বিষয়বস্তুতে চলুন

পথে-বিপথে (১৯১৮)/মোহিনী

উইকিসংকলন থেকে

পথে-বিপথে

মোহিনী

 ফেরি-ষ্টীমারে অবিনের সঙ্গে অনেক বছরের পর দেখা হতেই সে আমাকে একেবারে একখানা ছবি দেখিয়ে বল্লে—“দেখতে পাচ্ছ?” তোমার-আমার মতো হলে প্রথম প্রশ্ন হতো— তুমি কে হে? বা তোমাকে তো চিন্‌লেম না! কিন্তু অবিন, সে কোনোদিনই আমাদের মতো সাধারণ-একটা-কিছু ছিল না; সুতরাং সে আমাকে না চিনলেও, সে যে অবিন, এটার প্রমাণ পেতে আমার একটুও দেরী হল না। ছবিটার সবটা দেখ্‌লেম অন্ধকার; কেবল নীচে একটা পিতলের ফলকে বড়-বড়-করে লেখা ছিল—“মোহিনী”। আমি সেইটে দেখিয়ে বল্লেম—“মোহিনী বুঝি?”

 অবিন খানিকটা নিশ্বাস ফেলে বল্লে— “পেলে না। তবে শানো!”—বলেই আমাকে টেনে মাঝের বেঞ্চে বসালে। তখন শীতের সকাল; কুয়াশা ঠেলে জাহাজখানা খুব আস্তে-আস্তে জল—কেটে চলেছে। অবিন শুরু কল্লে—  "কলকাতায় আমাদের বাসা-বাড়িখানা অনেক-দিনের। এখন সেটা আমাদের বসত-বাড়ি হয়েছে বটে, কিন্তু সেকালে কর্ত্তারা সে-বাসাটা কেবল গঙ্গাস্নান আর কালীঘাট করবার জন্যেই বানিয়ে ছিলেন। খুবই পুরোনো এই বাসাবাড়ির ঘরগুলো, ঝাড়লণ্ঠন কৌচ-কেদারা ওয়াটার-পেণ্টিং অয়েল-পেণ্টিং বড়-বড় আয়না এবং সোনার ঝালর-দেওয়া মখমলের ভারি ভারি পর্দা দিয়ে যতদূর সম্ভব জাঁকালো এবং মানুষের প্রতিদিন বসবাসের পক্ষে সম্পূর্ণ অনুপযোগী করে কর্ত্তারা সাজিয়ে গিয়েছিলেন। আমাকে সেকালের সেই ধূলোয় ভরা, পুরোনো মদের ছোপ্‌ধরা, সাবেকী আতরের গন্ধমাখানো এই সব ফারনিচার তখন কতক বিক্রি করে, কতক ঝেড়ে-ঝুড়ে মেরামত করে, আর কতক-বা একেবারে ফেলে দিয়ে বাড়িখানাকে একালের বসবাসের মতো করে নিতে হচ্ছিল। আমি এখনো যেমন, তখনো অবিবাহিত। সেই সময় একদিন এই ছবিটা আমার হাতে পড়ল। খানিকটা কালো-অন্ধকারের রং লেপা;—কেবলমাত্র দুটি সুন্দর চোখ—তাও অনেকক্ষণ ধরে ছবিটার দিকে চেয়ে থাকলে তবে দেখা যেত।”

