বিষয়বস্তুতে চলুন

পথে-বিপথে (১৯১৮)/বিচরণ

উইকিসংকলন থেকে

বিচরণ

 আমাদের সেখানে আর এ-পাহাড়ের ঋতু-পর্যায়ে আকাশপাতাল প্রভেদ। বসন্ত এখানে এসে—যায়—শীতের আগেই, দিক্‌বিদিকে ফুলের মেলা বসিয়ে দিয়ে। আমাদের সেখানে যখন ফুলেদের বাসর-জাগবার পালা, এখানে তখন তুষারের বিছানায় ঘুমিয়ে গেছে সব ফুলগুলি। সেখানে বসন্ত দেখা দেয় শীতের আসরে শিউলি-ফুল ছড়িয়ে; এখানে শীশু আসে বসন্তের সভায় সাদা চাদর টান্‌তে-্টান্‌তে, ফুল মাড়িয়ে।

 শীত গলে-পড়ছে বর্ষায়, বর্ষা ফুটে উঠছে বসন্তে, বসন্ত ক্ষীন্ন হতে-হতে শরতের জ্যোৎস্নার মধ্যে—দিয়ে ঝিক্‌মিক্‌ করতে-করতে তুষারের শুভ্রতায় গিয়ে শেষ হচ্ছে; এখানের ছন্দটা এইরূপ।

 এখানে এসে অবধি হিমালয়কে একবার দেখে নেবার জন্যে উঁকি দিচ্ছি—এখানে-ওখানে, সকালে-সন্ধ্যায়। কিন্তু অচল সে, কুয়াশার ভিতরে কোথায় যে চলে গেছে, সপ্তাহ ধরে তার সন্ধানই পাচ্ছি না।

 এ যেন একটা নিহারিকার গর্ভে বাস করছি! দিন এখানে আছে—উত্তাপহীন অনুজ্জ্বল; রাত আস্ছে—অঞ্জনশিলার মতো হিম অন্ধকার।

 আমার চারিদিকে সবেমাত্র দশবিশ হাত পৃথিবী—গুটিকতক ফুল-পাতা নিয়ে,—যেন অগোচরের কোলে একটুক্‌রো জগৎ; আর আমরা যেন এক—ঝাঁক দিশেহারা পাখী এইখানটায় আশ্রয় নিয়েছি। আমাদের কাছে চারিদিক এখনো অপরিচিত রয়েছে। শিল্পী এখনো যেন তাঁর রং-তুলির কাজ শুরু করেননি,—সবেমাত্র কুয়াশার শুভ্রতার গায়ে পার্ব্বত্য দৃশ্যের আমেজ একটু-একটু দেগে রেখেছেন— অসম্পূর্ণ, অপরিস্ফুট।

 এই-যে পরিচয়ের পূর্ব্বমূহূর্ত্তে কুয়াশার যবনিকাটি দুল্ছে— এপারে-ওপারে বিচ্ছেদের সূক্ষ্ম ব্যবধান—একে সরিয়ে যেদিন শুভদৃষ্টি হবে, সেদিন অন্তর গিয়ে মিলবে বাহিরে, বাহির এসে লাগবে অন্তরে! এই কথাটাই একগোছা সবুজ-পাতা আমার জানলার কাচের বাহিরে কেবলি ঘা-দিয়ে-দিয়ে জানাচ্ছে—কাচের এপারে ঘরের বন্দী প্রকাণ্ড একটা পতঙ্গকে। অজানার দিক থেকে একটির-পর-একটি দূত-চঞ্চল একটি নীল পাথী, ছোট একটি মৌমাছি—তরুলতার কানে-কানে অপরাজিতার ঘোমটা একটু খুলে, এই কথাই জানিয়ে যাচ্ছে—দিনের মধ্যে শতবার।

 আজকের সন্ধ্যাটি শীতাতুর কালো হরিণের মতো পাহাড়ের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালো—অন্ধকারের দিকে মুখ কোরে। কলঙ্কধরা একখানা কাঁসরের মতো গভীর রাত্রিটাকে কালো ডানার ঝাপ্‌টায় বাজিয়ে তুলে মস্ত—একটা ঝড় আজ মাথার উপরে ক্রমান্বয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে—যেন দিশেহারা পাগল পাথী।

 রাত্রিশেষে বর্ষা দিকবধূর কাছে বিদায় নিয়ে চলে গেছেন। আকাশের নীল চোখে সরু একটি কাজল-রেখার কোণে একটুখানি অরুণ আভা দেখা যাচ্ছে; আর যতদূর দৃষ্টি যায় কেবল দেখছি ধূসরের অচল ঢেউ, দিকের শেষ-সীমা পর্য্যন্ত;—আর রংও নেই, রূপও নাই! এই অবিচিত্রতার মধ্যে একটি মাত্র পাহাড়ি-ফুলের কুঁড়ি, বসন্তের নববধূ সে, আলোর প্রতীক্ষা করছে! প্রজাপতির পাখার চেয়ে সুকুমার এর পাব্ড়িগুলি; এত ছোট, এত কচি— একেই ঘিরে আজ প্রভাতের সমস্ত সুর। সুদূর গিরি-শিখরে, মেঘলহরীর তীরে, বনের পাখীর কণ্ঠে, নিহারের যবনিকা ঠেলে বাহিরে ছুটে এসেছে পর্ব্বতের কলভাষী দুরন্ত শিশু—এই-যে জলধারা, এর ঝরে-পড়ার মধ্যে!

