পশ্চিম প্রদেশের দুর্ভিক্ষ উপশমে সাহায্য সংগ্রহার্থে ব্রাহ্মসমাজের বক্তৃতা
একমেবাদ্বিতীয়ং
পশ্চিম প্রদেশের দুর্ভিক্ষ
উপশমে সাহায্য সংগ্রহার্থে
ব্রাহ্মসমাজের বক্তৃতা।
কলিকাতা
ব্রাহ্মসমাজের যন্ত্রে
মুদ্রিত।
মূল্য চারি আনা।
☞ এই পুস্তক বিক্রয় করিয়া যে টাকা হইবে, তাহা দুর্ভিক্ষ উপশমার্থে প্রেরিত হইবেক।
একমেবাদ্বিতীয়ং
পশ্চিম প্রদেশের দুর্ভিক্ষ
উপশমে সাহায্য সংগ্রহার্থে
ব্রাহ্মসমাজের বক্তৃতা।
কলিকাতা
ব্রাহ্মসমাজের যন্ত্রে
মুদ্রিত।
২৭ চৈত্র ১৭৮২ শক।
ওঁ তৎসৎ
পশ্চিম প্রদেশের দুর্ভিক্ষ উপশমে সহায্য দিবার নিমিত্তে গত ১২ চৈত্র রবিবারে যে ব্রাহ্মসমাজ হইয়াছিল, তাহাতে বিধি পূর্ব্বক ঈশ্বরের উপাসনা সমাধা হইবার পরে শ্রীযুক্ত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বলিলেন যে “ অদ্য এই পবিত্র ব্রাহ্ম-সমাজে আমরা সকলে প্রীতির সহিত সম্মিলিত হইয়াছি। আমারদের আত্মাতে প্রাতি; হৃদয়ে মঙ্গল ভাব। আমরা ঈশ্বরকে প্রীতি দান করিব এবং তাঁহার প্রিয় কার্য্য সাধন করিব; এক কালে সম্যক্রূপে তাঁহার উপাসনা করিব। আজ আমারদের মহৎ দিন। ঈশ্বর আমারদের নিকট হইতে পূজা চান, প্রীতি চান এবং আমারদের প্রীতির দান চান। আমারদের যৎকিঞ্চিৎ অন্ন-দানে ভ্রাতৃগণের দুঃখ দূর হইবে। উত্তর-পশ্চিমে দারুণ মৃত্যু যে প্রকার নির্দ্দয়রূপে এক্ষণে শাসন করিতেছে—চিতা-অগ্নির সহিত শোকানল দাবানলের ন্যায় যে প্রকার অহর্নিশি প্রজ্বলিত হইতেছে; আমারদের কিঞ্চিৎ দানে তাহার উপশম হইবে। যে স্থানে এই দারুণ দুর্ভিক্ষ অবতীর্ণ হইয়াছে, তাহা আমাদের পূর্ব্ব পুরুষদিগের প্রিয় ভূমি। সেই প্রদেশই আমারদের জ্ঞান ও ধর্ম্মের আকর স্থান। আমারদের ঋষিরা সরস্বতী নদীর তীরে ব্রহ্মাবর্ত্তে ব্রহ্মের নাম উচ্চারণ করিতেন। তাঁহাদের মুখ হইতে “সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম ” এই সকল জীবন্ত মহা বাক্য বিনির্গত হইয়াছে, তাহা এখনো পর্য্যন্ত আমরা সংকীর্ত্তন করিতেছি। আহা! সেখানকার লোকেরা এক্ষণে অন্নাভাবে প্রাণ ত্যাগ করিতেছে। সেই দাবানল নির্ব্বাণের নিমিত্তে আমারদের যাহার যে ক্ষমতা, যৎ কিঞ্চিৎ বারি দানে যেন ত্রুটি না হয়। সেই ভারত ভূমির প্রধান স্থান,—সেখানকার সকলে শোকেতে, দুঃখেতে, ক্ষুধাতে, তৃষ্ণাতে, জর্জরিত হইতেছে। তাহারদের এই দুঃখের অবস্থা স্মরণ করিয়া আমরা কি ব্যাকুল হইব না? আমরা কোন্ প্রাণে তাহারদের এই দুঃখ দেখিয়া