বিষয়বস্তুতে চলুন

পথে-বিপথে (১৯১৮)/শেমুষী

উইকিসংকলন থেকে

শেমুষী

 সেদিন মান্‌থ্লি-টিকিট রিনিউ করবার দিন; তার উপর সাগরযাত্রীর ভিড়; ষ্টীমার—ঘাটে বিষম গোলমাল লেগেছে। জাহাজ ছাড়তে বিলম্ব দেখে ব্রীজের ধারে ফুটপাতের উপর যেখানে অনেকগুলো নাগা সন্ন্যাসী ধূনী-জ্বালিয়ে আগুন পোহাচ্ছে সেইখানে অশথগাছের তলায় আমি একটু দাঁড়িয়েছি, এমন সময় রাস্তার ওপার থেকে অবিন টিকিট কিনে হন্হ—ন্ করে আমার কাছে ছুটে এসে বল্লে—“ওহে শোমুষী দেখবে তো এসো।”

 লোকের ভিড়-ঠেলে জাহাজে উঠে দেখি ফার্স্ট ক্লাসে রোজ অবিন যেখানটায় বসে, সেইখানে একটা লোক;—চেহারাটা বেশ গম্ভীর, পরণে লুঙ্গী, গায়ে বেরালের লোমের একটা আলখাল্লা। আর তার মাথায় একটা অদ্ভুত টুপি—তেমন টুপি আমি কখনো দেখিনি—কতকটা টোপর, কতক পাগড়ী, কতকটা যেন বিলাতী ষ্ট্র-হ্যাট!  ষ্টীমারে উঠেই অবিন আমার হাত ছেড়ে সেই লোকটার দিকে সোজা এগিয়ে চল্লো। আমি দেখলেম অবিনের দুই চোখের মাঝখানে ভ্রূ-কুটি বিদ্যুতের মতো চম্কে গেল। অবিন যেখানটিতে রোজ বসে, লোকটা ঠিক সেইখানেই বসেছে! তিন বৎসরের মধ্যে বেঞ্চের ঐ অংশটুকু থেকে অবিনকে বে-দখল করেছে এমন লোক-কি সাদা, কি কালো—আমি তো দেখিনি। লোকটার কপালে কি আছে ভেবে আমি বেশ—একটু চিন্তিত হয়েছি এমন সময় অবিন দেখি “ইয়েঃ সম্স্”—বলে লোকটাকে প্রকাণ্ড এক সেলাম বাজিয়ে অতি ভালোমানুষের মতো আমার পাশে, পিছনের বেঞ্চিতে এসে বস্‌লো! লোকটা অবিনের দিকে ফিরেও চাইলে না; সে কেবল নিজের বাঁ-হাতখানা সাপের ফণার মতো বাঁকিয়ে অবিনের মুখের কাছে একবার দুলিয়ে গট্—হয়ে বসে রইল। ঝুঁটিকাটা ময়ূরের মতো অবিনকে একেবারে মুহ্যমান দেখে আমার আজ যেমন হাসি পাচ্ছিল, তেমনি বিস্ময়েরও অন্ত ছিল না। অবিনকে এ-রকম করে দমিয়ে দিতে পারে এমন লোক আছে বলে আমার ধারণা ছিল না। আমি তাকে চুপিচুপি বল্লুম— “ওহে এই ভাগীরথীতীরে এবং নীরে এতকাল তুমি একা সিংহাসনে বিরাজ কচ্ছিলে, আজ আবার এ কোন্ ভাসুরক এসে উপস্থিত হল হে?” অবিন আমার কথার কোনো জবাব না দিয়ে, কেবল ইঙ্গিতে চুপ করতে বলে, চোখ-বুজে চুরুট টানতে লাগ্‌ল। নদীর মাঝ দিয়ে সারা পথটা তার মুখে আজ কথা নেই। আমিও চুপ করে চেয়ে রয়েছি। দূরে দেখা যাচ্ছে বালির চড়ার উপরে গোটাকতক নৌকো কাৎ হয়ে পড়ে আছে। আরো—দূরে সবুজ একটা আকের ক্ষেত; তার পিছনে একটা কলের চিম্‌নি থেকে একটু—একটু ধোঁয়া উঠ্ছে; একটা শঙ্খচিল নীল আকাশ থেকে আস্তে—আস্তে জলের দিকে নাম্‌ছে।

 নদীনীর, বালুতীর, দুপুরের আলোয় মিলে আমাদের চারিদিকে যখন একটা দিবাস্বপ্নের সৃষ্টি করেছে আর আমাদের জাহাজখানা কুটীঘাট থেকে আস্তে-আস্তে ক্রমে—ক্রমে ওপারের দিকে মুখ ফেরাচ্ছে, ঠিক সেই সময় অবিন হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে আমাকে এক ঝাঁকানি দিয়ে বলে উঠল—“ওহে সে-লোকটা গেল কোথায়?”

