে তেড়েবেড়ে উঠে বললেন “যাদের শরীরে নানারূপ রক্তের সংমিশ্রণ তাদের সংগে হাত মেলানো কোনমতেই চলে না। বৃটিশ ত ভাল জাত। তাদের পেছনে থাকাই ভাল। নিগ্রো অথবা অর্দ্ধ-নিগ্রোর সংস্পর্শে আসা কোন মতেই ভাল হবে না।” এ ধরণের কথা শুধু তার কাছ থেকেই শুনি নাই, হিন্দুদের কাছ থেকেও শুনেছি। একজন মৎস্যজীবি হিন্দুর সংগে এ সম্বন্ধে কথা হয়। ভদ্রলোক ব্যবসা করে বেশ দু’পয়সা কামিয়েছেন। তার কাছে যখন আমার প্রস্তাব উত্থাপন করলাম তা শুনে তিনি একেবারে অবাক হয়ে গেলেন। অনেকক্ষণ চিন্তা করে বললেন “তা কি করে হয়?”

 লসমনের উদ্যোগে আমার বিদায়ের পূর্বে একটি সভা হয়। অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার পর বললাম “আমার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা কিছুটা শুনলেন এখন আফ্রিকা ভ্রমণের অজিজ্ঞতা থেকে বলছি “যদি আপনাদের এদেশে বাস করতে হয় তবে নিগ্রো এবং অর্দ্ধ-নিগ্রোদের সাথে ঐক্য রেখে বাস করতে হবে, নতুবা জাঞ্জিবারের কাছে পেম্বাদ্বীপে আরবগণ ইণ্ডিয়ান মুসলমানদের যেমন করে তাড়িয়েছে আপনারাও তেমনিভাবে রডেসিয়া হতে বিতাড়িত হবেন। আমার কথা শুনে আমার প্রতি অনেকেই বিতশ্রদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু বর্তমানে বুঝতে পারছেন আমার কথা অক্ষরে অক্ষরে ফলতে বসেছে। নিগ্রো এবং অর্দ্ধ-নিগ্রোদের সাহায্যে স্থানীয় সরকার ইণ্ডিয়ানদের হয়রাণ করবার জন্য লেলিয়ে দিয়েছে। ইণ্ডিয়ানরা ভীত হয়ে ভারত সরকারের আশ্রয় ভিক্ষা করছে। যদি ভারতবাসীর রাষ্ট্রনৈতিক দূরদৃষ্টি থাকত তবে আজ আর বিপদে পড়তে হত না।