উদাসীন থাকিব? সেখানকার সেই ঘোর সন্তাপানল এ পর্য্যন্ত চলিয়া আসিতেছে। মৃতকল্পা মাতার উষ্ম নিঃশ্বাস এখান পর্য্যন্ত আসিয়া আমারদের সমুদয় শরীর দগ্ধ করিয়া দিতেছে। এস আমরা সকলে যথাসাধ্য দান করিয়া সেই দুঃখ নিবারণ করি। ইহাতে আমরা কেবল আমারদের ভ্রাতৃগণের দুঃখ শান্তি করিব, এমন নহে; ইহার সঙ্গে সঙ্গে আমারদের পিতার কার্য্য করা হইবে। এই এক স্থলে বসিয়াই আমারদের প্রীতি ও প্রিয়কার্য্য সাধন হইবে সকলে হৃদয়ের দ্বার উদ্ঘাটন কর। প্রীতিকে প্রসারিত করিয়া ভারত ভুমিতে ব্যাপ্ত কর। যে প্রীতি সমুদয় পৃথিবীতে ব্যাপ্ত হইয়া ঈশ্বরের উদার প্রীতির ভাব ধারণ করিবে, তাহা কি এই সঙ্কীর্ণ ভারত ভুমিতে ব্যাপ্ত হইবে না? সেই পশ্চিমবাসিগণ, যাহারদের সঙ্গে আমাদের এমন নৈকট্য সম্বন্ধ, যাহারদের দেশ হইতে— যেমন হিমালয় হইতে গঙ্গ। আসিয়াছে—আমরা সেই গঙ্গার ন্যায় পূর্ব্বদেশে প্রবাহিত হইয়া আসিয়াছি; ভাষাতে, জ্ঞানেতে, ধর্ম্মেতে, সমুদয় সংসারের কার্য্যেতে, যাহারদের সঙ্গে আমাদের ঐক্যতা; তাহারদের সঙ্গে সমদুঃখী হওয়া কি কঠিন? তাহারদের দুঃখ-দাবানলে কিঞ্চিৎ সাহায্য দিতে কি আমারদের কষ্ট বোধ হইবে? তাহারদের দুঃখ দেখিয়া আমরা কি হাস্য কৌতুকে দিন যাপন করিব? তাহারা অন্নাভাবে মরিতেছে মনে করিয়া আমরা কি অন্নের কোন স্বাদ পাই?
আমরা ঈশ্বরের উপাসনার সময় বলি; তোমার যে করুণা, তাহার প্রতিক্রিয়া কি করিব? তুমি অহর্নিশি আমারদিগকে রক্ষা করিতেছ, অন্নপানে হৃষ্টপুষ্ট রাখিতেছ, রজনীতে অন্ধকার প্রসারিত করিয়া বিশ্রামে প্রবৃত্ত করিতেছ; আমরা তাহার কি প্রতিক্রিয়া করিব? তাহার প্রতিক্রিয়া কি, শুন। যিনি ক্ষুধা-তৃষ্ণা শাস্তির নিমিত্তে তোমারদিগকে অজস্র-রূপে অন্নপান পরিবেশ করিতেছেন, তাঁহার অমৃত পুত্ত্রদিগের দুঃখ-শান্তির নিমিত্তে তাহার কতক অর্পণ কর। ঈশ্বর তোমারদিগকে যাহা কিছু দিয়াছেন, তাহার সকল আপনার জন্যই রাখিও না। তোমার ভ্রাতৃগণের দুঃখ একেবারে বিস্তৃত হইও না। এই কি ভুলিবার সময়? তোমার ভ্রাতা ভগিনীরা আহার না পাইয়া কেহ অচেতন হইয়া পড়িয়াছে, কেহ প্রাণ ত্যাগ করিতেছে; এখন কি ভুলিবার সময়? এখন কি এ কথা বলিবার সময়, আমি বারম্বার দিয়াছি, আর দিতে পারি না? এ কথা কি এখন মুখে আনিতে আছে? আমরা যত বার দান করিব, শত শত লোক ধন্যবাদ দিয়া তাহা গ্রহণ করিবে।