 সাম্‌নের দিকে চেয়ে দেখি সেই প্রথমশ্রেণীর বেঞ্চথানা একেবারে খালি;—সে অদ্ভুত টুপির আর চিহ্নমাত্র নেই। জাহাজ তখনো জেটি ছাড়ায়নি; আমি সেদিকে চেয়ে দেখলুম জনমানব নেই। গ্রামের পথ ঘাট—পেরিয়ে সোজা দেখা যাচ্ছে— সেখানে একটা মড়াখেকো কুকুর রাস্তার মাঝখানে ধূলোর উপরে মুখ গুঁজড়ে শুয়ে রয়েছে—আর অন্য পথিক কাউকে দেখা গেল না। অবিন আমাকে সঙ্গে নিয়ে জাহাজের এধার থেকে ওধার, নীচের তলার কামরা মায় ইঞ্জিন-ঘরটা পর্য্যন্ত তন্ন তন্ন করে খুঁজে এসে, সারেং থেকে সুক্‌নী খালাসী এবং সকল-যাত্রীদের একে-একে সেই লোকটার হুবহু বর্ণনা দিয়া জেরা করে দেখলে সে— লোকটাকে এ-জাহাজে উঠতেও কেউ দেখেনি, বসে থাকতেও কেউ দেখেনি, এবং কোনো ঘাটে নেমে যেতেও কেউ দেখেছে কিনা তাও জানা গেল না। আমরা দুজনে গিয়ে সেই সাম্‌নের বেঞ্চিখানা এবং তার চারিদিকটা এমন— করে সন্ধান কল্লুম যে সেই লোকটার লোমশ আলখাল্লার যদি একগাছিও লোম সেখানে থাকতো তবে সেটা আমাদের কাছে ধরা পড়তোই পড়তো। কিন্তু এ কি আশ্চর্য্য ব্যাপার! লোকটা এলো, বস্‌লো এবং চলে গেল অথচ পৃথিবীর কোনোখানে একটু আঁচড়ও পড়ল না! কোনো-কোনো দিন ঘন কুয়াসার মধ্যে দিয়ে পারাপার করবার সময় দেখেছি কোথাও কিছু দেখা যাচ্ছে না, হঠাৎ একখানা নৌকো তার দাঁড়িমাঝি মালপত্র রসারসি নিয়ে চকিতের মতো কুয়াসার গায়ে ফুটে উঠেই আবার মিলিয়ে গেল;—এ লোকটা ঠিক যেন তেমনি করে আমাদের দেখা দিলে! আমার মনের মধ্যে কেমন যেন শীত করতে লাগল। প্রথম-শ্রেণীতে অবিনের সঙ্গে একলা বসে থাকতে আমার ভালো লাগলো না; আমি তৃতীয়-শ্রেণীতে যেখানে ইঞ্জিনের ধারে আগুনের তাতে কতকগুলা চিনেম্যান তাদের ফ্যাকাসে মুখগুলো তাতিয়ে নিচ্ছে সেইখানে গিয়ে দাঁড়ালুম।

 “শেমুখী” বেঞ্চ খালি করে দিলেও অবিন কিন্তু আজ তার নিজের সিংহাসনে বসতে বড় উৎসাহ প্রকাশ কল্পে না। সে বেঞ্চিখানার পিঠে হাত রেখে চুপ—করে দাঁড়িয়ে, থেকে-থেকে খানিক চুরুট টেনে-টেনে দোতলায়—যেখানে সারেংসাহেব চাকা ঘুরিয়ে কম্পাসের কাঁটা দেখে জাহাজ চালিয়ে যাচ্ছে—মই-বেয়ে সেখানে উঠে গেল। সাধারণ যাত্রীর দোতলায় যাবার হুকুম নেই, আমি নীচেই রইলুম। কিন্তু অবিনের গতিবিধি সর্ব্বত্র। সে দোতলার উপর থেকে দিব্যি আমাদের নাকের উপর দুই পা ঝুলিয়ে সারেংসাহেবের হুঁকোর মজলিস জম্কে তুল্লে। সারা পথটা তার আর কোনো খবরই পেলুম না। ফিরতি-ষ্টীমার যখন আহিরীটোলার ঘাটে ভিড়ছে, এমন সময় অবিন নেমে এসে বল্লে—“ওহে কাল আবার আসছো তো?”