 কাঁচা সোনার একটিমাত্র আভা—বসন্ত-বাউরীর বুকের পালকের অস্ফুট বাসন্তী আভা—সকালের আকাশে বিকীর্ণ হয়ে গেল। এই আলোর উপরে সর্ব—প্রথম তুষার, আজ সে সোনার পটে যেন কাজলের লেখার মতো কালো হয়ে ফুটে উঠল।

 এই কালো বরফের নিষ্কলঙ্ক ললাট! এইখানে বসন্ত—দিনের—তরুণ দিনের—প্রথম আশীর্ব্বাদ পড়েছে; সে একটিমাত্র আলোর করকা! আর তারি আভা তুষারের সহস্র— ধারায় হিমালয়ের অন্ধকার আলো-কোরে গড়িয়ে আসছে পৃথিবীর দিকে ফুল-ফোটার ছন্দটি ধরে।

 আমার এ-বাগানখানি পাহাড়কে আঁকড়ে—ধরে শূন্যের উপরে ঝুলে রয়েছে। এখানে একঝাড় পাহাড়-মল্লিকা, এক-ঝাঁক পাখী আর আমি! এইখানটিতে তুষারের বাতাস নিয়ত গাছের ফুল, পাখীর গান ফুটিয়ে তুলছে। আমার গান নেই। সকাল-সন্ধ্যার একখানা পাথরের মতো নিশ্চল নির্ব্বাক আমাকে, বাতাস আর আলো শুধুই স্পর্শ করে যাচ্ছে।

 আমাদের যারা অনেকবার পাহাড়ে এসেছে এবং যারা নুতন আগন্তুক তাদের দেখি ওঠা-নামা, চলা-ফেরার অন্ত নেই। যেখানে ইংরাজি বাদ্য, গোরার নাচ সেই-সকল মেলাতেই এরা ত্রিসন্ধ্যা যোগ দিয়ে ঘুরছে, কেবলি ঘুরছে,—হয় ঘোড়ার পিঠে, নয়তো নিজের পায়ে দুইজোড়া চাকা বেঁধে! মাড়োয়ারীরাজার ফরাসী-ধরণের বৈঠকখানার চূড়োয় বাতাসের ধনুকে-চড়ানো ঐ লোহার তীরটার মতো, এরা দেখি, শূন্যকে বিঁধে-বিঁধেই কেবলি ঘুরছে বাঁধা গণ্ডীর মধ্যে—ছুটেও চলছে না উড়েও যাচ্ছে না।

 আমার চলার গণ্ডীটাও যে খুব বড়, তা নয়। একটি পাহাড়ের যে-পিঠে সূর্য্য উদয় হন, আর যে-পিঠে তিনি অস্তে যান, এইটুকুমাত্র প্রদক্ষিণ কোরে উঁচু-নীচু একটা পথ; এই পথ-দিয়ে কাঁটা-দেওয়া একটা মস্ত লাঠি নিয়ে আমি ঘুরে বেড়াচ্ছি—পাথর কুড়িয়ে, গাছ সংগ্রহ কোরে—মাসের মধ্যে ত্রিশ না হোক, ঊনত্রিশ দিন তো বটেই;—এই পথটিতেই সকালের আলোয়, সন্ধ্যার ছায়ায়, দিবা দ্বিপ্রহরে, রাতের অন্ধকারে। এইখানে পাথরের গায়ে কচি স্যাওলার নূতন সবুজ, কেলুবনের ফাঁকে নীলআকাশের চাঁদ, একটি নির্ঝরের শীর্ণ ধারা আর পর্ব্বত ছেয়ে দুর্গম বনের নিবিড় রহস্য; প্রাতঃসন্ধ্যায় ভ্রমরের গুঞ্জন, সায়ংসন্ধ্যায় পাখীদের গানের শেষে অন্ধকারের সেই ঝিম্‌ঝিম্‌—যা শুন্ছি, কি বোধ কচ্ছি বলা কঠিন।

