পদ্মাবতী নাটক (১৯৫৫)
পদ্মাবতী নাটক
মাইকেল মধুসুদন দত্ত
[ ১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত ]
সম্পাদক :
ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
শ্রীসজনীকান্ত দাস
বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ
২৪৩।১, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোড
কলিকাতা-৬
প্রকাশক
শ্রীসনৎকুমার গুপ্ত
বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ
প্রথম মুদ্রণ—বৈশাখ, ১৩৪৮
দ্বিতীয় মুদ্রণ—শ্রাবণ, ১৩৫৫
তৃতীয় মুদ্রণ—আষাঢ়, ১৩৬২
মূল্য ১৷৹
শনিরঞ্জন প্রেস, ৫ ইন্দ্র বিশ্বাস রোড, কলিকাতা-৩৭
হইতে শ্রীরঞ্জনকুমার দাস কর্তৃক মুদ্রিত।
১১—১৭.৬.১৯৫৫
ভূমিকা
মধুসূদনের প্রথম বাংলা গ্রন্থ ‘শর্ম্মিষ্ঠা নাটক’। ইহার পরেই তিনি দুইখানি প্রহসন রচনা করিয়াছিলেন। ইতিমধ্যে বেলগাছিয়া নাট্যশালায় যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের সহিত বাংলায় অমিত্রছন্দ-সম্পর্কে তিনি বাজি রাখিয়াছিলেন। ‘পদ্মাবতী নাটকে’ তিনি সর্বপ্রথম এই ছন্দের প্রবর্তন করেন। এই একটি মাত্র কারণে ‘পদ্মাবতী নাটক’ চিরস্মরণীয় হইয়া থাকিবে। এই প্রসঙ্গে রামগতি ন্যায়রত্ন তাঁহার ‘বাঙ্গালা ভাষা ও বাঙ্গালা সাহিত্যবিষয়ক প্রস্তাবে’ (১৮৭৩) লিখিয়াছিলেন—
…এই নাটকের মধ্যে অনেকগুলি উৎকৃষ্ট গীত দৃষ্ট হইল। পদ্যগুলি নূতন প্রকার—অর্থাৎ অমিত্রাক্ষরচ্ছন্দে রচিত। বাঙ্গালা পয়ারের প্রতি-অর্দ্ধের শেষ অক্ষরে মিল থাকে, এই জন্য উহাকে মিত্রাক্ষর ছন্দ বলা যায়—অমিত্রাক্ষরে সেরূপ মিল নাই। এই ছন্দ ইঙ্গরেজির মিল্টন্ প্রভৃতির গ্রন্থে বহুসমাদৃত, বাঙ্গালায় কেহই এ পর্য্যন্ত উহার অনুকরণ করেন নাই—মাইকেলই উহার সৃষ্টিকর্ত্তা বা প্রবর্ত্তয়িতা, এবং পদ্মাবতী নাটকই উহার প্রথম প্রয়োগস্থল।—পৃ. ২৬৫
গ্রীক ধর্মপুরাণের সহিত সম্পর্কযুক্ত—এ কথা মানিয়াও ন্যায়রত্ন মহাশয় এই নাটকটিকে “কবির স্বকপোলকল্পিত” বলিয়াছেন। কিন্তু ‘জীবন-চরিত’-প্রণেতা যোগীন্দ্রনাথ বসু দেখাইয়াছেন (৪র্থ সংস্করণ, পৃ. ২৪৮-৫১), ইহা গ্রীক পুরাণের ছায়াপাতে রচিত হইয়াছে। তিনি লিখিয়াছেন—
…Discordia অথবা কলহদেবী, অন্যান্য দেবীগণের মধ্যে বিবাদ উৎপাদন করিবার জন্য, একটি সুবর্ণময় “আপল্” (apple) নির্ম্মাণপূর্ব্বক, তাহাতে ইহা “সর্ব্বোত্তম সুন্দরীর জন্য” এইরূপ লিখিয়া, তাঁহাদিগের মধ্যে নিক্ষেপ করেন। জুপিটরের (Jupiter) পত্নী জুনো (Juno), জ্ঞান ও বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী প্যালাস (Pallas) এবং সৌন্দর্য্য ও প্রেমের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ভিনস্ (Venus), প্রত্যেকেই আপনাকে সর্ব্বাপেক্ষা সুন্দরী স্থির করিয়া, তাহা প্রাপ্ত হইবার জন্য একান্ত উৎসুক হন। তাঁহারা, ট্রয়-রাজপুত্র পারিসকে (Paris) আপনাদিগের মধ্যস্থ স্থির করিয়া, প্রত্যেকেই তাঁহাকে, আপন কার্যোদ্ধারের জন্য, পুরস্কার প্রদানে স্বীকৃতা হন। জুনো তাঁহাকে সাম্রাজ্য, প্যালান তাহাকে সংগ্রামে বিজয়লক্ষ্মী, এবং ভিনস্ তাহাকে সর্ব্বোত্তম সুন্দরী প্রদান করিতে প্রতিশ্রুতা হন। পারিস সর্ব্বাপেক্ষা সুন্দরী বোধে ভিনিসকেই সুবর্ণ আপল প্রদান করেন। অপরা দেবীদ্বয়, ইহাতে ঈর্ষায় ও অভিমানে, পারিসের সর্ব্বনাশের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। ইহাই সুপ্রসিদ্ধ ট্রয়নগর ধ্বংসের কারণ। সধুসূদন, এই গ্রীক উপাখ্যান অবলম্বন করিয়া, তাঁহার পদ্মাবতী রচনা করিয়াছিলেন। গ্রীক কবির ন্যায় তিনিও তাঁহার গ্রন্থ দেব ও মানব অভিনেতার কার্য্যে পূর্ণ করিয়াছেন। গ্রীক কাব্যেও যেমন, পদ্মাবতীতেও তেমনই, মানব অভিনেতাগণ দেব-অভিনেতাগণের হস্তে ক্রীড়াপুত্তলির ন্যায় পরিচালিত হইয়াছেন। পদ্মাবতী নাটকের শচী, রতিদেবী, নারদ, রাজা ইন্দ্রনীল এবং রাজকুমারী পদ্মাবতী, যথাক্রমে, গ্রীক পুরাণের জুনো, ভিনস্, ডিস্কর্ডিয়া, পারিস এবং হেলেনের আদর্শে কল্পিত হইয়াছেন। পার্থক্যের মধ্যে এই যে, গ্রীক কাব্যের জ্ঞান ও বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী প্যালাসের পরিবর্ত্তে মধুসূদন পদ্মাবতী নাটকে যক্ষরাজমহিষী মুরজা দেবীর অবতারণা করিয়াছেন। জ্ঞান ও বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবীকে সামান্যা সৌন্দর্য্যাভিমানিনী রমণীর ন্যায় বিবাহপরায়ণা না করিয়া মধুসূদন গ্রীক কবির অপেক্ষা বরং সুরুচির পরিচয় দিয়াছেন। স্ত্রীজাতি, বিভাবতী ও বুদ্ধিমতী হইলেও সৌন্দর্য্যাভিমানিনী, এই বলিয়া অনেকে গ্রীক কবিকে সমর্থন করিতে পারেন; কিন্তু স্ত্রীজাতির প্রতি অশ্রদ্ধা এবং অবজ্ঞা হইতে যে এরূপ সংস্কারের উৎপত্তি, তাহা তাঁহারা অনুধাবন করেন না। সামান্যা রমণীর পক্ষে যাহা সম্ভবপর, জ্ঞান ও বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবীর পক্ষে কখনই তাহা সঙ্গত নহে। পদ্মাবতীর আখ্যায়িকাটি যদিও গ্রীক পুরাণ হইতে পরিগৃহীত, তথাপি মধুসূদন তাহাকে এরূপ হিন্দু আকার দান করিয়াছেন যে, তাহার অনুকরণাংশও মৌলিক বলিয়া মনে হয়।
১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দে এপ্রিল মাসের শেষে অথবা মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ‘পদ্মাবতী নাটক’ প্রকাশিত হয়; পৃষ্ঠা-সংখ্যা ছিল ৭৮। প্রথম সংস্করণের আখ্যাপত্রটি এইরূপ—
পদ্মাবতী নাটক। / শ্রীমাইকেল মধুসুদন দত্ত / প্রণীত। “চীয়তে বালিশস্যাপি সংক্ষেত্রপতিতা কৃষিঃ।” / মুদ্রারাক্ষসঃ। / কলিকাতা। / শ্রীযুত ঈশ্বরচন্দ্র বসু কোং বহুবাজারস্থ ১৮২ সংখ্যক / ভবনে ষ্ট্যান্হোপ্ যন্ত্রে যন্ত্রিত। / সন ১২৬৭ সাল। /
মধুসূদনের জীবিতকালে ইহার তিনটি সংস্করণ হইয়াছিল। তৃতীয় সংস্করণের (১২৭৬ সাল, পৃ. ৯০) পাঠই আদর্শরূপে গৃহীত হইয়াছে।
‘পদ্মাবতী’-সম্পর্কে মধুসূদন ও তাঁহার বন্ধুদের চিঠিপত্রে যে সকল সংবাদ পাওয়া যায়, এখানে তাহা একত্র সন্নিবিষ্ট হইল।—
১। মধুসূদন গৌরদাস বসাককে, ১৯ মার্চ ১৮৫১
Now that I have got the taste of blood, I am at it again. I am now writing another play. Some time ago, I sent & synopsis of the plot to the Rajas, and they appear to be quite taken up with it. The first Act is finished. J. M. Tagore has written to me to say that it is “indeed very good.” If I can achieve myself a name by writing Bengali I ought to do it. But I have said enough of self—a d—d unpleasant subject.—‘জীবন-চরিত’, পৃ. ২৪৭।
২। ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ মধুসূদনকে, ৮ মে ১৮৫৯
Three or I believe four acts of your new drama are with my brother. I have not had the pleasure of seeing them yet, but from the synopsis which was read to me some months ago, I have no doubt that the plot under your able management would be turned to good account. I am thinking of some domestic farces to follow immediately after the first representation of the ‘Shermistha’ and before it is repeated, just to show the public that we can act the sublime and ridiculous both at the same time and with the same actors.—‘মধু-স্মৃতি,’ পৃ. ১১৯-২০।
৩। যতীন্দ্রমোহন মধুসূদনকে
I should like very much to see Blank-verse gradually introduced in our dramatic literature. I am inclined to believe that at first it should be done with great caution and judgment. Where the sentiment is elevated or idea is poetical there only should short and smooth flowing passages in Blank-verse be attempted, so that the audience may be beguiled into the belief that they are hearing the self-same prose to which they are accustomed, only sweetened by a certain inherent music pleasing and agreeable to the ear. But care must be taken that they may, in the first instance, be not scared away by the rugged grandeur of this form of versification nor disgusted by the rounded periods, replete with phrases, which are jargon to the untutored ears of many; for that would make the thing at once unpopular and injure the cause for many years to come.—‘জীবন-চরিত,’ পৃ. ২৬৫-৬৬।
৪। মধুসূদন রাজনারায়ণকে, ২৪ এপ্রিল ১৮৬০
...I don’t know if you have seen ‘Sarmistha’ or if you have what you think of it. There is another Drama of mine which will be soon acted by a company of amateurs. It is also written on the classical model. As soon as it is out of the Printer’s hands, I shall send you a copy and you must let me know what you think of it. If I am spared, I intend to write 3 or 4 more plays of the classical kind, just to give our Countrymen a taste for that species of the drama, and then take up historical and other subjects.—‘জীবন-চরিত,’ পৃ. ৩১১।
