পঞ্চরাত্র/তৃতীয় অঙ্ক

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন


তৃতীয় অঙ্ক

ভটের প্রবেশ

 ভট। অভিমন্যুকে রথ থেকে নামিয়ে নিয়ে গেল সশস্ত্র কৌরবেরা তাকে রক্ষা কত্তে পাল্লে না। বড় লজ্জার কথা! নারায়ণচক্রের ভয়েও তারা ভীত হয় নি! বালক অভিমন্যু বহুদিন ধরে আত্মীয় স্বজন হ’তে বিচ্ছিন্ন হ’য়ে আছে একথাও তারা একবার ভাবে নি—ওহে সারথি, ক্ষত্রিয়গণের সঙ্গে উপবিষ্ট সশিষ্য গুরু দ্রোণকে একথা নিবেদন কর।

ভীষ্ম ও দ্রোণের প্রবেশ

 দ্রোণ। সারথি, কোন ব্যক্তি আমার শিষ্য-পুত্রকে রণক্ষেত্র হ’তে নিয়ে গেল? কে আমার মন্ত্রাভিষিক্ত বিখ্যাত শর দ্বারা আহত হ’য়ে যুদ্ধ কত্তে ইচ্ছুক হয়েছে? প্রবল দূতরূপে উৎকৃষ্ট যোদ্ধা ও অস্ত্র তাহার বিরুদ্ধে প্রেরণ কত্তে হবে।

 ভীষ্ম। বালক বলে অভিমন্যু এখনও যুদ্ধাদি ব্যাপারে অনভিজ্ঞ। যখন সকল যোদ্ধা পালিয়ে যাচ্ছিল তখন অভিমন্যু পালায় নি, এজন্যই সে শত্রুহস্তে বন্দী হয়েছে। হস্তি-যূথ পালিয়ে গেলে যেমন হস্তিগ্রহণেচ্ছু ব্যক্তি কর্তৃক হস্তিশাবক ধৃত হয় সেরূপ সমস্ত সৈন্য পালিয়ে গেলে বালক অভিমন্যু শত্রুহস্তে বন্দী হয়েছে।

দুর্য্যোধন, কর্ণ ও শকুনির প্রবেশ

 দুর্য্যো। সারথি, অভিমন্যুকে কে বন্দী করে নিয়ে গেল? আমিই তাকে মুক্ত করব।

 অভিমন্যুর পিতার সঙ্গেই আমার বিবাদ। লোকে যখন শুনবে যে অভিমন্যু বন্দী হয়েছে তখন সকলেই আমাকে দোষী মনে করবে। অভিমন্যু এখন আমারই পুত্র। পাণ্ডবগণের পুত্র হলেও সেটা এখন গৌণ সম্পর্ক। জ্ঞাতি-বিরোধে বালকের নিরপরাধ।

 কর্ণ। আপনার কথা স্নেহপূর্ণ ও আপনার অনুরূপই বটে।

 অভিমন্যু আপনার সম্পর্কিত একথা এস্থলে প্রধান বিচার্য্য নহে। আপনার এখন মনে কত্তে হবে যে, আপনারই হিতের জন্য বালক অভিমন্যু সমরশীর্ষে বিপন্ন ও অবমানিত হয়েছে। আমরা তাকে রক্ষা কত্তে পারি নি। সুতরাং ধনু ছেড়ে এখন আমাদের বল্কল ধারণ করা উচিত।

 শকুনি। অভিমন্যুর সাহায্যকারীর অভাব নেই। সে মুক্ত হয়ে আছে ধরে নিন।

 রাজা বিরাট যখন শুনবেন অভিমন্যু অর্জ্জুনের পুত্র তখন তিনি স্বয়ংই তাকে মুক্ত করে দেবেন। দামোদরের কথা মনে করেই রণক্ষেত্রে বন্দী অভিমন্যুকে বিরাটরাজ মুক্ত করবেন। অথবা ক্রোধভরে হলাঘাতে যিনি প্রলম্বাসুরকে বিনাশ করেছিলেন, সেই বলভদ্রের ভয়েই বিরাট অভিমন্যুকে ছেড়ে দেবেন। বলশালী ভীমও বলদর্পিত শত্রুকে নিহত করে অভিমন্যুকে হস্তিনাপুরে নিয়ে আসতে পারে।

 দ্রোণ। সারথি, অভিমন্যু কিরূপে বন্দী হ’ল? অভিমন্যুর রথ কি ভেঙ্গে গিয়েছিল? তার রথের ঘোড়া কি হত হয়েছিল? তার রথের চাকা কি মাটিতে বসে গিয়েছিল? তার দুটি তূণীরই কি শরশূন্য হয়েছিল? তোমার সঙ্গে কি অভিমন্যু ঝগড়া করেছিল? তার ধনুর গুণটি কি ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল? রথিগণের যুদ্ধে এসকল দৈবকৃত বিপদ ঘটে থাকে। অভিমন্যুও যুদ্ধ বিদ্যায় বড় নিপুণ। তাকে কি শত্রুরা শর দ্বারা যুদ্ধক্ষেত্র হতে তাড়িয়ে নিয়ে গেল?

