বিষয়বস্তুতে চলুন

পথে-বিপথে (১৯১৮)/অরোরা

উইকিসংকলন থেকে

অরোরা

 অরোরার সঙ্গেও যে অবিনের পরিচয় ছিল, সেটা আমি জানতেম না। সে কবিতা করে, সুতরাং চাঁদের সঙ্গে তাকে কথা বলতে আমি স্বচক্ষে দেখেছি, রামধনুকের সঙ্গে তার আলাপ থাকা সম্ভব, কিন্তু অরোরার বাসা—সেখানেও যে তার গতিবিধি, এটা একেবারেই আমি ভাবি-নি!

 কমলালেবুর মতো পৃথিবীর সব গোল ঠিক যেখানটিতে চাপা এবং যে-রাজ্যটা বেশ-একটু গভীর সেইখানেই চিরশীতল মণিমন্দিরে না-দিন না-রাত্রির দেশে একাকিনী অরোরা আলো বিতরণ করেন। লক্ষকোটী রামধনুকের শোভা এক-কোরে ঝালর বানিয়ে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলে যে বাহার, বিনা-বরের বাসরে অরোরার রূপ কতকটা সেই ধরণের। নব-নব সৌন্দর্য্যের, রঙের এবং আলোর সে যেন একটা ভরা—জোয়ার বা চীনেভাষায় যাকে বলে ‘টাইফুং’।

 অরোরা-সম্বন্ধে এমনি একটা ধারণা আমার দূরে থেকে। জলজীয়ন্ত অরোরার বাসায় গিয়ে তার নির্ভুল পরিচয় এ-পর্য্যন্ত আমার ভাগ্যে ঘটে-নি; কেননা সেদিন পর্য্যন্ত আমি সেই দলভুক্ত ছিলেম যে-দলের কাছে রামের ধনুক, অরোরার রঙ্গমঞ্চের রং —এমনি আরো—অনেকগুলো জিনিষ হিন্দুদের বিশেষ-বিশেষ তিথিতে পটোল ঝিঙে ইত্যাদির মতো একবারে বর্জ্জনীয় ছিল। আমি তখন কি জানি যে তলে-তলে আমার দলেও সব চলে? সেটা জানলে ও—দল থেকে নামকাটা সেফাইয়ের মতো অবিনের দলে এসে ভর্ত্তি হবার দরকার ছিল না।

 যাই হোক, সেই অমাবস্যার রাত্রে তারার জুঁইফুলে— সাজানো নীল আকাশের নীচে, কলকাতার অন্ধকার—গলিতে, আমরা দুইবন্ধু যে অরোরার বন্ধ-খিড়কি খোলা না পেয়ে ঘুরে-ঘুরে হয়রান ও হতাশ হয়ে রাত সাড়ে—চারটেয় আহিরিটোলার ঘাটের রানার বসে পয়লা-এপ্রেলের সকালবেলার প্রতীক্ষা করে রইলেম, সেটা স্বীকার করতে এখন আর লজ্জা নেই বা সে-লজ্জার কথাটা গোপন করতে দুটো মিথ্যে কথাও এখন আর আমার বলবার আবশ্যক হয় না; —অবিনের দলে মিশে এটা একটা সুবিধে আমি দেখছি।

 অরোরার অভিসারে বেরিয়ে আর—কখনো অবিন এমন নিরাশ হয়েছিল কিনা বলতে পারিনে, তবে আমার সঙ্গ—দোষেই যে এ-রূপটা ঘটলো পয়লা-এপ্রেলের ঠিক পূর্ব্বরাত্রে, আমাকে সেটা জানাতে অবিন কিছুমাত্র ইতস্তত করলে না এবং আমিও সেটা মেনে নিলেম। কেননা দল ছাড়বার পূর্ব্বে, আমার আগের দলের যাঁরা বৃদ্ধ, তাঁরা বিশেষ করে আমারি উপরে দীর্ঘনিশ্বাস ও হুঙ্কারগুলো নিক্ষেপ করে—পিতৃপুরুষের সঞ্চয়টার সঙ্গে নিজের উপার্জ্জিত পয়সা রূপ গুণ ও যৌবন নিয়ে তাঁদের কবল থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে আনায়—ইংরেজীতে এপ্রেলের ওই সম্ভাষণটাই আমাকে দিয়েছিলেন—যদিও মাসটা ছিল অন্য।