আমরা এই সমাজে আসিয়া প্রীতির সহিত যে নৈবেদ্য প্রদান করিতেছি, ঈশ্বর তাহা দক্ষিণ হস্তে গ্রহণ করিতেছেন। আমরা কোন মনুষ্যকে দিতেছি না, আমরা তাঁহার ধন তাঁহাকেই প্রত্যর্পণ করিতেছি। তিনি আমারদের প্রীতির ধন আদর পূর্ব্বক গ্রহণ করিতেছেন। আমরা আমারদের অকিঞ্চিৎকর বস্তু-সকল দিয়া ঈশ্বরের পূজা করিতেছি; ভ্রাতৃগণের দুঃখ শান্তি করিতেছি। ব্রাহ্মেরই এই মহৎ অধিকার। এই প্রকার নিষ্কাম প্রীতির সহিত ঈশ্বরের হস্তে দান করা ব্রাহ্ম ভিন্ন আর কেহই করিতে পারে না। অন্য লোকে লোককেই দান করে, আমরা ঈশ্বরের দক্ষিণ হস্তে এই সকল অর্পণ করিতেছি। যিনি ক্ষুধার জন্য অন্ন দিতেছেন, তৃষ্ণার জন্য পানীয় দিতেছেন; তাঁহার অন্ন পানীয় তাঁহার অমৃত পুত্ত্র-সকলের দুঃখ নিবারণের জন্য আমরা তাঁহারই হস্তে প্রত্যর্পণ করিতেছি। দেখিও, যেন আমারদের সাধ্যের কোন ত্রুটি না হয়। এস আমরা মুক্তহস্তে পিতার চরণে সকলি সমর্পণ করি—ভ্রাতৃবর্গের দুঃখ শান্তি করি—প্রীতি ও প্রিয়কার্য্য একত্রে সংসাধন করি।
এক বার চাহিয়া দেখ, দেখিবে যে চতুর্দ্দিকে দুঃখ-দাবানল জ্বলিতেছে। তোমার দয়া-বৃত্তি কি হৃদয়ে বারম্বার আঘাত করিয়া বলিতেছে না, তোমার সম্মুখে সহস্র সহস্র লোক অনাহারে প্রাণ ত্যাগ করিতেছে, তুমি কি সুখে ভোজন করিতেছ? কত কত লোক স্তব্ধ শূন্য গৃহে মৃতপ্রায় পড়িয়া রহিয়াছে, আহা একটী লোক নাই যে তাহাদের প্রতি চাহিয়া দেখে, তুমি কি সুখে শয়ন করিতেছ? সাধু দয়া-বৃত্তি কি আমারদিগকে বারম্বার এই প্রকার আঘাত করিতেছে না? দেখ, আমারদের দেশের কি প্রকার অবস্থা হইয়াছে। পশ্চিমে যোজন যোজন ভূমি মরু ভূমি হইয়া রহিয়াছে, হরিৎ বর্ণ আর কোথাও দেখা যায় না। আমারদের এমন ভারতবর্ষ আরব্য দেশের মরু-ভূমি তুল্য জল-শূন্য মরু-ভূমি হইয়া গেল—ইহার আশ্রিত অগণ্য লোকদিগকে আর আহার দিতে পারে না—এ কি সামান্য শোচনীয় বিষয়? চক্ষে দেখিলেই কি আমারদের দয়ার উদয় হইবে? এই সকল দেখিলে কি আমরা ক্ষণ কালের জন্য সুস্থ থাকিতে পারিতাম? আমারদের ভ্রাতৃগণের হৃদয়-বিদারণ দুঃখের ক্রন্দন শুনিয়া, তাহারদের রক্ত-শূন্য অস্থি-সার দেহ দেখিয়া, কি আমারদেরও এই দেহ বিকল হইয়া পড়িত না? মাতা ভূমির উপরে মৃত-শরীর হইয়া শয়ান রহিয়াছে, আর শিশু সেই মৃত দেহোপরি পড়িয়া রহিয়াছে; ইহা দেখিলে আমারদের হৃদয়ে কি শোণিত থাকিত? না আমারদের নিঃশ্বাস আর বহন হইত? জীবন্ত মনুষ্য গলিত মাংস ভোজন করিবার জন্য শৃগাল শকুনীর সহিত বিবাদ করিতেছে, ইহা দেখিয়া কি হৃদয়ের রক্ত শীতল হইয়া যাইত না?
