বিষয়বস্তুতে চলুন

পথে-বিপথে (১৯১৮)/নিষ্ক্রমণ

উইকিসংকলন থেকে

নিষ্ক্রমণ

 মায়ের পরশ! আলোয়-ধুলোয় লোকে-লোকাকীর্ণ সহরের কিনারা দিয়েই এই নির্ম্মল পরশখানি একটুখানি নদীর বাতাস হয়ে বহে চলেছে। এপার থেকে ওপারে যাবার, পার থেকে ঘরে আসার সেতু-পথে চকিতের মতো এই পরশ,—গঙ্গাজলে ধোয়া এই পরশ!

 এই শান্ত সুস্নিগ্ধ পরশখানির এক-পারে দেখছি পরিচিত পুরাতন দেশ, আর-পারে দেখা যাচ্ছে প্রবাস-বাসের সিংহদ্বার—হিমরাত্রির অন্ধকার মাথা।

 বিপুল জনস্রোতের সঙ্গে একত্রে ছুটে চলেছি, ঠেলে চলেছি— নিঃশব্দে, নীরবে; আর নদীর উপর দিয়ে অবিশ্রান্ত বহে আস্ছে কাজল আকাশ—কালো জলের সমস্ত স্নেহমাখা মায়ের পরশ!

 অন্ধকারের মাঝখান থেকে একটা তীব্র বাঁশি দিক্‌দিগন্তের সুনীল পরিসর হঠাৎ ছিন্ন কোরে দিয়ে চীৎকার কোরে উঠল! আবার আলো, আবার ধুলো, আবার জনকোলাহল! এ-সমস্তকে ছাড়িয়ে যখন পৃথিবী-জোড়া প্রকাণ্ড রাত্রি ভেদ কোরে চলেছি, তখন কেবল শুন্ছি পায়ের তলা দিয়ে একটা ঝন্‌ঝনা লৌহ-নির্ঝরের মতো ক্রমাগত গড়িয়ে চলেছে।

 গাড়ির দুই-সারি জান্লার ভিতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে কেবলমাত্র দুই-ফালি আস্‌মানি পর্দ্দা, তার মাঝে-মাঝে ঝক্‌ঝকে এক-একটি তারা।

 ঘণ্টার পর ঘণ্টা নীলের এই দুই যবনিকার ভিতর চলেছি। দক্ষিণে, বামে কিছুই দেখছিনা; কেবল সম্মুখ থেকে একটার পর একটা ঝন্‌ঝনার ধাক্কা আস্ছে আর মাঝে-মাঝে হঠাৎ এক-একটা গাছের ঝাপ্‌সা মূর্ত্তি চোখের উপরে এসে আঘাত কোরেই সরে যাচ্ছে।

 বিরাট রাত্রির এই প্রকাণ্ড বৈচিত্র্য-হীনতার ভিতর দিয়ে উড়ে চলেছি বল্লে ভুল হয়। নিশাচর পাথীরা রাত্রির নীরব নীলের মধ্যে আপনাদের নিশ্চল পাখা মেলিয়ে নিঃশব্দে যেমন ভেসে যায়, এ তেমন কোরে যাওয়া নয়, এ যেন একটা উন্মত্ত দৈত্য চাকা-দেওয়া লোহার খাঁচায় আমাকে বন্ধ কোরে পৃথিবীর উপর দিয়ে দৌড়ে চলেছে; তার চলার প্রচণ্ড বেগে লোহার খাঁচাটা পৃথিবীর বুকআঁচ্ড়ে চারিদিকে অগ্নিকণা ছিটিয়ে অন্ধকুহরের ভিতর ক্রমান্বয়ে এগিয়ে চলেছে।

 সুদীর্ঘ অনিদ্রা, অফুরন্ত অস্থিরতা, তার পরে বিরাট অবসাদ! নির্জ্জীব প্রাণ নিরুপায় অবোলা একটা জন্তুর মতো চুপ কোরে পড়ে আছে—অপার অন্ধকারের মুখে দুই-চোখ মেলে।

 একটুখানি আলোর আঘাত,—নিশীথ-বীণায় সোনার তারের একটুখানি তীব্র কম্পন। ঊষার অচঞ্চল শিশির, তার মাঝখানে একটিবার স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছি—নূতন দিনের দিকে মুখ কোরে। পৃথিবীর পূর্ব্বপার-পর্য্যন্ত অনেকখানি অন্ধকার এখনো রাশীকৃত দেখা যাচ্ছে। কৃষ্ণসার চর্ম্মের মতো একটি কোমল অন্ধকার, তারি উপরে আলোর পদক্ষেপ ধীরে ধীরে পড়ছে! সম্মুখে দেখা যাচ্ছে একটি পদ্মের কলিকা জলের মাঝে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে;—যেন ভূদেবী বিশ্বদেবতাকে নমস্কার দিচ্ছেন।

 পথিক যেমন পথ-চল্তে ক্ষণিকের মতো পথপ্রান্তে দেবতার দেউলটিতে একটি নমস্কার দিয়ে পুনরায় চল্তে আরম্ভ করে, আমরা তেমনি এই প্রাতঃসন্ধ্যাটিকে প্রণাম কোরেই যেন আবার অগ্রসর হচ্ছি।