 সূত। আয়ুষ্মন, ধনুর্বিদ্যা যে নিতান্ত সহজ নহে তাহা আপনিও স্বয়ং জ্ঞাত আছেন।

 আপনি যে যে কারণের উল্লেখ করেছেন তার একটির জন্যও অভিমন্যু বন্দী হন নি। তাঁর তূণীর সর্বদাই শরপূর্ণ ছিল, তিনি স্বয়ং মহারথ। আর আমার রথটি অলাতচক্রের ন্যায়[১] যুদ্ধক্ষেত্রে ঘুরে বেড়িয়েছে। একজন পদাতির হস্তে অভিমন্যু বন্দী হয়েছেন।

 সকলে। কি! পদাতির হস্তে অভিমন্যু বন্দী হয়েছে! সে ব্যক্তি কেমন পদাতি?

 সূত। তার রূপ বর্ণন করব, কি গুণ বর্ণন করব?

 ভীষ্ম। স্ত্রীলোকের রূপ বর্ণন কত্তে হয়। পুরুষের পরাক্রম বর্ণন কত্তে হয়। তার পরাক্রমই বর্ণন কর।

 সূত। আয়ুষ্মন —

 দুর্য্যো। আপনি গর্ব্বিত ভাষায় কি জন্য কার প্রসংসা কচ্ছেন? বেগে যদি সে ব্যক্তি পবনতুল্যও হয় তথাপি আমি ভীত হব না।

 সূত। মহারাজ শুনুন—

 সেই পদাতি বেগে রথের অশ্বগুলিকে অতিক্রম করে রথটা ধরে ফেল্লে। ঘাড় বাড়িয়েও ঘোড়াগুলি আর চলতে পাল্লে না। রথটা নিশ্চল হয়ে রৈল!

 ভীষ্ম। তা হ’লে সে অস্ত্র পরিত্যাগ করেছিল?

 সকলে। কেন?

 ভীষ্ম। রথ যদি এরূপে নিশ্চল হয়ে থাকে তা হ’লে মনে কত্তে হবে অভিমন্যু বৃকোদরের অঙ্কগত হয়েছে। দ্বৈতবনে দ্রৌপদীহরণে অকৃতকার্য্য জয়দ্রথও পদাতির হস্তে পরাজিত হয়েছিলেন।

 দ্রোণ। গাঙ্গেয় ঠিক কথা বলেছেন। বাল্যকাল থেকে আমি তাকে শিক্ষা দিয়েছি আমি তার বেগ জানি।

 পরীক্ষা-রঙ্গে কর্ণপর্য্যন্ত আকৃষ্ট গুণ হ’তে শরটি মুক্ত হলেও যদি আমি বলেছি তোমার মাথা কেঁপেছে অমনি সেও শরের ন্যায় ছুটে লক্ষ্য বিদ্ধ হওয়ার পূর্ব্বেই শরটি ধরে ফেলেছে।

 শকুনি। আপনার কথা শুনে হাসি পায়।

 পৃথিবীতে এরূপ আর কোন বলবান লোক নেই! সব কথাই কেবল প্রিয় পাণ্ডবগণের প্রশংসার জন্য আপনারা বলে থাকেন। আপনারা কি পৃথিবীময় কেবল পাণ্ডবই দেখছেন!

 ভীষ্ম। গান্ধাররাজ, সকল কথাই অনুমান করে বলা হচ্ছে।

 আমরা শস্ত্র ও চাপ গ্রহণ করে রথারূঢ় হয়ে যুদ্ধে গমন করি। হলায়ুধ এবং বৃকোদেরই মাত্র বাহু দুটি অবলম্বন করে যুদ্ধে গিয়ে থাকে।

 শকুনি। আমরা একটু অবিমৃষ্যকারী, এজন্য একজন যোদ্ধা আমাদিগকে তাড়িয়ে দিয়েছে। সে উত্তর। আর আপনারা বলছেন ফল্গুনী আমাদিগকে তাড়িয়ে দিয়েছে!

 দ্রোণ। গান্ধার-রাজ, এবিষয়ে এখনও আপনার সন্দেহ আছে?

 পরিষ্কার দিনে বজ্রনির্ঘোষের মত টঙ্কার দিয়ে কি উত্তর ধনু আকর্ষণ কত্তে পারে? শরবর্ষণ করে হৃতাতপ দিবাকরকে কি উত্তর মুহূর্ত্তকালের জন্য অস্তগমনোন্মুখ কত্তে পারে?