 জাহাজ এসে কাশীপুরের জেটিতে লাগল। একদল থার্ড ক্লাস যাত্রী মাড়োয়ারী নেমে গেল, এবং তার চেয়ে আরও বড় একদল কলের কুলী, মিলের চিনে-মিস্ত্রী উঠে এল। অবিন ডেকের এধার থেকে ওধারে একবার পায়চারি করে নিয়ে ফিরে এসে বল্লে—  “এই ছবিটা রাবিস্ বলে নিশ্চয়ই বৌবাজারে পুরোনো জিনিষের সঙ্গে চালান যে’তো, কিন্তু যে-ঘরের দেয়ালে এটা খাটানো ছিল, সেই ঘরটার ইতিহাসটা বেশ একটু রকমওয়ারি রকমের ছিল বলেই সে ঘরটায় আমি কোনো অদল-বদল ঘটতে দিইনি। আমাদের যিনি ছোটকর্ত্তা, তারই সেটা বৈঠকখানা। এই ছোট কর্ত্তাই আমাদের সেকালের শেষ-ঐশ্বর্য্যের বাতিগুলো দিনের বেলায় ঝাড়ে-লণ্ঠনে জ্বালিয়ে জ্বালিয়ে নিঃশেষ করে দিয়ে গেছেন; এবং নিজের হাতের হীরের আংটির বড়-বড় আঁচড়ে বিলিতি আয়নাগুলোকে সেই সব দিনকে রাত, রাতকে দিন করবার ইতিহাসের সন তারিখ এবং নামের তালিকায় ভরে দিয়ে গেছেন। এই কর্ত্তার বাবুগিরির কীর্ত্তিকলাপের গল্প ছেলে-বেলায় আরব্যউপন্যাসের মতোই আমার কাছে লাগ্‌তো; এবং বড় হয়ে যখন আমি এই ঘরের চাবি খুল্লুম, তখন গোলাপী-আতর-মাখানো পুরোনো কিংখাবের গন্ধ ভরা একটা অন্ধকারের মধ্যে এই ছবির দুটি কালো চোখ আমার দিকে এমনি একটা উৎকণ্ঠা নিয়ে চেয়ে রইল যে সে-ঘরটায় কোনো অদল-বদল করতে আমার সাহস হল না। কিন্তু সে-ঘরটাকে তালা বন্ধ করে ফেলে রাখতেও আমার ইচ্ছে ছিল না। বাড়ির মধ্যে সেই ঘরটা সব চেয়ে আরামের,—একেবারে ফুল-বাগানের ধারেই; দক্ষিণের হাওয়া এবং পূর্বের আলোর দিকে সম্পূর্ণ খোলা ঘরখানি! আমি সেইখানেই আমার অন্তরঙ্গ বন্ধুবান্ধব নিয়ে খাস—মজলিস—সেকালের মতো নয়, একালের ক্লাব-রুমের ধরণে—গড়ে তুল্লেম। আমরা সেই সাবেক-কালের নাচ-ঘরটায় বসে চা-চুরুটের সঙ্গে পলিটিক্স সোসিওলজি থিওলজি এবং জার্ম্মান- ওয়ারের চর্চ্চায় ঘোরতর তর্কযুদ্ধে যখন উন্মত্ত হয়ে উঠেছি তখন হঠাৎ এক-একদিন এই— ছবিখানার দিকে আমার চোখ পড়লেই সেকালের বিলাসিতার সাজসরঞ্জামের মধ্যে বিলাতী কেতায় আমাদের এই একালের মজলিস এত কুশ্রী বোধ হত—দুই কালের ব্যবধানটা এমন স্পষ্ট হয়ে দেখা দিত যে আমাতের তর্ক আর অধিক দূর অগ্রসর হতো না। আমাদের মনে হত এ ঘরের স্বামী যিনি, তাঁর অবর্ত্তমানে অনাহুত আমরা একদল এখানে অনধিকার প্রবেশ করে গোলমাল বাধিয়েছি; এখনি যেন বাবুর খানসামা এসে আমাদের এখান থেকে ঘাড়-ধরে বিদায় করে দেবে। মনের এই সন্ত্রস্ত ভাব নিয়ে ও-ঘরখানার মধ্যে আড্ডা জমিয়ে তোলা অসম্ভব দেখে আমার বন্ধুরা বলতে লাগল—'ওহে অবিন্, তোমার ভাই ওই মোহিনীকে এখান থেকে না নড়ালে চলছে না; ওর ওই ভূতুড়ে-রকমের চাহনিটায় আমাদের এখানে স্থির হয়ে থাকতে দেবে না দেখছি।’ কিন্তু বন্ধুদের অনুরোধ রক্ষে হল না, মোহিনী যেখানকার সেইখানেই রহিলেন; বন্ধুরা একে-একে সরে পড়তে থাকলেন। এই সময় আমার মনে হতো—একালটা যেন একটা খোলসের মতো আস্তে-আস্তে আমার চারিদিক থেকে খসে যাচ্ছে, আর আমার নিজ মূর্ত্তিটা পুরোনো খাপ থেকে ছোরার মতো ক্রমে রেরিয়ে আস্‌ছে। আমার মধ্যে যে সেকালটা ছিল, সে যেন দিনে-দিনে প্রবল হয়ে উঠছে;— বুঝছি আমার রক্তের সঙ্গে সেকালের বিলাসিতার গোলাপী আতর এসে মিশ্‌ছে, আমার দুই চোখের কোণে উদ্দাম বাসনার অগ্নিশিখা কাজলের রেখা টেনে দিচ্ছে! এই সময় আমি এক-এক দিন এই ছবিখানার দিকে চেয়ে-চেয়ে সারা রাত কাটিয়ে দিয়েছি। ঐ ছবির অন্ধকার ঠেলে ওপারে গিয়ে পৌঁছবার জন্যে-ঐ কালোর মাঝখানে যে সুন্দর চোখ, তারি আলোক-শিখায় নিজেকে পতঙ্গের মতো পুড়িয়ে মারবার জন্যে আমার দেহ-মন আবেগে থর-থর-করে কাঁপতো! আমার মনের এই তিমিরাভিসার বন্ধুরা পাগলামির প্রথম-লক্ষণ বলে ধার্য্য করে নিয়ে আমাকে সাবধান কল্লেন, উপহাস কল্লেন, নানাপ্রকার উত্ত্যক্ত করে ভয় দেখিয়ে শেষে আমার ভরসা ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র গমন কল্লেন—যেখানে চায়ের এবং চুরুটের আড্ডা ভালো জম্‌তে পারে।