 এই পথের একটা জায়গায় একখানা প্রকাণ্ড সাইন্‌বোর্ড, তাতে লেখা আছে—“সাধারণ সড়ক্ নয়। অনধিকার প্রবেশ দণ্ডিত হইবে!” পর্ব্বতের কোলে এই ‘সাইন্‌’টা আমাকে প্রথমদিন বড়ই ভয় দিয়েছিল, কিন্তু সন্ধানে জানলেম যারা এই মেয়াদের ভয় দিয়ে সারা পাহাড় ঘিরে নিতে চেয়েছিল, তাদের মেয়াদ অনেকদিনই ফুরিয়েছে। পথটা এখন আর অনন্যসাধারণ নেই এবং সাধারণেও এই পথটার আশা অনেকদিন ছেড়ে দিয়ে, একধাপ নীচে স্কুলবাড়ী, কুয়োখানা প্রভৃতির গা-ঘেঁসে আর-একটা ঘুরুনে রাস্তা—সারকুলার রোড—ক্লবঘর ব্যাণ্ডষ্টাণ্ড ও বাজার পর্য্যন্ত জিলাপির পাকের ধরণে রচনা করে নিয়েছে; সুতরাং এরাস্তাটার ভবিষ্যতে পথ—হয়ে ওঠবারও কোনো আশা নেই। এ বিপথ হয়েই রয়ে গেল,—মানুষের কাজে লেগে পথ— হয়ে—ওঠা এর ভাগ্যে আর ঘটলো না।

 অনেকদিনের আনাগোনায় এই বিপথটার একটা মানচিত্র আমার মনে আঁকা হয়ে গেছে। পাহাড়ের পশ্চিম-গা বেয়ে প্রথমটা সে ঠিক পশ্চিম-মুখে সুন্দর বাঁক নিতে-নিতে “সহস্রধারা”র উপত্যকার দিকে কাৎ হয়ে চলেছে। ঠিক যেখানাটি—থেকে সূর্য্যাস্তের নীচে সন্ধ্যার বেগুনি আঁধার চিরে নদী একটি রূপোর তারের মতো দেখা যায়, সেখানটিতে পৌঁছে পথ স্তূপাকার পাথরের উপর হঠাৎ লম্ফ দিয়ে অকস্মাৎ আবার পূবে মোড় নিয়ে পর্ব্বতের একটা উত্তর ঢালু বেয়ে ছুটে নেমেছে; একটু-দূর গিয়েই হঠাৎ পর্ব্বতের পূবের দেয়াল ঘেঁসে আবার পশ্চিমে দৌড়; সেখানে একদল মহিষ চোখ-রাঙিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখেই পাহাড়ের একটা গড়ানে ভাঙন দিয়ে সে দ্রুত নেমে গিয়ে সোজা আকাশের দিকে উঠেই সহসা মোড়—নিয়ে পর্ব্বতের পূর্ব্বগায়ে দিগন্ত-জোড়া হিমালয়ের সম্মুখে দেবদারু-বনের ছায়ায় এসে লুকিয়ে পড়েছে; এই দিকটাতে সে শৈবল-কোমল নির্ঝর-শীতল পর্ব্বতের বাঁকেবাঁকে একলাটি খেলা করতে-করতে পর্ব্বতের পূর্ব-পিঠে আরএকটা গলির মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে; এখানে টিন্-মোড়া দোকান-ঘরে দর্জ্জি কোট সেলাই কচ্ছেন, রাস্তার একপাশে কাদের একগাড়ি জ্বালানী কাঠ খরিদ্দারের অপেক্ষায় পড়ে আছে, হতভাগাচেহারার দুখানা ভাঙা ডাণ্ডি আড্ডার দাওয়ার বাহিরে চড়ায় বাধা পান্‌সির মতো কাৎ—হয়ে পড়েছে। এই পর্য্যন্তই বিপথের দৌড়; বাকি যেটুকু অতিক্রম কোরে আমাদের বাসায় উঠে যেতে হয় সেটা বিপথ না হলেও বিপদ যে তার আর সন্দেহ নেই! মানুষ সেটাকে পর্ব্বত-শিখর পর্য্যন্ত এমন তিন-চারটে বিশ্রী মোচড় দিয়ে টেনে তুলেছে যে সেখানে কোনো যানও যান্‌না, পাও চান্‌না যে চলি।

