নৌকাডুবি-২৩ (২)

উইকিসংকলন থেকে
Jump to navigation Jump to search

কমলার তাহা মনঃপূত হইল না। সে নিজেই উৎসাহসহকারে কাজ আরম্ভ করিল। এই অনভ্যস্ত প্রণালীর অসুবিধাতে তাহার কৌতুকবোধ হইল। মসলা লাফাইয়া উঠিয়া চারি দিকে ছিটকাইয়া পড়ে, আর সে হাসি রাখিতে পারে না। তাহার এই হাসি দেখিয়া রমেশেরও হাসি পায়।
এইরূপে মসলা কোটার অধ্যায় শেষ করিয়া কোমরে আঁচল জড়াইয়া একটা দরমাঘেরা জায়গায় কমলা রান্না চড়াইয়া দিল। কলিকাতা হইতে একটা হাঁড়িতে করিয়া সন্দেশ আনা হইয়াছিল, সেই হাঁড়িতেই কাজ চালাইয়া লইতে হইল।
রান্না চড়াইয়া দিয়া কমলা রমেশকে কহিল; “তুমি যাও, শীঘ্র স্নান করিয়া লও, আমার রান্না হইতে বেশি দেরি হইবে না।”
রান্নাও হইল, রমেশও স্নান করিয়া আসিল। এখন প্রশ্ন উঠিল, থাল তো নাই, কিসে খাওয়া যায়?
রমেশ অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে কহিল, “খালাসিদের কাছ হইতে সানকি ধার করিয়া আনা যাইতে পারে।”
কমলা কহিল, “ছি!”
রমেশ মৃদুস্বরে জানাইল, এরূপ অনাচার পূর্বেও তাহার দ্বারা অনুষ্ঠিত হইয়াছে।
কমলা কহিল, “পূর্বে যা হইয়াছে তা হইয়াছে, এখন হইতে হইবে না–আমি ও দেখিতে পারিব না।”
এই বলিয়া সে নিজেই সন্দেশের মুখে যে সরা ছিল, তাহাই ভালো করিয়া ধুইয়া আনিয়া উপস্থিত করিল। কহিল, “আজকের মতো তুমি ইহাতেই খাও, পরে দেখা যাইবে।”
জল দিয়া ধুইয়া আহারস্থান প্রস্তুত হইলে রমেশ শুদ্ধভাবে খাইতে বসিয়া গেল। দুই-এক গ্রাস মুখে তুলিয়া কহিল, “বাঃ, চমৎকার হইয়াছে।”
কমলা লজ্জিত হইয়া কহিল, “যাও, ঠাট্টা করিতে হইবে না।”
রমেশ কহিল, “ঠা ঠাট্টা নয় তাহা এখনি দেখিতে পাইবে।” বলিয়া পাতের অন্ন দেখিতে দেখিতে নিঃশেষ করিয়া আবার চাহিল। কমলা এবারে অনেক বেশি করিয়া দিল। রমেশ ব্যস্ত হইয়া কহিল, “ও কী করিতেছ? তোমার নিজের জন্য কিছু আছে তো?”
“ঢের আছে–সেজন্যে তোমার ভাবিতে হইবে না।”
রমেশের তৃপ্তিপূর্বক আহারে কমলা ভারি খুশি হইল। রমেশ কহিল, “তুমি কিসে খাইবে?”
কমলা কহিল, “কেন, ঐ সরাতেই হইবে।”
রমেশ অস্থির হইয়া উঠিল। কহিল, “না, সে হইতেই পারে না।”
কমলা আশ্চর্য হইয়া কহিল, “কেন, হইবে না কেন?”
রমেশ কহিল, “না না, সে কি হয়!”
কমলা কহিল, “খুব হইবে–আমি সব ঠিক করিয়া লইতেছি। উমেশ, তুই কিসে খাইবি?”
উমেশ কহিল, “মাঠাকরুন, নীচে ময়রা খাবার বেচিতেছে তাহার কাছ হইতে শালপাতা চাহিয়া আনিতেছি।”
রমেশ কহিল, “তুমি যদি ঐ সরাতেই খাইবে তো আমাকে দাও, আমি ভালো করিয়া ধুইয়া আনিতেছি।”
কমলা কেবল সংক্ষেপে কহিল, “পাগল হইয়াছ!” ক্ষণকাল পরে সে বলিয়া উঠিল, “কিন্তু পান তৈরি করিতে পারি নাই, তুমি আমাকে পান আনাইয়া দাও নাই।”
রমেশ কহিল, “নীচে পানওয়ালা পান বেচিতেছে।”
এমনি করিয়া অতি সহজেই ঘরকন্না শুরু হইল। রমেশ মনে মনে উদ্‌বিগ্ন হইয়া উঠিল। সে ভাবিতে লাগিল-দোম্পত্যের ভাবকে কেমন করিয়া ঠেকাইয়া রাখা যায়।
গৃহিণীর পদ অধিকার করিয়া লইবার জন্য কমলা বাহিরের কোনো সহায়তা বা শিক্ষার প্রত্যাশা রাখে না। সে যতদিন তাহার মামার বাড়িতে ছিল, রাঁধিয়াছে-বাড়িয়াছে, ছেলে মানুষ করিয়াছে, ঘরের কাজ চালাইয়াছে। তাহার নৈপুণ্য, তৎপরতা ও কর্মের আনন্দ দেখিয়া রমেশের ভারি সুন্দর লাগিল; কিন্তু সেইসঙ্গে এ কথাও সে ভাবিতে লাগল, ‘ভবিষ্যতে ইহাকে লইয়া কী ভাবে চলা যাইবে? ইহাকে কেমন করিয়া কাছে রাখিব, অথচ দূরে রাখিয়া দিব? দুই জনের মাঝখানে গণ্ডির রেখাটা কোন্‌খানে টানা উচিত?’ উভয়ের মধ্যে যদি হেমনলিনী থাকিত তাহা হইলে সমস্তই সুন্দর হইয়া উঠিত। কিন্তু সে আশা যদি ত্যাগ করিতেই হয়, তবে একলা কমলাকে লইয়া সমস্ত সমস্যার মীমাংসা যে কী করিয়া হইতে পারে তাহা ভাবিয়া পাওয়া কঠিন। রমেশ স্থির করিল–আসল কথাটা কমলাকে খুলিয়া বলাই উচিত, ইহার পর আর চাপিয়া রাখা চলে না।


পরবর্তী পাতা