 ভীষ্ম। গান্ধারীমাতঃ, আমি স্পষ্ট করে বলছি আপনি জানেন পার্থ ধনু আকর্ষণ করে বাণপুঙ্খরূপ বাক্য জ্যারূপ জিহ্বা দ্বারা উচ্চারণ করেছে, কিন্তু আপনি সে কথা শুনবেন না।

সারথির প্রবেশ

 সারথি। আয়ুষ্মানের জয় হ’ক। শান্তিকর্ম্মের অনুষ্ঠান করুন।

 ভীষ্ম। কেন?

 সারথি। এবিষয়টি প্রথমে আপনার অনুধাবনের যোগ্য। এই বাণটি ধ্বজে লগ্ন হয়েছিল পুঙ্খে ক্ষেপনকর্ত্তার নাম অঙ্কিত আছে।

 ভীষ্ম। নিয়ে এস দেখি।

(সারথির বাণ প্রদান)

 ভীষ্ম। (বাণগ্রহণ ও নিরীক্ষণ করিয়া) বৎস গান্ধাররাজ, জরায় আমার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়েছে। এই শরের অক্ষরগুলি পাঠ কর।

 শকুনি। (বাণগ্রহণ ও পাঠ করিয়া) অর্জ্জুনের এই শর। (এই বলিয়া বাণটি নিক্ষেপ করিল ও বাণটি দ্রোণের পদতলে পড়িল)।

 দ্রোণ। (শর গ্রহণ করিয়া) বৎস, এস। গাঙ্গেয়কে বন্দন করার জন্য আমার শিষ্য-নিক্ষিপ্ত এই শর পরে আমাকে বন্দন করার জন্য আমার পাদমূলে পতিত হ’ল।

 শকুনি। স্পষ্ট করে বলুন না কেন যে অর্জ্জুন যোদ্ধা, অর্জ্জুনই শর ছুড়েছে আর উত্তর নাম লিখেছে।

 দুর্য্যো। পাণ্ডবদের রাজ্য দেওয়ার জন্য যদি ভীষ্মাদি এরূপ কথা বলে থাকেন তাহ’লে আমিও বলছি যুধিষ্ঠিরকে দেখলেই আমি রাজ্যার্দ্ধ পাণ্ডবদিগকে প্রদান করব।

ভটের প্রবেশ

 ভট। মহারাজের জয়। বিরাটনগর থেকে দূত এসেছে।

 দুর্য্যোধন। নিয়ে এস।

 ভট। যে আজ্ঞা। (প্রস্থান)

ভটের প্রবেশ

 উত্তর। অল্প পথ আসতেও আমার অনেক সময় লেগেছে। কৌন্তেয়-বাণ-হত হস্তিসমূহ চতুর্দ্দিকে পতিত রয়েছে। ভূমিভাগ তজ্জন্য নতোন্নত হয়েছে। এবং দ্রুতগামী অশ্বের বেগও তজ্জন্য মন্দীভূত হয়েছে।

(কৃতাঞ্জলি পুটে)

 আচার্য্য, পিতামহের সহিত উপবিষ্ট সমগ্র রাজমণ্ডলকে অভিবাদন কচ্ছি।

 সকলে। আয়ুষ্মান হও।

 দ্রোণ। বিরাটেশ্বর কি বলেছেন।

 উত্তর। বিরাটেশ্বর আমাকে পাঠান নি।

 দ্রোণ। কে তোমাকে পাঠিয়েছে?

 উত্তর। রাজা যুধিষ্ঠির।

 দ্রোণ! ধর্ম্মরাজ কি বলেছেন?

 উত্তর। শুনুন—

 তিনি বলেছেন, “আমি উত্তরাকে পুত্রবধু রূপে লাভ করেছি। রাজগণ শীঘ্রই সমাগত হবেন। শুভবিবাহ কোথায় সম্পন্ন হবে? সেখানে, কি এখানে?”

 শকুনি। সেখানে, সেখানে।

 দ্রোণ। এজন্যই আমরা সেখানে গিয়েছিলুম। পঞ্চরাত্র এখনও অতীত হয় নি। মহারাজ, আমার ধর্ম্মভিক্ষা ধর্ম্মানুরোধে প্রদান করুন।

 দুর্য্যো। আমাদের রাজ্যের অর্দ্ধাংশ আমি প্রদান কল্লুম। মৃত্যু হলেও লোকে চিরস্থায়ী সত্য লঙ্ঘন করে না।

 দ্রোণ। আমাদের প্রসারণশীল বংশের আমরা সকলেই প্রসন্ন হলুম। আমাদের রাজসিংহ এই সমগ্র মেদিনীমণ্ডল শাসন করুন।

সম্পূর্ণ

 

  1. “অবাতচক্রপ্রতিমস্তু মে রথঃ”—অবাত (নিবাত প্রদেশ) দেশে চক্রমিব। চক্র = উইণ্ড-কক্। সুতরাং এইরূপ পাঠে “নিশ্চল” অর্থ হইবে।