 বিপথের শেষে পথের এই মোড়টা যেন ইস্কুল-মাষ্টার, নয়তো ধর্ম্মপ্রচারক! তার বুলিই হচ্ছে—‘এইবার পথে এসো!’ নয়তো সে বলছে—‘বিপথ হইতে পথে আইস।’ এই যে রোড—সেণ্টভিন্‌সেণ্ট বা তপস্বী ভিন্‌সেণ্ট-মহোদয়ের রাস্তা—এখানে নিরালা একটুও নেই;—মানুষের সকৌতুক তীক্ষ্ণদৃষ্টির চোর-কাঁটা এখানে আমার মতো বিপথের পথিকদের জন্য শরশয্যা রচনা কোরে রেখেছে। পেন্‌সন্‌ভোগী এক কাবুলী আমীরের নূতন বয়ঃপ্রাপ্ত দুইচারি বংশধর—যাদের মাথায় শিখ-পাগড়ি, গায়ে সাহেবি কোট ও পায়ে যোধপুরী পাজামা ও ডসনের বুট, তারা আজ কদিন ধরে আমার লম্বা চোগা ও গোর্খা টুপিটার উপরে বক্রদৃষ্টি নিক্ষেপ করছে এবং দুইবেলা আমার গা-ঘেঁসেই বলাবলি করে চলেছে— “আজব টোপি! আজব চোগা!” আজবের মধ্যে আমার দুটিমাত্র পদার্থ—দুইটিই তিব্বতীয় এবং শীতের সম্পূর্ণ উপযোগী। কিন্তু আজবের সংগ্রহ এগরীবের চেয়ে আমীর-পুত্র-কয়টির অনেক বেশী ছিল। সুতরাং যুদ্ধে আমারই হার লেখা গেল। এক মেমসাহেব শিলাতলে বসে মসুরী-ভ্রমণের নোট নিচ্চেন। তিনিও দেখলাম আমার দিকে একবার দৃষ্টিপাত করেই চট্‌-কোরে খাতায় কি-এক লাইন টুকে নিলেন। তাঁর সে-নোট ইউরোপীয় যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্য্যন্ত দুই-একজন নিকট-বন্ধুছাড়া আর কারু হাতে পড়ছেনা। যাই হোক, এইরকম সব ছোট-খাট উৎপাত এড়াতে মানুষের পথে আমি চোগা ছেড়ে একটা প্রকাণ্ড সোলাটুপি ও তদুপযুক্ত চাঁদনীর কোট-প্যাণ্ট পরিধান করে বিচরণ কোরে বেড়াই। তাতে মানুষেরা আমায় আর তাড়া দিচ্ছেনা বটে কিন্তু মানুষের উল্টোপিঠের জীব যারা, তারা আমাকে তরুশাখার উপর থেকে একটা আয়না দেখিয়ে ইঙ্গিত করতে ছাড়েনা। সুতরাং বলার জ্বালায় আমার চলা দুর্ঘট হয়েছে—কি পথে, কি বিপথে। অথচ ডাক্তার পরামর্শ দিচ্ছেন চলবারই।

 পথে যাই, কি বিপথে; চলি কি না চলি!—এই দো-টানার মধ্যে যখন আমি ন যযৌ ন তস্থৌ অবস্থায় কোনো— রকমে পথবিপথ দুইয়েরই মান রেখে দিনযাপন করছি—সেই সময় দেখি পর্ব্বত একেবারে আপাদমস্তক ফুলের সাজ পোরে সহসা বসন্তের বাসর জমিয়ে বসেছেন। “ফুলন ফুলত ভার ভার!” যত পাতা, তত ফুল! যেখানে যত ধরা ছিল—পাথরের বুকে, শাখায়—শাখায় পাতায়-পাতায়—সূর্য্যের উদয়-অস্তের যত রং, আজ তারা ফুল হয়ে বাহিরে এসেছে! ঋতুরাজের বাঁশীর ডাকে পৃথিবীর সমস্ত সবুজ রংটা দেখছি বিপুল হিল্লোলে মেঘ অতিক্রম কোরে গিরিশিখর পর্য্যন্ত উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে! মেঘের বুক থেকে ইন্দ্রধনুর ফোয়ারা সাতরঙের পিচকারি আকাশে ছিটিয়ে দিচ্ছে; আর সন্ধ্যার কুঙ্কুম, সকালের হলুদে হিমালয়ের সাদা আর গেরুয়া—বসনের দুই পিঠই দুইবেলা রঙের প্লাবনে ডুবিয়ে দিয়ে বইছে উত্তরতীরের-বসন্ত বাতাস।

 বসন্তের সঙ্গে অকস্মাৎ পরিচয়ের আনন্দটা আমার পথ-বিপথ দুটোরই ভাবনা ঘুচিয়ে দিয়েছে। আমি আজকাল যখন যে সাজটা হাতের কাছে পাই সেই বেশেই ঋতুরাজের দরবারে ত্রিসন্ধ্যা হাজির দিচ্ছি—একেবারে নির্ভয়ে।

 ইনি এই পর্ব্বতের এক নামজাদা মহিলা আর্টিষ্ট! আজ কদিন ধরে আমার যাবার—আসবার পথ আগ্‌লে হিমালয়ের একটা দৃশ্য-পট লিখতে বসেছেন। সমস্ত উত্তরদিক জুড়ে তুষারের উপরে সন্ধ্যা মুঠো-মুঠো ইন্দ্রধনুচূর্ণ ছড়িয়ে আল্‌পনা টেনে যাচ্ছেন,—মনেই ধরা যায় না, সে এমন বিচিত্র;—একটুক্‌রো সাদা কাগজে এরি নকল নিচ্ছেন অমোদের এই মহিলা আর্টিষ্ট!

