পথে-বিপথে (১৯১৮)/গুরুজী
গুরুজী
আজ অবিনের গুরুর কাছে সে আমাকে নিয়ে যাবে। শুনেছি তিনি মহা সাধুপুরুষ এবং জাতিস্মর। আমি সেদিন আমার গেরুয়া মলিদার ওভার—কোটটার উপরে আজ-কালের স্বামীজীর ধরণে পাগড়িটা বেঁধে, পকেটে কবীরের পুঁথিখানা নিয়ে, জাহাজে গিয়ে চড়লেম। নাকে সোনার চশমা এবং হাতে রূপো-বাঁধা শুয়োরের দাঁতের ছড়ি আর পায়ে ফানেলের পেণ্টালুনের নীচে ব্রাউন-লেদার বুটটায় আমাকে ফকির কি ফিকিরবাজ পুলিসের সি-আই-ডি অথবা আর-কিছু দেখাচ্ছিল তা আমি ঠিক বলতে পারিনে; তবে আমার মনের ভিতর সেদিন যে একটু গেরুয়ার আভা পড়েছিল এবং আমি গান-বাজনা না করে খুব গম্ভীর হয়ে বসে থাকায় জাহাজে তাবৎ যাত্রী আমার দিকেই যে থেকে-থেকে কটাক্ষপাত করছে এটা আমি বেশ বুঝছিলেম। বুড়ো গোলোকবাবু সেদিন খবরের কাগজটা চশমার অতটা কাছে নিয়ে কেন যে অমন মনঃসংযোগ দিয়ে জুটের বাজার-দরের কলম্টা আগাগোড়া মুখস্থ করছিলেন সেটা জানতে আমায় অধিক কষ্ট পেতে হয়নি।
যাই হোক, অন্যদিনের মতো সেদিনও নিয়মিত উত্তরপাড়ায় এসে জাহাজ ভিড়লো। অবিনে-আমাতে সেখানে নেমে পড়ে থার্ড এবং ফোর্থ এই দুই ক্লাসের মাঝামাঝি গড়নের ছক্কড় গাড়িতে ধূলো এবং ঝাঁকানি খেতে-খেতে আধক্রোশ-টাক্ গিয়ে রাজাদের একটা বাগান-বাড়ির ফটকের সাম্নে গাড়ি, ঘোড়া, মায় গাড়োয়ান আমরা দুজনে খানার ভিতরে উল্টে পড়লেম। একখানা মোটরগাড়ি একরাশ ধূলো আর খানিক পেট্রোলের বিকট গন্ধ আমাদের নাক-চোখের উপরে ছড়িয়ে দিয়ে সাঁ করে বেরিয়ে গেল। অবিন সেই পলায়িত মোটরের চলন্ত ধূলোর মধ্যে আরো গোটাকতক ইংরাজি গালাগাল মিশিয়ে দিয়ে আমাকে চাকা—ভাঙা গাড়ির ভিতর থেকে টেনে বার করে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে দিলে। আমার চশমার একখানা কাঁচ গেছে ভেঙে, পাগড়িটা গেছে খুলে, এবং শুয়োরের দাঁতটা খসে গিয়ে আমার লাঠিটা হয়ে পড়েছে ফোগ্লা। অবিন আমার চেহারা দেখে হো-হো করে হেসে উঠল। আমি গায়ের ধুলো যথাসম্ভব ঝেড়ে-ঝুড়ে অবিনের দিকে চেয়ে দেখলেম সে যেমন ফিট্-ফাট্ হয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল তেমনি আছে; —তার কালো কোটের একটি ভাঁজও এদিক—ওদিক হয়নি এবং তার বুকের মাঝে ফুটন্ত গোলাপ-ফুলটি থেকে একটি পাপ্ড়িও ঝরে পড়েনি। অবিন লম্বায় চওড়ায় আমার চেয়ে বেশী বই কম হবে না, অথচ ঐ ছক্কড় গাড়িটার খাঁচা-কল থেকে কি—করে এমন সাফ্ বেরিয়ে গেল তা জানিনে; কিন্তু তাকে দেখে আমার হিংসে হয়েছিল সত্যি