আমরা এই দুঃখের প্রতি মনোযোগ দিতেছি না। আমারদের দুঃখের সময় কে দেখিবে? পশ্চিম দেশ হইতে যদি পূর্ব্ব দেশে এই দুর্ভিক্ষ চলিয়া আইসে, তখন আমারদের কি হইবে? তখন আর বলিতে পারিবে না, পৃথিবী নির্দ্দয়—আমারদের প্রতি কেহই ফিরিয়া দেখে না। সম্পত্তি বিপত্তি এখানে অহর্নিশি পরিভ্রমণ করিতেছে। আজ আমার সম্পত্তি, আমার ভ্রাতার বিপত্তি; কন্য ভ্রাতার সম্পত্তি, আমার বিপত্তি। আগামী বৎসরে যদি আমারদের এই প্রকার দুর্দ্দশা হয়, তখন পশ্চিমবাসিরা মনে করিবে, আমারদের দুঃখের সময় ইহারা এক বারও ফিরিয়া চায় নাই। আর আমারদের এ প্রকার কৃপণতার পরিবর্ত্তে যদি সেই সময়ে তাহারা আমারদের প্রতি সাধু ব্যবহার করে, তখন আমারদের আপনারদের প্রতি কত লজ্জা ও ঘৃণা হইবে!
ঈশ্বরের ধর্ম্ম-সেতু দেখ। তিনি আমারদিগকে কি প্রকারে রক্ষা করিতেছেন। যদি পশ্চিমবাসিরা আপনারদের প্রাণ রক্ষার জন্য এ দেশে পঙ্গপালের মত আসিয়া আমারদের সকলকে আক্রমণ করে, তবে আমারদের কি দশা হয়? তাহারা আসিয়া যদি আমারদের নিকট হইতে ধন ধান্য সকলি কাড়িয়া লয়, তবে কে আমারদিগকে রক্ষা করিতে পারে? পঞ্জাব হইতে দিল্লী পর্য্যন্ত যে সকল লোক হাহাকার করিতেছে, তাহারা ক্ষিপ্তের ন্যায় বঙ্গ দেশের উপরে পড়িয়া যদি ধান্য শস্য-সকল হরণ করে, তবে কি হয়? তাহা হয় না কেন? কেন না ঈশ্বর স্বয়ং ধর্ম্ম-সেতু ধারণ করিয়া রাখিয়াছেন! তাহারা বরং অনাহারে প্রাণ ত্যাগ করিবে, তথাপি বল পূর্ব্বক আমারদের নিকট হইতে এক মুষ্টি তণ্ডুলও গ্রহণ করিতে পারে না। আমরা ইচ্ছা পূর্ব্বক দান করিলে তবে তাহারা গ্রহণ করিতে পারে।
দেখ! ধর্ম্ম কি বলে, দয়া কি বলে, কৃতজ্ঞতা কি বলে; সকলি বলিতেছে, তোমরা ভ্রাতৃগণের সাহায্যের নিমিত্তে হস্ত প্রসারণ কর। আমরা যৎকিঞ্চিৎ দিব বই নয়, আমরা যদি সর্ব্বস্ব জীবিকা প্রদান করি, তথাপি এই বিস্তীর্ণ দুর্ভিক্ষের কতই বা উপশম হইতে পারে। আমারদের মধ্যে ধনেতে, মানেতে, সকলেই অল্প। আমরা শ্রদ্ধার সহিত যাহা দান করি, তাহাই আমারদের সর্ব্বস্ব। ঈশ্বরের পূজার নিমিত্তে প্রীতির সহিত, শ্রদ্ধার সহিত, শ্রেয়স্কামেতে আমরা যাহা কিছু দিই, তাহাই আমারদের যথার্থ দান। ঈশ্বর তাহা আদরের সহিত গ্রহণ করিবেন। যশ মান খ্যাতি প্রতিপত্তির যে দান, তাহা