 একটা কূলকিনারা-হারা বালুচরের ঠিক আরম্ভে রাত্রি প্রভাত হয়েছে। আকাশের বর্ণ দূরে-দূরে নদীর ক্ষীণ ধারাগুলিকে সুতীক্ষ্ণ ছুরির মতো উজ্জ্বল কোরে তুলেছে। পৃথিবীর শেষ—প্রান্ত-পর্য্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে—পরিস্কার ফিরোজার একটি মাত্র প্রলেপ; তার উপরে একঝাড় কুশ আর কাশ। নুতন সূর্য্যালোক কাশ—ফুলের শ্বেত-চামরের উপরে আবীর ছড়িয়ে সমস্ত ছবিটিকে রাঙিয়ে তুলেছে। নির্জ্জন এই নদীর পার, নিঃশব্দ নিশ্চল এই নদীপারের বালুচর,—এর ভিতর দিয়ে জলের ক্ষীণধারা আমাদেরই মতো মন্দগতিতে চলেছে।

 নদী থেকে শত-শত হাত ঊর্দ্ধ দিয়ে সেতুপথ বেয়ে চলেছি। একটি মৃদুমন্দ দোলা, গতির একটা শিহরণ মাত্র,—এছাড়া আরকিছু অনুভব হচ্ছেনা। চলেছি, চলেছি— দিনের মন-ভোলানো সবুজের মাঝ দিয়ে, রাতের ঘুমপাড়ানো নীলের দিকে।

 অশেষ পথ, সুদীর্ঘ প্রহর-পলের ভিতর দিয়ে, ক্রমাগত চলেছে; দিন ও রাত্রি এই পথের দুইধারে নিরাবরণ ও আবরণের দুইখানি মায়াজাল রচনা করতে-করতে আমাদেরই সঙ্গে চলেছে।

 বারাণসী—মন্দির-মঠের একটা প্রকাণ্ড অরণ্য; দ্বিপ্রহরের সূর্যালোকে তার সমস্তটা সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে,—জনশূন্য স্নানের ঘাটে সোপানের কোলে-কোলে নদীজলে বিজলী রেখাটি থেকে, তপ্ত পথে নিঃশব্দে যে-যাত্রীরা চলেছে তাদের গাঢ় ছায়াটি পর্য্যন্ত। এ যেন একটা মায়াপুরীর দিকে চেয়ে রয়েছি! পাষাণ-প্রাচীরগুলো থেকে একটা উত্তাপ মুখে এসে লাগছে, নাগরিকদের সমস্ত গতিবিধি কার্য্যকলাপ আমাদের চোখে পড়ছে স্পষ্ট, কিন্তু তাদের কোনো সাড়াশব্দ আমাদের কাছে পৌঁছতে পারছেনা। এ যেন একটা মূকের রাজত্ব পেরিয়ে চলেছি। আর শব্দের সীমার বাহিরে তাদের এই প্রকাণ্ড নগরী, উর্দ্ধ-আকাশে পাংশু দুইটা পাষাণ-বাহু তুলে, একটা ভাষাহীন নিবারণের মতো দূর-দূরান্তরের দিকে চেয়ে রয়েছে—দুইপ্রহর বেলার শব্দহীন আলোকের গায়ে চিত্রার্পিত।

 রৌদ্রদগ্ধ প্রান্তরের উপরে বেলাশেষের তাম্র আভা। আম্রবনের ছায়ায়-ছায়ায় রাত্রি আপনার আশংসা নিয়ে এখনি দেখা দিয়েছে। বনরেখার উপরে অযোধ্যার শেষ—নবাবের বহুকালের পরিত্যক্ত প্রাসাদের একটা অংশ আকাশের পরিস্কার নীলের গায়ে শুষ্করক্তের গাঢ় একটা বিমলিন ছাপ ফেলেছে। বাঁধ-ভাঙা গোমতীর জল প্রকাণ্ড একটা ছিন্ন কন্থার মতো পৃথিবীর উপরে বিস্তৃত হয়ে পড়েছে—অনেক দূর পর্য্যন্ত সমস্ত সবুজকে আচ্ছাদন কোরে।

 পশ্চিম দিগন্তব্যাপী শোণিমার নীরব একটি নির্ঝর আকাশ থেকে পৃথিবীর উপর পর্য্যন্ত নেমে এসেছে; রাতের পাখী এরি উপর দিয়ে কালো ডানা মেলে উড়ে আসছে।

 রাত্রি তৃতীয়-প্রহরে বৃষ্টি নেমেছে, পাহাড়ের হাওয়া অন্ধকারের ভিতর দিয়ে মুখে এসে লাগছে—বরফের মতো! দূর-দূরান্তরে একটিমাত্র ঝিল্লি অন্ধকারে শব্দের একটা উৎস খুলে দিয়ে ক্রমান্বয়ে গেয়ে চলেছে। একটা পান্থশালার প্রদীপ জলে-ধোয়া পৃথিবীর মসৃণতার উপরে আপনার আলোটি অনেক-দূর-পর্য্যন্ত বিস্তৃত কোরে দিয়ে অনিমেষে রাত্রির দিকে চেয়ে রয়েছে।  নিরন্ধ্র, অন্ধকারকে ধাক্কা দিতে-দিতে গাড়ি চলেছে— হিমালয়ের যেদিক বেয়ে গঙ্গা নামছেন সেই দিক হয়ে।

 এখানে মেঘ-কেটে চাঁদ দেখা দিয়েছেন— অন্ধকার গিরিশ্রেণীর চূড়ায়। অদূরে স্নানের ঘাট, নহবৎখানা, মন্দির-চূড়া জ্যোৎস্নায় ঘুমিয়ে আছে; গঙ্গার বাতাস সমস্তটির উপরে স্নিগ্ধতা ঢেলে দিয়েছে। আমাদের যাত্রা-পথের শেষে, সুদীর্ঘ রাত্রির অন্তিম-প্রহরে এই গঙ্গাদ্বার! এরি ওপারে সূর্য্যদেবের হরিতাশ্বসকল অপেক্ষা করচে —নূতনকে অদৃষ্টপূর্ব্বকে জগতে বহন কোরে আনবার জন্য।