 খানিক বসে থেকে অবিন মরীচিকামুগ্ধ হরিণের মতো অন্ধকারে আর-একবার তার অরোরার সন্ধানে ঘুরে মরতে গেল— অলিতে-গলিতে। আমি একা ঘাটে —যেখানটিতে সকালের একটি তারার আলো অনেকদূর থেকে এসে অন্ধকার তীরের কাছে জলের উপর নেমে দাঁড়িয়েছে, সেইখানটিতে চুপ করে বসে রইলেম। ভোরের হাওয়ায় তখনো হিম মাখানো; নদীর মাঝে ময়লা কুয়াসা গতশীতের ছোঁড়া—কাঁথার একটা কোণের মতো এখনো ঝুলে রয়েছে। ঘাটের দুধারে বাঁধা সারি-সারি বোঝাই নৌকো জলের ধাক্কায় ঘুম-ভেঙে এক-একবার একটু নড়ে উঠে আবার ঝিমিয়ে পড়ছে। অন্ধকারের মধ্যে একটা চিতা কিছুদূরে শ্মশানঘাটের সমস্তটা এবং অন্ধকারের অনেকখানি আলোতে ভরে দিয়ে জ্বল্-জ্বল্ করে জ্বলছে। চলে যাবার সময়—জ্বলে ছাই হয়ে যাবার বেলায়, মানুষ কতটা আলোই না দিয়ে যাচ্ছে! কি আলোর রথই না তাকে নিতে এসেছে— যে হয়তো জীবনের অন্ধকারেই কাটিয়ে গেল রাত্রিদিন!

 অন্ধকারের মধ্যে এতখানি আগুনের একটা টান আছে; শিখাগুলো যেন হাত নেড়ে আমায় ডাকতে লাগলো। মন আমার প্রদীপের চারিদিকে পতঙ্গের মতো কতক্ষণ ধরে ঐ আগুনটার দিকে ঘুরছিল, হঠাৎ একসময় অন্ধকারে একখানা হাত, যেন বোধ হল, আমার দুই-চোখের উপর আস্তে-আস্তে চেপে পড়ল। ঠাণ্ডা হাত,—চাঁপাফুল আর হেনার গন্ধ-মাখানো আঙুলগুলি পাত্লা একখানি আঁচল, হাল্কা বাতাসের মতো উড়ে-উড়ে আমার গালে পড়ছে, ঠোঁটের খুব কাছে চন্দনের গন্ধ-ভরা গরম একটা নিশ্বাস অনুভব করছি! আশ্চর্য্য এই যে, সে আমার চোখ টিপে থাকলেও আমি তার মুখখানি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি—একেবারে রাত্রির মতো কালো আর তারি মতো স্নিগ্ধ, সুন্দর! আমি একবার তার চাঁপার কলির মতো আঙুলগুলির উপরে হাত বুলিয়ে চুপি-চুপি বল্লেম— “অরোরা”! পিছন থেকে অবিন গলাছেড়ে হেসে উঠলো। আমি চমকে উঠে বল্লেম—“কিহে তুমি? অরোরা কোথা!” অবিন তার আঙুলটা দিয়ে শ্মশানের চিতা দেখিয়ে বল্লে— “শোনো বলি—”

 সকালের হাওয়ায় কুয়াশার সাদা চাদর নাট্যশালার যবনিকার মতো আস্তে-আস্তে উঠে যাচ্ছে। নদীর পশ্চিম-পারে চিতার আগুন নিভে গেল। তারি শেষ-আভার মতো একটি সোনার রেখা নদীর পূর্ব-পারের আকাশে ফুটে উঠল। অবিন তার কথা সুরু করে এমন সময় রামা বেহারা এসে খবর দিলে— “ডাক্তারবাবু আয়া।”

 এত রাত্রে এখানে ডাক্তারবাবু কেন বুঝতে আমার সময় লাগলো। ঘুম ভাঙলে যেমন আমি ডাক্তারকে বল্লেন—“তুমি র্ষে অসময়ে?” ডাক্তার হেসে বল্লেন—“আপনি আবার গল্পের খাতা নিয়ে বসেছেন? এ-রকম কল্লে আপনার অসুখ কিছুতে সারবে না। লেখা রাখুন; যান্ জাহাজে একটু বেড়িয়ে আসুন।”

 লেখবার টেবিল এবং তার উপরে দেয়ালে ঝোলানো পাঁজির প্রকাণ্ড একটা এক এবং তার শিয়রে বড়-বড় অক্ষরে এপ্রেলটার দিকে আমার তখন দৃষ্টি পড়লো। আমি একবার ডাক্তারের দিকে, একবার নিজের দিকে চেয়ে সুবোধ ছেলের মতো গল্পের খাতা বন্ধ কল্পেম। ঘড়িতে তখন বেলা দুটো-উনপঞ্চাশ।