ব্রাহ্ম সমাজের দান নহে। অন্যেরা অনুরোধে পড়িয়া দেয়, অন্যেরা নামের জন্য দেয়, অন্যেরা না জানিয়া শুনিয়া ঈশ্বরের কার্য্যে সাহায্য করে; আমরা ইচ্ছা পূর্ব্বক, প্রীতির সহিত, ঈশ্বরের কার্য্য জানিয়া, তাঁহার দক্ষিণ হস্তে সকলি সমর্পণ করিতেছি। আমারদের দানে যদি এক বেলার জন্য এক জনেরো ক্ষুধা শান্তি হয়, তথাপি তাহার ফল অনন্ত ফল। আমারদের সাধু ইচ্ছাই সর্ব্বস্ব। এস আমরা সকলে এমন দৃষ্টান্ত দেখাই যে আর সহস্র লোকে তাহার অনুগামী হয়। কৃপণতা, ক্ষুদ্র ভাব, পরিত্যাগ করিয়া উদার ভাব ধারণ কর। ঈশ্বরের সেই উদার মঙ্গল ভাব মনে করিয়া দেখ। দেখ, তাঁর বৃষ্টি আসিয়া কেমন সমুদয় পৃথিবীকে শস্যশালিনী করিতেছে। সেই বৃষ্টি এক বৎসর আসে নাই বলিয়া দেখ কি হইয়াছে। যে দেশে মেঘ এক বৎসর যায় নাই, আমারদের দয়া গিয়া কি তথায় এক বৎসরেরও কার্য্য করিতে পরিবে না? আমরা কি বাষ্প হইতেও লঘু, মেঘ হইতেও অপদার্থ? এই বৃষ্টি, সূর্য্য, যাঁহার কার্য্য করিতেছে, আমরা কি তাঁহার কার্য্যে অবহেলা করিব? যাঁহার বায়ুতে আমরা নিঃশ্বাস লইতেছি, যাঁহার সূর্য্য-কিরণে রক্ষিত হইতেছি, যাঁহার বৃষ্টিতে অপর্য্যাপ্ত অন্ন পান পাইতেছি; তাঁর কার্য্য কি সমুদয় যত্নের সহিত অদ্য সম্পন্ন করিব না? আমারদের প্রতি তাঁহার অজস্র দান; আমরা যথাসাধ্য তাঁহাকে দান করিয়া তাহার অল্প মাত্রাও পরিশোধ করিতে পারি, এ অপেক্ষা আমারদের সৌভাগ্য আর কি আছে।
যদি সাধু দৃষ্টান্ত দেখিতে চাও, তবে দেখ। এই বিষয়ে ইংরাজেরা দেখ কত সাহায্য করিতেছে। দুই তিন বৎসর হইল, সেই পশ্চিমের লোকেরা তাহারদের প্রতি কত অত্যাচার করিয়াছিল, তাহারদের বাসগৃহ জ্বালাইয়া দিয়াছিল, তাহারদের স্ত্রী পুত্রদিগকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করিয়াছিল; সে শোণিত এখনো শীতল হয় নাই। কি মহত্ত্ব! তাহারা সে সমস্ত ভুলিয়া গিয়া সেই সকল লোকের দুঃখ দূর করিবার জন্য অগ্রসর হইয়াছে। তাহারা অসৎকে সদ্ভাব দ্বারা পরাজয় করিতেছে; শত্রুতাকে বন্ধুতা দিয়া দমন করিতেছে। তাহাদের তুলনায় আমারদের কি হীনতাই প্রকাশ পায়। আমারদের মধ্যে ধনী, মানী, উচ্চ পদের লোকেরা, তাহারদের প্রতি কৃপা-দৃষ্টিতে দেখিলে তাহারদের অর্দ্ধেক দুঃখ চলিয়া যায়; কিন্তু