 আমি একলা ঘরে; আর আমার মনের শিয়রে অন্ধকারের পর্দ্দার ওপারে— মোহিনী! যবনিকা তখনো সরেনি, চাঁদ তখনো —ওঠে নি। এ সেই-সব দিনের কথা হৃদয়তন্ত্রীতে যখন মিনতির সুর অন্ধকারে লুটিয়ে পড়ে বিনয় করছে—“এসো এসো, দেখা দাও।” একখানা ছবি, তাও আবার প্রায় ষোলো-আনাই ঝাপ্‌সা—সে যে এমন করে মনকে টা্ন্‌তে পারে, এটা আমার নিজেরই স্বপ্নের অগোচর ছিল;—বন্ধুদের কথাতো দূরে থাক। বল্লে বিশ্বাস করবে না, তখন বসন্তকালে ফুলের গন্ধ যদি আস্‌তো আমার মনে হতো ঐ ছবিখানার মধ্যে যে আছে, তারি যেন মাথা-ঘসার সুবাস পাচ্ছি! হাফেজ যে সজীব ছবিটি দেখে দেওয়ানা হয়েছিলেন, তার চেয়ে পটের অন্দরে লুকিয়েছিল যে‘মোহিনী’ সে যে কম জীবন্ত, কম সুন্দরী, তাতো আমার মনে হতো না। নীল ঘেরাটোপ দেওয়া খাঁচার মধ্যেকার সে আমার শ্যামা পাখী!—তার সুর আমি শুন্‌তে পাই, তার দুখানি ডানার বাতাসে নীল আবরণ দুলছে দেখতে পাই। আমার প্রাণের কান্না সে গান দিয়ে সাজিয়ে, সুর দিয়ে গেঁথে আমাকেই ফিরে দেয়—কেবল চোখে দেখা আর দুই বাহুর মধ্যে—বুকের মধ্যে এসে ধরা-দেওয়ার বাকি!”

