পাতা:অক্ষয়কুমার বড়াল গ্রন্থাবলী.djvu/২৫

উইকিসংকলন থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।


প্রদীপঃ প্রস্তুতি

দুঃখবাদের বিষও অমৃতে পরিণত হইয়াছে। তিনি দুঃখাবদগ্ধ হইয়াও আস্তিক, বিশ্বাসী; বিধাতার মঙ্গলবিধানে তাঁহার একান্ত নির্ভর। এই জন্য তাঁহার 'পেসিমিজম্'ও অনেকটা স্নিগ্ধ, শান্ত, সংযত। এই জন্যই তাঁহার দুঃখবাদও সুখবাদের পরিপষোক ও আনন্দের নির্ঝরে পরিণত হইয়াছে।

 অক্ষয়কুমার সৌন্দর্য্যের উপাসক, ভক্ত, ভাবুক। এই ভাবুকতার ফলে তাঁহার কবিতা ধন্য হইয়াছে। তিনি সৌন্দর্য্যের বিশ্লেষণ করেন নাই। কবি বহিঃপ্রকৃতি ও অন্তঃপ্রকৃতির সৌন্দর্য্য অনুভব করিয়াছেন, এবং পাঠককে তাহা অনুভব করিবার, উপভোগ করিবার অবকাশ দিয়াছেন। তাঁহার অন্তর্দৃষ্টি ও অনুভূতি অসাধারণ। এই আন্তরিকতাই সাহিত্যের প্রাণ। অক্ষয়কুমারের কবিতায় যে প্রাণের স্পন্দন অনুভব করি, এই আন্তরিকতাই সেই প্রাণ-বলের অমৃত-উৎস।

 অক্ষয়কুমারের কবিতায় নারী ভোগের উপাদান নহে। কবি নারীকে দেবতার আসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়া মানস-পুষ্পে অর্ঘ্য দিয়াছেন। এই উচ্চ আদর্শের অনুসরণ করিয়া কবি ভাবের উচ্চ শিখরে আরোহণ করিয়াছেন; তাঁহার কবিতাও পবিত্র হইয়াছে। লালসার অঙ্কুর উদগত হইবামাত্র কবি স্বয়ং তাহা পদ-দলিত করেন। তিনি লালসা-বিলাসের ক্রীতদাস নহেন। তিনি রূপ দেখিয়া মুগ্ধ হন, কিন্তু বিহ্বল হইয়া পিশিতপিন্ডের পূজা করেন না। রূপ অ-রূপের সৌন্দর্য্য মগ্ন হইয়া যায়। বাসনার তরঙ্গ পূর্ণ প্রেমের বিক্ষোভবিহীন পারাবারে মিশিয়া লুপ্ত হইয়া যায়।

 এই জন্য তাঁহার প্রেমের কবিতায় লালসার রক্তরাগ নাই। সে প্রেম সর্ব্বত্র অগ্নিপূত শুদ্ধ হেম। তাহা ভোগতৃষ্ণার হাহাকার নহে-- আত্মবিস্মৃত ভক্তের আত্মবিসর্জ্জনের আকাঙ্খা। কবি এই উচ্চ আদর্শের অনুবর্ত্তী হইবার ও সন্নিহিত থাকিবার যে চেষ্টা করিয়াছেন, তাহা সার্থক হইয়াছে।

 অক্ষয়কুমারের কবিতায় Human interest-- 'মানবিকতা' আছে। আধুনিক বাঙ্গালা কবিতায় ইহা অত্যন্ত দুর্ল্লভ, তাহা অসঙ্কোচে বলা যায়। অক্ষয়কুমার মানুষকে ভালবাসেন, মানবের সুখে দুঃখে তাঁহার প্রাণ হাসে, কাঁদে,-- তাঁহার কবিতা পড়িয়াই আমরা তাহা বুঝিতে পারি।এই জন্যই তাঁহার কবিতাএ ঝঙ্কারে আমাদের প্রাণের তন্ত্রী ঝঙ্কৃত হইয়া উঠে। তাঁহাকে এই বিপুল মানব-পরিবারের একজন, --নিতান্ত ঘনিষ্ঠ আত্মীয় বলিয়াও মনে হয়;-- চন্দ্রলোক-চারী, কমলবিলাসী কবি বলিয়া কল্পনা না করিয়াও, তাহার কবিতা আমরা সর্ব্বান্তঃকরণে উপভোগ করিতে পারি। এইরূপ সমবেদনায় সমৃদ্ধ বলিয়াই তিনি বর্ত্তমান কালের বহু হীনতা ও দীনতা অতিক্রম করিয়া, অণু হইতে বিরাট পর্য্যন্ত--আব্রম্ভস্তম্ব পর্য্যন্ত সর্ব্বত্র বাঞ্ছিতকে অনুভব করিয়াছেন। আর সেই অনুভূতির প্রসাদে