তাহারা আমোদ কোলাহলেই মত্ত—পর-দুঃখে কিঞ্চিৎ মাত্রও কাতর নহে। বিদেশীয়েরা নিঃস্বার্থ ভাব অবলম্বন পূর্ব্বক তাহারদের দুঃসময়ের বন্ধু হইয়াছে, আর আমরা তাহাদের দুঃখে দৃক্পাতও করিতেছি না। ব্রাহ্মেরা যেন এই সাধারণ দোষে দোষী না হন। তাঁহারদের দৃষ্টান্তে যেন আর সকল লোকে অগ্রসর হইয়া এই মহৎ কার্য্যে সহায়বান্ হন।
আমরা সকলে দীন দরিদ্র—ধনী মানী আমারদের মধ্যে অতি অল্প। ঈশ্বর ধন সম্পত্তি দেখেন না; তিনি হৃদয় দেখেন, তিনি সাধু ইচ্ছা দেখেন। তিনি আন্তরিক ভাব দেখিয়। দানের মূল্য বিবেচনা করেন। ঈশ্বরের নিকটে ধনী মানী পদশালীর মান নাই। আন্তরিক শ্রদ্ধার সহিত যে যাহা দান করে, তাহাই তিনি গ্রহণ করেন। যে ব্যক্তি অনুরোধে পড়িয়া লক্ষ মুদ্রা দেয়, ঈশ্বর তাহার . মনের ক্ষুদ্র ভাব দেখেন; যে আপনি দুই দিবস উপবাস করিয়া এক জন ক্ষুধার্ত্তকে এক বেলার অন্ন দেয়, তিনি তাহার উদার ভাব দেখেন। নিঃস্বার্থ সাধুর হৃদয়েই তিনি বিমল আত্ম-প্রসাদ প্রেরণ করেন। এস সকলে মিলিয়া আমরা নিঃস্বার্থ ভাবে দান করি। হৃদয়কে প্রীতি ও মঙ্গল ভাবে পরিপূর্ণ করিয়া ঈশ্বরের দক্ষিণ হস্তে সকলি সমর্পণ করি; আমারদের যেন কোন নীচ হীন লক্ষ্য না থাকে, আমারদের সাধ্যের যেন ত্রুটি না হয়। মুক্ত হস্তে, প্রশস্ত হৃদয়ে, যে যাহা পারি; তাহা তাঁহার চরণে অর্পণ করি।”
ওঁ একমেবাদ্বিতীয়ং।
পরে দান সংগ্রহ ও নিম্নলিখিত সংগীত হইয়া সমাজ ভঙ্গ হইল।
রাগিণী দেশ।
কাল-রজনী আঁধারিল এ ভারত; এ ঘোর বিপদে রাখ তুমি, দেখ চেয়ে করুণা-নিধান।
দিবা রাত জ্বলে ঘোর শোকানল, রাশি রাশি চিতা সঙ্গে; দেখ চেয়ে করুণা-নিধান।
আহা চাহিয়ে কেহ দেখে না রে, আপন ভাবে না আপন ভ্রাতা জনে। দেখ দেখি, জননীর ক্রোড়োপরে শিশু শুখাইছে।
নাহি আর কেহ তার ত্রিভুবনে; রাখ তারে করুণানিধান।
দুর্ভিক্ষ উপশমে সাহায্যার্থে চাঁদায় যে টাকা আদায় হইয়াছে, তাহার নিদর্শন।
| ২৬ চৈত্র পর্য্যন্ত আয় | ২২৮৩৷৶১০ |
| দুর্ভিক্ষগ্রস্ত দেশে প্রেরিত হইয়াছে। | ২২৫০ |
| অবশিষ্ট ৩৩৷৶১০ |
এতদ্ব্যতীত নিম্নলিখিত যে সকল দ্রব্য দান প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে, তাহার মূল্য ৬০০ টাকারো অধিক হইবেক।
১। ফিরোজা রঙ্গের রুমাল ১ খানা