বলছি। ধূলো-মাখা গেরুয়া—পাগড়ি ঝেড়ে-ঝুড়ে সাম্লে নিলেম বটে কিন্তু বাড়িতে আয়না দেখে যেমন চোস্ত করে সেটাকে বেঁধেছিলেম তেমনটা আর হল না;— ব্রহ্মতেলোর মাঝখান থেকে কাপড়ের ফুঁপিটা সাপের ফণার মতো আর উদ্যত হয়ে রইল না— বাঁ-কানের উপরে লট্কে পড়ল; এবং এই আকস্মিক দশা-বিপর্য্যয়ে দেহটা অনেকখানি ধূলো মেখে নিলেও, মন তার নিজের গেরুয়া রংটুকু আর বজায় রাখতে পারলে না। অবিনের সঙ্গে সেই রাজার বাড়িতে সাধু-দর্শনে যখন প্রবেশ কল্লেম তখন মন আমার সম্পূর্ণ অসাধু এবং অধীর।
রং-ওঠা লোহার শিক দেওয়া একটা ফটকের মাঝ দিয়ে ইটের খাদরী-করা চওড়া একটা রাস্তা খানিক সোজা গিয়ে বেড়ির মত ডাইনে-বাঁয়ে ঘুরে টালি বসানো একটা বারান্দার চার ধাপ সিঁড়ির নীচে গিয়ে শেষ হয়েছে; রাস্তাটায় এককালে লাল সুরকি ঢালা ছিল, এখন সেগুলো উড়ে গিয়ে জায়গায় জায়গায় সবুজ সেওলার ছোপ ধরেছে। রাস্তার ধারে—ধারে. পুরোনো গোটাকতক পাটা-ঝাউ এবং এখানে-ওখানে মাটীর পরী রাখবার গোটা-দুচ্চার ইটের পিল্লে। পরীগুলোর মাটির দেহ বারো—আনা ক্ষয়ে গিয়ে ভিতরের শিক্গুলো বেরিয়ে পড়েছে। বাগানটা বাড়ির পিছন পর্য্যন্ত ঘুরে গিয়ে, একটা টানা রেলিঙের ভিতর দিয়ে যেখানে গঙ্গা দেখা যাচ্ছে সেইখানে একসার শুকনো গাঁদাফুলের গাছে গিয়ে শেষ হয়েছে। সিঁড়ির দুধারে সিংহি বসবার দুটো বড় চাতাল। একটার উপর থেকে সিংহি অনেক কাল পালিয়েছে—সেখানে একটা ছেঁড়া মাদুর রোদে শুকচ্ছে; আর-একটা চাতালে পোড়ামাটির মুখ-খিঁচিয়ে, এখনো এক পশুরাজ ভোম্বলদাস তার খসে—পড়া ল্যাজের সরু শিক্টা আকাশের দিকে খাড়া করে থাবাহীন এক পা শূন্যে উঁচিয়ে বসে আছে।
আমরা সিঁড়ির ক’টা ধাপ পেরিয়ে মোটামোটা তিনটে থাম-দেওয়া বারান্দা পেরিয়ে এক বড় ঘরে ঢুকলেম। ঘরটা খুব লম্বা, মাঝে বাঘ—থাবা পুরোনো মেহগ্নি-কাঠের মস্ত একটা গোল টেবিল—অনেকখানি ধূলো আর খুব জম্কালো একটা চিনে-মাটির ফুলদান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ফুলদানটার একটা হাতোল আর খানিকটা কানা ভাঙা; আর তার গায়ে বড়-বড় গোলাপ-ফুল, প্রজাপতি আঁকা। ঘরের ঝাড় ক’টা ময়লা গেলাপ দিয়ে মোড়া—আগে লাল, এখন কালো সালুমোড়া শিকে ঝুলছে। ঘরের সবুজ খড়খড়ি ছিল; এখন ফিকে হতে—হতে দাঁড়িয়েছে প্রায় গঙ্গামৃত্তিকার রং। ঘরের পাশের দেয়ালগুলোতে একটাকরে আয়না, একটা মেমের ছবি,—ছবির কোনোটার কাপড়-পরা, কোনোটা নয়। মাঝের দুই বড় দেয়ালে একদিকে একটা বড় ঘড়ি, আর-একদিকে চওড়া গিণ্টির ফ্রেমে বাঁধা জরীর তাজ-মাথায় এক সুপুরুষের চেহারা,—মনে হচ্ছে যেন সামনের দেয়ালে সেই অনেক-দিনের-বন্ধ-হয়ে-যাওয়া ঘড়ির কাঁটা-দুটোর দিকে তিনি চেয়ে আছেন।