৫। মধুসূদন রাজনারায়ণকে, ১৫ মে ১৮৬০
Some days ago I wrote to my publisher to send you a copy of the new drama; I am very anxious to hear what you think of it. I am of opinion that our drama should be in blank-verse and not in prose, but the innovation must be brought about by dogroes.—‘জীবন-চরিত,’ পৃ. ৩১৬-১৭।
৬। যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর মধুসুদনকে, ২২ মে ১৮৬০
I quite forgot to mention in my last letter that I have read পদ্মাবতী with the greatest pleasure and how could it be otherwise when the book owes its authorship, to you? The style is neat and colloquial (perhaps in some places a little too much so) and many of the sentiments are rich and fanciful. The story, being quite of a novel sort in the Bengali language, is highly entertaining and the interest in it is well preserved to the very last in short the play is well worthy of the author of Sharmista—‘জীবন-চরিত,’ পৃ. ২৬৪।
৭। মধুসুদন রাজনারায়ণকে, ১ জুলাই ১৮৬০
Your opinion about Padmavati is very gratifying, indeed. —‘জীবন-চরিত,’ পৃ. ৩২১।
মধুসূদনের ‘পদ্মাবতী নাটক’ লইয়া সমসাময়িক পত্র-পত্রিকায় বিশেষ আলোচনা হয় নাই; ইহার একমাত্র কারণ এই যে, ১৮৬০ খ্রীষ্টাব্দেই পর পর মধুসূদনের চারিখানি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।
‘পদ্মাবতী নাটক’ বেলগাছিয়া নাট্যশালায় অভিনীত হয় নাই। ১৮৬৫ খ্রীষ্টাব্দে একাধিক বার কলিকাতার ধনি-গৃহে এবং ১৮৭৪ খ্রীষ্টাব্দে সাধারণ-রঙ্গালয়ে এই নাটকের অভিনয় হয়। সে-যুগে পদ্মাবতী গীতাভিনয়ও খুব জনপ্রিয় হইয়াছিল।
পদ্মাবতী নাটক
[ ১৮৬৯ খ্রীষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে মুদ্রিত তৃতীয় সংস্করণ হইতে ]
নাট্যোল্লিখিত ব্যক্তিগণ
ইন্দ্রনীল। ( রাজা )।
মানবক। ( বিদূষক )।
রাজমন্ত্রী।
দেবর্ষি নারদ।
মহর্ষি অঙ্গিরা।
মাহেশ্বরীপুরীর রাজ-কঞ্চুকী।
ঐ পুরোহিত।
কলি।
সারথি।
শচী দেবী।
রতি দেবী।
মুরজা দেবী।
পদ্মাবতী।
বসুমতী। ( সখী )
মাধবী। ( পরিচারিকা )।
গৌতমী। ( তপস্বিনী )।
রম্ভা। (অপ্সরী )।
নাগরিকগণ, রক্ষকগণ, ইত্যাদি।
সূচীপত্র
এই লেখাটি বর্তমানে পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত কারণ এটির উৎসস্থল ভারত এবং ভারতীয় কপিরাইট আইন, ১৯৫৭ অনুসারে এর কপিরাইট মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে। লেখকের মৃত্যুর ৬০ বছর পর (স্বনামে ও জীবদ্দশায় প্রকাশিত) বা প্রথম প্রকাশের ৬০ বছর পর (বেনামে বা ছদ্মনামে এবং মরণোত্তর প্রকাশিত) পঞ্জিকাবর্ষের সূচনা থেকে তাঁর সকল রচনার কপিরাইটের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়। অর্থাৎ ২০২৬ সালে, ১ জানুয়ারি ১৯৬৬ সালের পূর্বে প্রকাশিত (বা পূর্বে মৃত লেখকের) সকল রচনা পাবলিক ডোমেইনের আওতাভুক্ত হবে।