নৌকাডুবি-১৮ (৩)

উইকিসংকলন থেকে
Jump to navigation Jump to search

কমলা কহিল, “বঁটি হইলে আমি কাটিয়া দিতে পারি, ছুরিতে পারি না।”
রমেশ কহিল, “তুমি মনে করিতেছ বঁটি এখানে নাই?” চাকরকে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিল, “বঁটি আছে?”
সে কহিল, “আছে–রাত্রের আহারের জন্য সমস্ত আনা হইয়াছে।”
রমেশ কহিল, “ভালো করিয়া ধুইয়া একটা বঁটি লইয়া আয়।”
চাকর বঁটি লইয়া আসিল। কমলা জুতা খুলিয়া বঁটি পাতিয়া নীচে বসিল এবং হাসিমুখে নিপুণহস্তে ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া ফলের খোসা ছাড়াইয়া চাকলা চাকলা করিয়া কাটিতে লাগিল। রমেশ তাহার সম্মুখে মাটিতে বসিয়া ফলের খণ্ডগুলি থালায় ধরিয়া লইল।
রমেশ কহিল, “তোমাকেও খাইতে হইবে।”
কমলা কহিল, “না।”
রমেশ কহিল, “তবে আমিও খাইব না।”
কমলা রমেশের মুখের উপরে দুই চোখ তুলিয়া কহিল, “আচ্ছা, তুমি আগে খাও, তার পরে আমি খাইব।”
রমেশ কহিল, “দেখিয়ো, শেষকালে ফাঁকি দিয়ো না।”
কমলা গম্ভীরভাবে ঘাড় নাড়িয়া কহিল, “না, সত্যি বলিতেছি, ফাঁকি দিব না।”
বালিকার এই সত্যপ্রতিজ্ঞায় আশ্বস্ত হইয়া রমেশ থালা হইতে এক টুকরা ফল লইয়া মুখে পুরিয়া দিল।
হঠাৎ তাহার চিবানো বন্ধ হইয়া গেল। হঠাৎ দেখিল, তাহার সম্মুখেই দ্বারের বাহিরে যোগেন্দ্র এবং অক্ষয় আসিয়া উপস্থিত।
অক্ষয় কহিল, “রমেশবাবু, মাপ করিবেন–আমি ভাবিয়াছিলাম, আপনি এখানে বুঝি একলাই আছেন। যোগেন, খবর না দিয়া হঠাৎ এমন করিয়া আসিয়া পড়াটা ভালো হয় নাই। চলো, আমরা নীচে বসি গিয়া।”
বঁটি ফেলিয়া কমলা তাড়াতাড়ি উঠিয়া পড়িল। ঘর হইতে পালাইবার পথেই দুজনে দাঁড়াইয়া ছিল। যোগেন্দ্র একটুখানি সরিয়া পথ ছাড়িয়া দিল, কিন্তু কমলার মুখের উপর হইতে চোখ ফিরাইল না–তাহাকে তীব্রদৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করিয়া দেখিয়া লইল। কমলা সংকুচিত হইয়া পাশের ঘরে চলিয়া গেল।


পরবর্তী পাতা