পত্রপুট/বসেছি অপরাহ্নে পারের খেয়াঘাটে

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

বসেছি অপরাহ্নে পারের খেয়াঘাটে
                   শেষধাপের কাছটাতে ।
            কালো জল নিঃশব্দে বয়ে যাচ্ছে পা ডুবিয়ে দিয়ে ।
   জীবনের পরিত্যক্ত ভোজের ক্ষেত্র পড়ে আছে পিছন দিকে
            অনেক দিনের ছড়ানো উচ্ছিষ্ট নিয়ে ।
মনে পড়ছে ভোগের আয়োজনে
                   ফাঁক পড়েছে বারম্বার ।
কতদিন যখন মূল্য ছিল হাতে
                   হাট জমে নি তখনো,
           বোঝাই নৌকো লাগল যখন ডাঙায়
তখন ঘণ্টা গিয়েছে বেজে,
            ফুরিয়েছে বেচাকেনার প্রহর ।


    অকালবসন্তে জেগেছিল ভোরের কোকিল;
       সেদিন তার চড়িয়েছি সেতারে,
                     গানে বসিয়েছি সুর ।
                           যাকে শোনাব তার চুল যখন হল বাঁধা,
                      বুকে উঠল জাফরানি রঙের আঁচল
                                তখন ঝিকিমিকি বেলা,
                    করুণ ক্লান্তি লেগেছে মূলতানে ।
                      ক্রমে ধূসর আলোর উপরে কালো মরচে পড়ে এল ।
                   থেমে-যাওয়া গানখানি নিভে-যাওয়া প্রদীপের ভেলার মতো
                 ডুবল বুঝি কোন্‌ একজনের মনের তলায়,
                           উঠল বুঝি তার দীর্ঘনিশ্বাস,
                               কিন্তু জ্বালানো হল না আলো ।


এ নিয়ে আজ নালিশ নেই আমার ।
                         বিরহের কালোগুহা ক্ষুধিত গহ্বর থেকে
             ঢেলে দিয়েছে ক্ষুভিত সুরের ঝর্না রাত্রিদিন ।
          সাত রঙের ছটা খেলেছে তার নাচের উড়নিতে
                             সারাদিনের সূর্যালোকে,
              নিশীথরাত্রের জপমন্ত্র ছন্দ পেয়েছে
                            তার তিমিরপুঞ্জ কলোচ্ছল ধারায় ।
আমার তপ্ত মধ্যাহ্নের শূন্যতা থেকে উচ্ছ্বসিত
              গৌড়-সারঙের আলাপ ।
   আজ বঞ্চিত জীবনকে বলি সার্থক --
           নিঃশেষ হয়ে এল তার দুঃখের সঞ্চয়
    মৃত্যুর অর্ঘ্যপাত্রে,
           তার দক্ষিণা রয়ে গেল কালের বেদিপ্রান্তে ।
জীবনের পথে মানুষ যাত্রা করে
নিজেকে খুঁজে পাবার জন্যে ।
গান যে মানুষ গায়, দিয়েছে সে ধরা,আমার অন্তরে;
যে মানুষ দেয় প্রাণ দেখা মেলে নি তার ।


          দেখেছি শুধু আপনার নিভৃত রূপ
                       ছায়ায় পরিকীর্ণ,
     যেন পাহাড়তলিতে একখানা অনুত্তরঙ্গ সরোবর ।
                    তীরের গাছ থেকে
                      সেখানে বসন্তশেষের ফুল পড়ে ঝ'রে,
                               ছেলেরা ভাসায় খেলার নৌকো,
                    কলস ভরে নেয় তরুণীরা
                                 বুদ্‌বুদফেনিল গর্গরধ্বনিতে ।
          নববর্ষার গম্ভীর বিরাট শ্যামমহিমা
                    তার বক্ষতলে পায় লীলাচঞ্চল দোসরটিকে ।
       কালবৈশাখী হঠাৎ মারে পাখার ঝাপট,
                         স্থির জলে আনে অশান্তির উন্মন্থন,
           অধৈর্যের আঘাত হানে তটবেষ্টনের স্থাবরতায়;
               হঠাৎ বুঝি তার মনে হয় --
                       গিরিশিখরের পাগলা-ঝোরা পোষ মেনেছে
                             গিরিপদতলের বোবা জলরাশিতে --
    বন্দী ভুলেছে আপনার উদ্‌বেলকে,উদ্দামকে--
  পাথর ডিঙিয়ে আপন সীমানা চূর্ণ করতে করতে নিরুদ্দেশের পথে
                   অজানার সংঘাতে বাঁকে বাঁকে
                      গর্জিত করল না সে আপন অবরুদ্ধ বাণী,
                             আবর্তে আবর্তে উৎক্ষিপ্ত করল না
                                                অন্তর্গূঢ়কে ।


       মৃত্যুর গ্রন্থি থেকে ছিনিয়ে ছিনিয়ে
                                যে উদ্ধার করে জীবনকে
সেই রুদ্র মানবের আত্মপরিচয়ে বঞ্চিত
                                       ক্ষীণ পাণ্ডুর আমি
   অপরিস্ফুটতার অসন্মান নিয়ে যাচ্ছি চলে ।
দুর্গম ভীষণের ওপারে
          অন্ধকারে অপেক্ষা করছে জ্ঞানের বরদাত্রী;
মানবের অভ্রভেদী বন্ধনশালা
           তুলেছে কালো পাথরে গাঁথা উদ্ধত চূড়া
                                      সূর্যোদয়ের পথে;
           বহু শতাব্দীর ব্যথিত ক্ষত মুষ্টি
                       রক্তলাঞ্ছিত বিদ্রোহের ছাপ
                   লেপে দিয়ে যায় তার দ্বারফলকে;
ইতিহাসবিধাতার শ্রেষ্ঠ সম্পদ
                   দৈত্যের লৌহদুর্গে প্রচ্ছন্ন;
   আকাশে দেবসেনাপতির কন্ঠ শোনা যায় ----
                       "এসো মৃত্যুবিজয়ী' ।
                               বাজল ভেরী,
          তবু জাগল না রণদুর্মদ
            এই নিরাপদ নিশ্চেষ্ট জীবনে;
ব্যূহ ভেদ ক'রে
স্থান নিই নি যুধ্যমান দেবলোকের সংগ্রাম-সহকারিতায় ।
                   কেবল স্বপ্নে শুনেছি ডমরুর গুরুগুরু,
           কেবল সমরযাত্রীর পদপাতকম্পন
                   মিলেছে হৃৎস্পন্দনে বাহিরের পথ থেকে ।


যুগে যুগে যে মানুষের সৃষ্টি প্রলয়ের ক্ষেত্রে
            সেই শ্মশানচারী ভৈরবের পরিচয়জ্যোতি
                             ম্লান হয়ে রইল আমার সত্তায়;
শুধু রেখে গেলেম নতমস্তকের প্রণাম
            মানবের হৃদয়াসীন সেই বীরের উদ্দেশে --
মর্তের অমরাবতী যাঁর সৃষ্টি
          মৃত্যুর মূল্যে, দুঃখের দীপ্তিতে ।

 
 
১ বৈশাখ, ১৩৪৩