অবিন ঘরে ঢুকেই বাঁকা-পায়া গোল-পিঠ পাঁচ-রঙা-ফুল-কাটা ছিট্-মোড়া একখানা চৌকিতে ধপাস্ করে বসে পড়ল। দুজনে প্রায় এক কোয়াটার বসে আছি; অবিনের মুখে কথাই নেই। আমরা কেন যে এখানে এসেছি সেটা যেন অবিন ভুলেই গেছে। আমি বেগতিক দেখে—একটা উড়ে ঘরের একটেরে, যেখানে খানিক রোদ এসে পড়েছে, একটা সিগারেটের মরচে-ধরা টিনের কৌটো থেকে দোক্তার পাতা একটা-একটা বার করে রোদে মেলিয়ে দিচ্ছিল সেইখানে আস্তে-আস্তে গিয়ে বল্লুম—“সাধু কোথায় রে?” উড়েটা ঘাড় না উঠিয়েই, সাধু এই শব্দটি মাত্র উচ্চারণ করেই আবার নিজের কাজে মন দিলে। আমি আবার বল্লুম— “ওরে সাধু কোথায়? তাঁকে একবার খবর দে না!”
দাসো একবার পানের দাগ-ধরা, লাল ঠোঁট দুটো কুঁচ্কে বল্লে—“সাধু? আমিই তো সাধু!”
আমার আর রাগ বরদাস্ত হলনা; আমি আমার ভাঙা ছড়িগাছটার বাকি অংশটা তার পিঠেই আজ ভেঙে যাব বলে উচিয়েছি আর অবিন ডাকলে—“ওহে এদিকে।” ফিরে দেখি যাঁকে দেখবার জন্যে আসা তিনি দাঁড়িয়ে। চোখা—চোখি হবামাত্র তিনি একটুখানি হেসে কবীরের এই পরখটা সুর করে আউড়ে নিলেন—
“মন ন রঙ্গায়ে, রঙ্গায়ে যোগী কাপড়া।”
আমার পকেটে কবীরের পুঁথি, এটা ইনি নিশ্চয় জেনেছেন; আর কথাগুলো আমাকেই বলা হল এই ভেবে আমি একটু বিস্মিত একটু ভীত আর একটু লজ্জিত হয়েই তাঁর পায়ে প্রণাম কল্পম। তিনি হো হো করে হেসে উঠে বল্লেন—“ওহে অবিন, তোমার বন্ধু যবনের পায়ের ধূলো নিয়ে ফেল্লেন, এটাতো ভালো হল না!”
ইনি যবন! বিস্ময়ে আমি যেন অভিভূত হয়ে অবিনের দিকে চাইলেম। মনে একটু যে ঘৃণার উদয় না হয়েছিল তা নয়। অবিনটা তার পাতলা ঠোঁট খুব চেপে এবং বড়-বড় চোখে প্রকাণ্ড একটা কৌতুকের নিঃশব্দ হাসি নিয়ে আমার মুখে চেয়ে রইল। আমার তার উপর ভারি রাগ হচ্ছিল; সে যদি আগে বলতো তো যবনের পদধুলি—কথাটা মনে আসবামাত্রই সাধু একেবারে গলা ছেড়ে গেয়ে উঠলেন—
“কোই রহীম কোই রাম বখানৈ, কোই কহে আদেস,
নানা ভেষ বনায়ে সবৈ মিল ঢুঁর ফিরে চঁহু দেশ।”
আমার বেশটার উপরে এই ঠেস—সেটা যিনি কল্লেন তিনিও যে ভেকধারী কেউ নন এটা তাঁর সাদা সিল্কের পাঞ্জাবীর উপরে কাশ্মীরী শাল এবং তার নীচে লুঙ্গী-ফ্যাসানে পরা নূতন ধোয়া থান ধুতি দেখে কিছুতেই আমি ভাবতে পারলেম না। এমন সাধু আমি অনেক দেখেছি এবং সময়ে—সময়ে তাদের পাল্লায় পড়ে অনেক ঠেকেও শিখেছি। আমি একটু আমি একটু চেঁচিয়েই অবিনকে বল্লেম—“চল হে, জাহাজ আবার না ছেড়ে দেয়! সাধু দর্শন হল; চল এখন গঙ্গাস্নান করে বাড়ি যাই।”
