পথে-বিপথে (১৯১৮)/পর্-ঈ-তাউস্
পর্-ঈ-তাউস্
ওপারে মুচিখোলার নবাবী নিলেমে চড়েছে, এপারে সবুজ ঘাসের ঢালুর উপরে দুই বন্ধুতে পা-ছড়িয়ে চড়ুই-ভাতির পরে একটু গড়িয়ে নিচ্ছি,—ঠিকে-গাড়ির ঘোড়াগুলো হঠাৎ কাজের অবসরে এক-এক-বার যেমন ধূলোয় লুটোপুটি খেয়ে হাত-পা ছড়িয়ে নেয়।
সেদিন একটা ভাঙা খাঁচা জলের স্রোতে ভেসে চল্তে দেখে আমি অবিনকে তামাসা করে বলেছিলেম—“ওহে খাঁচাটা নবাবের চিড়িয়াখানার দিক থেকে যখন ভেসে আস্ছে, তখন এটা পক্ষীরাজের খাঁচা হলেও হতে পারে। দেখ-না সাঁৎরে, যদি ওটাকে ধরতে পারো।” অবিন সাঁতার একেবারে না জানলেও সেদিন যে-কোরে জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আর খাঁচাটা না তুলে, তাঁকে জেলে ডেকে জল থেকে তুলে আনার জন্যে আমার সঙ্গে
যে-আড়িটা দিয়েছিল, চিরদিন সে-কথা আমার মনে থাকবে। এখন সে-কথা অবিন ভুলে গেছে; কিন্তু পক্ষীরাজ তার সেই যৌবনের দুঃসাহস বোধ হয় ভোলেনি; তাই হঠাৎ আজ তার স্থুল-শরীর কাশীপুরের ঘাট থেকে জাহাজে আমাদের দর্শন দিতে এসে উপস্থিত। গোছা-গোছা ময়ূরের পালক-হাতে সে লোকটা! কী অদ্ভুত যে দেখতে তাকে, তা আর কী বল্ব! ভণ্ডামির যত-রকম পালক হতে পারে সব-ক’টা দিয়ে সে আপনাকে সাজিয়েছে।
ছোট ছেলে পাখীর ছানা হাতে পেলে টিপে-টুপে পালক—ছিঁড়ে যেমন করে, অবিন ঠিক তেমনি এ-লোকটাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুল্লে। অবিনের গায়ে তূলো-ভরা ছিটের কালো কোট। এ-লোকটাকে ময়ূর-পুচ্ছে বিচিত্র দেখে আমার কথামালার দাঁড়কাকের গল্পটা মনে পড়ল। আমার তুলনাটা ইংরিজিতে অবিনকে শুনিয়ে দিতেই সে-লোকটা আমার দিকে চেয়ে বলে উঠলো— “তোমার বন্ধুর কোটের নক্সাটা ভালো করে কি দেখা হয়েছে? ওটা যে আগাগোড়া ময়ূর-পালকে ভরা!”—বলেই লোকটা উত্তরপাড়ার ঘাটে লাফিয়ে পড়লো—গাঁজার বিকট গন্ধে জাহাজ ভরে দিয়ে। আমি অবিনের কোটের দিকে চেয়েই একেবারে ঘাড়হেঁট কল্লেম।
আকাশে একটা রাম-ধনুক ময়ূরের পালকের রং-ধরে দেখা দিয়েছে। আবার যখন মুখ—তুলে চাইলুম তখন সর্বপ্রথম ঐটেই আমার চোখে পড়লো। আমি অবিনকে সেটা দেখাবো বলেডাক্তে গিয়ে দেখি অবিন সেখানে নেই। আশে-পাশে কোনো সহযাত্রী দেখলেম না। জাহাজের ডেক্ সমস্তটা খালি পড়ে আছে। তারি এককোণে আমাদের বায়া-তবলা-জোড়া পড়েছিল। হঠাৎ সে-দুটো দেখি, দুখানা কোরে পালকের ডানা বের কোরে পাথীর মতো উড়ে পালালো। সঙ্গে-সঙ্গে জাহাজের খালি বেঞ্চিগুলো একে-একে পালক গজিয়ে পক্ষীরাজের মতো লাফাতে লাফাতে ডেক্ময় ছুটোছুটি করতে-করতে একে-একে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে চম্পট দিলে।
আমাকে না-জানিয়ে বন্ধুরা সবাই হয় মাছের মতো, নয় পাথীর মতো পাখা না-গজিয়ে কেমন করে এই মাঝ—গঙ্গা থেকে সরে পড়লেন, বেঞ্চগুলো আর ডুগ্ডুগি দুটো কেন এমন অদ্ভুত কাণ্ড করতে লাগলো—একথা যেমন আমার মনে উদয় হয়েছে অমনি দেখি স্টীমারখানা দুপাশে দুটো প্রকাণ্ড ডানা ছড়িয়ে দিয়ে সোজা সেই আকাশ—জোড়া ময়ূর-পুচ্ছের মতো রামধনুকের ফাটকটার দিকে উঠে চল্লো।
জল ছেড়ে শূন্যে খানিক ওঠবার পর দেখছি অবিন উপরতলার সারেঙের কুট্রী থেকে উঁকি মেরে আমার দিকে চেয়ে হাস্ছে। তার পাশে সেই ময়ূরের পালক-ওয়ালা অদ্ভুত মানুষটা আমাদের! আমি এদের কোনো কথা বলেছিলেম কিনা মনে নেই, উত্তরে একটা খুব গম্ভীর গলায় শুনলেম—“পালকের যাদুঘরে চলেছি,— ময়ূর-পুচ্ছধারীদের সপ্তম স্বর্গে!”
স্বর্গ এবং যাদুঘর এর একটাতেও যাবার মতলবে আমি বাড়ি থেকে রওনা হইনি। তরী আমার বেরিয়েছে জোয়ার ঠেলে; ভাটা কাটিয়ে ঘরে ফিরবো—এই কথাই মনে ছিল। কাজেই আমি খুব চেঁচিয়ে বল্লেম—“জাহাজ ভেড়াও, আমি নামতে চাই।” কিন্তু জাহাজ তখন তার তরণী-রূপ ছেড়ে পাগ্লা পক্ষীরাজ হয়েছে। আর চালাচ্ছেন তাকে সেই পালকধারী! কাজেই কোনো ঘাটেই যে সে না-দাঁড়িয়ে বরাবর রামধনুকের মটকায় গিয়ে হ্রেষাধ্বনি করে হঠাৎ থামবে তার আর বিচিত্র কি!
তিনটেতে আমরা পক্ষীরাজের পিঠ থেকে জ্বলন্ত উল্কার মতো কেন যে এতক্ষণ মহাশূন্যে ঠিকরে পড়িনি, এইটেই আশ্চর্য্য! ময়ূরের পালকের ডগায় মাছি যেমন, তিনটিতে আমরা তেমনি সাতরঙের একটু কিনারা প্রাণপণে আঁকড়ে শূন্যে দুলছি, এমন সময় আমাদের পাণ্ডা—সেই ময়ূরপুচ্ছধারী মানুষ-দাঁড়কাক রামধনুর ডগায় স্থির হয়ে বসে আঙুল বাড়িয়ে দেখালেন। সেখানে কি আশ্চর্য্য পাখীরাই ঘুরে বেড়াচ্ছে! রঙিন পালকের আলোতে সে-দিকটা কখনো দেখাচ্ছে জ্যোৎস্নার মতো নীল, কখনো সকালের আকাশের মতো সোনালী, সন্ধ্যার আকাশের মতো রাঙা, জলের মতো ঝক্ঝকে রূপালী, ধানের ক্ষেতের মতো ঠাণ্ডা সবুজ। এই বা নতুন পাতার মতো টাট্কা, এই ঝরা পাতার মতো মলিন। রঙের খেলার সেখানে অন্ত নেই। তারি মধ্যে খেলে বেড়াচ্ছে একদল শিশু, পাখীর ঝরা—পালক উড়িয়ে-উড়িয়ে ছড়াছড়ি করে—তপোবনের শকুন্তলার মতো। আমি অবিনের গা টিপে বল্লেম—“ওহে, এরাই হচ্ছে পরী।”