উপহাসকে সেদিন আর পুরু পাহাড়ী-চোগার মধ্যে ঢেকে রাখা গেলনা। সে একটা অকাল-বাদলের আকার ধোরে বাতাসে কুয়াসায় ও জলের ঝাপ্‌টায় চিত্র-কারিণীর রং, তুলি, কাগজপত্র উড়িয়ে নিয়ে, অবশেষে তাঁর অতি-আবশ্যকীয় রং-মেশাবার জল-পাত্রটি পর্য্যন্ত উল্টে দিয়ে, দুরন্ত একটা পাহাড়ী-ছাগলের পিছনে-পিছনে পলায়ন করলে একেবারে গিরিশৃঙ্গে।

 এই দলের এক আর্টিস্টের কতকগুলো ছবি নিয়ে একটা লোক কোন্-একটা পাহাড়ে শিল্প প্রদর্শনী খুলেছে! যিনি কবি, যিনি কর্ম্মী তিনি ঐ নীল আকাশ-পটে আলো-অন্ধকারের টান্ দিয়ে ছবি সৃষ্টি করছেন; আর আমরা যারা কবিও নই, শিল্পীও নই, ঐ আসল ছবিগুলো দেখে একটা-একটা জাল দলিল প্রস্তুত কোরে নিজেদের নামের মোহরটা খুব বড়-কোরেই তাতে লাগিয়ে দিচ্ছি —নির্লজ্জভাবে।

 মানুষ সে মানুষই, বিধাতা তো নয় যে তার সৃষ্টিটা বিধাতারই সমান কোরে তুলতে হবে? মানুষের শিল্প মানুষকে আগাগোড়া স্বীকার কোরে বিশহাত দশমুণ্ডু অথবা বিধাতার গড়া নরনারীমূর্ত্তির চেয়ে সুন্দর হয়ে যদি দেখা দেয় দিক্, তার মধ্যে প্রবঞ্চনার পাপ তো ফুটে ওঠে না! কিন্তু তুষার— পর্ব্বত না হয়েও যেটা তুষারের ভ্রম জন্মে দিয়ে চলে যেতে চায়, সেটাকে আমরা কি বলব? সে যে বিধাতা এবং মানুষ, দুয়েরই সৃষ্টির বাহিরে থেকে দুজনকেই অপমান করতে থাকে!

 আমার এ-বাগানে ফুল আর ধরছেনা। প্রতিবেশী সাহেবসুবার ছেলেমেয়েরা—তাদের আঁচল নেই—খড়ের টুপি ভরে ফুল লুট করে নিয়ে চলেছে। আমাদের গয়লা-মালী, তার অনেক যত্নের এ-ফুল। ওই শিশু-পঙ্গপালের বিরুদ্ধে সে আমার কাছে নালিশ জানায় বটে কিন্তু ফুলের মকদ্দমা তার দিনের পর দিন মুলতুবিই থাকে।

 সেদিন এই গয়লার একটা কালো বাছুর খাদ্যাখাদ্য বিচার না কোরেই নিতান্ত ছেলেমানুষি-বশত সাহেবদের বাগানের একটা ফুলগাছ সমূলে নিঃশেষ করে ধরা গেছে। সাহেবের চৌকিদার বাছুরকে থানায় দিতে চলেছে। পথে বেচারা অবোধ জীব মানুষের এই আইনের বিরুদ্ধে বিষম আপত্তি জানাচ্ছে এবং দেখছি তার বড় বড় দুটো চোখ চারিদিককে কেবলি প্রশ্ন করছে সকাতরে—কি তার অপরাধ জান্‌তে। গোরু-বাছুরের উপরে চৌকিদারের একটা শ্রদ্ধা অনুমান কোরেই যেন সাহেব, পুলিশের উপর একখানি জবাবি চিঠি দিয়েছিলেন; সুতরাং উৎকোচ দিয়ে যে নিরপরাধ জন্তুটিকে খালাস করে দিই এমন উপায়ও ছিল না। তখন গয়লাকে তার বাছুরের হয়ে ত্রুটি স্বীকার কোরে মার্জ্জনা-ভিক্ষা কোরতে পাঠিয়ে দিয়ে ফুলের দুটা মোকদ্দমা একই দিনে নিষ্পত্তি করলেম। এমনি করেই নির্ব্বিবাদে পর্ব্বতে-পর্ব্বতে ফুল-ফোটার দিন অবসান হল।

 যেপর্ব্বতটাকে ঘিরে চঞ্চল হরিণ-শিশুর মতো আমার চলার পথটি নৃত্য কোরে খেলা কোরে চলেছে, তারি মেরুদণ্ডের ঠিক উপরে সজারুর কাঁটার মতো ঘন দুই সারি দেবদারু। শরতের বাতাস এখান থেকে শব্দের একটা জাল নীল—আকাশে দিবারাত্রি নিক্ষেপ করছে। একদিকে হিমালয়, আর-একদিকে “সহস্রধারা”র উপত্যকা—যেখানে সূর্য্য-উদয় এবং যেখানে সূর্য্যের অস্তগমন—এ দুই দিকই আমি দেখি এইখানটিতে বোসে।