অবিনের যিনি গুরু, তিনি এতক্ষণে এসে আমার হাত চেপে ধরে বল্লেন—“এই এতক্ষণে আপনি আমায় যথার্থ চিনেছেন। আসুন, একটু চা আর গোটা-দুই মুরগীর ডিম না খাইয়ে আপনাদের ছাড়া হচ্ছে না।”
বলা বাহুল্য, যবনের পদধূলিতে ঘৃণা থাকলেও, যবনপালিত পক্ষীজাতির উপরে আমার কোনো আক্রোশ ছিল না। জেলের জল শাস্ত্র-মতে অগ্রাহ্য বলে জেলের মাছও যে বাদ দেব এমন মূর্খ আমি ছিলেম না; বা জেলখানার ছত্রিশ-জাতের গায়ের বাতাস মনুর মতে নিষিদ্ধ হলেও জেলের তেল অথবা সেই তেলে ভাজা সহরের ছত্রিশ-জাতের পদধূলি মাখানো গরম ফুলুরি যে অনাদরের সামগ্রী এটা স্বীকার করতে আমি একেবারেই নারাজ ছিলেম। তার পর সদ্য-ধোপ—দেওয়া সাদা চাদরে ঢাকা টেবিলে যখন অতি বিশুদ্ধ তামার কোষা কমণ্ডলু তাম্রকুণ্ডুতে টাট্কা-পাড়া মুরগীর সাদা ডিম এবং তার চেয়েও পরিস্কার এবং সাদা পাউরুটি, ঘরের গরুর দুধ, লিপ্টনের চা-পানি—কলের জলের, গঙ্গাজলের নয়—এসে উপস্থিত, তখন অবিনের গুরুকে সাধুবাদ দিতে একটুও আমায় ইতস্তত করতে হল না।
ফকিরটির ভিতরে ফক্রেমি কোথাও ছিল না। দেখলেম তাঁর হাতের চিমটেয় তিনি তিনটে পাখীর খাঁচা ঝুলিয়েছেন এবং তাঁর গেরুয়া-বসনটা টুকরো-টুকরো করে কেটে তিনি বানিয়েছেন খাঁচার ঢাকা এবং পৈতের সুতোয় তিনি বানিয়েছেন ঘুড়ি ওড়াবার সরু লক্; লক্ষ্মীর ঘটটা উল্টে তিনি সরস্বতীর বীণার তুম্বি বানিয়ে নিয়েছেন। বৈরেগীদের যা-কিছু ভণ্ডামি, ও গোঁড়ামির যত-কিছু আসবাব, সবগুলোকে তিনি এমন-এক-একটা অদ্ভুত কাজে লাগিয়েছেন যে সেগুলোর দুর্দশা দেখে দুঃখ না হয়ে, হাসি পাবেই পাবে। মনুসংহিতায়, বাইবেলে, কোরাণে যেগুলো শুদ্ধ, সেগুলো বিরুদ্ধ-কাজে খাটিয়ে তিনি আপনার চারিদিকে এমন একটা হাস্যরসের এবং অদ্ভূত রসের অবতারণা করে রেখেছেন যে মন সেখানে এসে দুঃসাহসে ভরে না উঠে যায় না। আমার মনে হল যেন বাইরের একটা পরিস্কার বাতাস জোর করে আমার বুকের কপাটদুখানা খুলে দিয়ে গেল। এর পর যখন সেই সাধুপুরুষের দিকে চাইলেম তখন তাঁকে গুরু এবং বন্ধু এই দুই ছাড়া আমি আর-কিছু মনে করতে পাল্লুম না। আমি গুন্গুন্ করে গাইতে লাগলুম—“আরে ইন্ দুহু রাহ না পাঈ, হিঁন্দুকী হিংদ বাঈ দেখী, তুর্কণকী তুর্কাঈ।” হঠাৎ হাতের কাছ থেকে বীণাটা তুলে নিয়ে বন্ধু আমার, গুরু আমার, তিনি গানের শেষ-চরণ দুটো পূর্ণ করে দিলেন— “কহৈঁ কবীর সুনো ভাই সাধো কৌন রাহ হবৈ যাঈ।” তার পর তাঁর সঙ্গে কবির লড়াই চল্লো;— আমি গাই, তিনি জবাব দেন! কিন্তু আমার তেমন সুস্বরও ছিল না, আর বাজাতে তেমন দক্ষতা জন্মজন্মান্তরেও লাভ করব কি না তাও জানিনে।