 আমি বল্লুম—“আসছি, কিন্তু এ-জাহাজখানার দিকেও আসছি নে!” ঘাটে নেমে জাহাজখানার নাম দেখে নিলুম—‘প্রতিভা’।

 তার পরদিন থেকে বড়বাজারের ঘাটে ‘প্রতিভা’টি বাদ দিয়ে এ-লাইনের আর যত-নামের যত-জাহাজ সব ক’খানাতে চড়ে বেড়াই কিন্তু অবিনকে আর দেখতে পাই নে! সে যে কখন কোন্ জাহাজ ধরে যাতায়াত করে, তার আর সন্ধান পাই নে। দূরবীন লাগিয়ে দেখেছি ‘প্রতিভা’র ডেকে তার জায়গা শূন্য পড়ে আছে! লোকটা গেল কোথা? শেমুষীর মতো তাকেও গা-ঢাকা হতে দেখে আমি একদিন সন্ধ্যার সময় তাদের আহিরীটোলার ঘাটে নেমে জেটি পেরিয়ে অবিনদের বাড়ির দিকে চলেছি, এমন সময় রাস্তার মোড়ে দেখি অবিন হন্‌—হন্ করে ষ্টীমার ঘাটের দিকে চলেছে; সঙ্গে আলবোলা আর ক্যাম্বিসের ব্যাগ নিয়ে তার চাকর গোবিন্দ। তখন সন্ধ্যা সাতটা হয়ে গেছে। বড়বাজার থেকে শেষ-ষ্টীমার রাতের অন্ধকারে ভেঁপুর শব্দ এবং সার্চ্চ-লাইটের আলোর সুঁড় দোলাতে—দোলাতে রক্তচক্ষু একটা বিরাট জলজন্তুর মতো আস্তে-আস্তে জেটির গায়ে এসে থাম্‌লো। অবিনকে এতরাত্রে জাহাজে উঠতে দেখে আমার ভারি-একটা কৌতূহল হল। আমি তার অসাক্ষাতে ষ্টীমারে উঠে থার্ড ক্লাসের একটা খালি বেঞ্চে শালমুড়ি দিয়ে বসলুম। আমি, অবিন এবং গোবিন্দ ছাড়া আর একটিমাত্র সহযাত্রী একটা প্রকাণ্ড ঝুড়ির আড়ালে চুপ—করে বসে রয়েছে। জাহাজ অন্ধকার জল কেটে সন্তর্পণে চলেছে। তীরের আলোগুলো কালো জলের গায়ে সাপ-খেলানো সোনার এক-একটা রেখা টেনে দিয়েছে। আকাশের আর জলের আঁধার এক হয়ে গিয়ে নদীটা অকূল সমুদ্রের মতো মনে হচ্ছে। এমন সময় অবিন আমার নাম ধরে ডেকে বল্লে—“ওহে ইয়ার, শেমুষীর অত কাছে বসা নিরাপদ নয়; এদিকে চলে এস।”

 অবিনের চোখ এড়াতে পারি নি দেখে আমি তার কাছে গিয়ে বল্লুম—“এখানে আবার শেমুষী কোথায় পেলে?” অবিন একবার ঝুড়ি-কোলে যে-মানুষটা, তার দিকে ঘাড়-হেলিয়ে সুরু কল্লে— শেমুষী কি এক-রকম? তারা নানাবেশে জগৎময় ঘুরে বেড়াচ্ছে।

—অভিধানে শেমুষী অর্থে দেখবে বুদ্ধি।” আমি বল্লুম—“বুদ্ধিমন্ত জীবমাত্রেই যদি শেমুষী হয়, তবে তুমি-আমিও তো শেমুষী!” অবিন বল্লে—“না, ওই বুদ্ধির সঙ্গে অতির যোগ হলে তবে হয় শেমুষী। যেমন তোমার ঠগী, তেমনি শেমুষীর একটা দল এখনো আছে। আমরা যেমন কালেজ থেকে ডিগ্রী নিয়ে বেরোই, এদেরও মধ্যে তেমনি অনেক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তবে হয় শেমুষী। আজন্ম-শেমুষীও দুচারজন আছে। তারা কেমন জানো? হতভাগা লক্ষ্মীমন্ত, ধার্ম্মিক ও পাজি, ভদ্র, অভদ্র, মহাত্মা এবং দুরাত্মা, সুবুদ্ধি দুবুদ্ধি, পাজি, ছুঁচো, মহাশয়, দুরাশয়, পণ্ডিত ও গোমূর্খ, সমালোচক ও গোবদ্যি, বুজরুগ ও বেচারা একত্র মেশালে যা হয় তাই। এরা স্মরণমাত্রে যেখানে খুসি যেতে পারে, যা খুসি তাই করতে পারে; —ঘটি-চালানো, বাটি চালানো থেকে মায় তোমার লোহার সিন্ধুকের ক্যাসবাক্স পর্য্যন্ত সরানো— হোসেন খাঁর যত বুজরুকী, সব এঁদের জানা আছে। এঁরা ইচ্ছে করলে অফুরন্ত তূণ, অক্ষয় কবচ, সোনার কাঠি, রূপোর কাঠি, বিশল্যকরণীর মলম—এমন-কি ঘুমের দেশের রাজকন্যাকেও তোমার মুঠোয় এনে দিতে পারেন। স্বর্গের অপ্সরী এঁদের দাসী; দেবতাগুলো হুকুমের চাকর, আর ভূতগুলো ইয়ার। মনে কল্লে একরাত্রের জন্যে এঁরা তোমাকে ইন্দ্রের অমরাবতীতে, কালীফের বোগদাদে, এমন-কি এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ঘুরিয়ে আনতে পারেন অথচ তোমার গায়ে একটু ঘাম দেবে না। এমনি একজন শেমুষীকে সেদিন দেখেছ। কিন্তু আজ যে ঐ ঝুড়ি নিয়ে ওধারে ভালোমানুষটি বসে আছে দেখছ, ওঁকে চিনেছ?”

 লোকটা আমার একেবারেই অচেনা। অবিন আমার কানেকানে বল্লে—“উনিই সেই দিনের শেমুষী; ওঁরই পাল্লায় একবার পড়ে একটা স্বর্ণ্মৃগের পিছনে ছুটতে—ছুটতে আমার প্রাণ গিয়েছিল আর কি! আবার উনি যে কার সর্ব্বনাশ করতে কিম্বা কার-বা কি ভালো করতে এখানে এসেছেন, তাই ভাবছি।”

 লোকটার চেহারায় কোনো রকম শেমুষীত্ব ছিল না। আমি অবিনকে বল্লুম—“নির্ভয়ে তোমার শেমুষীর ইতিহাস বলে যাও, ও-লোকটা এখনি নেমে যাবে।”

 অবিন আমার দিকে একটু ঝুঁকে বল্লে—“দেখবে তবে?” বলেই অবিন তাঁর বুকের পকেট থেকে একটা বনমানুষের হাড়ের বাঁশী বার করে বল্লে— “এই হল শেমুষীদের বুকের হাড়ের বাঁশী। গান এবং এই বাঁশীর সুর—এই দুই হচ্ছে শেমুষী তাড়াবার একমাত্র ওস্তাদ। তুমি গান ধর; আমি বাজাই।”

 হাড়ের মধ্যে থেকে যে অমন সুর বার হয় তা আমার ধারণা হয়-নি এবং অবিনও যে এমন বাঁশী বাজায় তা আমি আগে জানতেম না। সুর যেমন গিয়ে অন্ধকারকে বিদ্ধ করলে, অমনি মনে হল যেন রাত্রির নীল পর্দ্দা খুলে দলে-দলে তারা আমাদের দিকে উকি দিচ্ছে; জলের শব্দ এতক্ষণ কানে আসে নি কিন্তু এখন যেন শুনি জলও ঐ সুরে, বাতাসও সেই সুরে তাল দিচ্ছে। আর মনে হল রাত্রির রং ক্রমে যেন পাতলা হয়ে আসছে। শিবতলার শ্মশানঘাটের কাছে জাহাজ এসে স্থির হল। পারে একটা চিতার আগুন ধুধু জ্বলছে। সেই লোকটা ঝুড়ি-মাথায় জেটীতে নেমে দাঁড়াল। আমি দেখলেম সেটা ঝুড়ি নয়, সেটা তার সেই টুপিটা। অবিন বল্লে—“দেখলে?” দেখতে আমার ভুল হয়-নি কিন্তু শেমুষীর সঙ্গে তার কি লড়াই বেধেছিল যথন তাকে প্রশ্ন করুম সে বল্লে— “ভুলে গেছি, মনে নেই।”