 ফুলের রাজত্ব শেষ হয়েছে। আকাশের চোখে রঙের নেশা আর তেমন কোরে লাগে না; সূর্য্যের আলোতে ঝরা-পাতার কস্ ধরেছে, তুষারের সাদা দিনে-দিনে নীল-আকাশে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে—চাঁদের আলোর সঙ্গে-সঙ্গে।

 হিমালয়ের দিনগুলিতে বিজয়ার সুর লেগেছে। এই সুর লোহার—কসের মতো পাথরের গায়ে, ঘাসের সবুজে, সন্ধ্যার সিঁদুরে মিশিয়ে গিয়ে দিনান্তেরও পরপারে রাত্রির অনেকদূর পর্য্যন্ত আকাশের গায়ে গেরুয়ার টান্-দিয়ে-দিয়ে বাজছে। দিন যেন আর যায় না! শরতের চাঁদনী-রাতের তীরেও নীলাকাশের বিরহী নীলকণ্ঠ আপনার একটিমাত্র সুরে বেদনার নিশ্বাস টান্ছে শুনি—উঃ উঃ!

 আজ আমাদের সে-দেশে নবমীর নিশি প্রভাত হল। এখানে শরতের সাদা মেঘের দুখানা ডানা নীল-আকাশে ছড়িয়ে আজকের দিনটি যেন কৈলাসের তুষারে—গড়া একটি শ্বেত-ময়ূরের মতো কার ফিরে—আসার পথ চেয়ে পর্ব্বতের চারিদিকে কেবলি উড়ে বেড়াচ্ছে। আজ সন্ধ্যায় দেখছি ঠিক সহস্রধারার উপত্যকার মুখে—পর্ব্বতের পশ্চিম-গায়ে তৃণে-গুল্মে, লতায়-পাতায়, পাথরের গায়ে, পথের ধুলায়, ফুলের মতো, আবীরের মতো, মাণিকের আভার মতো একটা আলো জ্বল্‌জ্বল্ করছে; মনে হচ্ছে যেন তুষারের হৃদয়-রক্ত গলে এসে হিমালয়ের এই পশ্চিম-দুয়ারের সোপানে আল্‌পনার মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এরি উপর দিয়ে দেখছি, সন্ধ্যাতারার মতো একটি বন-বিহঙ্গী—আলোয়-গড়া মোনাল পাখী সে—চলে গেল পায়ে—পায়ে গিরিশিখর অতিক্রম কোরে—চাঁদনী-রাতের প্রাণের ভিতরে। আজ দেখলেম তুষারের শিখরে চাঁদ উঠছে আলোর একটা সুকোমলচ্ছটা আকাশে বিকীর্ণ কোরে। হিমালয়ের আর-সমস্তটা আজ অন্ধকারে ডুবে রয়েছে। ঘরে এসে দেখছি এ-পাহাড়ের এক ভিখারী আমার জন্যে তার শরৎকালের উপহারটি রেখে গেছে—একগোছা সোনালী কুশ আর কাশ! সুদূর পাহাড়ের কোন্ নিরালা পথের ধারে এরা নত হয়ে পড়েছিল, চলে যেতে কার সোনার আঁচল উড়ে-উড়ে এদের স্পর্শ কোরে কনক-চূর্ণের বিভূতি দিয়ে এদের সাজিয়ে গেছে!

 ভেঙে-পড়া দেবদারুর নির্য্যাস-গন্ধ দিকে-দিকে ছড়িয়ে দিয়ে আজকাল বরফের হাওয়া বইতে আরম্ভ হয়েছে। পথ-দিয়ে ক্রমাগত কম্বল-পরা পাহাড়ীর দল কাঠের বোঝা, ভালুকের আর বানবেড়ালের ছাল নিয়ে, গহন বন থেকে ‘মোনালপাখির’ সোনার পাখা মৌচাকের সোনালী মধু চুরি কোরে ঘরে-ঘরে ফেরি দিচ্ছে। কোনো দিকে কুয়াসার লেশমাত্র নেই; দিনরাত্রি সমান পরিস্কার। কেলগাছের ফলন্ত শাখায় প্রশাখায় গিরি-মাটির একটা রং লেগেছে।