পাণ্ডা একটু হেসে বল্লেন—“আজ্ঞে না। এরা হলো রামধনুকের প্রাণ। এরা আছে বলেই রামধনুকে রং আছে। পরী দেখতে চান্ তো ঐ দিকটায়—যে দিকটায় পালকের যাদুঘর—যেখানে পালকের দাম আছে।”—এই বলে তিনি দক্ষিণে— প্রায় দক্ষিণ-দুয়ারের কাছাকাছি একটা জায়গা দেখিয়ে বল্লেন—“ওই যে দেখছেন দুখানা ডানা বেঁধে হাত—দুটি বুকে রেখে, ওঁরা হলেন মানুষ, কেবল ডানার খাতিরে আমরা বলি ওঁদের এন্জেল্;—আরকোনা তফাৎ মানুষের সঙ্গে নেই। আর ঐ দেখুন গরুড়কে। শুধু ডানা নয়, পাখীর ঠোঁটটা পর্য্যন্ত মুখোস কোরে পোরে দাস্যরসের রাজসিংহাসন আপনার রামা-চাকরের হাত থেকে বেদখল করে নিয়ে বসে আছেন। ওই ঠোঁট আর ডানা বাদ দিলে উনি মানুষমাত্র। আর ওই দেখুন বৃন্দাবনের শুক-সারি। এঁদের রাজা গরুড় তবু প্রভুর সেবার জন্যে মানুষের হাত-দুখানা রেখেছেন; কিন্তু এই গরুড়ের চেলা—সেবাদাস সেবাদাসীগুলি নিজেদের টিয়াপাখীর খোলসে সম্পূর্ণ মুড়ে ফেলে আসলটাকে একেবারেই গোপন কোরে দিব্যি সুখে বিচরণ করছে। মানুষ যখন পালকের শিল্পে খুব বিচক্ষণ হয়ে ওঠেনি—অর্থাৎ তাদের গোঁজা পালক ও পাখ্না সহজেই লোকের কাছে ধরা পড়তো—এরা তখনকার জীবের আদর্শ। এ অংশটাকে যাদুঘরের পুরানো অংশ বলা যায়।বড়-বড় শিল, পালক, ধূলো-বালি মুঠো-মুঠো ঝুড়ি—ঝুড়ি আমাদের মাথায় মুখে-চোখে পড়ছে। রামধনুক আঁকড়ে আর থাকা চলে না। এরি মধ্যেই তার সাত—রং ফিকে হতে শুরু হয়েছে—সম্পূর্ণ গল্তে সাত-সেকেণ্ডও লাগবে না। এই ঝড়ের মুখে অবিন তার পালক-ছাপা কোটের বোতাম এঁটে, পাণ্ডাজী তাঁর ময়ূরপালকের চামর বাগিয়ে, উড়ে-পড়বার জোগাড় কচ্ছে দেখে আমি বল্লেম—“ওহে আমার উপায়? আমার ত পালক নেই। আছে মাত্র গায়ে এই কাশ্মীরের ‘পরীতোষ’ শাল। এর নাম পরী বটে কিন্তু এর পালক মোটেই নেই! একে নিয়ে তো ওড়া চলবে না?”
“খুব চলবে। ওকে বুঝি বলে পরীতোষ? ওর ফার্সি নাম হচ্ছে পর্-ঈ-তাউস্। ময়ূরের পেখমের গোড়াতে যে ছাই-রঙের নরম পালক লুকোনো থাকে, তাই দিয়ে এটা প্রস্তুত। বাদশারা তক্ততাউসে এই শালের বিছানা লাগাতেন; এখন আমরা গায়ে দিয়ে থাকি। ভয় নেই, উড়ে পড়।”
মাথা-থেকে-পা-পর্য্যন্ত শালখানা মুড়ি দিয়ে রামধনুকের মট্কা থেকে ঝুপ করে’ আবার যে-জাহাজ সেই-জাহাজেই নেমে পড়লেম। চোখ খুলে দেখলেম যেখানকার সেইখানেই আছি—পূর্ব্বের মতো শ্রীঅবনীন্দ্র। রামধনুক আর পক্ষীরাজের সঙ্গে অবিনটা পালিয়েছে।