সে-বেলার ষ্টীমার অনেকক্ষণ ঘাট পেরিয়ে আপনার ঠিকানায় যাত্রী নিয়ে পৌঁছে গেছে—তখন তিনি বীণা রেখে বল্লেন—“চল এখন স্নান করে কিছু খাওয়া যাক্।” আমি গঙ্গার দিকে চাইতেই তিনি বল্লেন—“না, ওখানে নয়, আমার সঙ্গে এসো।”
এইটে তাঁর স্নানের ঘর। সাদা পাথরে মোড়া যেন একটা চাঁদের আলোর গহ্বরে এসে ঢুকলেম। মাঝে স্ফটিকের চেয়ে পরিস্কার গোলাপ-জলের ফোয়ারা! কি বিপুল শুভ্রতার ঘাটে এই মহাপুরুষের সঙ্গে স্নানে নামলেম! যখন আমি এই কথা ভাবছি তখন একটা দাসী—তেমন সুন্দরী আমি কখনো দেখিনি—সোনার একটা পাখীর খাঁচা এনে বন্ধুর হাতে দিয়ে গেল। পাখীর গা-টা বাউলদের শততালি কাঁথাখানার মতো নানা—রঙে বিচিত্র। পাখীটা খাঁচার তলায় বসে ধুঁক্ছে। আর তার রোগা পালকওঠা গলাটা থেকে ‘গোপীযন্ত্রের শব্দের মতো গুব্গুব্ একটা আওয়াজ বেরোচ্ছে। বন্ধু সেই মুমূর্ষু পাখীটিকে খাঁচা থেকে টেনে-হিঁচড়ে বার করে আচ্ছা—করে গোলাপজলের ফোয়ারায় চুবিয়ে দাসীর হাতে একখানা সাদা রুমালের উপরে বসিয়ে দিলেন। পাখীর ডানা-দুখানা সেই সাদা রুমাল ঢেকে পাঁচমিশিলি বদ রং—মাখানো বিশ্রী দুটো হাতের যতো ছড়িয়ে রইল। নির্জ্জীব পাখীটার হলদে দুটো চোয়াল বেয়ে লোহার কসের মতো পাতলা গেরুয়ারক্ত সেই রুমালখানার সাদা রং মলিন করে দিচ্ছে আর মূর্ত্তিমন্ত নিষ্ঠুরতার মতো আমাদের বন্ধু, দুটো জ্বলন্ত চক্ষু নিয়ে সেই দিকে চেয়ে আছেন—এ দৃশ্যটা আমার কল্পনারও অতীত। আমার অন্তর-বাহির একটা বীভৎস বিস্ময়ে সেই লোকটার সঙ্গে আরো বেশী—করে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠবার উৎকট আকাঙ্ক্ষায় টল্ম্ল করে উঠল। এই দেখলেম এঁকে মহাপুরুষ, আবার এই দেখছি ঘোর নৃশংস—মৃত্যুর মতো নির্ম্মম। এ-রহস্যের ব্যূহভেদ একমাত্র অবিনই করতে পারবে জেনে আমি তার শরণাপন্ন হলেম। কিন্তু সে আজ অত্যন্ত নিষ্ঠুর হয়ে বল্লে—“আমি পারবো না; ইচ্ছা হয় তুমি ওঁকে শুধোও।”