 পার্ব্বতী রুক্ষ্ম রক্ত-বাস আপনার সর্ব্বাঙ্গে জড়িয়ে নিয়ে কঙ্কালিনী বেশে দেখা দিয়েছেন। অনেক দূরের একটা পাহাড়; তার গায়ে একটি—একটি গাছ দ্বিপ্রহরে চাকা—চাকা কালো দাগ ফেলেছে;—যেন প্রকাণ্ড একখানা বাঘছাল রৌদ্রে বিছানো; এরি উপরে চির-তুষারের ধবল মূর্ত্তি সারাদিন সুস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। একটির-পর-একটি গিরিচূড়া হিমে সাদা কোরে দিয়ে শীত আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে দেখতে পাচ্ছি। পর্ব্বতে-পর্ব্বতে মানুষের জ্বালানো দীপমালা থেকে দু-দশটা কোরে আলোর ফুল্‌কি প্রতিদিনই দেখছি খসে পড়ছে, আর নীল—আকাশে দীপালী উৎসব ক্রমেই দেখছি জমে উঠ্ছে। এখানকার হাট-ভাঙবার পালা সুরু হয়েছে, পূজোর ছুটির যাত্রীরা দলে-দলে ঘোড়াতে ডাণ্ডিতে ক্রমে পর্ব্বত খালি কোরে দিয়ে নেমে চলেছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্তটা দৈন্য এবং অশোভনতা—দেশী-বিদেশী নির্ব্বিশেষে—তার মুরগীর ঝুড়ি, আধপোড়া হাঁড়ি, ছিট্মোড়া ময়লা রিছানা, দড়ি-বাঁধা বাক্স, কড়ি-বাঁধা হুঁকা, হলুদের ছোপধরা চিনের বাসন নিয়ে ঘর ছেড়ে আজ রাস্তায় বেরিয়েছে এবং ময়লা জলের একটা নালার মতো পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে চলেছে।

 এই যে-ক’টা ঋতুর মধ্যে দিয়ে শীতের আগে পর্য্যন্ত এই পাহাড়ে লক্ষ লক্ষ পাখী এল—বাসা বাঁধলে, সংসার পাতলে, বাস করলে—আবার চলে গেল দূরদূরান্তরে, আকাশ— পথে দলে দলে, কি সুন্দর, কি স্বাধীন এদের গতিবিধি! আর মানুষ যে জলেস্থলে-আকাশে আপনার রাজত্ব বিস্তার কল্লে তার যাওয়ায় কি অশোভনতা! সিন্ধবাদের বিকটাকার বুড়োটার মতো সে আপনার সঞ্চিত কাজের বাজের মূল্যবান অথচ মূল্যহীন আসবাবের আবর্জ্জনাকে বয়ে চলেছে দেখছি— বোঝার ভারে নুয়ে পোড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে। পাখী চলে গেল, সে তার বাসার একটি কুটোও নিয়ে গেল না; আর মানুষ যেতে চাচ্ছে আস্তাবলের খড়কুটোটা এবং আস্তাকুঁড়ের ভাঙ্গা ঝুড়িটা, এমন-কি রাস্তার কাঁকরগুলো পর্য্যন্ত সংগ্রহ কোরে মোট বেঁধে নিয়ে।

 প্রথমে এসে পর্ব্বতে-পর্ব্বতে পথ হারিয়ে আমি প্রায়ই অন্যের বাগানে অনধিকার প্রবেশ কোরে লজ্জিত হয়েছি, এখন সে-ভয় গিয়েছে। প্রায় অধিকাংশ বাড়ীরই ফাটক বন্ধ এবং পর্ব্বতের গভীর থেকে গভীরতম প্রদেশের পথ একেবারে খোলা হয়ে গেছে। আমি সেখানে অবাধে স্বচ্ছন্দে বিচরণ করছি। চন্দ্রসূর্য্যের উদয়াস্তের মধ্যে দিয়ে ছবির পর ছবি, কিন্নরীর ঝাঁকের মতো চিত্র-বিচিত্র আলোর পাখনা মেলে, এ কয় দিন আমার অন্তরের বাহিরে সকালে-সন্ধ্যায় দিনে-রাতে উড়ে-উড়ে বেড়াচ্ছে। এদের ধরতে গিয়ে দেখি, এদের সমস্ত শ্রী লজ্জাবতী লতার মতো। আমার আঙুলের পরশে ম্লান হয়ে গেল। শীত এসেছে। হিমের অভিযানের পূর্ব্ব থেকেই গাছগুলো তাদের পাতার অনাবশ্যক বাহুল্য ঝেড়ে—ঝুড়ে আপনাদের সমস্ত শক্তি ভিতরে-ভিতরে সঞ্চয় কোরে বেশ শক্ত হয়ে উঠেছে। বসন্তে ফুলের ভারে এরা নুয়ে পড়েছিল দেখেছি, আর আজ দুদিন পরে বরফের পীড়ন সুদীর্ঘ শীতের দিন-রাত্রিতে বহন করবে এরাই অনায়াসে—ফুলেরই মতো, পাতারই মত! পর্ব্বতের সক্ষম সহিষ্ণু সন্তান এরা, পাথরের বুকের ভিতরকার স্নেহ এদের বড় কোরে তুলেছে,—অটুট এদের প্রাণ!

 আর মানুষ যাদের যত্নে বাড়িয়েছে সেইসব ক্ষীণপ্রাণ গাছদের মালীরা দেখছি আজকাল তুষারের কবল থেকে রক্ষা করবার জন্য কাচ-মোড়া গরম ঘরে নিয়ে তুলছে—শুকনো ঘাসের রক্ষাকবচ তাদের সর্ব্বাঙ্গে ঝুলিয়ে দিয়ে।

 এখানকার পাহাড়ীগুলো মোটেই পাহাড়ী নয়, তারা আসলে চাষী;—যখন ক্ষেতের কাজ নেই, ডাণ্ডিতে এসে কাঁধ দেয়। পাহাড়ের পথগুলো চেনে কিন্তু পাহাড়কে চেনে না, বরফকে এরা ভয় করে। পর্ব্বত যেখানে ক্ষেতের উপরে নদীর জলে আপনার ছায়া ফেলেছে সেখান থেকে উঠে এসেছে এরা; আবার সেইখানেই ফিরে যেতে চায়। আজ কদিন ক্রমাগত এরা আমাকে ভয় দেখাচ্ছে বরফ পড়ল-বোলে! কাল আমাদের যেতে হবে; কালো মেঘের ভ্রূ-কুটি বিস্তার কোরে একটা ঝড় দূর-পাহাড়গুলোর উপর দিয়ে আজ আমাদের দিকে চেয়ে দেখ্ছে। দিনের আলো নিষ্প্রভ, ধূসর আকাশ দুর্ব্বহ হিমের ভারে যেন নুয়ে পড়েছে। আমি পর্ব্বতের চূড়ায় একটা বন্ধ-বাড়ির বাগানে একলা উঠে এসেছি;—ঠাণ্ডা দিনটির ভিতর দিয়ে একটানা বরফের হাওয়া মুখে এসে লাগ্ছে। একেবারে ছায়ার মতো ঝাপ্‌সা কালোকালো পাহাড়গুলোর উপরেই আজ তুষারের সাদা ঢেউ যেন এগিয়ে এসে লেগেছে— চোখের সাম্‌নেই দাঁড়িয়েছে যেন! এ বাগানটা যাদের, তারা চলে গেছে; টিনের ঘরে তালা দিয়ে বাগানের যত ফুলগাছ সব রেখে গেছে। এদের বুড়ো মালী একটা কেলুগাছের তলায় কতকগুলো চারাগাছের উপরে খড়ের ঝাঁপ আড়াল দিচ্ছিল। সে আমাকে তার কাজ ফেলে বাগান দেখাতে লাগলো। কাচের ঘরে সাহেবের যত মূল্যবান সৌখিন ফুলের গাছ— জাল-দিয়ে-ঘেরা; টেনিস্ খেলার একটা চাতাল, এর উপরে একহাত বরফ সেবারে পড়েছিল; এইটে মেম—সাহেবের চা-পানের মণ্ডপ; এই রাস্তা দিয়ে সাহেবের ঘোড়া পর্ব্বতের উপর আস্‌তে পারে, ওখানে সাহেবের কাছারির তাম্বু পড়ে, বাড়ির এই-দিকটা পুরানো আর ঐ-দিকটে সাহেব অনেক ব্যয়ে নূতন করে বানিয়েছে ইত্যাদি! অনেক দেখিয়ে মালী আমাকে একটা জায়গায় নিয়ে এসে বল্লে, ঐযে ভাঙা বাংলাটা ঐটেই যে এ-বাগান প্রথম বানিয়েছিল তার; ওদিকে আরো অনেকটা বাগান ছিল, বরফে ধ্বসিয়ে দিয়েছে; আমি ছোটবেলায় সেই বাগান দেখেছি। মালী যেদিক দেখালে সেদিকে তুষার-পর্ব্বত পর্য্যন্ত নির্ম্মল একটি শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই নেই। এরি ধারটিতে সেই ভাঙা বাংলা; ভাঙনের গা-বেয়ে একটি গোলাপ-লতা ভাঙা ঘরখানার চালের উপর দিয়ে একেবারে তুষার-পর্ব্বতের দিকে ঢলে পড়েছে—ফুলের একটা উৎস! এর কাটায়-কাঁটায় ফুল, গাঁটে গাঁটে ফুল,—পর্ব্বতের শিখরে এ যেন একটা ফুলের স্বপ্ন! বসন্তের বুল্বুল্ নয়, তুষারের সাদা পাথী একে ডেকেছে— শূন্যতার ঐ ওপার থেকে!

* * * *

অবরোহণ

 চলা-বলা সব বন্ধ কোরে যা-কিছু কুড়োবার কুড়িয়ে, যা-কিছু গুড়োবার গুড়িয়ে বসেছি। পাহাড়ের নীচে থেকে কুলীর সর্দার চীৎকার কোরে ডাক্‌ছে—‘ফাল্‌তো, ফাল্তো! হারেরে বেগার কুলী।’

সমাপ্ত