 এতটা বলে অবিন হঠাৎ চুপ কল্লে। তখন আধখানা নদীর উপর থেকে কুয়াশা সরে গিয়ে জলের গায়ে সকালের আকাশ থেকে বেলফুলের মতো সাদা আলো এসে পড়েছে, আর আধখানা নদীর বুকে ভোরের অন্ধকার টল্‌টল্‌ করছে—এরি মাঝে দুই ডিঙায় দুই জেলে কালোর আলোর বুকে জাল ফেলে চুপ-করে বসে রয়েছে দেখছি। আমাদের জাহাজ থেকে একটা ঢেউ গড়িয়ে গিয়ে ডিঙা দুখানাকে খুব-একটা দোলা দিয়ে চলে গেল। অবিন শুরু কল্লে—

 “শুনেছিলেম তান্ত্রিক সাধকেরা না-কি মন্ত্রবলে জড়ে জীবনদান, অদৃশ্যকে দৃশ্য করে তুলতে পারেন; আমি আমার মোহিনীকে মন্ত্রবলে কাছে—একেবারে আমার চোখের সম্মুখে— টেনে আনবার জন্য এমন-এক সাধকের সন্ধান করছি, সেই সময় আমার এক আর্টিষ্ট বন্ধুর সঙ্গে দেখা। তাঁর সঙ্গে কথায়-কথায় ‘মোহিনী’র ছবিটা যে কেমন-করে আমাকে পেয়ে বসেছে সেই ইতিহাস উঠল। বন্ধু আগাগোড়া ব্যাপারটা আমার মুখে শুনে বল্লেন—“তোমার দশা সেই গ্রীসদেশের ভাস্করটার সঙ্গে মিলছে দেখছি!” আমি বল্লেম—“তার সামনে তো তবু তার 'মোহিনী' প্রাণটুকু ছাড়া আর-সমস্তটা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল; কিন্তু আমার 'মোহিনী' যে অবগুণ্ঠনের আড়ালেই রহে গেছে হে! এর উপায় কিছু বাৎলাতে পার?” বন্ধু আমায় উপায় বাৎলে—বাড়ী গিয়ে এক শিশি আরক আমাকে দিয়ে পাঠালেন। সেকালটা যদিও আমাকে বারো-আনা গ্রাস করেছিল তবু মনের এক-কোণে একালের বিজ্ঞানটার উপরে একটু যে শ্রদ্ধা, তা তখনো দূর হয় নি। আমি বন্ধুবরের কথা-মতো ঘড়ি-ধরে হিসাব করে সেই আরকটা সমস্ত 'মোহিনী'র ছবিখানায় ঢেলে দিলেম। সে-আরকটার এমন তীব্র গন্ধ যে আমায় যেন মাতালের মতো বিহ্বল করে তুল্লে। তারপর কখন যে অজ্ঞান হয়ে পড়েছি তা মনে নেই। এইটুকু মাত্র জানি যে আরক ঢালবার পরে 'মোহিনী'র ছবিখানা ধোঁয়ায় ক্রমে ঝাপ্‌সা হয়ে আস্‌ছে; আর আমি ভাবছি এইবার মেঘ কাট্‌লো।

 একমাস পরে কঠিন রোগশয্যা থেকে শেষে নিষ্কৃতি পেয়ে আরএকবার এই ছবিখানার দিকে চেয়ে দেখলেম, সেটার উপর থেকে সেই চাহনিটা সরে গেছে; কেবল তার নামটা আঁটা রয়েছে— সোনালী ফলকে, বড়-বড় অক্ষরে!”

 তখন শিবতলার ঘাটে জাহাজ লেগেছে, আমি তাড়াতাড়ি অবিনকে নমস্কার করে নেমে চলেছি, এমন সময় সে সজোরে আমার হাতে এক ঝাঁকানি দিয়ে বলে উঠল— “ওহে আর্টিষ্ট! মোছেনি হে, ভয় নেই; ছবিখানা পটের গভীর থেকে গভীরতর অংশ গিয়েই আমার অন্তর থেকে অন্তরতম স্থানে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।”