আমার আর ভোজনে সুখ হল না, শয়নে শান্তি এল না। মহাপুরুষ উপাদেয় রকমেই আমাদের পান ভোজন ও শয়নের ব্যবস্থা করেছিলেন। অবিনটা দিব্যি সেগুলো উপভোগ কল্লে এবং বেলা চারটের সময় ফিরতি ষ্টীমার ধরবার জন্য ঠিক সময়ে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়ালো। কিন্তু আমার এস্থানটা থেকে কিছুতেই নড়তে ইচ্ছা ছিল না। এবার আমি অবিনের ঠিক পাল্টা-জবাব দিলেম—“আমি যাবো না; তোমার ইচ্ছা হয় তুমি যাও!” কত আশ্চর্য্য ব্যাপার চোখের উপরে ঘটে গেল, তাতে অবিনের কৌতূহল জাগেনি; কিন্তু ওই যে বলেছি যাবো না, অমনি তার মনে একটু ‘কেন’ জাগল এবং দেখতে-দেখতে সেটা একটা বিরাট কৌতূহলে পরিণত হল। সে ছড়িগাছটা আর ওভারকোটটা খুলে রেখে অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে আমাকে শুধোলো—“নিমন্ত্রণ পেয়েছ নাকি?” আমি গম্ভীর হয়ে বল্লেম- “হুঁ।” অবিনের কৌতূহলের আবেগ দেখে হাসি পাচ্ছিল; সে একেবারে আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বল্লে—“এইখানে তুমি রাত কাটাবার নিমন্ত্রণ পেয়েছ? একি সম্ভব!”—“অসম্ভব কেনইবা হবে?—” অবিন বোধ হয় আমার মুখ দেখে কতকটা এঁচে ছিল আমি তাকে ভোগাচ্ছি। সে এবার জোরের সঙ্গে বল্লে— “অসম্ভব; কেননা আমার পক্ষে সেটা আজ পর্য্যন্ত সম্ভব হয় নি!”—বলেই অবিন ওভারকোট পিঠে ফেলে উঠে দাঁড়িয়েছে, অমনি সেই মহাপুরুষ ঘরে এসে বল্লেন—“যা এতদিন অসম্ভব ছিল, আজ তা সম্ভব হোক; কি বলেন?”
আমাদের আর দুবার করে অনুরোধ করতে হল না। আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে যখন তাঁর দিকে চেয়ে দেখলেম তখন তাঁর হাতে হাতির দাঁতের রং একটা পাখী দেখ্লেম। সেটা পায়রা কি ঘুঘু কিছু বোঝা গেল না; আর তাঁর পাশে যেন পাথরে-গড়া একটি সুন্দর ছেলে।
আজ পূর্ণচন্দ্র আকাশের নীলের উপরে সাদা আলোর একটা জাল বিস্তার করে দেখা দিয়েছেন। এমন পরিস্কার ধব্ধবে রাত আমি দেখিনি। তার মাঝে একটা শ্বেত—পাথরের মন্দিরে আমরা এসে বসেছি। অবিনের পরণে তার সেই নেভি-ব্লু চায়নাকোট, আমার সেই গেরুয়া অলষ্টর, আর তাঁর পা থেকে মাথা পর্য্যন্ত সাদা সাজ। তাঁর মাথার চুল যে এত সাদা তা পূর্ব্বে আমার চোখে পড়ে নি। যেন সাদা ফেনার মধ্যে তাঁর সুন্দর মুখ শ্বেতপদ্মের মতো দেখা যাচ্ছে। আজ কি সাদার মধ্যেই এসে আমরা ডুব দিলুম। মেঘ যখন তার সমস্ত জল ছড়িয়ে দিয়ে হাল্কা হয়ে উঠেছে—এ তেমনি সাদা।হিমালয়পর্ব্বতের শিখরের তুষার যখন তার সমস্ত তরলতা সমাহার করে শুভ্র কঠিন হয়ে উঠেছে— এ তেমনি সাদা। এরি মাঝে তিনি আস্তে-আস্তে তাঁর ইতিহাস শুরু কল্লেন—“পূর্ব্বজন্মে যাগ-যজ্ঞ দানসাগর শ্রাদ্ধ ব্রাহ্মণভোজন ও কুমারী দানে সর্ব্বস্ব লুটিয়ে দেবার পুণ্যে আমি তিন ত্রিশে নব্বই লক্ষ বৎসর বিষ্ণুলোক ব্রহ্মলোক আর শিবলোকে বাস করে শেষে অমরাবতীতে ইন্দ্রত্ব পদ দখল করে বসলেম। সে বারো হাজার বৎসর নন্দনবনে চিরযৌবন নিয়ে কি আনন্দ, কি বিলাসের মধ্যেই যে বাস কচ্ছিলেম তা বর্ণনাতীত। তোমরা এখানে মোগল-বাদসাহের বাবুগিরির যে-সব গল্প পড়ে অবাক হয়ে যাও সেখানকার তুলনায় সেগুলো কি তুচ্ছ! সেখানে বিরাম নেই, বিশ্রাম নেই, শ্রান্তি নেই, অবসাদ নেই;—মনের বাগানে চিরবসন্তের ফুলগুলো সৌন্দর্য্যের সুখের লালসার মত্ততার অফুরন্ত পেয়ালার মতো রসে চিরদিন ভরপুর রয়েছে। অতৃপ্তির শিখা সেখানে আলাদিনের আশ্চর্যয় প্রদীপের মতো দিনরাত জ্বলছে। স্বর্গের সেই ক’টা দিন আমার ভোগের অনলে উর্ব্বশী রম্ভা তিলোত্তমাকে আহুতি দিয়ে প্রায় স্বর্গবাস শেষ করে এনেছি সেই সময়ে ইন্দ্রানীর উপরে আমার লোলুপ দৃষ্টি পড়ল। আমার কাছে অপ্রাপ্য তখন কিছুই ছিল না। আমার শেষ-পুণ্যফল একটা বিরাট অজগরের মতো উত্তপ্ত নিশ্বাসে আকর্ষণ করে শেষে একদিন ইন্দ্রের ইন্দ্রানীকে আমার দুই বাহুর মধ্যে এনে উপস্থিত কল্পে। সেই রাত্রি—সেই সুনীল আকাশের বাসর ঘরে প্রমোদের বীণার ঝঙ্কারে নারীর ক্রন্দন, সতীর নিশ্বাসের করুণ সুর ডুবে গেল— অশ্রুত রইল! সেই আমার স্বর্গবাসের শেষ-প্রমোদ-রজনী, আমার চিরযৌবনের উত্তেজনার মদিরা পূর্ণমাত্রায় আমি পান কল্লেম। আর সেই রাত্রিপ্রভাতে ইন্দ্রদেবের অভিশাপের সঙ্গেসঙ্গে বারো-হাজার বৎসরের শ্রান্তি আর অবসাদ প্রথম এসে আমাকে আক্রমণ করলে। ইন্দ্রের উদ্যত বজ্র থেকে আপনাকে রক্ষা করবার আর-কোনো উপায় ছিল না। আমি গিয়ে বিষ্ণুর শরণাপন্ন হলেম। তিনি আমাকে একগাছা হরিনামের মালা দিয়ে বল্লেন—“তুমি নিজের কর্ম্মফলেই স্বর্গে এসেছিলে এবং তারি ফলে আবার পৃথিবীতে চলেছ; হরিনাম কর আবার এখানে তোমার স্থান হবে।” স্বর্গ যে কি ভয়ঙ্কর স্থান তা আমার জানতে বাকি ছিল না। অমর-অতৃপ্তিতে আমার আর লোভ ছিল না। আমি বিষ্ণুকে নমস্কার করে ব্রহ্মার কাছে এলেম। তিনি তাঁর মানসপুত্রদের লেখা খানকতক সংহিতা আমার হাতে দিয়ে বল্লেন “এতে যেমন বিধান লেখা হয়েছে সেই মতো যথাবিধানে পৃথিবীতে গিয়ে তুমি প্রায়শ্চিত্ত কর, স্বর্গ আবার তোমার করতলে আসবে।” আমি সেখান থেকেও হতাশ হয়ে দেবাদিদেবের দ্বারে উপস্থিত হয়ে তাঁকে সমস্ত নিবেদন কল্লেম। তিনি বল্লেন—“তুমি কারো কথা শুনো না, স্বর্গলাভের সহজ উপায় আমার হাতে আছে। এই এক টিপ সিদ্ধি মুখে ফেলে দাও, তোমাকে আর স্বর্গের ফটক পেরিয়ে বেশী দূর যেতে হবে না; আমার