২। চিকনেরসবুজ রঙ্গেরঐ রুমালঐ ২ খানা
৩। চিকনেরলাল রঙ্গেরঐ রুমালঐ ১ খানা
৪। চিকনের রঙ্গেরঐ রুমালঐ ১ খানা
৫। জরদ রঙ্গের জোড়া ১
৬। লাল রঙ্গের জোড়া ১
৭। শাদা রুমাল ১ খানা
৮। টুপী ১০ টা
৯। ৪ গজ কালো রঙ্গের আলপাকা
১০। আনারসি কাপড়ের কাবা ১ টা
১১। হীরার অঙ্গুরী ২ টা
১২। ফিরোজার অঙ্গুরী ১ টা
১৩। স্বর্ণ অঙ্গুরী ২ টা
১৪। ১ ছড়া সোনার গোট
১৫। ঘড়ির শিকলি ১ ছড়া
১৬। ঝুমকা ১ জোড়া ও পাসা ১ জোড়া
১৭। বালা ভাঙ্গা সোণা
১৮। সোণার বাজু ২ খানা
১৯। বোঁদা ২ টা
২০। টুকরা সোণা
২১। রূপার থালা ১ খানা
২২। রূপার আতরদান ১টা, গোলাপপাস ১টা এবং ফুলদান ১টা
২৩। রূপার বিছা ১ছড়া ও বক্লস ২টা।
২৪। রূপারঐ ছালনা ১০টা
২৫। রূপারঐ গোটের খামি ১ খানা
২৬। রূপারঐ মল্ ১ জোড়া
২৭। রূপারঐ ছোট মল ১ জোড়া
২৮। রূপারঐ কাঁটা ২ টা
২৯। রূপারঐ শিকলি ১ ছড়া ও চুটুকী ২ টা
৩০। রূপারঐ চিরুণি ২ খানা
৩১। পিতলের ঘড়া ১টা
৩১। পিতলের থালা ৩ খানা
৩২। কোমর বন্দ ১টা
৩৩। গরদের ধূতি ১ খানা
৩৪। লাং ক্লাথ ২ গজ
৩৪। বালাম চাল ২ মোণ
৩৫। হায়ান ট্রে ১ টা
দ্রব্যের নিদর্শন মনোযোগ পূর্ব্বক দেখিলে জানিতে পারিবেন যে কোন কোন স্ত্রী লোকেরা আপনারদিগের অলঙ্কার পর্য্যন্তও তাহাতে সমর্পণ করিয়াছেন এবং কাহারো কাহারো যেমন ইচ্ছা তত ধন দান করিবার ক্ষমতা না থাকাতে তাঁহারদিগের প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য্য দ্রব্য সকল অতি উদার ভাবে দান করিয়াছেন। ঈশ্বর তাঁহারদিগের আত্মাতে নির্ম্মলা শান্তি প্রেরণ করুন।
বিজ্ঞাপন।
যাঁহারা উত্তর-পশ্চিমের দুর্ভিক্ষ উপশমের নিমিত্ত সাহায্য করিতে মানস করেন, তাঁহারা কলিকাতার ব্রাহ্মসমাজে পাঠাইয়া দিলে দুর্ভিক্ষগ্রস্ত দেশে তাহা প্রেরিত হইবেক। যৎকিঞ্চিৎ সাহায্য প্রেরণ করিলেও তাহা ধন্যবাদের সহিত গৃহীত হইবেক।
শ্রীদেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর
শ্রীকেশবচন্দ্র সেন
কলিকাতা ব্রাহ্মসমাজের
সম্পাদক।
এই লেখাটি ১ জানুয়ারি ১৯৩১ সালের পূর্বে প্রকাশিত এবং বিশ্বব্যাপী পাবলিক ডোমেইনের অন্তর্ভুক্ত, কারণ উক্ত লেখকের মৃত্যুর পর কমপক্ষে ১০০ বছর অতিবাহিত হয়েছে অথবা লেখাটি ১০০ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছে ।