বিষয়বস্তুতে চলুন

পঞ্চরত্ন/জনক গীতা

উইকিসংকলন থেকে

জনক গীতা॥

“বিদুরের ক্ষুদ।”

কাতরাশ্রু, সকাতরে মুছায় যে করে,
নিয়ত আশ্রিতে রক্ষা করে যেই করে,
যে করে শঙ্করে সেবা নিয়তই করে,
নিয়ত যে করে শিব নাম জপ করে,
দরিদ্র ব্রাহ্মণ আজি ধরি যুগ্মকরে.
বিদুরের ক্ষুদ দিল সে রাজীব করে।

 শ্রীরাখালদাস মুখোপাধ্যায়।

“জনক পূজা।”

মিত্র যাঁর সদাশিব, সদাশিব দাতা,
কমলা দুহিতা যাঁর, কেশব জামাতা,
মহাযোগী, মহাঋষি, জ্ঞানের ভাণ্ডার,
কি দিয়া পূজিব তাঁরে কি আছে আমার,
আপনার প্রিয় বস্তু দেখিলে সবাই
পরিতুষ্ট হয়, বলি, করযোড়ে তাই
তাঁর গীতা দিয়া তাঁর করিব পূজন,
গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজা করয়ে যেমন।

 শ্রী রাখালদাস মুখোপাধ্যায়।

জনক গীতা॥

মনোদেহসমুত্থাভ্যাং
দুঃখাভ্যামর্দ্দিতং জগত্‌।
তয়োর্ব্যাস সমাসাভ্যাং
শমোপায়-মিমং শৃণু॥১॥

মন, দেহ সমুৎপন্ন দুঃখের লাগিয়া,
রয়েছে জগৎ সদা পীড়িত হইয়া,
শুন এবে সে দুঃখের শান্তি যাতে হয়,
সংক্ষেপে বিস্তারে বলি তাহার উপায়॥১॥

ব্যাধেরনিষ্টসংস্পর্শাত্
শ্রমাদিষ্টবিসর্জ্জনাত্‌।
দুঃখং চতুর্ভিঃ শারীরং
কারণৈঃ সম্প্রবর্ত্ততে॥২॥

ব্যাধি, ক্ষতি, পরিশ্রম, ইষ্ট বিসর্জ্জন,
শারীরিক দুঃখপ্রদ চারিটি কারণ॥২॥

সদা তত্‌প্রতিকারাচ্চ
সততঞ্চাবিচিন্তনাত্।
আধি-ব্যাধি-প্রশমনং
ক্রিয়া-যোগ-দ্বয়েন তু॥৩॥

ব্যাধি প্রতিকার হেতু ঔষধ সেবন
করিলে যেমন হয় ব্যাধি প্রশমন,
তেমনি সতত চিন্তাত্যাগ আর যোগ,
নষ্ট করে আধিরূপ মানসিক রোগ॥৩॥

মতিমন্তো হ্যতো বৈদ্যাঃ
শমং প্রাগেব কুর্ব্বতে
মানসস্য প্রিয়াখ্যানৈঃ
সম্ভোগোপনয়ৈর্নৃণাম্‌॥৪॥

প্রথমে রোগীর কাছে বিজ্ঞ বৈদ্যগণ,
যাইয়া বলেন কত মধুর বচন,
সুখভোগ্য ভোজ্যদান প্রসঙ্গ তুলিয়া,
মানসিক দুঃখ দেন প্রশম করিয়া॥৪॥

মানসেন হি দুঃখেন
শরীরমুপতপ্যতে।
অয়ঃপিণ্ডেন তপ্তেন
কুম্ভসংস্থমিবোদকম্॥৫॥

হয় যদি মানসিক দুঃখের উদয়,
শরীর সন্তপ্ত তাহে হইবে নিশ্চয়।
যেমন প্রতপ্ত লৌহ কলসীর জলে
ফেলিলে উত্তপ্ত করে সকল সলিলে॥৫॥

মানসং শময়েত্ তস্মাজ্
জ্ঞানেনাগ্নিমিবান্বুনা।
প্রশান্তে মানসে হাস্য
শারীরমুপশাম্যতি॥৬॥

মানসিক দুঃখরূপ অগ্নি নিবারণ—
করিবারে কর তাহে জ্ঞানাম্বু সিঞ্চন,
মানসিক তাপ যদি নিবারণ হয়,
শারীরিক তাপ তবে যাইবে নিশ্চয়॥৬॥

মনসো দুঃখমূলন্তু
স্নেহ ইত্যুপলভ্যতে।
স্নেহাত্তু সজ্জতে জন্তু
দুঃখযোগমুপৈতিচ॥৭॥

স্নেহই মানস দুঃখের কারণ,
স্নেহ হতে হয় রাগের বর্দ্ধন,
রাগ হতে হয়, বিষয় চিন্তন
তাহাই জীবের দুঃখের কারণ॥৭॥

স্নেহমূলানি দুঃখানি
স্নেহজানি ভয়ানি চ।
শোকোহর্ষৌতথায়াসঃ
সর্ববং স্নেহাত্ প্রবর্ত্ততে॥৮॥

স্নেহেতে উৎপন্ন, হর্ষ, শোক, ভয়,
আয়াস ইহাও স্নেহেতে উদয়,
এ সকল দেখি দুঃখ অনুকূল,
স্নেহই ত যত অনর্থের মূল॥৮॥

স্নেহাদ্ভাবোহনুরাগশ্চ
প্রজজ্ঞে বিষয়ে তথা।
অশ্রেয়স্কাবুভাবেতৌ
পূর্ব্বস্তত্র গুরুঃ স্মৃতঃ॥৯॥

বিষয় ভাবনা স্নেহ্ন হতে হয়,
বিষয়ানুরাগ স্নেহেতে উদয়,
উভয়েই করে মনের বিকার,
প্রথমোক্ত কিন্তু অতি গুরুতর॥৯॥

কোটরাগ্নি-র্যথা শেষং
সমূলং পাদপং দহেৎ।
ধর্ম্মাথৌ তু তথাল্লোঽপি
রাগদোষো বিনাশয়েৎ॥১০॥

বৃক্ষ কোটরস্থ যথা হুতাশন,
সমূলে পাদপে করয়ে দহন,
তেমনি মানবে বিষয়ের আশ,
ধর্ম্ম অর্থ সব করয়ে বিনাশ॥১০॥

বিপ্রযোগেণ তু ত্যাগী
দোষদর্শী সমাগমাত্‌।
বিরাগং ভজতে জন্তু
নির্ব্বেরো নিরবগ্রহঃ॥১১॥

বিষয় বিহীন ব্যক্তি কভু ত্যাগী নয়,
বিষয়ে যে দোষ দেখে সেই ত্যাগী হয়,
সেই ত্যাগী এ জগতে হ’ন বৈরিহীন,
জনমধ্যে দোষহীন এবং স্বাধীন॥১১॥

তস্মাত্ স্নেহং ন লিপ্সেত
মিত্রেভ্যো ধনসঞ্চয়াত্।
স্বশরীর-সমুত্থঞ্চ
জ্ঞানেন বিনিবর্ত্তয়েত্॥১২॥

মিত্রের নিকট হ’তে ধন লব্ধ স্নেহ
লভিবার ইচ্ছা কভু না করিবে কেহ।
যেই স্নেহ সমুৎপন্ন শরীর হইতে,
জ্ঞান দ্বারা সদা তাহা হবে নিবারিতে॥১২॥

জ্ঞানান্বিতেষু যুক্তেষু
শাস্ত্রজ্ঞেষু কৃতাত্মস্থ।
ন তেষু সজ্জতে স্নেহঃ
পদ্মপত্রেধিবোদকম্॥১৩॥

নিত্য বস্তু পাইবারে ব্যগ্র যত জন,
বিবেকী, বিশুদ্ধচিত্ত, বিজ্ঞ সুধীগণ
তাঁদের অন্তর স্নেহাসক্ত কভু নয়,
পদ্মপত্রে বারি যথা লিপ্ত নাহি হয়॥১৩॥

রাগাভিভূতঃ পুরুষঃ
কামেন পরিকৃষ্যতে।
ইচ্ছা সঞ্জায়তে তস্য
ততস্তৃষ্ণা বিবর্দ্ধতে॥১৪॥

বিষয়ানুরাগে অভিভূত যেই হয়,
তাহারি অন্তরে হয় কামনা উদয়,
কামনা হইতে হয় বাসনা ঘটন,
বাসনা হইতে হয় তৃষ্ণা বিবর্দ্ধন॥১৪॥

তৃষ্ণা হি সর্ব্বপাপিষ্ঠা
নিত্যোদ্বেগকরী স্মৃতা।
অধর্ম্মবহুলা চৈব
ঘোরা পাপানুবন্ধিনী॥১৫॥

এই ঘোরা পাপীয়সী তৃষ্ণা মানবের,
উদ্বেগকারিণী, প্রদায়িনী অধর্ম্মের॥১৫॥

যা দুস্ত্যজা দুর্ম্মতিভি
র্যা ন জীর্যতি জীর্য্যতঃ।
যোহসৌ প্রাণান্তিকো রোগ
স্তাং তৃষ্ণাং ত্যজতঃ সুখম্॥১৬॥

এই যে বিষয় তৃষ্ণা, মূঢ়মতি জন,
পরিত্যাগ করিবারে পারে না কখন,
শরীর হইলে শীর্ণ বিষয়ের তৃষা,
জীর্ণ হইবার তবু নাহি থাকে আশা,
প্রাণান্তিক রোগ ইহা, যে জন ইহাকে
ত্যাগ করিবারে পারে, সেই থাকে সুথে॥১৬॥

অনাদ্যন্তা তু সা তৃষ্ণা
অন্তর্দ্দেহগতা নৃণাম্‌।
বিনাশয়তি ভূতানি
অযোনিজ ইবানলঃ॥১৭॥

এ বিষয় তৃষ্ণা হয় আদ্যন্ত বিহীন,
অন্তরের অন্তস্তলে হইয়া বিলীন,
দগ্ধকরে অযোনিজ অনলের প্রায়,
পরিশেষে মানবের বিনাশ ঘটায়॥১৭॥

যথৈধঃ স্বসমুত্থেন
বহ্নিনা নাশমিচ্ছতি।
তথাহকৃতাত্মা লোভেন
সহজেন বিনশ্যতি॥১৮॥

দেহোৎপন্ন অগ্নিযোগে যেমন ইন্ধন,
সমূলে পুড়িয়া পরে হয় সে নিধন,
সেইরূপ সহজাত লোভের লাগিয়া,
অকৃতাত্মা মূঢ় যায় বিনাশ হইয়া॥১৮॥

রাজতঃ সলিলাদগ্নে
শ্চৌরিতঃ স্বজনাদপি।
ভয়মর্থবতাং নিত্যং
মৃত্যোঃ প্রাণভূতামিব॥১৯॥

যেমন মানবগণ মরণের তরে,
ভীত হয়ে এ সংসারে সদা বাস করে,
তস্কর, নৃপতি, বহ্ণি, বারি, আত্মজন―
হতে, ভীত ধনবান্ সদাই তেমন॥১৯॥

যথা হ্যামিষমাকাশে
পক্ষিভিঃ শ্বাপদৈর্ভুবি।
ভক্ষ্যতে সলিলে মৎসৌ
স্তথা সর্ব্বত্র বিত্তবান্॥২০॥॥

আকাশে আমিষ রাশি করিলে রক্ষণ
ভক্ষণ করয়ে তাহা যত পক্ষিগণ,
জলে খায় মৎস্যগণ, ভূমিতে শ্বাপদ,
বিত্তবানে বিদ্যমান সদাই বিপদ॥২০॥

অর্থ এব হি কেষাঞ্চিদ্
অনর্থং ভজতে নৃণাম্।
অর্থশ্রেয়সি চাসক্তো
ন শ্রেয়ো বিন্দতে নরঃ॥২১॥

অনেকের পক্ষে অর্থ, ঘটায় কত অনর্থ
অর্থকে যে শ্রেয়ঃ জ্ঞান করে।
আসক্ত হইয়া তাহে, মোহিত হইয়া রহে,
সে কভু না সুখী হতে পারে॥২১॥

তস্মাদর্থাগমাঃ সর্ব্বে
লোভমোহবিবর্দ্ধনাঃ
কার্পণ্যং দর্পমানৌ চ
ভয়মুদ্বেগ এব চ।
অর্থজানি বিদুঃ প্রাজ্ঞা
দুঃখান্যেতানি দেহিনাম্‌॥২২॥

সে কারণে বিজ্ঞজন, লোভ মোহ বিবর্দ্ধন,
কৃপণতা, দর্প, অহঙ্কার।
চিন্তাভয়বৃদ্ধিকর, জানেন গুণ অর্থের,
অর্থে নর বহে দুঃখ ভার॥২২॥

অর্থস্যোত্ পাদনে চৈব
পালনে চ তথা ক্ষয়ে।
সহন্তে চ মহদ্ দুঃখং
ঘ্নন্তি চৈবার্থকারণাত্॥২৩॥

অর্থ উপার্জ্জনে যত দুঃখ পেতে হয়,
রক্ষণে বিনাশে তার কিছু কম নয়,
এমন কি অর্থের তরে অনেকের প্রাণ
ছাড়িয়া মৃত্যুর পথে করেছে প্রয়াণ॥২৩॥

অর্থাদ্ দুঃখং পরিত্যক্তুঃ
পালিতাশ্চৈব শত্রবঃ।
দুঃখেন চাধিগম্যন্তে
তস্মান্নাশান্ন চিন্তয়েত্॥২৪॥

দুঃখনিবারণ তরে, নিজ অর্থ দান ক’রে
করা যায় যাদের পালন।
তারাই অর্থের তরে, কতই শত্রুতা ক’রে
হয় পুনঃ দুঃখের কারণ॥
অতএব সেই অর্থ নাশ যদি হয়,
তার তরে চিন্তা করা কভু বিধি নয়॥২৪॥

অসন্তোষপরা মূঢ়াঃ
সন্তোষং যান্তি পণ্ডিতাঃ।
অন্তো নাস্তি পিপাসায়াঃ
সন্তোষঃ পরমং সুখম্॥
তস্মাৎ সন্তোষমেবেহ
ধনং পশ্যন্তি পণ্ডিতাঃ॥২৫॥

সদা অসন্তোষী হয় যত মূর্খগণ,
সন্তোষে সদাই সুধী করেন যাপন,
পিপাসার অন্ত নাই, সুখ সন্তোষেতে,
সন্তোষ প্রধান ধন বলেন পণ্ডিতে॥২৫॥

অনিত্যং যৌবনং রূপং
জীবিতং রত্নসঞ্চয়ঃ।
ঐশ্বর্য্যং প্রিয়সংবাসো
গৃধ্যেত্তত্র ন পণ্ডিতঃ॥২৬॥

জীবন যৌবন, সঞ্চয় রতন,
রূপৈশ্বর্য্য প্রিয়জন।
জানিয়া অনিত্য, যতেক পণ্ডিত,
বিরাগী তাহাতে হন॥২৬॥

তজেত সঞ্চয়াংস্তস্মা
ত্তজ্জান্ ক্লেশান্ সহেত চ।
ন হি সঞ্চয়বান্ কশ্চিদ্
দৃশ্যতে নিরুপদ্রবঃ।
অতশ্চ ধার্ম্মিকৈঃ পুংভি
রনীহার্থঃ প্রশস্যতে॥২৭॥

শরীরের ক্লেশ সহি ধনের সঞ্চয়,
অতএব, করা কভু উপযুক্ত নয়।
ধনবান নহে কভু আপদ বিহীন,
ধার্ম্মিকের কাছে তাই শ্রেষ্ঠ লোভহীন॥২৭॥

ধর্ম্মার্থং যস্য বিত্তেহা
বরং তস্য নিরীহতা।
প্রক্ষালনাদ্ধি পঙ্কস্য
দূরাদস্পর্শনং বরম্॥২৮॥

ধরম করম তরে, অর্থের যে চেষ্টা করে,
নিশ্চেষ্টতা তার পক্ষে ভাল,
সর্ব্বাঙ্গে মাখিয়া পঙ্ক, ধোয়াপেক্ষা সেই পঙ্ক
পঙ্কস্পর্শ না করাই ভাল॥২৮॥

ইতি জনক-গীতা সম্পূর্ণ।