দূতেরা ঝুঁটি ধরে এখানে তোমায় ফিরিয়ে আনবে।” আমি তখন জগৎ-জননীর পা জড়িয়ে ধল্লেম। মা আমাকে রূপা করে তিন রঙের তিনটি কপোত দেখিয়ে বল্লেন—“পৃথিবীতে এই তিন জন তোমার বন্ধু থাকবে, এদের চিনে নিও, তবেই জীবন তোমার শান্তিতে কাটবে, না হলে আবার এই স্বর্গবাস আর এই স্বর্গবাসের লাঞ্ছনা তোমার অদৃষ্টে ঘটবে নিশ্চয়।” আমি বিষ্ণুর জপমালা, ব্রহ্মার ঘেরওসংহিতা আর শিবের সিদ্ধির পুঁটুলি টেনে ফেলে সেই কপোত-তিনটিকে বুকে জড়িয়ে ধল্লেম। একটি নীল, একটি গেরুয়া, একটি সাদা। দেখতে-দেখতে সপ্তস্বর্গ রামধনুকের রঙের্ মতো আমার চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে গেল। আমি এইখানে নেমে এলেম। সেই তিনটি কপোতী হচ্ছেন—”
অবিন অমনি ফস্ক—রে বলে উঠলো—“বস্ গুরুজী, আর না! গল্পের ভিতর মোরালিটি ও নীতি-কথা এসে মিশছে, রক্ষে করুন! এই নীল-কোট-আমি—আপনার যৌবনের ইয়ার—আমিই হচ্ছি সেই নীল কপোত; মাঝে দুদণ্ডের মতো এই গেরুয়া-কপোত আমার বন্ধু—এ আপনার দাঁড়ে বসে ছোলা খেলে এবং আপনার গোলাপজলের ফোয়ায়ার পিচ্কিরিতে এর ভিতরের ও বাইরের বৈরাগ্য গেরুয়া-রক্ত বমন করে স্বর্গলাভও কলে; তবে এখন আপনার পাশে শিশু-বেশে যে সাদা কপোত দেখা দিয়েছেন ওঁকে নিয়েই আপনি শান্তিতে থাকুন, আমাদের আর নীতিকথা বলে দগ্ধাবেন না।”
শাণিত ছোরার উপরে আলো পড়লে যেমন হয়, মহাপুরুষের চোখদুটো অবিনের এই ধৃষ্টতায় ঝক্—ঝক্ করে জ্বলে উঠ্ল। তিনি আস্তে-আস্তে দাঁড়িয়ে উঠে কোমর থেকে সাপের মতো বাঁকা একখানা ছোরা বার করে অবিনের দিকে এগিয়ে চল্লেন। আমি চীৎকার করে অবিনকে সাবধান করতে যাব কিন্তু কথা সরল না; —সেই ছেলেটা এসে আমার গলা এমন—ভাবে জড়িয়ে ধরেছে! সেই সাদা পাখীটা ঝটপট করে ডানা—ঝাপ্টে মাথার চারিদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর অবিন তার দুই ঘুসো—বাগিয়ে সেই মহাপুরুষের দিকে এগিয়ে যেতে-যেতে কেবলি বলছে—“গল্পে নীতিকথা অসহ্য!”— তার পর হঠাৎ একটা প্রচণ্ড আলো আর শব্দের মাঝে মহাপুরুষ অন্তর্ধান কল্লেন। আমি চম্কে উঠে ফ্যাল্-ফ্যাল্ করে চেয়ে দেখলেম জাহাজের ডেকে শুয়ে আছি; অবিন আমার মুখে কেবলি জলের ঝাপ্টা দিচ্ছে; আমি যেন একটা স্বপ্ন থেকে জেগে উঠছি। মাথায় হাত দিয়ে দেখি একটা ভিজে পটি লাগানো। এই সময় আমাদের এক উকিল সহযাত্রী অবিনকে প্রশ্ন করলেন—“গাড়িটা যে মটোরের ধাক্কায় উল্টে গেল আপনি তার নম্বরটা নিলেন না কেন? এর মাথায় যে-রকম চোট লেগেছে তাতে নালিশ চলতো।”